যদিও সেদিন কিছু দৃশ্য ছিল চাঁদের শরীরে কিন্তু তেমন কোনো মুখ দেখিনি সেখানে শ্লথ গতিতে এগিয়ে চলেছিল মিছিল যে মিছিলের অগ্রভাগে ছিল রুনাই নামের মহিলা আর তাকে অনুসরণ করছিল পোষ্য জাম্বো I
ধৈর্য ধরুন মান্যবর ! আমি কোনো মহিলা বা জাম্বোর গল্প পাড়তে আসিনি গল্পটা ছিল রোদের সাথে এগিয়ে চলার রঙিন স্তব্ধতা আর কিছু ফুলহীন ফুলদানির I গল্পটা ছিল মানুষের ভিতরের অন্য মানুষের যার সামনে গোলাপ অপরাধী আর পাকস্থলীর শরীর বেয়ে জন্ম নেওয়া খিদের যে খিদের জন্য মানুষ এখন আর সবুজ ভালবাসেনা I মান্যবর বিশ্বাস করুন! সেদিন দেখেছিলাম রুনাই নামের মহিলার পোষ্য মানুষের থেকেও এগিয়ে গেছে অনেকটা I
ঠিক সেরকম পূর্নিমা চাঁদ ছিলনা বলে প্রজাপতির চঞ্চলতা দেখিনি সেদিন অবশ্য সেও তেমন ছিলনা যেমন হলে সে কবিতা হয়ে উঠতে পারত I
এযাবৎ ভাবনার দেওয়াল জুড়ে লিখে রেখেছি আমার অবিন্যস্ত টেবিলে জন্ম নেওয়া এমন সব শব্দের পাতুরি I এও জানি , আমার এইসব বেনামী শব্দদের কবিতার আঁতুর ঘরে প্রবেশ নিষিদ্ধ I
তবু আমার অন্য আমি এখনো চায় প্রখর অমাবস্যার শেষে কবিতার মত সুন্দর শান্তির সকাল ফিরে আসুক ভালবাসার পৃথিবীতে I
ভালো আছ এই আশা রাখছি I এখন রাত্রি দুটো, ডিউটি সেরে এই মাত্র বাঙ্কার থেকে তাঁবুতে ফিরলাম I তাঁবুর ভিতরে ক্ষীন আলো দিতে থাকা বাল্বের নীচে শুয়ে শুয়ে তোমার কথা মনে পড়ছে I সারাটা দেশের সবার মত তুমি মা ও আয়ুষ অবচেতনে I বেশ দেখতে পাচ্ছি , আয়ুষের নিষ্পাপ মুখ জুড়ে আমাদের স্বপ্নেরা খেলা করছে, ফটোতে বাবা ঠিক তেমনভাবেই স্থির হয়ে রয়েছে আর মা চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন হয়ত I আর তুমি! তুমি ঘুমের মধ্যে আমাকে ছুঁতে চাইছ I
প্রিয়তমা, বারামুল্লার এই মাইনাস টেম্পারেচারে আপেল বাগানে এখন নিঃসীম শুন্যতা I আমার নাকের ডগা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অবিরত, বিগত কয়েক ঘন্টা পরে ডিউটি শেষে তাঁবুতে ফিরে স্নো- বুট খুলে বড় আরাম বোধ করছি I পায়ের হাজা বড্ড কষ্টদায়ক বটে I আগুনের ধারেও যাওয়া যায়না , চামড়ায় পচন ধরে যাবার ভয় আছে I এখানে এখন ন্যাড়া আপেল গাছের ডালে পুরু বরফ জমে আছে I জানো চন্দ্রা প্রতিদিন সকালে দেখি পাট্টন রেলস্টেশনে তেমন কোনো যাত্রী থাকেনা তবু নিয়ম মাফিক ট্রেন প্রতিদিন থামে I ট্রেনের এই আসা যাওয়া দেখে বাড়ির কথা মনে পড়ে I কিন্তু জীবনটা এখন অন্য রকম হয়ে গেছে I সব ইচ্ছের পাহাড়ে বরফ জমে গেছে I কবিতার মত সকালগুলো কেমন যেন ছন্দহীন হয়ে পড়েছে I আমার ফরটি সেভেনের ব্যারেল রক্তপিপাসু হয়ে উঠলে আমিও অমানুষ হয়ে উঠি I বাঁচার লড়াইয়ে মেতে উঠি I তবু এই লড়াই থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে কবিতা লিখি এখনো I ওই যে ভালো থাকার অভিনয়টা এখনো করে চলেছি। নিজের মধ্যে একটা অন্য আমি-কে বাঁচিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস করে চলেছি I
প্রিয়তমা জানো, গতকাল মাঝ রাত্রে টেন্টের রুফে জমতে থাকা বরফ সরাতে সরাতে হঠাত দেখি দুরের পাহাড়ের টিলায় জমে থাকা বরফের উপর চাঁদের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে ঠিক যেন রুপালি ঘোমটায় নববিবাহিত তুমি I আকাশের গায়ে তখন এক থালা দুধের মত চাঁদ ঠিক যেন আমার দেশ আর দুধের মাঝে পড়ে যাওয়া একটা মাছি ঠিক যেন ভারতবর্ষের বুকে কাশ্মীর I
চন্দ্রা, সংসারের সব দায়িত্ব তোমার কাঁধে দিয়ে যথেষ্ট ভারমুক্ত হয়েছি বটে কিন্তু কোথাও যেন মনে হয় বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে তোমাকে একলা ফেলে দিয়েছি I নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয় I প্রতি ছুটিতে গিয়ে তোমার হাসি মুখ দেখি, কিন্তু আমার চোখে বার বার ধরা পড়ে কত নিপুন ভাবে তুমি লুকিয়ে রাখো আমিহীন দিনগুলোতে তোমার চিবুক বেয়ে গড়িয়ে যাওয়া জলের চিহ্ন I জানি এই দিনগুলো আর ফিরে আসবেনা, ফিরে আসবেনা এই যৌবন বেলা, এর জন্য পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও I খুব জানি এই এতদূর পড়তে পড়তে তোমার চোখ বেয়ে জলের ধারা বইছে এতক্ষণ , কিন্তু দূরত্বের মাঝে আমাদের এই প্রেম ভালবাসাই তো আমাদের অপেক্ষার প্রহর গুনতে সাহায্য করে I অপেক্ষায় ভালবাসা আরও রঙিন হয়ে ওঠে I ভালো থেকো তোমরা, আয়ুষ আর তোমার জন্য ভালবাসা রইলো, মা কে প্রনাম জানিও I
তুমি আসবে বলে হাসিমুখে এখনো কষ্টের মাঝেও গোলাপ দেখি I তুমি আসবে বলে বিদ্রোহী হয়ে স্রোতের বিপরীতে বৈঠা বাই I তুমি আসবে বলেই আমার এই দীর্ঘ অপেক্ষা তুমি আসবে বলেই আমার এই পথ চলা তোমার বুকের সাড়ে হাত জমির দখলে আমার এই আজীবন সংগ্রাম ! জানি , বসন্ত জুড়ে তুমি আসবে যেদিন সেদিন সব রক্তদাগ মুছে আমিও দেবশিশু হয়ে উঠব I
শীতার্ত সকালগুলোকে সরিয়ে রেখে এগিয়ে যাই কিছু ধ্বংসস্তুপের ভগ্নাবশেষ আর মননশীল দিনযাপন বাদ দিলে এখনো আমার ভ্যালেন্টাইনকে তেমনই দেখি কোথাও মরুভূমি আবার কোথাও অরন্যে ঘেরা সে যেন এক চির যুবতীর প্রশস্ত কেশ বিন্যাসে আলোকিত সংসার I
জানি তোমার অনন্য রূপের বর্ণনায় কবিতার ক্যানভাসে এই কালো হরফ যথেষ্ট নয় আমি এও জানি , একমাত্র তোমার জন্য একটা জীবন যথেষ্ট নয় I
হে প্রিয়তমা , অনন্তকাল তোমার ভ্যালেন্টাইন হয়ে থেকে যেতে চাই , তাই তোমার বুকের উপর আমার জন্য নির্ধারিত রেখো সাড়ে তিন হাত জমি I
বাগানের ফুলের কথা বলতে গিয়ে প্রিয় মুখের কথা মনে পড়ে যায় সময়ের টুকরোগুলোকে সাজিয়ে দেখি তুমি আছ আজও সেরকম শুধু সময়ের কাছে ক্রীতদাস হয়ে বদলে গেছে আমার দৃষ্টি আর গেরস্থের ভিটেতে সূর্যের অত্যাচারে চাপা পড়ে গেছে আমাদের হাসির মুহুর্তেরা I
এসো এই প্রেমের মাসে স্বপ্নভুক পাখি হয়ে উঠি এসো ভালবাসার তরঙ্গে ভেসে যাই চোখে চোখ রেখে ভালবাসার পৃথিবীতে কুড়িয়ে রাখি কবিতার মত সুন্দর যা কিছু সব .....
আমরা কেউই আর ভালো নেই ! ভালো থাকার লড়াইয়ে টিকে আছি শুধু এই ভেবে যে , একদিন ভুঁয় যশের মুকুট খসে পড়বে খসে পড়বে ভুঁয় ভালো মানুষের মুখোশ স্বেচ্ছায় নির্বাসিত সূর্যকে ফিরিয়ে আনা হবে ঘুমন্ত রাজপথ থেকে অপসারিত হবে হায়নার দল I
আমরা কেউই আর ভালো নেই ! ভালো থাকার শেষ লড়াইয়ে টিকে আছি শুধু এই ভেবে যে , একদিন স্বপ্নময় ঘুমের ভেতর থেকে জেগে উঠবে একটা আস্ত মানুষ I
ছায়াময় তাবৎ অঞ্চল পেরিয়ে আলোর মুহুর্তে পৌঁছে দেখি , বেবাক স্মৃতিময় মুহুর্তের বাঁধ ভেঙ্গে এখনো তাকিয়ে আছ অমনি ভাবেই I
সেদিনের জ্যোত্স্নার রেশ মুছে যাবার পর থেকে আমি আর দুর্বল হয়ে উঠিনা অনঙ্গ শরীরের জটিলতা কাটিয়ে উঠি অনায়াস I তাই তোমার দৃষ্টির সুশীতল শৈলচন্দ্রিমা আমাকে আর প্রভাবিত করেনা তবু কেন নিথর সময়ের গায়ে একক প্রজাপতির মত এই দৃষ্টিলেপ I
বল হে মানবী , এ কি অপেক্ষা তবে ? না কি , ক্ষতের হিসেব গুনে দেখে নেওয়া !
জানিস অর্পিতা ! বাতাসের স্বরে স্বরে জীবনের পঞ্চপ্রদীপ জ্বালতে জ্বালতে জানতে পেরেছি , মেঘেরও ছায়া হয় ঠিক যেমন তুই ছিলি আমার ছায়া I জানতে পেরেছি , তোর গলার আওয়াজের মতন শ্লোকেরও আছে নরম কোমলতা I
জানিস অর্পিতা ! গোধুলি বেলার ঘ্রান নিতে নিতে আজ চব্বিশ বছর পর মনে হলো রোল কল হলো , তেলচিটে বেঞ্চে আবার বিনুনি বেঁধে তোকেই দেখলাম I
জানিস আর্পিতা ! অনেকদিন হলো ঝিঁঝি পোকার ডাক শুনিনি টিফিন বাক্স গুছিয়ে আসছি বহু বছর ধরে কিন্তু আমার জন্য কেউ টিফিন বাক্স গুছায়নি I আজ চব্বিশ বছর পর তোকে পেয়ে মনে হলো অতিশয় জীর্ণ গাছের শুকনো ডালে শরতের মাধুরীতে ফুটে উঠছে নরম শিউলি আকাশের সামিয়ানার নীচে মাটিটাও অনেক নরম হয়ে গেছে I
জানিস আর্পিতা ! আজ তোর অর্পিত ভালবাসার স্তবকে বিন্দু বিন্দু স্মৃতির সমবায়ে হারিয়ে গেলাম ঠিক চব্বিশ বছর আগের বিকেলে I
নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনের ওয়েটিং হল ....নিউ দিল্লি ...০১/১০/২০১৮