চাঁদের সাথে দেখা হতেই আমি এগিয়ে এলাম তাকে দুটো কথা বলবো বলে সময়ের হাত ধরে টান দিয়েছি তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করেছি সে যেন তার ব্যস্ততার অজুহাত না দেখায় । দ্যাখো কেমন ছুটো-ছুটি করছে পুরো রাতটাই যে তার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সে যে যাবে যদি একদল মেঘ-সৈনিক এসে তাঁর পথে দাঁড়ায় তাকে বাঁধা দেয় তাদেরও হার মানতে হবে এই চাঁদের কাছে সে যে একাই একশো প্রহরীর সমান । এসো চাঁদ এসো একবার এই বট গাছের নীচে এসে বোসো একটু জিড়িয়ে নাও যেমন আমি ঘুরতে-ঘুরতে ক্লান্ত পথিকের মতো বসে বাতাস জড়িয়ে ওপরে তাকিয়ে আছি । চাঁদও এসে গাছের ওপর বসে পড়ল বেড়াল শিকারে নিঃশব্দে নেমে এলো যেন আমাকেই শিকার করবে বোধ হয় ! গাছের ভিতর থেকে তাঁর সাদা-সাদা থাবায় আমাকে আঘাত হানলো আমি অচেতন হয়ে কোথায় হারিয়ে যাই ! . **************** . সূচীতে . . .
আমার ডান হাতে শ্মশান বাঁ হাতে কবরখানা আমি ঠিক মধ্যিখানে ঠায় দন্ডায়মান কিংকর্তব্যবিমূঢ় ! দিগন্তে সূর্য কোথাও যাবে বলেই প্রস্তুত আমাকে তাক লাগিয়ে হঠাৎ খসে পড়ল দ্যাখো কেমন নিঃশব্দে শেফালী ফুল ঝরে পড়লো যেন । এরকমই ঝরে গেছে বোধহয় অনেক প্রাণ তাদের কেউ শ্মশানে কেউবা কবরখানায় পেতেছে লাইন আবার কোথাও যাবে এই ভেবে । চিতার আগুন জ্বলছে দাউ দাউ আগুনের ঝলকানি অসহ্যনীয় পোড়া চামড়ার গন্ধ চতুর্দিকে বাতাস দ্রুত ছড়ায় । যে একটু আগেই তার প্রিয়জনের সাথে আবার দেখা হবে এই ভেবে তাদেরকে বিদায় জানালো সেই কি এখন জ্বলছে ? আর প্রিয়জনেরা চক্রাকারে বেষ্টনী করে পাহারা দিচ্ছে যদি চিতা থেকে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে তাহলে তাকে আবার ঠেলে সটান শুইয়ে দেবে প্রয়োজন হলে ভারী কাঠ দিয়ে চেপে দেবে । আমি এই ডুবন্ত সন্ধ্যায় এই প্রেক্ষাপটে এক অসহায় দর্শক ছাড়া আর কি ? বেঁচে আছি কেন বেঁচে আছি কেনইবা থাকবো সব উত্তর এইখানে ঘুরে-ফেরে, শুধু তাকে ধরে রাখা কঠিন আমি শুধুমাত্র একবার দুবাহুতে ধরেছি তাকে । বাঁ দিকে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে কবরখানা খুব শান্ত দুষ্টুমি নেই – সে ঘুমোয় কখনো আবার জেগে ওঠে কেউ যখন তাকে ডেকে তোলে – ‘এই ওঠ আমরা এসেছি তোমার সাথে কথা বলবো বলে সময় কাটাবো কিছুক্ষণ তারপর ফিরে যাব’ – মনে কোন দুঃখ থাকবে না আমাদের । যাবার আগে আমাদের এক সাথীকে রেখে যাব সে থাকবে তোমার সাথে তুমি তাকে শুইয়ে রেখো এখন সে ঘুমোচ্ছে তাকে জাগিয়ে বিভ্রান্ত কোরো না আমরা চলে যাচ্ছি সে যেন না উঠতে পারে তাই মাটিচাপা দিয়ে গেলাম আমরা আবার আসবো আমাদেরই আরেক বন্ধুকে নিয়ে আজ তবে যাই । . **************** . সূচীতে . . .
রোজ তাকে দেখি আমি সেই রোজকার মতোই হাঁটু গেড়ে বসে আছে গাছের নিচে । সমস্ত শরীর জুড়ে প্রত্যাশার ছায়া ছোট জীর্ণ কাপড় সামনে বিছানো দু-চারটে খুচরো পয়সা ছড়ানো-ছিটানো । একপাশে চায়ের দোকান অনেকেই চা-পানে ব্যস্ত সিগারেটের ধোঁয়ায় ফুঁৎকারে কুন্ডলী বানায় কেউ নিমেষেই উড়ে গেল দশ-বিশ টাকা । সে এখনো মত্ত যদি কারো নজর কাড়া যায় কেউ একবার দেখে ফের মুখ ফিরিয়ে নেয় কেউ কেউ আবার না দেখার ভান-এ দ্রুত এগিয়ে যায় । বাজারে হরেক-রকম পসার ঝিঙে-পটল-কুমড়ো পেছনে একের পর এক মুরগির মৃত্যু ঘটছে রক্ত ফিনকি দিয়ে উপরে উঠে আবার স্বাভাবিক নিয়মেই নিচে নেমে আসে । ছোট-ছোট চিকেন পিস্ পলিথিনে ঝুলিয়ে উদ্ধত-ভঙ্গিতে ছুটছে নিজের সত্ত্বাকে নিজেই হারিয়ে ফেলবে যেন । কোথাও কোন খামতি নেই আছে শুধু বসে বৃদ্ধা একদিন বৃষ্টি ভেজা সকালেও এমনই দেখেছি তাকে কোন সহৃদয় ব্যাক্তি তাকে পলিথিন দিয়ে বলেছিল আর ভেজোনা তোমার জ্বর হবে বয়স বেড়েছে অনেক । আজকে কড়া রোদ নেমেছে খান খান হচ্ছে মাটি শরীর পুড়ছে চড়চড় শব্দে কেউ যেন দৌড়ে গাছের নিচে হাঁফ ছাড়লো বুঝি এইখানে দাঁড়িয়ে সে । কিন্তু নিশ্চিত নীঃরবে একান্ত মনে সময় গুনে কোন হেলদোল নেই । অথচ যারা অনেক কিছু সাথে বাজারে এসেছে অনেক কিছু নেবে বলে তাদের হেল-দোলে কোনো ত্রুটি নেই কোন অভাব নেই দুলছে তো দুলছেই । . **************** . সূচীতে . . .
আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি পঞ্চাশের ওপারে সম্মুখে বড় নদী তরঙ্গের শব্দমালা যেন আমাকে ডাকে এসো এসো এপারে এসো । আমার ভয় হয় বড্ড বেশি ভয় হয় বয়সের মধ্যাহ্ন অতিক্রম করেছি বলেই কি এমন হয় ? এমনটি হোতো না কখনোই এখন এগোনোর আগেই যাবো কি যাবো না আমাকে সতর্কতার সন্ত্রস্ত-বাণী সর্বদা বিব্রত করে । কিন্তু ওপারে এখানে ওখানে যেতেই যে হবে এ-কাজ ও-কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেও হবে । এমনটা হোতো না কক্ষনো ।
একদিন উত্তাল সমুদ্রকে জাপটে ধরে হার মানাবো বলেই এসেছি আমি এক লাঠিতে অমাবস্যার অন্ধকারের সাথে খেলেছি তাকে নিয়ে চোদ্দ জনের পেছন তাড়া করেছি আমার দাপটে নদী খান-খান হয়ে যেত তাঁর বুক চিরে বুকের ওপারে দিগন্ত ধরবো বলে জলে নেমেছি এমন সময় ছিল তরঙ্গে তরঙ্গ দোলা দিত একদিন এক ডুবে পুকুরের মাছ ডাঙায় তুলেছি গাছের হাত-পা ধরে তার সাথে সময় কাটিয়েছি দুলেছি লাফিয়েছি তার ওপর চিৎ হয়ে ক্যাঁৎ হয়ে শুয়ে থেকেছি আমার হাত-পা ভাঙ্গে নি – আমি তখন যে কৃষ্ণ রূপ ধারণ করেছি । পূর্ণিমার জ্যোৎস্না-আলোয় সবাই যখন শীতঘুমে আমি তখন জেগে উঠে বক পাখি শিকার করি । তখন আমার কেউ ছিল না এখন আমার ছেলে মেয়ে ঘরণী তবুও আমাকে পেছন থেকে কেউ যেন ডেকে বলে ‘এই সাবধানে যাস’ – ঠিক তখনই ঠিক তক্ষুনি আমি ভাবতে বসে যাই ভাবতে ভাবতে অন্য দিকে ছুটে পালাই কখনো-সখনো সোজা রাস্তার একধার আঁকড়ে ধরে দ্বিধাগ্রস্ত ফের এগিয়ে যাই কিছুটা এগোই । এখন পঞ্চাশের ওপারে এভাবেই এগোই । . **************** . সূচীতে . . .
আজ ১৯শে অক্টোবর অমৃতসর অকস্মাৎ কেঁপে উঠল রাবণ-বধের প্রাক্-উৎসবে আ-বাল-বৃদ্ধ-নরনারী শতাধিক বিসর্জন এমন মৃত্যু-শবে রাবণ বধের প্রেক্ষাপট কি কখনো দেখেছে কোন দর্শকবৃন্দ ? উল্লাসে চিৎকারে-ফুঁৎকারে বোমের বিষ্ফোট শব্দ ! বারুদের আলোর নৃত্য দেখে উন্মত্ত জনতা জনতার বুক চিরে হিংস্র বদান্যতায় বালবৃদ্ধ নরনারী বাদ বিচারহীন গিলে নিল সে এক দ্রুতগামী শিকারি । রক্ত-মাংসের স্রোতে নেমে এল এক মিলিত উষ্ণতা গোধূলির মিলিত উষ্ণতায় মিলিয়ে গেল শতাধিক প্রাণের স্পন্দন বাজে কানে ক্রন্দনের বিষণ্ণ সুর । তানপুরাতে যদি কেহ বসে থাকে তবে তার সাক্ষী হবে এই দানবী ট্রেন , স্পর্ধা তার অপরিসীম তা নাহলে সে কি দাঁড়িয়ে থাকে আপন বাহুবলে এই দৃশ্যপটেই । ফিবছর এখানে এই লাইনের ধারে রাবণের মৃত্যু ঘটে আনন্দের জোয়ারে মেতে ওঠে যেমনটি ঘটে শত্রু নিধনে । আজ তার শোধ নেবার পালা ছিল বলেই না দশমুন্ড-বিশ হাতে প্রতিশোধ নেবে বলেই ডঙ্কা বাজায় । যে গেল সে নিমেষেই শেষবারের ছন্দে সকলের সম্মিলিত আর্তনাদে মিলে গেল – সে কি ফিরবে ? এরকম মৃত্যু কি ঘটবে ফিবছর যারা গেল তাদের ? তারা তো চলেই গেল ! রাবণ বেঁচে থাকে তাঁর মৃত্যুর মধ্যেই তা নাহলে রাবণের বধ হবে কেন ফিবছর ? কিন্তু যারা চলে গেল তারা কি রাবণ হয়ে জন্মাবে কখনো ? মৃতেরা পাবে পাঁচ লক্ষের উপহার – মৃতেরা কোথায় আছে ? তারা কি জানতে পারবে তাদের এই নামাঙ্কিত উপহারের কথন ? তারা তো নেই ! আমারও ঘটতো যদি এমন তাহলেও মরা না-মরার মাঝে ফারাক থাকতো বুঝি পাঁচ লক্ষ টাকা ? মাত্র পাঁচ লক্ষ টাকা ! আমারও তো আছে প্রিয়জন যেমন কাউকে ডাকা যায় সন্তান বা ভাই-বোন অথবা কোন অর্ধাঙ্গিনী পাশাপাশি ঘুমোই সকাল হলে একসাথে চা পান করি আমাকে এগিয়ে দেবে ভাতের থালা জলের গ্লাস । সেই প্রিয়জনেরা যারা একেবারেই একান্ত আপনজন তারা কি আবার ভুল করেও ডাকবে এস তোমার জন্য ভাত বেড়েছি পাঁচ লক্ষের পরিবর্তে সেরকম ঘটবে না কক্ষনো । . **************** . সূচীতে . . .
বাথরুমে স্নানের অপেক্ষায় নল থেকে জল গড়াচ্ছে নলের ক্লান্তি নেই । এখানে নল জল দানেই ব্যস্ত সে নেয় নিজের জন্য নয় অপরকে দেবে বলে । নিচে পাত্র তা সাদরে গ্রহন করে আমি কেন থেমে আমি দ্বিধায়-দ্বন্দ্বে কার থেকে গ্রহণ করবো নলের জলের যদি হয় অভিমান ? পাত্রের জল সেও যে আমার অপেক্ষায় আমাকে দানের জন্য সে হাত বাড়িয়েছে আমার কোনো পক্ষপাত নেই কেউ উপরে কেউ নিচে নলের জল গড়িয়ে পড়ে অনায়াসে বাধাহীন স্নান সেরে নেওয়া যায় । যদি তুলে নিই পাত্রের জল তার স্পর্শে আমার কোন খামতি ঘটবে না আমার বিশিষ্টতায় । সে বরং উঠে আসুক আমাকেই ধরে উপরে আমাকে ধুইয়ে দিক তার অমল স্নিদ্ধতায় তাতে আমার-ই লাভ । যদি তাকে একটু একটু করে উপরে এনে আলতো করে প্রেম-প্রণয় গায়ে মেখে নিই সে ধুইয়ে নেবে সমস্ত অস্ফুট আবর্জনা । যা কিছু অদৃশ্য অলক্ষ্যে থেকে গেছে সব নর্দমায় জমাঁট বাঁধে আমি নিজে ধৌত হয়ে পরিমল বাতাসে মিশে যাই নির্মল বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নিই । . **************** . সূচীতে . . .