কালীপ্রসন্নের ছড়া, কবিতা ও গান -                                              পাতার উপরে . . .   
কালীপ্রসন্ন সিংহ কোনো কবিতার বই প্রকাশিত করেন নি। ১৯০৫সালে প্রকাশিত
কবি দুর্গাদাস লাহিড়ী
সংকলিত ও সম্পাদিত দুশো সাতাশজন গীতিকারের লেখা পাঁচ হাজার ছশো তেষট্টিটি গানের বিশাল  
সংকলন  “বাঙ্গালীর গান”-এ কালীপ্রসন্ন সিংহের একটিও গান নেই।

কিন্তু তাঁর ১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে রচিত,  ভবভূতির প্রসিদ্ধ সংস্কৃত নাটক অবলম্বনে,  “মালতীমাধব” নাটকে গান
আছে। আমরা সেখান থেকে ১২টি গান তুলেছি। বইটি, প্রথম-পাতাবিহীন অবস্থায় ইন্টারনেট আর্কাইভে
রয়েছে অনামা লেখকের  রচনা  হিসেবে। ১৭৮০শকাব্দ বা ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দে রচিত  “সাবিত্রী সত্যবান”  
নাটকেও বহু গান আছে। সেখান থেকে আমরা ২৬টি গান তুলেছি। হুতোমপ্যাণচার নক্সা থেকেও ৫টি
গান ও ১টি অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতা তোলা হয়েছে মিলনসাগরে। এ ছাড়া সরলা দেবীচৌধুরাণী সম্পাদিত
"ভারতী" পত্রিকা থেকে আমরা কবির স্কুল জীবনের স্লেটে-লেখা পত্রিকা “আন্দোলন পত্র”-এর একটি ছড়া   
পেয়ে এখানে তুলে  দিয়েছি।

কবি কালীপ্রসন্ন সিংহের মাত্র আঠারো-উনিশ বছর বয়সের লেখনীতে এত পরিপক্কতা আমাদের অষ্টাদশ
শতকের
কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র বা বিংশ শতকের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য রচনা এক বছর পরে কালীপ্রসন্ন সিংহ তার হুতোম  প্যাঁচার নক্সা
গ্রন্থে অমিত্রাক্ষর ছন্দে লিখেছিলেন “হে সজ্জন, স্বভাবের সুনির্ম্মল  পটে”  কবিতাটি। কবিতাটি হুতোমপ্যাঁচার
নক্সার ২য় ভাগের শুরুতে দেওয়া রয়েছে।

“হুতোমপ্যাঁচার নক্সা”-তেও বেশ কিছু গান ও কবিতা রয়েছে। দুটি গানে “হুতোম দাস” ভণিতাও রয়েছে।  
তাঁর “রাড়ী বাড়ী জুড়ী গাড়ী মিছে কথার কি কেতা” গানটি এতকালে, প্রচলিত গানের মর্যাদায় নেমে এসেছে।
অথচ গানটিতে “হুতোম দাস” ভণিতা রয়েছে!



মিলনসাগরে  কবি কালীপ্রসন্ন সিংহের কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার
সার্থকতা।


উত্স -
  • মন্মথনাথ ঘোষ রচিত "মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ" জীবনীগ্রন্থ, ১৯০৫।
  • পরেশচন্দ্র দাস রচিত “বাংলার সমাজ ও সাহিত্যে কালীপ্রসন্ন সিংহ”, ১৯৫৯।
  • সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত সংসদ বাঙালি চরিতাবিধান, ১ম খণ্ড, ২০১০
  • শিশিরকুমার দাশ সম্পাদিত সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী, ২০০৩।


কবি কালীপ্রসন্ন সিংহের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১.১২.২০১৮।
...
কালীপ্রসন্নের শিক্ষালাভ ও টিকি-কাটা-জমিদার আখ্যা       
শৈশব থেকেই কবির কৌতুকপ্রিয়তা ও স্লেট-পত্রিকা   
বিদ্যোৎসাহিনী সভা ও বাংলা নাটক    
কালীপ্রসন্ন সিংহের রচনাসম্ভার মহাভারত হুতোমপ্যাঁচা   
নীলদর্পণ-বিচারে লং সাহেবের জরিমার ভরেন   
কালীপ্রসন্ন ছিলেন সে যুগের “বিপদে মধুসূদন”   
কালীপ্রসন্ন সিংহের সম্মাননা   
কালীপ্রসন্নের ছড়া, কবিতা ও গান    
*
তাঁর জমিদারী ছিল। তিনি কাশীধামে একটি শিব মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর দুই পুত্র, প্রাণকৃষ্ণ এবং
কবির পিতামহ জয়কৃষ্ণ। জয়কৃষ্ণ ছিলেন কলকাতার হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার একজন উদ্যোগী এবং তার
অন্যতম ডাইরেক্টর। জয়কৃষ্ণর একমাত্র পুত্র নন্দলাল কবির পিতা।
কালীপ্রসন্নের শিক্ষালাভ ও টিকি-কাটা-জমিদার আখ্যা -                        পাতার উপরে . . .  
কবি হিন্দু কলেজে শিক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে তার গৃহে ইংরেজি গৃহশিক্ষক মিস্টার কার্কপেট্রিকের কাছে শিক্ষা
সম্পন্ন করেন। তাঁর নামে একটি রটনা প্রচলিত হয়েছিল যে, তিনি নাকি অনেক ব্রাহ্মণের টিকি কেটে  
দিয়েছিলেন। যার ফলে কলকাতায় তিনি “টিকি কাটা জমিদার” নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এ বিষয়ে
“অর্ঘ্য” পত্রিকার সম্পাদক অমূল্যচরণ সেন তাঁর পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩১৮ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১১)  
লিখেছিলেন . . .

একটা জনশ্রুতি আছে যে কালীপ্রসন্ন অনেক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের টিকি কাটিয়া দিয়াছিলেন। লোকমুখে এখনও
আমরা শুনিতে পাই, টাকা দিয়া কালীপ্রসন্ন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদিগকে বশীভূত করিয়া তাঁহাদিগের টিকি ক্রয়  
করিতেন, পরে ঐগুলি কাটিয়া লইয়া আলমারিতে সাজাইয়া রাখিতেন ; কাহার টিকি কত মূল্যে  ক্রীত,  
তাহাও এক টুকরা কাগজে লিখিত হইয়া ঐ টিকির সঙ্গেই সংলগ্ন থাকিত। এই ঘটনা যে মিথ্যা, তাহা আমরা
জানিতে পারিয়াছি। কিন্তু তাহা হইলে কি হয়, এই জনশ্রুতি এতই প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল যে, কলিকাতায়
তিনি “টিকি কাটা জমিদার” আখ্যা লাভ করিয়াছিলেন। বাস্তবিক সে সময়ে “টিকি কাটা জমিদার” বলিলে
লোকে উঁহাকেই বুঝিত। যাহা হউক, এই আখ্যার মূলে যে কতকটা সত্য না ছিল, এমন কথাও  আমরা
বলিতে পারি না। ব্যাপারটা এইরূপ ঘটিয়াছিল। একবার কালীপ্রসন্নের বাটীতে কোন ব্রতাপলক্ষে এক   
ব্রাহ্মণকে একটী গাভীদান করা হইয়াছিল। ব্রাহ্মণ গাভী লইয়া যাইতে যাইতে পথেই ইহা কসাইকে বিক্রয়
করে। ঘটনা কালীপ্রসন্নের গোচরাভূত হইলে তিনি সেই ব্রাহ্মণকে বাটীতে ডাকিয়া আনেন এবং  স্বহস্তে  
তাহার টিকি কাটিয়া লয়েন। এই ঘটনাই ক্রমশঃ অতিরঞ্জিত হইয়া জনশ্রুতিতে পরিণত হয় যে, কালীপ্রসন্ন
ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের টিকি কাটিয়া থাকেন। বস্তুতঃ তিনি যে এইরূপ এক জন নীচাশয় ব্রাহ্মণের শিখা কর্ত্তন  
করিয়াছিলেন বলিয়াই, সকল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের উপর শ্রদ্ধাহীন ছিলেন, এইরূপ কখনই সম্ভবপর নহে।  
পক্ষান্তরে, প্রকৃত ব্রাহ্মণপণ্ডিতগণকে যে তিনি অতি ভক্তি করিতেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নাই
।”
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ - জন্মগ্রহণ করেন
কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। পিতা নন্দলাল
সিংহ এবং মাতা ত্রৈলোক্যমোহিনী দেবী।

দেওয়ান শান্তি রাম সিংহের প্রপৌত্র ছিলেন
কবি কালীপ্রসন্ন সিংহ। দেওয়ান শান্তিরাম
স্যার টমাস রমবোল্ড ও মিস্টার মিডল্টনের
অধীনে মুর্শিদাবাদ ও পাটনার দেওয়ানী করে
প্রভূত অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন। উড়িষ্যাতেও
*
শৈশব থেকেই কবির কৌতুকপ্রিয়তা ও স্লেট-পত্রিকা -                        পাতার উপরে . . .  
কবির কৌতুকপ্রিয়তা তাঁর শৈশব থেকেই ছিল। তাঁর স্কুলের সহপাঠী “বঙ্গাধিপ-পরাজয়” গ্রন্থের রচয়িতা
প্রতাপচন্দ্র ঘোষ তাঁদের ছাত্রাবস্থায়, সহপাঠী কালীপ্রসন্নের রচিত একটি ছড়ার কথা বলেছিলেন কবির  
জীবনীকার, “মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ” গ্রন্থের প্রণেতা মন্মথনাথ ঘোষকে। কবি স্কুলে “আন্দোলন পত্র” নামে
একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। অনেকেই তাতে লিখতেন। কালীপ্রসন্ন তার সম্পাদক ছিলেন।  
পত্রিকাটি স্লেটের উপর লিখে দু-তিনটি ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে চালাচালি করে প্রচারিত করা হতো! আমরা
এই ছড়াটি পেয়েছি
সরলা দেবী সম্পাদিত “ভারতী” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩২৪ (ফেব্রুয়ারী-মার্চ১৯১৮) সংখ্যায়
প্রকাশিত মন্মথনাথ ঘোষের “সেকালের গল্প” প্রবন্ধ থেকে। ছড়াটি নীচে কবির অন্যান্য কবিতার সঙ্গে দেওয়া
রয়েছে। এই ছড়াটি তাঁর হিন্দু কলেজের বিভিন্ন শিক্ষকগণকে নিয়ে লেখা।
*
বিদ্যোৎসাহিনী সভা ও বাংলা নাটক -                                              পাতার উপরে . . .   
মাত্র ১৫বছর বয়সে তিনি "বিদ্যোৎসাহিনী সভা"-র প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর বাড়ীতেই। কৃষ্ণদাস পাল, আচার্য্য
কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্য, প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদার প্রমুখগণ সেই সভায় অংশগ্রহণ করতেন। ১৮৫৬
খৃষ্টাব্দে তিনি  “বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা” এবং ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে “বিদ্যোৎসাহিনী থিয়েটার”-এর প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৫৬ খৃষ্টাব্দের ৯ই এপ্রিল বিদ্যোত্সাহিনী থিয়েটারের প্রযোজনায় তিনি রামনারয়ণ তর্করত্ন দ্বারা অনুদিত
“বেণীসংহার” নাটকে অভিনয় করেন। এই নাটকে কোনও সঙ্গীত ছিল না। প্রশংসা পেলেও নাটকটি  
কালীপ্রসন্নের মনমতো হয়নি।

তাই এরপরই তিনি নিজেই কালিদাস রচিত “বিক্রমোর্ব্বশী” নাটকের অনুবাদ করে প্রকাশিত করেন।  
গ্রন্থখানি তিনি বর্ধমানের
মহারাজা মহাতপচাঁদের নামে উত্সর্গ করেছিলেন। নাটকটি চন্দ্রবংশীয় রাজা  
পুরূরবার ও অপ্সরা উর্বশীর প্রেমকাহিনী। ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে তিনি “বিক্রমোর্ব্বশী” নাটকটি মঞ্চস্থ করেন  
বিদ্যোত্সাহিনী থিয়েটারে। তিনি স্বয়ং অভিনয় করেন রাজা পুরূরবার ভুমিকায়। এই নাটকে অনেক বিশিষ্ট
ব্যক্তি অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখনীয় হলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
(W.C.  
Bonnerjee)
, যিনি ১৮৮৫ খৃষ্টাব্দে, অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম, দাদাভাই নারোজী এবং অন্যান্যদের  সঙ্গে
জাতীয় কংগ্রেস দলের স্থাপনা করেন। তখন উমেশচন্দ্রের বয়স ছিল মাত্র ১৩বছর! নাটক দেখতে সেই  
সময়ের প্রায় সমস্ত সম্ভ্রান্ত ইউরোপিয়ান এবং দেশীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়েছিলেন। স্থানাভাবে অনেককেই
বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। তদানিন্তন বাংলার ছোটলাট স্যার সিরিল বীডন, নাটকটি দেখে
কালীপ্রসন্নের প্রশংসা করেন। কলকাতা রিভিউ পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়। এই বিদ্যোত্সাহিনী থিয়েটারের
এই নাটকটির সাফল্য দেখেই রাজা প্রতাপচন্দ্র ও ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ভ্রাতৃদ্বয় এবং রাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের
উদ্যোগে বেলগাছিয়ার বাগানে নাট্যশালার স্থাপনা করা হয়।

এই ঐতিহাসিক নাটকটির রচয়িতা, নির্দেশক ও রাজা পুরূরবার ভুমিকায় অভিনেতা কালীপ্রসন্নের সে সময়ে
বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর!
*
কালীপ্রসন্ন সিংহের রচনাসম্ভার মহাভারত হুতোমপ্যাঁচা -                       পাতার উপরে . . .   
তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় “সর্বতত্ত্ব প্রকাশিকা” (প্রাণিতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা),   
“বিবিধার্থ সংগ্রহ” (রাজেন্দ্রলাল মিত্রের পরে), “পরিদর্শক” প্রভৃতি পত্র-পত্রিকা। এর সঙ্গে অবশ্যই থাকছে পূর্বে
উল্লিখিত তাঁর স্কুলজীবনে স্লেটে লেখা প্রায় দৈনিক প্রকাশিত “আন্দোলন পত্র” পত্রিকাটি।

তাঁর রচিত নাটকের মধ্যে রয়েছে “বাবু” (১৮৫৪), “বিক্রমোবর্শী” (১৮৫৭), “সাবিত্রী সত্যবান” (১৮৫৮),   
“মালতীমাধব” (১৮৫৯) প্রভৃতি।

তিনি ছদ্মনামে (হুতোম প্যাঁচা) লিখেছেন "হুতোম প্যাঁচার নক্সা" (১৮৬২-৬৪) যা সমাজ জীবনের কিছুটা স্থুল
ব্যঙ্গরূপ। এই গ্রন্থটি সংস্কৃত শব্দবহুল পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষার বিরুদ্ধে বাংলা সাহিত্যে, চলিত ভাষার প্রচলন  
করার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তিনি বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে পাঠ করেছেন সেযুগের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সম্মুখে। কিশোরীমোহন মিত্রের
উদ্যোগে অনুষ্ঠিত, ডেভিড হেয়ার সাহেবের স্মৃতি রক্ষা বার্ষিক সভায় ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৩ সালের মধ্যে  
তিনি পাঠ করেন তাঁর লেখা “বাঙ্গালা ভাষার অনুশীলন”, “বাঙ্গালা নাটক”, “বাঙ্গালার কৃষি সম্বন্ধীয় অবস্থা ও
কৃষি-প্রদর্শনী” বিষয়ক বিবিধ প্রবন্ধাদি।

মহাভারত -
তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উত্সাহে ও তত্ত্বাবধানে, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়,
নবীনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখদের সাহায্যে বেদব্যাস রচিত “মহাভারত” (১৮৬০-৬৬) এর বঙ্গানুবাদ। এই
কাজে তাঁর নিযুক্ত একটি বিরাট পণ্ডিতগোষ্ঠির সদস্যমণ্ডলীকে পরিচালনা করে তিনি চার বছরে এই কাজ
সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। রচনা শেষ করার পরে এই গ্রন্থটি, নিজ ব্যায়ে মুদ্রণ করে, সারা দেশে বিনামূল্যে
বিতরণ করার ব্যবস্থাও করেছিলেন কালীপ্রসন্ন। এমন কি ডাকযোগে যাঁরা পুস্তকটি আনিয়েছিলেন তাঁদের
ডাকমাশুলও দিতে হয় নি। মন্মথনাথ ঘোষ তাঁর “মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ” গ্রন্থের ৬৪-পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে
১৭৮০ শকাব্দের (১৮৫৮) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় এই গ্রন্থের বিনামূল্যে বিতরণের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত
হয়েছিল যার প্রতিলিপি আমরা এখানে উদ্ধৃত করছি . . .

.                                                            বিজ্ঞাপন।
.                               শ্রীযুক্ত কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয় কর্ত্তৃক গদ্যে অনুবাদিত
.                                                        বাঙ্গালা মহাভারত।
মহাভারতের আদি পর্ব্ব তত্ত্ববোধিনী সভার যন্ত্রে মুদ্রিত হইতেছে, অতি ত্বরায় মুদ্রিত হইয়া সাধারণে
বিনামূল্যে বিতরিত হইবে। ভিন্ন প্রদেশীয় মহাত্মারা পুস্তক প্রেরণ জন্য ডাক ষ্ট্যাম্প প্রেরণ করিবেন না।
কারণ, পূর্ব্ব প্রতিক্ষানুসারে ভিন্ন প্রদেশে পুস্তক প্রেরণের মাসুল গ্রহণ করা যাইবে না। প্রত্যেক জেলায় পুস্তক
বণ্টন জন্য একজন এজেণ্ট নিযুক্ত করা যাইবে, তাহা হইলে সর্ব্বপ্রদেশীয় মহাত্মারা বিনাব্যয়ে আনুপূর্ব্বিক
সমুদায় খণ্ড সংগ্রহ করণে সক্ষম হইবেন।
.                                                                                        শ্রীরাধানাথ শিকদার।
.                                                                                   বিদ্যেত্সাহিনী ,ভার সম্পাদক।
*
নীলদর্পণ-বিচারে লং সাহেবের জরিমার ভরেন কালীপ্রসন্ন -                     পাতার উপরে . . .   
“নীলদর্পণ” নাটকের জন্য পাদ্রি রেভারেণ্ড জেমস্ লং সাহেবের জরিমানার হাজার টাকা কালীপ্রসন্ন সিংহই
আদালতে জমা দিয়েছিলেন।

নীলদর্পণ নাটকে রচয়িতা
দীনবন্ধু মিত্র, নীলচাষীদের উপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচারকে সর্বসমক্ষে তুলে
ধরে ছিলেন। পুলিশের সতর্কতা সত্বেও "ন্যাশনাল থিয়েটারের" ব্যানারে নাটকটি চারবার অভিনীত হয়।  
নীলচাষীদের উপর অত্যাচারের অভিনয় দেখতে বসে
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উত্তেজিত হয়ে মঞ্চে   
অভিনেতাদের দিকে তাঁর চটি খুলে ছুড়ে মেরেছিলেন! সেই চটিজুতাকে অভিনয়ের পুরস্কাররূপে  তাঁরা  
গ্রহণও করেছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায় তুলনা করে লেখেন যে Uncle Tom's Cabin আমেরিকায়  
দাসপ্রথা নির্মূলে যে  ভূমিকা নিয়েছিল, নীলদর্পণ নাটক ভারতে নীলচাষীদের উপর ব্রিটিশদের অত্যাচার  
নির্মূলে একই ভূমিকা পালন করেছিল।
দীনবন্ধু মিত্র এর জন্যই চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটকের ইংরেজী অনুবাদ করলে রেভারেন্ড জেমস লং তা প্রকাশিত করেন।  
ইংলিশম্যান ও হরকরা পত্রিকার স্বত্বাধিকারীগণ এবং নীলকরগণের পক্ষে মানহানির মামলা করা হয়  
বিচারক স্যার মর্ডণ্ট ওয়েল্সের এজলাসে। বিচারক ওয়েল্সের দুর্নাম ছিল যে তিনি বাঙালীদের প্রতি বিদ্বেষ
পোষণ করতেন এবং মনে করতেন ও বলতেন যে বাঙালী মিথ্যেবাদী ও বর্বর জাতি। ১৮৬১ খৃষ্টাব্দের ২৪
জুলাই তারিখে, এই মামলায় বিচারক ওয়েল্স লং সাহেবকে এক মাসের কারাবাস ও ১০০০টাকা জরিমানার
শাস্তি প্রদান করেন। এই জরিমানার ১০০০ টাকা দিয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ।

কালীপ্রসন্নের জাতীয়-সম্মান-রক্ষার চিন্তা কতদূর প্রসারিত ছিল তা আমরা মন্মথনাথ ঘোষের মহাত্মা   
কালীপ্রসন্ন সিংহ গ্রন্থের ৪৬-পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি থেকে বুঝতে পারি। সেখানে মন্মথনাথ ঘোষ লিখেছেন . . .

নীল-বিপ্লবের অন্যতম ঐতিহাসিক, 'নীলদর্পণ'-প্রণেতার তৃতীয় পুত্র, শ্রীয়ুক্ত ললিতচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের নিকট
শুনিয়াছি যে, লঙের বিচারকালে দীনবন্ধু বাবুও অভিযুক্ত হইবেন, এইরূপ আশঙ্কার কারণ ঘটিয়াছিল।  
তত্কালে স্বদেশপ্রাণ কালীপ্রসন্ন তাঁহাকে এই আশ্বাস দেন যে, যদি অর্থের দ্বারা তাঁহাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়,
তাহা হইলে তিনি নিশ্চিন্ত থাকিতে পারেন ; কারণ কালীপ্রসন্ন সর্ব্বস্ব দিয়াও তাঁহাকে বিপন্মুক্ত করিতে চেষ্টা
পাইবেন!

পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত পুরাতন ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রদৃষ্টে প্রতীত হয় যে, এই সময়ে নীলদর্পণে'র
প্রথম সংস্করণ নিঋশেষিত হওয়ায়, কালীপ্রসন্ন নিজব্যয়ে উহার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত করিয়া বিনামূল্যে
সাধারণ্যে বিতরণ করেন
।”
*
কালীপ্রসন্ন ছিলেন সে যুগের “বিপদে মধুসূদন” -                                     পাতার উপরে . . .   
বিপদে আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও আর্থিকভাবে মানুষকে সাহায্য করার জন্য তিনি প্রসিদ্ধি লাভ  
করেছিলেন। কবি, “হিন্দু প্যাট্রিয়ট” পত্রিকার সম্পাদক হরিশ মুখার্জি ও তার পরিবারবর্গ কে  এবং  
“মুখার্জ্জীস” ম্যাগাজিনের শম্ভুচন্দ্র, শিক্ষক রিচার্ডসন প্রমুখদের নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। তিনি বিধবা
বিবাহ কে জনপ্রিয় করার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন এবং বহু বিবাহ রোধ ও বারবনিতা   
স্থানান্তরীকরণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

কলকাতায় জলের কল আসার অনেক পূর্বে দশহাজার টাকা ব্যায়ে পাঁচটি বারি-প্রশ্রবণ
(Water Fountain)  
নির্মিত করিয়েছিলেন জনসাধারণের জন্য।

কবি প্যারিচাঁদ মিত্র (ছদ্মনাম টেকচাঁদ ঠাকুর) তাঁর "ডেভিড হেয়ারের জন্মচরিত" (১৮৭৮)-এ লিখেছেন যে  
তাঁর ভাই কিশোরীমোহন মিত্র ডেভিড হেয়ার সাহেবের স্মতি রক্ষায় যে বাশিক সভার আয়োজন করতেন
তার অনেকগুলিই কালীপ্রসন্ন সিংহের বাড়ীতে তাঁরই উদ্যোগে ও অর্থানুকুল্যে অনুষ্ঠিত হতো।

কালীপ্রসন্নের অসংখ্য দানের জন্যই
দয়ার সাগর বিদ্যাসগর তাঁকে পুত্রাধিক স্নেহ করতেন।
*
কালীপ্রসন্ন সিংহের সম্মাননা -                                                         পাতার উপরে . . .   
কালীপ্রসন্ন সিংহ, ব্রিটিশ সরকার দ্বারা অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অফ দ্য পিস নিযুক্ত হয়েছিলেন।

মাত্র তিরিশ বছরের জীবনকালে তাঁর এই কীর্তি-সম্ভার আমাদের বিস্মিত করে। এক ঝলকে দেখিয়ে যায় যে
ইচ্ছা থাকলে মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব হতে পারে।
*