কবি স্বপনবরণ আচার্যের কবিতা
*
তুমি কি শুধুই নির্জনতার এককের গান গেয়েছ?
কবি স্বপনবরণ আচার্য  
পাঠ করেছিলেন শ্রীকান্ত আচার্য
অরুন্ধতী দেব কল্পিত ও নির্দেশিত, রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে, ১৮শে মার্চ ২০০৭
তারিখে কলকাতার নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত, সম্মেলিত হাজার কণ্ঠে
রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান “বিশ্বমনাঃ রবীন্দ্রনাথ” এর শুরু এবং শেষে, অনুষ্ঠানের সঞ্চালক
শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য এই কবিতাটি পাঠ করেছিলেন।


ইউটিউবে এই কবিতাটির আবৃত্তি দেখুন
এখানে ক্লিক করে . . .


অনুষ্ঠানের শুরুতে পাঠ . . .

তুমি কি শুধুই নির্জনতার এককের গান গেয়েছ?
তুমি কি গানের সুরনির্জন একাকিত্বের ভিতরে
আমাদের সব নির্জনতায় সঙ্গসুধার স্পর্শ ছড়িয়ে দাওনি?
তুমি আছ তবু নির্জন হ’য়ে কি করে?
রাতের আকাশে নক্ষত্রের একা জ্বলন্ত শরীরে
শুধু নিজে নিজে পুড়ে যাওয়াটাই শেষ কথা হতে পারে না
আমি একা তারা, তোমার আকাশে নির্জন হ’য়ে কি করে?
কি জানি, হয়তো নির্জনই ছিলে, একাকিই ছিলে এখানে
সমুদ্র আর আকাশের কোনো সঙ্গী থাকবে কি করে?
সেই দুঃখেই সূর্য-তপ্ত-সাগর আকাশে উঠে যায়
সেই দুঃখেই একাকী আকাশে, দলে দলে মেঘ জুটে যায়
তারপর,
তুমি অবিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গতা ঝাঁকিয়ে,
আমাদের মত বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা ঝরালে
আমরা তোমার একা আকাশের বহু সংখ্যক বৃষ্টি
আমাদের দিয়ে এককের গান একসাথে তুমি গাওয়ালে


অনুষ্ঠানের শেষে পাঠ . . .

সহস্র ফুল ফুটে উঠেছিল
সহস্র ফুল ঝরলো
ফুল ভাঙা সব পাপড়ি
তারা তো শেকড়েরই পায়ে পড়লো
তুমি অদৃশ্য, তুমি মূলগত, তুমি বিমূর্ত থাকলে
তোমার হাওয়ায় আমাদের গাওয়া গন্ধ মিশিয়ে রাখলে

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একটি চলাচলের
কবি স্বপনবরণ আচার্য
শ্যামলকান্তি দাশ ও বিমল গুহ সম্পাদিত
"হাজার কবির হাজার কবিতা" (২০০৪)
কাব্যসংকলন থেকে পাওয়া।


বৃষ্টি যখন থামে, তখন
কাপড় মেলার তার,
পেঁপেপাতার ডাঁটা, নিকট-
বর্তী কবিতার
প্রেরণাজল ফোঁটায়-ফোঁটায়
সাজায়। পেঁপের ডাঁটা
ডাঁটা তো নয়, বাঁশি! বাঁশির
ছিদ্রে ফোঁটা-ফোঁটা।

জলের আঙুল চাপা। হাওয়ায়
এক-এক ফোঁটা জল
একটা করে আঙুল সরে
বাতাস চলাচল
বাঁশির চতুর্দিকে। পেঁপের
শিকড় ডুবে আছে
গান-মেশানো জলে! যখন
বৃষ্টি থেমে গেছে।
এবং জলের শব্দ হচ্ছে,
জলের? শব্দ জলের?
সবুজ পাতায় হলুদ পাতায়
একটি চলাচলের।

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রেমিক ও উন্মাদের মগজে কল্পনার রং
আ! মিডসামার-নাইট্ স্ ড্রিম এর ট্রান্সক্রিয়েশন থেকে
কবি স্বপনবরণ আচার্য
আমার থিয়েটার-এর ফেসবুক পাতায় দেওয়া বিজ্ঞাপন থেকে নেওয়া। সেই পাতায় যেতে
নীচে ক্লিক করুন . . .  
https://www.facebook.com/aamartheatre/     


প্রেমিক ও উন্মাদের মগজে কল্পনার রং
ফুটতে থাকা কল্পনার উপচে ওঠা ঢেউ-
রূপকথা তৈরী করে। যুক্তি-বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে
ততটা বুঝবে না তুমি, স্বপ্ন দিয়ে ওরা যা বানায়!
কবিও পড়েন একই দলের! এই তিনটি মগজ,
মানুষের সবটুকু কল্পনার রঙিন উত্স!

প্রেমিকের প্রেম-কল্পনায়,
বাঁদরের বোঁজা চোখে হেলেন ঘুমায়!

কবিও পাগল, তবে কিছুটা শৈল্পিক।
চরম অস্থির দৃষ্টি মাটি আর আকাশের
সীমা ছুঁয়ে ছুঁয়ে---
ছুটোছুটি করে। তার কল্পনার অদৃশ্য শরীর
ক্রমশ মূর্তি পায়! হাওয়ায় ভাসতে থাকে মাটি।
কবি তার নাম দেন, সে-মাটির ঠিকানা জানেন!

জোরালো কল্পনার কল্পনায় সুখ দেখা দিলে ---
সুখের কারণটাও তত্ক্ষণাৎ হাতে চলে আসে!

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
জলসত্র
কবি স্বপনবরণ আচার্য
কবির “কুড়ি বছরের কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


পিসী বসেছিল দাওয়াতে
দারুণ তেষ্টা পাওয়াতে
কে-একটা লোক জল চেয়েছিল
কি-একটা মনে হওয়াতে।
বিধবা পিসীর বয়ে গিয়েছিল
যাকে-তাকে জল খাওয়াতে।
পিসী একটুও নড়েনি
কেননা খয়ালই করেনি
যে লোকটা জল চেয়েছিল, তার
চোখের পলক পড়েনি।
মরুভূমি চাটে বিধবা আকাশ
পিসী তো খেয়ালই করেনি!
খেজুরের বীজ বালিতে
মাথাচাড়া দিল অঙ্কুর
ক্রমে উদ্যানে বালি ঢেকে গেল
রসে মেঘ টই-টুম্বুর।
দাওয়া থেকে উঠে পিসী উঁকি দিল,
চলে গেল? কেন? কদ্দুর?
ও! মরীচিকা ভাবলে?
বুকের মাংস খাবলে

রক্ত চেখেও বুঝলে না? জল
পেতে আরেকটু নাবলে।
পিসী বসে থাকে দাওয়াতে
দস্যুকে জল খাওয়াতে
বুকের ভিতর আবডালে ফুল
ঝরে অশ্লীল হাওয়াতে।

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রৌদ্র
কবি স্বপনবরণ আচার্য
কবির “কুড়ি বছরের কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


রোদ যেখানে পড়েছে শুধু সেইটুকু নয়
রৌদ্র নিজেও দিচ্ছে দেখা
এ-গাছ থেকে ও-গাছ অব্দি ঢেউ খেলানো
হাওয়ার উপর রৌদ্র রাখা!

চোখের সামনে হাতের পাতার আন্দোলনে
রোদের উপর দাগ পড়ে যায়,
পরস্পরের টোকায় দুটে লম্বা ঘাসের
শরীর থেকে রোদ ঝরে যায়

হাত পেতে দাও, হাতের উপর রোদের গুঁড়োর
ক্ষুদ্র একটি পাহাড় রাখা!
রোদ যেখানে পড়ছে শুধু সেইটুকুই কি?
রোদ কি নিজেও দেয়না দেখা!

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ব্রাহ্মণ
কবি স্বপনবরণ আচার্য
কবির “কুড়ি বছরের কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


ছুটন্ত সাপের স্থিরচিত্রের মতো
সুস্পষ্ট বনপথ
পায়ের নীচ থেকে ছাড়া পেয়ে
গিয়ে উঠেছে পাহাড়ের উপর, তারপর
পাহাড় টপকে নেমে গেছে
ওইপাড়ে, চোখের আড়ালে।

সঙ্গমক্লান্ত আর্যযোদ্ধার তামাটে বুকের পাটা বেয়ে
উঠে গেছে তেজী ঘামে পোড়া পৈতা,
কাঁধ পেরিয়ে নেমে গেছে ওই পাড়ে, চোখের আড়ালে।
শুকনো পাতার উপরে
হাত ছড়িয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছে যুবক
সন্ধ্যা নামছে বিপুল আয়োজনে।

হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পাওয়া আশ্রমযুবতীটি
যুবকের নাভি থেকে কাঁধ অব্দি
উপবীতরেখা বেয়ে তার ঠোঁট নিয়ে গেল,
ফিসফিস করে ডাকল, তারপর
দ্রুতহাতে বাকল কুড়িয়ে নিয়ে
ঝড়ের পালকের মতো . . .

ওই ছুটে চলে যাচ্ছে পাহাড়ের উপবীত ধরে!

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভ্রমণকালে
কবি স্বপনবরণ আচার্য
কবির “কুড়ি বছরের কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


দুইটি উচ্চ উচ্চারণের চূড়ার থেকে যাচ্ছে দেখা
কিশোরীটির পেটের মতম নিস্তরঙ্গ উপত্যকা।
একটি শশব্যস্ত নদী
জলের ঘূর্ণীপাকটি যদি
এক মূহূর্ত থমকে যেত, নাভিটি তার চিত্রলেখা।
দুইটি উচ্চ উচ্চারণের চূড়ার থেকে যাচ্ছে দেখা।

সেই সুগ্ন্ধ নাভিকুন্ডে নিম্নাবর্তে চক্র আঁকা
নিস্তরঙ্গ উপত্যকায় একটি ঝিনুক উলটে রাখা।
জীবাশ্মটি থমকে ছিল
হঠাৎ শশব্যস্ত হল
পর্যটকের নখের টোকায় শিউরে উঠল উপত্যকা!
দুইটি উচ্চ উচ্চারণের চূড়ার থেকে যাচ্ছে দেখা।

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মাটিকে ছোঁয়ার
কবি স্বপনবরণ আচার্য
কবির “কুড়ি বছরের কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


মাটিকে ছোঁয়ার একটা নিয়ম রয়েছে বুঝলে
মাটিকে ছোঁয়ার
হাত আর পা আর আঙুলের চূড়া আর জিভের ডগায়
মাটিকে ছোঁয়ার
একটাই নিয়ম আছে। মাটি সেই নিয়মের
পদশব্দ ছাড়া
নিজেকে মাংসের সঙ্গে মেশাতে চায় না। মাটি
সে নিয়ম ছাড়া
নিজেকে ধমনী করে নিজেকে শিরার পাশে
রক্তের ভিতরে
রাখতে চায় না তাই এলোমেলো হস্তক্ষেপে মাটির মানুষ
মাংসের পুতুল হয়ে যায়!

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পুণর্বার
কবি স্বপনবরণ আচার্য
কবির “কুড়ি বছরের কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


আমিও তো যেতে চাই প্রাচীন গাছের কাছে। কিশোর বয়সে
যে গাছ দিয়েছে তার প্রথম বাদামী ছাল কিশোরীকে খুলে।
তারপর তিলে তিলে মিশে গেথে মেয়েটির সবুজ হাড়ের
ব্যঞ্জনাকে ঘিরে থাকা সোনালি মাংসের মতো চৈত্রের বাতাসে!
সেই গাছটির কাছে যেতে পারলে আমরা তার বাকল ছাড়িয়ে
দেখতে পাই আমাদের প্রপিতামহীর ত্বকে আদিপুরুষের
এখনও নখরচিহ্ন, সজীব, কুঠারাঘট এখনও ধ্বনিত
এখনও ঊরুর কাছে ক্রমবর্দ্ধমান বৃত্তে আঁকা হয়ে আছে
সে-ধ্বনিকম্পনরেখা। এখনও নখরাঘাতে তর্জনী ডোবালে
অভিজ্ঞ বাদামী ছাল থত্থরিয়ে কেঁপে ওঠে, এই সে কম্পন
যে কম্পন তপোবনে যেগেছিল পিতামহ ঋষিবুকের
আর্ষসঙ্গমের ঝড়ে! আমি সেই আর্ষকাম ধমনীতে নিয়ে
প্রাচীন গাছের ছাল খুঁটে তুলি, খুঁজে খুঁজে একটি গাছের
প্রাচীন গুঁড়িতে বসে দেখতে পাই, জেগে উঠছে স্নিগ্ধ তপোবন।

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পানীয়
কবি স্বপনবরণ আচার্য
কবির “কুড়ি বছরের কবিতা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


নেকড়ের পানীয় জল যে পুকুরে থাকে তার পাড়ে
কয়েটি অদম্য ঘাস হরিণ-করোটি গহ্বরে
নিশ্চিনেত বৃদ্ধি পায়। হাওয়া বৃষ্টিজল পায়। আলো
চোখের কোটরপথে ঘাসগুলি স্পর্শ করেছিল
তোমার মাথার মধ্যে যদি সেই ঘাস বেড়ে ওঠে
যদি দু’টো ঘাসফুল দু’চোখের মণিমধ্যে ফোটে . . .

বুকের ভিতর ছলছল করবে নেকড়ের পানীয়।

.                   ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর