কবি চূড়ামণি দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
নাচত মোহন নন্দ-দুলাল মেরো কান
ভণিতা চূড়ামণি দাস
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩২৫ বঙ্গাব্দের (১৯১৮ সাল), ২য় খণ্ড, ৩য় শাখা, ১৯শ পল্লব,
কৌমারোচিত বাত্সল্য, ১১৪২-পদসংখ্যায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ শ্রীগান্ধার॥

নাচত মোহন নন্দ-দুলাল মেরো কান।        
নাসা বিরাজিত মোতিম-ভূষণ                
কটি মাঝে ঘুঙ্গুরু রসাল॥১
সুন্দর উর পর বর রুরু-নখ-পদ                
সররুহ রতন-মঞ্জীর।
নব নব বচ্ছ-পুচ্ছ ধরি ধায়ত                
পতন অঙ্গুলি ধুলি-ধুসর শরীর॥
মরকত চান্দ মুকুর মুখ-মণ্ডল                
পরিসর কুঞ্চিত অলক-হিলোল।
ব্রজ-রমণী পরবোধ করায়ত                
নয়ন ফিরায়ত আধ আধ বোল॥
অভিনব নীল জলদ জিনি তনুরুচি        
কহিল নহিল রুপ কিয়ে নিরমাণ।
কত কত ভকত যতন করি ধাওত        
সবে চূড়ামণি দাসের এই নিবেদন॥

টীকা -
১। ‘দুলাল’ শব্দের মিলে ‘রসাল’ শব্দ দ্বারা কলিটি শেষ করায় বুঝা যাইতেছে যে, প্রথম পংক্তির ‘মেরো
কান’ অংশটি গীতের আখর-রূপে প্রযুক্ত হইয়াছে।

ই পদটি উনিশ শতকে প্রকাশিত, নিমানন্দ দাস সংকলিত “পদরসসার” পুথির ১৬৪৯-পদসংখ্যায় এই
রূপে দেওয়া রয়েছে। আমরা পুথিটি হাতে পাইনি। সতীশচন্দ্র রায়ের পদকল্পতরুর টীকা-পাঠান্তর দেখে
এখানে উপস্থাপন করা হলো।

॥ শ্রীগান্ধার॥

নাচত মোহন নন্দ-দুলাল মোর কান।        
নাসা বিরাজিত মোতিম-ভূষণ                
কটি মাঝে ঘুঙ্গুরক সান॥
সুন্দর উর পর বর রুরু-নখ-পদ             
সররুহ রতন-মঞ্জীর।
নব নব বচ্ছ-পুচ্ছ ধরি ধায়ত                
পতন অঞ্জলি ধুলি-ধুসর শরীর॥
মরকত চান্দ মুকুর মুখ-মণ্ডল                
পরিসর কুঞ্চিত অলক-হিলোল।
ব্রজ-রমণী পরবোধ করায়ত                
নয়ন ফিরায়ত আধ আধ বোল॥
অভিনব নীল জলদ জিনি তনুরুচি          
কহিল নহিল রূপ কিয়ে নিরমাণ।
কত কত ভকত যতন করি ধাওত          
সবে চূড়ামণি দাসের এই নিবেদন॥

ই পদটি ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত, নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রর মহাজন পদাবলী
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৩য় খণ্ড, ৮২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

শ্রীগোপালের নৃত্য
॥ ভৈরবীমিশ্র বারোঁয়া - তেওট॥

নাচত মোহন নন্দ-দুলাল মেরো কান।
নাসা-বিরাজিত                        মোতিম ভূষণ
কটি মাঝে ঘুঙ্গুরু রসাল॥
সুন্দর উরপর                      বর রুরু-নখ-পদ
সরোরুহ রতন-মঞ্জির।
নব নব বচ্ছ                        পুচ্ছ ধরি ধায়ত
পতন অঙ্গুলি ধুলি ধুসর শরীর॥
মরকত চান্দ                        মুকুর মুখ-মণ্ডল
পরিসর কুঞ্চিত অলক-হিলোল।
ব্রজ-রমণী পর-                        বোধ করায়ত
নয়ন ফিরায়ত আধ আধ বোল॥
অভিনব নীল                   জলদ জিনি তনু-রুচি
কহিল নহিল রূপ কিয়ে নিরমাণ।
কত কত ভকত                   যতন করি ধ্যাওত
সভে চূড়ামণি দাসের এই নিবেদন॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মাধবেন্দ্র পুরী রছে সেই বৃন্দাবনে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত,  “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ১১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।


এই পদে রয়েছে . . .
নিশাভাগে অদ্বৈতাচার্য্যকে শ্রীকৃষ্ণের বাণী, শচী জগন্নাথ মিশ্রের একমাস ব্যাপী হবিষ্যাশী
জপ-প্রার্থনা, নারায়ণের দর্শন ও শচীগর্ভে তাঁর সমান পুত্রের বরদান, শচীদেবীর স্বপ্ন দর্শন,
এবং নদীয়া নগরে নিমাইর জন্ম, গৌরাঙ্গের নিমাঞি নামটি দাদা বিশ্বরূপ ঘোষণা করলেন,
পিতা নিমাইর পঞ্চম দিনে পাঁচটি বলির ঘোষণা করলেন, ষষ্ঠ দিনে প্রসবিনী শচীদেবী
ষষ্ঠীপূজা করলেন, জন্মের পর অষ্টম দিনে আট-কড়াইয়া ভেজে শিশুদের বিতরণ ও
নিমাঞিকে তাদের দেখানো, নবম দিনে গণকেরা শিশুর নাম বিশ্বম্ভর রাখা স্থির করলেন,
দশম দিনে বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানে অশৌচ শেষ হলো, ছয় মাস বয়সে শুক্লা পঞ্চমী
হস্তানক্ষত্র বুধবারে নিমাঞ্রির অন্নপ্রাসনের দিন স্থির করা হলো, অন্নপ্রাশনের
পূর্বদিবসে সব আয়োজন সেরে জগন্নাথ মিশ্র শয়ন করলেন


॥ এখানে রাগের উল্লেখ নেই॥

মাধবেন্দ্র পুরী রছে সেই বৃন্দাবনে।
ওথা নবদ্বীপে লই শুনছ বচনে॥
ঠাকুর অদ্বৈত জপে বারকোনা ঘাটে।
নিশাভাগে কৃষ্ণ বলি ডাকে গিয়া মাঠে।
আরতি পিরিতি করি গাঢ় অনুরাগে।
আদরে অদ্বৈত ডাকে মাঠে নিশাভাগে॥
করুণা কুহরে শুনি সুমধুর হৃদি।
অদ্বৈতের কাছে আসি কৃষ্ণ দয়ানিধি॥
শুনহ অদ্বৈত তুমি নহ মোর ভিন।
নিত্যানন্দ তুমি আমি একতনু ভিন॥
নিত্যানন্দ জম্মি আছেন শ্রীখলপপুরে।
আমি ত জন্মিব এই নদীয়া নগরে॥
আনন্দে মন্দিরে তুমি করহ গমন।
কলিকাল-সর্প মুঞ্রি করিমু দমন॥
এতবলি কৃষ্ণচন্দ্র অন্যধার্ন করে।
অদ্বৈত চলিলা সুখে আপন মন্দিরে॥
আনন্দে অদ্বৈত করে শ্রীকৃষ্ণমনন।
ওথা শচী জগন্নাথের শুনহ বচন॥
শ্রীমাধবী পৌর্ণমাসী শ্রীমাধব মাস।
নিজ নিজ গৃহে গ্রহ করয়ে বিলাস॥
অতিমহাশুভক্ষণ অর্থ ডভেঠরি (?)।
অতি মহাশুভ ভেল নদীয়া নগরী॥
আনন্দে উল্লাসে লোক আপনা পাসরে।
ঊদ্ধবাহ উচ্চস্বরে হরি হরি করে॥
অন্তরিক্ষে দেবগণ করে পুষ্পবৃষ্টি।
শচী জগন্নাথে কৃষ্ণ কইল শুভদৃষ্টি॥
মাধবেন্দ্র অদ্বৈতের পুরে অভিলাস।
শচীর জঠরসিন্ধু করয়ে বিলাস॥
অধিক অধিক জয় নিতি খিতি ধরে।
জয় জয় দশদিগ সিন্ধুচরাচরে॥
জয় সর্ব্বলোক দুঃখ শোক পাসরিল।
সদাচার দেখি কলি-সন্ধে উপজিল॥
অধিক অধিক জয় নদীয়া নগরে।
গৌর-জম্মে মহালক্ষ্মী প্রতি ঘরে ঘরে॥
রঙ্ক দুঃখী নাহি কেহো সভে ধনবান।
প্রভাতে উঠিয়া সভে করে গঙ্গাস্নান॥
যজ্ঞ দান একাদশী হরি-বাসহরে।
আশ্রমের ধর্ম্ম সভে আদরে আচরে॥
ব্রাহ্মণ অতিথি সেবা সর্ব্বধর্ম্মে মন।
কেহো করে গঙ্গা-নারায়ণ অরচন॥
গৌর-জন্মে মহাজয় নদীয়া-নগরে।
সর্ব্বভাবে মহালক্ষ্মী জগন্নাথ-ঘরে॥
প্রাতক্রিয়া গঙ্গাস্নান উঠিয়া প্রভাতে।
পূজে গঙ্গা বৃন্দাঙ্কুরে চন্দনের সাথে॥
আরত আদর ভক্তি পুত্র অভিমতে।

নারায়ণ অরচয়ে শচী জগন্নাথে॥
হবিষ্যাশী জিতেন্দ্রিয় জপযজ্ঞাচরে।
করে ফল করে মূল করে নিরাহারে।
হেনমতে দুহে জপ একমাস করে।
সাক্ষাৎ হইয়া প্রভু কহে মাগ বরে॥
নারায়ণ-রূপ দেখি ভাবে অগেয়ান।
শচী কহে পুত্র হব তোমার সমান॥
হাসি নারায়ণ কহে সদয়হৃদএ।
মোর সম পুত্র হব কহিলুঁ নিশ্চয়ে॥
এত শুনি আনন্দে উথলে দুইজনে।
তবে অন্তর্ধান করে প্রভু নারায়ণে॥
মন্দিরে বসিয়া কহে আনন্দ-কথন।
কোনভাগ্যে দেখা দিল প্রভু নারায়ণ॥
করুণাসাগর প্রভু রূপ-গুণনিধি।
শরণ নয়ান মুখ কৃপাপূর্ণ হৃদি॥
অমিঞা-সাগর মুখ সুধাময় হাসি।
তিঁহী হব মোর পুত্র মনে হেন বাসি॥
কিবা এ সংমোহ মোর কিবা এ সপন।
মো সভার কবে হবভাগ্য হেন মন॥
শচী কহে শুন প্রভু আমার বচন।
মোর গর্ভে কিবা জন্ম কৈল নারায়ণ॥

খিতি না পড়এ পদ আনন্দে হরিষে।
কিবা গর্বে মোর শির পরশে আকাশে॥
আর জত চিত্তে জন্মে কহিল না হএ।
কি কব তোমার আগে বাসি লঙ্জা-ভয়ে।
হেনমতে হই গেল প্রভাত সময়ে।
প্রাতঃক্রিয়া গঙ্গাস্নান জাহ্নবী পূজয়ে॥
মন্দিরে আসিয়া নারায়ণ অরচয়ে।
ব্রাহ্মণ-ভোজন ক্রিয়া চিন্তএ উপাএ॥
আরত করিয়া নানা দিব্য আওজন।
আদরে করএ সব বাহ্মণ-ভোজন।
আর জত ত্রিবিধি আছএ লোকজন।
আদরে আনিঞা সবা করাএ ভোজন॥
গঙ্গাস্নান করিয়া পরি কাচা ধূতী।
নারায়ণ পুজা জপ করে শুদ্ধমতি॥
পুন ডাকি অন্ন দেই বুভুক্ষিত জনে।
যজ্ঞ-শেষ অন্ন দোঁহে করএ ভোজনে॥
অঙ্গ পাখালিয়া দুঁহে পরি কাচা ধূতী।
মুখ শুদ্ধি শয্যায়ে শয়ন শুদ্ধমতি॥
নারায়ণ দিব্যরূপ করিয়া ধেয়ান।
নিদ্রা এ সমাধি দুঁহে নাঞি আন তান॥
হেন বেলা শচীদেবী দেখএ সপন।
হাসি স্থান মাগে এক পুরুষরতন॥

অতি রসার্ণব রূপ চরিত অগাধ।
দেখি অচেতন শচী ভাবে উনমাদ॥
প্রবোধ সম্বোধ নাঞি কান্দিয়া বিকল।
কম্প পুলক শ্বেদ আখি বহে জল॥
কি দেখিলুঁ কি দেখিলুঁ কছে ঘনে ঘনে।
কহিতে কহিতে গেল এ দিবস তিনে॥
প্রভু স্থানে কহে শচী দেখিলুঁ সপন।
মোরে স্থান মাগে আসি এক দিব্যজন॥
চান্দ ভানু জিনি তেজ রূপে মত্ত কাম।
চায়নী গভীর থীর নাঞিক উপাম॥
মিশ্র কহে শুন প্রিয়ে স্থির কর চিত্ত।
এসব কহুন লোকে বড় অনুচিত॥
শচী কয়ে শুন শুন প্রভু মহাশয়ে।
মুখে প্রবেশিয়া মোর রহিল হৃদএ॥
শুনিঞা আহলাদে কহে মিশ্র জগন্নাথ।
কৃপাএ তোমারে প্রভু কৈল আত্মসাত॥
সাক্ষাতে সদয়ে দেখা দিল নারায়ণ।
সেই ভাগ্য ফলে হেন দেখিলে সপন॥
এসব ভাগ্যের কথা কারে নাঞি কবে।
পরম আনন্দ সুখে স্থির হই রবে॥
শচী জগন্নাথ রএ এসব কথনে।
ওথা কৃষ্ণচন্দ্র লৈয়া শুনহ বচনে॥
কলির স্বভাব ধর্ম কেহো না আচরে।
দানব্রত অতিথের সেবা প্রতি ঘরে॥
প্রাতর্গঙ্গাস্নান আচমন তরপণে।
করএ জাহ্নবী পূজা তুলসী-চন্দনে॥

জত নবদ্বীপবাসী অতি শুদ্ধমন।
শ্রীগৌরপ্রভাবে গৃহে পূর্ণ নানাধন॥
শ্রীগৌরাঙ্গ-আবির্ভাব শচীর জঠরে।
চরিত্র রূপের শোভা কে কহিতে পারে॥
জবে গঙ্গাস্নানে শচী দেবী চলি জাএ।
আকুল ত্রিবিধি লোক দেখিবারে ধাএ॥
কিবা সৌদামিনী-পুঞ্জ ক্ষিতি অবতরি।
কিবা চান্দ ভানু কিবা দুঁহে এক ভনু ধরি॥
কি বুলে কৌস্তভমণি মুরুতি ধরিয়া।
সুদর্শন মূর্ত্তি বুলে কি মায়া করিয়া॥
কিবা নারীরূপ ধরি প্রভু নারায়ণ।
কিবা কার ভাগ্যে করে খিতি পর্যটন॥
অতি সুমোহন রূপ দেখি অনুপাম।
আদরে ত্রিবিধি লোক করে পরণাম॥
এইরূপে গৌর-আবির্ভাব সাত মাস।
অন্ত মাসে পঞ্চামূত করএ বিলাস॥
নানারূপ দ্রব্য কইল নানা আয়োজন।
করিল সাম্রাট গোষ্ঠী ব্রাহ্মণ সজ্জন॥
এ বেদ বিধানে সর্ব্ব কর্ম্ম আচরিল।
ভাগ্যরাশী শচীরে ত পঞ্চামৃত দিল॥
তবে মিশ্র পুরন্দর সভাসতে গিয়া।
পণ্ডিতমণ্ডলী পূজে বস্ত্র রত্ন দিয়া॥
সমর্পয়ে বিপ্র ভাট নানা ভিক্ষুকেরে।
অকাতরে পরিতোষ দেই সভাকারে॥

অন্নব্যঞ্জন পুয়া পিষ্টক পায়াসে।
ঘৃতদুগ্ধ দধি খীর সন্দেশ বিশেষে॥
নানা উপচারে করে ব্রাহ্মণ ভোজন।
তবেত ভূঁজাএ জত ত্রিবিধি সুজন॥
পুন স্নানে যজ্ঞ-শেষ ভূঁজে দুই জনে।
আচমন মুখশুদ্ধি করিল শয়নে॥
চিন্তিতে ভাবিতে তবে পৌষ মাঘ গেল।
দশমাস পূর্ণ গর্ভ শচী ত ধরিল॥
অতিশুভ বৃষ লগ্ন তিথি পৌর্ণমাসী।
বিংশতি দিবসে মহা যোগ ভেল আসী॥
চতুঃসাগর কোষ্ঠী উভে চারি যোগ।
নিজ নিজ গৃহে সর্ব্ব গ্রহ করে ভোগ॥
মেষে ভানু গ্রহরাজ দশ অংশে বসে।
সুতুঙ্গি ত সুধানিধি ত্রষ অংশে বৃষে॥
মকরেত ভূমিসুত অষ্ট অংশে বৈসে।
কর্কটেত দেবগুরু বসে পঞ্চ অংশে॥
কন্যাএ ত বুধ বসে পঞ্চদশ অংশে।
তুলায়ে ত শনি বসে একবিংশতি অংশে॥
সিংহে ত সুতুঙ্গি বাহু নব অংশে বসে।
কুম্ভে কেতু তুঙ্গ হেতু বসে পঞ্চ অংশে॥

এষব সুতুঙ্গে বসি নবগ্রহগণে।
বিমতি বিপক্ষ সব রাখে রাতিদিনে॥
প্রসন্ন রজনী শুভ নক্ষত্র রাশি।
প্রসন্ন ত দশদিগ গণ সাথ শশী॥
ফাল্গুনী পৌর্ণমাসী মহাশুভ যোগ।
চান্দে গ্রস্ত রাহু সুধা করিবারে ভোগ॥
এত দেখি সর্বলোক বলে হরি হরি।
আনন্দ আহ্লাদে গৌরচন্দ্র অবতরি॥
উপৰাস দেখি সব নদীয়া-নগরে।
শ্রাদ্ধশান্তি নিত্যক্রিয়া সর্ব্বলোকে করে॥
আরে মহা শুভক্ষণে গৌরচন্দ্র জন্ম।
উত্তম অধম ছাড়ে কলিযুগ-ধর্ম্ম॥
জপযজ্ঞ করে কেহ দিয়া নানাধনে।
গঙ্গা নারায়ণ পুজে তুলসী-চন্দনে॥
হরি হরি বলি কেহ ডাকে উচ্চস্বরে।
অবিরত হরি জাগে আখি জল ভরে॥
নবন্ধীপে জন্ম গৌর করল সদয়ে।
জার অনুগ্রহে লোক প্রসন্ন হৃদয়ে॥
মহাভাবভক্তি-শক্তি দিব গৌড়ে দান।
প্রেমানন্দসিন্ধু নিত্যানন্দ বিদ্যমান॥
এইনসপে সতপথে রাখিব সর্বলোক।
নাভুঁজিব কেহ কলিদুরাচার শোক॥

গৌরজন্মে মহাজয় নদীয়া-নগরে।
ধনে ধর্ম্মে পূর্ণ ভেল প্রতি ঘরে ঘরে॥
সর্ব্বলোক অনুরাগ এ দক্ষিণ পথে।
কলিদুরাচার সব ছাড়ি ভাগ্যমতে॥
শুনিঞাঁ অদ্বৈত নাচে শ্রীবাসের সাথে।
আর জত ভাগ্যবান মেলি গেল তাতে॥
মহা অনুরাগে নাচে শ্রীঅদ্বৈতবায়ে।
মহা-মহা-ভাবোদয় শ্রীগৌরসহায়ে॥
মহাপ্রতু প্রীঅদ্বৈত জাহাপানে চাএ।
কৃষ্ণভাবে পড়ি পড়ি ভুমে গড়ি জায়ে॥
অদ্বৈতের নাটে নাচে নদীয়া-নগর।
মহাবন্যা হইল ভক্তিরসের সাগর॥
উত্তম মধ্যম নাচে অধম যে বসে।
এ মূর্খ পণ্ডিত নাচে এ নারী পুরুষে॥
বৌদ্ধ তার্কিক মৈমাংসিক বৈদান্তিক।
সভাকার নাটে কহে ইবে দেখি ধিক॥
সবলোক নাচে কান্দে করে কিবা কাজ।
ভাল লোক নাচে কান্দে না বাসএ লাজ॥
হোর দেখ অধ্যাপক অদ্বৈত আচার্য্য।
নাচিয়া কাঁদিয়া ওবা সাধে কোন কার্য্য॥

তর্কবাদীন্দ্র সিদ্ধানন্দ ভট্টাচার্য্য।
এ দিগবিজয়ী কবি পূজে সর্ব্বরাজ্য॥
ইহার নাটের কিছু টের নাঞি পাই।
দিগস্বর হইয়া নাচে কিবা কামবাই॥
এতদিন নদীয়ার হই গেল খাঁখার।
ভাল ভাল মানুষের এত দুরাচার॥
কেহ কেহ বলে কিছু না বোলিবে ভাই।
না বুঝি না বুঝি করি চল ঘর জাই॥
রৌরবে গৌরব জাএ কহি সারধারে।
নীচ বহু লোক ঘাঁটাইলে অবশ্য মারে॥
এত বলি কুপণ্ডিত সব ঘব জাএ।
সর্ব্বলোক নাচে গাএ কাঁদে উভরায়ে॥
নাচিতে অদ্বৈত গেলা জগন্নাথ-ঘরে।
বাড়ী প্রদক্ষিণ করি কান্দে উচ্চস্বরে।
অতি সে উদ্ভট দেখি অদ্বৈতের নাট।
নবদ্বীপ পাতিয়াছে প্রেমভক্তি-হাট॥
দেখি সর্ব সন্বরিল শ্রীগৌরসুন্দর।
সম্বিতে অদ্বৈত জাএ আপনার ঘর॥
ঠাকুর অদ্বৈত চলি জাএ নিজ ঘরে।
লাফে ঝাঁপে জাএ প্রভু আখি জল ঝরে॥
পুলকে আকুল অঙ্গ কাঁপে সব গাএ।
আবেশে বিবশ প্রভু চারিদিগ চায়ে॥
সবলোক কাঁদে ভূমি পড়ি ধড়ফড়ে।
কদলী পড়এ জেন কার্ত্তিকের ঝড়ে॥

ভুজমূলে ভুজ খেপি প্রভূ করে দর্প।
আর না দংশিব লোকে কলি-কালসর্প॥
এতবলি মহাপ্রভু করে সিংহনাদ।
গৌরাঙ্গ করুণানিধি পুর্ণ কইল সাদ॥
পরম আহ্লাদ দেখি অদ্বৈতের চিত।
তর্কবাদীন্দ্র আসি মেলে আচম্বিত॥
দিগন্বর বিপুল পুলকাবলি গাএ।
সবে কম্প আখি জলধার বই জাএ॥
দেখিয়া অদ্বৈত চিত পরম আহ্লাদ।
এতদিন পুর্ণ হইল মনগত সাদ॥
জয় জয় মাধবেন্দ্র পূরী মহাশয়ে।
জাহার প্রসাদে গেল কলিযুগ-ভয়ে॥
জাহার প্রসাদে হৈল বৈষ্ণবে ত মতি।
জাহার প্রসাদে দেই ভাব-বিভূতি॥
জাহার প্রসাদে ভক্তিরস পরচার।
জাহার প্রসাদে দেখি গৌর-অবতার॥
জাহাব প্রসাদে কৃষ্ণরসে নাটগীত।
জাহার প্রসাদে জানি সাত্বত-চরিত॥
জাহার প্রসাদে গৌর-জন্ম গৌড়দেশে।
জাহার প্রসাদে বুঝি শ্রীকৃষ্ণ-আবেশে॥
জাহার প্রসাদে জত নবদ্বীপবাসী।
ত্রিবিধি লোক হৈল এ ভাব-বিলাসী॥

জাহার প্রসাদে হৈল কৃষ্ণভক্তি দর্প।
লোকে না দংশিব আর কলি-কালসর্প॥
হাহা মাধবেন্দ্র বিষ্ণুভক্তির কারণ।
কবে সে দেখিমু তোর এ দুই চরণ॥
অতুল করুণাময় অবিচিন্ত শক্তি।
অসাধনে দিলে চিন্তামণি কৃষ্ণভক্তি॥
সত্যসংকল্প তোমি এ কহিলে হৈল।
শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু ঘরে বসি পাইল॥
পূর্ব্বে কহিছেন মাধবেন্দ্র মহান।
অবনীমণ্ডলে হব কৃষ্ণরস-বান॥
এই নবদ্বীপে কৃষ্ণ লভিবেন জন্ম।
সর্ব্বলোক আচরিব কৃষ্ণভক্তি ধর্ম॥
সর্ব ধর্ম্ম ছাড়ি সবে কৃষ্ণভক্তি নাট।
গৌড়মণ্ডলে হব প্রেমরস হাট॥
কৃষ্ণ-আবির্ভাব মিশ্র পুরন্দর ঘরে।
পরিণামে কব লব চলহ মন্দিরে॥
এত বলি অদ্বৈত চলিলা নিজ ঘর।
ওথা শ্রীগৌরাঙ্গ দিয়া শুনহ উত্তর॥
মহাভাগ্যবতী শচী পুত্র প্রসবিল।
অঙ্গের বিভুতি জুতি রাত্রি দিন হৈল॥
শুনি মিশ্র পুরন্দর গঙ্গাস্নান করি।
বৈদিক লৌকিক কর্ম্ম আদরে আচরি॥

পুত্রমুখ দেখি মিশ্র পরানন্দে ভাসে।
কি সাক্ষাত কিবা স্বপ্ন না জানে আবেশে॥
এ নাভি ছেদন করি করে স্তন্য পান।
শচীর জিজ্ঞাসা করে বিবিধ বিধান॥
দেখিতে শুনিতে ভেল রজনি প্রভাত।
বস্ত্র রত্ব গাভী কৈল ব্রাহ্মণেত সাত।
বিবিধ ভিক্ষুকে ভাটে করি পরিতোষ॥
শুনাঞি কুটুম্ব ইষ্ট করাএ সন্তোষ॥
মহাপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গ জন্ম মিশ্র-ঘরে।
সর্ব্বভাবে মহালক্ষ্মী নদীয়া-নগরে॥
বিশ্বরূপ আসিয়া দেখিল ভাই-মুখে।
উদয়ে সাত্বিক ভাব পরমানন্দ সুখে॥
স্বেদ কম্প পুলক বৈবর্ণ অশ্রুপাত।
মূর্চ্ছা বিনে সগাদগদ স্তম্ভ ভেল জাত॥
একেবারে সপ্তভাবে পূর্ণ বিশ্বরূপে।
ভূমি ধড়ফড় করে পরানন্দ সুখে॥
মিশ্র পুরন্দর আসি পুত্র করে কোলে।
ভূমি ডুবি গেল স্বেদ নয়ানের জলে॥
কথোক্ষণে সম্বিতে সে ভ্রাতৃমুখ চাই।
শুন মাতা পিতা ইহার নাম নিমাই॥
জে নিমাই বলি ডাকে তাহা পানে চায়ে।
ভুবনমোহন হাসি চালে হাত পাএ।

এসব আনন্দে সুখী সর্ব্ব পরিবারে।
জয় জয় নিমাই ঘোষএ উচ্চস্বরে॥
পুনঃস্নানে বৈদিক লৌকিক কার্য্যাচরী।
সর্ব্বান্তে সকল লোক দেহ-ধর্ম্ম আচরি॥
গাইতে ঘোষিতে সব দিন রাত্রি গেল।
ঠাকুর নিমাই আসি দিন তিন হইল॥
ঊষঃকালে এক লোক কহে মিশ্র স্থানে।
অতি অদ্ভুত আজি দেখিনু সপনে॥
চারিপাঁচমুখ গজমুখ বড়ানন।
সব-গাএ আখি স্থুলপাদ কোনজন॥
চতুর্তজা কেহ পদ্মহন্তা কেহ দশভুজা।
কতশত ফুলে নিমাঞির করে পুজা॥
দেখি বুকে কর খেপি শচী দেবী কান্দে।
হাসি হাসি পুন তাঁরা পদ অতিনন্দে॥
দেখি ত্রাস উপজিল তোমারে কহিল।
মিশ্র কছে না জানি কি জানি আসি হৈল।
তিনচারি জন হৈল তারদূর গেল।
শোকসাগরে ডুবি নানা দুঃখ পাইল॥
তবে নারায়ণ সেবি পাইল এ পুত্র।
ইহা এ উঠয়েত নানা সে কুসূত্র॥

জে হবে প্রভুর ইচ্ছা অবশ্য সে হবে।
জত দেখ শুন মোকে কিছু নাই কবে॥
নিশ্বাস ছাড়িয়া মিশ্র ভালে কর খেপে।
না জানি ঠাকুর মোরে দেই কিবা তাপে॥
সর্বদেব আসিছিল আমার মন্দিরে।
সকল হৈব ভাল তাসভার বরে॥
এত বলি মিশ্র গিয়া দেখে পুত্রমুখ।
দরশনে নাশ গেল জত দুঃখ শোক॥
চিন্তিতে আনন্দে চারি দিন আসি হইল।
কালি সে পাঁচটি বলি ঘোষণা ত দিল॥
পরম কুটুম্ব ইষ্ট মহাকুলবান।
নদীয়া-নিবাসী জত পণ্ডিত-মহান॥
তাসভার জত জত বরাঙ্গনা ছিল।
পাঠাই উত্তম লোক নিমন্ত্রণ দিল॥
মিশ্রের তনয় আজি পাঁচদিন হৈল।
পাচটি করাবে গিয়া সবিনয়ে বৈল॥
এত গুনি বরাঙ্গনা গিয়া মিশ্র-ঘরে।
শচীর কোলেতে দেখি দিব্য শিশুবরে॥
সবে কহে কামাঙ্কুর কিবা দিব্য চান্দ।
কিবা উপজিল মন-নয়ানের ফাঁদ॥
অখিল-ভুবনরূপ ধরিয়া মুরতি।
ত্রিবিধি লোকের কিবা সাধিতে পিরিতি॥

কিবা সর্দ-লোক-ভাগ্য হই একু ঠাম।
উজ্জ্বল করিল সিয়া নবদ্বীপ ধাম॥
কর-পদ চালি গৌর সতাপানে চাষে।
কান্দি সব বরাঙ্গনা ভূমিতে লোটাএ॥
এত দেখি শচী দেবী সম্ভ্রমে উঠিয়া।
বদন মুছিয়া সভা বসাইল গিয়া॥
নাপিত-ক্রিয়া করে অনেক নাপিত।
নানা উপচারে সভা করাএ তৃপিত॥
জাহার জে যোগ্য দ্রব্য প্রেমে দিল তারে।
পরম আহলাদে সবে চলি গেলা ঘরে॥
নিমারি চরিত্র সব কহে বরাঙ্গনা।
অদ্ভূত শ্রবণে লোকে লাগিল ঘোষণা॥
কহিতে ঘুষিতে আসি ছয় দিন হৈল।
ছয় দিনে সুতিকায়ে ষষ্ঠীপূজা কৈল॥
সপ্ত দিন গেল অষ্ট দিন হৈল সিয়া।
অষ্ট দিনে করাইব আট-কড়াইয়া॥
উরীদ বাটুল মুগ বরবটী মোট।
মুষরী তেয়ডী ছোলা এ কলাই আট॥
তুণ্ডুল গোধুম তিল চিড়া মুশনিঞা।
ভাজিয়া ভাজিয়া ছেলা ভরী থূল নিঞা॥

বণিক আনিঞা কড়ী গনিয়া ত নিল।
পিঁড়ার উপর পাটে ভরিয়া ত থুইল॥
নগরে নগরে জত শিশুগণ ছিল।
শিবাই সভারে গিয়া ডাকিয়া আনিল॥
বাহির হইলা মিশ্র দেখি শিশুগণ।
সর্ব্বশিশুকে ত দিল মাল্য-চন্দন॥
দুদুজনে এককুলা বাড়ী দুদুগাছ।
বাড়ী লইয়া আইসে জাএ উঠান-নাছ॥
আটকলাই আটকলাই নিমাঞ্রি আছে ভালে।
মাএর কোল জুড়াইয়া রহ বাপের কোলে॥
কহি কহি শিশুগণ ঘন আইসে জাএ।
শিশু কহে নিমাঞ্রি আন দেখিব তাঁহাএ॥
কোলে করি শচী দেবী নিমাঞি আনিল।
আনন্দে আকুল শিশু নিমাঞি দেখিল॥
ভাজাভুজা দিয়া সব শিশুমন পুরে।
প্রতিজনে কবর্দ্দক দিল ত প্রচুরে॥
পরম আনন্দে শিশু নিজঘর জাএ।
চিন্তিতে শুনিতে সুখে রজনী পোয়াএ॥
নব দিন গেল দশ দিন পরবেশ।
এ নামকরণ আদি চিন্তিত বিশেষ॥
গণকে কহিল রাশি রোহিণীত বৃষ।
বিশ্বম্ভর নাম ইহার পরম সদৃশ॥

দশ দিবসে গেল অশৌচ উত্তরণ।
বৈদিক আচরি কৈল নামকরণ॥
স্বভাবস্বরূপ ভেল বিশ্বভর নাম।
বিশ্বভর রূপ গুণ বিশ্বভর ধাম॥
এক দুই তিন চারি পাচ মাস গেল।
শ্রাবণে ত ছয় মাস প্রবেশ করিল॥
অন্নপ্রাশন যুক্তি করে শচীর সনে।
কিরূপে করিব কার্য্য কহ দৃঢ় মনে॥
শুন প্রভু মহাশয় কহি আমি মর্ম্ম।
সমাবেশ বুঝিয়া করিবে সর্ব কর্ম্ম॥
তোমা বিদ্যমানে আমি জানি কিবা ধর্ম।
তোমি ত পরম বিজ্ঞ বুঝি কর কর্ম্ম॥
মহাবংশোদ্ভব তুমি মহোত্তর কাজ।
মহানাম মহাকীর্তি নদীয়া-সমাজ॥
বড় ভাগ্যোদয় পুত্র রূপগুণবান।
জে দেখএ তাহার মনে না জাগয়ে আন॥
অতিশয় মহাগোষ্ঠী নদীয়া-নগরে।
সবে মহোত্তর লোক না জানাবে কারে॥
এত শুনি মিশ্র কছে মন দিয়া শুন।
সর্ব্ব সমাবেশ আছে দুঃখ নাঞি কোন॥
জে দিনে জন্মিলা পুত্র তোমার উদরে।
সে দিবস হৈতে লক্ষ্মী আমার মন্দিরে॥
সর্ব্বলোকে আদর করিয়া জানাইব।
জে জাহার যোগ্য হএ তারে তাহা দিব॥

এত বলি নিজ লোকে আনিল ডাকিয়া।
রদ্ধনের জত সজ্জ কর মন দিয়া॥
তলাচর চক জত ভৃত্য সরখেল।
আসিয়া মিশ্রেরে সবে নমস্কার ভেল॥
কি কাজে ডাকিলা প্রভু করহ আদেশ।
শিরোপরি ধরি মোরা কবো সমাবেশ॥
প্রথমে তণ্ডুল চিড়া নানা বড়ী ডালী॥
আর জে রন্ধন-সজ্জা করিবে সাঁভালী॥
এত শুনি সর্ব্বলোক আদেশ ধরিয়া।
করএ রন্ধন সজ্জা শকতি করিয়া॥
দিব্য তণ্ডুল চিড়া দিব্য বড়ী ডালী।
বিবিধ পক্কান পুয়া চিনী রস-গালী॥
সে সব ভিঁয়ানে জত সন্দেশ উখড়া।
ভাণ্ডারে ধরিল আনি পুরী পুরী ঘড়া॥
অনেক কলসী হাঁড়ী হোলা শত শত।
হিঙ্গ জিরা মরিচ রন্ধন-দ্রব্য জত॥
অগৌর চন্দন যত কস্তুরী কর্পূর।
কুঙ্কুম অগৌর সত্ত্ব আনিল প্রচুর॥
আনী তৈল ঘৃত কাষ্ঠ ঝুনা নারীকেল।
দধি দুগ্ধ মাল্য লাজ ফরমাসী দিল॥
নিরামিষ্যামিষ্য জত যজ্ঞের রন্ধন।
সকল সুরীত কৈল সাবহিত মন॥

নানারপ বস্ত্র জত ধোয়াইয়া থুইল।
যজ্ঞ-শ্রাদ্ধের দ্রব্য আনিয়া এড়িল॥
নানারূপ অলঙ্কার নিমারি কারণ।
সোনার আনিঞা সব করিল গঠন॥
করিয়া সম্পন্ন দ্রব্য সব আয়োজন।
মিশ্র-স্থানে তারা সবে করিল গমন॥
প্রণাম করিয়া তারা করে নিবেদন।
তোমার কৃপাএ হৈল দ্রব্য আয়োজন॥
এত শুনি মিশ্রবর আনন্দে পূরিত।
গণক আনিঞা দিন করিল ত্বরিত॥
সিত পঞ্চমী হস্তানক্ষত্র গুরুবারে।
অন্নপ্রাশন করাইবে ত পুত্রেরে॥
এত শুনি মিশ্রবর কহে নিজ জনে।
সভারে আদরে গিয়া কর নিমন্ত্রণে॥
মহা-মহা-পণ্ডিত কুলীন মহান।
যতেক কুটুম্ব ইষ্ট মোক্ষ পরধান॥
এত শুনি নিমন্ত্রণ করায়ে ত্বরায়ে।
পুত্র ভুঁজাইব মিশ্রবর গুরুবারে॥
প্রাতঃকালে সবে জাবে তাঁহার মন্দিরে।
অনুগ্রহ আশীর্ব্বাদে ভুঁজাবে কুমারে॥
এত শুনি সর্ব্বজন নিমন্ত্রণ নিল।
আনন্দ আহলাদে গিয়া মিশ্রেরে কহিল॥

শুনিঞা ত আনন্দিত হৈল মিশ্রবর।
সংমার্জ্জ মন্দির দ্বার এ নাছ চত্বর॥
শত শত জন জত সব সংমার্জ্জিয়া।
টানাএ তোরণ-চান্দা কদলী রূপিয়া॥
যাজ্ঞিক আসিয়া যজ্ঞকুণ্ড সজ্জ করে।
শ্রাদ্ধদ্রব্য সজ্জ বিপ্র করএ আদরে॥
অদ্বৈত বাদীন্দ্র আদি অধ্যাপক আসি।
চরণ পাখালি দিব্য কম্বলে ত বসি॥
করি আচমন স্বস্তিক বিধানে।
পুত্র কোলে মিশ্র ছায়ামণ্ডপেরে আনে॥
বস্ত্রাঙ্গুরী মাল্য-চন্দনে বিপ্র বরি।
মিশ্রবর পুত্রে গন্ধ-অধিবাস করি॥
পরাইল দিব্যবাস দিব্য অভরণ।
দিব্যমাল্য দেই চতুঃসম চন্দন॥
বেদবিধান গন্ধ-অধিবাস আচরি।
সর্ব্ব বিপ্র বিশ্বম্ভরে আশীর্ব্বাদ করি॥
সভারে বিদায় দেই দ্রব্য পুরস্কারে।
বিয়ানে আসিবে কালি কৃপা করি মোরে॥
কুটুম্ব ইষ্টেরে মিশ্র করাই ভেজন।
আপনি ভোজন করে লৈয়া পরিজন॥
সর্ব্বলোকে সর্ব্বকার্য্য করি নিয়োজন।
কথো রাতে মিশ্রবর করিল শয়ন॥
সর্বলোক নিদ্রা জাহ সচকিত মনে।
নিশি উঠে করিবেত সর্ব প্রয়োজনে॥
এত শুনি নিদ্রা জাএ সবে অচেতনে।
কথো রাত্রে কার কার হৈল জাগরণে॥
প্রভাতে হইব প্রভুর অন্নপরাশনে।
শত শত করিবেক কার্য্য প্রয়োজনে॥

চূড়ামণি দাস কহে বিষ্ণুপ্রিয়া-নাথ।
করুণাসাগর প্রভু কর দৃক্ পাত॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর