উড়োজাহাজ কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
একটা জীবন উড়োজাহাজ দেখতে দেখতে কেটে গেল--- ছোটবেলা , মেজবেলা, বড়বেলা, সবসময়ই উড়োজাহাজে বিভোর আমি, আমার যত কিছু ভাবনা, ঐ উড়োজাহাজে চেপে পারাপার করে ...
ছোটবেলায় যা ভাবতাম মেজবেলায় তা ভাবিনি, আবার মেজবেলায় যা ভেবেছিলাম বড়বেলায় এসে তা বদলে গেছে , কিন্তু একটা বিষয় ধ্রুবক --- উড়োজাহাজ , আমার সব ভাবনাগুলি ওই উড়োজাহাজের পেটে রয়ে গেছে ...
ছোটবেলার গুলি-লাটাই মেজবেলার প্রেমিকার চিঠি, কবিতাখাতা বড়বেলার হা-হুতাশ, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, সব উড়োজাহাজে চাপিয়ে আমি নির্বিকার থাকি, যেমন চোখের সামনে প্রতিদিন অন্যায় দেখেও নির্বিকার থাকেন সুভদ্র জনগন ...
অচেনা আমি কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
আমাকে কেউ ঠিকঠাক দেখতে পায় না এ বড় আহ্লাদের ব্যাপার --- চোখের ভেতর জেগে থাকা ক্রূর দৃষ্টি, মুখের ভেতর গজিয়ে ওঠা হাঙর দাঁত, সর্প জিভ, সব যদি সবাই দেখে ফেলতো তাহলে …
আমার জামার নিচে লাগানো আছে নিষিদ্ধ পোস্টার, কোমরে লুকানো আছে ধারালো ছুরি, মাথার ভেতর থরে থরে সাজানো পৃথিবীর তাবৎ খলনায়কদের ছবি , অথচ আমার নিরামিষ ব্যবহার আর গায়ের নামাবলী দেখে সবাই ভেবে নেয়, দীঘির টলটলে জলের মত আমি, কলাগাছের মত নিরুত্তাপ আমার জীবন …
কেউ জানেনা , গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকলে আমার ভেতর থেকে শুনতে পাবে অন্ধকারের আর্তনাদ, আর দেখতে পাবে “ভালো আছি” বলা মানুষগুলির দিকে তাক করে রাখা অজস্র রাইফেল …
জ্যোৎস্নাফোয়ারা কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
আমাকে ভাঙো, ভেঙে দ্যাখো, আদীম গহ্বর থেকে কেমন উঠে আসছে জ্যোৎস্নাফোয়ারা – যেখানে শৈশবের পাখিরা খেলা করে, দাঁড়িয়ে থাকে কিশোরবেলা নকশিকাঁথার মাঠে …
গভীর চক্রান্ত করে যারা আমাকে ফেলে রেখে গেছিল ভূষণ্ডীর মাঠে, তাদের ধারালো দাঁত-নখের অক্ষরেখা পেরিয়ে ধীরে ধীরে আমি থিতু হয়েছি এক নতুন বনসৃজনের স্বপ্নে -- কারুকাজ বুনতে বুনতে দূর থেকে দেখি গর্ভবতী মেঘেদের আনাগোনা, সরীসৃপ মানুষদের ওড়াউড়ি …
মা-বাবা-ভাই-বোন-বন্ধু-প্রেমিকা, সবাই আমাকে নিয়ে ভাবে, অথচ কেউ ভেঙে দ্যাখেনা আমার বুকভর্তি জ্যোৎস্নাফোয়ারা কেমন একা একা ঋদ্ধ হচ্ছে প্রেতসিদ্ধ জরায়ুর ভেতর নির্মম আত্মকথায় …
সেই স্মৃতি কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
গগনচুম্বী শপিংমলটার পাশ দিয়ে যখনই যাই অরুণদার কথা মনে পড়ে। পুরো নাম, অরুণ্ময় বিশ্বাস--- দাস-ক্যাপিটাল, ক্লাশ-স্ট্রাগল, রেডবুক, চারু মজুমদার জঙ্গল সাঁওতাল, হাংরি জেনারেশন, সোমেন চন্দ, এরকম বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের অনর্গল বলে যেতেন অরুণদা গল্পের মত করে, হরিদার দোকানে বসে, হাতে ধরা থাকত চায়ের গ্লাস, ঠোঁটে চারমিনার— আমরা কয়েকজন কলেজ পড়ুয়া মন্ত্রমুগ্ধের মত সব শুনতাম ...
শপিংমলের পিছনে, এখন যেখানে ‘কার-পার্কিং’ তৈরি হয়েছে, সেখানেই ছিল ওদের টালির চালের দু-কামরার ঘর--- অরুণদাকে খোঁজার অছিলায় বেশ কবার ওদের বাড়ি গেছি অরুণদার বোন প্রীতিকে একঝলক দেখার আশায়, দুটো কথা বলার আশায়। ওর তখন ক্লাশ টুয়েল্ভ ...
তারপর কী যে কোথায় ভূমিকম্প হল একদিন , অরুণদা-প্রীতি কোথায় হারিয়ে গেল, আর কোনদিন ওদের খুঁজে পাইনি--- এখনো ওই মলের পাশ দিয়ে গাড়ি করে যাওয়ার সময় অরুণদার চোখদুটো আর প্রীতির মিস্টি হাসিটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই ...
নির্বাসন কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
তুমি নির্বাসন চাওতো নাও, তা বলে পাতার ফাঁক দিয়ে আর ফিরে তাকিও না— যে দিনগুলি হঠাত অতীত হয়ে গেল সেগুলি থেকে স্বপ্নগুলি মুছে তুলে রাখো দেরাজে, ইচ্ছা করলে সেগুলি মাঝে মাঝে বার করে দেখো, কিন্তু, ভুলেও আর ফিরে তাকিও না …
যে দিনগুলির মধ্যে ছিল বেঁচে থাকার বুদবুদ, নিজেকে পরিণত করে তোলার মত অহংকার--- সেগুলি যখন ফুতকারে উড়িয়ে বেছে নিয়েছো নতুন গ্রহের বাসস্থান, তখন আর ফিরে তাকিও না— জন্মান্তরে পৌঁছে ভালো থেকো, ভালো থাকার ভান কোরনা …
সাক্ষাৎকার কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
যদি লাল রঙ বলো লাল রঙে লিখবো, যদি বলো হলুদ, তাহলে হলুদ রঙে লিখবো, সবুজ-মেরুন-তুঁতে-কালো সব রঙেই লিখতে রাজী, শুধু নীল রঙে লিখতে বলোনা, সব নীল গলাধকরণ করে আমি নীলকন্ঠ হয়ে বসে আছি ...
একথা বলার পর, আমি কবির এক দীর্ঘ সাক্ষাতকার নিলাম, সেখানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা প্রশ্ন করে জানার চেষ্টা করলাম তার নীলকন্ঠ হওয়ার ইতিহাস, সেখানেও তিনি সব রঙের কথা বলে সযত্নে এড়িয়ে গেলেন নীল-কথা ...
ফিরে আসার সময় দেখলাম তার একেকটা ঘরের দেওয়াল এক এক ধরণের, কোনও ঘরে কাশ্মীর তো, কোনও ঘরে কেরল,. কোনও ঘরে বাংলাতো, কোনও ঘরে বাংলাদেশ, টুকরো টুকরো ইরাক-ইরান- ইজরায়েল--মায়ানমার-পাকিস্তান মুখোশ, টেরাকোটা-একতারা-কোরাল সব আছে তার ঘরে। কিন্তু, কোথাও নীল রঙ নেই, সব নীল যেন ঢুকে আছে তার গভীর ভিতরে ...
হাতে কি ধরে আছো লোভের হাতল ? পা-এ, পালিয়ে যাওয়ার রণপা ? যদি, তা-ই হয়, তাহলে সীদ্ধান্ত নাও তুমি কোন দিকে যাবে ? নিরামিষ, না আমিষ দুধ না মদ, ভালোবাসা, না শরীর ? কোনটা তোমার সঠিক পছন্দ ---
সেই বুঝে সুরের পৃথিবী তোমাকে গ্রহণ করবে, অথবা ফেলে দেবে অ-সুরের ডাস্টবিনে …
দৈববানী কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
এমন কবিতা লেখো, যেন গাছেরা শুনতে পায় এমন কবিতে লেখো, যেন পিঁপড়েরা গুটিগুটি পা-এ তোমার খাতার পাশে এসে বসে -- অন্যরা যা লিখছে লিখুক, গমগম স্বরে কবিতা পডুক, মঞ্চ দাপিয়ে বেড়াক, তুমি শুধু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবনগুলিকে ভালোবাসা দিয়ে আদর করে , কাছে টেনে নাও, তাদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করো, ওদের আনন্দ, যন্ত্রণাগুলিকে নিজের বুকে নিয়ে দ্যাখো ওরাই তোমাকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিচ্ছে, পৃথিবীর সব রূপ-রস-গন্ধ ছেঁকে এনে তুলে দিচ্ছে তোমার কোচড়ে -- কবি না হয় নাই হতে পারলে, কবির মত একটা জীবন কাটিয়ে যেতে পারবে শেষ অবধি ...
এমন দৈববাণী শুনিয়ে যিনি চলে গেলেন তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি আমার কোনদিন --- ভোরের আলো ফোটা থেকে পৃথিবীর শিরা-উপশিরায় কবিতা খুঁজে বেড়াই, প্রতিদিন ...
সংগ্রহশালা কবি বিশ্বজিৎ রায় মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৯.২০১৯
দ্যাখো, ভালো করে ঘুরে ঘুরে দ্যাখো আমার নিজের হাতে গড়া সংগ্রহশালা -- শুধু আমার নয়, তোমার, তোমাদের সকলের মূল্যবান টুকরো টুকরো, সুখ-দুঃখ-স্মৃতির সংগ্রহ, সব সজত্নে সাজিয়ে রেখেছি তোমরা একদিন দেখতে আসবে বলে ...
পূর্ব দিকের ঘরগুলিতে আমার নিজস্ব সবকিছু সাজিয়ে রেখেছি, যেগুলি কোনদিন কাউকে দেখাতে পারিনি, ডেকে বলতে পারিনি -'এগুলি নিয়েই বেঁচে আছি'। পশ্চিমের ঘরগুলিতে রেখেছি তোমাদের থেকে পাওয়া নানান সামগ্রী-- আমন্ত্রণপত্র, প্রশংসাপত্র থেকে শুরু করে অকথা-কুকথা, হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষের সব দলিল, প্রমাণপত্র, ছবি, ইত্যাদি --
উত্তরের ঘরগুলিতে রয়েছে প্রাচীন পুঁথির মতো আমার অনেক অপ্রকাশিত লেখার পাণ্ডুলিপি, যা তোমাদের চমকিত করলেও করতে পারে। দক্ষিনের ঘরগুলিতে রয়েছে কিছু ভাল লাগা গান ও ছবির সম্ভার-- যদি কোনদিন এই সংগ্রহশালায় আসো, তাহলে ভালো করে দেখে যেও সব আমার এ'জন্মের উপহারগুলি, তোমার জন্য, তোমাদের জন্য ...