আমাদের পুজো কবি সুমন্ত ভৌমিক কবিতাটি ‘জলফড়িং’ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা ২০২১-এ প্রকাশিত হয়েছিল।
কাশফুল ফোটার আগেই আমার নতুন জামা,প্যান্টের ব্যাগ জমা হতে থাকে। একটা মাসির দেওয়া, তিনটে মামাদের, এমন করে জমে যায় দশ-বারোটা ! প্রতিবার। সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাই... নিজেও দেখি; চারদিনের পুজোয় এবেলা-ওবেলা করে পরেও সব জামা ফুরোয় না...
আমাদের বাড়ির নীচে ফুটপাথে একটি ছেলে থাকে, আমার মতো, কিন্তু ওদের ঘর নেই,ওর বাবা নেই, আছে একটা অসুস্থ মা আর একটা প্লাস্টিক ঘেরা তাঁবু। ওর কি পুজোয় জামা হয় আমার মতো ? ও কি দু-মাস আগে থেকে ভাবে কবে কোন জামাটা পরবে, কবে কী খাবে ?
ওর একটা জামা আছে, আমি দেখেছি। আগে কী রং ছিল জানি না, এখন সব ধূসর ! কবেকার জামা, কে দিয়েছিল, কোন পুজোয় ? ওদের পুজো কেমন করে কাটবে ?
ভাবছি ওকেও পুজোর ক-দিন আমার বাড়ি ডাকব, দু-বেলা একসঙ্গে খাব আমার মায়ের হাতের রান্না। তারপর ওকেও সঙ্গে নিয়ে ঠাকুর দেখতে যাব, মাকে বলে আমার নতুন জামা ক-টা দিয়ে দেব;
আজ শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি, বিগত সব শরৎকালের জন্য। যে শরৎ শুধু শিউলি নয়, দিয়েছিল শিউলির থেকেও মিষ্টি কিছু স্বপ্ন। আমি সেই স্বপ্ন ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম। ভুল করছি তা বুঝিনি। আজ তাই শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি, মরে যাওয়া সব ইচ্ছেগুলোর জন্য। যে ইচ্ছেগুলো তোমাকে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু বুঝিনি, এত আপলকা তোমার হাত... বৈশাখী ঝড়ে গোড়া থেকে উপড়ে যেতে পারে, সব ইচ্ছের গাছ। আজ তাই শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি, তোমাকে বিশ্বাস করে ঠকে যাবার জন্য।
কিছু বৃষ্টি আজ পড়ুক আনমনে কিছু পথ হাঁটা বাকি আপনমনে। যা কিছু দামি পড়ে থাক আস্তাকুঁড়ে যা কিছু প্রাঞ্জল কুড়িয়ে পাক ভবঘুরে। হাত বাড়িয়ে ছিল যে শিশু অনাথ আশ্রমে হাত ধরুক কোনো পিতা,তার নিজের নামে। হাঁটা তো হল অনেক,এখনও হাঁটব কিছুটা হাঁটা তো তোমারও বাকি অপেক্ষায় সমস্ত পৃথিবীটা। গান লিখলাম,খুন করলাম, কবিতা নিয়ে হল অনেক কথা গান গাইলাম, ধর্ষণও করলাম, শুধু ভাগ হল না কিছু ব্যথা। ব্যথা কি শুধুই তোমার, নাকি ব্যথারও আছে কোনো কথা ব্যথা জেগে ওঠে তরবারি হয়ে, কাটা পড়ে পাঁচমাথা। পথের বাঁকে যুদ্ধ হয়, ঘরের কোনে হয় পাঁচালী পথের রক্ত মাড়িয়ে যায় যুগে যুগে শুধু পাঞ্চালী।
জ্বলন্ত দুপুরে চারটে লোক বয়ে নিয়ে যাচ্ছে পালকি... গরম বালিতে ঘামের বাষ্প জমে ওঠে একফোঁটা দু-ফোঁটা। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি পালকির ভিতরে, দুই হাঁটুর মাঝে থুতনি রেখে বসে আছ তুমি। পালকির দুলকি চাল থেকে থেকেই করে তোলে অস্থির; শুধু তোমার দৃষ্টিটা স্থির... মাটির ওপরে নিমজ্জিত। আমি হাত নেড়ে ইশারা করি, গলা ফাটিয়েও ডাকি ওই-ই। তুমি দেখতে পাবে বলে তোমার দেওয়া সেই রুমাল ওড়াই... পালকি কেবলই এগিয়ে চলে পশ্চিম থেকে আরো পশ্চিমে। আমি ছুটে যেতে চাই তোমার কাছে, কিন্তু কী করে যাই ! সামনে যে খরস্রোতা এক খাল বয়ে যায় মৃত্যুর পাশা খেলে। কিন্তু এইখানে এই খাল এলো কোত্থেকে... নিয়তি তুমি জান ? মনে পড়ে যায়, একদিন তো তুমি-আমি মিলেই আনমনে, কেটে ফেলেছি নিজেদের মধ্যেকার এই খাল... আজ যার একপারে তুমি, অন্য পারে আমি। আমাদের মতো, অজস্র ভেসে যাওয়া নৌকার মাঝিদের চোখের জলে দিনের পর দিন এই খাল হয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণা। আজ যার ওই পার দিয়ে বয়ে চলেছে তোমার পালকি পশ্চিম থেকে আরো পশ্চিমে, ভিতরে তুমি, একদম একা।
কিছু খুচরো আজো পকেটে আছে কিছু বন্ধুত্ব, এখনও গুমরে বাঁচে। অনেক কথা বলা হয় সাক্ষাতে, আসল কথা-ই থাকে না মাথাতে। কিছু পাওনা আজ রইল না পাওয়া কিছু দেনা শুধুই মেটাতে চাওয়া... অনেক স্মৃতি আজ মনের মাঝে জমল আসল স্মৃতি-ই কেবল চোখের জলে নামল। ছেড়ে যাওয়া নৌকা এখনো ফিরল না চলে যাওয়া মানুষটা এখনও এলো না। আমরা শুধু দেওয়াল লিখি ছলনায় তোমার কথা শুধু লিখব এইবার কবিতায়। রাস্তা আজো হয়নি শেষ এইটা জেনে রেখো আসছে জন্মে আবার দেখা হবে, তুমি দেখো
মাঝে মাঝে খুব আদর করতে ইচ্ছে হয় তোমাকে হঠাৎ করে চমকে দিয়ে, রান্নাঘরে এক মনে রান্না করছ, ঘেমে নেয়ে জবুথবু, পিছন থেকে যদি জাপটে ধরি, মাছের ঝোলের জন্যে হলুদবাটা দিই যদি তোমার গালে একটু লাগিয়ে, রাগল করলেও একটু কি আমায় জড়িয়ে ধরবে না? আমার গালে গাল ঘষে সেই হলুদ লাগিয়ে দেবে না ? কিংবা ধরো, ছুটির দিনে দুপুরে সবে খেয়ে একটু শুয়েছ, আমি পাখাটা দিলাম বন্ধ করে। গরমে তোমার নাকের ওপর ক্রমে ছোটো ছোটো হীরের দানা ফুটে উঠবে, আমি চুপিচুপি নাক ঘষে তাদের সঙ্গে প্রেম করব। রাগ করে কি তখন মুখ সরিয়ে নেবে ? মাঝে মাঝে পাগলের মতো আদর করতে ইচ্ছে হয়... যেমন আদর আর কেউ করতে পারে না কাউকে। মনে হয়, মাঝরাতে তোমায় ঘুম থেকে তুলে বলি চলো একটু ঝগড়া করি, তুমি ঢুলুঢুলু চোখে বিরক্ত হয়ে ঝগড়া করব না বলে, ঝগড়া করতে থাকবে, আমি তখন যদি আলতো করে গালে চিমটি কেটে দিই তখন, রাগ করবে ? নাকি আমাকে খামচে ধরে লুকিয়ে নেবে তোমার বুকে ? সত্যি বলছি, মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয়...একটু আদর করি তোমারও কি হয় ? ছেলেকে পড়াতে পড়াতে আড়চোখে আমায় দেখে একবারও কি মনে হয় না, ইস! বোকাটার গালে এখন একটু কামড়ে দিতাম যদি... কিংবা শীতকালের মাঝরাতে অঘোরে ঘুমোচ্ছি আমি তুমি ইচ্ছে করে গা থেকে কম্বলটা নিলে সরিয়ে যাতে ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে গিয়ে তোমাকেই জড়িয়ে ধরি। কোনোদিন সন্ধেবেলায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যদি বলি,এখন এসো তো বসে বসে গল্প করি, তুমি আটা-মাখা হাতে আমার কপালে আবির মাখিয়ে বলবে কি, একটু দাঁড়াও এক্ষুনি আসছি ? কোনোদিন ইচ্ছে করে চা-এ বেশি চিনি দিয়ে, আড়াল থেকে মিটিমিটি দেখবে কি, প্রথম চুমুকের পরে কেমন হয় আমার মুখভঙ্গি ? মাঝে মাঝে আমাদের খুব আদর করতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু কেউ কাউকে বলতে পারি না। বলতে গেলেই যত রাজ্যের ভুল-ভাল কথা বলে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়... আদর করা আর হয় না।
পথ ভুলে নাম না-জানা যে গ্রামে চলে গিয়েছিলাম বেশ কয়েক মাস আগে, কী করে এলাম জানি না, কী করে ফিরব জানি না এখন কী করব তাও জানি না। এমন সময় লাজুক কলাগাছের ছায়া থেকে বেরিয়ে এলো একটি মেয়ে, মুখে লাবণ্য ছেঁচা হাসি নিয়ে বলেছিল ও মা ! আপনি এইখানে ! তুমি কে ? আমায় চিনলে কী করে ? সংকোচে জানাই। চুলের বেণী দুলিয়ে বলেছিল- সে আপনি জানবেন না। আমাকে সেদিন সেই লাবণ্যে মাখা হাসি, তার বাড়ি চিনিয়েছিল, দুপুরে রান্না করে খাইয়েছিল। বিকেলে হাত ধরে ঘুরেছিল সারা গ্রাম,এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। সন্ধ্যের আগে বাড়ি ফেরার রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল আবার আসবেন তো ? আমাকে মনে থাকবে ? কুমারী কাজল পরা দুই চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম কী নাম তোমার বললে না তো ? দোয়েল পাখির মতো লজ্জা পেয়ে বলেছিল- পুতুল ! কেটে গেল বেশ কয়েকটা মাস, শহরের কালো হাওয়া খেয়ে। গতকাল বড়ো রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, ওপারের রাস্তা পেরিয়ে, একটা ছায়া এগিয়ে যাচ্ছে খুব চেনা চেনা ছায়া... চিনতে পারি এ সেই, আমার দেখা কলাগাছের ছায়া... ছুটে এগিয়ে যাই সংকোচ ভুলে ডেকে উঠি- পুতুল ! চিনতে পারছ? বলে। ছায়া মুখ ফিরিয়ে দেখে... সেই কাজল পরা চোখে,তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে- ভুল করছেন। আমি তো চিনতে পারছি না।
রঙিন খামের রং ফিকে হবে একদিন, একে একে ফিকে হব আমরা সবাই। অবুঝ কিছু দুঃখ ভুলব বলে ছুটে মরি, ভুলতে কি পারি ? নিজেকে ভোলাতে কি পারি ? যদি জিজ্ঞেস করো- কীসের দুঃখ ? আমি বলব- নিজেকে হারিয়ে ফেলার... শতছিন্ন হয়ে যাওয়া নিজের টুকরোগুলো খুঁজে মরি, সকাল থেকে রাত, মাস থেকে বছরে। যদি জিজ্ঞেস করো- কবে হল এত টুকরো ? আমি বলব- ২২ শে শ্রাবণ !