রসকলিকার রচয়য়িতা নন্দকিশোর - পাতার উপরে . . . ১৯৬১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য” সংকলনের ৩৯৩ পৃষ্ঠায় আক্ষেপানুনাগের একটি ভণিতাহীন পদ রয়েছে। “অনুরাগের লক্ষণ হয় চারি প্রকার” পদটির রচয়িতার নামে রয়েছে বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তীর শিষ্য নন্দকিশোর দাসের নাম। পদটি তাঁর রচিত রসকলিকা গ্রন্থের ১৪৭-পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া হয়েছিল।
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদ্-মন্দির থেকে ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে (১৯৩২) প্রকাশিত, তারাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য্য সঙ্কলিত “বাঙ্গালা প্রাচীন পুথির বিবরণ”, ৩য় খণ্ড, ২য় সংখ্যার ১৩৬-পৃষ্ঠায় একজন নন্দকিশোর দাসের রচিত “রসকলিতা” পুথির উল্লেখ রয়েছে। পুথির শেষ এইভাবে আছে . . .
"আমি মূঢ় দুরাচার অতি বড় হীন। রস কিছু নাহি বুঝি অতি অপ্রবীণ॥ শ্রীগুরুবৈষ্ণবপাদপদ্মে করি আস। এ রসকলিকা নন্দকিশোর প্রকাশ॥*॥ ইতি শ্রীরসকলিকা গ্রন্থে সম্ভোগলীলাবর্ন্ননং নাম শোড়ষদলং॥ ১৬॥ *॥ সমাপ্তেয়ং রসকলিকাগ্রন্থঃ॥ *॥ স্বাক্ষরমিদং শ্রীকৃষ্ণদাসস্য মোকাম শ্রীশ্রী ঁধাম॥ পঠনার্থ শ্রীযুক্ত নবকৃষ্ণ বসু মুনসী সাকিম কাইগ্রাম॥ ইতি সন ১২৩৯ সাল তারিখ ২০ ভাদ্র সম্বত ১৮৮৯। মাহ ভাদ্র সুদী নবমী রোজ সোমবার ব্রহ্মকুণ্ডে কুটিতে বসিয়া পুর্ন্ন করিলাম মাত্র॥"
দেখা যাচ্ছে যে, গ্রন্থটি শেষ করা হয় বৃন্দাবনে, কৃষ্ণদাস নামক এক ব্যক্তির গৃহে। বৃন্দাবনের ব্রহ্মকুণ্ডের কাছে, কোনও কুটীরে বসে এই পুথিটি লেখা শেষ করা হয়েছিল বর্ধমান জেলার কাইগ্রামের এক শ্রীযুক্ত নবকৃষ্ণ বসু মুনসীর জন্য, ২০ ভাদ্র সম্বত ১৮৮৯ তারিখে অর্থাৎ ১৮৩২ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। লেখক বা লিপিকর তাঁর নিজের নাম লেখেন নি।
এ ক্ষেত্রে দুরকম হয়ে থাকতে পারে। প্রথমত, পুথির লেখক নন্দকিশোর স্বয়ং নবকৃষ্ণ বসু মুনসীর জন্য পুথিটি লিখে থাকতে পারেন বা তাঁর পুথির নকল নিজেই করে দিয়ে থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে নন্দকিশোরের সময়কাল ১৮৩২ খৃষ্টাব্দ দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, গ্রন্থটি নন্দকিশোর বহুপূর্বেই শেষ করেছিলেন। এবার অন্য কোনও ব্যক্তি পুথিটি নকল করলেন, কিন্তু তাঁর নিজের নাম লিখলেন না। এক্ষেত্রে নন্দকিশোর ১৮৩২ খৃষ্টাব্দের পূর্বের কোনও সময়কালে বর্তমান ছিলেন।
নন্দকিশোর সম্বন্ধে প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . এক নন্দকিশোরের উল্লেখ পাই ১৯৫৫সালে প্রকাশিত প্রিয়নাথ জানা সম্পাদিত “বঙ্গীয় জীবনকোষ” গ্রন্থে। এখানে জানা যাচ্ছে . . .
“নন্দকিশোর দাস - সপ্তদশ শতাব্দীর কবি। এঁর রচিত গ্রন্থের নাম রসকলিকা বা রসপুষ্প কলিকা। রসকলিকা যোড়শ দল বা অধ্যায়ে পরিসমাপ্ত। এর একটিপ্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে রসশাস্ত্রের বিচারে শ্রীচৈতন্যের জীবনী হতে দৃষ্টান্ত। বহু সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত হয়েছে, তার মধ্যে অনেকগুলি গ্রন্থকারের স্বরচিত।
অভিরাম ঠাকুরের শাখা নির্ণয়ে চুনাখালীবাসী এক নন্দকিশোর দাসের উল্লেখ আছে। কেউ কেউ এঁকেই রসকলিকার রচয়িতা বলে মনে করেন।”
কবি নন্দকিশোর - আমরা তিন জন এই নামের কবিকে পাচ্ছি।
১। দীনবন্ধু দাস রচিত সংকীর্ত্তনামৃত গ্রন্থে সংকলিত পদকর্তা নন্দকিশোর। ৬টি পদ সংকলিত হয়েছে দীনবন্ধু দাস সংকলিত সংকীর্ত্তনামৃত পদসংকলনে। ইনিই দীনবন্ধু দাসের উল্লিখিত পিতামহ ছিলেন বলেই মনে হচ্ছে। কারণ দীনবন্ধু দাস তাঁর একাধিক পদ শেষ করেছেন এই নন্দকিশোরকে বন্দনা করে . . . শ্রীনন্দকিশোর-পদ হৃদয়ে ধরিঞা। দীনবন্ধু দাস কহে শুন মন দিয়া॥---দীনবন্ধু দাস, সংকীর্ত্তনামৃত, উত্তরখণ্ড ১ম পরিচ্ছেদ॥
সংকীর্ত্তনামৃতের পূর্বখণ্ড শেষ করার পরে তার নির্ঘন্টের শেষেও নন্দকিশোরের বন্দনা পাই . . . শ্রীনন্দকিশোর-পাদপদ্ম করি আশ। সংকীর্ত্তনামৃত কহে দীনবন্ধু দাস॥---দীনবন্ধু দাস, সংকীর্ত্তনামৃত॥
সংকীর্ত্তনামৃত গ্রন্থের রচনাকাল ১৭৮১খৃষ্টাব্দ (প্রাপ্ত পুথির শেষে এই সালের উল্লেখ রয়েছে) ধরলে
২। আরেক নন্দকিশোরের উল্লেখ পাই ১৯৫৫সালে প্রকাশিত প্রিয়নাথ জানা সম্পাদিত “বঙ্গীয় জীবনকোষ” গ্রন্থে। রসকলিকা গ্রন্থের রচয়িতা নন্দকিশোর। প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি নীচে রয়েছে।
৩। শ্রীবৃন্দাবন লীলামৃত গ্রন্থের রচয়িতা নন্দকিশোর দাস। এই কবি অবশ্যই বৃন্দাবনে কিছুকাল বসবাস করেছিলেন। এই গ্রন্থের মূল বিষয় তার দিকেই নির্দেশ করছে। ২য় ও ৩য় নন্দকিশোর দাস একই ব্যক্তি হতে পারেন। অথবা এঁরা চিনজনই এক ও অভিন্ন ব্যক্তি হতে পারেন যিনি বৃন্দাবনে কিছুকাল ছিলেন।
নন্দকিশোর দাস নিয়ে বিমানবিহারী মজুমদারের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৬১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য” গ্রন্থে তিনি এই কথা জানিয়েছেন যে "রসকলিকার" রচয়িতা নন্দকিশোর, বিশ্বনাথ চক্রব্রতী বা হরিবল্লভের শিষ্য ছিলেন এবং সেই কারণে আমরা ধরে নিতে পারি যে কিছুকাল বা দীর্ঘকাল তিনি বৃন্দাবনের অধিবাসী ছিলেন।
"উদ্ঘূর্ণা দশাতে চিত্তে নানা ভ্রম হয়" পদটি ১৯৬১ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত বিমানবিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ৫১২-পৃষ্ঠায় দেওয়া রয়েছে। পদটি নিয়ে তিনি লিখেছেন . . .