কবি বিশ্বজিৎ হালদারের কবিতা
*
রাজপথে
কবি বিশ্বজিৎ হালদার

পৃথিবীর আজ বড় বিপদ!
সভ্যতার দেওয়ালগুলো চোটে গেছে;
কার্নিশে জমানো জামানতের দলিলে ধুলা জমেছে,
দাবানলের উপক্রম সূর্য পুড়ে ছাই হতে বাকি নেই!
অন্তরালে নগ্নতা ,আবরণ দিয়েছে কৌতুকের কলঙ্ক;
তবুও উর্বশীর মতজীবন লাবণ্য!
চোখে আসছে না অন্ধকার
ধরার আড়ালে পিশাচ দের মেলা
সভ্য সমাজের নজরে সাজে প্রেয়সি, ফারিস্তা,
বন্ধু আজকের রাজপথে
এক উদ্বাস্তু মুদিখানা যাযাবর ওরা
উত্তর পেলাম ঘুড়ির সুতো ছিড়ে গেছে
বুঝলে খোকা সবথেকে বড় প্রতিযোগিতা কি?
সবথেকে বড় চাকরি?
দলে দলে তোষামোদি হও
তুমি তো নিরক্ষর না,তবে কেন
প্রতিবাদের ভাষাকে কেন ঘুম পাড়িয়ে রেখেছো
ওরা কি উন্নয়নের ছবি আঁকতে পারে?
সমৃদ্ধ সভ্যতার লেখচিত্র কী বোঝে?
আপনার মার্বেল বসানো  ঘরে জাকজমকের মেলা বসে  
ব্যস্ত থাকে লুটোপুটি প্রতিযোগিতায়
উপনিবেশ একমাত্র রাজপথ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তোমাকে লিখছি উজান
কবি বিশ্বজিৎ হালদার

কলেজ স্ট্রিটের বাইপাসে সেদিন একটা ছেলেকে
কবিতার মোহে দেখেছিলাম ,
অনাবিল কিছু কথার মধ্যে,জীবনের  রঙ ছিল ,
আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছি
কিভাবে আকাশের  কোলে চাঁদ নামে ;
কিভাবে জোস্না রাতের রং চুরি করে নেয় ,

যদি ক্ষণিক মুহূর্তের জন্য সময়কে বাঁধা যেতো
আজও কি বলতে পারতাম আমি সেই কালো মেয়েটা
তোমায় যদি একটু ছুঁতে পারতাম।
তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করছো না, নিস্তব্ধ দুপুরেও
মেঘের কোলে রোদ এর হাসি দেখে
সাদা বকের বিহান বেলায় এক মুহূর্তের
জন্য শান্ত মেয়েটা ফাগুনের মোহনায় ছন্দে
কি ভীষণ নেচেছিল জীবনে প্রথমবার।

খুব ইচ্ছে করছিল পাশের বাড়ির আয়না তে
একবার দেখে আসি আমায়  কি সত্যিই
খুব খারাপ দেখতে লাগছে আজ।
সবাই আমাকে কালো মেয়ে বলে,
তবুও আজ একবারও নিজেকে এতটা ছোট করে
দেখতে ইচ্ছে করেনি, শুধু মনে হয়েছিল
তুমি আমার রাজপুত্র এসেছো।
তোমার লেখা প্রত্যেকটা বই  আমি তোমার
উপহারের মত আগলে রাখি।
প্রতিবারই আসি বইমেলায়  
সাহস হয় না,কত নামি দামি মানুষ
তোমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভুলেই গেছিলাম আমার জীবনে বসন্ত বলে কিছু নেই
সব না পাওয়ার মত বৃষ্টির উল্কা হয়ে
কখন তুমি হারিয়ে গেলে
ব্যস্ত কলকাতার সব প্রান্তে ছুটেছিলাম
বিশ্বাস কর,আমিতো জানিনা তোমার নাম ,
কোথায় থাকো কলেজ স্ট্রিটের বুক স্টলে
তোমার ছবি মোড়ানো বইটা ছিল,
বড় বড় হরফে লেখা  ছিলো ইতি উজান
ভেবেছিলাম ওটাই তুমি
তোমার  কবিতার প্রতিটি অক্ষরে
তোমার  ঘ্রাণ খুঁজি, বাক্যের শেষে যদি
একটুও তোমার ঘামের গন্ধ লেগে থাকে
সেই সূত্র ধরে আমি ঠিক তোমার ঠিকানায় পৌঁছে যাব,
আবার কবে আসবে শিউলি বেলায় আসবে নাকি ?
সেদিন তোমায় সাহস করে একটু ছুঁতে পারবো?
তবে যদি বলি আমি সেই কালো মেয়েটা
আমায় চিনতে পারবে ?. . . . . উজান

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রসঙ্গ ঈশ্বর
কবি বিশ্বজিৎ হালদার

অন্ধকার যে নীরবতায় ব্যস্ত থাকে
শতাব্দির হাত ছুঁয়ে প্রগতিশীল সভ্যতা
এখনও সেই অদৃশ্যে বন্দি।
বিশ্বাস , কুসংস্কারের দাস হয়ে মেতে থাকে
মন্দির, মসজিদ,  চার্চে।
আমাদের গ্রামে পশ্চিম কোনের  শিব মন্দিরে
সবাই নিয়মিত পুজোয় ভিড় করে  শ্রাবণ মাসে।
আমতলার মাচায় তাস পেটানো ছেলেটিও
মাঝে মাঝে পুজো দিতে যায়।
ভজন পাল সারাজীবন  লোক ঠকিয়ে খায়,
তার তিন তলা বাড়ি ,ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে ।
অথচ ওই পাড়ার দীপু যার দিন আনে দিন যায়
ওর মস্ত বড় অসুখ হয়েছে ,রোগটার নাম ক্যান্সার !
দিন গুনছে শেষ প্রশ্বাসের.
তপন গোসাই সারা জীবন জরিবুটি দিয়ে মানুষের
জীবন বাঁচিয়ে ,অকালে সাপের কামড়ে মারা গেল ।
সবাই বলছিলো নিয়তি!
তবে কার দুয়ারে বসে থাকা?
উত্তরটা এখনও খুঁজছি.............. ঈশ্বর?

আমি প্রতিদিন গীতা পাঠ করি,
বেদ, কোরান, রামায়ণ মহাভারত সবকিছুতে খুঁজি ঈশ্বরকে
একটা মুসলিম বন্ধুর হাতে জল পান করেছিলাম বলে ঠাকুমা আমাকে একশো বার
গঙ্গাস্নান করিয়েছিল।
একটা খ্রিস্টান বন্ধুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম বলে গ্রামের মোড়লরা   
আমাকে একঘরে করবে বলেছিল ।
এত বিভেদের মধ্যেও আমি কখন ঈশ্বরক  , আল্লাহ,
কিম্বা যীশু কে  খুঁজে পাইনি ।
অগাধ শূন্যতায় ভাবনার বিশুদ্ধতায়  এখনও খুঁজি
প্রত্যাশার সেই জীব........... ঈশ্বর।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চিঠি পাঠিয়ো মা . . .
কবি বিশ্বজিৎ হালদার

স্মৃতির ক্যানভাসে বাসা বাঁধে কুয়াশা,
রং মশাল এর মত জীবনের অক্ষরগুলোকে,
চেনা রূপ দিয়ে যায়,
ফেলে আসার টানে নিরন্তর পথ চলা।

অফিসের জানালা থেকে,
চেয়ে থাকি হতভাগ্যের মতো ,বিভুঁইয়ে ডাক অফিসে ;
চাঁদের  মিঠুন হাসি আড়াল হয় ,নরম অন্ধকারে;
ঘরে ফিরি কাঙালের পরিচয়ে !

ফেরিওয়ালার ডাকে ,অবাধ্য ছেলেটার মতো ছুটে যায়,
হয়তো আমার ঠিকানায়  পোস্টম্যান;
অপেক্ষার হিরণময় পরিণতি!
চিঠি পাঠিয়ো মা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অকাল মৃত্যু
কবি বিশ্বজিৎ হালদার

একটা নিভে যাওয়া মুকুল
আজও ঘুম পাড়ানি গান শুনতে ব্যাকুল হয়।
কোলাহলের পৃথিবীতে সে এক আশ্চর্য নীরবতা
সবুজ মরুভূমির হাত ধরে বয়ে চলেছে
একশত শুকনো সমুদ্র !হাজার ক্রস হেঁটে  দেখি
অনাবৃষ্টিতে সে এক আশ্চর্য প্লাবন হাহাকার
ভূমি ক্ষয় হতে হতে এক বিপুল পর্বত গড়ে উঠেছে
নিবিড় নির্জন সে পথ অজস্র চিৎকার এর ছবি

আলতা রাঙা পায়ের নুপুর এখনো ধ্বনিত হচ্ছে
নতুন ফ্রক পরে কেউ ছুটছে পুরনো আমবাগানে
লুকোচুরি খেলতে আবার কেউ বলেছে
চল ভাই রান্নাবাটি খেলি
এগিয়ে এসে দেখলাম হাজার শবের হৃরণময় গুহা
আমার  শত শত বোনের রক্তে মাখা নগ্ন শরীর
সে এক নির্লজ্জ উপভোগ সংজ্ঞাহীন বিভীষিকা মৃত্যু
মৃত্যুর বোবা মুখ যেন এখনো বলছে
আমি একটু বাঁচতে চাই বাঁচতে চাই
ভেজা রোদ চুপিসারে সেজেছে মেঘে ঢাকা তারা
ফুটে ওঠা গোলাপ গুলো আজ পর্ণমোচী পথের আবর্জনা
ছুটে গেলাম শাসকের দরবারে বিচারককে বাণী বলে
ওরা খারাপ মেয়ে আর ওনারা সবাই ভদ্র লোক

খারাপ মেয়ে ...ভদ্রলোক!!
আমার ভিতরে মানুষ টাকে আর আটকাতে পারিনি
ইচ্ছে করছে আকাশের চেরা জিভ হয়ে
ঝলসে দিয় ওদের লালসার  বহ্নি
শৈশবের শেষ বেলা মৃত্যু কি করে বলবো
অসোহ্য শুয়োপোকার  প্রজাপতি হতে কিছু পথ বাকি
কয়েকটা বসন্ত পেরোলেই কিছু মিষ্টি মেধা
স্টেথোস্কোপ কাঁধে নিত
কেওবা রাঙা কপালে টকটকে সিঁদুর পরে
নতুন কোনে সাজতে

এ কেমন অসুখে নরম ফুলের পাপড়ি ভাঙা!
অকাল মৃত্যুর উৎসব!!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খারাপ ছেলে
কবি বিশ্বজিৎ হালদার

জীবনটা ক্রমশ ফুলস্টপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে
শব্দ ছকটা মেলাতে পারছি না
দশম শ্রেণীর প্রথম ছাত্র বেনীমাধব
রেলগাড়িতে বাচ্চাদের বই বিক্রি করে
কেমন অনায়াসে আমার অম্লান সপ্ন গুলো অনাথ হয়ে গেল
নীরব দর্শক আমার অভিনয়ে
ওই ছেলেটা ভিষন খারাপ যার ভেজা আঙ্গুলগুলো
উষ্ণ আদরের অপেক্ষা করে না
ভাঙা লাইব্রেরীর পুরোনো বই ছেঁড়া কাগজ , প্রতিটি অক্ষর
এমনকি দাড়ি,কমা, ... সবাই তাকে খুব ভালোবাসে
যার কবিতা শুনে মরা চাঁদের জোৎস্না জেগে ওঠে
শুকনো সমুদ্রের এক কোনে ভাঙা স্টেথোস্কোপ
নিপুণ স্বপ্নকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে
কখনো ইচ্ছে হয় সময়ের চিহ্ন হয়ে জীবনের দোদুল দোলনাটা থামিয়ে দিয়
স্বপ্নের শিকরটা ছিঁড়ে ফেলি
আচমকা চোখ বন্ধ করতেই প্রকান্ড সূর্যটা নিভে যায়
খারাপ ছেলেটার মৃত্যু সংবাদে
আলো-অন্ধকার, সুখ-দুঃখ ব্যস্ত হয় নরম আলিঙ্গনে
চাঁদের মিঠুন হাসি এক টুকরো বৃষ্টি হয়ে আমার অশ্রু মুছিয়ে দেয়
শান্ত শীতল শরীরকে স্নান করিয়ে দেয় রোদ্র জীবনের
সব পাপ্রি গুলো হারিয়ে দাঁড়িয়েছি শূন্য ক্যানভাসে
আমি সেই খারাপ ছেলেটা

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর