কবি চৈতন্যনন্দন - এই ভণিতার একটি মাত্র পদ পাওয়া গিয়েছে। আমাদের মতে চৈতন্যনন্দন, শ্রীনিবাস আচার্য্যের অপর একটি ভণিতা মাত্র। এ বিষয়ে আমাদের ব্যাখ্যা . . .
এই কবি সম্বন্ধে কোনও তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। বৈষ্ণবসাহিত্যের পূর্বেকার কোনও বিশেষজ্ঞ, পদকর্ত্তা চৈতন্যনন্দনের পরিচিতি নিয়ে কিছু লিখে যান নি।
তাঁর একটি মাত্র পদ “রাধাকৃষ্ণপদ মন ভজ অনিবার” পাওয়া গিয়েছে যার শেষ দুটি কলি এই রকম . . . অনঙ্গমঞ্জরী পদ করিয়া শরণ। ভজন উদ্দেশ গায় চৈতন্যনন্দন॥
এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এই পদকর্ত্তা “অনঙ্গমঞ্জরী”র শিষ্য ছিলেন। অনঙ্গমঞ্জরী ছিলেন ব্রজলীলার নবমঞ্জরীর অন্যতম এবং নবদ্বীপ লীলায় তিনিই ষটগোস্বামীগণের অন্যতম শ্রীগোপালভট্ট নামে খ্যাত হন। শ্রীনিবাসাচার্য্য ছিলেন বৃন্দাবনের গোস্বামী গোপালভট্টের দীক্ষিত শিষ্য।
শ্রীনিবাসাচার্য্যের পিতা ছিলেন ভাগীরথী তীরে চাখন্দি গ্রামের গঙ্গাধর ভট্টাচার্য্য। তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর, কেশবভারতীর কাছে সন্ন্যাসগ্রহণের কালে উপস্থিত ছিলেন। শ্রীচৈতন্যের মস্তক মুণ্ডন করার ফলে তিনি এতটাই আঘাত পেয়েছিলেন যে অচেতন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পরে শ্রীচৈতন্যের দীক্ষাগুরু কেশব ভারতীর কণ্ঠে গৌরাঙ্গের নতুন নাম “শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য”-এর কেবল “চৈতন্য”-টুকু শুনতে পেয়ে “হা চৈতন্য” “হা চৈতন্য”, বলে গঙ্গার ধার দিয়ে হাহাকার করতে করতে ছুটতে ছুটতে অবশেষে তাঁর গ্রামে পৌঁছে কিছু দিন অনবরত “চৈতন্য”, “চৈতন্য” বলে যেতে থাকেন, আহার নিদ্রা ত্যাগ করে। তাঁর মুখে এই “চৈতন্য” ডাক শুনে গ্রামের মানুষ তাঁকে “চৈতন্য দাস” নামে ডাকতে শুরু করেন। ফলে শ্রীনিবাস আচার্য্যের পিতা গঙ্গাধর ভট্টাচার্য্যের অপর নাম হয় চৈতন্য দাস। এখানে নাম “চৈতন্য” এবং বৈষ্ণবসুলভ পদবী “দাস”।
আমাদের এই “রাধাকৃষ্ণপদ মন ভজ অনিবার” পদটির ভণিতা “চৈতন্যনন্দন” অর্থাৎ চৈতন্যের ওরফে গঙ্গাধর ভট্টাচার্য্যের পুত্র এবং অনঙ্গমঞ্জরী অর্থাৎ গোপাল ভট্টের শিষ্য শ্রীনিবাস আচার্য ছাড়া আর কেউ নন। ---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
বৈষ্ণবসাহিত্যের পূর্বেকার বিশেষজ্ঞগণের গ্রন্থে চৈতন্যদাসের পরিচয় নেই - পাতার উপরে . . . ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত, মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ- তরঙ্গিণী”, (প্রথম সংস্করণ ১৯০২), সংকলনে “চৈতন্যনন্দন” ভণিতার একটি পদ তুললেও, পদকর্ত্তা সম্বন্ধে কিছু লেখেন নি।
১৯১৬ সালে প্রকাশিত, হরিলাল চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদরত্ন- মালা” সংকলনে সেই একই পদ থাকলেও তিনি তাঁর ১৯০৭ সালে (১৩১২বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত বৈষ্ণব ইতিহাস গ্রন্থে অন্যান্য বহু পদকর্ত্তার পরিচিতি লিখলেও চৈতন্যনন্দনের পরিচিতি লেখেন নি।
বৈষ্ণবদাসের শ্রীশ্রীপদকল্পতরু সংকলনে চৈতন্যনন্দনের কোনও পদ নেই। তাই সতীশচন্দ্র রায় সেই গ্রন্থের সম্পাদনার কালে চৈতন্যনন্দনের পরিচিতি দেন নি। তাঁর অপ্রকাশিত পদাবলিতেও একই কারণে চৈতন্যনন্দনের পরিচিতি নেই।
১৯১০ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে প্রকাশিত ৪খণ্ডে, নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত মহাজন পদাবলী “শ্রীপদামৃতমাধুরী” তেও চৈতন্যনন্দনের কোনও পদ নেই।