কবি আর্যতীর্থর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি আর্যতীর্থর পরিচিতির পাতায় . . .

। অপ্রেমিক।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১১.৭.২০২১

তুমি ভালোবেসেছো তা জানি, ক্ষমা করো, আমি ভালোবাসতে পারিনি।
প্রয়াস যে করিনি তা নয়, ভান করে গিয়েছে সময়, তবু কাছে আসতে পারিনি।
এ তোমার দোষ নয়, তলিয়ে ভাবলে বুঝি হয়তো বা নয় তা আমারও,
কার সাথে পথ চলা প্রেম বলে মনে হবে, সে ব্যাপারে হাত নেই কারো।
ভালোবাসা দুরূহ আবেগ, নিবেদন ও অধিকার নিশিদিন যুযুধান থাকে,
যাকে ভালোবাসি বলি, নিহিত শর্ত থাকে, সেও ভালোবাসবে আমাকে।
সীমাহীন ভালোবাসা কিভাবে হিংস্র হয়ে জিঘাংসা হতে পারে
গৃহীত না হলে,
সকলেই কম বেশি জানে সে কাহিনী। শুরু তার বহুবারই
দাবীহীন বলে।

এক মানে এই নয় তুমি ভালোবেসে দোষী, আমিও করিনি কোনো ঠকানোর ছক,
যদিও ভালোই জানি, ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা শেষে এই ছুতো দিতে চায় সব প্রতারক।
সেই অভিযোগ তিরে বিদ্ধ হতেই পারি, ভালোবাসা ভুল হলে কবে আর রাখে ক্ষতহীন,
সে ক্ষতি স্বীকার করে তবুও বলতে চাই, তোমাকে বাসিনি ভালো আমি কোনোদিন।
ভালোবাসা বলে যেটা ভ্রমবশে ভেবেছো, প্রচেষ্টা ছিলো যে তা প্রেম ফিরাবার,
এত ভালোবাসা পেয়ে তবু কেন এরকম আমি, জানিনা সত্যি আজও জবাবটা তার।

শুধু এইটুকু জানি আগামী কোথাও গিয়ে পথ ভাগ করে দেবে তোমার আমার।

আর্যতীর্থ

*********************









*

। রশি।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১১.৭.২০২১।

রাজা বললেন। মূর্তি তৈরি করো।
হাত থাকবে না, পা থাকবে না, থাকবে শুধু অনুপম এক মুখ।
আর খেয়াল রেখো, তাকে দেখলেই যেন বিশ্বাস করে মানুষ,
যুক্তির অনুযোগ ভেসে যায় ভক্তির আবেগের স্রোতে।
মূর্তিকার মাথা চুলকে বললো, যে আজ্ঞে।
রাজার আদেশ, মাথামুণ্ডু না বুঝেও সে খোদাই করলো এক অবিশ্বাস্য মাথাসর্বস্ব প্রতিমা,
যার দিব্যকান্তি দর্শনে শান্তি নামে।
দেখে রাজা বললেন , বাহ!
প্রতিষ্ঠায় নাম খোদাই হলো রাজার।
মূর্তিকার পয়সা পেলো না।

রাজা বললেন, সবাইকে দেখাতে হবে।
রথ তৈরী হোক।
এমন রথ যার ধ্বজা দেখেই দূর থেকে মানুষ নতজানু হয়,
কারুকার্যে বিস্মিত হয়ে কথা ভুলে যায় শিল্পবোদ্ধারা।
কাঠুরে বললো জো হুজুর ।
কারিগর বললো শিরোধার্য।
শিল্পী বললেন যথা আজ্ঞা।
তারপর সাপখোপবিছেকাঁটাগাছ পেরিয়ে কাঠুরে কাঠ কেটে আনলো।
সংসারসন্তানপ্রিয়া বিসর্জন দিয়ে কারিগর অনন্য এক শকট বানালো।
খিদেঘামঘুমআমোদ বন্ধক দিয়ে শিল্পী তাকে এমন অনিন্দ্য সাজালেন,
এর আগে যেরকম কেউ দেখেনি।
রাজা দেখে বললেন চমৎকার।
রথের সামনে জ্বলজ্বল করতে থাকলো তাঁর নাম।
কাঠুরে তার মজুরি পেলো না।
কারিগর তার বেতন পেলো না।
শিল্পী তার সাম্মানিক পেলেন না।

রাজা বললেন , রথের পথ চাই।
খনক বললো আজ্ঞা দিন।
শ্রমিক বললো জো হুকুম।
নির্মাতা বললেন, যেমন আপনার ইচ্ছে।
খনক দিনরাত এক করে পাথর সরিয়ে মাটি বের করে দিলো।
মজুর রক্তকে জল করে তার ওপরে ইঁটের গাঁথনি দিলো।
নির্মাতা এক অশ্রুত অ-পূর্ব পদ্ধতিতে একমেবাদ্বিতীয়ম এক পথ তৈরি করলেন।
রাজা দেখে বললেন , ঠিক এমনই চেয়েছি!
রাস্তার নামাংকন হয়ে গেলো রাজবংশের নামে।
খনক একটি কপর্দক পেলো না।
মজুরের এক কণা ভাত জুটলো না।
নির্মাতা নিজের ঘর বেচে ঋণ শোধ করলেন।

রাজা ঘোষণা করলেন অমুক তারিখ রথে মূর্তি বসবে, তারপর পথে চলবে রাজার রথ।
কোনো মূর্তিকার, কাঠুরে , কারিগর , শিল্পী , খনক, শ্রমিক বা নির্মাতা যেন ভুল করেও
ধারেকাছে না আসে।
এ উৎসবে কেবল রাজার অধিকার।
তৈরি হলো কাঁটাতারের বেড়া,
সঙ্গীন উঁচু করে চরকি কাটতে থাকলো রাজপেয়াদারা,
গুপ্তচরেরা তীক্ষ্ণ নজর রাখলো কেউ যেন রথের কৃতিত্ব দাবী করে বসে,
সামান্য সন্দেহেই বেজামিন জেল হলো কত লোকের।

রথ টানতে গিয়ে রাজা বুঝলেন একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে।
রশি তৈরি করতে কাউকে বলা হয় নি।
রাজা হুংকার দিলেন, রশি লাও!
কাঁটাতারের ওপার থেকে ,
পেয়াদাদের পাহারা পেরিয়ে,
গুপ্তচরদের নজর এড়িয়ে কারা যেন বেরিয়ে এলো।
রাজা দেখলেন,
মূর্তিকারের হাতে ,
কাঠুরের হাতে ,
কারিগরের হাতে ,
শিল্পীর হাতে ,
খনকের হাতে ,
শ্রমিকের হাতে ,
এমনকি নির্মাতার হাতেও এক গাছা করে সুতো।
তারা পাকাতে থাকলো সুতোগুলো,
চোখের নিমেষে একটা মজবুত লম্বা রশির জন্ম হলো, যা দিয়ে রথ কেন, গোটা পৃথিবী
নড়ানো যাবে।
রাজা হাত বাড়ালেন, ওরা দিলো না।
ওরা রথে সেই রশি বেঁধে টানতে থাকলো, হেঁইয়ো, হেঁইয়ো , হেঁইয়ো..
ক্রমে প্রবল গতিবেগে রথ চলতে থাকলো,
রাজা সভয়ে দেখলেন,
তাঁর পেয়াদা, তাঁর গুপ্তচর,
ঊর্দি খুলে ভিড়ে যাচ্ছে ওই হেঁইয়োর দলে।
রাজা ছুটছেন, হাঁপাচ্ছেন, ছুটছেন..
কিন্তু কিছুতেই আর রথটা ধরতে পারছেন না।

এরই মধ্যে, রাজবংশের নাম লেখা ফলকটা কখন যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে।

আর্যতীর্থ

*********************









*

। রেটিং।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৩.৭.২০২১।

রেটিং দেখে সেটিং করি , কোথায় ইটিং, মিটিং কই,
চারএর কমে রাখবো মাথায়, আমরা তেমন বান্দা নই।
দিচ্ছে রেটিং গুগলবাবা, জোমাটো আর জাস্ট ডায়াল,
ফেললে কড়ি কোথায় কী তেল, রেটিং রাখে তার খেয়াল।

রেটিং এখন ডাক্তারেরও, পাঁচের মাঝে কার কত,
রোগী কেমন বাঁচে মরে ঠিক করে লোক তার মতো।
মাগনা কেন পয়সা দেবো, উচ্চতে বেশ রেটিং চাই
দেহের কাটিং কোথায় গেটিং, রেটিং দেখে তবেই যাই।

কিন্তু এসব রেটিং যে সব পয়সা দিয়েই যায় কেনা,
ব্যবসা ওটা বিজ্ঞাপনের , সেই কথা কেউ ভাবছে না।
গুগল তো নয় সমাজসেবক, জাস্টডায়ালও ব্যবসায়ী,
আমাদেরই ক্লিকের জোরে লক্ষ্মী ঘরে হন স্থায়ী।

যার পকেটে যেমন চাঁদা, রিভিউ হয় সেই মাপেই,
পয়সা যদি না ঢালে কেউ, সেরার খেলায় আর সে নেই।
গুগল কিংবা জোমাটোতে কান ফাটালো যে শিঙে
আওয়াজটা তার মূল্য ধরে কেনা যে পাঁচ রেটিংয়ে।

রেটিং দেখে সেটিং করো, কম রেটিংয়ে ভীষণ ভয়,
ভরসা তুমি করছো কাকে, রেটিং যদি চিটিং হয়?

গুগল চালায় তোমায় আমায়, এটাও বুঝি সেটিং নয়?

আর্যতীর্থ

*********************









*

। চাক।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৪.৭.২০২১।

যুদ্ধে অনেক নামহীন লোক থাকে, যাদের রক্তের কোনো দাম থাকে না।
জয় পরাজয় যারই হোক না কেন , ইতিহাস তাদেরকে মনে রাখেনা,
সময়ের ডাইরিতে লেখা থাকে কোন রাজা কাকে মারে কোন প্রান্তরে,
অক্ষৌহিনী মুছে যায়, মানুষ জানেনা পড়ে কারা সেই হারজিত গড়ে।

সেভাবে ভাবতে গেলে মানুষ আসলে ঠিক মৌমাছি কর্মীরই মতো
যে মধু জোগাড় করে কোনো রাজা বা রাণী তাই খেয়ে বাড়ে বাধ্যত,
চাকের হরেক নাম, ধর্ম সমাজ জাতি দেশ বাহিনী দল আরো কত কি,
আজীবন যাই লড়ে টসটসে মধু ভরে, ওটাই ডিউটি ভেবে ঠকি।

স্বপ্নকে কারা ভরে আমাদের চোখে? কারা ঠিক করে দেয় মোক্ষের মানে?
নিজস্ব কিছু নেই আমাদের কারো, কজন আর সাঁতরায় বলো তো উজানে?
স্রোতে ভেসে যেতে যেতে আমরাই ভেবে নিই আমাদের দেশ জাতি আর ঈশ্বরও,
আসলে ভাবানো হয় , ওহে নামহীন সেনা, প্রশ্নরহিত হয়ে প্রাণপণ লড়ো।

তারপর? চিতা জ্বলে ছাই হয় , ক্রমশ শুকিয়ে আসে কবরের মাটি,
কিছুদিন স্মৃতি হয়ে অশরীর বাঁচা, চেনা লোকেদের মনে ছোটো খুঁটিনাটি,
অচিরে বিলীন হওয়া বিস্মৃতি পথ ধরে আর কক্ষনো না ফেরবার দেশে,
আগামীর পলি এসে অতীতকে ঢেকে দেয়, শূন্যে অঙ্ক নামে স্মৃতিদেরও শেষে।

অথচ জীবন কাটে জন্মের থেকে লড়ে মানুষের কোনো চাক বেছে একপেশে।

কজন গিয়েছে বলো বর্ণ গোত্রহীন, ধর্ম ও দেশহীন স্যাপিয়েন্স নামে এক প্রাণী ভালোবেসে?

আর্যতীর্থ

*********************









*

। শর্ত।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৪.৭.২০২১।

পেনাল্টি নেওয়ার আগে কালো মানুষটার কী মনে হয়েছিলো?
ঠিক সেটাই, যা তার আগেই শট নেওয়া সাদা মানুষটার মনে ছিলো।
ওটা গোল। ওই তেকাঠির মধ্যে কিপার এড়িয়ে জালে জড়িয়ে দিতে হবে বল।
এক মুহূর্তে থমকে ছিলো অনন্তকাল। অর্জুনের সামনে তখন পাখির চোখ।

শেষ বলটা করতে যাওয়ার আগে মুসলমান বোলারটি কী ভাবছিলো?
তার জায়গায় হিন্দু বা শিখ বোলারটির যা ভাবনা, একদম কপি পেস্ট করা।
রান দেওয়া যাবে না। উইকেট নিতে হবে। দেশকে জেতাতে ভার দিয়েছে ক্যাপ্টেন।
সামনের তাসমানিয়ান অস্ট্রেলিয় ব্যাটসম্যানটিরও চিন্তা আলাদা নয়। দেশ যেন জেতে।

পরের মুহূর্তে বল জালে জড়িয়ে গেলে, কালো মানুষটা সাদা মানুষদের হিরো।
পরের বলে উইকেট ছিটকে গেলে মুসলমান বোলারটির পোস্টারে হিন্দু সমর্থকেরা মালা পরাবে।
পরের বলটি সীমানা পার করে জিতিয়ে দিলে তাসমানিয়ানের নামে গোটা অস্ট্রেলিয়া জয়ধ্বনি দেবে।

আর বিপরীত হলে?
কালো মানুষটা তখন শিকড়হীন জোঁকের মতো পাউন্ডচোষা দেশদ্রোহী।
মুসলমান বোলারটি মুহূর্তে পাকিস্তানের চর, কেন যে এদের খেলতে নামায়!
তাসমানিয়ান প্লেয়ারটিও তখন ঘৃণিত আদিবাসী, সাদা অস্ট্রেলিয়ানদের দয়ায় পালিত কোটাপ্রাপ্ত কীট।

দেশপ্রেমের শর্ত ও অর্থ একটাই। জেতা।
দুনিয়ার সব কোণে নিজেকে নিংড়ে নিঃশেষ হয়েও হেরে যাওয়া সংখ্যালঘুরা সেটা ভালো করে জানে।

পরাজিত হলে তবু পিঠ চাপড়াবে, এমন সংখ্যাগুরু আছে কোনোখানে?

আর্যতীর্থ

*********************









*

। অবুঝ।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৫.৭.২০২১।

পৃথিবী সরিয়ে নিচ্ছে নিজেকে তোমার থেকে,
তুমি কি তা বুঝছো মানুষ? মহাদেশ জুড়ে পুঁতে অগণিত ক্রুশ,
কাঁটার মুকুট দিয়ে সাজিয়েছো যাকে,
নিমীলিত দুচোখ সে মেলছে আবার, এবারে করুণা নয়, নিদারুণ রাগে,
বুঝছো মানুষ তুমি প্রলয় দাঁড়িয়ে আছে আগামীর আগে?

তুমি বেশ খুশি আছো, মাটিতে জ্বালিয়ে রেখে লোভাতুর খিদে,
কর্ষিত ধর্ষণে লুন্ঠন করে নাও যেমন সুবিধে,
বিগত বনানীস্মৃতি উদগত ফসলের ঘ্রাণে লেগে থাকে,
তোমার প্রচারকেন্দ্র সে শ্মশান-কুবাসকে উন্নতি ডাকে,
যেন এই পৃথিবীর তাবত বৃক্ষকুল, পাখী আর প্রাণীদের দল,
দাসখত লিখে দিয়ে তোমাকেই প্রভু বলে মেনেছে কেবল,
যেন ওই অরণ্য, সাগর আর সুউচ্চ পর্বতমালা, তোমারই চারণভূমি,
সুবিশাল এক শুধু মনুষ্যশালা,
যেখানে তাবত সম্পদ শুধু একটিই প্রজাতির লাগে প্রয়োজনে,
বাকিদের থাকা খাওয়া বাঁচা মরা আর প্রজননে
গুরুত্ব আছে যদি মানুষের সেটা লাগে কাজে।
মানুষই শ্রেষ্ঠ বলে পৃথিবীর সব কোণে জয়ঢাক বাজে।

দেখো আজ সবদিকে এই গ্রহ কুঁচকেছে ভুরু।
কোথাও আচম্বিতে ভূমি জুড়ে সচকিত কম্পন শুরু,
সাগরে ভাসছে ওই মহাদেশব্যাপী এক বরফ চাঙর,
শহর ভাসিয়ে নিলো হঠাৎই কোথাও এসে বন্যার তোড়,
দেখো দেখো, নানা দেশে বন জুড়ে দপ করে জ্বলে ওঠে মহা-দাবানল,
বর্ষা বর্ষব্যপী হয়েছে কোথাও, খেয়ালী আকাশ ঢালে অবিরাম জল,
কোথাও আবার চাষী আকাশের দিকে চেয়ে মেঘ ভিক্ষে করে,
দেখো হে শ্রেষ্ঠ জীব , সসাগরা ধরিত্রী প্রতিরোধ গড়ে।

মহাকাশ ভাড়া দেবে , সেরকম স্বপ্ন দেখেছো।
যন্ত্রের ভরসায় আগামী এঁকেছো, অথচ এখনো ক্ষুধা,
জীবাণু সংক্রমণে মারা যায় রোজ লাখো লোকে,
এখনো ধর্ষণ জারি, ধর্মের অন্ধতা পোড়ায় মানুষ আজও ঘৃণার নরকে,
এইটুকু গ্রহ জুড়ে যুদ্ধের দুন্দুভি কখনো থামে না,
শোধ দেওয়া নেই কিছু, প্রকৃতির কাছে শুধু বাড়িয়েছো দেনা,
পৃথিবীরও সহ্যের সীমা আছে, এবারে চাইতে পারে গ্রহটা ফেরৎ,
তুমি কি তা বুঝছো মানুষ? ক্রমেই বন্ধ হয় ফেরবার পথ...

বুঝছো না অতিমারী বলে ভাবো যাকে, আসলে সে যুদ্ধের শুভ মহরত...

আর্যতীর্থ

*********************









*

। একা।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৬.৭.২০২১।

সব যাত্রায় যাত্রী হাঁটে একা।
সঙ্গী বলে পাশে যাদের দেখা,
তাদের গল্প একটু হলেও ভিন্ন,
যাত্রাপথের ঘটনাদের চিহ্ন,
একেক রকম মানে করে একেক জনের কাছে,
সমস্তটা উগরে দিলে আলাদা হয় পাছে,
তাই তো মানুষ সমস্বরে চরৈবেতি বলে,
কোটি লোকের সাথে হেঁটেও সবাই একা চলে।

সবার স্মৃতির সঙ্গে মেশে অনুভূতি নিজের,
ক্ষোভে রাগে আনন্দে বা চোখের জলে ভিজে,
মনের তুলি ঘটনাদের নিজের মতো আঁকে,
চলার সাথী সবিস্তারে শুনতো যদি তাকে,
দেখতো সেটা মিলছে না ঠিক নিজের স্মৃতির সাথে,
দৃশ্য একই, চিত্র পৃথক ভিন্ন তুলির হাতে।

গল্প কটা শুনবে তুমি শুনি?
সাতশো কোটি গল্প প্রতিদিনই,
জন্ম থেকে গল্প শুরু, দাঁড়ি শেষের শ্বাসে,
যেই ঘটনায় কান্না তোমার,আরেকজনে হাসে,
আরেকজনের হয়তো কিছুই যায় আসেনা তাতে,
তিন কাহিনীর জন্ম দেখো একই ঘটনাতে।
তিন যদি হয় তিনকোটিও, ঘটবে যে সেই এক,
বিন্দু থেকে কোটি ধারায় সিন্ধু বনে দ্যাখ।

ক’ থেকে খ’য়ের দিকে যেতে,
দেখবে মানুষ সামনে বাঁ ডাইনেতে,
স্বভাবত গল্প শুনতে গেলে,
এক ঘটনার হাজার ধরণ মেলে,
এটাও সত্যি ওটাও সত্যি পুরোটা সত্যি নয়,
দেখার তফাতে পাল্টে গিয়েছে ঘটনার পরিচয়।

কাজেই কোনো গল্প হয়না সবার।
ঘটনাপট পাল্টে যাবে ক’বার,
বলছে যারা তারাও জানে না যে,
একেকটা মন একেক সুরে বাজে,
পাল্টিয়ে যায় মানে একই গানের,
গল্প যখন শুনি অভিযানের,
সেই বিবরণ কারোর আঁকা ছবি,
দেখতে পাবো যা ঘটেছে সবই,
কিন্তু তাতে যোগ হয়েছে মাত্রায়,
অন্য কথক ভিন্ন স্মৃতি হাতড়ায়।

সবাই একা জীবনপথের যাত্রায়..

আর্যতীর্থ

*********************









*

। শেকড়।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৬.৭.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ১৭.৭.২০২১।

তুমি মহাকাশ ঘুরে এলে বুঝি? তা বেশ ,তা বেশ
আমিও ঘুরছি মাটিতে জানো তো! ইচ্ছে যদিও নয় তা বিশেষ,
থিতু হতে চাই, ভিতু পায়ে ঠাঁই খুঁজছি এখনো এদিকে সেদিকে।
খোঁচা ও ধমকে এটুকু ফেলেছি এতদিনে শিখে,
আমাকে চায় না আজও কোনো দেশ।

কোন দেশ সেটা? সে প্রশ্ন করা ঠিক নয় মোটে,
মহাকাশে গেছো মানুষ হিসেবে। কোথাও কখনো প্রশ্ন কি ওঠে,
কার নাম লেখা পাসপোর্ট জুড়ে, ভাড়া দিয়ে যেই ব্যোমে গেলে উড়ে,
নিচে উল্লাস, যেন চাঁদ থেকে আসা যাবে ঘুরে,
আমরা যেমন তাড়নায় ছুটি বাসে ট্রেনে প্লেনে , যখন যা জোটে।

তাড়না কিসের ? সেটা মোটামুটি আজীবন সাথী,
খিদে মারে লাথি, মেধা দেয় জ্বালা, ভালো হতো যদি ওখানে পালাতি,
জাগরুক চোখে স্বপ্নের দাবী,সুখের চাবিটা ওইখানে পাবি, ভাগ শিগগিরই।
আমিও তেমন সুযোগের খোঁজে দ্বারে দ্বারে ফিরি, যদি আশা হয় কালকে পোয়াতি।

যদিও ঘুরছি মূলহীন হয়ে, মজাটা কী জানো?
যত দূর যাই, যেখানে পালাই, শেকড়ের ঘ্রাণ গায়ে আটকানো গেঁয়ো হই যেই শহরেতে
আসা, রাজ্য পেরোলে থাকে জাতি ভাষা,
পালালে বিদেশে পেছন ছাড়েনা সেই জিজ্ঞাসা, কোন দেশে ঠিক শেকড় তোমার যেন?

মহাকাশে গেছো, আহা বেশ বেশ, পৃথিবী হয়েছে তোমার স্বদেশ,
মাটিতে তবুও দেশ থেকে দেশ এত ভেদাভেদ কেন?

আর্যতীর্থ

*********************









*

। অ-বাস্তব।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৬.৭.২০২১।

এবারে নামাও ফেসবুক ভূত, বাস্তবে ফেরো বাঙালীর পুত,
জুকার তোমায় জোকার বানিয়ে সময়ে ভরছে ভুষি,
তোমার খবর বাইরেতে বেচে, কামালো ডলার ফ্রি ডেটা চেঁছে,
সকলেই ফোনে সব জেনে নেওয়া ফেস-কালসাপ পুষি।

করো কি করো কি বাঙালীর ঝি, ভস্মতে আর কত ঢালো ঘি,
ফেসবুকে কটা কাঁচকলা গুনে ডগমগ হও সুখে,
ওরা চায় থাকো ব্যস্ত ও সবে, বৃহৎ ঘোড়ার অণ্ড প্রসবে
বাকি সব ভুলে মুঠোফোনে শুধু আঙুল চলুক ঝুঁকে।

মানছি এখন ছাড়াটা কঠিন, ফেসবুক করা হয়েছে রুটিন,
কবিতা গান ও নানান শিল্পে সহজে প্রাপ্তি ঘটে,
স্রষ্টার সাথে কথা সরাসরি, সাবাসি দেওয়ার এত ছড়াছড়ি,
এত কিছু কেটে বেরিয়ে আসাটা দুষ্কর কাজ বটে।

শুনে রাখো ওটা টোপ দেওয়া চার, অপেক্ষা শুধু ফাৎনা নড়ার,
অ্যালগরিদম নজর রাখছে কেমন বঁড়শি গেলো,
দিনশেষে ওরা জেনে গেছে ঠিক, প্রিয় ও ঘৃণিত কাদের প্রতীক,
কিসের খবর মানসিক ঝড়ে করে দেয় এলোমেলো।

যতটা সময় দাও ফেসবুকে, ওরা তত রাখে বেশি করে টুকে,
চিনে গেছে আজ এমন তোমাকে আয়না লজ্জা পাবে,
বিনোদনে কিছু চমক মেশাতে, ঢুকে গিয়ে আছো চরম নেশাতে,
সাধু সাবধান, এরা হেসে চুষে মগজ মজ্জা খাবে।

নাই পারো যদি ছেড়ে দিতে তাকে, তখরচ যেন কম হতে থাকে
হ্যাজানো গ্যাঁজানো ছেড়ে শুধু দাও কাজের জিনিসে মন,
ফেক নিউজ আর ফেক ইউজারে, সহজে বিপথে নিয়ে যেতে পারে
যেন এক ফেক রিয়ালিটি শো’তে তুমি আছো সারাখন।

বাঙালীর পুত, বাঙালীর ঝি, বাস্তবে ফের ফিরে এসো দেখি
জীবনে কমাও ভারচুয়ালের নিশিদিন জ্বালাতন।

আর্যতীর্থ

*********************









*

। ব্রাত্য।
কবি আর্যতীর্থ
রচনা ১৮.৭.২০২১।

রাজা চাইছেন প্রতিভা বিকাশ। রাজা চাইছেন নবীন কলম।
সুতরাং বাজে কাড়া ও নাকাড়া, প্রদেশে প্রদেশে ঢম ঢম ঢম!
রাজা চাইছেন দক্ষ লেখক, নানান ভাষাতে দড় হবে তারা,
রাজা চাইছেন সাহিত্য হোক, কোষাগার থেকে যাবে মাসোহারা।
কে কোথায় আছো ক্ষণজন্মারা, সৃষ্টিকে আনো রাজদরবারে,
রাজার বিচারে সেরা হলে দেখো তরতর করে কত দর বাড়ে।
প্রবন্ধ লেখো, ভ্রমণ কাহিনী, কল্প গল্প চলবে সবই তা,
শুধু দেখো বাপু ওসবের মাঝে স্বরচিত কোনো না থাকে কবিতা।
নির্দেশে আছে স্পষ্টই লেখা, যা খুশি পাঠাক আগামী লিখিয়ে,
কবিতা লিখলে প্রতিভার দলে যাবেইনা রাখা সে নাম টিকিয়ে।

কেন এরকম রাজার ইচ্ছা, প্রতিভাতে কেন কবিতা ব্রাত্য
তলিয়ে ভাবলে খুঁজে পেতে পারো ইতিহাস থেকে যুক্তি তার তো।
রাজা খুঁজছেন নতুন কলম, মালির হাতে যে সার জল পাবে,
রাজার প্রিয় যে পুষ্প বা ফল, জোড়হাতে তারা সেটাই ফলাবে।
মধুর কথাতে নানান ভাষাতে বন্দিত হবে সে পাদপদ্ম
তেল দিতে পারে গদ্য যেভাবে , সেপথে কখনো হাঁটে না পদ্য।
সে চিরকালই মানুষের সাথে, কথা দিয়ে আঁকে আসল ছবিকে,
মানুষের কাছে যতটা যে প্রিয়, রাষ্ট্রের তত ভয় সে কবিকে।
রাজা চাইছেন সাহিত্য হোক, রাজা চাইছেন কলম দক্ষ,
নিহিত রয়েছে শর্ত সেখানে, লেখা সব নেবে রাজার পক্ষ।
কবিতারা চির বাউন্ডুলে যে, কোটেশনে বলা কঠিন ভাষণে,
লগ্নী করাটা বেনোজলে যাবে, শেষ অবধি যদি আদেশ না শোনে।

রাজা চাইছেন প্রতিভা বিকাশ। রাজা চাইছেন নবীন কলম।
রাজা চাইছেন রাজধ্বজাধারী। কবিতা চাননা তিনি একদম।

ইতিহাস জানে, আহত সময়ে কবিতা প্রজার ব্যথার মলম।

আর্যতীর্থ

*********************