কবি দীপক কুমার সরকারের কবিতা
*
চলো পিছনে ফিরে যাই
কবি দীপক কুমার সরকার


মাঝে মাঝে পেছনে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়।
সকলেরই মনে হয় এরকম ইচ্ছে হয়ে থাকে মাঝেমধ্যে।
সেই বাল্যবস্থায় এখন ভরা সংসার
বাচ্চাকাচ্চা বাজার-হাট মাসের সদায় পুজোর বাজার
বাস-ট্রামের কানফাটা বিকট শব্দ কানে বাজে বড্ড লাগে।
অফিস-আদালত পুলিস-পাড়া সাইনবোর্ড হোটেল-রেস্তোরাঁ হসপিটাল
সবই যেন এক পাড়ায় গুঁতোগুঁতি  কেউ থেমে নেই
হরেকরকম রংবাহার কে কাকে ল্যাং মারে কিছুটা এগিয়ে যাবে বলে
কেউ যদি পেছেনে পড়ে গেলো তো সে পেছনেই পড়ে থাকলো
টেনে তোলা মানে নিজেকে পেছনে ফেলা
সময়ের অনর্থক অপচয়।
যে বেশি অন্য কাউকে হাত বাড়িয়ে দেয়
তাকে এগিয়ে দেবে বলে সে পাগল কিংবা স্বার্থান্বেষী
উপাধি সহজে পেয়ে য।
ভালোবাসা বাসি বলে যা কিছু ওসব ঠুন্কো
সব মাথার খুলিতে বন্দি করা আছে।
সবাই বেরোতে চায় কিন্তু অদৃশ্য কালো শৃংখলে
সবার হাত পা কিংবা মনকেও বেঁধে রা।
সবাই চলাফেরা করে দেখা যায়
সবাই সবাইকে দেখতে পায় আবার কেউ কেউ
অন্যের হৃদয়কেও নাকি স্পর্শ করতে পারে
এমনই শোনা যায়।
সবাই এখানে পরাধীন
বুকের পাঁজর ফেটে কখনো-সখনো অসতর্ক মুহূর্তে
অস্ফূট শব্দে কাচুমাচু করে বিনীত সুরে একত্রিত বলেই ফেলে
‘চলো ফিরে যাই’।
একবার অন্তত একবার ঘুরে আসি
একবার ছুঁয়ে দেখে আসি ছোটোবেলা
একবার তাকে চুপিসারে সুনিয়ে আসি গভীর যন্ত্রনার কথা।
তাতে কিচ্ছুটি হবে না
না জানিয়ে গেলেও চলবে
বুকের ভেতরটা হালকা হবে
ফের দ্রুত ধাবমান হতে পারবো।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ঘুমঘোরের মধ্যে
কবি দীপক কুমার সরকার


আমার ঘুমঘোর কাটেনি তবুও আমি দেখতে পাই
আমার প্রতিটি মুহূর্ত।
কেউ বলে দেবে আমার আসন্ন সময়
আমি কেন বসে আছি - আমি কোথায় ?
আমার ঘুমঘোরে পৃথিবী ঘুরছে ভন্‌-ভন্‌
মহাশূন্যে প্রকান্ড বলের উপর আমি দাঁড়িয়ে আছি
তাকে দুহাতে ধরে থাকবো অনন্তকাল।
সে যদি পালিয়ে যায়
কেউ কি দেখবে আমায় ?
সমস্ত নক্ষত্র তারা চন্দ্র আমার পাগলামী দেখে
আমি বোকা বলে উপহাস করে
আমি কেন তাদের নিকট কীটের মতো
কীটেরও প্রাণ আছে বলেই কি আমিও কীটের মধ্যে একজন ?

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সকাল
কবি দীপক কুমার সরকার


আর্দ্র সকাল মধ্যাহ্ন কার্তিকের
অন্যদিন দিকচক্রবালে ঠিক এই সময়ই
বড় রক্তিম ভোরের চাঁদ শেষবারের মতো দেখেছি আমি
সে আজ নেই, তবে কি অভিমান হল তার !
কেন এমন হলো ?
যতদূর চোখ যায় আকাশ রাশভারী মুখে তাই বুজি ?
খানিকটা দূরেই খেজুর নারকেল গাছগুলো
মৃদু বাতাসে মাখামাখি করছে
পাখিদের উৎসব-নৃত্য ছন্দের সাথে।
এইখানে শোনা যায় জাদুকরী ছন্দের খেলা
যারা ছিলো না তারাও দ্রুত ঘর ছেড়ে উড়ে এলো
এই মায়ামুগ্ধকর বাঁশঝাড়ে।
শিশু-বাঁশেরা তাদের মাথাগুলো তুলে রেখেছে যেন
এক লাফেই পলাতক হবে।
দেখতেই প্রকট প্রথম সূর্যের নতুন কিরন লেগেছে পশ্চিম দিগন্তে
কলরব গুঞ্জন হতে থাকে সোনালী আলোয়
যেন আসর ভেঙ্গে গেল।
এইখানে এখন যন্ত্রের শব্দ ভীড় করে
সন্ত্রস্ত ভোরের সকাল যেন বাঘ এসে নিয়ে গেল তারে ।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সোজা দাঁড়ানো কঠিন
কবি দীপক কুমার সরকার


আজ শনিবার প্রাতঃভ্রমন সেরে
সরাসরি ঝোলা হাতে বেরিয়ে পরি বাজারে
ভালো মাছ পাওয়া যাবে এই ভেবে।
সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব আজ এই ছুটির সকালে
মাছের সম্ভার রুই-কাতলা ভেটকি চিতল গলদে আরো অনেক সাথে ইলিশও।
এদিক ওদিক ফিরে দেখি কেউ একবার ডাকে কেউ না দেখার ভান করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
উপায়ান্ত না দেখে নিজে-নিজে স্বমহিমায় খুঁজে ফিরি কোনটা ভালো কোনটা মন্দ
এখানে ভালো-মন্দ মানে আমার ভালোলাগা
বাজেটের মধ্যে থাকা,
তাকে কিছুতেই অতিক্রম করা নয়।
বাজেট ফেল মানে অন্য কিছুর সাথে বোঝাপড়া
আমারও মতন অনেকেই আসে-যায় আসে-যায়
আজ নয়তো কাল এই-ভেবে ভেবে ভেবে।
ক্রমে ক্রমেই সপ্তাহ মাস বছর ঘুরে ফেরে।
সময়ের পরিবর্তন আছে অবস্থার পরিণতি যে-ই কে সে-ই
আমার পরে আরেকজনও আসে তাকে সবাই চেনে জানে
কোন দিকে যাবে ভেবে কূল পায় না
তাই যে কোন দিকেই পথভ্রস্টার মত চলে যায়
আদর আপ্পায়নের অন্ত নেই।
সে শুধু কেনে আর সবাই তাকে দ্যাখে প্রলুব্দ দৃষ্টিতে
সবাই এমন ক্রেতা হতে পারে না।
একটু বাঁকা না হলে সোজা থেকে এমনটা হওয়া কঠিন থেকে কঠিনতর।
আমারও ইচ্ছে ছিল একদিন এমনটা হবার
হাত পাতলেই হল
দীন দুঃখীর মতো কিংবা মহৎ দানের নয়
সে-সব উৎকোচ উপহার আজকাল অনেকেই তাকে স্যালুট দেয় ।
তান নামে জলসা রাখে তার কথায় কাজ হয়
এমনকি এক ফোনে প্রশাসন-পুলিস নড়েচড়ে
নেতাও খোঁজ রাখে।
আমার থেকে কেউ কিছু পাবে এমন বোকার হদ্দ নেই বললেই চলে।
আমার নাম গন্দও ছড়ায়নি পাড়ার মোড়ে কিংবা বাজার-ঘাটে
ওরা ভালো মানুষ ওরা কিছু করে
উৎকোচ-উপহারে এগিয়ে যায় আমরা এক কোণে পড়ে থাকি।
আমরা তাই শান্ত মানুষ
বৃষ্টির পরে সাতরঙা দেখার প্রত্যাশায়
সময়ের কাছে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকি দাঁড়িয়েই থাকি ।
শুধু ভয় হয় উৎকণ্ঠায় জড়োসড়ো হয়ে যাই
যদি প্রলোভনে হাতটা একবার বের হয়ে যায়
একবার বেঁকে যায় যদি হাতটা !
বাঁকতে বাঁকতে ক্রমশঃ একদিন কাত হয়ে শুয়ে পড়ি যদি তাকে নিয়ে
আর কি সোজা হবে কক্ষনো ?

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রতীক্ষায়
কবি দীপক কুমার সরকার


কলেজের গা ঘেঁষে বসে আছি
যেমন বসে থাকি প্রতিদিনের প্রতীক্ষায় প্রত্যাশায় গুটি কয়েক পথচারীর।
মাঝেমধ্যে যেমন দিয়ে যায় পাঁচ অথবা দশ টাকা
সকলে নয় মাত্র দুচার জন।
পথের একপাশে নামহীন মূল্যহীন এক পাথর
সে জানে আমার নিকট সে প্রয়োজনের।
অর্ধাসনেই বসে আছি অর্ধেকটা পাথরের বুকে আলতো চাপ দিয়ে।
জনাকীর্ন আলোকে সে শুধু আমার সযত্ন সংস্পর্শে নিদ্রা ভাঙ্গে।
ওপর দিয়ে ব্রিজ যেন বিদ্যুৎ গতিতে ধেয়ে যায়
মোটা-মোটা থামগুলো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে
যেন কোন ভন্ডামীর দৃষ্টিতে নজর কাড়ে
সে তো আমায় প্রতিদিনই দ্যাখে সকাল দুপুর বিকেল
আমি তো কোনো আগন্তুক বা অজানা নই!
ব্রিজমস্তকে সে আমায় দ্যাখে, কাঁধে তার প্রকান্ড চাপ
সে কি তবে কিছু বলবে বলে এগিয়ে আসছে সারসারি ঢেউয়ের তরঙ্গে ?
তবে কেন ও নিশ্চুপ নিশীথের থেকেও গভীর অন্ধকার বুকে ভারী চাপ
তবে কি ভিসুভিয়াস জাগ্রত হবার প্রাক মুহূর্ত?
আমি কেন এমন অনুভূতি নিয়ে ডুব দিয়েছি
প্রত্যন্ত লোকালয়ে সেই প্রিয়ার অশোভনীয় আচরনে একচুলও ফাঁক ছিল না মুখ লুকোবার।
আজ এই পদচারীর অসতর্ক দৃষ্টি যেন আমাকে ছিন্ন করে এই পথপাশে
অজ্ঞাত পাথর যেন এই সত্তর বছর বৃদ্ধের নিকট এক নিঃরব অসহায় সন্তান
বাস মোটর-সাইকেল কালো নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ফেলে
কোনো প্রলেপ দিয়ে কী সংকেত জানিয়ে গেল ?
আমি যে প্রতীক্ষায় সেই দু-চারজন পথচারীর পাঁচ-দশ টাকার।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মায়ের মুখচ্ছবি
কবি দীপক কুমার সরকার


এ কেমন হ’ল মা, তোমার মুখমন্ডলের রেখাচিত্র ধরবো বলে
পশ্চাৎগামী হতে থাকি
ফের ক্লান্ত নাবিকের মতো বিপথগামী
চতুর্দিকে সবকিছু অস্পষ্ট যেন সব মায়াজাল !
প্রকৃতির মিশ্রিতরূপে তুমি কি হারিয়ে গেলে ?
তারা কি তোমার সব রূপ চুরি করে নিয়ে গেলো ?

বাড়ীর সামনে সেই উঁচু ঢিবি বাঁদিকে নীমগাছে ফাটল
কুলগাছে হলুদপাতা তখনও
তাকে ডেঙ্গোলেই গলি স্কুলে গিয়ে উঠেছে
সব ছবি রেখাঙ্কিত হয়ে আছে ।
যত দূরেই হেঁটে যাই যেখানে শুয়ে পড়ি আমার দুঃসময়ে সর্বদা
আমার দৃশ্য-পিপাসু চোখ আমাকে দ্যাখে কথা বলে
আমি তাদের সাথে একত্র ঘুমিয়ে থাকি
আমার বালিশে বিছানায় হামাগুড়ি দেয়
আমার চোখের প্রেম তা জানে
তাইতো ভালোবাসার আন্তরিকতায় সাড়া পায় ।
আমি তাকে ধরবো বলে বহুবার প্রাণপন চেষ্টা করেও তাকে পাই নি
মুখ ফিরিয়ে রেখেছে তারা সব যেন অপরিবর্তনীয়
কোন মায়াজাল তাদেরকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে নি
এযেন সেই মোনালিসার চিত্র পুরনোর কোন লেশমাত্র চিহ্ন পাওয়া কঠিন ।
আমার কোন কষ্ট নেই তাদের সনাক্তকরনে দুঃখ-ক্লেশহীন চিত্ত আমার
কিন্তু আমার মা-প্রিয় মা-শ্রদ্ধেয় মা ওই-যে সমস্ত গাছ-গলি-নালা-পাতা-পাখি
তাদেরকে এতটা সময় দেই নি যতটা তোমার সাথে
তোমার পরশ মায়া-মমতা আমাকে ছায়ার মতো ঘিরে থেকেছে
আমার ঘুমে আমার অজান্তে কতদিন হাত বুলিয়েছ-সে তোমার মাতৃত্বের সোহাগ ।
একবার লাঠি সাথে তাড়া করে না ধরতে পেরে লাঠিটাই ছুঁড়ে মারলে
তোমার সঠিক টিপ-এ আমি ডিগবাজি খেয়ে মুখথুবড়ে পরে যাই
আমার কপাল ফাঁটে-তোমার মাতৃত্ব কেঁদে ওঠে
তুমি তরাৎ কপালে হাত-চেপে গ্যাঁদা-ফুল-গাছের পাতা মুড়িয়ে চেপে রাখলে
সব চিত্র আজও এক-ই রকম কোন কিছুই ম্লান হয়ে যায় নি ।
তোমাকে পাই কিন্তু তোমার মুখমন্ডলের একটা চিত্র নেব বলে যেইমাত্র এগোই
তাকে কিচ্ছুতেই ধরা যায় না ।
সে কি লজ্জায় মুখ লুকোয় নাকি শুধুমাত্র মা হয়ে থাকবে বলেই
রূপান্তরী রমণীরূপে ধরা দেবে না ?
আমারও তো ইচ্ছে হয় খুব ইচ্ছে হয়
আমার পাঁচ-দশ-বারো-পনেরো বছর মায়ের সাথে কেমন মানায়
এখন ঠিক যেন তোমার পাশে দাঁড়ালে বুঝতে পারি
তোমার দাঁত নেই অনেকটাই ঝুঁকে পড়েছ
ভুরু সাদা-চোখ তোমার ঘোলাটে ওষ্ঠে সমান্তরাল রেখাচিত্র
তাই ইচ্ছে হয় পেছনে ফিরে তোমাকে খুঁজে ফিরি
একবার তোমার অবয়ব মুখমন্ডলের জন্য।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ছোট্ট সিলিং ফ্যান
কবি দীপক কুমার সরকার


আমি চিৎ হয়ে শুয়ে আছি, দুচোখ ওপরে
সিলিং ফ্যানে বোধ হয় কিছু খুঁজে বেড়ায়
তার ভোঁ-ও-ও... ক্রন্দন শব্দ ওপর-নীচ চার দেয়ালে মাথা ঠোকে ।
যদি তাকে একটু বিরাম দাও যন্ত্রনা থেকে খানিকটা স্বস্তি
সে অনেক দিন বাঁচবে জীবন পাবে দীর্ঘায়ুজীবন ।
এভাবে অবিরাম বিশ্রামহীন জীবন কী কখনও কারও নিকট প্রিয় হতে পারে ?
সে অনবরত সকরুন সদা-ই সকর্মে মগ্ন বিনাপারশ্রমিক ।
তার নীচে আমাদের শরীর জিড়িয়ে নেওয়া
ক্লান্তিহীন বিছানায় পড়ে থাকা নিজেকে শান্ত করা
তারপর বেড়িয়ে আসা ভালো-মন্দ আমোদ-প্রমোদে মেতে থাকা
সে শুধু ঝুলে থাকে ফাঁসী নয় জেলবন্দী জীবন
যে কেউ নির্দেশ দেবে তৎক্ষণাৎ আবার সেই ঘুর্নন
সবারই অংগুলী হেলনে তার নৃত্য তার নির্বাক-ক্রন্দন
কেউ শোনে না কেউ বোঝে না ।
আমৃত্য এরকমই চলবে কেননা এতে সকলেরই লাভ-আনন্দ সবকিছু ।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মালতীর ভোরবেলা
কবি দীপক কুমার সরকার


মালতীর নিদ্রা ভাঙ্গে কাকভোরে
তখনো বিস্তৃত আকাশে ফুলের শয্যায় প্রহরী বিচরণরত
সে কি নিদ্রা যাবে না ?
তার নিদ্রার আয়োজন মালতীকে জাগ্রত করে তোলে
আজ তবে কেন মালতী উঠে পড়ল ?
স্বপ্নে তার পাঠশালা ক্লাস টু-এ সে দৌড়ে প্রথম হয়েছিল
এক দৌড়ে মাকে দুহাত জড়িয়ে প্রাইজটা সাথে বলেছিল
‘মা আমি দুটোতেই প্রথম হয়েছি’।
তোমাকে বড় হতে হবে মা অনেক বড়
তোমার বাবা স্বপ্ন দেখতো তুমি অনেক বড় হবে
সবাই তোমাকে দেখবে আর বলবে দ্যাখো-দ্যাখো নীরেনের মেয়েকে দ্যাখো ।
এখন কাকভোর সময় হয়েছে তার ঘুম ভাঙার ।
ভোরের আকাশ কতো রকম সুরে ডাকে
এই কাকভোরের পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধে আস্বাদ পাবার জন্য।
সে শুধু তাকিয়ে থাকে বারান্দার জানালায় দূরে ওই-যে রাস্তার দিকে
কখন ওদিকে সূর্য দেখা যাবে বড় রাঙ্গা সূর্য।
যেন লাল টিপ পড়ে কেউ রোজ ওইখানে ওই দিগন্ত রেখায় দাঁড়াবে ।
সে দিগন্তের দেশে লাল আবির ছড়িয়ে হোলি খেলবে
সেও যে খেলতো প্রতি-বসন্তে
মাকে যে হঠাৎ কেড়ে নেবে তা কি সে জানতো !
দূর থেকে দ্যাখে ছোট-ছোট কাঁচা বাড়ি টিলার মতো বসে আছে
সেই টিলার খোঁজে সে এইখানে এই বারান্দায় দাঁড়ায় ।
সেই সরু রাস্তা সাপের মতো এগিয়ে গিয়েছে
উত্তর-দক্ষিণ মিলে যায় বড় রাস্তার সাথে ।
ঠিক যেন নদী সমুদ্রে এসে লাফিয়ে পড়ল
মেঘলা আকাশ হলে সে যেন মৃত-স্থবির হয়ে যায়।
আজ সেরকম হবার নয় সূর্য এসে দাঁড়িয়েছে
সূর্য দাঁড়ালেই সে দেখতে পায় ছোট-ছোট খুদে বাচ্চারা
দৌড়ে-দৌড়ে স্কুল ছুটছে
তার বাল্যকাল এইখানে ফিরে আসে সেও যায় স্কুলে সেও যায় স্কুলে ।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ছোট ছেলেটা দাঁড়িয়ে চায়ের দোকানে
কবি দীপক কুমার সরকার


ছোট বাচ্চাটি বয়সে দশ কি বারো
এক্সাইড মোড়ে চায়ের দোকানে একপাশে দাঁড়িয়ে
পরনে নোংড়া ছিন্ন বস্ত্র নগ্ন শরীর তার
অনধিকার মৌন দৃষ্টি আস-পাশে যারা চা-সিগারেট হাতে আলাপচারিতায় মগ্ন
সবাই ব্যস্ত দ্রুত দৌড়চ্ছে সময়ের সাথে
কেউ কেউ সেড়ে নিচ্ছে অফিস পথে ক্ষনিকের জন্য বার্তালাপ ।
ছেলেটির কিছুই বোধগম্য নয় হয়েই বা কী লাভ এই গূঢ় সংলাপের ?
কার মুখমন্ডলের মানচিত্র পছন্দের কার দিকে হাত বাড়াবে
যদি কিছু পাওয়া যায় কিছুই ঠাহর করতে পারছে না ।
দৃঢ় সংকল্পের অস্থিরতায় একবার পরনের ছিন্ন বস্ত্রখানি
নাভী অবধি তুলে ধরে
যাদের দৃষ্টিগোচরে ছিল তাদের কাছে লজ্জা নিবারণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় যদি !
যদি কারও নজর পড়ে তার ওপর কিছু প্রাপ্তিযোগ ঘটে যায় ।
এক সহৃদয় ব্যাক্তি একটা পাঁচ টাকার কয়েন দিতে গিয়েই গড়িয়ে পড়ে হাত থেকে
ছেলেটি নির্ভাবনীয় কয়েনটা তাকে তুলে দেয়
নিজেকে যথাস্থানে ফের দাঁড় করায় ।
অনেক ছেলেরাই তাদের মায়ের সাথে ছুটছে
এদিক-ওদিক নয় সোজা স্কুলে গিয়ে উঠবে ।
তারও যাবার অধিকার আছে তার জন্যও অনেক অজানা স্কুল
কিন্তু সে পথে নেমে এসেছে খাবারের একগুচ্ছ আশায় ।
স্কুল কেন যায় গেলেই-বা কী লাভ হয় তাকে কেউ কক্ষনো জানায় নি
কক্ষনো জানায় নি অথচ দ্যাখো এদেশে কত মানুষ একশো পঁচিশ-ত্রিশ কোটি
তার মধ্যেও নিশ্চয়ই ভারতবর্ষ নামে দেশ লুকিয়ে আছে সে কি জানে ?
তাহলে কি সে ফের আগামী দিনে এইখানে
অথবা আরেকটা এরকম জায়গা খুঁজে বেড়াবে জনমানসের ভিড়ে ?
নাকি শিক্ষা-নেবে কিভাবে সিগারেট দিয়ে চা পানের আলাপচারিতা ।
অথবা যদি কোনো কাজে লেগে যায়
তাহলে শিশু-শ্রমিক আইন তাকে ঘিরে ছায়ার মতো ।
তবে কি ভিক্ষাবৃত্তি ! তাতে-ও যে প্রশ্রয় পেয়ে যাবে !
তবে কি আঠারো বছরের অপেক্ষায় কাটাতে হবে দিন এই ভিড়ে !
কোথায় কবে কোন দিকে হাঁটবে – সামনেই পাঁচতারা হোটেল তাকে দ্যাখে ।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আকাশের নক্ষত্র
কবি দীপক কুমার সরকার


হে অগ্রাহনের সুবিশাল মেঘমুক্ত নীলাকাশ
তোমার নীলিমা যে আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে চিরকাল
যে দিন আমি এই ধরিত্রীর বুকে পা দিলাম
সে দিন থেকেই তুমি একটা একটা করে নক্ষত্র আমার নামে চিহ্নিত করে দিলে ।
আমি ছুটতে শিখেই রাশ-পূর্নিমার রাতে মাঘ-পূর্নিমার রাতে
একবার ছাদের ওপর একবার পাহাড়ের চুঁড়ায় যেখানে আকাশ
ছুঁই-ছুঁই সেখানে গিয়েছি
শুধুমাত্র তোমার চিহ্নিত নক্ষত্রদের ধরবো বলে ।
তাকে একগাল হেসে চুম্বনে সোহাগ করবো
আর আমার ভালোবাসায় প্রতিহিংসা হয় যদি তোমার
তুমি মেঘের দলকে বলে রেখো তারা যেন দলবদ্ধ
তোমার ডাকে সাড়া দেয় আর আমার প্রিয় নক্ষত্রদের ক্ষনিকের দৃষ্টিগোচর ঘটাক
আমার মৃত্যু ঘটে যাক মুহূর্তের জন্য
তাদেরকে যেন ছিনিয়ে না নেয়
তুমি যেমন আছো তেমনই থেকো
আমি ছুটতে-ছুটতে একদিন তোমার নিকট পৌঁছে যাব
তখন তুমি আমায় কী বলে ফেরাবে ?
সেকথা ভেবে রেখো ।

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর