কবি আর্যতীর্থর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি আর্যতীর্থর পরিচিতির পাতায় . . .

সুভাষ
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

পদাতিক, কেন কেউ হাঁটবে মিছিলে?
তিক্ত সে সত্যকে ফেলা যাক গিলে,
ইচ্ছেরা চলে গেছে কায়েমী থাবায়,
মানুষের দাবীগুলো মানুষই দাবায়।

এসব এখন কোনো কবিকে ভাবায়?

ভাবায় না, কবি আজ মঞ্চে আসীন,
মঞ্চরা যথারীতি রাজার অধীন।
স্বভাবত, বাঁধা আছে অনেক উঁচুতে
মাটি লাগা হাত তাকে পারবেনা ছুঁতে।

নাকি কবি অপারগ নামতে নিচুতে?

আসলে কবি যে কে, ভুলে গেছি তাই।
পিছু থেকে হাঁক শুনে ‘পা চালিয়ে ভাই!’
ঘুরে দেখি বলছে যে, চিনিনা তাকে,
কবি নয় নিশ্চিত, তারা সভা আলো করে থাকে।

তাহলে ও কে, চলেছে কে মানুষের ঝাঁকে?

ওকে চিনবে না। আধুনিক যুগে ‘রেট্রো’,
স্টেশনে লিখেছে নাম শুধু মেট্রো।
বাকি সব? ভুলে যাওয়া, বঙ্গীয় ট্র্যাডিশন মেনে
কাগজে বারুদ লেখা ছিলো যার মৃত্তিকা ছেনে।

ফুল ফুটুক না ফুটুক, সে পাগল মানুষকে চেনে . . .

*********************









*

কফিহাউস
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

সেই সাতজন থাকতো যদি কফিহাউসের আড্ডাতে
থাকতো এখন ঠিক খবরে পড়তো না কেউ গাড্ডাতে
প্যারিস থেকে নিখিলেশের এক্সহিবিসন আসতো দেশে
মান্না এবং অমল সেটা দেখতে যেত কাজের শেষে
আসছে কবে তারিখটা সে জানিয়ে দিত ফেসবুকেতে
হয়তো তখন যেত তারা CCD তে কফি খেতে
সুজাতাটাও হাজির হত বরের সঙ্গে মার্সিডিসে
বুটিক থেকে সদ্যকেনা সব্যসাচীর design piece
আর্ট বোঝাটা অদরকারী কিনত ছবি নিয়ম করে
নিখিলেশের দুটো ছবি ঠাঁই পেত তার বসার ঘরে
মইদুল তার ব্লগেতে রোজ লিখত খবর ঢাকার থেকে
মৌলবাদী চোখ রাঙাতো মুক্তমনের বিচার দেখে
প্রদর্শনীর খবর পেয়ে আসতো সেও কলকাতাতে
বন্ধুগুলো একসাথে সব সাউথ সিটির মল মাতাতে
অমলটারও পদ্যগুলো নিজের ব্লগেই ছাপা হত
বিশ্বজুড়ে রসিক পাঠক তার কবিতায় মন রাঙাতো
ক্যানসার তার কেমো পেয়ে পালিয়ে গেছে শরীর থেকে
নতুন কোনো পদ্য শোনায় আবার বসা কফির ঠেকে
রমা রায়ের পাগলামিটা ওষুধ খেয়ে এখন ভালো
চাকরি ছেড়ে করেছে সে একটা নতুন নাটকদলও
নিখিলেশের আসার খবর মোবাইল কৃপায় আগেই জানা
আড্ডা দিতে আসত সেও মহড়াটায় সেদিন মানা
ছজন মিলে কফি নিয়ে বসতো যখন একটা কোনে
ডিসুজাটার গিটারখানা স্মৃতি হয়ে বাজতো মনে
নির্বাক সেই বাঙ্ময় বুক স্মৃতির থেকে আনতো তুলে
ভুলে যাওয়া কবরখানি পড়ত ঢাকা গোলাপফুলে।
..........................................................................
সেই সাতজন এখনো বন্ধু আছে
দিব্যি রয়েছে দেখো মিলটা
সময়ের সাথে সাথে আড্ডাটা বদলায়
পাল্টে গিয়েছে টেবিলটা
কফিহাউসের থেকে আড্ডাটা সরে গেছে
এখন রয়েছে নেটদুনিয়ায়
পুরোনো সে ফুলগাছে ফুটছে নতুন কুঁড়ি
মালির ঠিকানা শুধু পাল্টায় . . .

*********************









*

আলোর খোঁজে
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

নতজানু হবো বলে চরণ চলেছি খুঁজে বহুকাল ধরে।
এমন মানুষ কোনো, যার ছোঁয়া আলো দেয় ভিতরে বাহিরে।
মেঘহীন আকাশে অসংখ্য তারার মতো যত উপাসনাস্থল,
কম্পাসকাঁটার মতো দ্ব্যর্থহীন লক্ষ্য নিয়ে অনড়, নিশ্চল,
সেখানে খুঁজেছি আমি; পুরোহিত মৌলবী পাদ্রী বা ভিক্ষু শ্রমণ,
আলোর দিশারী হয়ে যে পথে বলেন তাঁরা করতে ভ্রমণ,
সেপথে ল্যাম্পপোস্টরা জ্বালে শর্তসাপেক্ষে বড় একরঙা আলো
ভিবজিওরের মাঝে সকলের দাবী নাকি তাঁর রঙই ভালো।
খুঁজেছি নিরীশ্বর জ্ঞানীদের ভিড়ে, যেখানে যুক্তিই প্রভু।
কোথায় কুসংস্কারী কুয়াশায় ঢেকে গিয়ে আলো নিভু নিভু,
সেকথা বোঝান তাঁরা অতীব বিশদে। কোন পথে সভ্যতা গেলে,
অবারিত আলো এসে পাহাড়ী ঝোরার মতো ঝংকার তোলে,
সমবন্টন আর সমদর্শীতা নিয়ে সারগর্ভ বক্তৃতা শেষ হলে পরে,
দামী গাড়ি চেপে দেখেছি ফেরত যেতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সজ্জিত ঘরে,
সুতরাং ওই পথ মাড়াইনি আর। কোন পথে দেবো এই মন অঞ্জলি,
ধার্মিক ও জ্ঞানীদের মাঝে খুঁজে মেলে কিছু তত্ত্ব কেবলই,
মানুষ মেলে না। হঠাৎই খেয়ালী এক ঝোড়ো হাওয়া এসে,
ফিসফিস করে বলে, আহম্মকের মতো গিয়েছো হে ফেঁসে
ভুল পথে। আলো যারা দেয় তারা কেউ ওদিকে হাঁটতে যায় নাকি?
সূর্য খুঁজছো কেন, জীবন তো আলো করে একঝাঁক নামহীন নীরব জোনাকি!
যে চাষী বছর ধরে তোমার টেবিলে দেয় ভাত রুটি ডাল,
তাঁতি, মুচি, মেথর আর কাজ করা মাসী, সকলেই জেনো সেই আলোর রাখাল।

জ্ঞানীগুণীর কাছে আলো পেতে কেন আর যাই অকারণে,
রোজ নতজানু হই এ জীবন আলো করা অখ্যাত অনামী চরণে।

*********************









*

রাধার প্রেম
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

রাইকিশোরীর গাল ধুয়েছে কাজলধোয়া জল
রাখালরাজার মন ভেজাতে ওইটুকু সম্বল।
চোখের জলে ঝাপসা দেখায় বৃন্দাবনের ঘাট
একলা পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে হোরিখেলার মাঠ।
কদমগাছে ফুল ধরেনি পাতাও ধুসর হোলো
শিখির পালক কোনায় পড়ে চক্ষু ছলোছলো।
প্রেমের রাজার রাধার থেকে উঠে গেছে মন
অন্য দেশের রাজা হবেন, বিদায় বৃন্দাবন।
রাইকিশোরীর কিশোরী মন রাজনীতি কি বোঝে
ধুরন্ধরের শুকনো চোখে পুরোনো প্রেম খোঁজে।
কানাই এখন শ্রীবাসুদেব মথুরাপুরের রাজা
আর হবেনা তাঁর দ্বারা ওই কিশোর প্রেমিক সাজা।
প্রেম ছিলো তার খেলার মতন খেলার সাথী রাধা
রাজনীতিতে এখন সে প্রেম মস্ত বড় বাধা।
মনচুরানো কদমতলায় রাই থেকে যায় একা
ক্ষমতা নেয় প্রেমের বলি, এখান থেকেই শেখা।
কিমাশ্চর্যম, কেউ যখনই প্রেমের কাব্য ভাবে
রাধাকৃষ্ণ প্রেমের যুগল ঠিকই এসে যাবে।
রাই যে ছিলেন প্রেমের স্বরূপ সন্দেহ নেই তাতে
সে প্রেম ছিল কৃষ্ণমনেও? সন্দেহ সেটাতে।
মথুরাধীশ একলা কই, ছিলেন সাথে রুক্মিণী,
সত্যভামা ইত্যাদিতেও নারীসঙ্গ পান তিনি।
রাইকিশোরীর কান্ড দেখো, কৃষ্ণপ্রেমে দেন জীবন
জগতপতি প্রেমিক হলেও তার ভাগে সেই বৃন্দাবন।
রাধা বিলীন কানুর প্রেমে, সম্মানে তার তাই বোধহয়
রাধার পরে কৃষ্ণ বসেন, কানুর পরে রাধা নয়।

*********************









*

তেইশে জানুয়ারী
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

ধর্ম যখন সর্বনাশা, লকলকানো বিষফলা
কর্ম যখন তাঁবেদারি, সময় যখন নিষ্ফলা,
আপোষ যখন ঢুকে গেছে নিত্যদিনের অভ্যাসে
এমনতর আঁধারকালে সুভাষ বোসের মুখ ভাসে।

বেদীর ওপর মূর্তি গড়ে গদগদ ভাষণে
আমরা বাঁধি নেতাজীকে পুজোর অনুশাসনে
ওটাই সহজ, প্রতিবাদে বড্ড জেনো দম লাগে
গড্ডলিকায় ভেসে যেতে শ্রমও অনেক কম লাগে।

থামাবে কোন শত্রু বলো বাঁধনভাঙা বন্যাকে
নিজের পথে যাওয়ার যদি ধনুর্ভাঙা পণ থাকে
সুভাষ তোমার জন্মদিনে বিধির কাছে ভিক্ষে চাই,
আর কিছুনা, যেন অমন স্বপ্ন দেখার সাহস পাই

*********************









*

কর্ণ
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

রথের চাকা যুদ্ধের সময় বসে যাবে আমি আগেই জানি তা।
এও জানতাম, আমার তাবত আয়ুধ কেড়ে নেওয়া হবে পুরোনো হিসেব মেটাতে।
আমার শত্রুর হাতে রোজ খুন হয়ে দিকে দিকে জ্বলে ওঠে ভাইয়েদের চিতা,
তাবত কাজের সাফাই হিসেবে স্বয়ং শাসক রয়েছেন তার হাতে।

সূর্যের আদিমতায় জন্ম হয়েও রাষ্ট্রের কাছে আমি আজ অন্ত্যজ।
অরণ্য পর্বত নদী উপত্যকার নামে আমি বহুবার চেয়েছি আমার অধিকার।
ওরা দেয়নি।
অপ্রাপ্য অপমানের ক্রোধে জীবন জ্বালিয়ে আমি নিজেকেই বলেছি ‘পরিচয় খোঁজো।’
ওরা আমাকে বিদ্রোহীর তকমা দিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করেছে বারবার।

আমার পেছনে অযুত গাছের দল হেরো কৌরবসেনার মতো দাঁড়িয়ে আছে ঠায়।
এদিকে ওদিকে ছিটিয়ে আমার সঙ্গীদের লাশ, পান্ডবপক্ষের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত।
আমার অস্ত্র নেই, অজস্র অর্জুন কারবাইন উঁচিয়ে ক্রমেই ঘিরে ধরেছে আমায়,
তাদের লক্ষ্য স্থির, আমার কবচকুন্ডলহীন দেহ ঝাঁঝরা করবে বলে আঙুল ট্রিগারে উদ্যত।

এ যুদ্ধে জয় নেই, সেটা জেনেই যুদ্ধে নেমেছি, সুতরাং মৃত্যুতে নেই আফশোষ।
প্রথম কার্তুজটা হৃৎপিণ্ড ফোঁড়ার আগে একবারই শুধু চেঁচিয়ে উঠলাম ,
‘অর্জুন, তোরা সক্কলে কিন্তু আমার ভাই হোস!’

*********************









*

হাসির মুখোশ
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

তোমার কাছে আসার আগে,
আলতো হাসির মুখোশ পরি,যেমন তোমার ভালো লাগে ।

রঙচটা এই জীবন ভারী বিশ্রী ঘেমো,
বলতে বাধে কন্যা তোমায় , এই কাদাতে সঙ্গে নেমো।

খুব নিরালায় বসে পাশে,
ফাগুনমাসের গল্প শোনাই, যেন রোজই বসন্তকাল খেলতে আসে।

মুখোশটাকে সাজিয়ে রাখি সুখের রঙে ,
কল্পলোকের মিথ্যে খুঁজে, গরম ভাতের গল্প বলি অন্য ঢংয়ে।

ঠিক সে সময় একটু দূরেই,
আমার বাড়ির শূন্য হাঁড়ি, ফিরলে পরে শুনতে পাবো ‘ভাত কিছু নেই’।

রাতজাগা সেই খিদের খবর,
সে ভাবনাতে কবর দিয়ে, মুখোশ বলে তোমায় গিয়ে ‘প্রেমিক হবো’।

তারপরে হয় তুফান ঠোঁটে ,
চিরন্তনের গল্পগাথা নকশিকাঁথার ফুলকারিতে আপনি ফোটে।

তোমার গালের লালের আভা,
মুখোশ ফুঁড়েই করায় মনে, ভুল হবে খুব এ প্রেমটাকে মিথ্যে ভাবা।

বস্তুত তো এটাই বাঁচায়,
মুক্ত আকাশ তুমিই আমার, বাকি সময় শেকলবাঁধা বাস্তবিকের রুক্ষ খাঁচায়।

আমার মাটির খন্দ এত,
মুখোশখানা সরাই যদি, অমনি তবে তেলচিটে এক গন্ধ যেতো।

ঢাকছি রোজের যাপনক্ষত,
পড়বো ধরা যে কোনোদিন, ঝুটো আলোয় করছি আঁধার ভবিষ্যতও।

হালকা করে মনের কোণায়,
ফিরতি পথে পা বাড়ালে, একলা হবার ফুরসতে এক ধন্দ ঘনায়।

সত্যি তুমি বোঝোনা কি,
প্রেম ছাড়া আর বাদবাকিতে শূন্য লেখা, আজন্মকাল হাসির ঘরে মস্ত ফাঁকি?

হঠাৎই এক সন্দেহে হয় মন উচাটন, আমিও যদি জানতে পারি,
তুমিও হাসির মুখোশ পরো আমার মতন?

*********************









*

পদবী
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

‘এই যে দাঁড়াও। তোমাকে প্রায়শ দেখি এদিকে ওদিকে যাও।
সকলে তোমার সাথে খানিক দাঁড়িয়ে দেখি সময় কাটায়।
আমারও লাগছে যেন খুব চেনা চেনা..
আজ তাই ডেকেছি তোমাকে, পরিচয় না দিয়ে যাওয়া চলবেনা।’

‘সকলের চেনা বটে, ফেরি করে ফিরি। মানে ফেরিওয়ালা।
বেশভূষা দেখে ধনী ভেবে বসে লোকে, আদতে ভিখিরি।’

‘ফেরিওয়ালা? হাঁকতে দেখিনা তো তোমায় কখনো? ঝাঁকাতে কি আছে?
হাঁকুপাকু করে লোক কি পেতে ভিড় করে আনাচে কানাচে?
কেউ হেসে গলে যায় , কেউ কেঁদে চলে যায়, ছ্যা ছ্যা করে ফেলে দিয়ে ফের ফিরে আসে,
কি বেচো হাতিঘোড়া, জনতা লেপটে যাতে ঘোরে আশেপাশে?’

‘ঝাঁকায় স্বপ্ন থাকে, নানা ভুল ঠিক, কিছু তার মাটিছোঁয়া, বাকিটা অলীক।
আশাদের মই আছে, হতাশার ফাঁস, পাগলামি, খুনসুটি, দীর্ঘশ্বাসকে ছেঁচে পাওয়া নির্যাস।
আরো কত কি যে আছে আমিও কি জানি, যে যেমন দাম দেয় তেমনটা আনি।’

‘কি বেচো সেটা তুমি নিজেই জানোনা?
তাহলে তো এইসব বৃথা আলোচনা..
কেউ দেখি তোমাকে পথে পথে খোঁজে,
কেউ নাম শুনলেই কানে তুলো গোঁজে।
কেউ বলে ঠকাও না, যেমন মূল্য দেয় সেরকমই পেয়ে থাকে ক্রেতা,
আবার শুনেছি তুমি ধূর্ত চালাকি করা পাকা অভিনেতা।’

‘আমি অত জানিবুঝি নাকি?
যার যা চাহিদা হয় আমার সাধ্যমতো তাই দিয়ে থাকি।
চালাকির চোটে কেউ আমাকে ঠকালে,
কিংবা অচল সিকি দিয়ে চমকালে,
সেটাও তো মেনে নিই, মেনে নিতে হয়,
শতাংশে একশোই ভালো ডিল পেয়ে যাওয়া বাস্তব নয়।’

‘তবুও তোমাকে খুব চেনা চেনা লাগে,
মোলাকাত কোনোকালে হয়েছে কি আগে?
এই দেখো, কত কথা, নামটা করিনি ভুলে এখনো জিজ্ঞাসা..’

‘আসলে তো ফেরিওয়ালা, তাই গোলমাল।
পোশাকি নামটা চেনো.. আমি ভালোবাসা।’

‘ভালোবাসা? দাঁড়াও, দাঁড়াও, ওইজন্যই লাগে চেনা চেনা এত,
চারদিকে তোমারই তো পোস্টার, গল্পে ও কবিতায় তুমি বিখ্যাত।
পদবীটা কি যেন, বলেছিলো কানে কানে যুগের বাতাস..
এই তো পড়েছে মনে পুরো নামখানা, ‘ ভালোবাসা দাস’’

‘ভুল! ভুল! একই ভুল কেন করো তোমরা বলো তো!
কোনোকালে পদবীতে দাস লিখি না তো, তবু বারবার,
আমার নামের পিছে দাস এসে লাগে,
মনে হয় সব ভাঙি মাঝে মাঝে রাগে!’

‘দাস নয়? তাই তো বলে থাকে লোক গলাবাজি করে,
ভুল জানি পদবী কি এতদিন ধরে?
তাহলে সত্যি কি? কোন নাম ঠিক বলো, সেটাকেই বলা তবে করি অভ্যাস..’

‘আর কত চিল্লিয়ে বলবো বলো তো, নামটা আমার।
শুনতেই চাও যদি বলছি আবার, দাস নই কোনো কালে, আমি বিশ্বাস।
ভালোবাসা বিশ্বাস, এটা পুরো নাম।
দেরী হয়ে গেছে খুব, মেলা কাজ পড়ে, এবারে বিদায় দাও, আমি চললাম!’

*********************









*

ওহে একলব্য
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

বুড়ো আঙুলটা সামলিয়ে রেখো, একালের কথা শোনো,
অঙ্গুষ্ঠটি তাঁর হাতে যাবে , সেটা চাইবেন দ্রোণ।
হয়তো তোমাকে বলবেন উনি, ওনাকেই মানো গুরু,
তবু যদি সেটা মুখে বলে দাও, সেটাই শেষের শুরু।

আসলে কি জানো, প্রতিভা যখন নিজে খুঁড়ে নেয় পথ
দ্রোণ’রা দেখেন এগোতে দিলেই আঁধার ভবিষ্যৎ।
ওনার কোচিংয়ে যারা সেরা হয়, তারা তো বিজ্ঞাপিত,
গুরুহীন কেউ অতটা এগোলে কে আর শিক্ষা নিতো!

আজকাল কেউ একাকী শেখে না, যুগ বড় অগ্রণী,
সফল হলেই কোচিংয়ের নাম, অথবা কি প্রকাশনী
তুমি তো নিজেই পড়ে সেরা হও, সরল গ্রাম্য ছেলে,
দ্রোণের কোচিং লাটে উঠে যাবে খবর বাইরে এলে।

সেরার খবরে দৌড়িয়ে আসে তাবত ছাত্রশালা,
‘বলে দাও তুমি আমাদেরই লোক’ অনুরোধে ঝালাপালা।
যদিও তোমার স্বাভাবিক মেধা , নিজেই চুড়োয় ওঠো,
শোভা পাবে ঠিক কোচিংয়ের অ্যাডে ছাত্র হিসেবে ফটো।

অমুক কোচিংয়ে ডাক্তার হয়, তমুকে ইঞ্জিনিয়ার,
দ্রোণ খুলেছেন নানাবিধ নামে শিক্ষাবিপণী তাঁর।
অঙ্গুষ্ঠটি তাঁর কাছে দিলে, সে খবরে বাজে ঢাক,
তোমার ছবিতে পরের ব্যাচের কোর্স ফি’স বেড়ে যাক।

হয়তো তোমাকে উৎসাহ দেন শিক্ষক গ্রামস্কুলে
বিজ্ঞাপণের চটক আড়ালে সে নামটি গেছো ভুলে
শিক্ষা এখন আলু পটলের মতন পণ্য দ্রব্য,
তোমার মগজ ওরা কিনে নেয়, বুঝেছো কি একলব্য?

আঙুল কেটো না, লেখা শুরু হোক তোমার নতুন কাব্য।

*********************









*

ক্যাপ্টেন
কবি আর্যতীর্থ
মিলনসাগরে প্রকাশ ২৯.৩.২০১৯।

‘এ জাহাজ ডকে উঠে গেছে।
সারাই হবে না আর, ভাসবে না জলে।
ভাঙা মাস্তুল আর অক্ষম ইঞ্জিনে, পুরোপুরি চলে গেছে বাতিলের দলে।
ওহে ক্যাপ্টেন! লগবুক স্তব্ধ হয়েছে।
রোজনামচায় আর অক্ষ-দ্রাঘিমা ঘিরে রোমাঞ্চ নেই,
বিস্ময়হীন হয়ে অতীত ‘এখন’ ছুঁয়ে যাচ্ছে ভাবীতে।
সামনে দেখো, ওই পথে বাঁক নিলে বন্দর পাবে,
নবীনেরা প্রস্তুত ঢেউয়ে পাড়ি দিতে।
এ বুড়ো জাহাজে আর দম নেই নেভা চিমনির মুখে,
খামোখা দাঁড়িয়ে থেকে একা একা ভোগো কেন স্মৃতির অসুখে,
কিছুটা নাবিক দেখো এখনও রয়েছে পড়ে তোমার ভেতরে,
ক্যাপ্টেন, সাগরে ফিরতে পারো নতুন জাহাজে, শুধু যদি পা রাখো ফের বন্দরে।’

‘এ জাহাজ জং ধরা আজ, ডেক জুড়ে ছিলো যত বাহারের কাজ,
সবই কামড়ে খেয়ে নিয়েছে সময়,
রেলিংয়ের চিকন বাহার কবেই পড়েছে খসে.
ঝকঝকে তকতকে কামরাগুলোয় থিতু আঁধারের বাস,
ইঞ্জিনঘরে ভাঙা কব্জাতে ঢুকে, বিষণ্ণ সুর তোলে বিদায়ী বাতাস।
ভাসার আশা না থাকা জাহাজের বুকে,
ওহে ক্যাপ্টেন এখনও ঘুরতে থাকো কি ধনের লোভে?’

‘হে অর্বাচীন যুগ, শোনো নি কি ক্যাপ্টেন জাহাজের সাথে তার ডোবে?’

*********************