কবি জয়ানন্দ - জন্মগ্রহণ করেন তাঁর মাতুলালয়ে “শুক্লা দ্বাদশী তিথি বৈশাখ মাসে”। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিলো বর্দ্ধমান জেলার মাঞিপুরা বা আমাইপুরা (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ অনুয়ায়ী) গ্রামে। পিতার নাম সুবুদ্ধি মিশ্র এবং মাতা রোদিনী। নিজের জয়ানন্দ নামটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরই রাখা বলে তিনিই জানিয়েছেন।
জয়ানন্দের নিজের সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য তাঁর নিজের চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থ থেকেই আমরা পাই। অন্যান্য চৈতন্যজীবনী গ্রন্থে নেই এমন বহু তথ্য জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। তার অনেকগুলিই বিশ্বাসযোগ্য ও সঙ্গতিপূর্ণ এবং অনেকগুলিই বিশেষজ্ঞদের মতে নির্ভরযোগ্য নয়। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের পুথি পাওয়া গেলেও, আশ্চর্যজনকভাবে জয়ানন্দের উল্লেখ, তাঁর পরবর্তী একটি মাত্র গ্রন্থ ছাড়া অন্য কোনও বৈষ্ণব সাহিত্য বা ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর কোনও পদ প্রাচীন থেকে আধুনিক কালে প্রকাশিত কোনও পদাবলী সংকলনে সন্নিবেশ করা হয় নি।
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” ৬ষ্ঠ সংস্করণের ৩২১-পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, জয়ানন্দের অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে “ধ্রুব-চরিত্র” ও “প্রহ্লাদ-চরিত্র” নামক দুটি ছোট কাব্যোপখ্যান।
নগেন্দ্রনাথ বসু, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল সম্বন্ধে প্রথম তথ্য প্রকাশ করেন ১৮৯৬ সালে এবং গ্রন্থ প্রকাশ করেন সর্বপ্রথম ১৯০৫ সালে কালিদাস নাথের সহসম্পাদনায়, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে। ১৯৭১ সালে গ্রন্থটি এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়।
জয়ানন্দের পিতা সুবুদ্ধি মিশ্র ছিলেন শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভুর ছাত্র। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য-চরিতামৃত গ্রন্থের আদি লীলার মূল স্কন্ধ শাখা বর্ণনে এক সুবুদ্ধি মিশ্রর উল্লেখ রয়েছে . . .
জয়ানন্দের পরিবারের অন্যান্যরাও ছিলেন শিক্ষিত কিন্তু তাঁর পিতা ও তাঁকে ছাড়া অন্যেরা বৈষ্ণব ছিলেন না।
বিমানবিহারী মজুমদারের মতে জয়ানন্দের “চৈতন্যমঙ্গল” ১৫৫০ থেকে ১৫৬০ খৃষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়। তিনি তাঁর গ্রন্থে যে যে পূর্বেকার গ্রন্থাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতও রয়েছে, যার প্রথম শ্লোকটিও তিনি তাঁর গ্রন্থে ব্যবহার করেছেন। এককথায় বৃন্দাবনদাস আরও কয়েকজন পূর্বেকার চৈতন্য-জীবনীকারের উল্লেখ করে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারও করেছেন।
এই গ্রন্থে এমন অনেক তথ্য পাওয়া যায় যা ওই সময়ের অন্য কোনও গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বহু খবর তাঁর গ্রন্থে উঠে এসেছে, যা ঐতিহাসিক দিক দিয়ে মূল্যবান। কিন্তু তার সবটাই নিশ্চিত সত্য অথবা সবটাই মনগড়া কথা তা জানার উপায় নেই কারণ এই বিষয়গুলি নিয়ে অন্যত্র তেমন কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না। আমরা, বৈষ্ণব সাহিত্যের বিশেষজ্ঞগণের প্রদত্ত ব্যাখ্যার আলোকে জয়ানন্দের কয়েকটি তথ্যের আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
জয়ানন্দ ছিলেন মূখ্যত পালাগানের রচয়িতা। সাধারণ নারী-পুরুষ, সাক্ষর-নিরক্ষর সকল মানুষের কাছে চৈতন্যজীবনী প্রচার করতে গিয়ে তাঁকে এই পালা রচনা করতে হয়। তাত্ত্বিত বিবরণের ভার বেশী হলে এই মানুষজনকে ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি তাঁদের মনোরঞ্জনের জন্য ধ্রুব, জালিন্দ্র প্রভৃতি পৌরাণিক কাহিনী তাঁর চৈতন্যমঙ্গলে ঢুকিয়েছিলেন। সে যুগে কেন, এই বর্তমান যুগেও তা খাটে। গুরুগম্ভীর আর্ট ফিল্ম আর বাজারী বলিউড মার্কা সিনেমার দর্শকের সংখ্যার আকাশ-পাতাল তফাতের মত আরকি!
সে দিক দিয়ে আমরা মনে করছি যে সাধারণ মানুষের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনী ও বাণী পৌঁছে দেবার এই প্রচেষ্টায় দোষের কিছু ছিল না। তবে গ্রন্থের কিছু তথ্য ও তত্ত্ব গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের সর্ব্বোচ্চ পীঠ, বৃন্দাবনের অনুমোদন লাভ করেনি এবং এই গ্রন্থ যাতে মানুষ না পড়ে তারও উদ্যোগ সম্ভবত নেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন মতামত নিয়ে, "কেন জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল জনপ্রিয় হয়নি", বিশেষজ্ঞদের মতে এবং মিলনসাগরের মতে , অনুচ্ছেদ দুটিতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
জয়ানন্দের কোন পদ, কি প্রাচীন কি আধুনিক, কোনও পদাবলী সংকলনে পাওয়া যায় নি। যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলিহেলনে, কোনও সংকলকই জয়ানন্দের কোনও পদ তাঁদের সংকলনে সন্নিবেশ করেন নি। তাই আমরা তাঁর "বিষ্ণুপ্রিয়ার বারমাস্যা" সহ ৬১টি পদ তাঁর "চৈতন্যমঙ্গল" থেকেই এখানে তুলে দিলাম।
জয়ানন্দের দীক্ষাগুরু গদাধর পণ্ডিত বা অভিরাম গোস্বামী - পাতার উপরে . . . তাঁর দীক্ষাগুরু ছিলেন চৈতন্য-পরিকর গদাধর পণ্ডিত। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থের নদীয়া খণ্ডের ২৯শ অধ্যায়ে দেওয়া শ্রীচৈতন্যের মুখে গদাধর পণ্ডিতের স্তুতি এবং গ্রন্থের বহু সংখ্যক ভণিতার কলিতে গদাধরের বন্দনা থেকে বলা যায় যে তিনি গদাধর পণ্ডিতের মন্ত্রশিষ্য ছিলেন। বিমানবিহারী মজুমদার এই মত পোষণ করতেন। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের অধিক ক্ষেত্রেই ভণিতার কলিতে চৈতন্য-গদাধরের স্তুতি রয়েছে। রয়েছে শ্রীচৈতন্যের ও অভিরাম গোসাঞি স্তুতিযুক্ত ভণিতাও। . . .
আদি খণ্ডে তিনি চৈতন্যের স্তুতি করেও ভণিতা দিয়েছেন যেমন . . . চিন্তিয়া চৈতন্যচন্দ্র চরণ কমল। জয়ানন্দানন্দে গায় প্রভুর মঙ্গল॥
কিন্তু রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের মতে জয়ানন্দের দীক্ষাগুরু ছিলেন অভিরাম গোস্বামী। সন্ন্যাস খণ্ডের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে নৃসিংহ ভারতী সঙ্গে পদটির ভণিতায় আছে . . .
চৌদিগে সন্ন্যাসী বৃন্দে সিতুতি করে গৌরচন্দ্রে . সব লোকে বলে হরি হরি। অভিরাম গোসাঞির দাস মিত্র # গোসাঞীর সুত . সর্ব্ব সুখ কাটোআ নগরী॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ১৯৭১ সালে প্রকাশিত, “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, সন্ন্যাস খণ্ড, ৬ষ্ঠ অধ্যায়, ১৩৪-পৃষ্ঠা॥
# - এখানে “মিত্র গোসাঞি” শব্দটি “মিশ্র গোসাঞি” হবে। কারণ জয়ানন্দের পিতা সুবুদ্ধি মিশ্র, মিশ্র গোসাঞি নামেও পরিচিত ছিলেন। গ্রন্থে সম্ভবত অসংশোধিত রয়ে গিয়েছে। সুখময় মুখোপাধ্যায়ও তাঁর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম” গ্রন্থের ১০৩-পৃষ্ঠার পাদটীকায় লিখেছেন - “এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে দু’এক জায়গায় ছাপার ভুলে “মিশ্র গোসাঞি”র জায়গায় “মিত্র গোসাঞি” মুদ্রিত হয়েছে।”
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক, শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“. . . বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই।”
বিষ্ণুপ্রিয়ার বারোমাস্যার পদগুলি জয়ানন্দর রচনা - পাতার উপরে . . . রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন রচিত, “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” ৬ষ্ঠ এবং তাঁর জীবদ্দশায়, ১৯৩৯ এর পূর্বে, প্রকাশিত শেষ সংস্করণের চরিত-শাখা, (খ) জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল, ৩২০-পৃষ্ঠায় তিনি বিষ্ণুপ্রিয়ার বারোমাস্যার পদগুলি নিয়ে লিখেছেন যে তাঁর মনে হয়েছে লেখাটি লোচনদাসেরই . . .
“পদকল্পতরুর ১৭৮৩ সংখ্যক পদে লোচনদাসের ভণিতাযুক্ত বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর যে বারোমাস্যা দৃষ্ট হয়, তাহা জয়ানন্দের প্রাচীন পুথিতেও পাওয়া যাইতেছে ; শ্রীযুক্ত নদেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়কে উহা বলাতে তিনি পরিষৎ পত্রিকায় নানারূপ যুক্তির অবতারণা করিয়া উক্ত কবিতাটী জয়ানন্দের খাতায়ই লেখা সাব্যস্ত করিয়াছেন। আমরা কিন্তু উক্ত পদটীর মধ্যে যেন লোচনদাসের রচনার সুমধুর ঝাঁজ পাইয়াছিলাম ; যাহা হউক, উহা জয়ানন্দের রচিত বলিয়া পাঠ করিলে সাহিত্যসেবীর পক্ষে রসাস্বাদের কোন বৈষম্য ঘটিবে না।”
কিন্তু বিমানবিহারী মজুমদার নিশ্চিতভাবে মনে করতেন যে এই পদটি জয়ানন্দেরই রচনা। বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থের ভুমিকার সংক্ষিপ্তসার -এর xliii-পৃষ্ঠায়, তাঁরা জয়ানন্দের বিষ্ণুপ্রিয়ার বারোমাস্যা নিয়ে লিখেছেন . . .
“ . . . জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’র সাহিত্যিক গুণের পরিচয় পাওয়া যায় শিশু গৌরাঙ্গের রূপ বর্ণনায়, শিশু গৌরাঙ্গ সম্বন্ধীয় কোন কোন গানে, চৈতন্যদেবের সন্ন্যাসগ্রহণের প্রাক্কালে শচীর বিলাপে এবং বিষ্ণপ্রিয়ার বারোমাস্যায়। এদের মধ্যে বারোমাস্যাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ; আসন্ন বিরহের সম্ভাবনায় বিষ্ণপ্রিয়ার অন্তরের হাহাকার এতে পরিপূর্ণভাবে ধ্বনিত হয়েছে ; এর মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়ার নিজের কষ্টের আশঙ্কা ততটা অভিব্যক্ত হয়নি, যতটা হয়েছে স্বামীর সম্ভাবিত কষ্টের ভাবনায় তাঁর অন্তরের আক্ষেপ। ‘পদকল্পতরু'তে এই বারোমাস্যাটি লোচনদাসের ভণিতায় পাওয়া যায়, কিন্তু লোচন জয়ানন্দের পরবর্তী গ্রন্থকার ; সুতরাং বারোমাস্যাটি যে জয়ানন্দেরই রচনা, তাতে কোন সন্দেহ নেই।”
একটি মাত্র বৈষ্ণব গ্রন্থে জয়ানন্দের উল্লেখ - পাতার উপরে . . . বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থের ভুমিকার সংক্ষিপ্তসারে জানিয়েছেন যে একমাত্র এক যদুনাথ দাসের অজ্ঞাত রচনাকালের "শাখানির্ণয়ামৃত" নামে একটি গ্রন্থ পাওয়া গিয়েছে যাতে চৈতন্যমঙ্গল রচয়িতা কবি জয়ানন্দের উল্লেখ রয়েছে গদাধর পণ্ডিতের শাখায়। এই গ্রন্থটি ছাড়া বৈষ্ণব সাহিত্য ও ইতিহাসের কোনও গ্রন্থেই জয়ানন্দের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না। এই গ্রন্থটি আমরা হাতে পাইনি তাই ওই গ্রন্থে জয়ানন্দ সম্বন্ধে উদ্ধৃতি এখানে তুলতে পারলাম না।
বিশেষজ্ঞদের মতে কেন জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল জনপ্রিয় হয়নি? - পাতার উপরে . . . স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে যে জয়ানন্দের লেখা শ্রীচৈতন্যের জীবনীটি কেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে জনপ্রিয়তা লাভ করলো না! একাধিক বিশেষজ্ঞ বিগত শতকে এর একাধিক কারণ খুজে তার ব্যাখ্যা করেছেন।
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ১৯২২ সালে প্রকাশিত, Chaitanya and His Age গ্রন্থে শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা লিখতে গিয়ে জয়ানন্দের উল্লেখ করে, গ্রন্থের ২৬২-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“We have, however, definite information on this obscure point from Chaitanya Mangal by Jayananda, brought to light some years ago, by Prachyavidya-maharnava Nagendranath Basu and edited by him and published by the Sahitya Parishat of Calcutta. It should be remembered that this work is not recognised by the Vaishnavas ; hence the author, who was outside the pale of the school of Brindaban from which sprang all canons and censor-ship in literary matters, could exercise his own discretion in using his materials and was not handicapped while waiting things, such freedom not being allowed in strictly orthodox literature. This book says that during the Car-festival of Jagannath in Ashar 1455 Saka, Chaitanya got a hurt in his left foot from a small brick in the coarse of his dancings. Then on the sixth tithi the pain increased and he could not rise from his bed. On the seventh tithi at ten dandas of night (about 11 p.m.) he passed away from the world having suffered from a sympathetic fever. Now this account seems to be quite true, as several very old Mss. of Jayananda's Chaitanya Mangal have been recovered which proves beyond doubt the genuineness of the printed edition.”
এখানে রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে জয়ানন্দর লেখা অন্যান্য লেখকের থেকে ভিন্নতর ছিল কারণ তিনি বৃন্দাবনের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবধারা ও ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে ছিলেন।
সুকুমার সেন তাঁর ১৯৪০ সালে রচিত “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস” ১ম খণ্ডের অষ্টাদশ পরিচ্ছেদের ৩৩৫- পৃষ্ঠায় জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল সম্বন্ধে লিখেছেন, কেন তাঁর কাব্য প্রসার লাভ করে নি . . .
“অন্যান্য চৈতন্যজীবনী কাব্য হইতে চৈতন্যমঙ্গলের কিছু স্বাতন্ত্র্য আছে। জয়ানন্দের কাব্য বিশেষ করিয়া জনসাধারণের রুচির উপযোগী করিয়াই রচিত হইয়াছিল. ইহা মনে করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। এই কারণে শিক্ষিত ভক্ত বৈষ্ণবের নিকট কাব্যটি কোন আদর না পাওয়ায় লুপ্তপ্রায় হইয়া পড়িয়াছিল। অপরাপর চৈতন্যজীবনী কাব্যগুলির মধ্যে কেবল লোচনের চৈতন্যমঙ্গলের সহিত জয়ানন্দের কাব্যের কতকটা সাদৃশ্য দেখা যায়। উভয় কাব্যেই কোন পরিচ্ছেদ-বিভাগ নাই, উভয় কাব্যেরই মঙ্গলাচরণে দেবদেবীর বন্দনা আছে, এবং উভয় কাব্যই একান্তভাবে গান করিবার উদ্দেশ্যে বিরচিত হইয়াছিল। তবে লোচনের কাব্য বিদগ্ধের কৃতি, আর জয়ানন্দের কাব্য অবিদগ্ধের লেখনীপ্রসূত। জয়ানন্দের কাব্যে কোনরূপ বাঁধুনী বা পরিপাট্যের প্রয়াস একেবারেই লক্ষিত হয় না, অথচ ইহাতে বৃন্দাবনদাসের কাব্যের মত ভাবাবেগও দেখা যায় না। এই সব কারণে জয়ানন্দের কাব্যের প্রসার ও স্থায়ী আদর হয় নাই।
বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত চৈতন্যচরিতের উপাদান গ্রন্থের ২২৫-পৃষ্ঠায় বৈষ্ণবসমাজে জয়ানন্দের গ্রন্থ অনাদৃত হবার তিনটি কারণ দেখিয়েছেন . . .
১। জয়ানন্দ বৈষ্ণবীয় রীতি অবলম্বন করেন নি তাঁর গ্রন্থ রচনার কালে। গ্রন্থ শুরু করেছেন অবৈষ্ণব-হিন্দু মতে, শিব ও তাঁর নন্দন অর্থাত গণেষবন্দনার করে। বৈষ্ণবরা রাধাকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য বা গুরুর বন্দনা দিয়ে গ্রন্থ শুরু করেন। তিনি গোস্বামী শাস্ত্রে প্রদত্ত শ্রীচৈতন্যের ধর্মমতও ব্যাখ্যা করেন নি। ২। তাঁর মতে জয়ানন্দ ঐতিহাসিক ক্রম রক্ষা করতে পারেন নি। অর্থাত তাঁর সঙ্গে মুরারি গুপ্ত, কবিকর্ণপূর ও বৃন্দাবন দাসের, শ্রীচৈতন্যের জীবনের ঐতিহাসিক ক্রমবিন্যাসের মিল নেই। ৩। ৩য় কারণ হিসেবে বিমানবিহারী মজুমদার লিখেছেন . . . “বৈষ্ণবসমাজে জয়ানন্দের গ্রন্থ আদৃত না হইবার তৃতীয় কারণ এই যে তিনি বিশেষ অনুসন্ধান না করিয়া এমন অনেক সংবাদ লিখিয়াছেন যাহা ভ্রান্ত।”
এখানে আমরা স্মরণে আনতে চাই যে লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলও একদন্ত ও হর-গৌরী কে বন্দনা করে শুরু করা হয়েছে। কিন্তু এই কারণে তাঁর চৈতন্যমঙ্গলকে কেউ পরিহার করে নি।
নীলরতন সেন তাঁর ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থের চৈতন্যজীবনী প্রসঙ্গ-এ ৩৭৫-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“. . জয়ানন্দ অঙ্কিত চৈতন্য-চরিত্র মূলতঃ মুরারি, কবিকর্ণপূর বা বৃন্দাবন দাস অঙ্কিত চরিত্র থেকে ভিন্নতর। সম্ভবতঃ এই কারণেই বৈষ্ণব সমাজে তাঁর গ্রন্থটি সম্পূর্ণ অপ্রচলিত হয়ে পড়েছিল।”
সুখময় মুখোপাধ্যায় তাঁর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম” গ্রন্থের ১০০-পৃষ্ঠায় জয়ানন্দের স্বল্প প্রচলন নিয়ে লিখেছেন . . .
“জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ ষোড়শ-শতাব্দীতে রচিত হলেও সর্বসাধারণের মধ্যে তেমন প্রচার লাভ করে নি। এক যদুনাথ দাসের ‘শাখানির্ণয়ামৃত’ ছাড়া আর কোন প্রাচীন গ্রন্থে জয়ানন্দের নাম পাওয়া যায় না। জয়ানন্দের গ্রন্থের এই বিরল প্রচারের প্রধান কারণ, নৈষ্ঠিক বৈষ্ণবদের রচিত চৈতন্যচরিতগুলির সঙ্গে জয়ানন্দের উক্তির অনেক ক্ষেত্রে অমিল দেখা যায়। কিন্তু সেই সব ক্ষেত্রে যে জয়ানন্দই ভুল করেছেন, বিনা প্রমাণে এমন কথা বলা উচিত হবে না।”
মিলনসাগরের মতে কেন জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল জনপ্রিয় হয়নি? - পাতার উপরে . . . মিনলসাগরে আমরা উপরোক্ত বিদগ্ধজনদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ ও উল্লেখ করার পরেও, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল কেন কোনও প্রচার না পেয়ে, প্রায় নিশ্চিতভাবে অবলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিলো? এই প্রশ্নের উত্তর একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করছি . . .
সুকুমার সেনের মূল বক্তব্য হলো জয়ানন্দের রচনা অন্যান্য চরিতকারের পাশে, সাহিত্যের মাপকাঠিতে, এতটাই নিম্নশ্রেণীর যে সেটা পাঠ করে মানুষই তাঁর গ্রন্থ পড়া বন্ধ করে এবং তার পরিণতিস্বরূপ গ্রন্থটি প্রায় লুপ্ত হতে চলেছিল।
বিমানবিহারী মজুমদার জয়ানন্দের জনপ্রিয়তা না পাবার পিছনে তিনটে কারণ দেখিয়েছেন, এক - গ্রন্থের শুরুতে বৈষ্ণবীয় রীতি অবলম্বন না করা যেমন গ্রন্থের মঙ্গলাচরণে রাধাকৃষ্ণ বা শ্রীচৈতন্য বা গুরুর বন্দনা না করে দেবদবীর বন্দনা করা। দুই - মুরারি গুপ্ত, কবিকর্ণপূর ও বৃন্দাবন দাসের লেখা শ্রীচৈতন্যের জীবনের ঐতিহাসিক ক্রমবিন্যাসের সঙ্গে মিল না রাখা, যা কিনা আদতে বৃন্দাবনের উচ্চ পীঠের অনুমোদিত version ছিল। তিন - জয়ানন্দ অনেক সংবাদ ভ্রান্ত দিয়েছেন।
নীলরতন সেন বলেছেন যে জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের অপ্রচলিত হয় পড়ার মূল কারণ ছিলো এই যে তাঁর অঙ্কিত চৈতন্য-চরিত্র মুরারি, কবিকর্ণপূর বা বৃন্দাবন দাস অঙ্কিত চরিত্র থেকে ভিন্নতর।
সুকুমার সেনের সাহিত্যের মাপকাঠির বিচার করার ধৃষ্টতা আমাদের নেই। তবুও আমরা দেখতে পাই যে বৈষ্ণব পদাবলী সংকলকগণ এমন বহু পদাবলী বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সংকলনে সন্নিবেশ করেছেন যার থেকে জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের বহু পদ অনেক সুন্দর। "বিষ্ণুপ্রিয়ার বারমাস্যা"-পদটি কিন্তু উত্কৃষ্ট পদের সংকলক, The Perfectionist বৈষ্ণবদাসও বাদ দিতে পারেননি তাঁর শ্রীশ্রীপদকল্পতরু (পদসংখ্যা ১৭৭৭- ১৭৮৮) থেকে। অবশ্য তাঁর হাতে যখন পদটি পৌঁছেছিল ততদিনে তা লোচনদাসের ভণিতায় প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল এবং লোচন দাসের পদ বরাবরই গৌড়ীয় বৈষ্ণবপীঠ, বৃন্দাবনের, অনুমোদনপ্রাপ্ত ছিল।
সুকুমার সেন আরও বলেছেন যে "অপরাপর চৈতন্যজীবনী কাব্যগুলির মধ্যে কেবল লোচনের চৈতন্য মঙ্গলের সহিত জয়ানন্দের কাব্যের কতকটা সাদৃশ্য দেখা যায় . . . জয়ানন্দের কাব্যে কোনরূপ বাঁধুনী বা পরিপাট্যের প্রয়াস একেবারেই লক্ষিত হয় না, অথচ ইহাতে বৃন্দাবনদাসের কাব্যের মত ভাবাবেগও দেখা যায় না। এই সব কারণে জয়ানন্দের কাব্যের প্রসার ও স্থায়ী আদর হয় নাই।"
আমরা বলি - সত্য বটে, সুকুমার সেনের মতে জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের সঙ্গে লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে কিন্তু লোচন দাস বৃন্দাবনকেন্দ্রিক গৌড়ীয় বৈষ্ণব প্রতিষ্ঠানের অঙ্গ হয়ে যেতে পেরেছিলেন, চৈতন্যের নিকট-পারিষদবর্গের সঙ্গে তাঁর নৈকট্যের জন্য। বৃন্দাবনদাসের রচনার নাম পরিবর্তন করিয়ে "চৈতন্যভাগবত" রাখা হয় এবং বৃন্দাবন দাসের মাতা নারায়ণী দেবীর মধ্যস্থতায় লোচনদাসের "চৈতন্যমঙ্গলের" নাম অপরিবর্তিত রাখা হয় তা সর্বজনবিদিত। জয়ানন্দের সেই সৌভাগ্য হয়নি। এছাড়া শ্রীচৈতন্যের তিরোধানে, লোচনদাসের বর্ণনায় শ্রীচৈতন্যের উপরে চরম ঈশ্বরত্ব আরোপিত করা হয়েছে যা শ্রীচৈতন্যের মহিমা প্রচার করার ক্ষেত্রে সহায় হয়েছে। জয়ানন্দের লেখা শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের বর্ণনায় দেহ ভূমিতে পড়ে থাকার কথায় সেই রকমে ঈশ্বরত্ব দেখানো সম্ভব হয় না। তাই প্রাতিষ্ঠানিক গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের কাছে জয়ানন্দের শুধু প্রয়োজন ছিল না বললে ভুল হবে, তাঁর রচিত চৈতন্যমঙ্গলের অবলুপ্তিতে শ্রীচৈতন্যের ঈশ্বরত্ব প্রচার আরও নির্বিঘ্নে করা সম্ভব হয়েছে।
লোচন দাস বৃন্দাবনকেন্দ্রিক গৌড়ীয় বৈষ্ণব প্রতিষ্ঠানের কতটা নিকট ছিলেন, তা বোঝা যায় যখন দেখি যে লোচনদাসের "চৈতন্যমঙ্গল"-এর নাম না বদল করে, বৃন্দাবন দাসের গ্রন্থের নাম "চৈতন্যমঙ্গল" থেকে বদলে "চৈতন্যভাগবত" করা হয়েছিল বৃন্দাবনবাসী অর্থাৎ বৃন্দাবনস্থিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব শিরোমণি গোস্বামীগণের অনুমতিক্রমেই, তা নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাসের ত্রয়োবিংশ বিলাসে দেওয়া রয়েছে এইভাবে . . . বাসুদেব দত্তের ঠাকুর বাড়ীতে বাস কৈল। নানাশাস্ত্র বৃন্দাবন পড়িতে লাগিল॥ নানাশাস্ত্র পড়ি হৈল পরম পণ্ডিত। চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থ যাহার রচিত॥ ভাগবতের অনুরূপ চৈতন্যমঙ্গল। দেখিয়া বৃন্দাবনবাসী ভকত সকল॥ চৈতন্য ভাগবত নাম দিল তাঁর। যাহা পাঠ করি ভক্তের আনন্দ অপার॥ ১৯১৩ সালে প্রকাশিত, বাবু যশোদালাল তালুকদার দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত, ১৫২২ শকাব্দে (১৬০০ খৃষ্টাব্দে) নিত্যানন্দ দাস বিরচিত প্রেমবিলাস, ত্রয়োবিংশ বিলাস, ২২২-পৃষ্ঠা॥
বৃন্দাবনদাসের গ্রন্থের নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল তাঁর জননী নারায়ণীর মধ্যস্থতায়। জগদীশ্বর গুপ্ত তাঁর ১৮৮৯ সালে সম্পাদিত সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহ কৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত চৈতন্যচরিতামৃতের আদিলীলার ৮ম পরিচ্ছেদে বৃন্দাবনদাসের গ্রন্থের নাম চৈতন্য মঙ্গল থেকে চৈতন্য ভাগবত-এ পরিবর্তন করা নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা এই দিয়েছেন সেই পাতার পাদটীকায় . . .
পাদটীকা - ৩ - চৈতন্যমঙ্গল --- শ্রীমতী নারায়ণী দেবীর পুত্র বৃন্দাবন দাস কর্ত্তৃক চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থ রচিত হইবার পর লোচন দাস ঠাকুর চৈতন্যমঙ্গল নামে আর এক খানি গ্রন্থ রচনা করেন। তদ্দৃষ্টে বৃন্দাবন দাস মহাশয় নিজ গ্রন্থের নাম পরিবর্ত্তন করিয়া ‘চৈতন্যভাগবত’ নাম রাখিলেন। হোধ হয় ঐ নাম পরিবর্ত্তনের পূর্ব্বে কৃষ্ণদাস কবিরাজ মহাশয় এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ---জগদীশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত কৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত “চৈতন্যচরিতামৃত”, আদিলীলা, ৮ম পরিচ্ছেদ, ২৫৪- পৃষ্ঠা॥
বিমানবিহারী মজুমদারের তোলা জয়ানন্দের প্রশ্নের প্রথম কারণটি এই যে জয়ানন্দ গ্রন্থের শুরুতে বৈষ্ণবীয় রীতি অবলম্বন করেননি। এখানে আমরা স্মরণে আনতে চাই যে লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলও একদন্ত ও হর- গৌরী কে বন্দনা করে শুরু করা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে বৈষ্ণবরা কেউ বাতিল করেন নি!
তাঁর দ্বিতীয় কারণ হল জয়ানন্দের লেখায় মুরারি গুপ্ত, কবিকর্ণপূর ও বৃন্দাবন দাস রচিত শ্রীচৈতন্যের জীবনের ঐতিহাসিক ক্রমবিন্যাসের সঙ্গে মিল নেই তাই তাঁকে বৈষ্ণবরা বর্জন করেছেন। এই মতের সঙ্গে আমরাও এক মত পোষণ করছি কারণ এই ঐতিহাসিক ক্রমই বৃন্দাবনের গোস্বামীগণের অনুমোদন লাভ করেছিল। বিমানবিহারী মজুমদারের তৃতীয় কারণটি হল এই যে জয়ানন্দ অনুসন্ধান না করেই অনেক ভ্রান্ত সংবাদ দিয়ে গিয়েছেন।
জয়ানন্দ অনেক নতুন সংবাদ দিয়েছেন বটে। কিন্তু তার মধ্যে বহু তখ্য আজকের বিজ্ঞানের যুগে অভ্রান্ত সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। যেমন তিনিই সঠিকভাবে বলেছিলেন যে শ্রীচৈতন্যের জন্মের তিথিতে চাঁদের পূর্ণগ্রাস হয়েছিল . . . পড়ুন। তিনিই সঠিকভাবে "আষাঢ় সপ্তমী তিথি শুক্লা" তিরোধানের তিথিটি জানিয়েছিলেন . . . পড়ুন। তাঁর দেওয়া বৃন্দাবনের বর্ণনাই সঠিক ছিল ধ্রুবের উপাখ্যানে . . . পড়ুন। আরও বহু তথ্য পাওয়া গিয়েছে যা আমাদের, সেই ঐতিহাসিক সময়টিকে সঠিক ভাবে ধরতে সাহায্য করে। সুতরাং জয়ানন্দের দেওয়া সব তথ্যকে সরাসরি ভ্রান্ত বলে সরিয়ে রাখা অন্যায়।
সর্বোপরি তাঁর বর্ণনায় আমরা পাই শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের একটি বাস্তব-সম্মত ব্যাখ্যা। আমাদের মনে হয়েছে যে এই একটি বিষয়ের জন্যই জয়ানন্দকে প্রায় সফলভাবে বিস্মৃতির অন্তরালে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। জয়ানন্দই সঠিক বলেন যে শ্রীচৈতন্য জগন্নাথের বিগ্রহে বিলীন হয়ে যান নি। তিনি, শ্রীচৈতন্যের ইটালের ঘায়ে জ্বর আসার পর মৃত্যুর কথা লিখলেও আসলে সেদিন কি হয়েছিল তা বৃন্দাবনের গৌড়ীয় বৈষ্ণব গোস্বামীগণ নিশ্চিতভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবের শীর্ষস্থানীয়রা অর্থাৎ ষট্ গোস্বামীগণ, বিশেষ করে রূপ ও সনাতন, যাঁরা একদা বাংলার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তাঁরাও শ্রীচৈতন্যের জগন্নাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার বর্ণনা বিশ্বাস করবেন এ কথা আমাদের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
আমাদের মনে হয় যে তাঁরা সবই জানতে ও বুঝতে পেরেছিলেন যে, শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল এবং এর জন্য দায়ী কে। কিন্তু প্রতিপক্ষ এত শক্তিশালী ছিল দেখে তাঁরা আর এই নিয়ে কারও প্রতি কোনও দোযারোপের আঙ্গুল তোলা সমীচীন মনে করেন নি। এবং তখনকার মন্দিরের পাণ্ডা ও প্রতিহারীদের দ্বারা "জগন্নাথ দেবের বিগ্রহে শ্রীচৈতন্যের বিলীন হয়ে যাওয়া" রটনাটিকেই মান্যতা দিয়ে নীরবতা পালনকেই বিবেচক কর্ম হিসেবে স্থির করেন। কারণ শ্রীচৈতন্যকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব ছিল না। যাঁদের চক্রান্তে তাঁর হত্যা হয়, তাঁদের স্পর্শ করার শক্তি তখন তাঁদের কারও ছিলো না। এর মধ্যে জগন্নাথে বিলীন হয়ে যাবার রটনাটিই মন্দের ভালো হিসেবে কাজ করেছিল। এতে অন্তত শ্রীচৈতন্যকে সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বররূপে দেখানো সম্ভব হয়েছিল।
তাই সম্ভবত তাঁরা চেষ্টা করেন যাতে নীলাচলের জগন্নাথের মন্দিরের বিগ্রহে বিলীন হয়ে যাওয়ার তথ্য- সম্বলিত শ্রীচৈতন্যের চরিতগ্রন্থ গুলিই প্রচার লাভ করুক। গোপীনাথের মন্দিরের বিগ্রহে বিলীন হয়ে যাওয়ার তথ্য-সম্বলিত বা অন্য কোনও মানব-সুলভ উপায়ে শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু (জয়ানন্দ) সম্বলিত চরিতগ্রন্থ গুলিও প্রচার লাভ করুক তা সম্ভবত তাঁদের কাম্য ছিল না।
মুরারি গুপ্তের করচা বা শ্রীচৈতন্যচরিতম্ এবং কবিকর্ণপূরের চৈতন্যচরিতামৃতমহাকাব্যম্ গ্রন্থ দুটি বৃন্দাবনের অনুমোদন লাভ করে, কারণ সেখানে শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু নিয়ে কোনও কথা লেখা নেই। তার উপর মুরারী গুপ্ত ছিলেন শ্রীচৈতন্যের শৈশব থেকে যৌবনের সাথী। তাই তাঁর রচনাকেই যে সবাই আদর্শ বলে মেনে নেবে, অন্ততঃ শ্রীচৈতন্যের জন্ম-শৈশব থেকে কাটোয়ায় সন্ন্যাস গ্রহণ করা পর্য়ন্ত, সেটা অনস্বীকার্য ছিল। মুরারি গুপ্তের পরবর্তী সকল চরিতকারগণ মুরারি গুপ্তের করচাকেই আদর্শগ্রন্থ বলে মেনে নেন। এর পরে বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবতের অন্ত্যখণ্ডের ১০ম অথবা কোনো কোনো সংস্করণে ১১শ অধ্যায় অবধি রচনা প্রচারিত হতে দেওয়া হলো অবাধে কারণ এই অবধি শ্রীচৈতন্যের তিরোধান নিয়ে কিছু লেখা নেই।
গ্রন্থের পরবর্তী, শেষ ৩টি অধ্যায় আশ্চর্যজনক ভাবে অজ্ঞাত রয়ে গেল যেখানে শ্রীচৈতন্যকে জগন্নাথের মন্দিরে নিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হবার পরে আবার সন্ন্যাসী রূপে গোপীনাথের মন্দিরে গিয়ে সেখানকার বিগ্রহে বিলীন হবার কথা লেখা আছে। ১৯১১ সালে দেনুড় শ্রীপাটের অধিকারী অম্বিকাচকণ ব্রহ্মচারী, দুটি নতুন আবিস্কৃত পুথির সাহায্যে, বৃন্দাবনদাস রচিত "চৈতন্যভাগবতের" অপ্রকাশিত এই তিনটি অধ্যায় প্রকাশ করেন। এই তিনটি অধ্যায় বৃন্দাবনদাস সম্ভবত বেশ কিছুকাল পরে লিখেছিলেন। কারণ এর মাঝে কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত লেখেন বৃন্দাবনে বসেই। তিনি নিজেই জানিয়েছেন যে শ্রীচৈতন্যের শেষ লীলা, বৃন্দাবনদাস বিস্তৃতরূপে লিখে উঠতে পারেননি বলেই নাকি বৃন্দাবনের গোবিন্দ মন্দিরের সেবাধ্যক্ষ হরিদাস পণ্ডিত প্রমুখ বৈষ্ণবগণ, কৃষ্ণদাস কবিরাজের বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে শ্রীচৈতন্যের শেষলীলা সহ জীবনী রচনা করতে আদেশ করেন। তিনি তাঁর চৈতন্যচরিতামৃতের আদিলীলার ১৩শ পরিচ্ছেদে লিখেছেন . . .
অনন্ত চৈতন্য লীলা ক্ষুদ্র জীব হঞা। কে বর্ণিতে পারে তাহা বিস্তার করিঞা॥ সূত্র করি গণে যদি আপনি অনন্ত। সহস্র বদনে ; তবু নাহি পায় অন্ত॥ দামোদর স্বরূপ আর গুপ্ত মুরারি। মখ্য লীলাসূত্র লিখিয়াছে বিচারি॥ সেই অনুসারে লিখি লীলাসূত্রগণ। বিস্তারি বর্ণিয়াছেন তাহা দাস বৃন্দাবন॥ চৈতন্য লীলার ব্যাস বৃন্দাবন দাস। মধুর করিয়া লীলা করিল প্রকাশ॥ গ্রন্থ বিস্তার ভয়ে ছাড়িলা যে যে স্থানে। সেই সেই স্থানে কিছু করিব ব্যাখ্যানে॥ ---জগদীশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত, ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত, কৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত, চৈতন্যচরিতামৃত, ১৩শ পরিচ্ছেদ, ৩১৬-পৃষ্ঠা॥
সুতরাং মনে হয় যে চৈতন্যচরিতামৃত লেখা শেষ হবার পরে কোনও সময়ে বৃন্দাবনদাস পুনরায় তাঁর চৈতন্যভাগবতের অন্ত্যলীলার উপরোক্ত শেষ তিনটে অধ্যায় রচনা করেন। সম্ভবত জগন্নাথে বিলীন হওয়াটাই বৃন্দাবনের গোস্বামীগণ অনুমোদন করেছিলেন বলে, বৃন্দাবনদাসের এই অতিরিক্ত তিনটি অধ্যায়ের পুথিও আশ্চর্যজনক ভাবে লোকসমক্ষে আসে নি। এরপরে কৃষ্ণদাস কবিরাজের "চৈতন্য চরিতামৃত" রচনার পূর্বে আসে জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল, যেখানে শ্রীচৈতন্যের মায়া-শরীর ধরায় পড়ে থাকার কথা আছে। তাই সেটিকেও লোকসমক্ষে আসতে দেওয়া থেকে আটকানো হয়। জয়ানন্দের পরে রচিত হয় লোচন দাসের চৈতন্যমঙ্গল যেখানে সরাসরি জগন্নাথে বিলীন হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। স্বাবাবিক ভাবেই এই গ্রন্থটি বৃন্দাবনের অনুমোদন লাভ করে।
জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে উল্লিখিত বেশ কয়েকটি চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ পাওয়া যায় নি। তাদের মধ্যে রয়েছে গৌরীদাস পণ্ডিত, পরমানন্দ গুপ্ত ও গোপাল বসুর চৈতন্যজীবনীমূলক গ্রন্থ। এই গ্রন্থগুলি হয়তো কালের স্বাভাবিক নিয়মে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে অথবা তাদের অবলুপ্তির পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা আমরা জানি না। যদি তাই দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কি অনমান করা অন্যায় হবে যে সেই গ্রন্থগুলিতে শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের বর্ণনা, যদি থেকে খাকে, তা বৃন্দাবনের গোস্বামীগণদের অনুমোদন-প্রাপ্ত হয়নি!
শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের পর, তাঁর আশ্রয়দাতা রাজা প্রতাপরুদ্র দেব নীলাচল ছেড়ে চলে যান, তাঁর দুই পুত্রকে একে একে হত্যা করা হয়, বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি গোবিন্দ বিদ্যাধর নীলাচলের সিংহাসনে বসে ভোয়ী বংশের রাজত্বকাল শুরু করেন এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রভার শেষ হয়ে অতিবড়ি সম্প্রদায়ের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় নীলাচলে। রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর Chaitanya and His Age গ্রন্থের ২৬৩-পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের পরে পরবর্তী ৫০ বছর গৌড় ও উড়িষ্যায় কীর্তন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বৈষ্ণবদের কথা তেমনভাবে শোনা যায় না। ---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
সুবুদ্ধি মিশ্রের গৃহে শ্রীচৈতন্যের আগমন ও জয়ানন্দের নামকরণ - পাতার উপরে . . . তাঁর নিজের লেখা চৈতন্যমঙ্গলের আদি খণ্ডের ১ম অধ্যায়, বৈরাগ্য খণ্ডের ২৫ অধ্যায়ে ও বিজয়খণ্ডের ৩য় অধ্যায়ে তাঁর নিজের পরিচয় জানাতে গিয়ে তিনি লিখেছেন যে তাঁর পিতা সুবুদ্ধি মিশ্র শ্রীচৈতন্যের কাছে বিদ্যার্থী থাকার সুবাদে, শ্রীচৈতন্য নীলাচল থেকে নবদ্বীপে আসার পথে মধ্যাহ্নভোজের জন্য বর্দ্ধমানের মাঞিপুরা গ্রামে, তাঁদের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেন। এই সময়ে তাঁকে কোলে নিয়েই মাতা শ্রীচৈতন্যের জন্য রন্ধন সম্পন্ন করেন। পূর্বে সুবুদ্ধি ও রোদিনীর একাধিক সন্তান মারা গিয়েছিল বলে তাঁরা তাঁর গুহিয়া নাম রেখেছিলেন। গুহিয়া নামটি বদলে শ্রীচৈতন্যই শিশুর নতুন নাম রাখেন জয়ানন্দ। দুপুরের খাবার খেয়েই শ্রীচৈতন্য পুনঃ নদীয়ার পথে রওনা হয়ে যান।
শুক্লা দ্বাদশী তিথি বৈশাখ মাসে। জয়ানন্দের জন্ম মাতামহ গৃহবাসে॥ গুহিয়া নাম ছিল মাএর মড়াছিয়া বাদে। জয়ানন্দ নাম হৈল চৈতন্য প্রসাদে॥ জয়ানন্দের বাপ সুবুদ্ধি মিশ্র গোসাঞি। পরম ভাগবত উপমা দিতে নাঞি॥ পূর্ব্বে গোসাঞির শিষ্য পুস্তক লিখনে। আপনে চিন্তিএ পড়ে যত শিষ্যগণে॥ বাপ সুবুদ্ধি মিশ্র তপস্যার ফলে। জয়ানন্দের মন হইল চৈতন্যমঙ্গলে॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, আদি খণ্ড, ১ম অধ্যায়, ৩-পৃষ্ঠা॥
বাপ সুবুদ্ধি মিশ্র তপস্যার ফলে। জয়ানন্দের মন প্রকাশে চৈতন্যমঙ্গলে॥ শুক্লা দ্বাদশী তিথি বৈশাখ মাসে। জয়ানন্দের জন্ম হইল সেই দিবসে॥ গুহিয়া নাম ছিল মাএর মড়াছিয়া বাদে। জয়ানন্দ নাম চৈতন্য গোসাঞি প্রসাদে॥ মাতা রোদিনী মোর নিত্যানন্দের দাসী। যার গর্ব্ভে জন্মিঞা চৈতন্যানন্দে ভাসি॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, বৈরাগ্য খণ্ড, ২৫শ অধ্যায়, ১২৮-পৃষ্ঠা॥
ছাড়িয়া দেবশরণ প্রবেশ মন্দারণ . বর্দ্ধমানে দিল দরশন। জ্যৈষ্ঠমাসের তাতে উত্তপ্ত সিকতা পথে . তরুতলে করিল শয়ন॥ বর্দ্ধমান সন্নিকটে ক্ষুদ্র এক গ্রাম বটে . মাঞিপুরা তার নাম। তাহে সুবুদ্ধি মিশ্র গোসাঞির পূর্ব্ব-শিষ্য . তার ঘরে করিল বিশ্রাম॥ তাহার নন্দন গুহিয়া জয়ানন্দ নাম থুয়া . রোদনী রান্ধিল তার লঞা। রোদনী-ভোজন করি চলিলা নদীয়া পুরী . বায়ড়াএ উত্তরিলা গিয়া॥ আশ্চর্য্য বিজয়খণ্ড কেবল অমৃতকুণ্ড . কর্ণরন্ধ্রে জগজন পিএ। চৈতন্যপদারবিন্দ সুধাময় মকরন্দ . জয়ানন্দ সেই আসে জিএ॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, বিজয় খণ্ড, ৩য় অধ্যায়, ২১৯-পৃষ্ঠা॥
জয়ানন্দের পিতৃগৃহে শ্রীচৈতন্যের আগমন কোন পথে? - পাতার উপরে . . . শ্রীচৈতন্যর জয়ানন্দের পিতৃগৃহে আগমন নিলাচল থেকে গৌড়ে যাওয়ার পথে হয়েছিল না কি নদীয়া থেকে নীলাচল যাবার পথে হয়েছিল? আমরা জানি যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, জয়ানন্দের শৈশবে, মাঞিপুরায় তাঁর পিতা সুবুদ্ধি মিশ্রর গৃহে একদিন মধ্যাহ্ন ভোজন করার জন্য থেমেছিলেন। সেই সময় তিনি ছাত্র সুবুদ্ধি মিশ্রের পুত্রের নাম গুহিয়া বদলে জয়ানন্দ রাখেন। জয়ানন্দ লিখেছেন যে তিনি নীলাচল থেকে গৌড়ে যাবার পথে বর্দ্ধমানের নিকটে তাঁদের গ্রাম মাঞিপুরায় আসেন। কিন্তু বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত “শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান” গ্রন্থের ২২৩-পৃষ্ঠায় জানিয়েছেন যে তাঁর মতে জয়ানন্দ গৌড় থেকে নীলাচলে যাবার পথে মাঞিপুরায় থেমেছিলেন।
জয়ানন্দের মতে শ্রীচৈতন্যের পূর্বপুরুষের আদিনিবাস উড়িস্যার জাজপুরে - পাতার উপরে . . . জয়ানন্দ তাঁর শ্রীচৈতন্যমঙ্গলের উত্কল খণ্ডে জানিয়েছেন যে শ্রীচৈতন্যের পূর্বপুরুষ উড়িষ্যার জাজপুরের বাসিন্দা ছিলেন এবং সেখানকার রাজা ভ্রমরের ভয়ে শ্রীহট্টে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এই তথ্য আর কোনও শ্রীচৈতন্যের জীবনী গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। নীলাচলের ভ্রমর উপাধীধারী রাজা ছিলেন কপিলেন্দ্রদেব যার রাজত্বকাল ছিল আনুমানিক ১৮৩৪-৬৭। কপিলেন্দ্রদেব ছিলেন শ্রীচৈতন্যের সান্নিধ্যে আসা নীলাচলের রাজা প্রতাপরুদ্র দেব এর পিতামহ।
চৈতন্য গোসাঞির পূর্ব্ব পুরুষ . আছিলা জাজপুরে। শ্রীহট্ট দেশেরে পালাইয়া গেল , রাজা ভ্রমরের ডরে॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, উত্কল খণ্ড, ১৪৪-পৃষ্ঠা॥
এই আলোচনা করতে গিয়ে বিমানবিহারী মুখোপাধ্যায় ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” গ্রন্থের “ভুমিকার সংক্ষিপ্তসার”-এর xlvl-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“জয়ানন্দের মতে চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষদের নিবাস ছিল উড়িস্যার যাজপুরে, রাজা ভ্রমরের ভয়ে তাঁরা দেশত্যাগ করেছিলেন। ভ্রমর -উপাধিধারী কপিলেন্দ্রদেব (রাজত্বকাল আঃ ১৪৩৪-৬৭ খ্রীঃ) চৈতন্যদেবের সামান্য পূর্ববর্তী। পঞ্চাস বছরেরও কম সময়ে চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষদের যাজপুর থেকে শ্রীহট্ট, শ্রীহট্ট থেকে নবদ্বীপে বাস পরিবর্তন অবিশ্বাস্য ব্যাপার। মুরারি গুপ্তের গ্রন্থে লেখা আছে , ‘চৈতন্যদেব পাশ্চাত্য বৈদিক শ্রেণী’ভুক্ত ব্রাহ্মণ ছিলেন ; উড়িয়া ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই শ্রেণীর অস্তিত্ব নেই। তাই চৈতন্যদেবের পূর্বপুরুষরা উড়িয়া ছিলেন বলে স্বীকার করা যায় না।”
শ্রীচৈতন্যের পিতা জগন্নাথ মিশ্রের ধর্মাবলম্বন - পাতার উপরে . . . জয়ানন্দ শ্রীচৈতন্যের পিতা জগন্নাথ মিশ্রকে পরম নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব রূপে দেখিয়েছেন। এবং তাঁর অপর এক নাম পুরন্দর মিশ্র ছিল বলে জানিয়েছেন . . .
মুরারি গুপ্তও জগন্নাথ মিশ্রকে ১ম প্রক্রমের ১ম সর্গের ২৪ সংখ্যক শ্লোকে (৬-পৃষ্ঠা) বৈষ্ণব দেখিয়েছেন। আবার ১ম প্রক্রমের ৮ম সর্গের ১৬ ও ১৭ সংখ্যক শ্লোকে (৩৯-পৃষ্ঠা) মৃত্যু-পথযাত্রী জগন্নাথ মিশ্রকে রঘুনাথের ভক্ত হিসেবে দেখিয়েছেন . . .
বঙ্গানুবাদঃ (২৪) আবার সেই ধামে দ্বিজকুল-সমুদ্রের চন্দ্রসদৃশ জগন্নাথও বাস করিতেন। তিনি বেদাচার্য্য, সকলগুণময় ও বৃহস্পতিসম ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের চরণকমল ধ্যানের প্রবলতর যোগযুক্ত মনে তিনি পবিত্র ও প্রেমাপ্লুত ছিলেন এবং নবীন চন্দ্রকালাবৎ শীঘ্রই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতেছিলেন।
বঙ্গানুবাদঃ (১৭) তিনি পুত্রের এই বাক্যামৃত শ্রবণপুটে পান করিয়া আদরের সহিত বলিলেন---“বত্স! তোমাকে আমি শ্রীরঘুনাথের পাদপদ্মেই সম্যক্প্রকারে সমর্পণ করিলাম।”
পূর্ব চৈতন্যজীবনীকারগণের উল্লেখ ও গোবিন্দ কর্মকার - পাতার উপরে . . . জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে তিনি তাঁর পূর্বের বহু কবিদের, এবং চৈতন্যজীবনীকারদের উল্লেখ করে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। চৈতন্যজীবনীকারদের মধ্যে তিনি বৃন্দাবনদাস, গৌরীদাস পণ্ডিত, পরমানন্দ গুপ্ত, গোপাল বসুর উল্লেখ করেছেন। এঁদের মধ্যে সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যর চৈতন্যচরিত্র, গৌরীদাস পণ্ডিতের সঙ্গীত প্রবন্ধ, পরমানন্দ গুপ্তের গৌরাঙ্গবিজয় ও গোপাল বসুর চৈতন্যমঙ্গল পাওয়া যায় নি। জয়ানন্দ তাঁর চৈতন্যমঙ্গলের, আদি খণ্ডে লিখেছেন . . .
“অনন্ত চরিত্র প্রভুর অনন্ত মহিমা। অনন্ত সেবক গুণ অনন্ত গরিমা॥ অচিন্ত্য অনন্ত রূপ অনন্তাবতার। অনন্ত কবীন্দ্রে গাএ গরিমা যাহার॥ রামায়ণ কহিল বাল্মীকি মহাকবি। পাঁচালি করিল কৃত্তিবাস অনুভবি॥ শ্রীভাগবত কৈল ব্যাস মহাশয়। গুণরাজ খান কৈল শ্রীকৃষ্ণবিজয়॥ জয়দেব বিদ্যাপতি আর চণ্ডীদাস। কৃষ্ণের চরিত্র তারা করিল প্রকাশ॥ সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য ব্যাস অবতার। চৈতন্য চরিত্র আগে করিল প্রচার॥ চৈতন্য সহস্র নাম শ্লোক প্রবন্ধে। সার্ব্বভৌম রচিল কেবল প্রেমানন্দে॥ পরমানন্দ পুরী গোসাঞি মহাশয়। সংক্ষেপে করিলেন তিহোঁ গোবিন্দবিজয়@॥ আদিখণ্ড মধ্যখণ্ড শেষখণ্ড করি। বৃন্দাবনদাস প্রচারিল সর্ব্বোপরি॥ গৌরীদাস পণ্ডিতের কবিত্ব সুশ্রেণী। সঙ্গীত প্রবন্ধে তার পদে পদে ধ্বনি॥ সংক্ষেপে করিলে অতি পরমানন্দ গুপ্ত। গৌরাঙ্গবিজয় গীত শুনিতে অদ্ভুত॥ গোপাল বসু করিলেন গীতত প্রবন্ধে। চৈতন্যমঙ্গল তারা চামর বিছন্দে॥ ইবে শব্দ চামর সঙ্গীত বাদ্যরসে। জয়ানন্দ চৈতন্যমঙ্গল গাএ শেষে॥ আর যত যত কবি জন্মিল আপারে। চৈতন্যমঙ্গল তারা করিল প্রচারে॥” ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, আদি খণ্ড, ৪- পৃষ্ঠা॥ @ - নগেন্দ্রনাথ বসু সম্পাদিত গ্রন্থে “গোবিন্দবিজয়” রয়েছে।
জয়ানন্দ সংস্কৃতে রচিত মুরারি গুপ্তের কড়চা, কবিকর্ণপূরের শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটক, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত মহাকাব্য ও গৌরগণোদ্দেশদীপিকার উল্লেখ করেন নি। সম্ভবত তিনি সেই সব গ্রন্থ তাঁর এই গ্রন্থ রচনার কালে হাতে পান নি। তিনি গোবিন্দদাসের কড়চার উল্লেখ না করলেও, গোবিন্দ কর্মকারের উল্লেখ করেছেন বৈরাগ্য খণ্ডের ২৪শ অধ্যায়ে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষতের ২২৪১ নং পুথিতে (বৈরাগ্যখণ্ড) “গোবিন্দ”-এর বদলে “মুকুন্দ” রয়েছে।
জগন্নাথ মিশ্রের আর্থিক অবস্থার ভুল ব্যাখ্যা করেন নি জয়ানন্দ - পাতার উপরে . . . বৃন্দাবনদাসের বর্ণনায় শ্রীচৈতন্যের পিতা জগন্নাথ মিশ্র ধনী ব্যক্তি ছিলেন না। শ্রীচৈতন্যের জন্মের পরে মাতামহ নীলাম্বর চক্রবর্তী তাঁর কোষ্ঠী গণনা করে তাঁর অতি উত্তম ভবিষ্যতের থা বলার পরে পিতা জগন্নাথের অবস্থা যেরূপে ব্যক্ত করেছেন বৃন্দাবনদাস, তাতে জগন্নাথ মিশ্রকে দরিদ্রই বলা হয়েছে . . .
বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর “চৈতন্যচরিতের উপাদন” গ্রন্থের ২৩১-পৃষ্ঠায়, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের নদীয়া খণ্ডের ৩য় অধ্যায়, ১৩-পৃষ্ঠা থেকে একটি কলি উদ্ধৃত করে লিখেছেন যে জয়ানন্দ বলেছেন যে জগন্নাথ মিশ্র ধনী ব্যক্তি ছিলেন . . .
“জয়ানন্দ জগন্নাথ মিশ্রকে খুব বড়লোক করিয়া আঁকিয়াছেন ; যথা--- লিখিতে না পারি দাস দাসী যত . মিশ্রের মন্দিরে খাটে।---পৃ. ১০ তাঁহার মতে নিমাইয়ের গায়ে “মণিমুক্তা প্রবালহার” ছিল (পৃ. ১৯)। মুরারি গুপ্ত দাসদাসী বা ঐশ্বর্য্যের কথা কিছুই লেখেন নাই।”
এর পরে তিনি বৃন্দাবনদাসের উপরোক্ত কলিটি উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে জয়ানন্দ আসলে ভুল তথ্য দিয়েছেন, জগন্নাথ মিশ্রকে ধনী দেখিয়ে।
আমরা এখানে বলতে চাই যে উপরোক্ত জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের প্রথম কলিটি আসলে বর্ধিষ্ণু নদীয়া নগরীর বর্ণনা করা “নানা চিত্রে ধাতু বিচিত্র নগরী” শিরোনামের পদের একটি কলি ব্যতীত অন্য কিছু নয়। পদটি মিলনসাগরে কবি জয়ানন্দের পদাবলীর পাতায় সম্পূর্ণ রূপে দেওয়া রয়েছে। এই অধ্যায়ে জয়ানন্দ কেবল নদীয়া নগরের বন্দনা করেছেন। উক্ত “মিশ্রের মন্দিরে” কথাটি আসলে এখানে বেমানান লাগছে। অপর একটি পুথিতে” ( D পুথিতে, অর্থাৎ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬৩৬ নং পুথি ) “মিশ্রের মন্দিরে” কথাটি “প্রেমের মন্দিরে” দেওয়া আছে, যা তাঁরই সম্পাদিত গ্রন্থের পাদটীকায় উল্লিখিত রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কলিটির যা অর্থ দাঁড়ায় তা নগরেরই বর্ণনা ছাড়া অন্য কিছু নয়। D পুথির ভাষ্য ধরলে কলিটি দাঁড়ায় . . .
লিখিতে না পারি দাস দাসী যত . প্রেমের মন্দিরে খাটে।
“মিশ্র” শব্দটি ঐ গ্রন্থে আরও কয়েক জায়গায় ভুল মুদ্রিত হয়েছে। সুখময় মুখোপাধ্যায়ও তাঁর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম” গ্রন্থের ১০৩-পৃষ্ঠার পাদটীকায় লিখেছেন -
“এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে দু’এক জায়গায় ছাপার ভুলে “মিশ্র গোসাঞি” র জায়গায় “মিত্র গোসাঞি” মুদ্রিত হয়েছে।” এই গ্রন্থের সহসম্পাদনা করেছিলেন তিনি নিজেই, বিমানবিহারী মজুমদারের সঙ্গে।
এই পদটিতে জয়ানন্দ বালক শ্রীচৈতন্যকে বালক কৃষ্ণের আদলে দেখাতে চেয়েছেন। কৃষ্ণের মতো সুন্দর, কৃষ্ণের মতো নিডর ও ডানপিটে, কৃষ্ণের মতো ঐশ্বরিক। এই পদটিও মিলনসাগরে কবি জয়ানন্দের পদাবলীর পাতায় সম্পূর্ণ রূপে দেওয়া রয়েছে। এই পদটির ঠিক পূর্বের “পাটের ধড়া বিচিত্র চূড়া” পদটিও একই ভাবনা থেকে রচিত। এই পদটিতে অবশ্য আভরণের বর্ণনায় কোনও মণিমাণিক্য নেই। আমরা মনে করছি এখানে কবি, শ্রীচৈতন্যকে বালক কৃষ্ণের আদলে দেখাতে এভাবে বর্ণনা করেছেন। এটাকে শ্রীচৈতন্যের পিতা জগন্নাথ মিশ্রকে ধনবান দেখাবার কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা হয় নি। ---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
জয়ানন্দই সঠিক বলেছেন শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথিতে চন্দ্রগ্রহণ পূর্ণগ্রাস ছিল - পাতার উপরে . . . শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম তিথির রাতে যে চন্দ্রগ্রহণ হয়েছিল তা অনেক চরিতকার উল্লেখ করলেও তাঁরা সঠিকভাবে জানাননি যে তা আংশিক ছিল না পূর্ণগ্রাস ছিল। একমাত্র জয়ানন্দই সঠিকভাবে লিখেছেন যে সেদিন পূর্ণগ্রাস হয়েছিল।
প্রথমে প্রভুর জন্ম কর্ম্ম সুপ্রকাশ। ফাল্গুন মাসে রাহু চন্দ্রে সর্ব্বগ্রাস॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”, উত্তর খণ্ড, প্রথম দুটি কলি, ২২৭-পৃষ্ঠা॥
যুগান্তর পত্রিকার ৮ই মার্চ ১৯৫৫ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মকুণ্ডলী প্রবন্ধে তিনি জানিয়েছিলেন যে জ্যোতিষ-গণনার ফলে নিশ্চিতভাবে জানা গিয়েছে যে ঐ দিন সর্বগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হয়েছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা NASA-র ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে জয়ানন্দের দেওয়া তথ্য মিলে যাচ্ছে। তাঁদের হিসেব অনুযায়ী ১৮ই ফেব্রুয়ারী ১৪৮৬ খৃষ্টাব্দে নবদ্বীপের ( ২৩° ৪০´ অক্ষাংশ, ৮৮° ৩৬´ দ্রাঘিমাংশ ) উপরে একটি পূর্ণগ্রাস (Total Eclipse) চন্দ্রগ্রহণ দেখা গিয়েছিল। গ্রহণ শুরু হয় সন্ধ্যা ০৮:৩৪ ঘটিকায় এবং শেষ হয় রাত্রি ০০:০৩ ঘটিকায় অর্থাৎ মধ্যরাত্রির তিন মিনিট পরে। এর মধ্যে পূর্ণগ্রাসের সময়কাল ছিল রাত্রি ০৯:৪৯ ঘটিকা থেকে রাত্রি ১০:৪৭ ঘটিকা। আমরা সেই ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া, কেবল শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথি ১৮ই ফেব্রুয়ারী ১৪৮৬ তারিখের পূর্ণচন্দ্রগ্রহণের তথ্যের চার্টটি এখানে তুলে ধরছি, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাম ইংরেজীতে যোগ করে।
জয়ানন্দের দেওয়া শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের নতুন তথ্য ও সঠিক তিথি - পাতার উপরে . . . বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবতের প্রচলিত সংস্করণগুলিতে অন্ত্যখণ্ডে কেবল ১১টি অধ্যায় রয়েছে (কোনটিতে ১০টি)। সেখানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর তিরোধানের বিষয়ে কোনও কথা লেখা নেই। গ্রন্থটি পড়েই মনে হয় যে তা অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
১৯১১ সালে দেনুড় শ্রীপাটের অধিকারী অম্বিকাচকণ ব্রহ্মচারী, দুটি নতুন আবিস্কৃত পুথির সাহায্যে, বৃন্দাবনদাস রচিত চৈতন্যভাগবতের অপ্রকাশিত, অন্ত্যখণ্ডের ৩টি অজ্ঞাতপূর্ব অধ্যায় (১২, ১৩ ও ১৪ অধ্যায়) নিয়ে “চৈতন্যভাগবতের অপ্রকাশিত অধ্যায়ত্রয়” নামে গ্রন্থাকারে মুদ্রিত করে প্রকাশিত করেন। তার ১৪শ অধ্যায়ে, শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান কাহিনী বর্ণিত রয়েছে। গ্রন্থটি আমরা হাতে পাই নি। যুধিষ্ঠির জানা ওরফে মালীবুড়ো তাঁর ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত, “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য” গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট অংশ উদ্ধৃত করেছেন। আমরা সেই গ্রন্থের ২০-২২পৃষ্ঠা থেকে তা এখানে তুলে দিচ্ছি। এই অংশের যুধিষ্ঠির জানার মুখবন্ধটি রেখে দিয়ে, আর তাঁর কোনও ব্যাখ্যা না রেখে বৃন্দাবনদাসের পয়ার উদ্ধৃত করছি . . .
"বৃন্দাবন ভ্রমণ শেষ করে রূপ-সনাতকে বৃন্দাবনের অধিকারী করে প্রভু ফিরে এলেন নীলাচলে। সঙ্গে গদাধর পণ্ডিত। যে সব দেশের মধ্য দিয়া মহাপ্রভু হেঁটে হেঁটে চললেন, সর্বত্র অকাতরে বিলালেন হরিনাম। প্রেমে আর ভক্তিতে বিভোর হয়ে জনপদবাসী সকলে হরিগুণগানে মত্ত হলো। শ্রীচৈতন্যের হরিনাম প্রচারিত হলো দেশে দেশে।" . . .
“নীলাচলে এসে একদিন নির্জনে পণ্ডিত গদাধরকে ডেকে বললেন মহাপ্রভু--- --- --- --- --- --- --- --- --- আমার মানস পূর্ণ হৈল এতদিনে॥ গৃহস্থ সন্ন্যাসী-দস্যু হিংসক যত জন। কুলের বউহারী সুখী দুখী অকিঞ্চন॥ সর্বজন হরিনাম বলে-শুনে-গায়। হরিনামে পরিণামে তরিব হেলায়॥ ইহা যদি বুঝিলেক সর্ব জীবগণ। তবে আর মোর এথা নাহি প্রয়োজন॥ --- --- --- --- --- --- --- --- গদাধরে বোলে প্রভু---শুন গদাধর॥ আমি আগে যাই তুমি আসিহ পশ্চাতে। এত বলি শ্রীদেউলে প্রবেশ কৈল নাথে॥ পরিছা বোলে---কোথা যাহ বলহ সন্ন্যাসী। প্রভু কহে---জগন্নাথ পরশিয়া আসি॥ রহ রহ---বোলে সভে বেত্র লয় করে। নিষেধ না শুনি প্রভু চলিলা ভিতরে॥ জগন্নাথ পরশিয়া হৈলা অন্তর্ধান। দেখিতে না পায় প্রভু গেলা নিজ স্থান॥ সর্বলোকে বোলে---ভাই! ন্যাসী নহে এই। অনুমানে জানিলাঙ চৈতন্য-গোসাঞী॥ কেহ বোলে---সন্ন্যাসী হৈল অন্তর্ধান। নিশ্চয় জানিল সভে প্রভু ভগবান॥ এই রূপে গৌরচন্দ্র হৈল অন্তর্ধান। --- --- --- --- --- --- --- --- আচম্বিতে গদাধর হৈল অন্তর্ধান। না পায় দেখিতে কেহ বোলে---রাম রাম॥ এই মতে মহাপ্রভু গদাধর লৈয়া। নিজ স্থানে গেল প্রভু অন্তর্ধান হৈয়া॥ --- --- --- --- --- --- --- --- এথা সে যখন প্রভু হৈলা অন্তর্ধান। ন্যাসী রূপে গেলা মদনগোপালের স্থান॥ অধিকারী সকল দেখি তানে যাইতে। পুনঃ কোথা গেল প্রভু না পারে লখিতে॥ সেই দিন বৈশাখ পূর্ণিমা ত্রয়েদশী। পাঠাইলা মনুষ্য পত্র লিখি সভে বসি॥ আসি উত্তরিলা লোক নীলাচল স্থানে। প্রভুর বিজয় জিজ্ঞাসিলা জনে জনে॥ সভে বলে---মহাপ্রভু হৈলা অন্তর্ধান। প্রবেশ করিলা মাত্র জগন্নাথ স্থান॥ তান সঙ্গে ছিলা গদাধর মহাশয়। আচম্বিতে অন্তর্ধান হৈলা নিশ্চয়॥ --- --- --- --- --- --- --- --- আসি উত্তরিলা তারা শ্রীবৃন্দাবন॥ (মোহন্ত ও ভক্তগণ নীলাচলের প্রতি একটা অস্রদ্ধা নিয়ে) নিশ্চয় বিজয় প্রভু কৈলা গৌরহরি। শুনি রূপ-সনাতন মূর্ছা হই পড়ি॥ যথা যথা ছিল ভক্ত দাস অনুরক্ত। প্রভুর বিজয় সভাকারে হৈল ব্যক্ত॥” ---চৈতন্যভাগবত, পরিশিষ্ট, ১৪শ অধ্যায়॥
এখানে শ্রীচৈতন্য জগন্নাথের মন্দিরে অন্তর্ধান হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু “ন্যাসী রূপে গেলা মদনগোপালের স্থান” অর্থাৎ তিনি ঠিক জগন্নাথে বিলীন হচ্ছেন না।
এখানে তো শ্রীচৈতন্য, জগন্নাথের মন্দিরে অন্তর্ধান হচ্ছেনই না। উপরন্তু বৈকুণ্ঠে যাত্রা “গরুড়ধ্বজ রথে করিল আরোহণ” করা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মত “মায়া-শরীর থাকিল ভূমে পড়ি”। যা প্রচলিত জগন্নাথে বিলীন হওয়ার সঙ্গে মিলছে না।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’র অন্ত্যলীলার অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ থেকে অনেকে অনুমান করেন যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবোন্মাদ অবস্থায় সমুদ্রে পতনের ফলে মৃত্যু হয়। যদিও গ্রন্থে, সেখান থেকে তিনি ফিরে আসেন এবং সম্পূর্ণ চৈতন্যলাভ করেন। আমরা তাই কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত থেকে কোনও উদ্ধৃতি দিলাম না।
ষোলশ শতকের শেষার্ধে রচিত, লোচন দাসের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’ আমরা পাই জগন্নাথ মন্দিরে, জগন্নাথের দারুময় দেহে লীন হবার বর্ণনা। কিন্তু তা জয়ানন্দের অনেক পরের রচনা। লোচনদাস লিখেছেন . . .
হেনকালে মহাপ্রভু কাশীমিশ্র-ঘরে। বৃন্দাবনকথা কহে ব্যথিত অন্তরে॥ নিশ্বাস ছাড়িয়া সে বলিলা মহাপ্রভু। এ মত ভকত সঙ্গে নাহি দেখ কভু॥ সম্ভ্রমে উঠিয়া জগন্নাথ দেখিবারে। ক্রমে ক্রমে গিয়া উত্তরিলা সিংহদ্বারে॥ সঙ্গে নিজজন যত তেমতি চলিল। সত্বরে চলিয়া গেল মন্দির ভিতর॥ নিরখে বদন প্রভু দেখিতে না পায়। সেই খানে মনে প্রভু চিন্তিল উপায়॥ তখনে দুয়ারে নিজ লাগিল কপাট। সত্বরে চলিয়া গেল অন্তরে উচাট॥ আষাঢ় মাসের তিথি সপ্তমী দিবসে। নিবেদন করে প্রভু ছাড়িয়া নিশ্বাসে॥ সত্য ত্রেতা দ্বাপর সে কলিযুগ আর। বিশেষতঃ কলিযুগে সঙ্কীর্ত্তন সার॥ কৃপা কর জগন্নাথ পতিত-পাবন। কলিযুগ আইল এই দেহ ত শরণ॥ এ বোল বলিয়া সেই ত্রিজগৎ-রায়। বাহু ভিড়ি আলিঙ্গন তুলিল হিয়ায়॥ তৃতীয় প্রহর বেলা রবিবার দিনে। জগন্নাথে লীন প্রভু হইলা আপনে॥ গুঞ্জাবাড়ীতে ছিল পাণ্ডা যে ব্রাহ্মণ। কি কি বলি সত্বরে সে আইল তখন॥ বিপ্রে দেখি ভক্ত কহে শুনহ পড়িছা। ঘুচাহ কপাট প্রভু দেখি বড় ইচ্ছা॥ ভক্ত-আর্ত্তী দেখি পড়িছা কহয়ে কথন। গুঞ্জাবাড়ীর মধ্যে প্রভুর হৈল অদর্শন॥ সাক্ষাতে দেখিল গৌর প্রভুর মিলন। নিশ্চয় করিয়া কহি শুন সর্ব্বজন॥ এ বোল শুনিঞা ভক্ত করে হাহাকার। শ্রীমুখ-চন্দ্রিমা প্রভুর না দেখিব আর॥ ---রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত লোচনদাস কর্ত্তৃক বিরচিত “চৈতন্য-মঙ্গল”, শেষ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৩৯॥
লোচনদাসের এই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জগন্নাথের দারুময় মূর্তিতে বিলীন হয়ে যাওয়ার বর্ণনাটিই সত্য বলে প্রচলিত হয়ে এসেছে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে।
শ্রীহট্টে শ্রীচন্যের পিতা জগন্নাথ মিশ্রের আদি গ্রাম জয়পুর - পাতার উপরে . . . জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থের নদীয়া খণ্ড, ২য় অধ্যায়ে রয়েছে যে শ্রীচৈতন্যের পিতৃপুরুষের শ্রীহট্টের আদি নিবাস ছিল সেখানকার জয়পুর গ্রামে এবং সে দেশে অনাচার ও দুর্ভিক্যের কারণে পিতা জগন্নাথ মিশ্র ও নীলাম্বর চক্রবর্তী নবদ্বীপে চলে আসেন।
শ্রীহট্ট দেশে অনাচার দুর্ভিক্ষ জন্মিল। ডাকা চুরি অনাবৃষ্টি মড়ক লাগিল॥ উচ্ছন্ন হইল দেশ অরিষ্ট দেখিয়া। নানা দেশে সর্ব্বলোক গেল পলাইয়া॥ নীলাম্বর চক্রবর্ত্তী মিশ্র জগন্নাথে। সবান্ধবে জয়পুর ছাড়িল উত্পাতে॥ কোন দেশে রহিব সভার অনুমান। এ দেশে না পাব রক্ষা চল অন্যস্থান॥ আমা সভার বসতি যোগ্য গঙ্গার কূলে। নন্দ যেন উত্পাতে ছাড়িলেন গোকুলে॥ পূর্ব্বে মোরে কয়্যাছিল এক যতিরাজ। এ দেশ ছাড়িয়া যাহ নদীয়া সমাঝ॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল, নদীয়া খণ্ড, ২য় অধ্যায়, ১০-পৃষ্ঠা॥
"জয়ানন্দের চৈতন্য-মঙ্গল একখানি প্রামাণিক গ্রন্থ। কতগুলি বিষয়ে বৈষ্ণব ইতিহাস সম্বন্ধে তাঁহার মত প্রচলিত মত হইতে স্বতন্ত্র। প্রচলিত মত জগন্নাথ মিশ্রের পূর্ব্বনিবাসস্থান শ্রীহট্টস্থ ঢাকা দক্ষিণ গ্রাম, কিন্তুআনন্দের মতে উহা শ্রীহট্টস্থ জয়পুর গ্রাম।" ---রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন রচিত, “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” ৬ষ্ঠ সংস্করণ, চরিত-শাখা, (খ) জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল, ৩১৮-পৃষ্ঠা॥
জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের বৃন্দাবনের ভৌগোলিক বর্ণনাই লঠিক - পাতার উপরে . . . বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে জয়ানন্দ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা ভালভাবে ভ্রমণ করে থাকলেও ভারতবর্ষের অন্যত্র তিনি হয়তো যাননি, বিশেষ করে বৃন্দাবনে। বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত “শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান” গ্রন্থে জয়ানন্দ লিখিত শ্রীচৈতন্যের তীর্থ ভ্রমণ-পথের কথা লিখতে গিয়ে তিনি লিখেছেন . . .
“জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে শ্রীচৈতন্যের ভ্রমণপথের যেরূপ বিস্তৃত বর্ণনা আছে, এমন আর অন্য কোন চরিত- গ্রন্থে নাই। জয়ানন্দ-বর্ণিত পথেই শ্রীচৈতন্য ভ্রমণ করিয়াছিলেন কি না বলা কঠিন ; তবে ষোড়শ শতাব্দীতে ঐ পথ ছিল এবং লোক উহাতে যাতায়াত করিত এই তথ্য জয়ানন্দ হইতে পাওয়া যায়।” (পৃষ্ঠা-২৪১)
এর পর (ক) নবদ্বীপ থেকে গয়া, (খ) কাটোয়া থেকে শান্তিপুর, (গ) শান্তিপুর থেকে পুরীর বিস্তৃত বর্ণনা দেবার পরে পুরী থেকে বৃন্দাবন যাত্রার সম্বন্ধে বিমানবিহারী মুখোপাধ্যায় লিখেছেন . . .
“(ঘ) পুরী হইতে বৃন্দাবন--- এই পথের কোন বিস্তৃত বিবরণ জয়ানন্দ দেন নাই। তিনি শুধু লিখিয়াছেন যে শ্রীচৈতন্য অযোধ্যা হইতে দক্ষিণাভিমুখে যাইয়া মথুরায় পৌঁছাইলেন (পৃ ১৩৬ ও ১৪৯)। জয়ানন্দের লিখিত তীর্থপথের বিবরণ পড়িয়া মনে হয়, তিনি নিজে পশ্চিমে গয়া পর্য্যন্ত ও দক্ষিণে পুরী পর্য্যন্ত ভ্রমণ করিয়াছিলেন। তিনি যে- সকল অখ্যাত গ্রামের নাম করিয়াছেন, তাহা এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ফল।”
১৯৬৭ সালের প্রকাশিত নীলরতন সেনের “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থের ৩৭৫-পৃষ্ঠায় জয়ানন্দের দেওয়া শ্রীচৈতন্যের যাত্রাপথ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে লিখেছেন . . .
“. . . জয়ানন্দের গ্রন্থে চৈতন্যের নবদ্বীপ থেকে গয়া, কাটোয়া থেকে শান্তিপুর, শান্তিপুর থেকে পুরী এবং পুরী থেকে বারানসী যাত্রা-পথের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। এই বর্ণনা অন্যান্য চরিতকারদের সঙ্গে প্রদত্ত বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। তবে সে যুগে যাতায়াতের এই পথগুলি চালু ছিল অনুমান করা চলে।”
বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায়ের সহ-সম্পাদনায় ১৯৭০ সালে প্রকাশিত, “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল” গ্রন্থের ভুমিকার সংক্ষিপ্তসার xli-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“জয়ানন্দ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিভিন্ন পথের যেরকম বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন, তার থেকে মনে হয়, এই তিনটি রাজ্যে তিনি খুব বেশি ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই গয়া ও পুরীতে গিয়েছিলেন, কারণ ঐ দুই তীর্থস্থানের মন্দিরগুলির তিনি বিস্তৃত ও নিখুঁত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে তিনি নিশ্চয়ই যান নি এই সব স্থানের বিবরণ দেবার সময় তিনি ভুল কথা লিখেছেন।”
সুখময় মুখোপাধ্যায় তাঁর ১৯৭৪ সালে প্রংকাশিত, “মধ্যযুগের সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম” গ্রন্থের ১০৪- পৃষ্ঠায় এই বিষয়ে লিখেছেন . . .
“জয়ানন্দ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার অনেক স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই, কারণ ঐ তিন অঞ্চলের পথ-ঘাটের খুব বিস্তৃত ও নিখুঁত বর্ণনা তাঁর গ্রন্থে পাওয়া যায়। জয়ানন্দ গয়া ও পুরীর মন্দির ও পুত স্থানগুলির বিশদ ও সঠিক বর্ণনা দিয়েছেন, এর থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে তিনি ঐ দুই তীর্খক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। বৃন্দাবনে সম্ভবত তিনি যান নি, কারণ বৈরাগ্যখণ্ডে ধ্রুবের কাহিনী লিপিবদ্ধ করার সময় তিনি লিখেছে যে যমুনার তীরে বংশীবটের পাশে একটি পর্বত আছে ; কিন্তু বংশীবটের নিকটতম পর্বত গোবর্ধন বংশীবট থেকে প্রায় কুড়ি মাইল দূরে অবস্থিত ; বৃন্দাবনে গেলে জয়ানন্দ এরকম লিখতেন না।”
সুখময় মুখোপাধ্যায় ঠিক কথাই লিখেছেন যে বর্তমানে বংশীবটের নিকটতম পর্বত গোবর্ধন যমুনার নিকট অবস্থিত বংশীবট থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে। তিনি ১৯৭৪ সালে লিখেছিলেন এ কথা, অর্থাৎ বর্তমান সময়কালে। ৫০০বছর পূর্বে জয়ানন্দ ও শ্রীচৈতন্যের যুগে যমুনা নদী গোবর্ধন পর্বতের পূর্বদিক দিয়ে তার নিকট দিয়েই প্রবাহিত হতো। ভৌগোলিক সক্রিয়তা ও পলি জমার প্রভাবে, যমুনা নদীর পথ পূর্বদিকে সরে গিয়ে বর্তমানে, গোবর্ধন পর্বতের প্রায় ২০-২৫ কিমি দূর দিয়ে বয়ে চলেছে।
Geological Survey of India-র পত্রিকা “Journal Geological Society of India”-র সেপ্টেম্বর ১৯৮০ সংখ্যায় প্রকাশিত পি.সি. বাকলিওয়াল ও এস.বি. শর্মা তাঁদের “On the migration of the River Yamuna” প্রবন্ধটিতে বিগত ৫০০বছর ধরে যমুনা নদীর পথ পরিবর্তন হয়ে চলার বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁরা সেই প্রবন্ধের শুরুতে দেওয়া Abstract এ লিখেছেন . . .
“The history of migration of river Yamuna over a period of about 500 years is traced. Migration is generally towards the east and its extent varies from 10 km to about 40 km. Accretion of sediments is considered to be the principal cause of migration.”
এই প্রবন্ধে তাঁরা দেখিয়েছেন যে যমুনা নদী, উপরোক্ত ৫০০ বছরের সময়কালের মধ্যে কীভাবে ১০ থেকে ৪০ কিমিঃ পূর্বদিকে সরে এসেছে। জয়ানন্দ এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনকালও আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বেরই। উপরোক্ত বৈজ্ঞানিকদ্বয়ের প্রবন্ধে দেওয়া মানচিত্রে দেখানো হয়েছে যে সেই সময়ে যমুনা গোবর্ধন পর্বতের নিকটে পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং বর্তমানে যমুনা প্রায় ২০ থেকে ৩০ কিমিঃ দূর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। তাঁদের এই গবেষণায় তাঁরা কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা Landsat MSS Imagery এর সঙ্গে Aerial Photographs ব্যবহার করেছিলেন। এই মানচিত্র সহ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . . http://www.geosocindia.org/index.php/jgsi/article/download/64849/50693
সুতরাং জয়ানন্দের বৃন্দাবনের বর্ণনা অর্থাৎ “বংশীবট নিকটে পর্ব্বতগুহাতলে। ডুবিয়া রহিল ধ্রুব কালিন্দীর জলে॥”-এর সঙ্গে এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মিলে যাচ্ছে। এর ফল স্বরূপ আমাদের ধরে নিতে হবে যে হয় জয়ানন্দ নিজেই বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন নয় তিনি যে কোন উপায়ে হোক, গন্ধমাদন পর্বত থেকে যমুনা নদীর সঠিক অবস্থান সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু কোনও মতেই বলা যাবে না যে তাঁর চৈতন্যমঙ্গলে, বৃন্দাবনের গোবর্দ্ধন পর্বতের অবস্থানের তখ্যে ভুল ছিল।
বিশ্বরূপের উপনয়ন ও নিমাইর কর্ণবেধ একই সঙ্গে হয়নি - পাতার উপরে . . . বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গলের ভুমিকার সংক্ষিপ্তসারের xivii-পৃষ্ঠায় জয়ানন্দের লেখা নতুন কথার মধ্যে লিখেছেন যে বিশ্বরূপেক উপনয়ন ও চৈতন্যদেবের চূড়ামঙ্গলিয়া (কানবিঁধানো) একই সঙ্গে হয়েছিল। নদীয়াখণ্ডের ১৩শ অধ্যায়ে জয়ানন্দ লিখেছেন . . . আর দিনে কর্ণবেদ সময় নিকটে। অন্তরীক্ষে দিব্যমালা পড়ে গণেশ ঘটে॥ আশ্চর্য্য দেখিয়া সভাএ লাগে চমত্কারে। কর্ণবেধ করাইল শচীর কুমারে॥ খড়িকা তাড়্যাতি পাতে কর্ণ বাঢ়াইল। মদনমোহন রূপ গৌরাঙ্গ ধরিল॥ দ্বিজকুলে জন্মিয়া পালিল কুলধর্ম্ম। চূড়ামঙ্গলিয়া করিল চূড়াকর্ম্ম॥ বিশ্বরূপ বিশ্বম্ভর দুই শচীপুত্র। শুভক্ষণে বিশ্বরূপে দিল যজ্ঞসূত্র॥
এখানে কোখাও বলা হচ্ছে না যে তাঁদের একসঙ্গে কর্ণবেধ ও উপনয়ন হলো। বলা হয়েছে যে গৌরাঙ্গের কর্ণবেধের পূর্বে নানারকম শুভলক্ষ্মণ দেখা দিল। প্রথমে গৌরাঙ্গের কর্ণবেধ করানো হলো এবং “শুভক্ষণে” বিশ্বরুপকে যজ্ঞসূত্র দেওয়া হলো অর্থাত তাঁর উপনয়ন হলো। একই সঙ্গে বা একই দিনে এই দুটি কাজ হলো, একথা কিন্তু এখানে বলা হয়নি।
পিরাল্যার যবনদের অত্যাচার ও সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যের গৌড় ত্যাগ - পাতার উপরে . . . জগন্নাথ মিশ্রের বড় ছেলে বিশ্বরূপের জন্মের পরে এবং বিশ্বম্ভরের জন্মের ঠিক পূর্বে নবদ্বীপে এক ঘোর সংকট দেখা দেয়। নবদ্বীপের কাছে স্থিত পিরাল্যা গ্রামের কিছু যবন গৌড়েশ্বর অর্থাৎ গৌড়ের নবাবের মন বিষিয়ে দিতে সক্ষম হয়, একটি মিথ্যা রটনা করে। এই নবাব সম্ভবত জালাউদ্দীন ফতেহ্ শাহ (১৪৮১-৮৭ রাজত্বকাল)। তারা নবাবকে বোঝতে সক্ষম হয়েছিল যে নবদ্বীপের ব্রাহ্মণগণ তাঁর অনিষ্ট করবেই। তারা নবাবকে আরও বুঝিয়েছিল যে এমন কথা নাকি আছে যে ব্রাহ্মণ গৌড়ের রাজা হবে। একথা শুনে নবাব প্রচণ্ড ক্রোধিত হয়ে ব্রাহ্মণদের সর্বনাশ করার জন্য নানান আদেশ দেন। এই ঘটনাবলীর আংশিক সমর্থন পাওয়া যায় বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলে।
ব্রাহ্মণদের প্রতি সেই অত্যাচারের ফলে সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য গৌড় ছেড়ে নীলাচলে চলে গিয়েছিলেন, যেখানে রাজা প্রতাপরুদ্র দেব তাঁকে সসম্মানে আশ্রয় দেন। নদীয়ার উপরে এই ঘোর অত্যাচার চাপানোর পরে, এক রাতে মা কালী, নবাবকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাঁর সর্বনাশ করার হুমকি দেন। এই ভয়ানক স্বপ্ন দেখার পরে নবাব পুনরায় নবদ্বীপে শান্তি ফিরিয়ে আনেন এবং ব্রাহ্মণদের সুখ-শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করেন। যাঁরা নবদ্বীপ ছেড়ে গিয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই আবার ফিরে আসেন। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের নদীয়া খণ্ডে, গৌড়েশ্বরের দ্বারা নবদ্বীপের ব্রাহ্মণদের উপর এই অত্যাচারের ঘটনাবলী এবং সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যের গৌড় ছেড়ে নীলাচলে চলে যাবার কথা উল্লিখিত হয়েছে . . .
বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলেও তত্কালীন গৌড়ের, প্রায় একই রকমের, ব্রাহ্মণের উপরে অত্যাচারের বর্ণনা রয়েছে। ১৪০৬ শকাব্দে অর্থাৎ ১৪৮৪ খৃষ্টাব্দে বিজয়গুপ্ত রচনা করেন তাঁর “মনসামঙ্গল” কাব্য। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জন্মগ্রহণ করেন ১৪৮৬ খৃষ্টাব্দে। প্রায় একই শতকের সময়কালের মধ্যে রচিত দুটি সম্পূর্ণ আলাদা গ্রন্থে যখন একই রকমের সামাজিক ও রাজনৈতিক বর্ণনা পাওয়া যায় তখন তাকে জয়ানন্দের মনগড়া বলে, বাতিল করা অনুচিত হবে। বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের “হাসন হুসন যুদ্ধ পালা”-র ৪র্থ অনুচ্ছেদে, সেই সময়কার গৌড়ে, ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচারের বর্ণনা দেওয়া রয়েছে এইভাবে . . .
দক্ষিণে হোসেনহাটি গ্রামের নিকট। তথায় যবন বসে দুই বেটা শঠ॥ হাসন হোসেন তারা দুই ভাইর নাম। দুইজনে করে তারা বিপরীত কাম॥ কাজিয়ালি করে তারা জানে বিপরীত। তাদের সম্মুখে নাহি হিন্দুয়ালির রীত॥ এক বেয়া হালদার তার নাম দুলা। বড় অহঙ্কার করে হোসেনের শালা॥ সর্বক্ষণ হোসেনের আগে আগে আসে। তাহার ভয়ে হিন্দুর সব গলায় তরাসে॥ যাহার মাথায় দেখে তুলসীর পাত। হাতে গলে বান্ধি নেয় কাজীর সাক্ষাৎ॥ সোগার তলে মাথা থুইয়া মারে উভাকিল। পাথরের প্রমাণ যেন ঝড়ে পড়ে শিল॥ পরেরে মারিতে কিবা পরের লাগে ব্যথা। চোপাড় চাপড় মারে দেয় ঘাড়কাতা ॥ যে যে ব্রাহ্মণের পৈতা দেখে তারা কান্ধে। পেয়াদা বেটা লাগ পাইলে তার গলায় বান্ধে॥ ব্রাহ্মণ পাইলে লাগ পরম কৌতুকে। তার পৈতা ছিড়ি থুতু দেয় মুখে॥ ব্রাহ্মণ সজন তথায় বসে অতিশয়। গৃহ ঘর তোলায় না দুর্জনের ভয়॥ ---অচিন্ত্য বিশ্বাস সম্পাদিত “বিজয় গুপ্তের মনসা মঙ্গল”, হাসান হুসন যুদ্ধ পালা, ৪র্থ অনুচ্ছেদ, ১৩৭-পৃষ্ঠা॥
নদীয়াতে সেকালের ছেলে-ধরা রাজার দূতের খবর দিয়েছেন জয়ানন্দ - পাতার উপরে . . . শ্রীচৈতন্যের বালকাবস্থায় তাঁর উপর ঈশ্বরত্ব আরোপ করার মূল উদ্দেশ্যেই এই কাহিনীটি লিখেছেন জয়ানন্দ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ঘটনা থেকে একটি সত্য বেরিয়ে আসে যে সেই সময়ে রাজার দূতেরা বালকদের ধরে চুরি করে নিয়ে যেতো। তেমন এক রাজদূতকে দেখে শ্রীচৈতন্য একটি অন্ধকূপে পড়ে যান। তাঁকে ধরতে এলে এক মহাসর্পের দংশনে দূতের মৃত্যু হয়। সেই যবন দূতের কানে, বালক গৌরাঙ্গ জোরে "হরি” ডাক দিলে সেই দূত উঠে বসে সম্ভ্রমের সঙ্গে গৌরাঙ্গের পা ধরে ক্ষমা চায়। নদীয়া খণ্ডের “পাটের ধড়া পাটের থোপা” পদটিতেও এই “ছেলে-ধরা-রাজার-দূত”-এর উল্লেখ রয়েছে। পদটি মিলনসাগরে কবি জয়ানন্দের কবিতার পাতায় তোলা রয়েছে।
গৌড়ের সঙ্গে অন্যান্য দেশের ব্যাবসা-বাণিজ্যের খবর দিয়েছেন জয়ানন্দ - পাতার উপরে . . . জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল থেকে আমরা সেই সময়ে সুদূর তিব্বত বা ভোট্টদেশ, কাশ্মীর, বারাণসী, উড়িষ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গা থেকে থালা, বাসন, রাসায়ণিক দ্রব্য, কাঁচের ঢাল. তীরের ফলা, তালা, ক্ষুর, কম্বল সহ অন্যান্য বিভিন্ন সামগ্রী নবদ্বীপ বা গৌড়ে আমদানি করা হোত। নদীয়াখণ্ডের ৩য় অধ্যায়ের সুহই রাগে রচিত “নানা চিত্রে ধাতু বিচিত্র নগরী” পদটিতে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। পদটি সম্পূর্ণ মিলনসাগরে কবি জয়ানন্দের পদাবলীর পাতায় দেওয়া রয়েছে।
নদীয়া খণ্ডের ৭ম অধ্যায়ে, গৌরাঙ্গের ভূমিষ্ঠ হবার পরে, ধাত্রীমাতা নারায়ণীকে নিয়ে সূতিকামন্দিরে বা আঁতুড় ঘরের ক্রিয়াকর্মের তথ্যসমৃদ্ধ বর্ণনাযুক্ত একটি দীর্ঘ অংশ রয়েছে . . .
@ = “সাক্ষি” - B মুদ্রিত গ্রন্থে ও D পুথিতে “সখী” রয়েছে। B = নগেন্দ্রনাথ বসু ও কালিদাস নাথ সম্পাদিত এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রকাশিত ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে মুদ্রিত গ্রন্থ। D = কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬৬৬ নং পুথি (আদিখণ্ড ও নদীয়াখণ্ড)।
কেবল বন্দনাতে এবং ভূমিষ্ঠ হবার কালে ধাত্রীমাতা নারায়ণীর উল্লেখ রয়েছে এমন নয়, গ্রন্থের ১৩ জায়গায় শ্রীচৈতন্যের ধাত্রীমাতা নারায়ণীর উল্লেখ রয়েছে।
শ্রীবাসের ভ্রাতুস্পুত্রী তথা বৃন্দাবনদাসের জননী নারায়ণী, যাঁর উল্লেখ মুরারি গুপ্ত, বৃন্দাবনদাস সহ অন্যান্য চরিরকারগণ করে গিয়েছেন, তাঁর উল্লেখ রয়েছে এই গ্রন্থের মাত্র ২ জায়গায়।
শচীমাতার কোলে গদাধর - পাতার উপরে . . . জয়ানন্দ তাঁর চৈতন্যমঙ্গলের নদীয়া খণ্ডে লিখেছেন যে শৈশবকালে শ্রীচৈতন্য , গদাধর কে তাঁর মাতা শচীদেবীর কোলে দিয়ে বলেছিলেন তাঁকে দেখভাল করে গৃহে রাখতে। এখানে সম্ভবত গদাধর ও শ্রীচৈতন্যকে রুক্মিণী ও কৃষ্ণের অবতাররূপে দেখাবার চেষ্টা হয়েছে। পরবর্তীতে তাঁদের রাধাকৃষ্ণের অবতাররূপে প্রচার করা হয়।
একদিনে নবদ্বীরে শচীঠাকুরাণী। গদাধর জগদানন্দ কোলে কৈব়্যা আনি॥ সমুদ্রমথনে জেন লক্ষ্মীর উদয়। গৌরাঙ্গের কেবল গদাধর প্রেমময়॥ গৌরচন্দ্র বলেন মা গদাধরের আমি। নানা অলঙ্কার দিয়া ঘরে রাখ তুমি॥ শ্রীরামের সীতা জেন কৃষ্ণের রুক্মিণী। গৌরাঙ্গের গদাধর জানিহ আপনি॥ রক্ষণ পোষণ প্রতিপালন করিহ। দিন কথো আন্তরে ইহার যজ্ঞসূত্র দিহ॥ আমার অঙ্গসেবায় গদাধরের অভিলাষ। গদাধরের অঙ্গে মোর সতত বিলাস॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল, নদীয়া খণ্ড, ২৯শ অধ্যায়, ৩৭-পৃষ্ঠা॥
নিত্যানন্দের পূর্বাশ্রমের নাম ও তাঁর জন্মস্থান নিয়ে নতুন তথ্য - পাতার উপরে . . . প্রভু নিত্যানন্দ জন্মগ্রহণ করেন বীরভূম জেলার একচক্রা বা একচাকা গ্রামে। বৃন্দাবনদাস তাঁর চৈতন্যভাগবতের মধ্য-লীলার ৩য় অধ্যায়, নিত্যানন্দ মিলনং নাম বর্ণনায় লিখেছেন . . .
প্রসঙ্গে শুনহ নিত্যানন্দের আখ্যান। সূত্ররূপে জন্ম-কর্ম্ম কিছু কহি তান॥ রাঢ় মাঝে একচাকা-নামে আছে গ্রাম। যহিঁ জন্মিলেন নিত্যানন্দ ভগবান॥ ---অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত বৃন্দাবনদাস বিরচিত চৈতন্যভাগবত, মধ্যথণ্ড, ৩য় অধ্যায়, ১৭৪-পৃষ্ঠা॥
জয়ানন্দ প্রভু নিত্যানন্দের পূর্বাশ্রমের নাম ও জন্মস্থান নিয়ে তাঁর চৈতন্যমঙ্গলের নদীয়া খণ্ডের ৪র্থ অধ্যায়ে লিখেছেন যে তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল “অনন্ত” এবং তিনি জন্মেছিলেন “একচাকা খলকপুর” গ্রামে . . .
ধন্য ধন্য সপ্তদ্বীপ মধ্যে জম্বুদ্বীপ। ধন্য ধন্য গৌড় দেশ উত্কল সমীপ॥ একচাকা খলকপুর পদ্মাবতী রক্ষে। জন্মিলা অনন্ত মাঘ মাসে শুক্ল পক্ষে॥ জাতকর্ম্ম করিয়া ঠাকুরে নাম থুইল। বালক্রীড়া করি কত আত্ম প্রকাশিল॥ উন্মাদ বৈরাগ্য মহা ঔদ্ধত্য দেখিয়া। শাস্ত্রশালে পড়াইল যজ্ঞসূত্র দিয়া॥ মাতা পিতা ভ্রাতা কত দেখিল প্রকাশ। অষ্টাদশ বত্সরে ছাড়িল গৃহবাস॥ প্রয়াগেতে যতিরাজ ঈশ্বরপুরী। ,ন্ন্যাস করিল তথা গুরু লক্ষ্য করি॥ অবধূত প্রেমে নিত্যানন্দ নাম ধরি। কাশীপুরে রহিলা সকল তীর্থ করি॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল, নদীয়া খণ্ড, ৪র্থ অধ্যায়, ১৩-পৃষ্ঠা॥
নিত্যানন্দ নদীয়াতে আসার পূর্বে বারাণসীতে ছিলেন - পাতার উপরে . . . প্রভু নিত্যানন্দ নবদ্বীপে আসার পূর্বে কোথায় ছিলেন তা অন্য চৈতন্যচরিত গ্রন্থে না থাকলেও জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের নদীয়াখণ্ডের ৬৮-অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন . . .
নিত্যানন্দ গোসাঞি আছিলা বারাণসী। গৌরাঙ্গমহিমা শুনি নবদ্বীপে আসি॥ অনেক সেবক সঙ্গে মহামল্ল বেশ। অবধূতাশ্রম নিত্যানন্দ ভ্রমে নানা দেশ॥ ---বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল, নদীয়া খণ্ড, ৬৮শ অধ্যায়, ৭৫-পৃষ্ঠা॥
নিত্যানন্দের ৩য় স্ত্রী শ্রীমতী চন্দ্রমুখী নিয়ে বিতর্ক?পাতার উপরে . . . অন্যান্য গ্রন্থ থেকে জানতে পারি যে প্রভু নিত্যানন্দ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদেশে সূর্য্যদাস সরখেলের দুই কন্যা জাহ্নবী ও বসুধার পাণিগ্রহণ করেন। জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলের আদিখণ্ডের বন্দনায় রয়েছে . . .
বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর “চৈতন্যচরিতের উপাদান” গ্রন্থের ২৩৮-পৃষ্ঠায় এ বিষয়ে লিখেছেন . . .
“সূর্যদাস সরখেলের কন্যা বসুধা ও জাহ্নবীর নাম অন্যান্য গ্রন্থে পাওয়া যায়। জয়ানন্দ চন্দ্রমুখী নামে অন্য একটি কন্যার নাম এমন ভাবে লিখিয়াছেন যে মনে হয় তিনিও নিত্যানন্দ-প্রভুর কৃপাপ্রার্থী ছিলেন।”
আমাদের কাছেও এটা আশ্চর্যজনক লাগলেও প্রথম কলিটিতে “শ্রীমতী চন্দ্রমুখী”র মানে চাঁদের মতো সুন্দর মুখের উপমা হিসেবেও ধরা যায় বলে আমরা মনে করছি। কারণ জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলেরই উত্তরখণ্ডে, যেখানে তিনি শ্রীচৈতন্যের জীবনের সব ঘটনাবলি কালানুক্রমিকভাবে সাজিয়ে লিখেছেন যে নিত্যানন্দ সূর্য্যদাসের দুই কন্যা বসুধা ও জাহ্নবী কেই বিবাহ করেছিলেন। এখানে পূর্বোক্ত শ্রীমতী চন্দ্রমুখীর কোনও উল্লেখ নেই। তিনি লিখেছেন . . .
বৃন্দাবন দাসের “শ্রীশ্রীনিত্যানন্দ বংশ বিস্তার” গ্রন্থে, যা কিনা প্রভু নিত্যানন্দের জীবন নিয়ে সবচেয়ে প্রামাণিক গ্রন্থ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে, সেই গ্রন্থেও বসুধা ও জাহ্নবী দেবীদ্বয়কে ছাড়া নিত্যানন্দের আর কোনও স্ত্রীর উল্লেখ নেই। এমনকি শ্রীমতী চন্দ্রমুখী নামের কোন চরিত্রেরও উল্লেখ নেই সেই গ্রন্থে।
যবন হরিদাসের গ্রাম ও হিন্দু পিতা-মাতা - পাতার উপরে . . . “জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল”-এর নদীয়া খণ্ডের ২৮-অধ্যায়ে তিনি যবন হরিদাসের গ্রাম ভাটকালগাছি ও পিতা-মাতার নাম মনোহর ও উজ্জ্বলা জানিয়েছেন। অন্য চরিতকারগণ বলেছেন যে বূঢ়নে হরিদাসের নিবাস ছিল। জয়ানন্দ তাঁর গ্রামের নাম দিয়েছেন ভাটকালগাছি। ভাটকালগাছি বূঢ়ন পরগণার একটি গ্রাম।
মুরারি গুপ্তের কড়চায় রয়েছে যে হরিদাস, যবন অর্থাৎ মুসলমান কুলে জন্মেছিলেন। মুরারি গুপ্তের কড়চা, যার ভাল নাম “শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃতম্”-এর ৪র্থ সর্গ, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ সংখ্যক শ্লোকে হরিদাসের বিবরণ দেওয়া রয়েছে যেখানে শ্রীরাম্ মুনি, ভগবানে অধৌত তুলসী অর্পণ করার ফলে স্বয়ং যবন কুলে হরিদাস হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন . . .
শ্রীমত্শ্রীহরিদাসোহভূন্মুনেরংশঃ শৃণুষ্ব তৎ। কথিতং নাগদষ্টেন ব্রাহ্মণেন যথা পুরো॥ ৮॥ বঙ্গানুবাদঃ (৮) মুনির অংশ শ্রীমান্ শ্রীহরিদাসও আভির্ভূত হইলেন--- নাগদষ্ট (সর্পক্ষত ডঙ্ক) ব্রাহ্মণ প্রাচীনকালে ইহার যে তত্ত্ব বলিয়াছেন, তাহা আপনি শ্রবণ করুন।
আদৌ মুনিবরঃ শ্রীমান্ রামো নাম মহাতপাঃ। দ্রাবিড়ে বৈষ্ণবক্ষেত্রে সোহবাত্সীৎ পুত্রবত্সলঃ॥ ৯॥ বঙ্গানুবাদঃ (৯) পুরাকালে মহর্ষি শ্রীমান্ রাম নামক জনৈক মহাতপস্বী বৈষ্ণবক্ষেত্র দ্রাবিড়ে বাস করিতেন। তিনি পুত্রবত্সল ছিলেন।
তস্য পুত্রেণ তুলসীং প্রক্ষাল্য ভাজনে শুভে। স্থাপিতা সাহপতদ্ভূমারপ্রক্ষাল্য পুনশ্চ তাম্॥ ১০॥ বঙ্গানুবাদঃ (১০) তাঁহার পুত্র তুলসী প্রক্ষালন করিয়া পবিত্র পাত্রে রাখিলেন, কিন্তু তাহা ভূমিতেই পড়িয়া গেল। পুনরায় সেই তুলসী প্রক্ষালন না করিয়াই
পিত্রেহদদাৎ পুনঃ সোহপি শ্রীরামাখ্যো মহামুনিঃ। দদৌ ভগবতে তেন জাতোহসৌ যবনে কুলে॥ ১১॥ বঙ্গানুবাদঃ (১১) মুনিপুত্র পিতার হস্তে দিলেন। মহর্ষি শ্রীরামও সেই তুলসী শ্রীভগবান্ কে সমর্পণ করিলেন। অধৌত তুলসী ভগবানে অর্পণ করার ফলে তিনি যবনকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।
স ধর্ম্মাত্মা সুধীঃ শান্তঃ সর্ব্বজ্ঞানবিচক্ষণঃ। ব্রহ্মাংশোহপি ততঃ শ্রীমান্ ভক্ত এব সুনিশ্চিতঃ॥ ১২॥ বঙ্গানুবাদঃ (১২) তিনি ধার্মিক, সুধী, শান্ত ও সর্বজ্ঞ ছিলেন। স্বয়ং ব্রহ্মাংশ হইয়াও তিনি ভক্তরূপেই সুনিশ্চিত হইয়াছেন। ---শ্রীল হরিদাস দাস কৃত বঙ্গানুবাদ সহ শ্রীল মুরারি গুপ্তের “শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃতম্” গ্রন্থ, ৪র্থ সর্গ, ১৬- ১৭-পৃষ্ঠা॥
কবিকর্ণপূর বিরচিত “শ্রীগৌরগণোদ্দেশ-দীপিকা” গ্রন্থে তিনি মুরারি গুপ্তের দেওয়া সূত্র ধরে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে হরিদাস, যবন অর্থাৎ মুসলমান কুলে জন্মেছিলেন একটু অন্যভাবে। “গৌরগণোদ্দেশদীপিকার” ৯৩, ৯৪ ও ৯৫ সংখ্যক শ্লোকে (৩৪-পৃষ্ঠা) হরিদাসের বিবরণ দেওয়া রয়েছে এভাবে যে অধৌত তুলসী, জনৈক মুনির পুত্র তাঁর পিতার হাতে তুলে দেবার ফলে, পিতার অভিশাপে পুত্রই যবন কুলে হরিদাস হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন . . .
ঋচীকস্য মুনেঃ পুত্রো নাম্না ব্রহ্মা মহাতপাঃ। প্রহ্লাদেন সমং জাতো হরিদাসাখ্যাকোঅপি সন্॥ ৯৩॥ অর্থাৎ, ঋচীক মুনির পুত্র মহাতপা-ব্রহ্মা প্রহ্লাদের সঙ্গে মিলে এখন শ্রীহরিদাস ঠাকুর নামে খ্যাত হয়েছেন।
মুরারিগুপ্তচরণৈশ্চৈতন্যচরিতামৃতে। উক্তো মুনিসুতঃ প্রাতস্তুলসীপত্রমাহরণ্॥ ৯৪॥ অধৌতমভিশপ্তস্তং পিত্রা যবনন্তা গতঃ। স এব হরিদাসঃ সন্ জাতঃ পরমভক্তিমান্॥ ৯৫॥ অর্থাৎ, শ্রীমুরারিগুপ্ত দ্বারা রচিত শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, কোন এক মুনির পুত্র এক দিন প্রাতঃকালে তুলসী পত্র চয়ন ক’রে না ধুয়েই পিতাকে দিয়েছিলেন। এই কারণেই তাঁর পিতা তাকে অভিশাপ দেন যে তিনি যবন হবেন। পিতার দ্বারা সেই অভিশপ্ত মুনি পুত্রই যবনকুলে পরম ভক্তিমান শ্রীহরিদাস ঠাকুর রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন।
[ এই অংশটি ২০০৮ সালে প্রকাশিত, ত্রিদণ্ডিস্বামী শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিবেদান্ত নারায়ণ গোস্বামী মহারাজ দ্বারা, হিন্দী ভাষায় অনুদিত ও সম্পাদিত শ্রীল কবিকর্ণপূর বিরচিত “শ্রীগৌরগণোদ্দেশ-দীপিকা” গ্রন্থের ৩৪-পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া। মিলনসাগরের জন্য এই অংশের হিন্দী থেকে বাংলায় অনুবাদ - মিলন সেনগুপ্ত। ]
জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন রচিত, “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” ৬ষ্ঠ এবং তাঁর জীবদ্দশায়, ১৯৩৯ এর পূর্বে, প্রকাশিত শেষ সংস্করণের চরিত-শাখা, (খ) জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল, ৩১৮-পৃষ্ঠায় তিনি বিস্তারিত লিখেছেন। আমরা তা থেকে কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি . . .
“কবি জয়ানন্দ বর্দ্ধমানস্থ আমাইপুরা গ্রাম (বৈষ্ণবাচারদর্পণমতে অম্বিকা) নিবাসী সুবুদ্ধিমিশ্রের পুত্র। চৈতন্য চরিতামৃত, বৈষ্ণবাচারদর্পণ প্রভৃতি পুস্তকে চৈতন্যশাখায় সুবুদ্ধিমিশ্রের নাম উল্লিখিত আছে। কবি যে বংশে জন্মগ্রহণ করেন, সেই বংশের নাম স্মার্ত্ত রঘুনন্দনের দ্বারা ইতিহাসে উজ্জ্বল রহিয়াছে। . . . . . . জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল আবিষ্কর্ত্তা শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়ের মতে ১৫১১ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৫১৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যে জয়ানন্দ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার মন্ত্রগুরু ছিলেন অভিরাম গেস্বামী। নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্র ও গদাধর পণ্ডিতের আজ্ঞায় তিনি চৈতন্যমঙ্গল রচনা করেন।
জয়ানন্দের চৈতন্য-মঙ্গল একখানি প্রামাণিক গ্রন্থ। কতগুলি বিষয়ে বৈষ্ণব ইতিহাস সম্বন্ধে তাঁহার মত প্রচলিত মত হইতে স্বতন্ত্র। প্রচলিত মত জগন্নাথ মিশ্রের পূর্ব্বনিবাসস্থান শ্রীহট্টস্থ ঢাকা দক্ষিণ গ্রাম, কিন্তু আনন্দের মতে উহা শ্রীহট্টস্থ জয়পুর গ্রাম। প্রচলিত মত, হরিদাসঠাকুরের জন্মস্থান বুড়ন গ্রাম (বুড়ন গ্রামেতে অবতীর্ণ হরিদাস---চৈ, ভা, আদি)। কিন্তু জয়ানন্দের মতে, স্বর্ণনদীতীরস্থ ভাটকালগাছি গ্রাম। এতদ্ভিন্ন জয়ানন্দ অনেকগুলি অজ্ঞাতপূর্ব্ব ঐতিহাসিক তথ্য উদ্ঘাটন করিয়াছেন। তাঁহার গ্রন্থে আমরা জানিতে পাই, চৈতন্যদেবের পূর্ব্বপুরুষ উড়িষ্যার অন্তর্গত যাজপুর গ্রামে বাস করিতেন। মহারাজ কপিলেন্দ্রদেবের (ইঁহার উপাধি ছিল রাজা ভ্রমর) ভয়ে তিনি পলাইয়া শ্রীহট্টে আগমনপূর্ব্বক বাস করেন। চৈতন্যদেবের তিরোধান সম্বন্ধে জয়ানন্দ প্রকৃত তত্ত্ব জ্ঞাপন করিয়াছেন। আষাঢ় মাসে একদা কীর্ত্তন করিতে করিতে চৈতন্যদেবের পদ ইষ্টকবিদ্ধ হয় ; দুই এক দিনের মধ্যেই বেদনা অত্যন্ত বাড়িয়া যায়, শুক্লপক্ষীয় পঞ্চমীতিথিতে তিনি শয্যাশায়ী হন এবং এবং সপ্তমীতিথিতে ইহলোক ত্যাগ করেন। চৈতন্যদেবের তিরোধানসংক্রান্ত নানারূপ অলৌকিক গল্পে সত্য কাহিনী কুহকাচ্ছন্ন হইয়াছিল, ---জয়ানন্দের লেখায় সেই ঘনীভূত তিমিররাশি এখন অন্তর্হিত হইবে। চৈতন্যদেবের জন্মের অব্যবহিত পূর্ব্বে নবদ্বীপে নানারূপ বিপ্লব উপস্থিত হয়, সে সকল বৃত্তান্ত এই পুস্তক ভিন্ন অন্য কোন প্রাচীন পুস্তকে পাওয়া যায় নাই। . . .
. . . সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে প্রাচীন লেখকগণ কোনরূপ আভাস দিতে এতই কৃপণতা করিয়া গিয়াছেন যে, দৈবক্রমে কোন লেখক যদি এ সম্বন্ধে আমাদিগকে মুষ্ঠিমেয় তত্ত্বও ভিক্ষা দিয়া গিয়া থাকেন, আমরা তাহাতেই নিরতিশয় পরিতৃপ্তি লাভ করিয়া তাঁহাকে ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারি না। জয়ানন্দ নিম্নলিখিত সামান্য বিবরণটী প্রদান করিয়া আমাদিগকে ধন্যবাদার্হ্য হইয়াছেন ;---
চৈতন্য অনন্তরূপ অনন্তাবতার। অনন্ত কবীন্দ্র গায় মহিমা জাহার॥ শ্রীভাগবত কৈল ব্যাস মহাশয়। গুণরাজ খান কৈল শ্রীকৃষ্ণ বিজয়॥ জয়দেব বিদ্যাপতি আর চণ্ডীদাস। শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র তাঁরা করিল প্রকাশ॥ সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্য ব্যাস অবতার। চৈতন্যচরিত্র আগে করিল প্রচার॥ চৈতন্য সহস্র নাম স্লোক প্রবন্ধে। সার্ব্বভৌম রচনা করিল প্রেমানন্দে॥ শ্রীপরমানন্দপুরী গোসাঞি মহাশয়ে। সংক্ষেপ করিল তিঁহ গোবিন্দবিজয়ে॥ আদিখণ্ড মধ্যখণ্ড শেষখণ্ড করি। শ্রীবৃন্দাবনদাস রচিল সর্ব্বোপরি॥ গৌরীদাস পণ্ডিতের কবিত্ব সুশ্রেণী। সহ্গীত প্রবন্ধে তার পদে পদে ধ্বনি॥ সংক্ষেপে করিলেন তিঁহ পরমানন্দ গুপ্ত। গৌরাঙ্গ-বিজয় গীত শুনিতে অদ্ভুত॥ গোপালবসু করিলেন সঙ্গীত প্রবন্ধে। চৈতন্যমঙ্গল তাঁর চামর বিচ্ছন্দে॥ ইবে শব্দ চামর সঙ্গীত বাদ্যরসে। জয়ানন্দ চৈতন্যমঙ্গল গাএ শেষে॥”
জয়ানন্দের কবিত্ব নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . জয়ানন্দের কবিত্ব নিয়ে রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” ৬ষ্ঠ সংস্করণের ৩২১-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে নানারূপ ঐতিহাসিকতত্ত্বের নিরবচ্ছিন্ন বর্ণনায় কবিত্বশক্তির ভালরূপ বিকাশ পাইতে পারে নাই, কিন্তু এই সমস্ত চরিতাখ্যাগুলিকে কাব্যের মানদণ্ডে পরিমাণ করা বোধ হয় সমীচীন হবে না।
জয়ানন্দের চৈতন্য-মঙ্গলে কড়চা-লেখক গোবিন্দদাস যে কর্ম্মকার ছিলেন, তাহার স্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে, একথা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে।
চৈতন্যমঙ্গল ছাড়া জয়ানন্দ-বিরচিত “ধ্রুব-চরিত্র” ও “প্রহ্লাদ-চরিত্র” নামক দুইখানি ছোট কাব্যোপখ্যান পাওয়া গিয়াছে।”
জয়ানন্দের কবিত্ব নিয়ে বিমানবিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় - পাতার উপরে . . . ১৯৭১ সালে প্রকাশিত বিমান বিহারী মজুমদার ও সুখময় মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত জয়ানন্দ বিরচিত চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থের ভুমিকার সংক্ষিপ্তসার -এর xliii-পৃষ্ঠায়, তাঁরা জয়ানন্দের কবিত্ব নিয়ে লিখেছেন . . .
“বৃন্দাবনদাস, লোচনদাস ও কৃষ্ণদাস কবিরাজের তুলনায় জয়ানন্দের কবিত্বশক্তি অনেক কম ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। জয়ানন্দের চৈতন্য মঙ্গলের বহু স্থানেই কোন সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে না। এই গ্রন্থে সরলভাবে গতানুগতিক পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের মধ্য দিয়ে কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। জয়ানন্দ ছিলেন মূখ্যত পালা-রচয়িতা ; জনসাধারণের মনোরঞ্জনের জন্য তিনি অনেকগুলি অবান্তর পৌরাণিক কাহিনী তার গ্রন্থের মধ্যে সন্নিবেশ করেছেন। চৈতন্যদেবের উক্তির মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের অনিত্যতা সম্বন্ধে ও বিভিন্ন নীতি সম্বন্ধে যে সব তত্ত্বকথা বিবৃত করেছেন, সেগুলিও প্রায় ক্ষেত্রেই গতানুগতিক ধরণের।
জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’র সাহিত্যিক গুণের পরিচয় পাওয়া যায় শিশু গৌরাঙ্গের রূপ বর্ণনায়, শিশু গৌরাঙ্গ সম্বন্ধীয় কোন কোন গানে, চৈতন্যদেবের সন্ন্যাসগ্রহণের প্রাক্কালে শচীর বিলাপে এবং বিষ্ণপ্রিয়ার বারোমাস্যায়। এদের মধ্যে বারোমাস্যাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ; আসন্ন বিরহের সম্ভাবনায় বিষ্ণপ্রিয়ার অন্তরের হাহাকার এতে পরিপূর্ণভাবে ধ্বনিত হয়েছে ; এর মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়ার নিজের কষ্টের আশঙ্কা ততটা অভিব্যক্ত হয়নি, যতটা হয়েছে স্বামীর সম্ভাবিত কষ্টের ভাবনায় তাঁর অন্তরের আক্ষেপ। ‘পদকল্পতরু’তে এই বারোমাস্যাটি লোচনদাসের ভণিতায় পাওয়া যায়, কিন্তু লোচন জয়ানন্দের পরবর্তী গ্রন্থকার ; সুতরাং বারোমাস্যাটি যে জয়ানন্দেরই রচনা, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
কাব্য হিসাবে জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’ অনেক ত্রুটি আছে। এর মধ্যে বহু জায়গায় ছন্দপতন দেখা যায়। কয়েক স্থানে বাক্যের অর্থও ঠিকমত বোঝা যায় না।”
জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল - তথ্য নিয়ে নিলরতন সেনের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . নীলরতন সেন তাঁর ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়” গ্রন্থের চৈতন্যজীবনী প্রসঙ্গে ৩৭৫-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থটি বৈষ্ণবসমাজে অপরিচিত ছিল। . . . জয়ানন্দের গ্রন্থটি তথ্যের দিক থেকে আদৌ নির্ভরযোগ্য নয়। তিনি বহু ঘটনাই ভুলভাবে বর্ণনা করেছেন, এবং ঘটনার পারস্পর্য রক্ষা করেননি। যেমন, নিমাই-এর গয়া থেকে ফেরার পর লক্ষীর সঙ্গে বিবাহ, পূর্ববঙ্গ গমন ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন। আবার গয়া-গমনের পূর্বেই তাঁকে কৃষ্ণভক্তরূপে দেখিয়ে হরিদাস ও বক্রেশ্বরকে তাঁর সঙ্গীরূপে বর্ণনা করেছেন। মুরারি, কবিকর্ণপূর বা বৃন্দাবনের বর্ণিত ঘটনাধারা থেকে এখানে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এমন আরও ঘটনাগত অমিল রয়েছে। জয়ানন্দই প্রথম আমাদের চৈতন্যের পূর্বপুরুষদের নিবাস সম্পর্কে একটি নতুন তথ্য জানিয়েছেন যে, --- চৈতন্য গোসাঞির পূর্বপুরুষ . আছিলা যাজপুরে। শ্রীহট্ট দেশেরে পালাঞা গেলা . রাজা ভ্রমরের ডরে॥ [ উত্কল খণ্ড ]
ডঃ মজুমদার (বিমানবিহারী) নানাদিক বিচার-বিশ্লেষণের পর এই তথ্য ভ্রান্ত বলে গণ্য করেছেন। মুরারিগুপ্ত জানিয়েছেন, শ্রীচৈতন্য পাশ্চাত্য বৈদিক কুলে বাত্স্যগোত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেদিক থেকেও বলা যায়, চৈতন্যের পূর্বপুরুষ বাঙালী ছিলেন---ওড়িয়া নহে। জয়ানন্দের গ্রন্থে চৈতন্যের নবদ্বীপ থেকে গয়া, কাটোয়া থেকে শান্তিপুর, শান্তিপুর থেকে পুরী এবং পুরী থেকে বারানসী যাত্রা-পথের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। এই বর্ণনা অন্যান্য চরিতকারদের সঙ্গে প্রদত্ত বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। তবে সে যুগে যাতায়াতের এই পথগুলি চালু ছিল অনুমান করা চলে। জয়ানন্দ অঙ্কিত চৈতন্য-চরিত্র মূলতঃ মুরারি, কবিকর্ণপূর বা বৃন্দাবন দাস অঙ্কিত চরিত্র থেকে ভিন্নতর। সম্ভবতঃ এই কারণেই বৈষ্ণব সমাজে তাঁর গ্রন্থটি সম্পূর্ণ অপ্রচলিত হয়ে পড়েছিল। তবে এসব সত্ত্বেও মনে রাখতে হবে একমাত্র জয়ানন্দ চৈতন্য তিরোভাবের বাস্তবানুগ একটি বিবরণ দিয়েছেন । মুরারি, কবিকর্ণপূর বা বৃন্দাবনদাস, লোচন বা কৃষ্ণদাস কবিরাজ কেউই চৈতন্য তিরোভাবের ঐতিহাসিক কোনও তথ্য-বিবরণ দেননি। কিছুটা অলৌকিকতার রহস্যে সে কাহিনী আচ্ছন্ন রেখেছেন। জয়ানন্দই স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন ---
কৃষ্ণপথ.কম ওয়েবসাইটে মহানিধি স্বামীর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . কৃষ্ণপথ.কম ওয়েবসাইটে রাখা লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলের ইংরেজীতে অনুবাদের ভূমিকায় অনুবাদক শ্রী মহানিধি স্বামী, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
"Readers should not confuse Locana Dasa Thakura's authentic and authorized book, Caitanya-Mangala, with another book of the same title written by Jayananda. Jayananda's book has many strange descriptions of Sri Caitanya Mahaprabhu. Among the society of Vaisnavas, Jayananda's book is not loved, appreciated, or widely read. In fact, Bhakti-ratnakara doesn't even mention or refer to his book. Jayananda didn't show any talent in composing; his writing is incoherent and sloppy."
শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের তিথিটিও সঠিকভাবে জয়ানন্দই লিখে গিয়েছেন। এ নিয়ে সুখময় মুখোপাধ্যায় তাঁর ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত, “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম” গ্রন্থে লিখেছেন . . .
“. . . লোচনদাস তাঁর চৈতন্যমঙ্গলে লিখেছেন যে, আষাঢ় মাসের সপ্তমী তিথি রবিবারে মহাপ্রভুর তিরোধোন হয়েছিল ; কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন ১৪৫৫ শকাব্দে (১৫৩৩ খ্রীঃ) মহাপ্রভু পরলোকগমন করেছিলেন। জ্যোতিষ-গণনার ফলে জানা যায় ঐ আষাঢ় মাসের দু’টি সপ্তমী তিথির মধ্যে শুক্লা সপ্তমী তিথি রবিবারে পড়েছিল। জয়ানন্দ স্পষ্টভাবে এবং অভ্রান্তভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মহাপ্রভুর তিরোধান “আষাঢ় সপ্তমী তিথি শুক্লা”তে ঘটেছিল। . . .” ---সুখময় মুখোপাধ্যায়, “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের তথ্য ও কালক্রম”, ১০০-পৃষ্ঠা॥
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ১৯২২ সালে প্রকাশিত, Chaitanya and His Age গ্রন্থে শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা লিখেছেন। তিনি জয়ানন্দের বর্ণিত রথের দিন “ইটালের ঘায়ে” শ্রীচৈতন্যের জ্বর আসার এবং পরে ঘটনাটি বিশ্বাস করেছিলেন এবং তিনি মনে করতেন যে ইটালের ঘায়ে জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় শ্রীচৈতন্য জগন্নাথ দেবের মন্দিরে গিয়েছিলেন বিকেল চারটের সময় এবং তিনি মন্দিরে প্রবেশ করার পরেই মন্দিরের সিংহদ্বার রাত্রি ১১টা পর্য়ন্ত বন্ধ ছিল। Chaitanya and His Age গ্রন্থের ২৬৩-পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন কেন জয়ানন্দের লেখা বৃন্দাবনমুখী গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের মনের মত হয়নি . . .
“It should be remembered that this work is not recognised by the Vaishnavas ; hence the author, who was outside the pale of the school of Brindaban from which sprang all canons and censor-ship in literary matters, could exercise his own discretion in using his materials and was not handicapped while waiting things, such freedom not being allowed in strictly orthodox literature.”