কবি কালীপ্রসন্ন সিংহের ছড়া কবিতা ও গান
*
Sturgeon সাহেবের classএ পড়তো লাহা
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির কৌতুকপ্রিয়তা তাঁর শৈশব থেকেই ছিল। তাঁর স্কুলের সহপাঠী বঙ্গাধিপ-পরাজয় গ্রন্থের
রচয়িতা প্রতাপচন্দ্র ঘোষ তাঁর ছাত্রাবস্থায় সহপাঠী কালীপ্রসন্নের রচিত এই ছড়াটির কথা
বসেছিলেন কবির জীবনীকার মন্মথনাথ ঘোষকে। কবি স্কুলে আন্দোলন পত্র নামক একটি দৈনিক
পত্রিকা প্রকাশ করতেন। অনেকেই তাতে লিখতেন। কালীপ্রসন্ন তার সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকাটি
স্লেটের উপর লিখে দু-তিনটি ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে চালাচালি করে প্রচারিত করা হতো! আমরা
এই ছড়াটি পেয়েছি সরলা দেবী সম্পাদিত “ভারতী” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩২৪ (ফেব্রুয়ারী-মার্চ১৯১৮)
সংখ্যায় প্রকাশিত মন্মথনাথ ঘোষের “সেকালের গল্প” প্রবন্ধ থেকে।


Sturgeon সাহেবের classএ পড়তো লাহা।
তার নীচে ঈশ্বর সাহা॥
ঈশ্বর সাহার ছোট পেট।
তার নীচে জয়গোপাল সেট॥
জয়গোপাল সেটের লম্বা ঠ্যাঙ্গ।
তার নীচে বেণী ব্যাঙ্গ॥
তার নীচে বুনো কালো
বুনো কালো মারে বড়।
তার নীচে গুপী দড়॥
গুপী মিত্র, খাতায় চিত্র,
Blank ও বুকে Black ও মার্ক॥ ইত্যাদি।

হিন্দু কলেজের পুরাতন রিপোর্ট হইতে এই সময়ের কয়েকজন শিক্ষকের নাম উদ্ধৃত হইল :---
মিষ্টার টি, এইচ, ষ্টার্জ্জন                বাবু বেণীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায়
বাবু ঈশ্বরচন্দ্র সাহা                    বাবু বনমালী মিত্র
বাবু জয়গোপাল শেঠ                   বাবু গোপীকৃষ্ণ মিত্র

.                         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
হে সজ্জন স্বভাবের সুনির্ম্মল পটে
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
অমিত্রাক্ষর ছন্দের এই কবিতাটি হুতোমপ্যাঁচার নক্সার ২য় ভাগের শুরুতে এইরূপে  
দেওয়া রয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) রচনার পরের বছরেই
কালীপ্রসন্ন সিংহ তার হুতোম প্যাঁচার নকশা গ্রন্থ কে সর্বসাধারণের জন্য উৎসর্গ করে  
লিখেছিলেন, এই অমিত্রাক্ষর ছন্দে।

হে সজ্জন, স্বভাবের সুনির্ম্মল পটে,
রসের রঙ্গে,---
চিত্রিনু চরিত্র---দেবী সরস্বতীর বরে।
কৃপাচক্ষে হের একবার ;  শেষে বিবেচনামতে,
যার যা অধিক আছে ‘তিরস্কার’ কিংবা ‘পুরস্কার’
দিও তাহা মোরে---বহুমানে লব শির পাতি।

ই কবিতাটই আমরা পেয়েছি  মন্মথ নাথ ঘোষ রচিত “মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ” গ্রন্থে
এইরূপে।

হে সজ্জন স্বভাবের সুনির্ম্মল পটে,
রহস্যরসের রঙ্গে,
চিত্রিনু চরিত্র--- দেবী সরস্বতীর বরে।
কৃপা চক্ষে হের একবার ;  শেষে বিবেচনা মতে,
যার যা অধিক আছে তিরস্কার কিংবা পুরস্কার
দিও তাহা মোরে--- বহুমানে লব শির পাতি ।

.                         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চন্দ্রের কিরণ ক্রমে মলিন হইল
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির ১৭৮০শকাব্দ বা ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে রচিত “সাবিত্রী সত্যবান” নাটকের ২য় কাণ্ড, ২য়
অঙ্কের কবিতা।

শার্ঙ্গরব।---

চন্দ্রের কিরণ ক্রমে মলিন হইল।
মন্দ মন্দ সমীরণ বহিতে লাগিল॥
কুসুম সৌরভে আমোদিত তপোবন।
স্বীয় স্বীয় রবে ডাকে যত দ্বিজগণ॥
নাথেরে মলিন দেখি হইয়া দুঃখিনী।
ঐ দেখ ম্লানমুখী হলো কুমদিনী॥
শিশুগণ করিতেছে রোদনের ধ্বনি।
প্রবোধে ভূষিছে মন তাদের জননী॥
ঋষিগণ করিতেছে হরিগুণ গান।
কোকিল পঞ্চমস্বরে ধরিয়াছে তান॥
মৃগকুল যুথে যুথে বাহির হতেছে।
কোনদিকে কোথা যাবে মনে ভাবিতেছে॥
হম্বারব করিতেছে যত গাভিগণ।
পূর্ব্বদিক হলো ক্রমে রক্তিমাবরণ॥
পদ্মিনী পাইয়া কাল পরিতেছে বেশ।
মাথা নেড়ে কুমদীরে করিতেষে দ্বেষ॥
দণ্ড কমুণ্ডধারি যত ঋষিগণ।
ঐ দেখ প্রাতঃ স্নানে করেন গমন॥
জলচরগণ সব আকাশে উঠেচে।
দেখ দেখ মরি কিবা শ্রেণী গাঁথিয়াচে॥
হংসকুল সরবরে দিতেছে সাঁতার।
জাহুক জাহুকী ডাকে সংখ্যা নাহি তার॥
প্রিয়তম! প্রভাত কি রমণীয় কাল।
কেবল চোরের পক্ষে ঘটিল জঞ্জাল॥
হরি আগমনে আর হরি নাম নাই।
শার্দ্দূল আপন স্থানে পলায়েছে তাই॥
গাভি লয়ে রাখালেরা যাইতেছে মাঠে।
দেখ কিবা নাচিতেছে রাখালিয়া ঠাঁটে॥

.                         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
যখন দুহিতা মম পতির কারণ
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির ১৭৮০শকাব্দ বা ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে রচিত “সাবিত্রী সত্যবান” নাটকের ৪র্থ কাণ্ড, ৩য়
অঙ্কের কবিতা।

রাজা (সাবিত্রীর পিতা)---

যখন দুহিতা মম পতির কারণ।
হাহাকারে ঊর্দ্ধস্বরে করিত রোদন॥
ছিন্ন স্বরপ্ণলতা সম ভূমিতলে পড়ি।
পতিশোকে মনদুঃখে দিত গড়াগড়ি॥
কুরঙ্গনয়ন হতো শোকে ছল ছল।
ভাসিত নয়ন জলে মুখ শত দল॥
হৃদয় বিদীর্ণ হতো তাহা দরশনে।
বাঁচিলাম প্রভু আজ তোমার কারণে॥

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাড়ী বাড়ী জুড়ী গাড়ী মিছে কথার কি কেতা
হুতোমপ্যাঁচা
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে রচিত “হুতোমপ্যাঁচার নক্সা” গ্রন্থের গীত। ১৭৮৪শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে
প্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ৪২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। গানটি অনেকেই প্রচলিত গান
বলেন, অনেকে আবার মনে করেন গানটি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আমলের। কিন্তু গানটি একেবারেই
হুতোমপ্যাঁচার রচিত। গানটিতে “হুতোম দাস” ভণিতা রয়েছে!

॥ বাউলের সুর॥

রাড়ী বাড়ী জুড়ী গাড়ী মিছে কথার কি কেতা।
হেতা ঘুঁতে পোড়ে গোবর হাসে বলিহারি ঐক্যতা,
যত বক বিড়ালে ব্রহ্মজ্ঞানী, বদমাইসির ফাঁদ পাতা।
পুঁটে তেলির আশা ছড়ি                         শুঁড়ি সেনার বেণের কড়ি,
খ্যাম্ টা খান্ কির খাসা বাড়ী, ভদ্রভাগ্যে গোলপাতা।
হদ্দ হেরি হিন্দুয়ানী,                               ভিতর ভাঙ্গা ভড়ংখানি,
পথে হেগে চোক্ রাঙ্গানি, লুকোচুরির ফেরগাঁতা।
গিণ্টি কাজে পালিশ করা,                        রাঙ্গা টাকায় তামা ভরা,
হুতোম দাসে স্বরূপ ভাষে, তফাৎ থাকাই সার কথা॥

.                   ****************                    
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বড় বারে বারে এসো ঘরে মকদ্দমা ক’রে ফাঁক
হুতোমপ্যাঁচা
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে রচিত “হুতোমপ্যাঁচার নক্সা” গ্রন্থের গীত। ১৭৮৪শকাব্দে অর্থাৎ ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে
প্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ৩৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

চিতেন।
বড় বারে বারে এসো ঘরে মকদ্দমা করে ফাঁক!
এইবারে গেরে, তোমার কল্লে সূর্পণখার নাক!
আস্তাই।
ক্যামন সুখ পেলে কম্বলে শুলে,
ব্রহ্মত্তর দেবত্তর বড় নিতে জোর ক’রে
এখন জারী হ্যাল, ভূর ভাংলে,
তোমার আত্তো জুলুম চল্ বে না!
পেনেলকোডের আইন গুণে মুখুয্যের পোর ভাংলো জাঁক।
বে-আইনীর দফারফা বদমাইসি হলো খাক্॥
মোহাড়া।
কুইনের খাসে, দেশে, প্রজার দুঃখ রবে না।
মহামহোপাধ্যায় মথুরানাথ মুস্ ড়ে গিয়েচেন।
কংস-ধ্বংসকারী লেটোর, জেলায় এসেচেন।
এখন গুমী গ্রেপ্তারী লাঠি দাঙ্গা ফোজ চলবে না।

.                   ****************                    
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কে মা রথ এলি?
হুতোমপ্যাঁচা
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে রচিত “হুতোমপ্যাঁচার নক্সা” গ্রন্থের “রথ” অধ্যায়ের গান। ১৭৮৪শকাব্দে অর্থাৎ
১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ৮৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

… দর্শকদের ভিড়ের ভিতর একটা মাতাল ছিল, সে রথ দর্শন করে ভক্তিভরে মাতলামী সুরে---

কে মা রথ এলি?
সর্ব্বাঙ্গে পেরেক-মারা চাকা ঘুর-ঘুর ঘুরালি।
মা তোর সামন দুটো ক্যেটে ঘোড়া,
চূড়োর উপর মুকপোড়া,
চাঁদ চামুরে ঘন্টা নাড়া,
মধ্যে বনমালী।
মা তোর চৌদিকে দেবতা আংকা
লোকের টানে চল্ চে চাকা,
আগে পাছে ছাতা পাকা, বেহুদ্দ ছেনালী॥

গান গেয়ে, “মা রথ! প্রণাম হই মা!” বলে প্রণাম কল্লে।

.                   ****************                    
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিদায় হো মা ভগবতি
হুতোমপ্যাঁচা
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে রচিত “হুতোমপ্যাঁচার নক্সা” গ্রন্থের “দুর্গোত্সব” অধ্যায়ের গান। ১৭৮৪শকাব্দে
অর্থাৎ ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ৮৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এই
গানটিতে “হুতোম দাস” ভণিতা রয়েছে।

গান

বিদায় হও মা ভগবতি! এ সহরে এসো নাকো আর।
দিনে দিনে কলিকাতার মর্ম্ম দেখি চমত্কার॥
জষ্টিসেরা ধর্ম্ম-অবতার, কায়মনে কচ্চেন সুবিচার।
এদিকে ধূলোর তরে রাজপথেতে চেঁচিয়ে চেয়ে চলা ভার॥
পথে হাগামোতা চলবে না, লাহোরের জল তুলতে মানা,
লাইসেন্সচেক্স মাথটচাঁদা, পাইখানায় বাসি ময়লা রবে না।
আবার গবর্ণরের গুয়েদৃষ্টি, সৃষ্টিছাড়া ব্যবহার।
অসঙ্য হতেছে মাগো! অসাধ্য বাস করা আর॥
জীয়ন্তে এই ত জ্বালা মাগো! ---মলেও শান্তি পাবে না,
মুখাগ্নির দফা রফা কলেতে করবে সত্কার।
হুতোমদাস তাই সহর ছেড়ে আসমানে করেন বিহার॥

.                   ****************                    
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চায় মন চিরদিন পূজিতে সেই পুতুলে
হুতোমপ্যাঁচা
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
কবির ১৮৬২ খৃষ্টাব্দে রচিত “হুতোমপ্যাঁচার নক্সা” গ্রন্থের “রেলওয়ে” অধ্যায়ের গান। ১৭৮৪শকাব্দে অর্থাৎ
১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ১০৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

গান

চায় মন চিরদিন পূজিতে সেই পুতুলে।
রং-চঙ্গে চক্ চকে, সাধে কি ছেলে ভুলে॥
জাক রাং অভর চিক্ মিক্ ঝিক্ মিক্ করে।
তায় সোণালী রূপালী চূমকি বসান আলো করে॥
আহ্লাদে পেহ্লাদে কেলে, তামাকখেগো বুড়ো ফেলে।
কও কেমনে রহিব, খেলাঘর কিসে চলে।
চিরপরিচিত প্রণয় সহজে কি ভগ্ন হয়।
থেকে থেকে মন ধায় চোরাসিঙ্গী পাটের চুলে॥
শর্ম্মার সাহস বড়, ভুতের নামে জড়োসড়ো,
ঘরে আছেন গুণবতী গঙ্গাজলে গোবর গুলে।

.                   ****************                    
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দিবা অবসান হেরি তিমির আসি ঘেরিল
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ
১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে রচিত, ভবভূতির প্রসিদ্ধ সংস্কৃত নাটক অবলম্বনে, কালীপ্রসন্ন সিংহের
“মালতীমাধব” নাটকের গান।

॥ রাগিণী পুরবি, তাল আড়াঠেকা॥

দিবা অবসান হেরি তিমির আসি ঘেরিল।
ব্যাধভ্রমে দ্বিজদল ভয়ে নিজবাসে এল॥
নলিনী বিষণ্ণ মনে, বিধবার দশা জেনে,
নতমুখে সরোবরে, মরমে মলিনী হল।
শঙ্খ ঘন্টা বাদ্য রবে, বিবিধ মঙ্গলোত্সবে,
দেবে সেবি দ্বিজদল সায়ং সন্ধ্যা সমাপিল॥

.                   ****************                    
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর