কবি আশাপূর্ণা দেবীর কবিতা
তোমাকে
কবি আশাপূর্ণা দেবী

"সানগ্লাস" ঢাকা দু' চোখে তোমার
অন্ধকার |
নীল কালো আর বেগুনে কাঁচের
অন্ধকার |
সেখানে সূর্য রং জ্বলা জ্বলা পাংশুটে |
সেখানে সূর্য ঘুম ঘুম আর মনমরা |
সেখানে সূর্য রাখছে না কোনো অঙ্গীকার |
সূর্যকে তুমি করছো সেখানে অস্বীকার |

সূর্যকে তুমি দেখবে না, মোটে দেখবে না |
ধারালো ছুরির ফলার মতন সূর্যকে
গলানো লোহার স্রোতের মতন সূর্যকে
চোখ ঝলসানো ঝকঝকে
শাদা সূর্যকে দোখবে না |

তবুও তোমার কাঁচের আড়াল থাকবে কি ?
থাকবে না |
নীল কালো আর বেগুনে আড়াল থাকবে না |
গোঁয়ার ঝড়ের ঘুর্ণি দাপটে ভাঙবে সে,
রোখা গরুড়ের পাখার ঝাপটে ভাঙবে সে |
সামলাবে তুমি কতই আর ? সাধের তোমার
অহঙ্কারের অন্ধকার!

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
আমরা যখন ছোট্ট ছিলাম
কবি আশাপূর্ণা দেবী

আমরা যখন ছোট্ট ছিলাম --
বড্ড ভারী লক্ষ্মী ছিলাম !
লক্ষ্মী ছিলাম ! লক্ষ্মী ছিলাম !

সাত চড়ে 'রা' কাড়তাম না |
ঘটি বাটি নাড়তাম না !
কুলকাসুন্দি আমের আচার
তাকের থেকে পাড়তাম না |

দুধের শেষটা ফেলতাম না,
ডানপিটেনি খেলতাম না,
গুরুজনের একটি কথাও--
এক্কেবারে ঠেলতাম না !
এক্কেবারে ঠেলতাম না !

পাখীর ছানা ধরতাম না |
দোয়াতে জল ভরতাম না |
আরো কতই করতাম না |
কত কী যে করতাম না |
(মানে) যা ভালো সব করতাম, আর---
যা ভাল নয় করতাম না |
আমরা তো সব লক্ষ্মী ছিলাম !
যখন কি না ছোট্ট ছিলাম!

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
খেলা
কবি আশাপূর্ণা দেবী

এখন যারা ছোট্ট আছে---
ডাইনে বাঁয়ে সামনে পাছে,
কেমন তারা ? কেমন তারা ?

চুপ চুপ ওরে বাব্বা,
আসবে তেড়ে বাগিয়ে থাবা,
ধাঁই ধপাধপ চড়িয়ে দেবে,
দাঁতের গোড়া নড়িয়ে দেবে,
চাও কি হতে দফাসারা ?

তাইতো বলি তোমার কাছে,
এখন যারা ছোট্ট আছে,
(ডাইনে বাঁয়ে সামনে পাছে)
কী যে ভীষণ মিষ্টি তারা !!
মিছরি চিনি লজেন্স টফি,
মধুর মত মিষ্টি তারা |
আর -- "ছোট্ট" তো নয় "বাচ্চা" তারা |
খোকাও নয়, খুকুও নয়,
সবাই শুধু বাচ্চা তারা |
মিষ্টি তা'রা | মিষ্টি তা'রা | বেজায় ভীষণ মিষ্টি তারা |

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
ডাক   
(উনিশশো বিয়াল্লিশের আনেদোলন কালে)

ওই শোন্ শোন্ সাড়া জাগিয়েছে---
    কালের ঘূর্ণি পথে !
ভঙনের গান গেয়ে ছুটে আয়---
    মরণের জয়রথে |
ওই দেখ কারা আসে দলে দলে,
দেশজননীর পূজাবেদীতলে ;
অক্লেশে প্রাণ, করে বলিদান
হোমের আহুতি হতে |
তাই দ্বারে দ্বারে ডাক দিয়ে যাই,
    চল চল ছুটে চল |
কে ওরা ভাঙিছে, বন্দিনী মার
    চরণের শৃঙ্খল |
ওদের সঙ্গে দে মিলায়ে হাত,
বৃথা পশ্চাতে কর আঁখিপাত,
বাঁধিবে কি তোরে শিশুর হাস্য,
প্রিয়ার অশ্রুজল ?
এখনো যদি না ভাঙিতে পারিস,
    কখনো কি হবে আর ?
লৌহনিগড় গড়িবে আবার
    প্রবলের কারাগার |
মরণযজ্ঞে ঝাঁপ দিতে এসে,
নতশিরে, কী রে ফিরে যাবি শেষে ?
মস্তকে বহি কাঁটার মুকুট,
    ললাটে অন্ধকার |
বিশ্বজগত্ টিটকারি দেবে,
    স্পর্ধিত উপহাসে |
যষ্টি আহত পশুর সমান
    কাপুরুষ ক্রীতদাসে |
ভাবী তনয়ের ললাটে কি ফের,
দিয়ে যাবি এই কলঙ্ক জের ?
যে কালি এখনো মাখানো রয়েছে---
অতীতের ইতিহাসে ?
কালিমাখামুখে পৃথিবীর বুকে
     টিকে থেকে কি বা ফল ?
অকারণ শুধু ধ্বংস করিতে---
     ধরার অন্ন জল |
ক্ষুদ্র ক্ষতির হিসাব কষিয়া,
যে মাটি আঁকড়ি আছিস বসিয়া,
দাবিদাওয়াহীন সে মাটির ঋণ
শোধ দিবি কিসে বল ?
নাড়া দিয়ে ভাঙ্ পুরনো দেওয়াল,
    কতকাল রবে খাড়া ?
শাসনরক্ত ভ্রূকুটির তলে
    মাথা তুলে আজ দাঁড়া |
বীরদাপে যারা করে অন্যায়,
তারা যেন আজ ভাল জেনে যায়,
বিষবৃক্ষের উচ্ছেদ লাগি
মাটিতেও জাগে সাড়া |

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
ময়নার বায়না   
কবি আশাপূর্ণা দেবী

ময়না দোকান যায় না
তবুও করে বায়না
চুল বাঁধবে মুখ মাজবে
চাই একটা আয়না |
ক্রীম-পাউডার মাখবে
তেল-চিরুনি রাখবে
চাই একটা লম্বা টেবিল-আয়না |

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
বন্দিয়া মা দুর্গা দেবী, বন্দি সরস্বতী   
কবি আশাপূর্ণা দেবী

বন্দিয়া মা দুর্গা দেবী, বন্দি সরস্বতী,
লিখিতেছি এ-কাহিনী, আমি দীন অতি |
অভাগা নির্বোধ আমি নিজ কর্ম ফলে---
আগাছার মত আছি এ ভূমণ্ডলে |
কোথা মাতা কোথা পিতা কোথা আত্মজন,
দূর দূরান্তরে আমি ভ্রমি অকারণ |
তবু নিত্য লিখি এই জীবন-কাহিনী,
মনে আশা কোনোদিন দেখিবে জননী |
দেখিবেন পিতা আজি অন্য পরিজনে,
আবার পাইব ঠাঁই তাঁদের চরণে |
বর্ধমান জেলা মধ্যে খণ্ডঘোষ গ্রাম,
পিতা তার জমিদার নাম রাজা রাম |
মোর নাম বাবুরাম ছিল এক কালে,
এখন কতই নাম জুটিছে কপালে |
তবু দস্তখত্ করি বাবুরাম রায়,
অতঃপর লিখি দুই দেবীর কৃপায় |

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
চাঁদের কণা কুড়িয়ে
কবি আশাপূর্ণা দেবী

চাঁদের কণা কুড়িয়ে
বউটি দেব গড়িয়ে


লোকের বৌ কালো ঝুল,
আমার নাত বউ পদ্মফুল


ঘরে কেন আবার পিদিপ জ্বালো?
( আমার ) খোকার বউ তো করছে ঘর আলো


.             ****************             
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
এ কী লাইন এলো দেশে দাদা    
কবি আশাপূর্ণা দেবী

এ কী লাইন এলো দেশে দাদা,
  কী 'লাইন' এলো দেশে!
সকল লাইন ঘুচিয়ে দিল লাইন সর্বনেশে |
  রেশনে ও কেরসিনে
  লাইন জানি লাগে,
পাঁউরুটিতে লাইন লাগে, কে শুনেছে আগে?
  হাওড়া স্টেশন তাকিয়ে দেখ---
  লাইন, ট্যাক্সী পেতে,
ট্রামে বাসে লাইন দেখো, পথে যেতে যেতে |
  পয়সা আছে? বিদেশ যাবে?
  কথা ভারি সাদা?
ট্রেনের টিকিট কিনতে গিয়ে লাইন দেখুন দাদা |
  খেলার মাঠের কথা?
  কী আর বলবো মহাশয়,
সে দুর্গতি, কেবল মাত্র মানুষ বলেই সয় |
  তবে দাদা সবার বড়ো
  লাইন সিনেমার |
এ সংসারে যে লাইনটি সব লাইনের সার |
  কিন্তু শুনুন চুপি, চুপি---
  আরো আছে ভাই!
রোজ সকালে সেইখানেতে লাইন দিতে যাই |||

.                 ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর