শশিভূষণ বিদ্যালঙ্গার, তাঁর ১৯৩৮ সালে সম্পাদিত ও প্রকাশিত “জীবনীকোষ”, ৩য় খণ্ড, ৫৭৬-পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “তিনি একজন পদকর্ত্তা। তাঁহার রচিত ৯টী পদ পাওয়া গিয়াছে।” কিন্তু উপরোক্ত একটিই মাত্র পদ আমরা পেয়েছি উনিশ শতকে প্রকাশিত, নিমানন্দ দাস সংকলিত “পদরসসার” পুথিতে এবং ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত, নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রর “শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৩য় খণ্ডে। আমাদের কাছে সংগৃহীত ৪৭টি পদাবলী সংকলন সহ অন্যান্য বৈষ্ণব সাহিত্য-গ্রন্থে তাঁর আর অন্য কোনও পদ আমরা পাই নি।
সম্প্রতি আমাদের হাতে এসেছে সুকুমার সেন সম্পাদিত চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গ-বিজয় চৈতন্য-জীবনী গ্রন্থটি।
চূড়ামণিদাসের পাতা, প্রথম মিলনসাগরে প্রকাশিত হয় ১৮.৯.২০১৯ তারিখে, কেবল মাত্র বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু সংকলনের একটি মাত্র "নাচত মোহন নন্দ-দুলাল মেরো কান" পদটি দিয়ে। অধ্যাপক ও কবি ডঃ দিলীপ কুমার বসুর অনুরোধে আমরা সুকুমার সেন সম্পাদিত চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গ- বিজয় থেকে ২২টি পদ সংযোজন করলাম ৫ই জুন ২০২১ তারিখে। তাঁর এই সুবিবেচিত পরামর্শের জন্য আমরা তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইলাম এবং বৈষ্ণব পদাবলীর পাঠক যে ভীষণভাবে উপকৃত হবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মিলনসাগরে কবি দিলীপ কুমার বসুর সম্পূর্ণ কাব্যোপন্যাস কঙ্কনমালা সহ অন্যান্য কবিতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . .।
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক, শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . . “. . . বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই।”
আমরা মিলনসাগরে কবি চূড়ামণি দাসের বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
কবি চূড়ামণি দাস সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৩১ সালে প্রকাশিত, সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকায় পদকর্তা চূড়ামণি দাস সম্বন্ধে ১১৫-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“চূড়ামণি দাসের শুধু একটী পদ (১১৪২ সংখ্যক) পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হইয়াছে। পদটী শ্রীকৃষ্ণের কৌমার- কালোচিত নৃত্যের বর্ণন। এই পদ হইতে পদ-কর্ত্তার সম্বন্ধে কোন তথ্যই জানা যাইতে পারে নাই। পদটী ব্রজবুলী ভাষায় রচিত ও পদ-কর্ত্তার রচনা-পরিপাট্যের পরিচায়ক। তিনি অবশ্যই আরও বহু পদ রচনা করিয়া থাকিবেন। পদকল্পতরুর মত প্রসিদ্ধ সংগ্রহ-গ্রন্থে স্থান না পাওয়ায়, সেগুলি বোধ হয় এত দিনে বিলুপ্ত বা বিলোপন্মুখ হইয়াছে। প্রাচীন পদাবলী-সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী আমাদিগের উত্সাহী যুবক সাহিত্যসেবীদিগকে আমরা পদ-কর্ত্তা চূড়ামণি দাসের জীবন-বৃত্ত সহ তাঁহার বিলুপ্তপ্রায় পদাবলী সংগ্রহের কার্য্যে মনোনিবেশ করার জন্য সাদরে অনুরোধ করি।”
চূড়ামণি দাস সম্বন্ধে প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . প্রিয়নাথ জানা তাঁর ১৯৫৫ সালে সম্পাদিত ও প্রকাশিত “বঙ্গীয় জীবনীকোষ”, ১ম খণ্ড, ১৮২-পৃষ্ঠায়, চূড়ামণিদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“চৈতন্য চরিতের উপর রচিত চূড়ামণি দাসের একটিমাত্র পুঁথি পাওয়া গিয়াছে। তারও আবার আদ্যান্ত খণ্ডিত। ভণিতায় কাব্যের কোন নাম নেই। কেবল একবার মাত্র আছে “ভূবনমঙ্গল”,
এই থেকে ডঃ সুকুমার সেন কাব্যটির নাম ভূবনমঙ্গল বলে অভিহিত করেছেন। ভণিতা থেকে কবির এইটুকু পরিচয় পাওয়া যায় যে তিনি নিত্যানন্দের অনুচর ধনঞ্জয় পণ্ডিতের শিষ্য ছিলেন। কাব্যটি ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে রচিত। নিত্যানন্দের স্বপ্নাদেশ পেয়েই চূড়ামণিদাস কাব্যরচনায় প্রবৃত্ত হন। পুঁথিতে শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ এবং মাধবেন্দ্র পুরীর সম্বন্ধে কিছু নূতন তথ্য পাওয়া যায়। কারুর কারুর মতে এঁর রচিত কাব্যের নাম ‘গৌরাঙ্গবিজয়’।”
চূড়ামণি দাস সম্বন্ধে সুখময় মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . সুখময় মুখোপাধ্যায় তাঁর ১৯৫৮ সালে রচিত “প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের কালক্রম” গ্রন্থের ১৮৪-পৃষ্ঠায় এক চূড়ামণি দাসের সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি লিখেছেন যে এই চূড়ামণিদাস, ষোড়শ শতকের একেবারে শেষ দিকে, একটি চৈতন্যচরিত গ্রন্থ লিখেছিলেন যার পুথিটি রক্ষিত ছিল এশিয়াটিক সোসাইটিতে। সুকুমার সেন তাঁর “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস” ১ম খণ্ড, ২য় সংস্করণে এই গ্রন্থটির প্রকৃত নাম জানান “গৌরাঙ্গবিজয়”। ইনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পার্ষদ ধনঞ্জয় পণ্ডিতের শিষ্য ছিলেন। তিনি গুরু ধনঞ্জয় পণ্ডিত ও প্রভু নিত্যানন্দের কাছে তাঁর গ্রন্থের উপকরণ পেয়েছিলেন বলে তাঁর নিজের উক্তিতে জানিয়েছেন। “চূড়ামণিদাস” ভণিতার উপরোক্ত পদটি এই কবির রচনা হতেই পারে।
সুখময় মুখোপাধ্যায়, চূড়ামণিদাসের বৌদ্ধ হওয়া ও লেখায় অলৌকিকতা নিয়ে “প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের কালক্রম” গ্রন্থের ১৮৪-১৮৫-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“চূড়ামণিদাস লিখেছেন যে (চৈতন্যচরিত গ্রন্থে) মহাপ্রভুর জন্মের খবর শুনে বৌদ্ধরাও আনন্দিত হয়েছিলেন। এর থেকে নগেন্দ্রনাথ বসু অনুমান করেন যে চৈতন্যভক্ত হলেও চূড়ামণিদাস প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ ছিলেন। চূড়ামণিদাসের গুরু ছিলেন চৈতন্যদেবের পার্ষদ ধনঞ্জয় পণ্ডিত। একথা তাঁর নিজের উক্তি থেকেই জানা যায়। ধনঞ্জয় পণ্ডিত ও নিত্যানন্দের কাছে তাঁর গ্রন্থের উপকরণ পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।
চূড়ামণিদাসের গ্রন্থ অলৌকিক ঘটনায় পরিপূর্ণ। চূড়ামণিদাসের মতে বাল্যকাল থেকেই চৈতন্যদেবের অলৌকিক মহিমা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেই সময়েই নিত্যানন্দ নিত্যানন্দ নবদ্বীপে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যান। তারপর, মাধবেন্দ্র পুরী চর্মচক্ষে কৃষ্ণকে দর্শন করেছিলেন ও তাঁরই অনুরোধে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই জাতীয় অনৈসর্গিক ঘটনার বহু দৃষ্টান্ত চূড়ামণিদাসের গ্রন্থে পাওয়া যায়। চূড়ামণিদাস বহুক্ষেত্র সুষ্পষ্ট ভুল খবরো দিয়েছেন। যেমন “চূড়ামণিদাস বলেন যে, চৈতন্যের জন্মনক্ষত্র রোহিণী ও জন্মরাশি বৃষ এই কারণে গণকরাশি অনুসারে ইহার নাম বিশ্বম্ভর রাখিয়াছিল। কিন্তু একথা সম্পূর্ণই ভ্রান্তিমূলক, চৈতন্য রোহিণী নক্ষত্রে জন্মগ্রহণ করেন নাই, তাহা হইলে সেই দিন কখনই চন্দ্রগ্রহণ হইতে পারিত না।” (বিশ্বকোষ, ৬ষ্ঠভাগ, পৃঃ ৪১১) এই সব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, চূড়ামণিদাস বিশুদ্ধ ভক্তের দৃষ্টি নিয়ে চৈতন্য-চরিত বর্ণনা করে গেছেন, ইতিহাসবোধ তাঁর একেবারেই ছিল না । সুতরাং চূড়ামণিদাসের যেসব কথার পিছনে অন্য কোন সূত্রের সমর্থন নেই, তাদের তথ্য বলে গ্রহণ করা নিরাপদ হবে না।
চূড়ামণি দাসের গ্রন্থে অলৌকিক অলৌকিক বর্ণনার আতিশয্য থেকে মনে হয়, চৈতন্যদেবের মৃত্যুর অনেক দিন পরে, যখন চৈতন্যদেব ভক্তের কাছে মানুষ বলে গণ্য না হয়ে দেবতা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছিলেন, সেই সময়ে চূড়ামণিদাস এই বই লিখেছিলেন। সুতরাং ষোড়শ শতাব্দীর একেবারে শেষ দিকে এই বই লেখা হয়েছিল বলে মনে হয়। ধন়্জয় পণ্ডিতের শিষ্য ও নিত্যানন্দের সঙ্গলাভকারীর পক্ষে ততদিন বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ সম্ভব।”
কবি চূড়ামণি দাস - এর একটি মাত্র ব্রজভাষায় লেখা পদ “নাচত মোহন নন্দ- দুলাল মেরো কান”, রয়েছে বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে। সুতরাং তিনি নিশ্চিতভাবে বৈষ্ণবদাস পূর্ববর্তী কবি, এ কথা বলা যায়।
চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গবিজয় নিয়ে সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . কলকাতার এশিয়াটিক সোটাইটি থেকে অগাস্ট ১৯৫৭ এ প্রকাশিত, সুকুমার সেন সম্পাদিত, চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গবিজয় গ্রন্থের Introduction থেকে আমরা সুকুমার সেনের লেখা কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি। নীচে দেওয়া [ ] এই বন্ধনীর অংশ, আমদের সংযোজন . . .
The Middle Bengali poem printed here for the first time is based on a single manuscript copy that has been lying in the library of the Asiatic Society for about a hundred years. It is an almost unknown biography of Caitanya and was written not long after the demise of the Great Master. Unfortunately the Ms. is mutilated at both ends, and no other copy of the work is known to exist. . . .
. . . The name of the author is Cudamanidisa. He was, as he has often mentioned, that his guru was Dhananjaya, Pandita. Dhananjaya was among the twelve select followers of Nityananda, who were know as the “Twelve Gopalas (‘Dvadasa Gopala’) as they were believed to have been representatives of the twelve playmates of Krsna and Balarama in Vrndavana. Dhananjaya was noted for his devotion and spirit of detachment. The author received the material for the biography not only from his guru but also from other followers of Nityananda, such as Gadadharadasa and Ramadasa. Cudamani has mentioned more than once that he had collected particular informations when Nityananda was speaking to Dhananjaya and Gadadharadasa.
kahichen Nityananda ei saba parabandha Gadadhara-Dhananjaya sane । Gaura-Madhavendra meli prema-ananda keli Cudamanidasa racane ॥ (p. 40)
. . . The author was induced to take up the work on an auspicious dream command from Nityananda. So he says repeatedly.
susvapna-gocara Nityanandera ajnaye (p. 47) [ সুস্বপ্ন-গোচর নিত্যানন্দের আজ্ঞায়ে। ] ‘At a command from Nityananda: received in a happy dream’.
Kahila susvapna prabhu Nityananda-rae (p. 48) [ কহিল সুস্বপ্ন প্রভু নিত্যানন্দ রায়ে। ] ‘Lord Nityananda the Master spoke in a happy dream.’
susvapna kahiyache Nityananda-rae । Cudamanidasa kahe ei bharosae ॥ (p. 52) [ সুস্বপ্ন কহিয়াছে নিত্যানন্দ রাএ। চূড়ামণি দাস কহে এই ভরোসাএ ]
‘Lord Nityananda spoke in a happy dream. Banking on this Cudamanidasa has undertaken this narration.’ . . .
. . . About himself Cudamanidasa had something to say at the end of the first Khanda but only the following is now available : ‘abalak Kala haite svabhava Amara । alasa adaksa ajna akrtira sara ॥ esaba durgati dekhi thakur dhananjaya । Karila krpa more dekhi durasaya ॥ kona karme dharme tora nahi anurodha । krsne vaisnava tora haiba satya-bodha ॥ ei ta bharosae buli bhiksa kari sara । thakur ramai krpa karila apara ॥ tore bada krpa kari vaisnava dhananjaya । [ আবালক কাল হৈতে স্বভাব আমার। অলস অদক্ষ অজ্ঞ ইকৃতির সার॥ এসব দুর্গতি দেখি ঠাকুর ধনঞ্জয়। করিল ত কৃপা মোরে দেখি দুরাশয়॥ কোন কর্ম্মধর্ম্মে তোর নাহি অনুরোধ। কৃষ্ণ-বৈষ্ণবে তোর হয়িব সত্যবোধ॥ এই ত ভরোসাএ বুলি ভিক্ষা করি সার। ঠাকুর রামাই কৃপা করিল অপার॥ তোরে বড় কৃপা করি বৈষ্ণব ধনঞ্জয়। (শেষ পৃষ্ঠা-১০৯) ] ‘From my boyhood days I am lazy, incompetent, ignorant and utterly worthless, Noticing these my shortcomings and finding me a good for nothing fellow the spiritual master Dhanafijaya was moved by pity. (He told me:) ‘You have no inclination for any work, good or otherwise, but may you you have from faith in Krsna and in Vaishnav devotees.’ On this assurance I have become a wanderer depending on alms. The spiritual master Rimai was very kind to me, (and he said,) ‘Dhanafijaya, the Vaishnav devotee, has shown you much kindness.’ . . .
. . . Cudamanidasa’s Gauranga-vijaya contains much additional information, regarding Madhavendra Puri and the early life of Caitanya and Nityananda. All these may not be necessarily true. But as they come from the pen of a neat contemporary writer they are worthy of note. The author must have learnt the account of the home life of young Nityananda from his guru (and partly also from Nityananda when talking to his guru). We do not know how far the account of Nityananda’s first meeting Caitanya is true but for all that it is very interesting. . . .
. . . Cudamanidasa was not a learned man like Krsnadasa Kaviraja. Nor was he an inspired writer like Vrndavanadasa. He was a devoted Vaishnav and his appeal was directed entirely to the masses. Like Jayananda he did digress into puranic stories and he took greater interest in the home life of the two masters, Caitanya and Nityananda. Cudamanidasa has preserved for us descriptions of certain domestic ceremonies not noted in any other Middle Bengali work. We are also indebted to him for the following meagre but interesting description of the home of Caitanya :
daksina ta purvadvari sundara srighare | purvadvara abhyantare suramya catvare॥ [ দক্ষিণে ত পূর্ব্বদ্বারী সুন্দর শ্রীঘরে। পূর্ব্বদ্বার অভ্যন্তরে সুরম্য চত্বরে॥ (পৃষ্ঠা-৪৪) ] ‘The fine house had a gate on the south and another on the east. Beyond the eastern gate there was a nice courtyard.’
চূড়ামণি দাসের কোথাও নাম করে বা নাম না করে উল্লেখ আছে কি?পাতার উপরে . . . আনুমানিক ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে, চূড়ামণিদাস বিরচিত এবং সুকুমার সেন দ্বারা ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত, “গৌরাঙ্গ-বিজয়” অথবা “ভূবনমঙ্গল” গ্রন্থের ১ম খণ্ডটি প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে চূড়ামণি দাসের নাম সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞাত ছিল। চূড়ামণিদাসের নাম অন্য কোনও গ্রন্থেও পাওয়া যায় না, কেবলমাত্র বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদতল্পতরুর ১১৪২-পদসংখ্যার ভণিতা ব্যতীত। চূড়ামণি দাস নামের কোনও কবি বা গ্রন্থকারের বা কোনো চরিত্রের নাম কোনো শাখাবর্ণনাতেও পাওয়া যায় না।
সাধারণভাবে দেখলে, তাঁর নাম এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ও প্রকাশিত কোনও পুথিতে ও গ্রন্থে পাওয়া যায় নি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? চৈতন্য-জীবনীকার জয়ানন্দের অ-সংশয়াতীত লেখনীতে, নাম উচ্চারিত না থাকলেও, চূড়ামণিদাসে অস্তিত্ব আমরা পাই। ঠিক যেমন আমরা পাই অপর এক কবি, সম্ভবত সর্বপ্রথম চৈতন্য- জীবনীকার গোবিন্দ কর্মকারের অস্তিত্বও।
“জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”-এর আদি খণ্ডে জয়নন্দ তাঁর পূর্বতন কবিদের এইভাবে উল্লেখ করেছেন . . . সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য ব্যাস অবতার। চৈতন্য চরিত্র আগে করিল প্রচার॥ চৈতন্য সহস্র নাম শ্লোক প্রবন্ধে। সার্ব্বভৌম রচিল কেবল প্রেমানন্দে॥ পরমানন্দ পুরী গোসাঞি মহাশয়। সংক্ষেপে করিলেন তিহোঁ গোবিন্দবিজয়@॥ আদিখণ্ড মধ্যখণ্ড শেষখণ্ড করি। বৃন্দাবনদাস প্রচারিল সর্ব্বোপরি॥ গৌরীদাস পণ্ডিতের কবিত্ব সুশ্রেণী। সঙ্গীত প্রবন্ধে তার পদে পদে ধ্বনি॥ সংক্ষেপে করিলে অতি পরমানন্দ গুপ্ত। গৌরাঙ্গবিজয় গীত শুনিতে অদ্ভুত॥ গোপাল বসু করিলেন গীতত প্রবন্ধে। চৈতন্যমঙ্গল তারা চামর বিছন্দে॥ ইবে শব্দ চামর সঙ্গীত বাদ্যরসে। জয়ানন্দ চৈতন্যমঙ্গল গাএ শেষে॥ আর যত যত কবি জন্মিল আপারে। চৈতন্যমঙ্গল তারা করিল প্রচারে॥” ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, আদি খণ্ড, ৪- পৃষ্ঠা॥ @ - নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত গ্রন্থে “গোবিন্দবিজয়” রয়েছে।
জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে উল্লিখিত চৈতন্য-জীবনীকারদের আমরা এক এক করে দেখবো . . .
বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর সম্পাদিত জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থের উপরে দেওয়া Introduction-এর, অংশে মূলত লিখেছেন যে জয়ানন্দ মুরারি গুপ্ত আর কবিকর্ণপূরের (পরমানন্দ সেন) উল্লেখ করেন নি, সম্ভবত তিনি তা পড়েন নি বলে। বিমানবিহারী মহাশয়ের মতে এই দুটি সংস্কৃত গ্রন্থ অবশ্যই আগে লেখা হয়েছিল, কিন্তু জয়ানন্দ তা পড়ে দেখার অবকাশ পান নি কারণ তিনি ছিলেন একজন চারণ কবি জিনি শ্রীচৈতন্যের জীবনী গেয়ে বেড়াতেন।
চৈতন্য-জীবনীকারদের মধ্যে জয়ানন্দ সর্ব প্রথম নাম করেছেন সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যের লেখা চৈতন্য সহস্র নামের সংস্কৃত শ্লোক বিশিষ্ট গ্রন্থের। সুকুমার সেন তাঁর সম্পাদিত চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গ-বিজয় গ্রন্থে এনাকে নিয়ে কোনও টীকা-টিপ্পনী লেখেন নি। সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যের সহস্রশ্লোক না হলেও “সার্ব্বভৌমশতক” নামের শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে নিয়ে একশত শ্লোক-বিশিষ্ট গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতের (অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত) অন্ত্য খণ্ডের ৩য় অধ্যায়ের ৪০৭-পৃষ্ঠায়। চৈতন্যভাগবতের উক্ত অংশে এই নামকরণটি শ্রীচৈতন্যই করছেন, সার্ব্বভৌমকে নিজের ষড়ভূজ নারায়ণ মূর্ত্তি প্রদর্শন করার পরে। এখানে শ্রীচৈতন্য বলছেন . . . যতেক করিলা তুমি --- সব সত্য কথা। তোমার মুখেতে কেন আসিবে অন্যথা॥ শত শ্লোক করি তুমি যে কৈলে স্তবন। যে জন করয়ে ইহা শ্রবণ পঠন॥ আমাতে তাহার ভক্তি হইবে নিশ্চয়। ‘সার্ব্বভৌমশতক’ বলি লোকে যেন কয়॥
এরপরে জয়ানন্দ উল্লেখ করেছেন “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” মহাশয়ের সংক্ষেপে “গৌরাঙ্গবিজয়” নামক গ্রন্থের নাম। নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত “জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল” গ্রন্থে এই গ্রন্থের নামটি “গোবিন্দবিজয়” দেওয়া রয়েছে। “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” নামটি নিয়ে সরাসরি কিছু না লিখলেও বিমানবিহারী মহাশয় যে এই নামটিকে কবিকর্ণপূরের “পরমানন্দ সেন” নামের ভুল করে লেখা নাম বলে মনে করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন কী ভাবে জয়ানন্দ আসলে কবিকর্ণপূরের লেখা পড়েন নি। তাঁর মতে জয়ানন্দ কেবল বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত পড়েছিলেন। জয়ানন্দের দেওয়া শ্রীচৈতন্যের পূরীতে বাস, বৃন্দাবনদাসের দেওয়া ২৮ বছরের সাথে মিলছে কিন্তু কবিকর্ণপূরের (পরমানন্দ সেন) ২০ বছরের পুরী-বাস এবং তিন বছরের ভারত-ভ্রমণের সঙ্গে মিলছে না। সুতরাং উল্লিখিত “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” পরমানন্দ সেন বা পরমানন্দ দাস ভণিতার কবি বা কবিকর্ণপূরের শ্রীচৈতন্যের দেওয়া অপর নাম “পুরী দাস” নয়। অন্যদিকে সুকুমার সেন তাঁর সম্পাদিত চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গবিজয়-এর Introduction-এ খুব জোর দিয়ে বলেছেন যে পরমানন্দ পুরী তাঁর মতে নিশ্চিতভাবে পরমানন্দ সেন বা পরমানন্দ দাসের নাম ভুল করে লেখা ।
আমরা “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি”, এই নামের নীলাচলে শ্রীচৈতন্যের প্রিয় পরমানন্দ গোসাঞির উল্লেখ পাচ্ছি বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতের অন্ত্য খণ্ডের ৩য় অধ্যায়ের ৪১০-৪১১ পৃষ্ঠায় (অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত)। সেখানে চৈতন্য ও পরমানন্দপুরীকে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে . . . একদিন প্রভু পুরীগোসাঞির মঠে। বসিলেন গিয়া তান পরম-নিকটে॥ পরমানন্দপুরীরে প্রভুর বড় প্রীত। পূর্ব্বে যেন শ্রীকৃষ্ণ-অর্জ্জুন দুই মিত॥ পরমানন্দ পূরী গোসাঞির মঠের একটি কূপের বিষাক্ত জল কে শ্রীচৈতন্য, জগন্নাথের কাছে প্রার্থনা করে গঙ্গার প্রবেশ ঘটিয়ে নির্মল জলে পরিপূর্ণ করিয়েছিলেন। পরে . . . পুরীগোসাঞির প্রীতে সেই দিব্য জলে। স্নান-পান করে প্রভু মহাকুতূহলে॥ প্রভু বোলে আমি যে আছি পৃথিবীতে। জানিহ কেবল পুরীগোসাঞির প্রীতে॥
কিন্তু এই পরমানন্দ পুরী কোনও “গৌরাঙ্গবিজয়” নামক চরিত-গ্রন্থ লিখেছিলেন, এমন কোথাও লেখা পাওয়া যায় না। আমাদের মনে হচ্ছে যে “গৌরাঙ্গবিজয়” গ্রন্থটির নাম ঠিক মত জেনে থাকলেও তার রচয়িতার নাম লিখতে ভুল করেছিলেন জয়ানন্দ।
এর পরে জয়ানন্দের উল্লেখ করা কবির নাম “বৃন্দাবনদাস”। সেখানে কোনও দ্বিমত দেখা যাচ্ছে না। তাই ধরে নেওয়া ভুল হবে না যে বৃন্দাবনদাসের পরেই জয়ানন্দ তাঁর চৈতন্যমঙ্গল রচনা করেছিলেন।
এরপরে রয়েছে গৌরীদাস পণ্ডিতের নাম। তাঁর কোনো রচনার নামের উল্লেখ করা হয়নি। গৌরীদাস পণ্ডিতের রচিত কোনো চৈতন্য-চরিত গ্রন্থের খবর আমরা পাই না। কিন্তু আমরা দুইজন গৌরীদাসের নাম জানতে পারি। প্রথমজন গৌরীদাস পণ্ডিত, যিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্য এবং নিত্যানন্দের খুব নিকট ভক্ত। তাঁর ভ্রাতা সূর্য্যদাস পণ্ডিতের দুই কন্যা বসুধা ও জাহ্নবা দেবীর সঙ্গে নিত্যানন্দের বিবাহ হয়েছিল। দ্বিতীয়জন ছিলেন গৌরীদাস কীর্ত্তনিয়া। “গৌরীদাস” ভণিতার যে দুটি পদ শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে রয়েছে (১৬১ ও ২৩১৩ সংখ্যক পদ), সে দুটি অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি এবং সতীশচন্দ্র রায়ের মতে গৌরীদাস কীর্তনিয়ার রচিত পদ। তার মধ্যে “পহু মোর নিত্যানন্দ রায়” পদটি শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে “গৌরীদাস” ভণিতায় থাকলেও এই পদটিই দীর্ঘ “আরে মোর আরে মোর নিত্যানন্দ রায়” রূপে, রয়েছে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বা হরিবল্লভ দাসের সংকলিত শ্রীশ্রীক্ষণদাগীত-চিন্তামণি গ্রন্থে “বলরামদাস”-এর ভণিতায়। জয়ানন্দ সম্ভবত গৌরীদাসের রচিত পদাবলী পড়েছিলেন বা শুনেছিলেন এবং সে কথাই লিখে গিয়েছেন কোনও চরিত-গ্রন্থের নাম না করে। এখানে আমরা শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন মহাশয়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করছি যে গৌরীদাস পণ্ডিতের লেখা কোনও চৈতন্য- জীবনী রচনা যদি থাকতো তাহলে তা কোনোমতেই হারিয়ে যেতে পারতো না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পদগুলি গৌরীদাস কীর্ত্তনিয়ার রচনা বলে আজ মাত্র ২ অথবা ১টি পদই অবশিষ্ট রয়েছে।
কোন কোন পুথিতে “পরমানন্দ পুরী গোসাঞি” রচিত গ্রন্থের নাম “গৌরাঙ্গবিজয়” এর যায়গায় “গোবিন্দবিজয়” দেওয়া রয়েছে। তা হলেও পুনরায় কবি “পরমানন্দ গুপ্তের” রচনাতেও গ্রন্থের নাম “গৌরাঙ্গবিজয়” দেওয়া রয়েছে দ্বিতীয়বারের জন্য। এটাই প্রমাণ করে যে জয়ানন্দ অবশ্যই গৌরাঙ্গবিজয় নামক কোনও গ্রন্থ, হয় পড়েছিলেন বা নিশ্চিতভাবে সেই গ্রন্থের নাম শুনেছিলেন। রচয়িতার নামটি তিনি সঠিকভাবে লেখেন নি, সম্ভবত সেখানে ধোঁয়াশা ছিল বলে। সুকুমার সেন প্রায় নিশ্চিতভাবে দাবী করেছেন যে পরমানন্দ পুরী নামটি আসলে হবে পরমানন্দ সেন বা পুরীদাস এবং গ্রন্থের নামটি “গৌরাঙ্গবিজয়” না হয়ে হবে চৈতন্যচরিত কাব্য অথবা “গৌরগণোদ্দেশদীপিকা”।
জয়ানন্দ, শেষ রচনাকারের নাম “গোপাল বসু” দিয়েছেন। এঁর কোন রচনাই আজ আমাদের হাতে নেই। এনার পরিচয়ও আমাদের জানা নেই।
আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে সুকুমার সেন মহাশয়ের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে মনে করছি যে জয়ানন্দের উল্লিখিত পয়ারে উদ্ধৃত প্রথম “গৌরাঙ্গবিজয়” গ্রন্থটি, যার নাম নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের সম্পাদিত জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে “গোবিন্দবিজয়”, তার রচয়িতার নাম গোবিন্দ কর্মকার হবার সম্ভাবনা প্রবল। এই গোবিন্দ কর্মকার “গোবিন্দদাসের করচা” নামের একটি চৈতন্যজীবনী লিখেছিলেন শ্রীচৈতন্যের জীবদ্দশাতেই। আমাদের মতে জয়ানন্দের উল্লিখিত প্রথম গ্রন্থটি “গোবিন্দদাসের করচা” যা ভুল করে “গোবিন্দবিজয়” লেখা হয়ে থাকতে পারে। এই গোবিন্দদাস বা গোবিন্দ কর্মকার শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে সন্ন্যাস গ্রহণের সময়ে থেকে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে ছিলেন। তিনি স্ত্রীর ভর্ত্সনার চোটে গৃহত্যাগ করে শ্রীচৈতন্যের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর করচা গ্রন্থটি লুকিয়ে রাখতেন বলে নিজেই লিখে গিয়েছেন . . . না পারি লোকের বুলি সমস্ত বুঝিতে। যাহা পারি তাহা লিখি আকার ইঙ্গিতে॥ এই দেশে তীর্থ পর্য্যটিয়া দীর্ঘকাল। সকলেক বুলি বুঝে শচীর দুলাল॥ দুই চারি বাত কভু প্রভুরে পুছিয়া। করচা করিয়া রাখি মনে বিরচিয়া॥ যেই লীলা দেখিলাম আপন নয়নে। করচা করিয়া রাখি অতি সঙ্গোপনে॥--- ১৯২৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন ও প্রভুপাদ বনোয়ারীলাল গোস্বামী দ্বারা সম্পাদিত, “গোবিন্দ দাসের করচা” গ্রন্থের ৬২-পৃষ্ঠা॥
উপরোক্ত গ্রন্থটির সম্পাদকদের মতে গোবিন্দদাস তাঁর করচাটি লুকিয়ে রাখতেন যাতে তা তাঁর স্ত্রীর হাতে না পড়ে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সব কটি লাইন পড়লে কারণটি অন্য বলে প্রতীত হচ্ছে। তবে মোদ্দা কথা হলো এই যে গ্রন্থটি তিনি লুকিয়ে রাখতেন। তাই সম্ভবত গোবিন্দদাসের করচার কথা জানতে বা শুনতে পেলেও এর পুথিটি দেখার গৌভাগ্য খুব অল্পজনেরই হয়েছিল।
জয়ানন্দ, সংস্কৃতে রচিত মুরারি গুপ্তের করচা, কবিকর্ণপূরের শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটক, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত মহাকাব্য ও গৌরগণোদ্দেশদীপিকার উল্লেখ করেন নি। সম্ভবত তিনি সেই সব গ্রন্থ তাঁর চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থ রচনাকালে হাতে পান নি। তিনি গোবিন্দদাসের করচার সরাসরি উল্লেখ না করলেও, গোবিন্দ কর্মকারের উল্লেখ করেছেন বৈরাগ্য খণ্ডের ২৪শ অধ্যায়ে, যিনি শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে কাটোয়ায় গিয়েছিলেন তাঁর সন্ন্যাস- গ্রহণের সময়ে। . . . মুকুন্দ দত্ত বৈদ্য গোবিন্দ কর্ম্মকার। মোর সঙ্গে আস্য কাঁটোয়া গঙ্গাপার॥ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষতের ২২৪১ নং পুথিতে (বৈরাগ্যখণ্ড) “গোবিন্দ”-এর বদলে “মুকুন্দ” রয়েছে। এর থেকেই আমরা মনে করছি যে জয়ানন্দ গোবিন্দদাসের রচনার খবর পেয়ে থাকবেন, যা কিনা বাংলা ভাষায় লেখা সর্বপ্রথম শ্রীচৈতন্যের সন্ন্যাস পরবর্তী জীবন-চরিত।
জয়ানন্দের উক্ত পয়ারে ২য় “গৌরাঙ্গবিজয়” গ্রন্থের রচয়িতা, আমাদের বিবেচনা ও অনুমানে আর কেউ নন, স্বয়ং চূড়ামণি দাস। পরমানন্দ গুপ্ত নামের কোনও কবি বা গ্রন্থকারের নাম আমরা পাই নি। এমন কি এই নামের কোনও চরিত্র বা কোনও উল্লেখ পাইনি কোনও শাখাবর্ণনাতেও। চূড়ামণিদাসের নামও কোনও গ্রন্থে পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের সমসাময়িক, প্রভু নিত্যানন্দের শিষ্য, দ্বাদস গোপালের অন্যতম ধনঞ্জয় পণ্ডিতের শিষ্য, ব্রজলীলায় যাঁর নাম ছিল “বসুদাম”। সুতরাং চূড়ামণিদাস ছিলেন শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের সমসাময়িক। চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গ-বিজয় গ্রন্থের কেবল ১ম খণ্ডটি খণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। ২য় ও তয় খণ্ড আদৌ তিনি শেষ করে যেতে পেরেছিলেন কি না তা আমাদের জানা নেই। যদি তা করেও থাকেন, তাহলে কেন এভাবে অবলুপ্তির পথে ঠেলে দেওয়া হলো, তা নির্ভর করছে সেখানে তিনি কি লিখেছিলেন! যা লিখেছিলেন তা যদি বৃন্দাবনের অনুমোদন প্রাপ্ত না হয়ে থাকে তবে সেটাই সম্ভবত মূখ্য কারণ হবে গ্রন্থটির, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের মতো অন্তরালে ঠেলে অবলুপ্তির দিকে পাঠিয়ে দেওয়ার।