মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি -                   পাতার উপরে . . .  
১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন
কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . .
“. . .
রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা
তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয়
মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার
অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের
প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই
প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত
করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার
পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন,
মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ
করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ
বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন।
মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা
গাহিয়াছেন।


আমরা
মিলনসাগরে  কবি সৈয়দ সুলতান-এর বৈষ্ণব পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে  পৌঁছে দিতে
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।



কবি সৈয়দ সুলতান-এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১৬.৫.২০১৯

...
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
১২৯৪ বঙ্গাব্দে (১৮৮৭ খৃষ্টাব্দ) লস্করপুরের সৈয়দ আবদুল আগফার চৌধুরীর তরফের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে
জানা যায় যে লস্করপুরের সৈয়দ বংশের মিকাইল এর কনিষ্ট পুত্র সা-মিনা। এই সা মিনার অপর নাম  
সোলতান, জিনি জনসাধারণের কাছে সোলতান নামেই পরিচিত ছিলেন। তিনি বড় হয়ে লস্করপুর ছেড়ে দেড়
ক্রোশ দূরে নিজের বাসগৃহ নির্মান করে বসবাস শুরু করেন। এই নব-স্থাপিত পল্লী তাঁর নাম অনুসার  
“সোলতানসি” নামে খ্যাত হয়।

বৈষ্ণব পদ সংকলেন কাজে এই কবির পদও সংগ্রহ করতে গিয়ে কবি সম্বন্ধে আরও অনেক কথা জানা
হলো যা পাঠকের কাছে না পৌঁছে দিতে পারলে অন্যায় হবে। যেমন, কবি ছিলেন শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক।
তাঁর তিরোধানের সময়কালের ৩৩ বছর পূর্বে কবি তাঁর শেষ গ্রন্থ “শবে মেয়েরাজ” লেখা শুরু করেছিলেন।

এই কবিই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় ইসলাম ধর্মের এবং হজরত মহম্মদের কথা ও কাহিনী বাংলা ভাষায়
বাঙালীর কাছে পৌঁছে দেন। তাঁর জন্য তাঁকে অনেক বিরোধ প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল গোঁড়া মুসলমানদের
কাছ থেকে।
হিন্দু-মুসলমান সমন্বয়ের যুগে কবির কাব্য নিয়ে ডাঃ এনামুল হক   
কবি সৈয়দ সুলতানের রচনা সম্ভার     
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি    
কবির মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে ডাঃ এনামুল হকের উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি   
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি   
এই কবিদের পরিচয় নিয়ে ব্রজসুন্দর সান্যালের উদ্ধৃতি    
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
এই পাতার কবিতার ভণিতা -
সৈয়দ সুলতান,ছৈয়দ ছোলতান,
ছৈদ ছোলতান,ছৈদ ছুলতান,
ছৈঅদ ছোলতান,
.
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                            পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, জলধর সেন
সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার কার্তিক, ১৩২৩ সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯১৬),  তাঁর “বৈষ্ণব-কবিগণের
পদাবলী” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
মুসলমান কবিগণ এক-সময়ে কবিতাকারে রাধাকৃষ্ণের প্রেম-বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন,---এখন  এই   
ভেদবুদ্ধির দিনে এ কথা নিতান্ত বিচিত্র বলিয়াই বোধ হইবে। কিন্তু বিচিত্র বোধ হইলেও, তাহা একান্ত সত্য
কথা,---তাহাতে বিস্মিত হইবার কিছুই নাই। মুসলমান কবিগণ সত্যসত্যই রাধাকৃষ্ণের  প্রেমসুধা-পানে
বিভোর হইয়াছিলেন। সেই সুধাপানে কেহ-কেহ অমরতাও লাভ করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের  লীলারস
প্রকটনে অনেকে এমনই তন্ময়চিত্ত হইয়াছিলেন যে, ভণিতাটুকু উঠাইয়া দিলে---কবিতাটি হিন্দুর, কি  
মুসলমানের রচনা, তাহা চিনিয়া লওয়া অসম্ভব বিবেচিত হইবে। জাতিধর্ম্মের ব্যবধানে থাকিয়া একজন  
কবির এরূপ প্রসংশা-লাভ করা সামান্য গৌরবের কথা নহে। সৈয়দ মর্ত্তুজা, নাছির মহাম্মদ, মীর্জ্জা ফয়জুল্লা
প্রভৃতি কবিগণের পদাবলী কবিত্বে ও মাধুর্য্যে যে-কোন হিন্দু বৈষ্ণব-কবির পদাবলীর সহিত তুলনীয়
।”
.
.
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র
সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের
একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“. . .
বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ
আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই
।”
.
এই কবিদের পরিচয় নিয়ে ব্রজসুন্দর সান্যালের উদ্ধৃতি -                          পাতার উপরে . . .  
ব্রজসুন্দর সান্যাল তাঁর “মুসলমান বৈষ্ণব কবি, ৩য় খণ্ড”-এর “জীবনী আলোচনা”-তে লিখেছেন . . .
“ . . .
 ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবির’ বর্ত্তমান খণ্ডে সৈয়দ আলাওল, মীর্জা ফয়জুল্লা, মীর্জা কাঙ্গালী, সৈয়দ  
আইনদ্দিন, নাছির মহম্মদ, সৈয়দ নাছিরদ্দিন, সেরচান্দ বা সেরবাজ, এবাদোল্লা, আবাল ফকির, মোছন আলী,
মহম্মদ হানিফ এবং আলিমদ্দিন,---এই দ্বাদশ জন কবির পদাবলী প্রকাশিত হইল। ইহাঁদের মধ্যে মহাকবি
আলাওলের বৃত্তান্ত পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ হইল। অবশিষ্ট কবিগণের সম্বন্ধে আমাদের গবেষণার হুল কিছুমাত্র
প্রবেশ করিতে পারে নাই। প্রাচীন কবিগণ সাহিত্য-সংসারে একান্ত কুহেলিকাচ্ছন্ন। তাঁহাদের  জীবনী  
জানিবার অভিলাষ করা আর অন্ধকারে ঢিল ছোড়া প্রায় সমানই বটে
!”
.
হিন্দু-মুসলমান সমন্বয়ের যুগে কবির কাব্য নিয়ে ডাঃ এনামুল হকের উদ্ধৃতি -  পাতার উপরে . . .  
১৫০০ শতকে শ্রীচৈতন্য, কবীর, নানক, তুকারাম, সহ আরও বহু উদার মনস্ক ধর্মনেতা বা সমাজ
 
সংস্কারকদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এই সময়কে ইতিহাসকারগণ “ভক্তি আন্দোলনের” যুগ আখ্যা দিয়েছেন।
হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মের মধ্যে সমন্বয়ের একটা প্রচেষ্টার সময়কাল ছিল সেই যুগ। কবি সৈয়দ সুলতানের
কাব্যে সেই সময়কালের প্রভাব নিয়ে খুব সুন্দর করে লিখেছেন ডাঃ এনামুল হক তাঁর ‘বঙ্গীয়
 সাহিত্য-
পরিষৎ’ পত্রিকার ১৯৩৪ সালের ৪১ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ৪৮-পৃষ্ঠায় প্রকাশিত, ডাঃ এনামুল হকের ‘কবি সৈয়দ
সোলতান’ প্রবন্ধে . . .

কবি সৈয়দ সোলতান যে সময়ে (পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে) জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা হিন্দু  ও   
মুসলমান ধর্ম্মের সমন্বয় সাধনের যুগ। খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতের সর্ব্বত্র ইসলাম ও হিন্দু
ধর্ম্মের মিলনের এক বিরাট প্রচেষ্টা চলিয়াছিল। এই সময়ে রামানন্দ, কবীর, নানক, দাদু, চৈতন্য
 প্রভৃতির
ন্যায় উদারহৃদয় হিন্দু মুসলমান সাধকদের আবির্ভাব ভারতের শাসক ও শাসিতেরা একই প্রকারের
  
চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হইয়া একই স্থানে আসিয়া মিলিত হইতেছিল। এই যে দুই যুধ্যমান ধর্ম্মের মিলন-
প্রচেষ্টা, ইহা বারতের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত আলোড়িত করিয়া তুলিয়াছিল। কবি সৈয়দ
 
সোলতানের কাব্যগুলিতে আমরা এই উদার আন্দেলনের প্রতিধ্বনি দেখিতে পাই। বাঙ্গালার কি হিন্দু, কি
 
মুসলমান, আর কোন প্রাচীন কবির মধ্যে সৈয়দ সোলতানের পূর্ব্বে এই প্রচেষ্টা দেখা যায় না। বর্ত্তমান
 
সাম্প্রদায়িকতা-বিদ্বেষ-পূর্ণ ও ইসলাম স্স্কারের যুগে মুসলমানগণ প্রাচীন বাঙ্গালার এই জাতীয় কবিকে কোথায়
স্থান দেন বা কখন কুফকীর ফতোয়া দিয়া বসেন, জানি না ; তবে তিনি যে যুগে জন্ম গ্রহণ করিয়া
  
মুসলমানদের মুখোজ্জ্বল করিয়াছিলেন (এবং এখনও করিতেছেন), সে যুগের প্রভাব হইতে মুক্ত হইতে না
 
পারিলে, তাঁহাকে কোন দোষ দেওয়া চলে না। কবি হিন্দু ও মুসলমানধর্ম্ম-সমন্বয়সাধনব্যাপারে যে চেষ্টা
 
করিয়াছিলেন, তাহাতে তাঁহার কতখানি আন্তরিকতা ছিল, তাহা কে বলিবে? কারণ, কবি বলিতেছেন,---


মোহোর মনের ভাব জানে করতারে।
জখেক মনে কথা কহিমু কাহারে
॥”
.
কবি সৈয়দ সুলতানের রচনা সম্ভার -                                                  পাতার উপরে . . .  
তাঁর রচনাসম্ভারে রয়েছে “নবীংবংশ”, “শবে মেয়েরাজ” ও “জ্ঞানপ্রদীপ” নামক তিনটি গ্রন্থ।
 “হজরত  
মোহাম্মদ চরিত”, “ওফাত রসুল”, “ইব্লিসের কিচ্ছা”, “জ্ঞান চৌতিশা” নামে তাঁর আরও রচনা পাওয়া গিয়েছে
। সেগুলি তাঁর মূল তিনটি রচনারই অংশ।  এছাড়া তাঁর রচিত অনেকগুলি পরমার্থ-সঙ্গীত পাওয়া গিয়েছে।
“হজরত মোহাম্মদ চরিত”, “ওফাত রসুল” ও “শবে মেয়েরাজ” একই গ্রন্থের ভিন্ন নাম মাত্র। এই গ্রন্থটি কবি-
প্রদত্ত নাম “শবে মেয়েরাজ”।

আমরা এখানে কবির ৩টি বৈষ্ণব পদ, ৬টি পরমার্থ সঙ্গীত এবং তাঁর পরিচিতির মধ্যে তাঁর শবে মেয়েরাজ
কাব্য থেকে কিছু অংশ তুলে দিলাম।
.
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি -                                                        পাতার উপরে . . .  
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” সংকলনে এই কবি সম্বন্ধে
লিখেছেন . . .

ইনি শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত লস্করপুরের প্রসিদ্ধ সৈয়দ-বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইঁহার রচিত
“নবীংবংশ”, “শবে মেয়েরাজ” ও “জ্ঞানপ্রদীপ” নামক তিনটি গ্রন্থ পাওয়া গিয়াছে। “শবে মেয়েরাজ” কবির
শেষ রচনা, ইহা--- ‘গ্রহশত রস যোগে অব্দ’---অতীত হইলে অর্থাৎ ৯০৬ হিজরী = ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দের
 শেষে
রচনা করিতে আরম্ভ করেন। এই পুস্তকত্রয় ব্যতীত কবি-রচিত অনেকগুলি পরমার্থ-সঙ্গীত পাওয়া গিয়াছে।
ব্রজসুন্দর সান্যাল-সঙ্কলিত ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবি’, চতুর্থ খণ্ডে সৈয়দ সুলতান-রচিত তিনটি পদ মুদ্রিত
 
হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত ডাঃ এনামুল হক-লিখিত ‘কবি সৈয়দ সোলতান’ প্রবন্ধে (বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ পত্রিকা,
৪১ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, পৃঃ ৩৮) ৬টি গান প্রকাশিত হইয়াছে। সৈয়দ সুলতানকে ডাঃ হক চট্টগ্রামবাসী বলিয়া
অনুমান করিয়াছেন। কিন্তু শ্রীহট্ট হইতে প্রকাশিত আল্ ইস্ লাহ, এবং বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ
 পত্রিকার
দুইটি প্রবন্ধে (‘আল্ ইস্ লাহ’, ৮ম বর্ষ, ১ম-৩য় সংখ্যা, পৃঃ ১ ; ‘সাহিত্য-পরিষৎ পত্রিকা’, ৫১ বর্ষ, ৩য়-৪র্থ
সংখ্যা, পৃঃ ১) কবিকে শ্রীহট্টবাসী বলিয়া প্রমাণ করা হইয়াছে। শোষোক্ত মতই অধিকতর সমীচীন মনে
 
করিয়া কবিকে শ্রীহট্টবাসী বলিয়া নির্দ্দেশ করিলাম
।”
.
কবির মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে ডাঃ এনামুল হকের উদ্ধৃতি -                  পাতার উপরে . . .  
বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ পত্রিকার ১৯৩৪ সালের ৪১ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ৪২-পৃষ্ঠায় প্রকাশিত, ডাঃ এনামুল হকের
‘কবি সৈয়দ সোলতান’ প্রবন্ধে কবির কালের বাঙালী মুসলমানদের বাংলা ভাষার প্রতি মনোভাব
 এবং  
কবির ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে লিখেছেন . . .

“কবি সৈয়দ সোলতান যে সময়ে বাঙ্গালা ভাষার সাধনা করিতেছিলেন, সে সময়ে শিক্ষা বিষয়ে বাঙ্গালী
 
মুসলমানের অবস্থা শোচনীয় ছিল। আরবী ও ফারসী ভাষাভিজ্ঞ “আলিম”গণ বাঙ্গালা ভাষা জানিতেন না ;
তাঁহারা বাঙ্গালা ভাষাকে হিন্দুধর্ম্মের ভাযা বলিয়া অবজ্ঞার চক্ষে দেখিতেন এবং ইসলাম ধর্ম্মগ্রন্থাদিকে বা
ধর্ম্মের কথাকে বাঙ্গালা ভাষায় লিখিয়া প্রকাশ করা ধর্ম্মদ্রোহিতা বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। “আলিম”দের সঙ্গে
গোঁড়া মুসলমানগণও এই মত পোষণ করিতেন। বলা বাহুল্য, সংখ্যায় ইঁহারা অধিক ছিলেন না। অধিকাংশ
মুসলমান আরবী ফারসী জানিতেন না, তাই তাঁহারা ধর্ম্মবিষয়ে নিরপেক্ষ থাকিতেন। তাঁহারা ভাষায়, ভাবে,
আচারে ও ব্যবহারে সম্পূর্ণ বাঙ্গালী ছিলেন। তাঁহারা প্রস্তাব বা গল্প গুজবে দিন কাটাইতেন, ইসলাম ধর্ম্মের
কথা কিছুই বুঝিতেন না ; কেহই তাঁহাদিগকে বাঙ্গালা ভাষায় ধর্ম্মের কথা বা কাহিনী শুনাইতেন না। ইহাতে
মর্ম্মাহত হইয়া কবি সৈয়দ সোলতান সাধারণ মুসলমানের মধ্যে বাণী প্রচার করিবার জন্য বাঙ্গালা ভাষায়
“নবীবংশ” রচনা করিলেন। আরবী ফারসী পুস্তক হইতে সার সংগ্রহ পূর্ব্বক “নবীবংশ” লিখিত হইল। কিন্তু
কবি বাঙ্গালা ভাষায় ধর্ম্মের কথা প্রচার করিয়া নিষ্কৃতি পাইলেন না ; গোঁড়া মুসলমান সম্প্রদায় তাঁহাকে
 
ধর্মদ্রোহী “মুনাফিক” বলিয়া প্রচার করিতে লাগিল। শবে মেয়েরাজ রচনাকালে কবি বাঙ্গালা ভাষায় ধর্ম্মের
কথা প্রকাশ করার জন্য যে দীর্ঘ কৈফিয়ৎ দিয়াছেন, তাহাতে যে শুধু তত্কালের গোঁড়া মুসলমান সম্প্রদায়ের
মানসিক ভাব প্রকটিক হইয়াছে, তাহা নহে ; তদ্দারা মাতৃভাষার প্রতি আমাদের কবির শ্রদ্ধা এবং তাঁহার
মানসিক উদারতা কত গভীর ছিল, তাহাও জানা যায়। যথা---

আল্লায় কহিছে মোরে দেশের যে ভাষ।
সে দেশে সে ভাষে কৈলুম রছুল প্রকাশ॥
এক ভাষে পয়গম্বর আর ভাষে নর।
না পারিব বুঝিবারে উত্তর পদুত্তর॥
যথেক রছুল নবী পয়গম্বর হৈছে।
উন্মত্তের যে ভাষা সে ভাষে সৃজিয়াছে॥
*        *        *        *        *
আরবেত আরবী ভাষে পয়গম্বর।
কহিলা দীনের কথা সবার গোচর॥
আরবে আরবী ভাষে পাইলা ইমান।
কোরানের কথা শুনি হৈলা মুছলমান॥

আরবীর যত কথা খোরাছানী ভাষে।
খোরাছানী জিজ্ঞাসয় আরবের পাশে॥
ফার্ছি ভাষে কোরানের বাখান জানিলা।
যত খোরাছানী তবে ইমান আনিলা॥
জাওয়া (যাভা) সবে জাওয়া বাষে আরবী বচন।
কিতাবের কথা সবে কৈলা উদ্ধারণ॥
ইমা ইসলামের কথা ভালমতো জানি।
এক করতার হেন লইলা পরমানি॥
চোলিআ সকল যত চোলিআ কথাএ।
কোরানের কথা যত বাখানে সদাএ॥

রূমী সবে রুমী ভাষে কোরাণের কথা।
লিখি লই জানিলেন্ত জথেক ব্যবস্থা॥
তবে তুর্কস্থানী তুর্ক ভাষে আপনার।
কোরানের যে কহিআছে লিখি লৈল সার॥
শামী সবে শামী ভাষে কোরানের মর্ম্ম।
শুনিয়া করিতে আছে মুছলমানী কর্ম্ম॥
এমরানীএ এমরান ভাষে কোরানের তত্ত্ব।
শুনি ইমা ইছলাম হইলা সমর্থ॥
এরাকীএ তার ভাষে ইমা ইছলাম।
মুছলমানী কর্ম্ম সবে করে অনুপাম॥
পাঠান সকলে পোস্ত ভাষে আপনার।
কোরানের কথা শুনি বুঝিল আচার॥
কত দেশে কত ভাষে কোরানের কথা।
দীন মোহাম্মদী বুঝি দেঅন্ত ব্যবস্থা॥

যারে যেই ভাষে প্রভু করিল সৃজন।
সেই ভাষ তাহার অমূল্য যত ধন॥
পাপী সবে বোলে ছিদ্রি আল্লার প্রচারি।
ছৈয়দ সোলতানে সব দিল ব্যক্ত করি॥---সৈয়দ সুলতান, শবে মেয়েরাজ॥

আমাদের কবি দেখিয়েছিলেন, পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি আপন আপন ভাষায় ধর্ম্মের কথা প্রচার করিয়া
  
ইসলাম-বিস্তারে সাহায্য করিয়াছে, কিন্তু হতভাগ্য বাঙ্গালী মুসলমান কেবল গোঁড়া সম্প্রদায়ের
 গোঁড়ামীর  
জন্যই আপন ভাষায় তাহাদের ধর্ম্মকথা শুনিতে পারিতেছে না। তাই তিনি গোঁড়ামীর বাঁধ ভাঙ্গিয়া বাঙ্গালী
মুসলমানকে সর্ব্বপ্রথম মাতৃভাষায় ধর্ম্মের কাহিনী শুনাইলেন। ইহাতে গোঁড়া সম্প্রদায় রুষ্ট হইয়া
 প্রচার   
করিতে লাগিল যে, কবি আল্লা ও রসুলের অবমাননা (ছিদ্র) করিয়াছেন। কিন্তু কবি---

এত শুনি মনে মনে ভাবিতে লাগিলুম।
আল্লার কেমন ছিদ্রি প্রচার করিলুম॥
মহিমা সে আল্লার দিলাম প্রচারিআ।
মহিমারে ছিদ্রি বোলে মনে না ভাবিআ॥
পয়গম্বর সবের মহিমা প্রচারিলুম।
পাপমতি ইব্লিশের অবশ ঘোষিলুম॥

তবে কেনে ছিদ্রি প্রচারিলুম করি বোলে।
মনে ভাবি না চাহিলা পাপিষ্ঠ সকলে॥

মোহোর মনের ভাব জানে করতারে।
জথেক মনের কথা কহিমু কাহারে॥---সৈয়দ সুলতান, শবে মেয়েরাজ॥

কবি অন্তরে বিশ্বাস করিতেন যে, তিনি ধর্ম্মের কথা বাঙ্গালা ভাষায় প্রকাশ করিয়া কোন পাপ করেন নাই।
ইহাতে বাঙ্গালী মুসলমানের কল্যাণ হইবে ; কবি তাঁহাদের শত্রু নহেন, বরং মিত্র। তিনি সারা জীবন
 
বহ্গভাষার সেবায় অতিবাহিত করিয়াছিলেন। এই ভাষাকে তিনি দেশমাতৃকার পবিত্র বাষা বলিয়া মনে
 
করিতেন।”
কবি সৈয়দ সুলতান - চৈতন্য সমকালীন
এই কবি শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার
 
লস্করপুরের খ্যাতিসম্পন্ন সৈয়দ-বংশে
 
জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মিকাইল।