আর একদিন গৌরচন্দ্র ভগবান কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ২৬শ অধ্যায়, ৩৩-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ তত কথা দিশা॥
আর একদিন গৌরচন্দ্র ভগবান। শিশু সঙ্গে গুরু গৃহে করিল পয়াণ॥ শ্রীবাস ঠাকুর পণ্ডিত ঠাকুর চারি ভাই। বাসুদেব মুকুন্দ দত্ত লেখক জগাই॥ শ্রীগর্ভ পণ্ডিত মুরারি গোবিন্দ শ্রীধর। গঙ্গাদাস দামোদর শ্রীচন্দ্রশেখর॥ মুকুন্দ সঞ্জয় পুরুষোত্তম বিজয়। বক্রেশ্বর কাটা গঙ্গাদাস উদয়॥ সনাতন হৃদয় মদন রামানন্দ। ইহা সভা সনে নৃত্য করে গৌরচন্দ্র॥ কীর্ত্তন জীবন প্রভুর কীর্ত্তন সে ধ্যান। কীর্ত্তনলম্পট নট নাহি বাহ্যজ্ঞান॥ আপাদমৌলী পুলক কৃষ্ণশ্রুতি মাত্রে। অবিচ্ছিন্ন প্রেমধার বহে শ্রীনেত্রে॥ সিংহ গর্জ্জন করি মারে মালসাট। তুলিয়া আজানু বাহু উদ্ধত্ত নাট॥ কিরে কিরে অদ্বৈত ঘন ঘন ডাকে। ক্ষণে রাজপথে নিঃশব্দ হয়্যা থাকে॥ হাথের মোহন পূথি দূরে পেলাইয়া। বোল বোল ডাকেন গায় আছাড়িয়া॥ বড় ভাই বলাই ঠাকুর ওরে ভাই। তুমি কোথা আমি কোথা দেখিতে না পাই॥ শ্রীদাম সুদাম সুবল কুথা আছে। ব্রহ্মা আসে ব্রহ্মা আসে ইহা বলি নাচে॥ চৌদিগে নগরে লোক দেই করতালি। মাঝে নাচে বিশ্বম্ভর আজানু বাহু তুলি॥ ক্ষেণে বলে জিত জিত কিরে কিরে কিরে। মোর নাট কালীনাগে ফণার উপরে॥ ইহা বলি হাসেন গৌর শচীর নন্দন। অদ্বৈত গোসাঞি ভালি ভালি রে কীর্ত্তন॥ না দেখি না শুনি জত ইহা কেনে বল। কপট করিয়া আমা সভা কেন ছল॥ ক্ষীরোদ হইতে মুঞি আইলুঁ নদীয়া। মোর ঠাকুর নাচিব কীর্ত্তন বিনোদিয়া॥ প্রকাশিতে অদ্বৈত ঠারিল গৌরচন্দ্র। আমারে উদ্ধত বায়ু কথার প্রবন্ধ॥ আগে পাঠাইল বায়ু খেপা তিন জনে। তিন জনার নাট সবে হরি সংকীর্ত্তনে॥ অদ্বৈত শ্রীপাদ নিত্যানন্দ বিশ্বম্ভর। আগল পাগল খেপা তিন দ্বিজবর॥ ইহা শুনি সর্ব্বলোক করে কানাকানি। এমন কথা এমন নাট কোথায় না শুনি॥ কেহো বলে পৈতা হইল ভাল সুবুদ্ধি হইল। কেহো বলে হবিষ্যান্নে বায়ু জন্মিল॥ কেহো বলে পঢ়িতে পঢ়িতে বায়ু জন্মে। আর কেহো বলে যে ছিল তাহার কর্ম্মে॥ লাজ ভয় ছাড়ি কেহো বলে বলে উচ্চস্বরে। সচল জগন্নাথ নাচে নদীয়া নগরে॥ সংকীর্ত্তন প্রকাশিতে হৈল দ্বিজরাজ। জে খেপা বলে তার মুণ্ডে পড়ুক বাজ॥ কেহো কেহো বলে ধ্রুব প্রহ্লাদ নারদ। কেহো বলে নদীয়ার বাড়িল সম্পদ॥ সংকীর্ত্তনধূলি ধূসর বহে মন্দে। লোচন বয়ন অগোচর নানা ছান্দে॥ চৌদিগে আনন্দ বৃষ্টি হয় নবদ্বীপে। উজান ধরন গঙ্গা প্রভুর সমীপে॥ আশ্চর্য্য দেখিআ কার মনে চমত্কার। গঙ্গাজলে ঝাঁপ দিল শচীর কুমার॥ হাসিআ উঠিলা কূলে গলে দিব্যমালা। সন্ধ্যাকালে মন্দিরে চলিলা শচীর বালা॥ নদীয়াখণ্ডে গৌরাঙ্গ কীর্ত্তন প্রকাশিল। শুনিতে লোকের চিত্তে আশ্চর্য্য জন্মিল॥ চিন্তিয়া চৈতন্যচন্দ্রচরণকমল। জয়ানন্দানন্দে গাএ প্রভুর মঙ্গল॥
আর একদিন নবদ্বীপের ভিতরে কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ২১শ অধ্যায়, ২৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ কথা দিশা॥
আর একদিন নবদ্বীপের ভিতরে। শিশুগণ সঙ্গে গৌর খেলে ঘরে ঘরে॥ অনেক বালক সংখ্যা করিতে না পারি। কুকুরের ছা এক রড় দিয়া ধরি॥ আলিঙ্গন দিয়া তারে বলে দয়ানিধি। এতদিনে তুমারে প্রসন্ন হইল বিধি॥ গঙ্গাদাস বলি তার নাম থুইল। শিকলে বান্ধিআ তারে ঘৃতান্নে পুষিল॥ যথা গৌরাঙ্গ শিশু তথা গঙ্গাদাস। তার মুখে হরিনাম করিল প্রকাশ॥ হরি বল গঙ্গাদাস গৌরচন্দ্র ডাকে। হরি ধ্বনি শুনি কুকুর কোথাহ না থাকে॥ প্রভু বলে এ কুকুর আছিল ব্রাহ্মণ। বৈষ্ণবনিন্দক বড় বেদপরায়ণ॥ বৈষ্ণব মাগিল অন্ন না দিলেক তারে। বেদনিন্দ্য শূদ্রে অন্ন খাব মোর ঘরে॥ বৈষ্ণবে ভাণ্ডি সে দ্বিজে করিল আলাপ। সেই ক্রোধে বৈষ্ণব ব্রাহ্মণে দিল শাঁপ॥ প্রলাপে বৈষ্ণবে দ্বিজ উচ্ছিষ্টান্ন দিল। সেই শাপে নবদ্বীপে কুক্কুর হইল॥ গৌরচন্দ্র ভোজন করিয়া অবশেষ। কর্ম্মবন্ধ কুক্কুরের পাপ হইল শেষ॥ উচ্ছিষ্টান্ন খাইয়া কুকুর গঙ্গাদাস। পূর্ব্ব অপরাধ তার সব হৈল নাশ॥ কথোদিনে কুকুরের শাপান্ত ঘুচিল। গঙ্গাএ প্রাণ ছাড়ি কুকুর মুক্ত হইল॥ আশ্চর্য্য দেখিঞা নবদ্বীপ লোকে ত্রাস। গৌরাঙ্গপ্রসাদে মুক্ত কুকুর গঙ্গাদাস॥ অসীম চৈতন্যলীলা শুনিতে সুছন্দ। গঙ্গাদাস কুকুর ছাড়িল ভববন্দ॥ চিন্তিয়া চৈতন্যগদাধরপদদ্বন্দ্ব। আনন্দে নদীয়াখণ্ড গাএ জয়ানন্দ॥
আর একদিনে খেলে সুরনদীর তীরে কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ২০শ অধ্যায়, ২৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ কথা দিশা॥
আর একদিনে খেলে সুরনদীর তীরে। মিশ্র জগন্নাথ পুত্র না দেখে মন্দিরে॥ বিশ্বরূপ বলেন নিমাঞি মোর কুথা। রাত্রি দিনে খেলে পুত্র খেলে যথা তথা॥ স্নান দেবার্চ্চনা মোর সব লাগে শনি। নিমাই পরাণ ধন জীবন পুতলি॥ বিশ্বরূপ বলে আমার নিমাঞি প্রাণধন। হেম মন করে নিমাঞি দেখি সর্ব্বক্ষণ॥ নবদ্বীপচন্দ্র নিমাঞি দ্বিজ শিরোমণি। বংশ সরসীরুহ কদম্ব তরুণী॥ প্রচণ্ড দোর্দ্দণ্ড দীর্ঘ কিঞ্জল্ক লোচন। অসীম গরিম রূপ ভুবনমোহন॥ কূটিল কুন্তল ভুরু যুগল রামধনু। সিংহগ্রীব কম্বুকন্ঠ সাত কুম্ভ তনু॥ তিলফুল নাসিকা গরুড় গজাধর। চম্পক কলিকাঙ্গুলি নখ নিশাকর॥ গৌরচন্দ্রমহিমা শুনি বিশ্বরূপ মুখে। মিশ্র পুরন্দর ভাসেন প্রেমানন্দ সুখে॥ সে বদনে বিশ্বরূপ সন্ন্যাস কারণে। উন্মাদ বৈরাগ্য গেলা শচী বিদ্যমানে॥ মা আমি গৃহবাসে রহিতে নারিল। আজি হইতে মা আমি সংসার ছাড়িল॥ আমার জীবনধন গৌরচন্দ্র ভাই। হেন ভাই না দেখিব ইহা ছাড়ি যাই॥ আলিঙ্গন দিয়া প্রেমজলে অভিষেক। গৌরাঙ্গবদনে ঘন চুম্বন অনেক॥ মা গৌরাঙ্গ আমার আশ্রম লইব। ইহার মহিমা লোক অনেক গাইব॥ মাএ দণ্ডবৎ হয়্যা বাপে নমস্করি। গঙ্গা পার হঅ্যা গেলা কাটোয়া নগরী॥ কাটোয়াঅ কেশব ভারতী নিবস্যে। বিশ্বরূপ তার স্থানে লভিল সন্ন্যাসে॥ গুরু নাম থুইল তার শঙ্করারণ্য। গৌরাঙ্গ ধরিব নাম শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য॥ বিশ্বরূপ সন্ন্যাস লয়্যা লোক মুখে। গঙ্গা হৃদে শচী সাম্ভাইল পুত্রশোকে॥ ধরিয়া তুলিল তারে গঙ্গা হৃদ হইতে। মিশ্র পুরন্দর শুনি মৈল্যা আচম্বিতে॥ নারায়ণী সর্ব্বাণী মালিনী শুনি কান্দে। বসন না পরে কেহো কেশ নাহি বান্ধে॥ গৌরাঙ্গ দেখিয়া শচী মিশ্র পুরন্দর। পাসরিল বিশ্বরূপ শোকে জর জর॥ গৌরচন্দ্র প্রকাশ দেখিআ দিনে দিনে। পাসরিল বিশ্বরূপ গৌরাঙ্গ দর্শনে॥ গৌরচন্দ্র বলে মাতা তুমি ভাগ্যবতী। তুমার নন্দন বিশ্বরূপ হইল যতি॥ যার বংশে একজন হএ ত সন্ন্যাসী। সপ্তকোটি পুরুষ তার হএ স্বর্গবাসী॥ না কান্দ না কান্দ মাতা স্থির কর মন। সংসার অসার কিছু নাঞি প্রয়োজন॥ ভাল হইল বিশ্বরূপ লইলেন সন্ন্যাস। তিনকুল উদ্ধারিতে যাহার প্রকাশ॥ আমি তুমা সভাকার করিব পালন। ধন উপার্জ্জন করি করিব পোষণ॥ শুনিঞা আনন্দময় হইল সর্ব্বলোক। কথোদিনে পাসরিল বিশ্বরূপ শোক॥ চিন্তিয়া চৈতন্যগদাধরপদদ্বন্দ্ব। বিশ্বরূপ সন্ন্যাস গাইল জয়ানন্দ॥
আর একদিনে নীলাচলে গৌরচন্দ্র কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, প্রকাশ খণ্ড, ১৭শ অধ্যায়, ২০৩-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ ততঃ কথা দিশা॥
আর একদিনে নীলাচলে গৌরচন্দ্র। জোড় হাথে জিজ্ঞাসিল রায় রামানন্দ॥ তুমি কৃষ্ণচৈতন্য বলাহ ন্যাসি মুনী। মহাপ্রসাদের কথা কহ কিছু শুনি॥ বড় কথা জিজ্ঞাসিলে রায় রামানন্দ। একথা শুনিলে ঘুচে ভবভয়বন্ধ॥ সে দ্রব্য তুলসী দিআ করে নিবেদন। কৃষ্ণ পরিগ্রহ করেন সে দ্রব্য ততক্ষণ॥ গঙ্গাজল তুলসী দিআ মূর্ত্তি সমুখে। অন্ন নিবেদন করে কৃষ্ণ খান সুখে॥ নিত্য রূপ মহাপ্রসাদ জেই খাএ। অযূত কোটি মহাযজ্ঞের ফল সেই পাএ॥
আর একদিনে বালক সঙ্গে কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ১০ম অধ্যায়, ১৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ পঠমঞ্জরী॥
আর একদিনে বালক সঙ্গে। মন্দির বেড়িয়া নাচে ত্রিভঙ্গে॥ উছাল মারিল মাএর মুখে। রক্ত বায়্যা পড়ে শচীর বুকে॥ মূর্চ্ছা গেল শচী অল্বাল কেশ। মাএর কোলে কহিল উপদেশ॥ রামকৃষ্ণ বল মা গঙ্গা তুলসী। সংসার মিছা স্বপ্ন হেন বাসি॥ তুলসী মঞ্জীর মাএরে দিয়া। রড় দিয়া প্রভু গেলা পালাইয়া॥ দাসীগণে মুখে ঢালিল পানী। চেতন পাইল শচী ঠাকুরাণী॥ তুলসী আনিঞা মন্দিরে রুইল। ছল্র চন্দ্রাতপ উপরে দিল॥ পাথরে বান্ধিল তুলসীতলা। নিত্য পূজা করে গোধুলি বেলা॥ এত অনুভব জানিব কে। জয়ানন্দ বলে তাঁহার জে॥
আর একদিনে লক্ষ্মী পালঙ্ক উপরে কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ৫৮শ অধ্যায়, ৬৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ কথা দিশা॥
আর একদিনে লক্ষ্মী পালঙ্ক উপরে। শচী সঙ্গে নিদ্রা লক্ষ্মী বিলাসমন্দিরে॥ রাত্রি অবশেষে কাল সর্প রূপ ধরি। দংশিল দক্ষিণ পদ কনিষ্ঠ অঙ্গুলী॥ উঠ উঠ ঠাকুরাণী চিত্রলেখা সখী। বিষ জ্বালএ মরি মা চক্ষে নাঞি দেখি। শচী ঠাকুরাণী কান্দে গা আছাড়িয়া। ঠাকুর পণ্ডিত কান্দে মালিনী বেড়িয়া॥ চিত্রলেখা সুলোচনা কান্দে নারায়ণী। আচার্য্য পুরন্দর কান্দে লক্ষ্মীর জননী॥ সর্প গুরু তন্ত্রে মন্ত্রে রাখিতে নারিলা। আকাশ ভাঙ্গিআ সভার মস্তকে পড়িলা॥ লক্ষ্মী ঠাকুরাণী বলে ঠাকুর মহাশয়। অনিত্য দেহের দেখ কেন এত ভয়॥ রামকৃষ্ণ বল সভে করহ কীর্ত্তন। আমার ঠাকুরের কীর্ত্তন প্রাণধন॥ জখন ঠাকুর আমার গেলা বঙ্গদেশে। কান্ধের পৈতা মোরে দিলেন সন্দেশে॥ সেই পৈতা আমার গলাএ দেহ আনি। প্রবোধিয়া ঘরে নেহ মা ঠাকুরাণী॥ আমারে অন্তর্জলে নেহ বিলম্বে কি কাজ। গঙ্গা ছাড়া ঘরে মরি এই বড় লাজ॥ গঙ্গা তুলসী বৈষ্ণব হরিনাম। এ চারি ব্রহ্মণ্যে ত্রৈলোক্য অনুপাম॥ সবে দুঃখ রহিল কীর্ত্তন মহোত্সবে। অন্ন ব্যঞ্জন পিঠা না দিল বৈষ্ণবে॥ হরিদাস ঠাকুরে অন্ন দিল একবার। না জানি সে ভাগ্য কৃষ্ণ কি করেন আমার॥ বৈষ্ণব মহিমা কেবা জানে ত্রিজগতে। ত্রিজগতে জননী প্রকাশিল বিধিমতে॥ চিন্তিয়া চৈতন্যগদাধরপদদ্বন্দ্ব। আনন্দে নদীয়াখণ্ড রচে জয়ানন্দ॥
আর একদিন গৌরাঙ্গ বড় নিশি অবশেষে কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, বৈরাগ্য খণ্ড, ৪র্থ অধ্যায়, ৮৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ কথা দিশা॥
আর দিন গৌরাঙ্গ বড় নিশি অবশেষে। শ্রীনিবাস পণ্ডিতেরে কহিল বিশেষে॥ আজি হইতে ছাড়িল সংসার অভিলাষ। নবদ্বীপ সম্প্রতি ছাড়িব শ্রীনিবাস॥ অধ্যয়ন করিল করাল্য অধ্যাপনা। আর গৃহ সুখে মোর নাইখ বাসনা॥ স্রক্ চন্দন বনিতা উপভোগ জত। অনিত্য সংসার স্বপ্ন হেন মোর মত॥ বিষয় ভুজঙ্গ বিষ সর্ব্বক্ষণ দেহে। বিনি কৃষ্ণ না ভজিলে নিবারণ নহে॥ শ্রীনিবাস বলেন ঠাকুর জীব মরে শোকে। কৃষ্ণ হয়্যা চৈতন্য করাএ সর্ব্বলোকে॥ তুমার বৈরাগ্য লোকে দেহ দিব্যজ্ঞান। লোক নিস্তারিতে তুমি ক্ষিতি অধিষ্ঠান॥ আপনি শ্রীমুখ তুলি কহিল সভারে। সংকীর্ত্তন বই ধর্ম্ম নাঞিখ সংসারে॥ হেন সংকীর্ত্তন ছাড়ি করহ বৈরাগ্য। আমারে জিজ্ঞাসহ আমার বড় ভাগ্য॥ চন্দ্রশেখর বাড়ি কীর্ত্তনে নাচিতে। লক্ষ্ণীভাব প্রকাশ করিলে আচম্বিতে॥ গোপীভাব রূক্মিনীভাব দেখিল উত্সবে। স্তন পান করাইলে সকল বৈষ্ণবে॥ সে সব বৈষ্ণব তুমার বৈরাগ্য দেখিয়া। গঙ্গাএ মরিব তারা সর্প দংশাইঞা॥ পুত্রবাত্সল্য ভাব করিলে ঠাকুর। তবে না হইবে প্রভু এতেক নিষ্ঠুর॥ প্রভু বলেন ঠাকুর পণ্ডিত মহাশয়ে। সংসার করিব আমি যথোচিত নহে॥ বৈরাগ্য অচলে তুমা দেখিলে পাসরি। তুমার সন্তোষে আমি সংসার করি॥ সংসার কি কাজ আমার কি কাজ বৈরাগ্যে। নীলাচলে জগন্নাথে দেখি বড় ভাগ্যে॥ গঙ্গাবৈষ্ণব নবদ্বীপে হরিদাস। আচার্য্যরত্ন মুরারি গুপ্ত শ্রীরাম শ্রীনিবাস॥ ইহা সভা ছাড়িয়া বৈরাগ্য কত সুখ। বৈকুন্ঠ সমান বাসি দেখি সভার মুখ॥ হেনকালে শচী ঠাকুরাণী তথা গিয়া। প্রবোধিল গৌরচন্দ্র আলিঙ্গন দিয়া॥ গৌরচন্দ্র বলে মা তুমার গর্ব্ভে জন্ম। কৃষ্ণ না ভজিঞা করিলা কোন্ কর্ম্ম॥ না কর বিরোধ মা দেহ ত মেলানি। ধ্রূবেরে বৈষ্ণব কৈল ধ্রুবের জননী॥ শুন মাতা ধ্রুব কথা কহিএ তুমারে। তা শুনি জেমন আজ্ঞা করহ আমারে॥ এ বোল শুনিঞা কান্দে শচী ঠাকুরাণী। প্রকারে মাএরে প্রবোধেন দ্বিজমণি। চিন্তিয়া চৈতন্যগদাধরপদদ্বন্দ্ব। আনন্দে বৈরাগ্যখণ্ড রচে জয়ানন্দ॥
আর দিন প্রভাতে গৌরাঙ্গ বিশ্বম্ভর কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ২৩শ অধ্যায়, ২৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ ততঃ কথা দিশা॥
আর দিন প্রভাতে গৌরাঙ্গ বিশ্বম্ভর। শিশুগণ সঙ্গে পড়েন মন্দির ভিতর॥ পঢ়িতে পড়ুয়া সঙ্গে করিল কন্দল। গুরুগৃহে ভাঙ্গি কুম্ভ অনেক সকল॥ জলেতে ভাসিল যত পড়ুয়ার পুস্তক। অকথ্য দেখিআ দিল চৌদিগে রক্ষক॥ কার দেবমন্দিরে বসিয়া সিংহাসনে। দেবতা প্রতিমা লয়্যা পেলাএ প্রাঙ্গণে॥ কাহার মন্দিরচূড়ে বসিয়া সত্বরে। গড়াগড়ি দিয়া ভূমে পড়ে বিশ্বম্ভরে॥ আছাড়ের শব্দ যেন হএ ভূমিকম্প। পদতল তাল যেন বাজে ঘন ডম্ফ॥ কেহো বলে নিমাঞি উদ্ধত বড় হইল। কেহো বলে আহা আহা মইল মইল॥ এই মত ক্রীড়া করে দ্বিজশিরোমণি। লখিতে না পারে ক্রীড়া জনক জননী॥ কাহার মন্দিরে দেবতার দ্রব্য খাএ। দ্বারে কপাট দিআ হাসি গড়ি জাএ॥ কুহু কুহু ধ্বনি করে মন্দির ভিতরে। পারাবত ধ্বনি হেন হংসবত করে॥ কাহার মন্দিরে চলে ময়ূর পেখনে। কাহার মন্দিরে জাএ নানা বিভূষণে॥ কাহার মন্দিরে সন্ধ্যাকালে প্রবেশিয়া। প্রদীপ নির্বাণ করে হাসিয়া হাসিয়া॥ উচ্ছিষ্ট কুণ্ডেতে করে জাএ বড় দিয়া। রন্ধনশালাএ কার প্রবেশএ গিয়া॥ দেবতাপূজার দ্রব্য গন্ধমাল্য ধূপে। নৈবেদ্যাগ্রভাগ লয়্যা পেলে অন্ধকূপে॥ উচ্ছিষ্টকুণ্ডেতে কার যজ্ঞসূত্র পেলে। উদ্দণ্ড বালক নিমাঞি কেহো কেহো বলে॥ কেহো বলে জয় জয় বড় ভাল হইল। পূর্ব্বে যেন ব্রজমধ্যে কৃষ্ণক্রীড়া কৈল॥ শ্রীনিবাস মন্দিরে যে জন করে রঙ্গ। শ্রীকান্ত শ্রীমান্ বাসু মুকুন্দের সঙ্গ॥ পাটুআ শ্রীধর নামে এক দ্বিজবর। কলার পাটুয়া বিচে নগর ভিতর॥ প্রতিদিন পাটুয়া শ্রীধর সঙ্গে দ্বন্দ্ব। তাহার পাটুয়া চুরি করে গৌরচন্দ্র॥ পাটুয়া কিনিয়া আনি শ্রীধর বেচে। চুরি করেন গৌরাঙ্গ রহিয়া তার কাছে॥ প্রতিদিন অর্দ্ধেক পাটুয়া চুরি সব। শ্রীনিবাস মন্দিরে থুইল মণ্ডপের ভিতর॥ একদিন দ্বিজ কড়ি গণিঞা দেখিল। আছুক লভ্যের কাজ মূলহারা হইল॥ ব্যাকুল হইয়া দ্বিজ মন্দিরে চলিল। মিশ্র পুরন্দর সুত পথে রহাইল॥ ঈষৎ হাসিআ প্রভু তাহারে জিজ্ঞাসি। আমা ভাণ্ডিয়া বেটা মন্দিরে পালাসি॥ আজি পাটুয়াতে তোর কত কড়ি হইল। আমারে জানিঞা জায় জানি কেবা লইল॥ মুঞি তোর পাটুয়া কৈল সর্ব্ব চুরি। শ্রীনিবাস মন্দিরে থুইলুঁ কূপ ভরি॥ আমা সঙ্গে দ্বন্দ্ব কর মূলে নাঞি উঠে। আমারে ভজিলে দেখ বটেক না টুটে॥ অনেক দুঃখী ত তুমি পাটুয়া শ্রীধর। আমারে না চিন আমি সভার ঈশ্বর॥ আমি তোরে কিছু দিব আমা সঙ্গে আয়। রড় দিয়া ঝাঁপ দিল অলকানন্দাএ॥ কথোদূরে উঠিলেন গঙ্গার নিঙড়ে। এই খানে কুড় বলি হুঙ্কার সে ছাড়ে॥ পাটুয়া শ্রীধর বলে চলহ মন্দিরে। কান্ধে চড় লঅ্যা জাঙ গঙ্গা তীরে তীরে॥ চলিলা মন্দিরে গৌরচন্দ্র হাসি হাসি। গঙ্গাতীরে পাটুয়া শ্রীধর রহে বসি॥ রাত্রিকালে তিয়ড়িতে শ্রীধর পাইল ধন। গৌরাঙ্গ ঈশ্বর জ্ঞান হইল তখন॥ নবদ্বীপে বিদিত পাটুয়া শ্রীধর। তাহারে ভাগবত করিল বিশ্বম্ভর॥ চিন্তিয়া চৈতন্যগদাধরপদদ্বন্দ্ব। পাটুয়া শ্রীধরে কৃপা গাএ জয়ানন্দ॥
আর দিন প্রভাতে বালক সব সঙ্গে কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ১১শ অধ্যায়, ২০-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
॥ কথা দিশা॥
আর দিন প্রভাতে বালক সব সঙ্গে। সুরনদীতীরে বালক্রীড়া করে রঙ্গে॥ খাট পাট সিংহাসন বালির আত্তাশ। বালির দেবালয় কেহো করএ প্রকাশ॥ বালির দেবালএ অন্ন ব্যঞ্জন রন্ধন। বালির গোপীনাথে কেহ করে নিবেদন॥ কেহো কেহো বলে ভাই মহাপ্রসাদ খাই। কেহো বলে কয়া খেড়ি খেলি আইস ভাই॥ চৌদিগে বালক সব গঙ্গাজলে ভাসে। মাঝে গৌরাঙ্গ চান্দ করিল প্রকাশে॥ প্রেমে আকুল গঙ্গা জল নাঞি চলে। প্রদিক্ষণ করে গঙ্গা তরঙ্গের ছলে॥ এথা শচী ঠাকুরাণী ঘরে ঘরে চায়্যা। সুরনদী তীরে গেলা উদ্দেশ পাইয়া॥ রজনী প্রভাতে আইলে ক্রীড়া করিবারে। সপ্ত ঘটী হইল কেন না আস মন্দিরে॥ আমার বাপের ঠাকুর হাপুতির বাছা। ও মোর গোশারি প্রাণ শচীগর্ভ সাঁচা॥ ও মোর-অমূল্য ধন ও মোর ধিআন। ও মোর ঘরের ঠাকুর ও মোর পরাণ॥ মাএর বিলাপ শুনি দয়া উপজিল। কয়া খেড়ি সংকলিয়া মন্দিরে চলিল॥ রাজপথ দিয়া নিজ গৃহে প্রবেশিতে। হুঙ্কার দিআ পড়ে উচ্ছিষ্ট কুণ্ডেতে॥ সকল উচ্ছিষ্ট হাঁড়ি একত্র করিয়া। ব্রহ্ম বাখানিল তার উপরে বসিয়া॥ সর্ব্বভূত সম করি আত্মবৎ দয়া। পুরীর চন্দন ভেদ এই সব মায়া॥ যত দিন এ সব প্রকাশ নহে দেহে। ততদিন সংসার আচারভ্রষ্ট নহে॥ এত অনুভব ইহা কহিল বিশেষে। রড় দিয়া স্তন পিয়া শচীকোলে হাসে॥ চিন্তিয়া চৈতন্যগদাধরপদদ্বন্দ্ব। আনন্দে নদীয়াখণ্ড গাএ জয়ানন্দ॥
আর দিন প্রভাতে বালক সব সঙ্গে কবি জয়ানন্দ ভণিতা জয়ানন্দ এই পদটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” কাব্যগ্রন্থ, নদীয়া খণ্ড, ১৫শ অধ্যায়, ২২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
আর দিন প্রভাতে বালক সব সঙ্গে। সুদর্শন পাত্রের বাড়ি গেলা নিজ রঙ্গে॥ ক খ চৌতিশাক্ষর কাঠনতে লেখি। হামাকুড়ি দিয়া পড়ে গুরুমাএ দেখি॥ ক খ ইহার নাম গুরুরে জিজ্ঞাসে। আঙ্ক আস্থ পড়িয়া অট্ট অট্ট হাসে॥ ইহার নাম ওঝা ক খ কেন বল। আস্ক আস্থ একাক্ষর দেখি আমা ছল॥ ক খ পড়াই আজি হইতে ইহা না বলিহ। ক পড়াই আমার শিক্ষা স্বভাবে ধরাইহ॥ ইহা শুনি সুদর্শন ক্রোধে বাড়ি মাড়ি। শ্রী লয়্যা ঘর জায় শিশু সঙ্গে করি॥ ওঝা শ্রী লেখিয়া উপরে খড়ি থুইল। তা দেখিয়া গৌরচন্দ্র হাসিতে লাগিল॥ শ্রী মুছিয়া ক লেখী জাহাতে খড়ি এড়ি। নাভিপদ্মে নাগে খড়ি দণ্ডবতে পড়ি॥ কে মোর নাভিতে বসে প্রলয়াবসানে। কে মোরে চিন্তয়ে পদ্মাসনে ব্রহ্মা ধ্যানে॥ কে মোর গোকুলে বত্সবালক হরিল। কে মোরে ক্ষীরোদ স্তুতি বিস্তর করিল॥ আর জিজ্ঞাসি ওঝা কহ দৃঢ় মনে। য র ল ব প ভ বভ দুই ব কেনে॥ সর্ব্ববিদ্যার আদ্যাক্ষর কহিয়া ছাড়ি। আমার নত কএ শ্রী লই থুইয়া খড়ি॥ ক আমার প্রতি লোমকূপের ভিতরে। ক হইতে সর্ব্ববিদ্যা অক্ষর নিকরে॥ শুনি সুদর্শন ওঝা বলে কর্ম্ম ভজি। উদ্দণ্ড ছাত্তাল ইহার বচন না বুঝি॥ বিপরীত বলে সব বুঝিতে দুষ্করে। ইহা জিজ্ঞাসিব আজি মিশ্র পুরন্দরে॥ চিন্তিয়া চৈতন্যচন্দ্র চরণ কমল। জয়ানন্দানন্দে গাএ প্রভুর মঙ্গল॥