কবি রতন কাহার - বাংলাভাষার সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় লোকসংগীত “বড় লোকের বিটি লো”
গানটির  রচয়িতা কবি-গীতিকার। গানটি স্বপ্না চক্রবর্তীর কণ্ঠে রেকর্ড করা হলেও তিনি সুমনা চক্রবর্তীর
সঙ্গে এক  সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন যে, রেকর্ড হওয়ার বহু পূর্বেই, কবির নিজের কণ্ঠে আকাশবাণী থেকে
গানটি  প্রচারিত হয়েছিল। পূর্ণচন্দ্র দাস বাউলও তাঁর গান গেয়েছেন।

রতন কাহারের সম্বন্থে আমাদের কাছে খুব অল্প তথ্য রয়েছে। আমরা কবির সঙ্গে দেখা করে কোনও  
সাক্ষাত্কার গ্রহণ করে উঠতে পারিনি। বিভিন্ন জায়গা থেকে টুকরো টুকরো তথ্য একত্র করে যেটুকু পাওয়া
গেছে তা আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি।

কবি রতন কাহারের জীবন সম্বন্ধে আমাদের কাছে খুবই অল্প তথ্য রয়েছে। কেউ যদি তাঁর জীবন সম্বন্ধে
আমাদের তথ্য এবং তাঁর একটি ছবি পাঠান তাহলে আমরা প্রেরকের নাম, কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই  পাতায়
উল্লেখ করবো


বীরভূম জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। তিনি বীরভূম জেলার সদর ‘সিউরীর’ বাসিন্দা।  

সুমনা চক্রবর্তীর সাক্ষাত্কার থেকে জানা যায় যে রতন কাহারের সঙ্গীত জীবন শুরু হয় আলকাপ দিয়ে।  
তিনি যাত্রা দলে ছুকরিও সেজেছেন। পরে তৈরি করেন ভাদু গানের দল। বেঁধেছেন বহু ঝুমুর গানও।  
দারিদ্রের কারণে বন্ধ হয়ে যায় গান বাঁধা। তা কাটিয়ে উঠলেও খ্যাতির স্বাদ পাননি কবি। জীবিকার জন্যে
বিড়িও বেঁধেছেন। অর্থাভাবে তিন ছেলে এক মেয়ের কেউই স্কুলের গণ্ডি ছাড়াতে পারেননি। কবিকন্যা  
ভালো গান গাওয়া সত্ত্বেও তাঁকে একটা হারমোনিয়াম কিনে দিতে পারেন নি।

১৯৭৬ সালে কবির রচিত “বড় লোকের বিটি লো” গানটির রেকর্ডিং করেন স্বপ্না চক্রবর্তী। অশোকা রেকর্ড
কোম্পানির এই গানটি প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং গোল্ডেন ডিস্ক পুরস্কারে ভূষিত হয়। গানটির  
রচনা সম্বন্ধে সুমনা চক্রবর্তী তাঁর সাক্ষাত্কারে লিখেছেন, “লোকসঙ্গীতের সমঝদার বাদে আমজনতার ক’জন
শুনেছেন রতন কাহারের নাম ? সেই মানুষটাই ‘বড়লোকের বিটি’র গল্প বলতে গিয়ে আক্রান্ত হলেন  
নস্টালজিয়ায়। বললেন, ‘সেই কুমারী মা নিজের জীবনের সব গল্প বলেছিল আমায়। ওর আশ্রয়দাত্রী ছিল  
হরিদাসী। সেই প্রৌঢ়ার একটা ঝুমুরের দল ছিল। ওর কাছে সুর নিতে গিয়েছিলাম। তখনই আলাপ। সেই  
তরুণীর গল্পে এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম, যে গানটা লেখার সময় ওই গল্পটাই মাথায় ঘুরছিল। ইশারায়-ইঙ্গিতে
সেই মেয়েকে বাবুর বাগানে দেখা করতে বলত তার প্রেমিকটি। অল্প বয়সে না বুঝে সেই ফাঁদে পা দিয়ে  
ফেলে মেয়ে। যখন টের পায় শরীরে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে, তখন পিতৃত্ব অস্বীকার করে প্রেমিক। সে
তো তথাকথিত বড় ঘরের। তাই তার ঔরসে জন্মানো নিষ্পাপ শিশুটিকে উদ্দেশ করে লিখি, বড়লোকের  
বিটি লো। বাকিটা অবশ্য ওর মায়ের প্রেমকাহিনি। গুণীজন গানটির কদর করলেন। আমি কৃতার্থ।”

একসময় তিনি কাজ নিয়মিত কাজ করেছেন আকাশবাণী কলকাতায়। পাহাড়ি সান্যালই তাঁকে  
আকাশবাণীতে সুযোগ করে দেন। সুমনা চক্রবর্তীর সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন যে পাহাড়ি সান্যাল, আর্য  
চৌধুরী, ‘আনন’ গোষ্ঠীর রাজকুমার সাহারা, নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন কবির সঙ্গে। আনন গোষ্ঠীর সঙ্গেই
এসে খাতায় ‘বড়লোকের বিটি লো’ গানটি লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্না চক্রবর্তী। প্রশ্ন থেকে যায় যে স্বপ্না
দেবী নিজে এসে কবি রতন কাহারের কাছ থেকে গানটি লিখে নিয়ে গেলেও কেন রেকর্ডে, গানটিকে ‘প্রচলিত
গান’ হিসেবে দেওয়া হয়? তাঁরা কি বিশ্বাস করেন নি যে রতন কাহার এই গানটি লিখে থাকতে পারেন?  

সম্ভবত ১৯৭৬সালে,  শিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তীর কণ্ঠে “বড়লোকের বিটি লো” (গীতিকার রতন কাহার) এবং “বলি
ও ননদী” (গীতিকার
আশানন্দন চট্টরাজ) গান দুটি প্রথমে গীতিকারের নামের জায়গায় "প্রচলিত" বলে  
প্রকাশিত হয়েছিল পরে ৯৭-৯৮সালে
HMV থেকে  “চয়নিকা এপার বাংলা ওপার বাংলার লোকগীতি”
ক্যাসেটে “বলি ও ননদী” গানটি
আশানন্দন চট্টরাজের নামেই প্রকাশিত হয়, কিন্তু রতন কাহারের গানটির  
গীতিকার “পরম্পরাগত”-ই রয়ে যায়।  

শিল্পী অতনু বর্মনের একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “স্বপ্না চক্রবর্তীর রেকর্ড যখন প্রকাশ পায় রতন
কাহার প্রচলিত লেখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ক'রেছিলেন। কিন্তু প্রমাণ করতে পারেন নি—গানটির তিনিই  
গীতিকার। গায়িকাও দায়িত্ব নেন নি। ফলে রেকর্ডে রতন কাহার মশাইয়ের নাম গীতিকার হিসাবে উল্লিখিত
হয়নি ৷ সম্ভবত জানো যে, আশানন্দনদা'র ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল ৷ তবে উনি আইনের সাহায্যে  
লড়ে তথ্য-প্রমাণাদি দাখিল ক'রে 'আর দুমুঠো চালে'র গীতিকারের মর্যাদা আদায় ক'রে নেন।”  

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁর বয়স ৮২ বছর উত্তীর্ণ হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। প্রসার ভারতী  
থেকে তাঁর অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনী সরকার শপথ গ্রহণ  
করার পর থেকেই তাঁর শিল্পী-পেনশনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কবি ভবতোষ শতপথীর সঙ্গেও একই ঘটনা  
ঘটেছিল। ফলে তাঁর আর্থিক অবস্থা খুবই উদ্বেগজনক। বীরভূম জেলার সদর সিউরী শহরে তাঁকে শবযাত্রায়
খঞ্জনি বাজিয়ে রাস্তায় যেতে দেখেছেন অনেকেই।

এত পুরস্কার ও শংসাপত্র পেয়েছেন। কিন্তু খ্যাতি ও লক্ষ্মী তাঁকে সদাই এড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর বহু জনপ্রিয়  
গানের মধ্যে রয়েছে "ঠেলে দে মালের গাড়ি" গানটিও।

আরও গান তুললে, যদি পুনরায় কেউ তা চুরি ক’রে নিজের নামে চালিয়ে দেয়, সেই ভয়ে আমরা কবির  
আপাতত একটি মাত্র পরিচিত গানই মিলনসাগরে তুললাম।

কেউ যদি এই কবি-গীতিকার সম্বন্ধে আমাদের আরও তথ্য জানাতে পারেন তা হলে আমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ
তাঁদের নাম এই পাতায় উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা জানাবো


মিলনসাগরে  আমরা কবি রতন কাহারের গান তুলে তাঁকে মিলনসাগরের কবিদের সভায় আসন দিতে পেরে
ধন্য হলাম। আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর গান পৌঁছে দিতে পারলে আমাদের এই প্রয়াসের সার্থকতা।


উত্স -


কবি রতন কাহারের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৩.১২.২০১৮।
...