কবি তরুণীরমণের সহজিয়া পদাবলী
*
শুন শুন রসিক ভকত বন্ধুগণ
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭২-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

শুন শুন রসিক ভকত বন্ধুগণ।
চণ্ডীদাস নকুলে দিলেন প্রেমাঞ্জন॥
রামা রজকিনী সঙ্গে চণ্ডীদাসের প্রীত।
নকুলে পাঠ্যাল্য রাজা বুঝাইতে হিত॥
রাজা কহে বাণীতুল্য বিদ্বান চণ্ডীদাস।
সর্ব্বদেশ পূজনীয় নাহি তার হ্রাস॥
আমার পণ্ডিত তিহু বিদ্যাশিরোমণি।
সকল করিল নাশ রামা রজকিনী॥
রাজা না জানে দেবীর হইআছে কৃপা।
তাহা না জানিঞা সভে কহে কামখেপা॥
এক অংশ বাসুলী জে রামা রজকিনী।
চণ্ডীদাস কৃপাবাণ হয়েছে আপনি॥
রহিত হইএ আছে দ্বিজ চণ্ডীদাস।
নকুলে ডাকিএ রাজা করএ সম্ভাষ॥
সভামধ্যে কহে রাজা শুন হে নকুল।
চণ্ডীদাস বিনে আমি হএছি আকুল॥
রহিত করিলু তারে ধোবিনী ছাড়িতে।
তভু না ছাড়িল চণ্ডীদাস কোনমতে॥
উদ্ধার করিব তারে পতিত হইতে।
জায় হে নকুল চণ্ডীদাসের সাক্ষাতে॥
ব্রাহ্ণম মণ্ডলী করি অনুমতি লৈয়া।
চলিলা নকুল মনে হরষ হইয়া॥
যথা চণ্ডীদাস আছে রামিনী সহিত।
নকুল আসিএ তথা হৈল উপনীত॥
তাহারে দেখিএ তবে রামা রজকিনী।
সম্ভ্রম হইএ ঘরে গেলা জে ঐমনি॥
নাদুড় গ্রামেতে বাসুলূর ঈশান কোণেতে।
চণ্ডীদাসের বাসাঘর আছএ সেথাতে॥
রামা রজকিনীর ঘর সেখান হইতে।
দক্ষিণেতে এক পুআ নিকট সাক্ষাতে॥
যদি কহ একত্রেতে না থাকএ কেন।
পীরিতের রীতি নহে স্বকীয়াকরণ॥
বিপ্রলম্ভ সম্ভোগ স্বকীয়াতে নাই।
কেবল সম্ভোগ মাত্র প্রেম নাহি পাই॥
নকুল প্রণাম করি কহিল বৃত্তান্ত।
চণ্ডীদাস সকল বুঝিল আদ্যোপান্ত॥
ধোবিনী ছাড়হ ভাই জাতে উঠ তুমি।
শ্রীচরণে নিবেদন করিলাম আমি॥
ইহা শুনি নিশ্বাস ছাড়িল চণ্ডীদাস।
ছাড়িতে নারিব ধোবিনীর প্রেমফাঁস॥
ধোবিনীর প্রেমে আমি হইআছি ভোর।
জাতি পাতি জ্ঞাতি বন্ধু ধোবিনী সে মোর॥
এ দেহ সঁপেছি আমি ধোবিনীর পায়।
সকল সম্পদ মোর অন্য নাহি পায়॥
সর্ব্বস্ব ধোবিনী মোর এ ভূমি আকাশ।
ধোবিনী ছাড়িলে মোর প্রাণে নাহি আশ॥
আমি দেহ সেহ প্রাণ শুন ওরে ভাই।
পরাণ ছাড়িএ গেলে দেহ রবে নাঞি॥
ধোবিনী ধোবিনী বলি আন্দ হইআ।
নকুলে করিলা কোলে রামিণী বলিআ॥
চণ্ডীদাসের স্পর্শমাত্র নকুল ঠাকুর।
জত দুর্ব্বাসনা তার সব হৈল দূর॥
নকুল কহিল গোঁসাঞি কৃপা কর মোরে।
জাতি পাতি সর্ব্ব মোর জাউ ছারখারে॥
চণ্ডীদাস কহে জায় রামিনীর ঠাঞি।
তিহুঁ জা করিবেন আমি করিব তাহাই॥
ইহা শুনি নকুল ধোবিনীর বাড়ী গেলা।
জাইএ দেখএ চণ্ডীদাস সনে মেলা॥
আশ্চর্য্য হইল তবে নকুল ঠাকুর।
কোন পথে আইল [ ঞিহ ] হইএ আন্তর॥
দেখিএ বিস্ময় নকুল হইল তথায়।
অষ্টাঙ্গ হইএ পড়ে রজকিনীর পায়॥
উঠ উঠ বলি রামা নকুল ঠাকুরে।
দু করে ধরিএ বসায়ন নিজ কোরে॥
অস্পর্শী রজকী আমি তুমি ত ব্রাহ্মণ।
মোর পাও দণ্ডবত কর অকারণ॥
নকুল কহএ তোমায় জে কহে ধোবিনী।
ত্রিভুবনমধ্যে হয় মহাপাতকিনী॥
মোরে অনুগ্রহ কর তোমরা দুজন।
জাতি পাঁতি জ্ঞাতি মোর নাহি প্রয়োজন॥
রাজা কুটুম্বাদি ঘণে (গণে?) সকলে কহিবে।
কহিবে তোমাদের বাক্যে কুলেতে উঠিবে॥
রামা চণ্ডীদাস দুহে তারে আজ্ঞা দিলা।
মহানিশাকালে তুমি আসিবে একলা॥
সম্ভোগ সাধন তোমায় দেখাব শিখাব।
মহাঅপ্রাকৃত নিত্যকুলেতে উঠাব॥
আশ্বাসিএ নকুলেরে বিদাই করয়।
তরুণীরমণ কহে শুন ভক্তচয়॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
নকুল বিদাই হই বৃত্তান্ত করিল
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৩-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

প্রথম স্তবক॥

নকুল বিদাই হই বৃত্তান্ত করিল।
কুটুম্বাদি রাজা শুনি আনন্দ পাইল॥
দিবসান্তে হৈল তবে অধিক রজনী।
একলা আইলা যথা চণ্ডীদাস রামিণী॥
অষ্টাঙ্গ হইল তবে নকুল ঠাকুর।
দহে অনুকূল তারে হইলা প্রচুর॥
কামরতি গায়ত্রীবীজে করিলা আশ্রয়।
আশ্রয় করি রতিকামতত্ত্ববস্তু কয়॥
প্রথমে কহেন তারে কাম রতি ভেদ।
জাহা শুনি মানসের ঘুচে ধন্ধ খেদ॥
কাম কৃষ্ণ রতি রাধা শুন হে নকুল।
অহিংসা হইলে দুহে হয় অনুকূল॥
স্থাবর জঙ্গম আদি জত দেহ হয়।
রতি কাম সর্ব্বদেহে বিলাস করয়॥
সর্ব্ব আদি বৃত্তান্ত শুনহ একমনে।
সর্ব্ব আদি নিত্যবস্তু আছে মর্ম্মস্থানে॥
মহারস নিত্যবৃন্দাবন সেই ধাম।
মহা অপ্রাকৃতে রমে সেই স্বয়ং কাম॥
তাহা হৈতে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড উপজিল।
সেই রজবীজ হৈতে সর্ব্ব সৃষ্টি হৈল॥
প্রাকৃত অপ্রাকৃত আর মহা অপ্রাকৃত।
ত্রিবিধ বিহার তার শুনহ নিশ্চিত॥
সেই রজবীজ হৈতে নিশ্চয় জানিহ।
*    *    *    আর অন্য নহে কেহ॥
সেই কাম রজবীজ রস রতি সত্তা।
সেই সর্ব্বরসময় সর্ব্বময় কর্ত্তা॥
ধারণ পোষণ রস বিনে অন্য নাঞি।
অহিংসা হইলে বস্তু সিদ্ধতত্ত্ব পাই॥
সেই রজবীজ হৈতে সর্ব্ব দেহ হয়।
ঈর্ষা কর্ষা তাপ আদি ছাড়হ নিশ্চয়॥
সেই রস প্রাকৃত অপ্রাকৃত শুন কহি।
রসের হইলে ভক্ত নিন্দা হিংসা নাহি॥
সকল বরন্ধাণ্ড রস রস গুরু কয়।
কোথায় করহ নিন্দা গুরুশিন্দা হয় ॥
প্রারুত রূপেতে তিহু হএন বিস্তার।
মহা অপ্রাকৃত রূপে নিত্যবস্তু সার ॥
ইহা শুনি নকুল কহএ শুন গ্রভু।
কোন তত্ত্ব জিজ্ঞাসিতে নাহি জানি কভু॥
কৃপা করি সবৃত্তান্ত কহিবে আমায়।
এই নিবেদন আমি কৈলু তব পায়॥
ইহা শুনি চণ্ডীদাস নকুলেরে কয়।
সেই রস এই দেহে বর্তমান হয় ॥
দেখ জেন ইক্ষুরস দ্রবের সমান।
অনলের যোগে দেখ হয় বর্ণ আন॥
দেখ জেন ইক্ষুদণ্ড নিষ্পীড়ন করি।
অগ্নি আবর্ত্তন করে অতি যত্ন করি॥
অনলের জ্বালেতে বিরাগ জে উঠয়।
বিরাগ নির্ম্মল হএ রজগুড় হয় ॥
সেই গুড় মোদকেতে পুন লৈয়া জায়।
গাঞ্জ যোগ দিআ পুন বিকার ঘুচায়॥
গাঁজযোগ সাঙ্গ হৈলে ভুরা তার নাম।
সূ্র্য্যাগ্নিতে পুনরপি করএ শুখান॥
অনলে চাপায় পুন দিএ দুগ্ধ যোগ ।
নির্ম্মলতা হয় তার জায় গাদ রোগ ॥
শুভ্রবর্ণ হয় রস নাম তার চীনি।
তস্য পর ভিআনেতে ওলা লাড্ডুখানি॥
পুন দুগ্ধ যোগ দিএ তাহার ভিয়ান।
অখণ্ড লড্ডুকা হয় মিশ্রী তার নাম॥
তারপর দুগ্ধ যোগে ভিআন করয়।
সিতামিশ্রী নাম তার নির্ব্বিঘ্নে তা হয়॥
অথণ্ড মধুর রস সিতামিশ্রী নাম।
হেমবর্ণ বরিষণ হয় অবিরাম॥
সর্ব্বাদ্য সে নিত্যরস নিত্যেতে রময়।
গোপনেতে দুহা অঙ্গে বরিষণ হয়॥
সেই রস মহাঅপ্রাকৃত তার নাম।
বিহারে বরিষে রস সদা অবিশ্রাম॥
দুহু দোহ বিশ্রাম সেই উজ্জ্বল বিকার ।
ডগমগ দুহু অঙ্গ শত শুদ্ধ সার॥
রাধাকৃষ্ণ রসপ্রেম একুই সে হয়।
নিত্য নিত্য ধ্বংস নাই নিত্য বিরাজয়॥
মধুর হইলে রস জরা মৃত্যু নাই।
রাধাকৃষ্ণ বিহরএ দেহে সর্ব্বথাই॥
মৃত্যুকে করিএ জয় জায় নিতান্থান।
নিত্য সহ (?) প্রায় তার হয় অবস্থান॥
মধুর শৃঙ্গার রস দেহে জননিলে।
রাধাকৃষ্ণ নিত্যবস্ত প্রাপ্তি সেই কালে॥
মধুর শৃঙ্গাররসে বর্ত্তমান হয়।
মহা মহাপ্রলয়াদি নাহি তার ভয়॥
তরুণীরমণ কহে ভক্তগণপায়।
প্রেমসমাধি সিদ্ধ হৈলে নিত্য সিদ্ধে জায়॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
মহাকৃপাবান নেত্রে (?) করিএ আশ্বাস
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৫-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

মহাকৃপাবান নেত্রে (?) করিএ আশ্বাস।
সাধন উপায় তবে কহে চণ্ডীদাস॥
এই দেহে প্রাকৃত রস দ্রব দুগ্ধ হয়।
অগ্ধি আবর্ত্তন হৈতে হৈতে শুদ্ধ হয়॥
এই রস কর তুমি অগ্নি আবর্ত্তন।
অখণ্ড মধুর হবে শুদ্ধ হৈলে মন॥
ইহার অনল হয় প্রকৃতির সঙ্গ।
ক্রমে ক্রমে বিরাগ জাইএ হবে রঙ্গ॥
প্রকৃতি অনলে রস কর আবর্ত্তন।
স্বভাব ধীরতা হএ গুরুকে স্মরণ॥
সম্বত্সর দিন আগে ধৈর্য্য হৈলে মন।
গাঢ় রতি দিনে দিনে হইবে তখন॥
চারি মাস আগে তার চরণ সেবিআ।
পদতলে সুতি রবে স্বভাব লইআ॥
পুন আর চারি মাস চরণ সেবিআ।
বামভাগে সুতি রবে স্বভাব লইআ॥
পুনরপি চারি মাস সর্বাঙ্গ সেবিআ।
ছন্দে বন্দে সুতি রবে স্বভাব লইআ॥
আর চারি মাস তার চরণ সেবিএ।
হৃদএ রাখিবে তারে স্বভাব লইএ॥
পুন আর চারি মাস যন্ত্রে যন্ত্র দিএ।
সুস্থির হইএ রবে গুরু স্মঙরিএ॥
আর চারি মাস হয় সর্পের শৃঙ্গার।
চন্দ্রঘরে নিঃশ্বাসেতে শোষণ তাহার॥
এই মত করণেতে রতি স্থির হবে।
সাবধান হোএ চন্দ্র চালন করিবে॥
সুজাতি সর্পের হয় জেমন গমন।
তেন মতে নিজ যন্ত্র করিবে চালন॥
তাহাতে যদ্যপি রতি শূন্য হোতে চায়।
চন্দ্রঘরে গুণিএ লইবে ঊর্দ্ধ বায়॥
কামগায়ত্রী কামবীজ মনে স্মঙরিবে।
ক্রোড়াগত বন্দেতে শৃঙ্গারসুখ দিবে॥
তারপর হৃদে রাখি করিবে শৃঙ্গার।
তাহাতে অধিক সুখ হইবে দুহার॥
আসিতে চাহিলে বস্তু স্থিরতা হইবে।
চন্দ্রের ঘরেতে উর্দ্ধে নিঃশ্বাসে তুলিবে॥
ঈশরের ঘর এই ঈশ্বরের শৃঙ্গার।
মানুষের ঘর আছে সকলের পার॥
তরুণীরমণ কহে শুন ভক্তগণ।
সভে কৃপা করি দেহ মধুরত্ন ধন॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
ইবে কহি মানুষসাধনতন্বকথা
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা”-র
৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৫-
পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

ইবে কহি মানুষসাধনতন্বকথা।
তাহার আস্বাদে জায় হৃদয়ের বেথা॥
আপনার স্বভাব সপিবে তার স্থানে।
ভাহার স্বভাব নিবে করিএ যতনে॥
শৃঙ্গার ছাড়িএ তার সুতি রবে বামে।
তাহাকে আপনা মানি রবে শুদ্ধমনে॥
তাহারে নাএক রসরাজ মনে করি।
তাহারে আপন জ্ঞানে হইবে সুন্দরী॥
তাহার সর্ব্বাঙ্গ ধ্যান করি ভাবে রবে।
মন্ত্রবিদ্যা আদি করি আপনা ভুলিবে॥
আপনে উঠিএ তিহু করিবে শৃঙ্গার।
সেই দিনে শুদ্ধ হবে মানুষশৃঙ্গার॥
শৃঙ্গার সাক্ষাৎ রসরাজ রাধাকৃষ্ণ।
বর্তমান সদত থাকিবে হোএ তুষ্ট॥
মধুর মাধুর্য্য রাধা হৃদয়ে রহিবে।
মহাঅপ্রাকৃত রস বরিষণ হবে॥
নাএকস্বভাব রস তাবৎ থাকয়।
মধুর মাধুর্য্য রস তাবৎ না হয়॥
অপ্রাকৃত প্রকৃতি স্বভাবসিদ্ধ হৈলে।
কৃষ্ণ বশী হয় সদা শুনহ সকলে।
সাক্ষাৎ শৃঙ্গার কৃষ্ণ রস অফুরান॥
সে জন হইবে বশ শুনহ বিধান॥
কেমনে হইবে শুন কহিএ বিধান।
নিজ নারী সহ কর সাধন ধিআন॥
আগেতে পক্কতা হআ নিজনারী সহ।
সিদ্ধ হআ কর পরকীয়া প্রেম লেহ॥
পুন কহি শুন ভাই সাধন পত্তন।
অপক্ষেতে পরকীয়া নরকে গমন॥

শৃঙ্গার সাধন                        তাহার করণ
শুনহ করিএ মন।
স্বকীয়ার সহ                       বাড়াইএ নেহ
কর রসআবর্ওন॥
স্বকীয়ার রাগে                    ষড় ঋতু আগে
সুস্থির করিএ মন।
যন্ত্রে যন্ত্র পুরি                      গুরুকে স্মঙরি
কর নামের জপন॥
হৃদএ রাখিবে                       হৃদএ থাকিয়ে
স্থিরতা করিএ মতি।
গুমরি গুমরি                        পক্কতা হইবে
'অপক্ক এ দেহরতি॥
ষড় ঋতু পুন                        করিবে সাধন
গুরুমন্ত্র জপনেতে।
আপনা ভুলিবে                      গুরুদেহ নিবে
জীবরতি জাবে তাথে॥
শুন মহাভাগ                          পুন ষড় রাগ
জপন জে মূলমন্ত্র।
গুরু কৃষ্ণ হবে                      সে দেহ পাইবে
স্থকিত চালন যন্ত্র॥
পুন ষড় ঋতু                        সাধন করিবে
কামগায়ত্রী কামবীজে।
তিনে এক করি                     একতে রহিবে
সে দেহ ধরিএ নিজে॥
প্রতি জপনেতে                      উভয় যন্ত্রেতে
মন্থন সাধিবে ভাই।
সপ্ত এক করি                       সে বস্তু মাধুরী
পক্কতা হইবে তাই॥
স্বভাব ছাড়িএ                       স্বভাবাদি লৈএ
পুন ষড় ঋতু রবে।
মধুর আনন্দ                         গোপনে বর্ষণ
দুহু অঙ্গ না লড়িবে॥
পিআ নিত্য রস                       মধুরবিলাস
উজ্জ্বল দুহারি অঙ্গ।
তরুণীরমণ                              কহএ সঘন
অপার রসের রঙ্গ॥*॥
স্বকীয়াতে জীবদেহ সাধন করিআ।
পক্কতা হইএ সাধন কর পরকীয়া॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
পক্কতা না হএ পীরিতি করে
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৬-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ পদং॥

পক্কতা না হএ পীরিতি করে।
দুকুল হারায়ে পড়এ ফেরে॥
মহা কষ্ট পাএ নরকে রয়।
পীরিতি ভজন কভু না হয়॥
ব্রজ অনুসার জেমন রীত।
না বুঝি করএ সকাম প্রীত॥
সকাম কামেতে কামুকী নারী।
লোএ ফিরএ সঙ্গেত করি॥
তাহাতে জগৎ নিন্দিত হয়।
ভ্রষ্টাচারী বলি সকলে কয়॥
প্রেম প্রীত চিন্তা তাহাতে নাই।
সামান্য চিন্তাতে ভ্রমে সদাই॥
হিংসা নিন্দা আদি বেড়এ আসি।
কুক্রিয়া কুভাষা সদত ঘুষি॥
দেখহ এ পথ বিচার করি।
কেবা ভ্রমিঞাছে লোইএ নারী॥
ব্রজের সহজ জেমন রীত।
নিজঘরে রহি করিল প্রীত॥
সংযোগে পীরিতি ভজন করে।
অসংযোগে প্রেম মনন ধরে॥
শুরু দুরজন গঞ্জএ জত।
প্রেমানন্দ রাগ বাঢ়এ তত ॥
গুরুজনা আদি ভএতে রহে।
দেখি দেখি প্রাণ সদত চাহে॥
কভু বিপ্রলম্ভ সম্ভোগ কভু।
সদাই চিন্তএ পীরিতি প্রভু॥
জলাদি ছলনে চলিএ জায়।
নির্জনে জাইএ মিলে দুহায়॥
কহএ তরণীরমণ তাই।
কত প্রেম বাঢ়ে ওর না পাই॥*॥
এই ত কহিন শুদ্ধ সহজ বিধান।
ইবে কহি প্রেমরতির লক্ষণানুষ্ঠান।

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
রাধার লক্ষণ ধরএ জে জন
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা”-র
৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৭-
পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ পদং॥

রাধার লক্ষণ                        ধরএ জে জন
এমন নায়িকা দেখি।
তনু মন প্রাণ                        করি সমর্পণ
সে রূপ হৃদয়ে রাখি॥
বয়স কৈশোর                        চাঁচর চিকুর
সুদীর্ঘ হইব অতি।
বন্ধিম চাহুনী                        হাস্য সুবদনী
বচন মধুর জিতি॥
কমল চরণ                        স্থলপদ্ম জেন
সুকোমল সারাসার।
জবার কলিকা                   জিনি অঙ্গুলিকা
অতি সুশোভন আর॥
প্রেমপুলকিত                       সে দেহ সদত
পীরিতি জানএ সার।
নআন বাহিয়া                       পুলক হইআ
পড়ে প্রেমজলধার॥
সুমৃদু বচন                           কহে সর্ব্বক্ষণ
'অতি সুরোদন মিলে।
সদানন্দময়                             সদা বিহরয়
কৃষ্ণপ্রেমের হিল্লোলে॥
কিশোরীর ভাব                      আর অনুরাগ
সেই সুবদনী ধরে।
নাহি জানে আন                     প্রিয় অঙ্গ ধ্যান
সদা বিরহ অন্তরে॥
এই ত নায়িকা                       তত্ত্বের অধিকা
সপ্তগুণাশ্রিত সেই।
তরুণীরমণ                            @@@ @@@
@@@@@@@@॥

@ - অপাঠ্য অক্ষর।

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
স্বামীর সেবাতে জে ধনী রত
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৮-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

স্বামীর সেবাতে জে ধনী রত।
সেই প্রেমবতী জানএ প্রীত॥
সে ধনী যদ্যপি পীরিতি করে।
তনু মন প্রাণ সঁপিবে তারে॥
পীরিতি ভজন হইবে পূর্ণ।
প্রেমে প্রেমধন পাইবে তূর্ণ॥
নিজস্বামী নিন্দা জে নারী করে।
প্রেমী নহে কামী বলিএ তারে॥
পীরিতি কব়্য না তাহার সনে।
সে নারী মারিতে পারএ প্রাণে॥
তরণীরমণ কহএ ভাই।
এমন পীরিতি করিহ নাই॥*॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
রসিক রমণী মিলাবে জে
ভণিতা তরুণীরমণ
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৮-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

রসিক রমণী মিলাবে জে।
তাহারি চরণে সঁপিবে দে॥
মিলাইএ দিএ সুখ জে পায়।
সেই প্রাণবন্ধু বিকাবে পায়॥
অন্যের আলাপে ক্রোধ জে করে।
স্পর্শর না করিএ তেজিবে দূরে॥
ভকতি করিএ সকাম কামে।
কত ছল করি সকামে রমে॥
বৃন্দা আদি করি সকামী নারী।
ভুলায় নাগর ভকতি করি॥
তার রস রতি মন্থিআ নিএ।
চিকণ করএ আপন গাএ॥
জেমন জোখেতে শোণিত খায়।
তেমন সে নারী জানিবে তায়॥
তাহার আদরে জে জনা ভুলে।
সে জনা আপনা হারাল হেলে॥
বহু কান্তভোগী রোগে হয়।
শুনহ চতুর রসিকচয়॥
তার খতুপদ্মে জনমে কীটে।
বীর্য্য না পাইএ পদ্মকে কাটে॥
তাহার কামড়ে বাউলী প্রায়।
যথা তথা সদা শৃঙ্গার চায়॥
শৃঙ্গারেতে জত বীর্য্য সে পায়।
পদ্মে বসি তাহা কীটেতে খায়॥
জাতের বিচার নাহিখ করে।
রমণ লাগিএ সদত ফিরে॥
তরুণীরমণে এই সে কয়।
বিচারিএ প্রেম করিতে হয়॥*॥
এই ত কহিনু তোমায় শুনহে নকুল।
পীরিতিসাধনতত্ত্ব বিধান এই মূল॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
সহজ শৃঙ্গার রূপ মদনতরঙ্গ
ভণিতাহীন পয়ার
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৮-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ পয়ার॥

সহজ শৃঙ্গার রূপ মদনতরঙ্গ।
শৃঙ্গার সহজ রূপ আপনি অনঙ্গ॥
মদন অনঙ্গ কৃষ্ণ শৃঙ্গার আকৃতি।
সাক্ষাৎ শুঙ্গার কৃষ্ণ মদনমূরতি॥
জিহু শৃঙ্গার তিহু কৃষ্ণ বুঝহ মরমে।
সহজ রসিক হৈলে জানএ যতনে॥
সহজ মানুষ হৈলে জানএ শৃঙ্গার।
তবে সে দেখিতে পারে শৃঙ্গার আকার
শৃঙ্গারমাধুরী কৃষ্ণ জে জন জানিবে।
সহজ মানুষতত্ত্ব সে জনা পাইবে॥
বিশ্বাস হইব জার পাইবা সে জনা।
অবিশ্বাস হৈলে হবে নরকযাতনা॥
মর্ম্ম না জানিলে কেহ না জানে ভজন।
ভজন না জানিলে হয় বৃথাই জনম॥
মায়াবশে বন্দী হয় নানা যোনি ফিরে।
ঈশ্বর মায়ার বশে জানিতে না পারে॥
কদর্য্য ভক্ষণ করে নাহি জানে দুঃখ।
আপনার দেহে সেহ মানে মহা সুখ॥
মহাসুখ নির্ম্মল শৃঙ্গার না জানিঞা।
নানা যোনি ভ্রমণ করএ ভ্রান্ত হয়া॥
নির্ম্মল শৃঙ্গার সামরস অফুরান।
ইহা না জানিঞা মাত্র অধঃপাতে জান।
প্রকৃতি পুরুষ হয় রমণ কারণ।
রমণ না জানিলে কেহ না জানে মরম॥
অতঃপর কহি শুন আশ্রয় নির্ণয়।
কে কার আশ্রয় হয় শুনহ নিশ্চয়॥
প্রকৃতি পুরুষ এই ছুই দেহ হয়।
উভয়েতে দুহে দুহার হএন আশ্রয়॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর
*
সামান্য মানুষ কে
ভণিতাহীন পয়ার
কবি তরুণীরমণ
এই পদটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, নরেন্দ্রনাথ লাহা সম্পাদিত “সাহিত্য
পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ-এর “তরুণীরমণের পদাবলী ও
সহজ উপাসনা-তত্ত্ব” প্রবন্ধের ১৭৮-পৃষ্ঠায়, এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ পদং॥

সামান্য মানুষ কে।
সহজে পশেছে জে॥
সহজে পশিল জারা।
কেমনে সামান্য তারা॥
কেমনে সামান্য হয়।
সামান্য আচারময়॥
উত্তম সামান্য হয়া।
সহজে পশিল জায়া॥
সহজ বুঝিবে কে।
'আপনা জানিল জে॥
আপনা জেমন জানে।
সহজে রাখিল প্রাণে॥
সহজ মদন রতি।
শৃঙ্গার ভাবক নিতি॥
শৃঙ্গার বিলাসময়।
সদাই আনন্দে রয়॥
বুঝিআ আনন্দ রস।
সদাই তাহার বশ॥
কে তাহা কহিতে পারে।
পীরিতি লাগিয়া ঝুরে॥
নয়ানে নয়ানে রাগ।
সেই সে প্রেমেরি দাগ॥
পহিল নয়ানে প্রীত।
হিয়ায় হিয়ায় চিত॥
প্রীতিএ হানিল বাণে।
রসিক সঁপিল প্রাণে॥
চতুর্থে মরমে ভোর।
পঞ্চমে রসেরি চোর॥
শৃঙ্গার রতিতে ভোরা।
তিলে শতবার হারা॥
তরুণীরমণে কয়।
শুনহ রসিকচয়॥ *॥

.            ****************              
.                                                                                
সূচীতে . . .    



মিলনসাগর