অষ্টাদশ শতকে প্রকাশিত, গৌরসুন্দর দাসের “কীর্ত্তনানন্দ” সংকলনে গোপীকান্তের একটি পদ রয়েছে “শ্রীবিদ্যাপতি কবিবর শেখর কয়লহি বহুবিধ গীত”, পূর্ব পদকর্ত্তৃগণের বন্দনার এই পদটিতে রয়েছে . . .
ঠাকুর পিতামহ সুবলানন্দ পহুঁ . কয়লহি কতহুঁ সুছন্দ।
এর থেকে জানা যায় যে এই পদের রচয়িতা গোপীকান্তের পিতামহের নাম ছিল সুবলানন্দ ঠাকুর। নরহরি চক্রবর্তীর “নরোত্তম বিলাস” গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে পদকর্তা গোপীকান্তের পিতার নাম হরিরাম।
"গোপী" ভণিতার একটি পদ বৈষ্ণবদাসের পদকল্পতরুতে রয়েছে। সেই পদটি গোপীকান্তর পদ হতে পারে।
নরহরি চক্রবর্তীর নরোত্তম বিলাসে হরিরাম ও গোপীকান্ত পিতা-পুত্র - পাতার উপরে . . . ১৯১৩ খৃষ্টাব্দে কিশোরী দাস বাবাজী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত নরহরি চক্রবর্তী দ্বারা আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে, বিরচিত “নরোত্তম বিলাস” গ্রন্থের পরিশিষ্ট, গ্রন্থকর্ত্তার পরিচয়, ১২২-পৃষ্ঠায় থেকে জানা যায় যে
১। গোপীকান্তের পিতার নাম হরিরাম আচার্য্য বা হরিরাম দাস। ২। নরহরি চক্রবর্তীর দীক্ষাগুরু নৃসিংহ চক্রবর্ত্তী ছিলেন এই পাতার গোপীকান্ত ভণিতার কবি-পদকর্তার শাখাভুক্ত। অর্থাৎ নরহরি চক্রবর্তীও ছিলেন গোপীকান্তের শাখাভুক্ত . . .
শ্রীভট্টের প্রিয় শিষ্য শ্রীনিবাসাচার্য্য। সর্বত্র বিদিত যাঁর অলৌকিক কার্য্য॥ আচার্য্যের শিষ্য রামচন্দ্র কবিরাজ। যাঁর গুণগায় সুখে বৈষ্ণব সমাজ॥ যার ভেদবুদ্ধি নরেত্তম কবিরাজ। তাঁর সর্বনাশ প্রভু করেন অব্যাজ॥ শ্রীনিবাস নরোত্তম ভেদবুদ্ধি যার। সে পাপীর কোনকালে নাহিক নিস্তার॥ এবে কোন কোন পাপী ভেদবুদ্ধি করে। এ হেতু লিখিলুঁ এথা দুঃখিত অন্তরে॥ শ্রীকবিরাজের শিষ্য হরিরামাচার্য্য। যেঁহ রামকৃষ্ণ আচার্য্যের জ্যেষ্ঠ আর্য্য॥ শ্রীহরি রামের পুত্র শ্রীগোপী কান্ত। পিতার সেবক যেঁহ পরম সুকান্ত॥ শ্রীগোপীকান্তের শিষ্য রামভদ্র হন। রামভদ্র সকল শাস্ত্রেতে বিচক্ষন॥ শ্রীগোপীকান্তের পৌত্র শ্রীল মনোহর। শ্রীগোপীকান্তের শিষ্য সর্বাশে সুন্দর॥ শ্রীরামভদ্রের পুত্র শ্রীল রামনিধি। শ্রীমনোহরের শিষ্য গুণের অবধি॥ শ্রীমনোহরের পুত্র শ্রীনন্দকুমার। হইল পিতার শিষ্য অতি শুদ্ধাচার॥ শ্রীরামনিধির পুত্র শ্রীনৃসিংহ নাম। নন্দকুমারের শিষ্য চেষ্টা অনুপাম॥ মোর ইষ্টদেব শ্রীনৃসিংহ চক্রবর্ত্তী। জন্মে জন্মে সে চরণ সেবি এই আর্ত্তি॥
হরিরাম দাসের কারণাভাস মান-এর “অপরূপ গৌরাঙ্গের লীলা” ( ৫৮৬-পদসংখ্যা)পদটি রয়েছে পদকল্পতরুর ২য় শাখার ২২শ পল্লবে। সেই পল্লবেই একই বিষয়ের উপর রচিত পদকর্ত্তা গোপীকান্তের দুটি পদ সন্নিবেশ করা হয়েছে , “রাধা মাধব সহচরি সাথ” ( ৫৯৭-পদসংখ্যা) এবং “ঢূঁড়য়ে সবহু সখীগণ মেলি” (৫৯৮- পদসংখ্যা)। বৈষ্ণবদাস এই পিতা-পুত্র পদকর্তাদের দুজনকেই তাঁর বিশাল গ্রন্থে স্থান দিয়ে তাঁদের সম্মানিত করেছেন।
নৃসিংহচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বিদ্যারত্ন সম্পাদিত “সাহিত্য-সংহিতা” পত্রিকা-র ১৩০৯ বঙ্গাব্দের আষাঢ়-শ্রাবণ সংখ্যায় (জুলাই-আগস্ট ১৯০২খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের “অপ্রকাশিত প্রাচীন পদাবলী” প্রবন্ধে ২০৯-পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত, চট্টগ্রামের কোন পুঁথি থেকে পাওয়া, “আহ্মি কিরূপ হেরিলাম সই যমুনার জলে যাইতে” পদটির রচয়িতাও "গোপীকান্ত"। কিন্তু পদের ভাষা দেখে মনে হয় ইনি অন্য কোনও ব্যক্তি, সম্ভবত চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে।
গোপীকান্ত সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . জগবন্ধু ভদ্র তাঁর ১৯৩৪ সালে সংকলিত ও প্রকাশিত, মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”-র (প্রথম সংস্করণ ১৯০২, পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়তে তিনি গোপীকান্ত সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে তাঁর পিতার নাম হরিচরণ @ দাস লিখেছেন।
গৌরপদ-তরঙ্গিণীতে হরিচরণ দাস নামের পদকর্ত্তার কোনও পদ নেই। হরিরাম ও হরিরাম দাস ভণিতার তিনটি পদ রয়েছে। তার মধ্যে শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে প্রকাশিত হরিরাম দাসের “অপরূপ গৌরাঙ্গের লীলা” এবং “নিতাই করুণাময় অবতার” পদ দুটি রয়েছে। সুতরাং নিশ্চিতভাবে বলা চলে যে গৌরপদতরঙ্গিণীর ২য় সংস্করণে এটি একটি ভ্রম বা মুদ্রণ-প্রমাদ ছাড়া অন্য কিছু নয়। নিশ্চিতভাবে বলা চলে যে পদকর্তার নাম হরিরাম দাস।
হরিচরণ (হরিরাম) সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্র লিখেছেন . . .
“এই নামে দুইজনের পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। (১) রামচন্দ্র কবিরাজের শিষ্য হরিচরণ @ আচার্য্যের পুত্র গোপীকান্ত। ইনি পিতার নিকট মন্ত্র গ্রহণ করেন এবং পিতার ন্যায় কবি ও পদকর্ত্তা ছিলেন। (২) মহাপ্রভুর উপশাখায় এক গোপীকান্তের নাম আছে। যথা চৈতন্যচরিতামৃত, আদি, দশমে--- শ্রীনিধি শ্রীগোপীকান্ত বিপ্র ভগবান্। গৌরপদতরঙ্গিণীতে গোপীকান্ত-ভণিতাযুক্ত দুইটী পদ উদ্ধৃত হইয়াছে। ইহার একটি পদে পদকর্ত্তা শ্রীনিবাস আচার্য্যের চরিত্র আস্বাদন করিয়াছেন। হরিচরণ আচার্য্যের পুত্রই ইহার রচয়িতা বলিয়া কাহারও কাহারও ধারণা।”
গোপীকান্ত সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকায় পদকর্তা গোপীকান্ত সম্বন্ধে ৫১-পৃষ্ঠায় প্রথমে জগবন্ধু ভদ্র মহাশয়কে উদ্ধৃত করেছেন, যা আমরা উপরে তুলে দিয়েছি। এর পর তিনি লিখেছেন . . .
“. . . যাহা হউক, গোপীকান্তের ২৩৮২ সংখ্যক পদে তিনি শ্রীনিবাস আচার্য্য প্রভুর চরিত্রাস্বাদন করিয়াছেন।
গোপীকান্তের এই বর্ণনা ও ভণিতার কলির প্রার্থনা অধিক পরবর্ত্তী সাধারণ একজন বৈষ্ণব পদকর্ত্তার বলিয়া মনে হয় না ; ইহা যেন শ্রীনিবাস আচার্য্যের সমসাময়িক কোন ভক্তের বর্ণনা ও প্রার্থনা। শ্রীনিবাস আচার্য্য ও রামচন্দ্র কবিরাজের মধ্যে গুরু-শিষ্য সম্বন্ধ থাকিলেও উভয়ের বয়সে অধিক পার্থক্য ছিল না। সুতরাং রামচন্দ্র কবিরাজ গোপীকান্তের পিতার গুরু হইলে, তিনি সম্ভবতঃ বাল্য-কালে শ্রীনিবাস আচার্য্যকে প্রাচীন অবস্থায় দেখিয়া থাকিবেন। বালকের হৃদয়ে আচার্য্য প্রভুর উজ্জ্বল গৌরবর্ণ প্রেমময় মূর্ত্তিটী একটা মোহ সৃষ্টি করিয়া দিয়াছিল ; তাই বুঝি তিনি পরবর্ত্তী সময়ে তাঁহার সেই ক্ষীণ স্মৃতিটাকে চির-কাল হৃদয়ে জাগরূক করিয়া রাখার জন্যই নিত্য-লীলা-প্রবিষ্ট আচার্য্য প্রভুর শ্রীচরণে ব্যাকুল-হৃদয়ে এই কাতর-প্রার্থনা জানাইয়াছেন । এই ভাবে দেখিলেই গোপীকান্তের এই পদটার প্রকৃত রসাস্বাদন করা যায়। সুতরাং আমরাও বিরুদ্ধ প্রমাণের অভাবে এই গোপীকান্তকে পদকর্ত্তা হরিরামের পুত্র বলিয়াই ধরিয়া লইয়াছি। হরিরাম দাসের দুইটি পদ পদকল্পতরুতে উদ্ধৃত হইয়াছে। ইহার মধ্যে তাঁহার ৫৮৬ সংখ্যক অপরূপ গৌরাঙ্গের লীলা ইত্যাদি পদটি প্রতিবিম্ব-দৃষ্টে শ্রীরাধার হেতু মানের গৌরচন্দ্র বটে। তাঁহার পুত্র গোপীকান্তের ৫৯৭ ও ৫৯৮ সংখ্যক পদ দুইটিও দিনান্তরের সেই নির্হেতু বিচিত্র মান ও উহার বিচিত্র অবসানের বর্ণনাত্মক। বোধ হয় পিতা ও পুত্র উভয়েই মানের পালা চরনা করিয়াছিলেন। বৈষ্ণবদাস উহা হইতে পদ উদ্ধৃত করিতে যাইয়া, পিতা ও পুত্র উভয়েরই সম্মান রক্ষা করিয়াছেন। উক্ত পদগুলি একই বিষয়ের এবং পদকল্পতরুতে একই স্থলে (২য় শাখার ২২শ পল্লবে) সন্নিবেশিত হইয়াছে ; ইহা হইতেও আমাদিগের পূর্বোক্ত অনুমান সমর্থিত হইতেছে। পদকল্পতরুর উদ্ধৃত পিতা ও পুত্রের এই পদগুলি পড়িলে পিতা অপেক্ষা পুত্রেরই অধিক কৃতিত্ব স্বীকার করিতে হয়। “পুত্রাদিচ্ছেৎ পরাজয়ং” এই সমীচীন নীতি অনুসারে এ জন্য পিতা হরিরামেরই ভাগ্যের প্রশংসা করিতে হইবে ; কেন না, “পুত্রে যশসি তোয়ে চ নরাণাং পুণ্যলক্ষণম্”।”