কবি চূড়ামণি দাসের বৈষ্ণব পদাবলী
*
সর্ব্বশিশু সঙ্গে গৌর নিজ গৃহে আসি
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত,  “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৫৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
শচীদেবীর কথার উত্তরে জ্যেষ্ঠ পুত্রের সন্ন্যাস নেওয়ার ফলে হতাশ পিতা জগন্নাথ মিশ্রের
বিশ্বম্ভরকে শিক্ষিত না করার মত প্রকাশ, তা শুনে বিশ্বম্ভরের গঙ্গায় মানুষ ও পশুর
হাড়গোড় ফেলা, পিতার বাধ্য হয়ে নিমাঞিকে গঙ্গাদাসের টোলে ভর্তি করা, বিদ্যাচর্চা,
রসকাব্যের যোগের প্রকার, উপনয়ন। এই পদটি এর পূর্ব পদের অবিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে
মুদ্রিত রয়েছে। তাই পূর্ব পদের রাগ ও তাল এখানেও আমরা উল্লেখ করলাম


॥ করুণ শ্রী॥
॥ একতালী॥

সর্ব্বশিশু সঙ্গে গৌর নিজ গৃহে আসি।
বালকে বিদাএ দিয়া পিঁড়াএত বসি॥
শচী কহে শুন মিশ্র কহিতে ডরাই।
অকার্য্য পড়িলে কিছু কহিবারে চাই॥

বালক চঞ্চল পুত্র খেলে সর্ব্বক্ষণ।
ব্রাহ্মণকুমার হৈয়া না করে অধ্যয়ন॥
তোমার গোষ্ঠীতে জত মহা অধ্যাপক।
বেদ বেদান্ত সর্ব্ব বিদ্যাএ ক্ষমক॥
মিশ্র কহে এক পুত্র পড়িয়া শুনিঞা।
বৈষ্ণবের সঙ্গে বুলে কি বিদ্যা জানিঞা॥
পড়িবার কাজ নাঞি থাকুক মূর্খ হৈয়া।
জে জে পাকে বর্ত্তিবে নিজ ধন খাইয়া॥
এতেক কহিল মিশ্র শচী রহে শুনি।
শুনি শুনি বিশ্বম্ভর মনে মনে গুণি॥
কালি সে করিব কার্য্য এ কথার মত।
বুঝিয়া করিব কার্য্য মনে হএ যত।
গাইতে ঘোষিতে হইল প্রভাত রজনী।
যুক্তি করি শিশু সঙ্গে জাএ গৌরমণি॥
পশু-নর ছাড়মুড় জত তটে ছিল।
বালকের সাথে বহি গঙ্গা-জলে নিল॥
হস্তি ঘোড়া গো মহিষ নানা পণ্ড নর।
হাড় বহি পেলে গঙ্গাজলের ভিতর॥
সব দিন ছাড় বহি পেলে গঙ্গাজলে।
মিশ্র পুরন্দরে গিয়া সব লোক বলে॥

কপালে ক্ষেপিয়া কর কহে মিশ্রবর।
কতেক সন্তাপ বিধি দেই নিরন্তর॥
মন্দিরে ত গিয়া মিশ্র শচীরে কছিল।
তোমার পুত্রের পাকে অপকীর্ত্তি হৈল॥
মড়ার হাড় বহি পেলে গঙ্গাজলে।
দেখি শুনি সর্ব্বলোক কুবচন বলে॥
এত শুনি শচী দেবী বিশ্বম্ভরে বলে।
কেনি হাড় বহি পেল জাহ্নবীর জলে॥
এত শুনি গৌর বলে কি কহিব আর।
যেতেমতে করি সব জীবের উদ্ধার॥
না পড়ি না করি কার্য্য বসি অন্ন খাই।
পরলোক-কার্য্য কিছু করিবারে চাই॥
নিরাশ্রয় জত জীব নাঞিক সহাএ।
অপমৃত্যু মরি হাড় গড়াগড়ি জাএ॥
কোনপাকে তার হাড় পড়ে গঙ্গাজলে।
সে সব কৃতার্থ হএ সর্ব্ব শাস্ত্র বলে॥
লোতে জে করএ প্রীতি সে পিরিতি নয়ে।
জে জিঘাংসাএ লক্ষ্মী আনে সে লক্ষ্মী না রয়ে॥
সুপাত্রে যে দেএ ধন সে নহেত ব্যয়ে।
পরার্থে করিয়ে দুঃখ সেহ দুঃখ নয়ে॥
পরিশ্রম করি হাড় পেলি গঙ্গাজলে।
অবশ্য কৃতার্থ জীব হব শুভ ফলে॥

স্থাবর জঙ্গম জত সবে কৃষ্ণে রত।
কৃষ্ণের সবারে কৃপা করুণ মহত্ত্ব॥
জীবগণের সুখ দুঃখ সব কৃষ্ণে লাগে।
সর্ব জীবের কল্যাণ কৃষ্ণ-চিত্তে জাগে॥
অতয়েব বৈষ্ণব সব জীবে দয়া করে।
দেখিতে শুনিতে কিছু মোর চিত্রে স্ফুরে॥
এত শুনি শচীরে কহএ মিশ্রবর।
এসব কথাএ কার না সাজে উত্তর॥
মোর বাক্য বিশ্বস্তর শুন মন দিয়া ।
পরম যত্নেতে তুমি শাস্ত্র পড় গিয়া॥
গঙ্গাদাস চক্রবর্তী পণ্ডিত মহান।
সমর্পি এড়িব গিয়া চল তার স্থান॥
সহজে তোমার প্রখর শুদ্ধ ভাব।
তাঁর স্থানে তোমার ত হৈব বিদ্যালাভ॥
চক্রবর্তী স্থানে মিশ্র পুত্র লই জাএ।
বিনয়ে প্রেমেতে পুত্র সমর্পিল তাএ॥
আজি হৈতে পুত্র তোমারে কৈল সমর্পণ।
যত্ন আশীর্ব্বাদে ইহাঁ করাহ অধ্যয়ন॥
এত শুনি গঙ্গাদাস অনুমতি দিল।
পিরিতি আরতি ভক্তি মিশ্রেকে তোষিল॥
পরম আহ্লাদে মিশ্র মন্দিরেত গিয়া।
আর দিনে পড়িবারে পুত্র থুইল নিয়া॥

অধ্যয়ন করয়ে গৌর গঙ্গাদাস স্থানে।
এক জানাইতে গৌর অনেক সে জানে॥
বিশ্বম্ভর প্রতিভা দেখিয়া গঙ্গাদাস।
আকৃতের মত গুণ দেখি উল্লাস।
ইহাঁ পড়াইলে হব সর্ব্ব শিষ্য বশ॥
ইহাঁ পড়াইলে জত পণ্ডিত মহান।
সভাএ কহিব মোরে পরম বিদ্বান॥
মোর নাম যশ সব ঘুষিব সুজনে।
সামুদ্রক গুণ অঙ্গে দেখ বিদ্যমানে॥
জত জত সল্লক্ষণ আছে বিশ্বম্ভরে।
মহা সল্লক্ষণ গুণ কেহ নাঞি ধরে॥
অচিরাৎ বিদ্যালাভ হইব ইহাঁর।
এত বড় ভাগ্যে কেহ নাঞি হব আর॥
স্বভাবসুন্দর [রূপ] গুণ অনুপামে।
নবদ্বীপ শ্লাঘ্য হব বিশ্বম্ভর নামে॥
এত বলি বিশ্বম্ভরে আদরে পড়াএ।
শ্রুতিমাত্রে সব বুঝে শুনি সুখ পাএ॥
ছয় মাসের বিদ্যা গৌর পড়ে ছয় দিনে।
দেখি শুনি সর্ব্বলোক অদ্ভুত মানে॥
মাস পাঁচ ছয়ে হএ ব্যাকরণ বোধ।
কাব্য পড়াইতে গুরু করে অনুরোধ॥
একমাসে পড়ে গৌর সর্ব্ব অভিধান।
রসকাব্য পড় গুরু করিল বিধান॥
গৌর কএ শুন চক্রবর্ত্তী মহাশয়ে।
কোন রসকাব্য মোরে কহত নিশ্চয়ে॥

রসকাব্য জত জত চক্রবর্তী ভাষে।
রসকাব্য নাম শুনি গৌরচন্দ্র হাসে॥
গুরুকে কহএ গৌর শুন মহাশয়ে।
রসকাব্য হেন বোল কত যোগে হএ॥
স্পৃহা হৈলে শ্রদ্ধার্ত্তি তবে রুচি হয়ে।
রুচি হৈতে রতিদেবী ভাবময়ী পাএ॥
ভাবে পুষ্ট হই রতি ভক্তি নাম ধরে।
বিষ্ণুভক্তি হই ডুবে এ ভাবসাগরে॥
সাত্বিক সে অষ্ট ভাব হাস্যাদি দ্বাদশ।
ব্যভিচারী তের্ত্তিশ যোগে স্থায়ী হএ রস॥
বেদ-কল্পতরু-রস এ ফল কলিত।
ত্বকাষ্ঠ্য রহিত শুকমুখেতে গলিত॥
সে রস ফল পীএ কৃষ্ণের ভাবক।
রাধাকৃষ্ণ রাসকেলি শ্রীব্যাস ভাবক॥
ঘস্বরী ঘস্বর জত করএ শৃঙ্গার।
রসকাব্য করি বর্ণে সেহ ছারখার॥
শুনি শুণি গঙ্গাদাস হইলা হতাশ।
এতদিনে হৈল রসকাব্যে অবিশ্বাস॥
মীমাঁসাদি স্মৃতি পড় মনঃ স্থির করি।
কর্ণ নাসা ছুই গৌর কয়ে হরি হরি॥
কর্ম্ম প্রধান করি মীমাংসায়ে কয়ে।
আর জত জত স্মৃতি সকাম ধর্ম্মময়ে॥
দুই কড়ার দ্রব্য দিয়া লক্ষেশ্বরী মাগে।
অনুক্ষণ দুর্বাসনা তার চিত্তে জাগে॥

সকামী হইয়া লোক কৃষ্ণে ধর্ম্ম ছাড়ে।
কর্ম্মসূত্রে বদ্ধ লোক কুম্ভীপাকে পড়ে॥
কেবল সকাম ধর্ম্ম নহে লোকহিত।
পড়িব তোমার কাব্যে এ বটে উচিত॥
প্রাকৃত কাব্য আর স্মৃতিশাস্ত্র জত।
পড়িলত এক মাসে গুরুর অভিমত॥
বিশ্বম্ভর কয়ে শুন গুরু মহাশয়ে।
মন্দ না জানিলে ভাল জানিবারে নএ॥
এখন জানিল জেই শাস্ত্রের জে গুণ।
ঈশ্বরবাদী শাস্ত্র জানিব পুনঃপুন॥
বেদান্ত পড়ে গৌর জত জত কক্ষা।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মকর্ম্ম সভা দেই দীক্ষা।
জত মহা অধ্যাপক নবদ্বীপবাসী।
শ্রীক্বষ্ণে বিমুখ জত ব্রহ্মবিলাসী॥
সভা সাথ উগ্দ্রাহ ত করে বিশ্বম্ভর।
হেন জন নাঞিক জে করয়ে উত্তর॥
মালমাট মারি গৌর সভাসতে কয়ে।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মকর্ম্ম সব সত্য হয়ে॥
ইহাতে দ্বৈধ করে কোন দুরাশয়ে।
বুঝুক আমার সাথ সর্ব্বশাস্ত্র কয়ে॥
জতেক মন্দধী শাস্ত্র অর্থ নাঞি জানে।
অহঙ্কারে মুগ্ধ হয়ী ঈশ্বর না মানে।
চতুঃশ্লোকে নারায়ণ ব্রহ্মকে কহিল।
কৃষ্ণ জন্মকর্ম্ম সর্ব দীক্ষা শিক্ষা দিল॥

ভাগবতে কহিছেন ব্যাস মহাশয়ে।
জন্মকর্ম্ম নামগুণ গাইবে নিচ্চয়ে॥
সর্বশাস্ত্র ব্যাখ্যা করি সিদ্ধান্ত দিল।
বিদ্যামদে অধ্যাপক সব পাসরিল॥
কক্ষায়ে হারিয়া সবে করে অভিমান।
বালকের সাথ কিবা করিব বাখান॥
গঙ্গাদাস চক্রবর্তী মিশ্র মহাশয়ে।
বিশম্ভর লই দুঁহে মন্দিরে চলয়ে॥
চমৎকার লাগি গেল নদীয়া নগরে।
বালকের সাথে কেহ রা কাড়িতে নারে॥
পীঁড়াএ বসিয়া মিশ্র গঙ্গাদাসে কএ।
দিন করি বিশ্বম্ভরে দেহ উপনএ॥
ভাল যে বুঝিয়া দিন করে গঙ্গাদাস।
অক্ষয় তৃতীয়া তিথি শ্রীবৈশাখ মাস॥
মিশ্র কছে মহাশয়ে কর গঙ্গাস্নান।
ফলাহার করি ঘরে করিবে প্রয়াণ॥
গঙ্গাস্নান করি গঙ্গাদাস আসি ঘরে।
নানা উপচারে বসি করে ফলাহারে॥
আঁচমন করিয়া ত মুখ শুদ্ধি করে।
সুবর্ণ গাড়ুয়া দীব্য বস্ত্র দিল তারে॥

মন্দিরে চলিলা চক্রবর্ত্তী গঙ্গাদাস।
আয়োজন করে মিশ্র পরম উল্লাস॥
সরখেল ভৃত্য জত আমাত্য নফরে।
সভারে আদেশ কৈল চলহ নগরে॥
মিশ্র নমস্করি তারা নগরেত জাএ।
আয়োজন কিনি তারা ধরেরে পাঠাএ॥
আয়োজন লই তারা মিশ্রস্থানে গেল।
দেখি মিশ্র পুরন্দর হরষিত হৈল॥
এ ঘর মন্দির পীঁড়া এ নাছ চত্বর।
দশ বিশ জন মেলি মাজিল সত্ত্বর॥
শ্রাদ্ধ হোম স্থান কুণ্ড কৈল সংস্কার।
নানা দ্রব্য তুলসী চন্দন উপচার॥
শ্রাদ্ধ হোম স্থানে দ্রব্য বিপ্র সব থুইয়া।
মিশ্রবর স্থানে সবে গোচরিল গিয়া॥
শুনিঞা ত মিশ্রবর হরষিত মনে।
আনন্দে চলিলা করিবারে গঙ্গাস্নানে॥
সমুদ্ভব নাম অগ্নি করিয়া স্থাপন।
অগ্নির উত্তরে নিল গৌরাঙ্গ মোহন॥
শিখার সহিত শির মুণ্ডন করিয়া।
স্নান করাই রক্ত বস্ত্র পরাইয়া॥
পরাএ কুণ্ডল সাথ দিব্য অলঙ্কার।
অগ্নি প্রদক্ষিণ দিল শচীর কুমার॥
বেদমত সুপ্রকৃত কর্ম্ম আরপিয়া।
প্রাদেশ-প্রমাণ কুশ ঘটে ডুবাইয়া॥

এ সমিধ তুষ্ণী নাম অগ্মিকে হুনিয়া।
সাথ সমস্ত মহাব্যাহৃতি হোম করিয়া॥
এ সকল ক্রমণিকা করি সমাপন।
যজ্ঞোপবীত নিব শচীর নন্দন॥
কৃষ্ণাজিন মুঞ্জ মেখলা পরিধান।
এ গৃহীত বিল্ব দণ্ড অগ্নিতে প্রদান॥
বংশদণ্ড গ্রহণ করিয়া ব্রক্ষচারী।
আচার্য্য আজ্ঞাএ ভিক্ষা কার্য্যে অভিসারি।
প্রথমতে ভিক্ষা করে গিয়া মাতৃস্থানে।
ভিক্ষা দ্রব্য আচার্য্যেরে করিলেন দানে॥
আচার্য্যেরে পাদ্য অর্ঘ্য আচমনি দিয়া।
বস্ত্র রত্ন সবৎসা সিত ধেনু দিল নিয়া॥
বেদ-বিধান জত জত কর্ম্ম করি।
সর্ব্বদান দিল সর্ব্ব লোকে আশা ভরি॥
গঙ্গাস্নান করি পুন মন্দিরে আসিয়া।
নিজ পরিজন সাথ ভূঁজএ বসিয়া॥
আচমন করিয়া করয়ে মুখশুদ্ধি।
সর্ব পরিবারে বস্ত্র দেই মহাবুদ্ধি॥
শয্যায়ে সুতিয়া নিদ্রা জাএ মিশ্রবর।
প্রভাতের জত কর্ম্ম করে বিশ্বভর॥
যে দিনের জে জে কর্ম্ম সকল করিয়া।
পড়িবারে জাএ গৌর আরুতি ধরিয়া॥
পুস্তক লইয়া কাখে ডাকে ছাত্রগণে।
গুরুস্থানে গিয়া চল করি অধ্যয়নে॥

নানা উপচার দ্রব্য লয়ে ভৃত্যগণে।
উপঢৌকন দিল গুরুবর স্থানে॥
উঠিয়া গঙ্গাদাস কোলে করে বিশ্বম্ভরে।
ধর্ম্মসেতু গৌরাঙ্গ তাহারে নমস্করে॥
গঙ্গাদাস কহে অহে গৌরাঙ্গসুন্দরে।
মোরে কবে তোমি না করিবে নমস্কারে॥
তোমা দরশনে সর্ব্বদুঃখ বিমোচন॥
তোমা দরশনে মোর জুড়াএ লোচন।
তোমা দরশনে লাখ লাখ ধন পাই।
তোমার শ্রীমুখ রাতি দিনে বসি চাই॥
অনেক তপের ফলে করি অধ্যাপনা।
তোমারে পড়াইব বড় এ ভাগ্য বাসনা॥
তোমার মহান রূপ জত মহাগুণে।
কিছু কহিবারে পারি যদি কেহ শুনে॥
জত জত অঙ্গে ধর মহাসল্লক্ষণ।
কাহার শকতি তাহা করিব কথন॥
জেবা অনুভব দেখি জে দেখি সপন।
কহিতে চাহিএ কিছু না জাএ কথন॥
গৌর যজ্ঞোপবীতের অদ্ভুত কথন।
চূড়ামণি দাস কইল দিগদরশন॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গুরুরে লইল গৌর নানা দ্রব্যজাতে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
 
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৫৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
বিশ্বম্ভরের গুরু গঙ্গাদাস পণ্ডিতকে মহা-অধ্যাপক প্রতিপন্ন, নিত্যানন্দের আগমনের কথা
শ্রীবাসকে জানানো এবং বলা যে তাঁকে সে নিজে ছাড়া আর কেউ দেখতে পারবেন না,
শ্রীবাসকে গৌরাঙ্গ দশাবতার দর্শন করাবেন বললেন। এই পদটি এর পূর্ব পদের অবিচ্ছিন্ন
অংশ হিসেবে মুদ্রিত রয়েছে। তাই পূর্ব পদের রাগ ও তাল এখানেও আমরা উল্লেখ
করলাম


॥ করুণ শ্রী॥
॥ একতালী॥

গুরুরে লইল গৌর নানা দ্রব্যজাতে।
দিলেন সকল দ্রব্য নফরের হাথে॥
তোমার বুদ্ধ্যের কেবা নিতে পারে ওর।
না বুঝিএ তোমার বাক্য তোমি শিষ্য মোর॥
কি কাজে আমারে দিয়া গুরু সম্ভাষণা।
তুষিয়া সকল ধীর ভূষিলে আপনা॥
তোমার চিত্তের কথা কে বুঝিতে পারে।
কিছু বুঝএ কৃপাদৃষ্টে চাহ জারে॥
জে কিছু আছএ মোর বিরল কখন।
শুনিবে আমার ভাগ্যে দিয়া কিছু মন।
শুনিঞা ওরুর স্তব বিশ্বম্ভর রায়ে।
স্থগিত করাএ প্রভু ঈষত লীলায়ে॥
বিশ্বম্ভর রায়ে জত জত খণ্ডা করে।
তত তত সিদ্ধান্ত শ্রীগঙ্গাদাস পুরে॥
বিশ্বম্ভর গঙ্গাদাসে করে দৃক্পাতে।
মহা মহা প্রতিভা সে হএ হৃদ্জাতে॥
এক কহিতে কহে অনন্ত আখ্যান।
হাপুর কহিতে করে বেদান্ত ব্যাখ্যান।
বুঝি গঙ্গাদাস কণ্ঠে সরস্বতী বাস।
সেই দর্পে গঙ্গাদাসের এ বাগ্ বিলাস॥
মহা মহা অধ্যাপক নবদ্বীপবাসী।
অদ্ভূত শ্রবণে সবে মেলিলেন আসি॥

হেন জন নাঞি জে করএ প্রত্যুত্তর।
মহাব্যাখ্যা শুনি সভার সুখাএ অন্তর॥
কেহ কহে গঙ্গাদাস বড় ভাগ্যবান।
আচম্বিত শুনি ইহার এসব ব্যাখ্যান॥
কেহ কহে কোন সিদ্ধ আশীর্ব্বাদ দিল।
কেহ কহে কোন দেব পরসন্ন হৈল॥
কেছ কহে কোন মন্ত্র সাধি গঙ্গাদাস।
সেই সেই দর্পে করে এ বাগ্ বিলাস॥
কেহ কহে নারায়ণ পরসন্ন হৈল।
গঙ্গাদাসের শ্রীকণ্ঠে সরস্বতী দিল॥
ধনি ধনি গঙ্গাদাস সভার তিলক।
নদীয়া সমাজে তোমি মহা অধ্যাপক॥
মহাপদ গরুকে দিলেন গৌররায়ে।
বিমল কিরিতি তাঁর অধ্যাপক গাএ॥
এইরূপ অধ্যয়ন করে বিশ্বম্ভর।
বিদায় করিয়া চলেন আপনার ঘর।
এ জল আসন লৈয়া ভৃত্যগণ ধাএ।
চরণ পাখালে কেহ তৈল দেই গাএ॥
গঙ্গাস্নান করি গৌর পরে কাচা ধূতী।
আসনে বসিয়া লৈল সন্ধ্যাবিধি পুথী॥

সন্ধ্যা করি শ্রীকৃষ্ণের বিবিধ পূজন।
লই বৈসে আচমন শ্রীমুখবাসন॥
বিপ্রশিশু কহে প্রভু সিদ্ধ হৈল অন্ন।
ভোজন মন্দিরে প্রভু করহ গমন॥
ভোজন মন্দিরে গিয়া শ্রীশচীনন্দনে।
চরণ পাখালী পুন বসিলা আসনে॥
অন্নব্যঞ্জন জত নানা উপচারে।
পরিবেশন শচী কৈল একুবারে॥
শ্রীকৃষ্ণেরে অন্ন প্রভু করে নিবেদন।
বিবিধ বিধানে কৃষ্ণে করাএ ভোজন॥
ভোজনান্তে আঁচমন দিয়া মুখশুদ্ধি।
শয়নেত পাদসেবা অতি প্রেম বুদ্ধি॥
কৃষ্ণ-নিবেদিত অন্ন করিয়া ভোজন।
আচমন মুখশুদ্ধি করিল শয়ন॥
কথোক্ষণ নিদ্রা গিয়া উঠি বিশ্বম্ভর।
ত্বরাএ চলিয়া জাএ শ্রীবাসের ঘর॥
সভাকারে ডাকি আজি আন শ্রীনিবাস।
সবে মেলি করি আজি কীর্ত্তন বিলাস॥
সভা আনি কৈল সংকীর্ত্তন অনুবন্ধ।
মালিনী ত কৈল মাল্য নৈবেদ্য প্রবন্ধ॥
নাচত গৌরাঙ্গচাঁদ অদ্ভুত নাট।
শ্রীবাসের বাড়ী হৈল প্রেমরস-হাট॥

প্রভুর নাটেতে নাচে জত ভক্তগণ।
শ্রীকৃষ্ণ-উন্মাদে সবে হৈলা অচেতন॥
গৌরমন জাগ হৈল নিত্যানদ রায়।
'অহে ঠাকুর ভাই হয় ত সহায়॥
তোমা না দেখিয়া মোর প্রাণ বুক ফাটে।
আসিয়া প্রসন্ন হয় প্রেমরস হাটে॥
এতশুনি নিত্যানন্দ চিত্ত উচাটন।
নবদ্বীপ নবদ্বীপ বলে ঘন-ঘন॥
গৌর-অনুরাগে কান্দে নিত্যানন্দ রায়ে।
গৌর দেখিবারে চিন্তে পরম উপায়ে॥
এথায় নাচিতে গৌর অট্ট অট্ট হাসে।
মালসাট মারে প্রভু পরম উল্লাসে॥
আজি মোর রজনী প্রভাত শুভক্ষণে।
বড়ভাগ্যে পাইলুঁ মুঞি পুরুষ রতনে॥
আজি পরসন্ন মহা বৈকুণ্ঠনাথ।
অসাধনে চিন্তামণি দিল হাতে হাত॥
এত শুনি করজোড়ে কহে প্রিয়গণ।
কি কহিলে পুনঃ কহ সুদৃঢ় বচন॥
এত শুনি কহে প্রভু ধরি অনুরাগ।
মোর ভাগ্য তোর ভাগ্য নবদ্বীপ ভাগ॥
জাই সভে চল ঘর আসিহ প্রভাতে।
কহিব সকল কথা তোমা সভা সাথে॥

এত বলি বিশ্বম্ভর গেলা নিজঘর।
জলাসন লৈয়া ধাএ সব অনুচর॥
আসন জোগাএ কেহ পাখালে চরণ।
গামছাএ কেহ করে চরণ মোচন॥
উত্তর সম্বোধ নাঞি অগাধ গভীর।
ভরোষা করিয়া পাশে কেহ নহে থীর॥
আবেশে হুঁকাড় ছাড়ে কীরে কীরে বলে।
ঘরেতে বাহির হোই রাজপথে চলে॥
চলিতে চলিতে জাএ শ্রীবাসের বাড়ী।
যতেক সেবক (সব) জাএ বড়াবড়ী॥
উচ্চস্বরে কহে প্রভু দুয়ারে থাকিয়া।
ঘুচাহ কপাট জাব কছে ডাক দিয়া॥
শুনিয়া সত্বর ধাএ মালিনী শ্রীবাস।
কপাট ঘুচাই তাঁরা রহে একপাশ॥
শ্রীবাস মালিনী শুন তোমি শুদ্ধমতি।
তোমা সভা সনে করি এক যুকতি॥
দেখিতে আসিব মোরে নিত্যানন্দ রায়ে।
সেই সর্ব্ব কার্য্যে মোরে হৈব সহাএ॥
তাঁরে না দেখিব কেহ দেখিব সে আমি।
এ সব বিশ্বাস কারে না কহিবে তোমি॥
শ্রীনিবাস কয়ে শুন দয়ার সাগর।
কহিবে রহস্য কথা অ সি মোর ঘর।

এতদূর দয়া যদি আছে দীন জনে।
করহ কৃপা প্রভু দয়া ধরি মনে॥
এত শুনি উথলিলা দয়ার সাগরে।
দেখ দেখ শ্রীনিবাস কহে বিশ্বম্ভরে॥
যতেক আছএ মোর অংশ পরকাশ।
যতেক আছএ মোর এ কেলি বিলাস॥
সব আজি কহিমুঁ তোমার বিদ্যমান।
এ সত্য এ সত্য ইহা না কবিমু আন॥
দশ অবতার প্রভু দেখাএ শ্রীবাসে।
গৌর-পরকাশ কহে চুভামণি দাসে॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গৌর অঙ্গে নিকশল মৎস্যরূপ হবি
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৬১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
শ্রীবাসের গৃহে শ্রীবাস ও মালিনীকে দশাবতার প্রদর্শন, বিশ্বরূপের সন্ন্যাস। দীর্ঘ পদের
এইটুকুই আমরা এখানে তুলেছি


॥ সিন্ধুড়া॥

গৌর অঙ্গে নিকশল মৎস্যরূপ হবি।
সর্বাখর্ব অবয়ব সর্ব কান্তি ধরি॥
পুছের আষ্ফোটে খিতী কাঁপে থরথর।
কন্ধবর শৃঙ্গে যেন সুমেরু-শেখর॥
প্রলয়ের জলে বেদ উদ্ধরে ধরি।
শীবাস-মালিনী আখি-গোচর সে হরি॥
ত্রাসে মুরুছিত দুহুঁ গড়াগড়ি জাএ।
দেখি গৌর সংঘারল মৎস্যবর-কায়ে॥
গৌরাঙ্গ কৃপাএ দুহুঁ উঠল সুথীর।
আখি মেলি দেখে মহা কমঠ শরীর॥
পৃষ্ঠে খিতি সপ্ত সিন্ধু চক্র সম রয়ে।
শ্রীবাস-মালিনী চিত্রমূর্ত্তি হেন চায়ে॥

গৌর-অঙ্গে প্রবেশল কমঠ শরীর।
গৌর-অঙ্গে আবির্ভাব কোল মহাবীর॥
সুধানিধি অঙ্গ হেন দন্তে খিতী বসে।
শ্রীবাস মালিনী দেখি বাঢ়ল উল্লাসে॥
গৌর-অঙ্গে প্রবেশল বরাহ শরীর।
আবির্ভাব হৈলা নরসিংহ মহাবীর॥
ব্রহ্মাণ্ডের আগে লাগে শটার কলাপে।
সুরাসুর মুরূছাএ বদন-আলাপে॥
রক্তবর্ণ জিহ্বা কাঁপে বিকট দশনে।
কত দাবানল বহে মহা ত্রিনয়ানে॥
অঙ্গ-জ্যোতি দর্পে ডুবে ভানু সুধাকর।
অষ্টাবসু দিকপাল জলের ভীতর॥
দেবাদেবী লইয়া অদেখ সুরবর।
পর্ব্বত গহ্বরে রহে ব্রহ্মা মহেশ্বর॥
পালাএ কমলা দেবী না জানিঞা সুধি।
উদ্ভট বিকট দেখি নহে প্রভু-বুধি॥
পালাইল ভক্তিশক্তি নবগ্রহগণে।
রহিল ত মহাভক্তি প্রভু বিদ্যমানে॥
শ্রীবাস মালিনী পড়ে মুদিয়া নয়ান।
দৃষ্টিশক্তি তাঁরে প্রভু করিলেন দান॥
শ্রীবাস মালিনী দেখে নৃসিংহ-শরীর।
জার মহাতেজে কোন জন নহে থীর।
নরসিংহ নিজ দেহে গৌর সন্বরণ।
তবে প্রকাশিল গৌর অদ্ভুত বামন॥
শিরে পদ বলি ছলি পাতালে লইল।
শ্রীবাস মালিনী তারে দণ্ডবত কৈল॥
গৌরদেহে প্রবেশিল বামন শরীর।
তবে আবির্ভাব হৈলা শ্রীভার্গব বীর॥
জটিল কম্বল পরি ভূঁজে ধনুর্ব্বাণ।
বামাংশে কুঠার যজ্ঞোপবীত বিধান॥
দেখহে পৌরুষরাম পণ্ডিত শ্রীবাস।
তাঁহা নিজ দেহে ধরি শ্রীরাম-প্রকাশ॥
ত্রৈলোক্যমোহন রূপ দূর্বাদলশ্যাম।
লাবণ্য লীলাএ জিনে কোটি কোটি কাম॥
যার গুণে সমুদ্রে হইল সেতুবন্ধ।
লীলাএ হানিল জে রাবণ দশকন্ধ॥
উপামা দিবারে তাঁর না পাইল সীমা।
সর্ব্ব শাস্ত্র বেদে গাএ বিমল মহিমা॥
জন্ম হৈতে আছে ষাঠি সহশ্র বৎসর।
বাল্মীক পুরাণ কৈল আতি মনোহর॥
দেখিয়া রামের রূপ পণ্ডিত শ্রীবাস।
ত্রিবিধি সে তাপ পাপ হইল বিনাশ॥
দেখিতে দেখিতে রাম তিরোভাব ধাম।
লীলাএত আবির্ভাব প্রভু বলরাম॥
দেখিয়া কাঁদয়ে প্রভু শচীর নন্দন।
এই দেখ নিত্যানন্দ অংশ সঙ্কর্ষণ॥

জার হালে অদ্য বঙ্ক হস্তিনা নগরে।
বাসুদেব সঙ্কর্ষণ দ্বারাবতী পুরে॥
শুনি দণ্ডবত শত করে শ্রীনিবাস।
দেখিতে দেখিতে প্রভু হৈলা অপ্রকাশ॥
তবে আবির্ভাব হৈলা বৌদ্ধরূপ হরি।
জীববধে যজ্ঞ নিন্দে জীবে দয়া ধরি॥
দেখি তাঁরে দণ্ডবত করে শ্রীনিবাস
গৌর অঙ্গে সো রহে কল্কি-পরকাশ॥
কল্কী দেখি শ্রীনিবাস দণ্ডবত করে।
গৌর-দেহে পাএ লয়ে কল্কির শরীরে॥
শ্রীনিবাস কহে প্রভু দয়ায় সাগরে।
কৃপা করি দেখাইলে দশ অবতারে॥
কি ছার পামর মুঞি অপাত্র দুর্মতি।
দীন খীনমতি আমি অধম দুর্গতি॥
পরম কৃপালু গুণে করিয়াছ কৃপা।
কোন কল্পে না ছাড়িমুঁ তোমার দুই শ্রীপা॥
অবতারবলী-বীজ মহা বিষ্ণুধাম।
তোমার বিলাস রূপ অতি অনুপাম॥
শ্রুতিতে দেখিয়াছি কহি সেই বলে।
জত জত অবতার তাহারি সকলে॥
তুমি সর্ব্ব পরাৎপর ভগবান হরি।
যশোদা-তনয় তুমি বরজ-বিহারি॥

জে মোরে করিলে কৃপা সে হউক নিচ্চয়ে।
জনমে জনমে জেন পাসরণ নএ॥
এত শুনি ঘরে জাএ শচীর তনয়ে।
জলাসন লৈয়া অত ভৃত্যগণেঁ ধাএ॥
চরণ পাখালি প্রভু বসিল আসনে।
শচী কহে গুণনিধি করহ ভোজনে॥
অন্নব্যঞ্জন দেই দেই পিঠা খিরি।
গঙ্গাজলে শ্রীকৃষেরে নিবেদন করি॥
কৃষ্ণে নিবেদন অন্ন করিয়া ভোজন।
আচমন করি প্রভু করিল শয়ন॥
তাম্বুল খাই নিদ্রা জাএ বিশ্বম্ভর।
ওথা বিশ্বরূপ লইয়া শুনহ উত্তর॥
বিশ্বরূপ চলি গেলা করিতে সন্ন্যাস।
শুনিশচী মিশ্রবর হৈলা হতাশ॥
অন্ন নাঞি খাএ দুঁহে জল নাহি পীএ।
আছাড়-গড়িতে কাঁদে জীয়ে বা না জীএ।
বাপ মাএ শান্ত করাইল বিশ্বস্তর।
গৌরাঙ্গ দেখিয়া দুঁহু গেলা নিজঘর॥
পাশরিল দুঃখ শোক দেখি বিশ্বম্ভরে।
প্রাতঃক্রিয়া করি গৌর আহ্নিক আচরে॥
*        *        *        *        *

আমরা পদটিকে অসমাপ্ত ভাবে এখানে তুলেছি।

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চলিজাএ নিত্যানন্দ গৌর-অনুরাগে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৯১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
প্রভু নিত্যানন্দের বর্ণনা

॥ সিন্ধুড়িয়া রাগঃ॥

চলিজাএ নিত্যানন্দ গৌর-অনুরাগে।
রূপ দেখি মনমথ রূপলেশ মাগে॥
ছত্রিত শিরবর ভাল পরিসর।
গোরোচনা চন্দন তিলক সুন্দর॥
শ্যামর চামর কেশ নিতম্ব-চুম্বিত।
সুবেশ লোটন-বন্ধ স্কন্ধ সুলম্বিত॥
উন্নত ভ্রূভঙ্গ যুগ কামের কামান।
দীঘল বিপুল আখি মনমথ-বাণ॥
শ্রীমুখ নাসিকা তুঙ্গ সুনির্মিত কান।
কনক মুকুর গণ্ড হনু অনুপাম॥
সুরঙ্গ অধর চঞ্চু চিবুক সুন্দর।
দ্বিজরাজ পাঁতি যেন পূর্ণ সুধাকর॥
খর্ব্ব গ্রীব কম্বু কণ্ঠ উন্নত স্কন্ধর।
তুঙ্গ সুপীন চারু বক্ষ পরিসর॥
কনকের স্তম্ভ যেন মহা-ভুঙ্গরাজ।
বিপুল নিতম্ব বিম্ব সিংহ-দন্ত মাঝ॥
বলিত ললিত উরু জঙ্ঘ মনোহরে।
বিমল কমল পদে মকরন্দ ঝরে॥
ভকত লূবধ ভৃঙ্গ করে মধুপান।
বড় প্রতিআশ দাস চুড়ামণি গান॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অতি উসকালে জাএ চোর গমনে
কবি চূড়ামণি দাস
এই পদটি আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়”
অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ড, ৯২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

এই পদে রয়েছে . . .
প্রভু নিত্যানন্দ ও বিশ্বম্ভরের মিলন

অতি উসকালে জাএ চোর গমনে।
অঙ্গ ঢালিয়া জাএ মলিন বসনে॥
গৌর অনুরাগে আবেশে আকুল।
নয়ানের জলে ভিজে শরীর দুকুল॥
আখি-জল একে আরে অঙ্গে শ্বেদ বয়ে।
শিব-গীতে নারায়ণ যেন দ্রবময়ে॥
ত্বরায়ে উত্তরে গিয়া শ্রীনিবাসের বাসে।
ধরণী চলএ নিতাই ভাব বিবশে॥

গঙ্গাস্নান করি গৌর ত্বরাএ চলিল।
শ্রীনিবাস-বাড়ী গৌর আসিয়া মেলিল॥
গৌর দেখি নিত্যানন্দ করে দণ্ডবত।
গৌর দণ্ডবত করে নিজ অভিমত॥
দুঁহাকার দুঁহু ভক্ত দণ্ডবত করে।
নিবারণ করিবারে কেবা শক্তি ধরে॥
দুঁহাকার পদ-ধূলি দুহে নিতে চাএ।
দুঁহু বড় শক্ত ধূর্ত্ত দুঁহু নাঞি পাএ॥
হাথাহাথী ধরাধরী করি কোলাকোলি।
আবেশে আকুল দুঁহে ভাই ভাই বলি॥
আবেশে আকুল দুঁহু আখিজল বএ।
গদগদ বাক্য শ্বেদ স্তম্ভ হেন রএ॥
গৌর কহে ভাই অহে নিত্যানন্দ রাএ।
মোর বড় ভাগ্য তুমি আইলা এথাএ॥
আজি জন্ম সত্য মোর সত্য সর্ব্ব কাজ।
আজি সত্য পাব আমি বৈষব সমাজ॥
আছি সে বাড়িল মোর বৈষ্ণব দর্প।
আজি না দংশিব কারে কলি কালসর্প॥
আজি সে বাড়িব মোর সংকীর্ত্তন ধর্ম্ম।
পারিমু করিতে আজি মনোনীত কর্ম্ম॥
আজি হৈল নৃত্যগীত আনন্দ প্রকাশ।
আজি সে সভার কৃষ্ণ-প্রসাদের আশ।
এত শুনি নিত্যানন্দ কহিতে লাগিল।
নিদ্রা হৈতে সিংহ যেন নিদ্রা সে ভাঙ্গিল॥
শুন শুন অহে প্রভু করুণাসাগর।
সত্যসঙ্কল্প তুমি সর্ব্ব পরাৎপর॥
তোমার মনেতে সেবা হয়ে অভিলাষ।
বিলাস স্বরূপ বিষ্ণু করেন প্রকাশ॥
তোমার ইচ্ছাএ দেবগণ জিএ মরে।
তোমার ইচ্ছাএ পুনঃ পুন জন্ম ধরে॥
তোমার ইচ্ছাএ উরে শশি-দিবকর।
তোমার ইচ্ছাএ ক্ষণ দণ্ড প্রহর॥
তোমার প্রভাবে হএ কোটি জগদণ্ড।
তোমার প্রভাবে সব হএ খণ্ড খণ্ড॥
তোমার প্রভাবে যুগ-ধর্ম্ম পরকাশ।
তোমার প্রভাবে কেলি অনন্ত বিলাস॥
অবতারাবলি-বীজ বেদে নাম ধরে।
তোমার প্রভাবে মহা-বৈকুণ্ঠ ঈশ্বরে॥
অপূর্ব্ব অচ্যুত নিত্য অজিত অক্ষয়ে।
স্বভাব স্বরূপ সত্য অতুল অভয়ে॥
নিত্যানন্দ মকরন্দ পদদ্বন্দ্ব আশ।
আদর আরতি কহে চূড়ামণি দাস॥

.        *************************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর