কবি চূড়ামণি দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
বস্ত্র পরিধানে পুরী পিণ্ডাএ ত স্থান করি
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দে
সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়” অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম
খণ্ড, ৩৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
জগন্নাথ মিশ্রের গৃহে মাধবেন্দ্র পুরী

॥ করুণশ্রীঃ॥
॥ পড়িল মান॥

বস্ত্র পরিধানে পুরী                     পিণ্ডাএ ত স্থান করি
সায়াহ্নে ত কৃষ্ণপূজা করি।
মন্ত্রাঙ্গ ধেয়ান করি                          জপ যজ্ঞ আচরি
প্রেমাবেশে দণ্ডবত করে॥ ১॥
সন্ধ্যা করি মিশ্রবর                        গিয়া নারায়ণ-ঘর
পুষ্প ধূপ নৈবেদ্য চন্দন।
নিবেদিয়া নারায়ণ                        শঙ্খ ঘণ্টা সুবাদনে
আদরে (ত) অভিবন্দনে॥ ২॥
হেন বেলা বিশ্বভর                        গিয়া নারায়ণ-ঘর
অষ্টাঙ্গে ত দণ্ডবত করে।
পুরী কছে ভক্তিময়ে                     যত করে সে সাজএ
ইথে কেবা কি কহিতে পারে॥
গভীর অগাধ চিত                       দেখিতে লাগয়ে ভীত
দেখিতে দেখিতে তেজআনে।
জে দেখে তাহার মন                        হরএ(ত) ততক্ষণ
উপলভে কাহারী পরাণে॥ ৪॥
এত করি পুরীবর                           গিয়া নারায়ণ-ঘর
মিশ্র সাথে বসে গৌর লই।
সর্ব্বাঙ্গে বুলায়ে হাথ                        আপাদ পর্যন্ত মাথ
নানাবিধি শাস্ত্র মন্ত্র কয়ি॥ ৫॥
মিশ্র ডাকি একজন                        লই গেল কোন স্থান
মাধবেন্দ্র রহে গৌর সাথে।
নানাবিধ দুঃখ খেদে                      পাইলুঁ তোমারি পদে
এখন রহিমুঁ কোনমতে॥
প্রভু কহে শুন পুরী                      যে কহিলে তাহা করি
আমি রহিয়াছি এই স্থানে।
মোরে দেখি রহি এথা                    তোমা সনে কব কথা
বসিয়া ত অদ্বৈতের সনে॥
এত বলি বিশ্বম্ভর                          চলিয়া ত গিয়া ঘর
মাকে কহে আমি অন্ন খাব।
নানা উপচারে অন্ন                          করিয়া ত ভোজন
আচমন শয্যাকে ত জায়ে॥ ৮॥
কহিছেন নিত্যানন্দ                             এইসব পরবন্ধ
গদাধর-ধনঞ্জয় সনে।
গৌর-মাধবেন্দ্র মেলি                        প্রেম-আনন্দ কেলি
চূড়ামণি দাস রচনে॥ ৯॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নিশি অবশেষ পুরী মানসিক করে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত,  “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৪০-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
মাধবেন্দ্র পুরীকে নিত্যানন্দের আসার খবর

॥ ভাঠিয়ালী রাগঃ॥
॥ চোক একতালী॥

নিশি অবশেষ পুরী মানসিক করে।
প্রাতঃক্রিয়া করি গেলা জাহ্নবীর তীরে॥
দণ্ডবত করিয়া ত করি গঙ্গাস্নান।
ভুতশুদ্ধি ন্যাস প্রাণায়াম ধ্যান করে।
আবেশে বিবশ পুরী জপ যজ্ঞাচরী॥
জপান্তে উঠিয়া স্থান করি দণ্ডবত।
বস্ত্র পরি রাসক্রীড়া পড়ে ভাগবত॥ ২॥
হেনবেলা অদ্বৈতের সাত দরশন।
দেব-তরপণ করে বৈষ্ণব-বিধান॥
নিশির রহস্য সব করিল কখন।
ক্ষণেক বিশ্রাম মোয়া কারাঁ এই ঘাটে।
প্রভু আইলে কথা কব জাহ্নবীর তটে॥ ৩॥
হেনঞি সময়ে গৌরবর দেখা দিল।
দেখি চিন্তামণি যেন মহারঙ্ক পাইল॥
ত্বরাএ মেলিলা গিয়া প্রভু বিশ্বভরে।
দেখিয়া হাসিয়া শুভ দৃক্পাত করে॥
পুরী কহে শুন প্রভু নিবেদন কথা।
তুমি কিবা প্রকাশিবে মুই রহিমু কথা॥
গৌর কহে শুন অহে মাধবেন্দ্র পুরী।
কথোদিন রহ তুমি নদীয়া-নগরী॥
বাপ করাইব মোর এ চূড়াকরণ।
পণ্ডিতমণ্ডলী সভাতা করিব বরণ॥
তোমি ত রহিলে মিশ্র বড় সুখ পাব।
ভালমন্দ সঙ্গে জত তোমা গোচরিব॥
আর অদ্ভুত কথা শুন পুরীবরে।
নিত্যানন্দ আসিবেন এ নব বৎসরে॥
তাঁর সাথ জে জে কথা হব সারধার।
অনেক পরম গুহ্য জন্ম জার জার॥ ৭॥
আর মোর জত কার্য্য যতেক কারণ।
তিঁহি আইলে যত যত করিব ধারণ॥
তাঁহার যতেক কথা কহিছি তোমারে।
এই কহি কর আর জত ব্যবহারে॥
তিঁহি শ কহিব সব ভক্তির আখ্যান।
তিঁহি ত কহিব সব ভজনানুমান॥
তিঁহি শ রূপিব গৌরে বিষ্ণুভক্তি-বীজ।
প্রেম-সিক্ত করি বোধ দিব শক্তি নিজ॥
নিজ পরভাবে করাইব ফল ফুল।
রতি-ভক্তি পরিপাকে আনিব সকল॥
অষ্ট সাত্ত্বিক ভাব তেত্তিশ ব্যভিচারী।
হাস্য আদি বার ভাব এক-থান করি॥
প্রেমসুধা রসে নাম গুণানুবাদ।
মহা-মহা-ভাব হব রস-উনমাদ॥
নিত্যানন্দ করাইব গৌড়ভূমি ধন্যা।
ডুবাইব চরাচর কৃষ্ণরস-বন্যা॥
মো দেখি খলপপুর আরবার জাব।
সপ্ত প্রদক্ষিণ করি নবদ্বীপ পাব॥
তোমা দুহাকারে জেবা কহিলুঁ কথনে।
বিদায় সময়ে কব শুনহ জতনে॥
মোর ঘর জাহ পুরী অদ্বৈতের সনে।
তোমা না দেখিয়া মিশ্র বিবসবদনে॥
মিশ্রঘর জাএ পুরী অদ্বৈতের সনে!
চুডামণি দাস আশ গৌরাঙ্গ-চরণে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অতি শে চারুতর মস্তক পরিসর
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দে
সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়” অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম
খণ্ড, ৪১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
বালক শচীনন্দনের বর্ণনা

॥ ধানশ্রী॥
॥ মান জতি॥

অতি শে চারুতর                    মস্তক পরিসর
মেঘাঙ্কুর কেশজাল।
ত্রিজট মনোহর                        শ্রীমুখ উপর
শোণ কঞ্জে ভৃঙ্গমাল॥ ১॥
কি আঁজ পেখলুঁ                        শচীর নন্দন
বালকমণ্ডপী মাঝ।
লাবণ্য-রসসার                   আনন্দ-প্রেমাকার
কেবা কইল রূপরাজ॥ ধ্রু॥
উন্নত ভ্রুভঙ্গ                            নয়ন তরঙ্গ
বয়ান নবরস শশী।
অধর বিম্বফল                        দশন কুন্দদল
হাসল অমিঞাঁক রাশি॥ ২॥
সুগ্রীব সিংহজিত                    কম্বু কণ্ঠ ভিত
শ্রীবৎস লাঞ্ছন চীন।
পীন পরিসর                         উন্নত বক্ষবর
মধ্যদেশ অতি খীন॥ ৩॥
নবীন গজশুও                        দীঘল ভুজদণ্ড
পল্লব চারুতর রাত।
অঙ্গুলী সুবল                        চম্পক কুট্ মল
নখচান্দ ফল জাত॥
ছার করিকুম্ভ                        নিতম্ববর-বিম্ব
বলিত চারু ঊরু জঙ্ঘ।
চরণ অরবিন্দ                       প্রচুর মকরন্দ
পিঅব ভকত-ভূঙ্গ॥
নাশব কলিঘোর                     তোষব সহচর
মো সব পাষণ্ড বিমুখ।
বুক মুখ ভরি                    অদ্বৈতে কহে পুরী
চূড়ামণি দাসেরে সুখ॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আদেশিল পুরী বাদীন্দ্র শিরে ধরি
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দে
সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়” অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম
খণ্ড, ৪৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
নিমাঞির চূড়াকরণ ও কর্ণবেধ অনুষ্ঠান

॥ মঙ্গল রাগ॥
॥ জতি মান॥

আদেশিল পুরী                        বাদীন্দ্র শিরে ধরি
সভারে করিল বরণ।
জে বেদবিধি                            যজ্ঞ শ্রাদ্ধ আদি
করএ এ চূড়াকরণ॥
মিশ্র শুন্ধমন                              করি আচমন
পাতিয় গণাধিপ-বারা।
গৌর্য্যাদি ষোড়শ                      মাতৃকা পূজিয়া
মন্দির ভিতে বসুধারা॥ ২॥
কৃতবৃদ্ধি আদি                          শ্রাদ্ধ সমর্পিয়া
করিল অগ্নির স্থাপন।
বেদ যথাবিধি                     আনিঞা ঘৃত আদি
করিল অগ্নি রমণ॥ ৩॥
শুচি বাস লই                        গৌর-অঙ্গে দেই
শ্রীশচী পুত্র কোলে করে।
অগ্নিব উত্তর                       প্রাঙ্মুখী কুশোপরি
বসি বসাএ নাপিতেরে॥
তিথি ক্ষণ                              এ যোগ করণ
মাহেন্দ্রদণ্ডে ভিতরে।
উষ্ণোদক দেহ                        দিব্য খুর লইব
পণ কৈল বিশ্বম্ভরে॥
নাপিতে আদরে                        কহে মিশ্রবরে
শুনহ আমার বচন।
সাবহিত মনে                           এহ শুভক্ষণে
করহে কর্ণ-বেধন॥
হই সাবধান                           নাপিত শুদ্ধমন
করিয়া মন্ত্রতন্ত্র ভেদ।
জয়-জয় ধ্বনি                        করয়ে ব্রাহ্মণী
নাপিতে কৈল কর্ণবেধ॥
মিশ্র যথাবিধি                       ক্রিয়া ত সমাধি
নাপিতে ভক্ষ-বাস দিল।
বালক বপন                        কেশ কোন জন
বাঁশ-বনে লই থুইল॥
যতেক ব্রাহ্মণ                        ভিক্ষুক ভাটগণ
সভাকে সুখী করাইয়া।
মহামহাজন                        ফলাহার ভোজন
বিদায় বস্ত্র-রত্ন দিয়া॥
পুবীরে দণ্ডবত                       করিয়া আরত
ভিক্ষার নিমন্ত্রণ দিল।
অদ্বৈতেকে নমস্কারে                আরতি আদরে
দুঁহাকে মন্দিরে নিল॥
আনিঞা গঙ্গাজলে                    চরণ পাখালে
ভোজনে বসে দুইজন।
গৌর-সমপর্ণ                         অন্নাধি ব্যঞ্জন
দুঁহে করএ ভোজন॥
করিয়া ভোজন                        দুঁহে আচমন
মুখশুদ্ধি যথাবিধি।
দেখিয়া বিশ্বম্ভরে                  অদ্বৈত মন্দিরে
বিদায় করে দুই সিধি॥
সভারে বিদায়                   দিয়া ত মহাশয়ে
আনন্দে মন্দিরে আসি।
করহ ঘরে স্নান                        বাহির উঠাণ
কহিল পিঁড়ায়েত বসি॥
সবেত স্নান করি                   মিশ্রেরে গোচরি
কুটুম্ব জ্ঞাতি বন্ধু আনে।
দিব্যান্ন-ব্যঞ্জনে                     করাএ ভোজনে
আনন্দ মিশ্রবর মনে॥
করিল আঁচমন                        পরিয়া বসন
সবেত মুখশুদ্ধি করে।
করিয়া গঙ্গাস্নান                        মিশ্র মহান
আহ্নিক করি আদরে॥
দিব্যান্ন-ব্যঞ্জনে                    সমর্পে নারায়ণে
সুখে করিয়া ভোজনে।
আচমন করি                        ধুতি বস্ত্র পরি
এ মুখশুদ্ধি শয়নে॥
পরম আনন্দ                        সদয় নিত্যানন্দ
কছিল মহামহাজনে।
শুনি কি দশা                          সেই ভরোসা
এ দাস চূড়ামণি গানে॥ ১৭॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিশ্বরূপ গৌর দেখি ডাকে ভৃত্যগণে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত,  “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৫২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
অদ্বৈতের কৃষ্ণকথা, গঙ্গার তীরে বিশ্বম্ভরের অদ্ভুত রঙ্গ, বাল-ক্রীড়া, অফুরন্ত প্রসাদ

॥ করুণ শ্রী॥
॥ একতালী॥

বিশ্বরূপ গৌর দেখি ডাকে ভৃত্যগণে।
জল আনি নিমাঞির পাখাল চরণে॥
চরণ পাখালি দুই ভাই অন্ন খাএ।
আচমন মুখশুদ্ধি শুতি নিদ্রা জাএ॥
ক্ষণেক নিদ্রাএ হইতে বিশ্বরূপ উঠি।
পড়িবারে চলি জাএ হাথে করি পুথী॥
অদ্বৈতের নাছে আছে পণ্ডিত শ্রীবাস।
বিশ্বরূপ নমস্করী রহে তার পাশ॥
আনন্দে শ্রীবাস তারে করিলেন কোলে।
আপাদ পুলক কম্প আখি বহে জলে॥
দুঁহার নয়নে জল পোছে দুই জনে।
অদ্বৈত-মন্দিরে চলে আনন্দিত মনে॥
অদ্বৈতেরে দুঁহে গিয়া নমস্কার করে।
প্রেমানন্দে আলিঙ্গন দিল দুঁহাকারে॥
শ্রীঅদ্বৈত ভাবাবেশে কএ কৃষ্ণকথা।
শ্রীকৃঞ্চ না ভজে এ তার সর্ব বৃথা॥
মাংস রক্ত অস্থি মজ্জা বিষ্ঠা মুত্রময়।
কৃষ্ণ না ভজিয়া মূঢ় এ ভাল বাসএ॥
চতুঃসম চন্দনাদি পরি দিব্য বাস।

দিব্য শয্যায়ে করে রমণী বিলাস॥
তাহে অতি মতিনাশা যে পোস্থ-ভাঙ্গে।
কোন মতিনাশ করে অজাতির সঙ্গে॥
এ সব আচরি তারা বৈষ্ণবে নিন্দে।
সপনে না শ্রুতি করে চরণারবিন্দে॥
আর কথো গুলা তারা কুশাস্ত্র পড়িয়া।
গঙ্গা-যমুনাকে তেজি মজ্জয়ে গাড়িয়া॥
মঞ্জুঘোষ ভৈরবাদি জপে অনাচারে।
পরলোক নাঞি তার জাএ ছারে খারে॥
আর কেহ অনাচারে রামমন্ত্র জপী।
ভাগবত নিন্দা করে কোন কোন পাপী।
করএ মদিরা পান মহা বাম জপী॥
জেবা সেবা কৃষ্ণ ভজে কি শুদ্র ব্রাহ্মণ।
শ্রীকৃষ্ণ ভজিলে হএ ভুবন পাবন॥
অতএব শ্রীকৃষ্ণ-ভজন সত্য সত্য।
ব্যাসদেব ভাগবতে কহিছেন তথ্য॥
শ্রীনিবাস কি কহিব তোমারি মহত্ত্ব।
তুমি স জানহ কৃষ্ণ ভক্তিরস-তত্ত্ব॥
অলপ বয়েস বিশ্বরূপ মহাশয়।
কায়মন বাক্যে উঁহি কৃষ্ণের আশয়॥
ভাগবত পরসঙ্গে তোমার আবেশ।
যে দেশেতে তুমি রহ সুধন্য সে দেশ॥

এত বলে শ্রীঅদ্বৈত বিশ্বরূপ তরে।
বিশ্বরূপ বিদায় করিল পড়িবারে॥
অদ্বৈত শ্রীবাস করে শ্রীকৃষ্ণ-কথন।
ওথা বিশ্বম্ভর লৈয়া শুনহ বচন॥
শয্যা হৈতে উঠি বিশ্বভর শিশু সঙ্গে।
জাহ্নবীর তীরে করে অদ্ভুত রঙ্গে॥
বালি তুলি মাটির গোপাল দিল বার।
বালির নৈবেদ্য করে নানা উপহার॥
গঙ্গাজল বৃন্দাঙ্কুরে নিবেদন করে।
বালির নৈবেদ্য সব দিব্য রূপ ধরে॥
দিব্য কলা দিব্য সষা দিব্য নারিকেল।
দিব্য আম্র এ কাঁঠাল জত দিব্য ফল॥
নানাজাত সন্দেস পক্কান্ন নানাজাত।
দিব্য মোয়া উখুড়া সিঙ্গার চীড়া ভাত॥
দধি দুগ্ধ দিব্য খীর হল আচম্বিত।
দেখিয়া বালক সব অতি আনন্দিত॥
বালির জতেক দ্রব্য দিব্য দ্রব্য হৈল।
না জানি কি জানি আসি দিব্যরূপ কৈল॥
বালকে বোলএ শুন শুন হে নিমাঞি।
কেবা এ আনিল দ্রব্য কেমন গোসাঞী॥
নিমাঞি কহএ শুন সকল ছাওয়াল।
ভাল দ্রব্য করিলেন ঠাকুর গোপাল॥

মাটির গোপাল পানে সব শিশু চায়ে।
হাসিয়া গোপাল সব শিশুরে কহয়ে।
বালির নৈবেদ্য তোরা দিয়াছিলি মোরে।
নানা মিষ্ট দ্রব্য দিল তোমার সভার তরে॥
হাসি হাসি বালকেরে কহএ নিমাঞি।
মহাপরসাদ সভে বাটিয়াত খাঞি॥
যত যত দ্রব্য সব শিশু বাটি খাএ।
খাইলে তার না ফুরাএ আর বাড়ি জাএ।
নাগরিক জত লোক ডাকিয়া আনএ।
তাসভারে সব দ্রব্য বাঁটি বাঁটি দেএ।
আনন্দে সকল লোক এ নারী পুরুষে।
ধাই ধাই কৌতুকে দ্রব্য নিতে আইসে॥
বিশ্বম্ভর কহে শুন এ পুরুষ নারী।
জার জেই মনে সভে নেহ লুটি করি॥
সর্ব্বলোক সর্ব্বদ্রব্য লুটি করি লএ।
তবেত সকল দ্রব্য নাহি টুটি জাএ।
এনরূপে সর্ব্বলোক দ্রব্য লুটি করে।
শিশু সঙ্গে বিশ্বম্ভর চলিলা মন্দিরে॥
এতসব বালক্রীড়া করে গৌর রাএ।
ঠাকুর অদ্বৈত ইহা শুনিবারে পাএ॥
আবেশে বিবশ পঁহু শ্রীবাস সাত।
যত যত মহাভাব অঙ্গ ভেল জাত॥
সীতা ঠাকুরাণী শুনি আবেশে বিবশ।
এক এক আখি বহে কণ্ঠ ধারা দশ॥

পুলকে আকুল কম্প অঙ্গে বহে স্বেদ।
স্তম্ভ বৈবর্ণ আদি কণ্ঠ স্বরভেদ॥
আরত শ্রীবাস সাত প্রভু চলি জাএ।
যথা দ্রব্য লএ লোক মেলিল তথাএ॥
উর্দ্ধ বাহু করি নাচে অদ্বৈত আচার্য্য।
শুন হে শ্রীবাস সিদ্ধ হইল সর্ব্বকার্য্য॥
অদ্বৈতের নাটে নাচে ত্রিবিধি জীব।
সর্ব্বদেব দিকপাল নাচে ধাতা শিব॥
অনন্ত আকুল নাচে শক্তি ভক্তিময়ে।
নয়ান বয়ান নাকে মহানদী বয়ে॥
নাট-কোলাহল শুনি আসি বিশ্বম্ভর।
অদ্বৈত সমুখে গিয়া মিসিলা সত্বর॥
এখনি পাতিলে তুমি অদ্ভুত নাট।
এখনি পাতিলে তুমি প্রেমরস হাট॥
সর্ব্ব নাট সম্বরিল বিশ্বম্ভর রাএ।
হেনবেলা মাধবেন্দ্র মেলিলা তথাএ।
অদ্বৈত চলিলা ঘর মাধবেন্দ্র সঙ্গে।
বিশ্বরূপ সাথে গৌর ঘর জাএ রঙ্গে॥
এনরপ দ্রব্য তিন দিন লএ লুটি।
ভত লএ তত হএ নাহি হএ টুটি॥
পাঁচ দশ গ্রামে যত যত লোক ছিল।
তারা সবে আসি সর্ব্ব দ্রব্য লুটি নিল॥
পাঁচদিন ধরিয়া দ্রব্য লোক বহিনিল।
দেখি শুনি সর্ব্বলোকে ত্রাস উপজিল॥

লোক কয়ে বালকের অদ্ভুত চরিত।
যত যত কর্ম্ম করে মহা বিপরীত॥
পাষণ্ড দুর্মতি জত কুতার্কিকগণ।
গৌড়ে গিয়া রাজা হব বুঝি হেন মন॥
এই বেলা ধরি লৌক গৌড়ের রাজন।
বড় হৈলে ইহারে পারিব কোন জন॥
ভাল ভাল লোক কহে এ মানুষ নয়ে।
না জানি কমন দেব জন্মিছে এথাএ॥
কেহ কহে নিমাঞি সাক্ষাৎ বিধি শিব।
কেছ কহে আইলা বিষ্ণু তারিবারে
জার জেবা লয় তাহা কহে সর্বাজন।
লোকাতীত বেদাতীত সর্ব্ব আচরণ॥
অদ্বৈতাদি মহামহাতাগবত-গণ।
দেখি শুনি প্রেমানন্দে পূর্ণ সর্ব্বজন॥
নিত্যানন্দপ্রভু-শক্তি ধনঞ্জয় ধরে।
কটক-উজ্জ্বল বলি কহিতেন তাঁরে॥
তাঁর বলি কৃপা কৈল নিত্যানন্দ রাএ।
গৌর-বাল্যরঙ্গ চূড়ামণি দাস গাএ॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আর দিন প্রতাতে উঠিয়া বিশ্বম্ভরে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৫৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
বাত্সল্য মহাভাব, শচীর বাত্সল্যরস, গৌরাঙ্গ প্রকাশ, বাল্য ক্রীড়া, শেষে পদের ভণিতার
চরণে গ্রন্থের নাম “ভূবনমঙ্গল” দেওয়া রয়েছে। এই পদটি এর পূর্ব পদের অবিচ্ছিন্ন অংশ
হিসেবে মুদ্রিত রয়েছে। তাই পূর্ব পদের রাগ ও তাল এখানেও আমরা উল্লেখ করলাম


॥ করুণ শ্রী॥
॥ একতালী॥

আর দিন প্রতাতে উঠিয়া বিশ্বম্ভরে।
শ্রীমুখ পাখালি বস্ত্র পরিধান করে॥
শচী দেবী কহএ শুন আমার উত্তরে।
আজিকার মত পুত্র রহিবে মন্দিরে॥

আজি প্রাণ দহে যেন বুক প্রাণ ফাটে।
আজি না জাইবে বাপু জাহ্নবীর তটে॥
হাপুতির পুত্র তুমি পুনতীর বাছা।
আখি-আড় করিবারে নাহি মোর ইচ্ছা॥
এত বলি বিশ্বম্ভর ধরি লৈল কোলে।
গৌর-অঙ্গ ভিজি গেল দুই আখির জলে॥
বিকট কটক যেন পুলক বিপুল।
স্বেদজলে ভিজিল অঙ্গ-দুকূল॥
পীড়াএ উঠিল শচী পুত্র করি কোলে।
গৌর-অঙ্গ আচ্ছাদিল বসন-আঁচলে॥
বাৎসল্য মহাভাব শরীরে উদয়েএ।
আকুল অস্থির ভাবে কাঁথ ঠেলি রয়ে॥
আথি মুখ নাসা ঝরে যেন সিন্ধু-ঝোরে।
অঙ্গে স্বেদ বয়ে মেঘ মুশলের ধারে॥
শরীর দুকূল পীড়া জল নাঞি ধরে।
উঠানে পড়এ যেন নদীর কানরে॥
উঠান ভিজিয়া বেগে জল বই জাএ।
শুনি চমৎকার লোক দেখিবারে ধাএ॥
সগদ্গদ ভাবে কণ্ঠ ঘরঘর করে।
নবীন আষাঢ় মেঘ যেন শব্দ করে॥
আর হোর অদ্ভুত দেখি অঙ্গলতা।
প্রলয়ে কাঁপএ জেন অবনী দেবতা॥

ক্ষণে পীত ক্ষণে রক্ত ক্ষণে কৃষ্ণ সীত।
দেখিতে দেখিতে হএ অতি বিপরীত॥
পাষাণ-পুতলী হেন ক্ষণে ক্ষণে রএ।
সর্ব্বলোক আসি দেখি সবিস্ময়ে রয়ে॥
শুনি মাধবেন্দ্র ধাএ অদ্বৈত আচার্য্য।
গদাধর শ্রীনিবাস যত সাধু আর্য্য॥
মুবারি মুকুন্দ শুক্লাম্বর বক্রেশ্বর।
যত যত সাধুবৃন্দ ধাইল সত্বর॥
দেখি অদ্ভুত ভাব মারি মালসাট।
জিনিলুঁ দুর্জয় কলি ঊর্দ্ধবাহু নাট॥
তাঁসভার নাটে নাচে নবদ্বীপবাসী।
এ ভাব-বিভূতি বিশ্বম্ভর পরকাশি॥
বাদীন্দ্র কহএ মিশ্র শুন মোর বোলে।
নিমিঞ ধরিয়া রাখ আপনার কোলে॥
জেইমাত্র নিমাঞিকে (ধরি) লই কোলে।
স্থগিত হইলা দেবী আকুল বিব্ভলে॥
কথোক্ষণে শচী দেবী পাইয়া চেতন।
লজ্জাএ সন্বরে শচী অঙ্গের বসন॥
জত সহচরী শচী ধরিল জে ঘরে।
দিয়া পাক"তৈল জলে অভিষেক করে॥
সুগন্ধি জাহ্নবী-জলে করিআত স্নান।
অঙ্গ মোছিয়া ধুতি করে পরিধান॥
কুটিল দীঘল কেশ যেন মেঘমাল।
এ দিব্য চিরনী দিয়া করে সংস্কার॥

কেশ শুখাইয়া বাঁধে এ দিব্য লোটনে।
চরণ পাখালি করে মন্দিরে গমনে॥
আসনে বসিয়া নানা উপচার দিয়া।
নারায়ণ অরচয়ে শুদ্ধমতি হৈয়া॥
পূজা করি ধ্যান ধরি করে জপযাগ।
ভাব স্বভাব শুদ্ধ গাঢ় অনুরাগ॥
জপান্তে অষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ নমস্কার।
পরিবারে দুই পুত্রে দেই উপচার॥
রন্ধন আয়োজন কৈল দাসীগণে।
পাকশালে গিয়া দেবী করএ রন্ধনে॥
স্থান সংস্কার করি পিড়ি থাল পাতে।
ভোজনে চলএ পুরী অদ্বৈতের সাথে॥
বাদীন্দ্রের সাথে চলে জত মান্য জন।
পুত্র সঙ্গে মিশ্র জাএ করিতে ভোজন।
নানা উপচারে সবে করিয়া ভোজন।
আচমন করি বসি এ মুখ-বাসন॥
গুবাক চন্দন মাল্য সভাকারে দিয়া।
বিদায় করএ মিশ্র কথো দূর গিয়া॥
নিমারি চরিএ দেখি সবারে তরাস।
সভারে কহএ সবে গিয়া নিজ বাস॥
শুনি পাপীকুলে দুঃখ সুখ সাধুকুলে।
সাধু কহে কলিদর্প নাশ হৈল হেলে॥
শচীর বাৎসল্যরস গৌরাঙ্গ প্রকাশ।
ভূবনমঙ্গল গায়ে চূড়ামণি দাস॥ ০॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
আর দিন প্রভাতে উঠিয়া গৌর রায়ে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত,  “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৫৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
ঘাটে দ্রব্য হরিয়া ফেরত দেওয়া, বিশ্বম্ভরের বাল্য ক্রীড়া। এই পদটি এর পূর্ব পদের
অবিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে মুদ্রিত রয়েছে। তাই পূর্ব পদের রাগ ও তাল এখানেও আমরা
উল্লেখ করলাম


॥ করুণ শ্রী॥
॥ একতালী॥

আর দিন প্রভাতে উঠিয়া গৌর রায়ে।
বালকের সঙ্গে রঙ্গে গঙ্গাতীর জাএ॥
ৰসিয়া করয়ে যুক্তি বালকের সাত।
চোরি করি গিয়া ঘাটে পর-দ্রব্যজাত॥
গঙ্গাস্নান করে জত এ পুরুষ নারী।
ঘটী বাটী সাজী বস্ত্র সবে ঘাটে ধরি॥
প্রকারে হরিব দ্রব্য কেহ না জানিব।
কৌতুক করিয়া জার দ্রব্য তারে দিব॥
এত যুক্তি করি প্রভু গৌর বিশ্বম্ভর।
শিশুমেলে গলাজলে প্রবেশে সত্বর॥
বারকোনা ঘাটে গিয়া মিলে গৌররাজ।
যথা সান করে নারীপুরুষ-সমাজ॥
হরিল সকল দ্রব্য কেহ নাঞি জানে।
হরিয়া রাখিল নিঞা বাঙড়ের বনে॥
স্নান করি গিয়া দ্রব্য কেহ নাঞি পায়ে।
অল্প লোক কাঁদে বড় করে হায়ে হাএ॥
দেখিয়া বালক সাথ হাসে বিশ্বম্ভর।
বিস্ময়ে বিষাদে লোক জাএ নিজ ঘর॥
কেহ দেবায়নে জাএ সর্ব্বজ্ঞের ঘরে।
মহা গণ্ডগোল হৈল নদীয়া নগরে॥
চোর বলি ধায়ে লোক কহে ধর ধর।
হাসিয়া আকুল প্রভু গৌর বিশ্বম্ভর॥

কহিতে বুঝিতে দিন দশঘটি গেল।
গৌরাঙ্গচাঁদের চিত্তে দয়া উপজিল॥
এক ভট্টাচার্য্য বড় পণ্ডিত মহান।
মিলিলা গৌরাঙ্গচান্দ গিয়া তাঁর স্থান॥
খেলিয়া খেলিয়া বুলি শিশুগণ সনে।
দেখিল অনেক চোর বাঙড়ের বনে॥
আমা সবা দেখি তারা পালাএ সত্বর।
দেখিল অনেক দ্রব্য বনের ভিতর॥
ইহা শুনি সর্বলোক বাঙড়েরে ধাএ।
জার জেই দ্রব্য সর্ব্বলোক গিয়া পাএ॥
গৌর-বাল্যক্রীড়া এই জেই জন শুনে।
চোরবাদ চোরতয় নছিব কখনে॥
জে জে বাল্যক্রীড়া করিয়াছে গৌর রায়ে।
শুনিলে গাইলে লোক প্রেমতক্তি পাএ॥
অচিন্ত্য কপাএ তারে গৌরাজ সহাএ।
করুণসাগর চূড়ামণি দাস গাএ॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর