বৈষ্ণব ইতিহাসে “বলদেব” নামে খ্যাতিমান একজনই রয়েছেন। তিনি হলেন “গোবিন্দ-ভাষ্য” প্রণেতা বলদেব বিদ্যাভূষণ। শৈশবে তাঁর নিবাস ছিল উড়িস্যার বালাসোর জিলার রেমুনা শহরের কাছে। কিন্তু দীনহীন হরিদাস গোস্বামীর বৈষ্ণব দিগদর্শনী গ্রন্থের ১৩০-পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, "বলদেব বিদ্যাভূষণ পূর্ববঙ্গবাসী শৈব পণ্ডিত ছিলেন যিনি পরে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বৃন্দাবন গমন করেন"। তাঁর জন্ম সম্ভবত সপ্তদশ শতকের শেষে অথবা অষ্টাদশ শতকের শুরুতে। কথিত আছে যে তিনি খণ্ডায়ত সম্প্রদায়ের ছিলেন। তাঁর লেখা “শব্দসুধা”-র শেষে তিনি তাঁর পিতার নাম লিখেছেন গঙ্গাধর মাণিক্য। কথিত আছে যে শৈশবে তিনি চিলকা হৃদের তীরে অবস্থিত পাঠশালায় পড়েছেন। তারপর তিনি মহীশূরে গিয়ে মধ্ব-সম্প্রদায়ে যোগদান করেন। এরপরে তিনি পুরীতে গিয়ে, কুঞ্জমঠের সেবাধিকারী, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের, রাধা-দামোদর গোস্বামীর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি নবদ্বীপ ঘুরে বৃন্দাবনে গিয়ে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ওরফে হরিবল্লভের কাছে শিক্ষালাভ করেন।
অনেক লেখকেরই ধারণা এই যে বলদেব বিদ্যাভূষণ “গোবিন্দ-ভাষ্য” রচনা করেন, মহারাজা সওয়াই জয় সিংহ ২য়-এর রাজত্বকালে, জয়পুরের নিকট গলতা উপত্যকায় গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের বিরুদ্ধপক্ষ রামানন্দীদের আনা অন্যায় অভিযোগের যথাযত উত্তর দিতে। তিনি রামানন্দীদের নিরস্ত করে, রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে একই ঘরে রেখে পূজা করার অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রামাণিক শাস্ত্রিয় ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন। প্রমাণ করেছিলেন যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়, শাস্ত্রীয় মতে একটি সম্পূর্ণ বৈধ সম্প্রদায়।
বৈষ্ণব সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ ডেমিয়ান মার্টিনসের মতে, বলদেব বিদ্যাভূষণই “গোবিন্দভাষ্য” লিখেছিলেন, কিন্তু গলতার বিচারের সময়ে নয়। তাঁর মতে, গলতার বিচারের সময় যা তিনি লিখেছিলেন, তার নাম “ব্রহ্ম- সূত্র-কারিকা-ভাষ্য” যা লেখা হয় ১৭৩০ খৃষ্টাব্দ নাগাদ। পরে বিস্তারিতভাবে তিনি গোবিন্দ-ভাষ্য লেখেন ১৭৫৮ খৃষ্টাব্দে। এ বিষয়ে তিনি তথ্যপ্রমাণও উপস্থাপন করেছেন।
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক, শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . . “. . . বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই।”
কবি বলদেব দাস - এর একটি মাত্র ব্রজবুলিতে রচিত “জয় জয় মঙ্গল আরতি দুহুঁকি” পদ রয়েছে প্রাচীন পদাবলী সংকলনের মধ্যে বৈষ্ণবদাস সংকলিত “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু”-তে এবং দ্বিজ মাধব সংকলিত “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”-এ। তাঁর অন্য কোনও পদ আমাদের সংগ্রহের পদাবলী সংকলনগুলিতে পাওয়া যায় নি।
কবি বলদেব বিদ্যাভূষণের ছবি - পাতার উপরে . . . কবি বলদেব বিদ্যাভূষণের ছবিটি আমরা বৈষ্ণব ধর্ম তথা সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ, ডেমিয়ান মার্টিনের ব্লগ থেকে পেয়েছি। এর জন্য তাঁর প্রতি আমারা চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। তাঁর ব্লগে যেতে . . .।
ছবিটি রয়েছে বৃন্দাবনের রাধা-গোকুলানন্দ মন্দিরে। কেউ কেউ বলেন যে বলদেব বিদ্যাভূষণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। এই ছবিতে তাঁর উপবীত দেখা যাচ্ছে। ডেমিয়ান মার্টিন বলছেন যে এটাই প্রমাণ যে বলদেব বিদ্যাভূষণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন নি। কারণ তিনি ছিলেন মধ্ব-সম্প্রদায়ের বৈষ্ণব এবং মধ্বরা সন্ন্যাস গ্রহণ করলে উপবীত ধারণ করতেন না।
কবি বলদেব দাস সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকায় পদকর্তা বলদেব দাস সম্বন্ধে ১২৩-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“ ’'বলদেব দাস’ ভণিতার শুধু একটি মাত্র পদ (২৮৪২ সংখ্যক) পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হইয়াছে। বৈষ্ণব সাহিত্যে একজন বলদেবই বিশেষ প্রসিদ্ধ। ইনি ব্যাসদেবের কৃত বেদান্তসূত্রের গোবিন্দ-ভাষ্যের প্রণেতা বলদেব বিদ্যাভূষণ। বলদেব ষটগেস্বামীর পরবর্ত্তী লোক এবং সম্ভবতঃ সুপ্রসিদ্ধ সংস্কৃত বৈষ্ণব কবি ও টীকাকার বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তীর সমসাময়িক ছিলেন। প্রবাদ আছে যে, ভারতের সকল প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ই চারি সম্প্রদায়ের কোন না কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া মাধ্ব-গৌড়ীয় বৈষ্ণবদিগের অচিন্ত্য ভেদাভেদবাদ-বিশিষ্ট মতটীকে সম্প্রদায়হীন মনে করিয়া অন্যান্য সম্প্রদায়ীরা গৌড়ীয়াদিগকে কিঞ্চিৎ অবজ্ঞার চোখে দেখিতে আরম্ভ করিলে, সেই মাধ্ব-গৌড়ীয় মতের সমর্থনের জন্য স্বতন্ত্র বেদান্তভাষ্য প্রণয়নের একান্ত প্রয়োজন অনুভূত হয়। বলদেব বিদ্যাভূষণ অশেষ পাণ্ডিত্ব সহকারে তাঁহার সুপ্রসিদ্ধ ‘গোবিন্দ-ভাষ্যে’র প্রণয়ন করিয়া বিচারে তাঁহার সমসাময়িক বিভিন্ন মতের বৈষ্ণব দার্শনিকগণকে পরাজিত করিলে তদবধি গৌড়ীয় বৈষ্ণবদিগের ‘মাধ্ব-গৌড়েশ্বর’ সম্প্রদায়ও নিখিল বৈষ্ণব সমাজের মধ্যে বিশেষভাবে সমাদর লাভ করিতে থাকেন। সুতরাং গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মতসংস্থাপক বলিয়া শ্রীরূপ, সনাতন বা শ্রীজীব গোস্বামী যেরূপ সম্মানার্হ, বলদেব বিদ্যাভূষণও সেইরূপ সম্মানার্হ সন্দেহ নাই। পদকর্ত্তা বলদেব দাস এই প্রসিদ্ধ বলদেব বিদ্যাভূষণ, কিংবা অন্য কোনও বলদেব, নিশ্চিত বলা যায় না। গোবিন্দ-ভাষ্য ব্যতীত বলদেব শ্রীজীব-প্রণীত প্রসিদ্ধ যট্-সন্দর্ভের কোন কোন সন্দর্ভের ও রূপগোস্বামীর রচিত স্তব-মালার টীকা রচনা করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার “গোবিন্দ-ভাষ্য”ই তাঁহাকে বৈষ্ণব-সাহিত্যে অমর করিয়া রাখিবে।”
বলদেব বিদ্যাভূষণের গোবিন্দ-ভাষ্য নিয়ে হরিদাস গোস্বামীর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . দীনহীন হরিদাস গোস্বামীর ১৯২৫ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব দিগদর্শনী” গ্রন্থের ১৩০-পৃষ্ঠায় বলদেব বিদ্যাভূষণ সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন . . .
“অম্বররাজ দ্বিতীয় জয়সিংহ ১৬৯৯ খৃষ্টাব্দে রাজ্যলাভ করিয়া অম্বর হইতে রাজধানী তুলিয়া জয়পুরে স্থাপন করিলেন। ইঁহার অসাধারণ গুণে মুগ্ধ হইয়া দিল্লীর বাদশাহ ইঁহাকে “সওয়াই” উপাধি দিয়াছিলেন। ইঁহার রাজত্বকালে বৈষ্ণবগণের বৈষ্ণবগণের স্বকীয়া ও পরকীয়া মতের ভজন লইয়া মহা বিরোধ উপস্থিত হইল। গৌড়ীয় বৈষ্ণবের বিরুদ্ধপক্ষীয় বৈষ্ণবগণ রাজা জয়সিংহকে শাস্ত্র বিচারে বুঝাইয়া দিলেন যে, শ্রীগোবিন্দ দেবের সহিত শ্রীরাধিকা মূর্ত্তির পূজা শাস্ত্র বিরুদ্ধ, কারণ শ্রীরাধার নাম কোন প্রাচীন পুরাণ বা শাস্ত্রে নাই। রাজা, শ্রীমতী রাধিকার শ্রীমূর্ত্তি পৃথক গৃহে রাখিয়া স্বতন্ত্র পূজার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। বৃন্দাবনে হুলুস্থুলু পড়িয়া গেল। পণ্ডিতপ্রবর শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তী তথন শ্রীরাধাকুণ্ডতীরে বার্দ্ধক্যে জরাজীর্ণ হইয়া বাস করিতেছেন। তাঁহার আদেশে শ্রীগোবর্দ্ধনবাসী সুপণ্ডিত শ্রীবলদেব বিদ্যাভূষণ জয়পুরে গিয়া স্বকীয়াবাদী বৈষ্ণবদিগকে বিচারে পরাস্ত করিয়া পরকীয়া মত স্থাপন করিয়া আসিলেন পুনরায় পূর্ব্বের মত সেবা প্রচলিত হইল। গৌড়মণ্ডলে স্বকীয়বাদ স্থাপন করিবার জন্য শ্রীকৃষ্ণদেব ভট্টাচার্য্য নামক জনৈক পণ্ডিতকে জয়পুর রাজসভা হইতে গৌড়ে প্রেরিত হইল। সর্ব্বত্র জয় করিয়া শ্রীপাট মালিহাটী গ্রামে আসিয়া, এই পণ্ডিত প্রভু রাধামোহনের নিকট বিচারে পরাস্ত হইয়া অজয়পত্র লিখিয়া দিলেন। এই ব্যাপারে প্রভু রাধামোহন সমগ্র বৈষ্ণবজগতে সুপরিচিত হইয়া সুবিমল কীর্ত্তি জর্জ্জন করিলেন।
পরম বৈষ্ণব সুপণ্ডিত শ্রীবলদেব বিদ্যাভূষণ এই সময়ে তাঁহার বিখ্যাত “গোবিন্দ-ভাষ্য” রচনা করেন। শ্রীবলদেব বিদ্যাভূষণ পূর্ব্ববঙ্গবাসী শৈব পণ্ডিত ছিলেন, পরে বৈষ্ণব ধর্ম্মে দীক্ষিত হইয়া শ্রীবৃন্দাবন গমন করেন। তথায় বেষাশ্রয় ও গোবিন্দদাস নাম গ্রহণ করিয়া শ্রীগোবর্দ্ধনকন্দরে বাস ও ভজন-সাধন করেন। ইঁহার রচিত বহু গ্রন্থ আছে। ইনি শ্যামানন্দী-সম্প্রদায়ী বৈষ্ণব ছিলেন। কিন্তু কেহ কেহ বলেন ইনি শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তীর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করিয়া ছিলেন।”
ডেমিয়ান মার্টিনসের Baladeva Vidyabhusana Project-এর গবেষণা - পাতার উপরে . . . শ্রী ডেমিয়ান মার্টিনস একটি গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে বলদেব বিদ্যাভূষণ সম্বন্ধে। সেই গবেষণার নাম Baladeva Vidyabhusana Project। তাঁর একটি নিজস্ব Blog আছে। এবং ব্লগটি তাঁর গবেষণার বিভিন্ন অগ্রগতি জানানোর জন্য।
তাঁর মতে বলদেব বিদ্যাভূষণ “গোবিন্দ-ভাষ্য” লেখা শেষ করেছিলেন সম্ভবত ১৭৫৮খৃষ্টাব্দে, যে বছর এই গোবিন্দ-ভাষ্যের একটি অনুলিপি গোপীবল্লভপুরে পাঠানো হয়। ডেমিয়ান মার্টিনের মতে ১৭৩০ খৃষ্টাব্দে, যে সংক্ষিপ্ত ভাষ্যটি বলদেব লিখেছিলেন, তার নাম ছিল “ব্রহ্ম-সূত্র-কারিকা-ভাষ্য”। পুথিতে রচনাকালের কোনও নির্দেশ না থাকলেও, তাঁর মতে অন্য কিছু সংশ্লিষ্ট দলীল-দস্তাবেজ থেকে ১৭৩০ খৃষ্টাব্দকে রচনার সময়কাল মনে করা যেতে পারে। এবং এই লেখাটিই তিনি, রাজা ২য় জয় সিংহের আদেশে লিখেছিলেন, গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের বৈষ্ণব-সমাজে বৈধতা প্রদান করার জন্য।
বৈষ্ণব সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ ডেমিয়ান মার্টিনস, তাঁর নিজস্ব ব্লগে বিদ্যাভূষণের কর্ম ও জীবন সম্বন্ধে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন। আমরা সেখান থেকে অংশবিশেষ এখানে তুলে দিচ্ছি। বিদ্যাভূষণের রচিত বিখ্যাত “ভাষ্য” সম্বন্ধে তিনি নিখেছেন . . .
“By divine providence, it was through the hand of Śrī Baladeva Vidyābhūṣaṇa that the Gauḍīya- sampradāya came to be widely accepted as a bona fide school of Vedānta. Under the patronage of Sawai Jai Singh II (1688-1743 AD), King of Amber, Vidyābhūṣaṇa composed important works and became an exalted saint and scholar both in Vṛndāvana and Jaipur. The King not only commissioned him to write important treatises but also made him a member of his court, as confirmed at the end of this book. Several documents preserved at the Rajasthan State Archives corroborate Vidyābhūṣaṇa’s lifelong relationship with the royal family. It was King Jai Singh who first requested him to present a commentary on the Brahma-sūtras, both for his personal studies as well as to appease the claims raised against the authenticity of the Gauḍīya lineage. In response, Vidyābhūṣaṇa shortly produced the Brahma-sūtra-kārikā- bhāṣya, which starts by declaring that he is thereby fulfilling the King’s order to have such a commentary. Although the manuscript is undated, related documentation seems to indicate the text may have been written in the late 1730s. It is not clear when Vidyābhūṣaṇa started to work on a more comprehensive commentary that he named ‘Govindā-bhāṣya,’ but many years may have elapsed after the Kārikā-bhāṣya. Jai Singh suddenly passed away in 1743, probably many years before the completion of the Govinda-bhāṣya, a text that has never been added to his large collection of commentaries on Vedānta. Since the copy Vidyābhūṣaṇa sent to Gopiballabhpur is dated 1758 AD, this is possibly the year in which the Govinda-bhāṣya was concluded.”
বলদেব বিদ্যাভূষণ সম্বন্ধে নন্দরাণী দেবী দাসী ও দয়ানন্দ দাস - পাতার উপরে . . . http://www.krishna.com/ এ প্রকাশিত, নন্দরাণী দেবী দাসী ও দয়ানন্দ দাস বিরচিত ইংরেজীতে “Baladeva Vidyabhushana Part II”, আলেখ্যে, বলদেব বিদ্যাভূষণের জীবন এবং কর্ম নিয়ে লিখতে গিয়ে, তাঁরা মহারাজা সাওয়াই জয় সিংহ ২য়-এর সময়কালে তাঁর দরবারে ঘটে যাওয়া স্বকীয়া-পরকীয়াবাদের বিতর্কসভার একটি বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা নীচে তার কিছুটা বাংলায় তুলে দিচ্ছি।
মহারাজা সাওয়াই জয় সিংহ, শৈশব থেকেই বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন। তখন শ্রী, ব্রহ্ম, রুদ্র, এবং সনক, এই চারটি স্বীকৃত বৈষ্ণব সম্প্রদায় ছিল। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়, এই চারটি স্বীকৃত বৈষ্ণব সম্প্রদায় ভুক্ত ছিলেন না বলে তাঁদের দ্বারা পূজিত রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহের পূজা মানতে অস্বীকার করছিলেন রাজপুতানার গলতা-র প্রভাবশালী রামানুজ সম্প্রদায়ের রামানন্দী বৈষ্ণবগণ। তাঁরা রাধার বিগ্রহকে শ্রীকৃষ্ণের কক্ষ থেকে সরিয়ে অন্য কক্ষে স্থাপন করে পূজা করার দাবী করছিলেন, কারণ শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা বিবাহিত ছিলেন না। ভগবান বিষ্ণুর পূজা না করে শ্রীকৃষ্ণের পূজা করারও তাঁরা বিরোধিতা করছিলেন। এতে বোঝা যায় যে মহারাজা জয় সিংহের উপর স্বকীয়াবাদীদের চাপ ছিল পরকীয়াবাদীদের বিতাড়িত করার। উদারমনা প্রজাবত্সল মহারাজা নিজে রাধা-কৃষ্ণের ভক্ত হয়েও তাঁর দরবারের এই প্রভাবশালীদের মতের বিরুদ্ধে যেতে পারছিলেন না।
[ এখানে উল্লেখনীয় এই যে বৈষ্ণব ধর্মে “শ্রী, ব্রহ্ম, রুদ্র, এবং সনক”, এই চারটি স্বীকৃত বৈষ্ণব সম্প্রদায় নিয়ে সনাতন ধর্মতত্ব ব্লগের “বৈষ্ণব সম্প্রদায়-১ম পর্ব” প্রবন্ধে খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাঠকের জন্য তা আমরা এখানে তুলে দিচ্ছি। এর জন্য আমরা ঐ ব্লগের লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সনাতন ধর্মতত্ব ব্লগে যেতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন . . .।
“বিষ্ণুর উপাসকরা প্রধানতঃ বৈষ্ণব নামে পরিচিত। বিষ্ণুর পূজা, বিষ্ণুর উপাসনা বেদে দেখতে পাই। বিষ্ণুর উপাসনা উপনিষদ আদিতেও দেখা যায়। পুরাণের মধ্যে বিষ্ণুপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত, গরুড়-পুরাণ, নারদীয় পুরাণ প্রভৃতিতে বিষ্ণুর মহিমা বিশেষ ভাবে পরিকীর্ত্তিত। তবেই বুঝা যায়,-সকল যুগে, সকল সময়েই বিষ্ণুর পূজা প্রচলিত ছিল ; সুতরাং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ও আবহমান কাল বিদ্যমান আছেন। তবে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর যুগত্রয়ে বৈষ্ণবগণ কত সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিলেন, তার নিদর্শন পাওয়া সুকঠিন। পদ্মপুরাণে দেখা যায়,--- সম্প্রদায়বিহীনা যে মন্ত্রাস্তে নিষ্ফলা মতাঃ। অতঃ কলৌ ভবিষ্যন্তি চত্বারঃ সম্প্রদায়িনঃ। শ্রী-মাধ্বী-রুদ্র-সনকা বৈষ্ণব্য ক্ষিতিপাবনাঃ। চত্বারস্তে কলৌ দেবী সম্প্রদায়প্রবর্ত্তকাঃ॥১॥
অর্থাৎ, যাঁরা সম্প্রদায়-বিহীন বা কোনও সম্প্রদায়-ভুক্ত নন, তাঁদের মন্ত্র ফলদায়ক হয় না। এইজন্য কলিকালে শ্রী, মাধ্বী, রুদ্র ও সনক এই চারজন ক্ষিতি-পাবন বৈষ্ণব আবির্ভূত হয়ে চারটি সম্প্রদায় প্রবর্ত্তন করবেন।
অর্থাৎ-শ্রী (লক্ষ্মী) রামানুজকে, চতুর্ম্মুখ (ব্রহ্মা) মধ্বাচার্য্যকে, রুদ্র (মহাদেব) শ্রীবিষ্ণুস্বামীকে এবং চতুঃসন (সনক, সনন্দ, সনাতন, সনৎকুমার) নিম্বাদিত্যকে আপনি আপন সম্প্রদায়-প্রবর্ত্তকরূপে স্বীকার করেন। এই চার সম্প্রদায় হতে অসংখ্য বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে।” ]
নন্দরাণী দেবী দাসী ও দয়ানন্দ দাসের "বলদেব বিদ্যাভূষণ ২য় খণ্ড" আলেখ্যে তাঁরা বলেছেন যে বলদেব বিদ্যাভূষণই মহারাজার দরবারে স্বকীয়া রামানন্দীদের, তর্কযুদ্ধে পরাস্ত করে পরকীয়াবাদের প্রতিষ্ঠা করেন। বলদেব বিদ্যাভূষণ ছিলেন বৃন্দাবনের খ্যাতিমান, পরকীয়াবাদের প্রতিষ্ঠাতা এবং "শ্রীশ্রীক্ষণদাগীতচিন্তামণি" নামক বৈষ্ণব পদাবলীর সংকলনের রচয়িতা বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর শিষ্য। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী, হরিবল্লভ বা বল্লভ ভণিতায় পদরচনা করেছিলেন। মহারাজা জয় সিংহ যে স্বকীয়াবাদ ও পরকীয়াবাদের একটি সুষ্ঠ বিচার চাইছিলেন তা এই আলেখ্যে পরিষ্কার।
এখানে আমরা গৌড়মণ্ডলে কোনও পণ্ডিতকে পাঠানোর কথা লেখা দেখতে পাই না। সেই ঘটনাবলী, বলদেব বিদ্যাভূষণের জীবনের সঙ্গে জড়িত নয় বলেই হয়তো এখানে তার কোনও উল্লেখ করা হয় নি। এই ঘটনাটির কোন সন-তারিখ এই প্রবন্ধে না থাকলেও তাঁরা জানিয়েছেন যে এই বিচারে বলদেব বিদ্যাভূষণের জয়ের পরে ১৭১৪ খৃষ্টাব্দে মহারাজা জয়সিংহ গোবিন্দের বিগ্রহকে জয়নিবাস উদ্যানে নিয়ে যান এবং ১৭৩৫ খৃষ্টাব্দে জয়পুর রাজপ্রাসাদের মন্দিরে তাঁকে স্থানান্তরিত করেন। সুতরাং গলতার বিচারসভার ব্যাপার ১৭১৪ খৃষ্টাব্দের পূর্বেই ঘটে গিয়েছিল বলে তাঁরা মনে করেন।
নন্দরাণী দেবী দাসী ও দয়ানন্দ দাস রচিত ইংরেজীতে “Baladeva Vidyabhushana Part I” আলেখ্যটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . . এবং “Baladeva Vidyabhushana Part II” আলেখ্যটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .
গোবিন্দ-ভাষ্য ও গলতা বিচারসভার সময়কাল নিয়ে আমাদের অভিমত - পাতার উপরে . . . প্রথমত আমরা সতীশচন্দ্র রায় মহাশয়ের সাথে একমত যে এই পাতার “বলদেব দাস” ভণিতার কবিই বলদেব বিদ্যাভূষণ, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবুও বলদেব বিদ্যাভূষণের মতো পণ্ডিত ব্যক্তি জিনি বৃন্দাবনেও থেকেছেন, তিনি ব্রজবুলিতে একটি সুন্দর পদ রচনা করেই থাকতে পারেন। তাই সতীশচন্দ্র রায়ের সাথে আমরা একমত যে অন্য কোনও “বলদেব” এর প্রামাণিক সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত, বলদেব বিদ্যাভূষণকেই এই “জয় জয় মঙ্গল আরতি দুহুঁকি” পদটির রচয়িতা মেনে নিতে আমাদের আপত্তি নেই।
দ্বিতীয়ত, আমরা মিলনসাগরে বলদেব বিদ্যাভূষণের “গোবিন্দ-ভাষ্য” রচনার সময়কাল নিয়ে এখানে কিছু চিন্তা ভাবনা করবো। এই বিষয়ে মুরারি লাল অধিকারী মহাশয় তাঁর ১৯২৫ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব দিগদর্শনী” গ্রন্থের ১৩০-পৃষ্ঠায় এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপর একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তা হলো . . .
“গৌড়মণ্ডলে স্বকীয়বাদ স্থাপন করিবার জন্য শ্রীকৃষ্ণদেব ভট্টাচার্য্য নামক জনৈক পণ্ডিতকে জয়পুর রাজসভা হইতে গৌড়ে প্রেরিত হইল। সর্ব্বত্র জয় করিয়া শ্রীপাট মালিহাটী গ্রামে আসিয়া, এই পণ্ডিত প্রভু রাধামোহনের নিকট বিচারে পরাস্ত হইয়া অজয়পত্র লিখিয়া দিলেন।”
এই ঘটনাটির বেশ খানিকটা অংশ এখানে উল্লিখিত হয় নি। মহারাজা সওয়াই জয় সিংহ ২য়-এর প্রেরিত শ্রীকৃষ্ণদেব ভট্টাচার্য্য এবং রাধামোহন ঠাকুরের মধ্যে স্বকীয়া-পরকীয়া মতের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে বিচারসভা হয় তার জন্য তাঁরা বাংলার নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর (জাফর খাঁ) দরবারে আবেদন করেন। তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। কথিত আছে যে সেই বিচারসভায় রাধামোহন ঠাকুরের দুই শিয্য, শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর রচয়িতা গোকুলানন্দ সেন ওরফে বৈষ্ণবদাস এবং কৃষ্ণকান্ত মজুমদার পরবর্তিতে প্রখ্যাত পদকর্তা উদ্ধবদাস, উপস্থিত ছিলেন। বিচারেরাধামোহনের জয় হয় এবং বিজীতপক্ষের তরফে জয়ীকে একটি অজয়পত্র লিখে দেওয়া হয়। সেই অজয় পত্রটি নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর দরবারে রেজিস্ট্রি করা হয় ১৭ই ফাল্গুন ১১২৫ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৭১৯ খৃষ্টাব্দের মার্চ মাসের শুরুতে।
সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকার ১৩০৬ বঙ্গাব্দের (১৯০০খৃষ্টাব্দ) ৪র্থ সংখ্যায় প্রকাশিত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর “একখানি প্রাচীন দলীল” প্রবন্ধে তিনি লেখেন . . .
“. . . নবার জাফর খাঁ (মুর্শিদকুলি খাঁ) বাঙ্গালার তদানীন্তন শাসনকর্ত্তা। তাঁহার অনুমতিক্রমে, সম্ভবতঃ তাঁহার নিয়োগক্রমে এই বিচার হয়। এই বিচারে পরকীয়ামতাবলম্বী বাঙ্গালী বৈষ্ণবেরা জয়লাভ করেন। এই জয় লাভের পর যে সকল বাঙ্গালী পণ্ডিত পশ্চিমে পরাজিত হইয়া স্বকীয়া মত অবলম্বনে বাধ্য হইয়াছিলেন, তাঁহারা বাঙ্গালার পরকীয়াবাদী বৈষ্ণবগণের পঞ্চ পরিবার হইতে খারিজ হইয়া এই ইস্তফা পত্র লিখিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।”
তিনি তাঁর প্রবন্ধের সঙ্গে প্রথমে তাঁর প্রথম দলীলের প্রাপ্ত অনুলিপিও প্রকাশিত করেছিলেন। দ্বিতীয় দলীলটি পরে প্রকাশিত হয়। এই দলীলের সঙ্গে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আর নতুন কোনো লেখা ছিল না। এছাড়া একটি তৃতীয় দলীলও সামনে আশে। তৃতীয় দলীলটি প্রকাশ করেন হরিদাস দাস তাঁর “শ্রীশ্রীগৌড়ীয় বৈষ্ণব জীবন” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, পরিশিষ্ট (খ) ২৫১-পৃষ্ঠায়। তৃতীয় দলীলটির ভাষা অনেক শুদ্ধ এবং তা মোটেই দরবার বা আদালতে লেখা দলীলের ভাষা নয়। সময়কাল ১৭২১ খৃষ্টাব্দ। ব্যক্তিগত স্তরে যদি জয়ীকে বিজীত তা লিখে দিয়ে থাকেন তবে আলাদা কথা। তাছাড়া এই দলিলে কোন সাক্ষী ও কারও সাক্ষরের উল্লেখ নেই। দ্বিতীয় দলীলটিতে নবাবের সিল-মোহোরের উল্লেখ নেই। এ ছাড়া তারিখহীন ১৭৩১ খৃষ্টাব্দের এই দলিলে সাক্ষীর নামের মধ্যে কানুনগো দর্পনারায়ণের নাম রয়েছে, জিনি ১৭২৭ এর প্রাপ্ত একটি ফরমানে মৃত বলে উল্লিখিত আছেন। প্রথম দলীলটিতে নবাবের সীল-মোহোরের উল্লেখ রয়েছে এবং দলীলের তারিখ ১৭ ফাল্গুন ১১২৫ বঙ্গাব্দ (১৭১৯ খৃষ্টাব্দ)।
আমরা প্রথম দলীলটিকেই সর্বাধিক গ্রহণ যোগ্য বলে মনে করছি। যদিও দলীলের প্রথম দিকে মহারাজা জয় সিংহের প্রেরিত সভাপণ্ডিতের নাম কৃষ্ণদেব ভট্টাচার্য্য থাকলেও দলীলের শেষ দিকে তা দিগ্বিজয় ভট্টাচার্য্যে বদলে গিয়েছে।
এই নাম বদলের একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। সেকালে যে সব পণ্ডিত বিভিন্ন স্থানে গিয়ে তর্কযুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা ও ধন উপার্জন করতেন, তাঁদের “দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত” বলা হতো। সেই মতো, রাজা সওয়াই জয় সিংহ ২য়-এর প্রেরিত শ্রীকৃষ্ণদেব ভট্টাচার্য্যও একজন “দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত”-ই ছিলেন, কারণ তিনি বিভিন্ন স্থানে ঘুরে তর্কযুদ্ধে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করে আসছিলেন। তাই দলীলের শেষে তাঁর নামটি কৃষ্ণদেব ভট্টাচার্য্যের বদলে দিগ্বিজয় ভট্টাচার্য্য লেখাতে তেমন কোন দোষ হয়নি। বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতের আদি খণ্ডের ১০ম অধ্যায়ে এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃতের আদিলীলার ষোড়শ পরিচ্ছেদে রয়েছে --- শ্রীগৌরাঙ্গের সঙ্গে কোন এক সরস্বতী দেবীর আশীর্বাদধন্য "দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতের" সঙ্গে তর্কে শ্রীগৌরাঙ্গের জয়ের বর্ণনা রয়েছে। পণ্ডিতের নামের উল্লেখ নেই কিন্তু তাঁকে "দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত" নামেই উল্লেখ করা হয়েছে। ৩.৮.২০১৯।
প্রথম দলীলের শেষ দিকে রয়েছে যে গৌড়েমণ্ডলে পরাজিত হয়ে তাঁরা মহারাজার কাছে ফেরত গেলে পরে পুনঃ তাঁর সভায় বিচার হয় এবং তারপরেই পরকীয়াবাদের বৈধতা স্বীকার করে নেওয়া হয়। এই বিচার সভাই কি গলতার বিচারসভা ছিল? দলীলের শেষ দিকে লেখা আছে . . . (দলীলের ভাষা ও বানান অপরিবর্তিত রাখা হলো )
“. . . শ্রী.ঁ রাধামোহন ঠাকুর শ্রীশ্রী.ঁ আচার্য্য ঠাকুরের সন্তান তাহার সঙ্গে শ্রীযুত রাজা সওায়ের সভাপণ্ডিত অনেক সাস্ত সিদ্ধান্ত বিচার করিলেন তাহাতে শ্রীশ্রী.ঁ আচার্য্য প্রভুর সন্তান শ্রী.ঁ রাধামোহন ঠাকুরকে পরাভব করিতে পারিলেক না অতএব শ্রীদ্বিগবিজয় ভট্টাচার্য্য পরাভব হইয়া অজয়রত্র লিখিয়া ঠাকুরের স্থানে শীষ্য হইয়া পরকীয়াধর্ম্ম গ্রহণ করিলেক এবং দস্খত পরকিয়ায় ধর্ম্মের পর করিয়া দেসকে গেলেন এখানে জে সকল সাস্তগ্রেন্থ লইয়া বিচার হইল সেই সাস্ত শ্রীদ্বীগবিজয় শ্রীযুত মহারাজার নিকট গেলেন পুন ২ সভা শ্রীযুত রাজার সভাসতে বিচার হইল বিচারে পরক্রিয়াধর্ম্ম মোক্ষ হইল শ্রীমৎ আগম শ্রীমৎ ব্রহ্মবৈবত্ত এবং শ্রীমৎ ব্রেসদেবের শ্রীমত্ভাগবৎ এবং শ্রীমৎ হরিবংস আদি ভাগবত সাস্ত এবম শ্রী.ঁ গোস্বামীদিগের শ্রীমৎ ভক্তি সাস্ত এই সকল গ্রেন্থের মতে পরাভব হইয়া জয়নগরে গেলেন সেখানে পুন সভাসত হইয়া বিচার হইল শ্রীশ্রী.ঁ রাধাকুণ্ডে পরক্রিয়া ধর্ম্মের ঢাণ্ডা গারা গেল . . .”
এখানে দেখা যাচ্ছে যে বাংলা থেকে মহারাজার দেশে ফেরত যাবার পরে দুটি বিচার সভার উল্লেখ রয়েছে। সম্ভবত বাংলায়, রাজা জয় সিংহের প্রেরিত পণ্ডিতের পরাজয়ের পরেও সেখানকার বিরোধী রামানন্দী সম্প্রদায়ের মহান্তরা গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের বৈধ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এর পরেই সম্ভবত গলতা উপত্যকার বিচার সভায় বৃন্দাবনের গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের পক্ষে উপস্থিত হয়ে, বলদেব বিদ্যাভূষণ “গোবিন্দ-ভাষ্য” বা “ব্রহ্ম-সূত্র-কারিকা-ভাষ্য” (ডেমিয়ান মার্টিনস এর মতে) রচনা করে রামানন্দীদের বিচারে পরাস্ত করেছিলেন।
এই সময়ে বৃন্দাবনের গোস্বামী বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তীর প্রায় ৬০-৭০ বছর বয়স যা উপরোক্ত একাধিক উদ্ধৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। "বৈষ্ণব পদলহরী"-র সংকলক ও সম্পাদক দুর্গাদাস লাহিড়ী উক্ত সংকলনে, বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর জন্মের সাল জানিয়েছেন ১৬৬৩ খৃষ্টাব্দ। কোথাও কোথাও ১৬৫৪ খৃষ্টাব্দের উল্লেখ রয়েছে । তাঁর তিরোধানের বর্ষ ১৭৩৪ খৃষ্টাব্দ। ১৭১৯ এর পরে, ১৯২২-২৩ সালের সময়কালটিই গলতা বিচারসভার সর্বাধিক সম্ভাব্য সময়কাল বলে আমরা মনে করছি। ডেমিয়ান মার্টিনসের মতে ১৭৩০ খৃষ্টাব্দে নয়, আবার নন্দরাণী দেবী দাসী ও দয়ানন্দ দাসের মতে ১৭১৪ খৃষ্টাব্দের পূর্বেও নয়। ---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥