কবি তরুণীরমণ বা তরণীরমণ -
অদ্যবধি মনে করা হয় যে এই ভণিতার কবি
সম্ভবত
চৈতন্য  সমসাময়িক অথবা অব্যবহিত
পরবর্তী কালের কবি ছিলেন। বিভিন্ন গ্রন্থে
তাঁর নাম মূলত দুটি ভাবে পাওয়া যায়।
বানানভেদ সহ “তরুণীরমণ” ও “তরণীরমণ”।
আমাদের অনুমানে “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থের  রচনাকার মুকুন্দদাস গোস্বামীই এই “তরুণীরমণ”-ভণিতার  
পদকর্তা ছিলেন। আমাদের এই মত এবং বিবেচনার সপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করেছি এই আলেখ্যে।  
তা পড়তে
এখানে ক্লিক করুন . . .    

এই “তরুণীরমণ” বা “তরণীরমণ” ভণিতার কবি মুকুন্দ দাস গোস্বামী বা মুকুন্দ দত্ত, শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক
প্রখ্যাত কীর্ত্তনীয়া ও
শ্রীচৈতন্যের প্রিয় পার্ষদ মুকুন্দ দত্ত নন। কীর্ত্তনীয়া ও শ্রীচৈতন্যের প্রিয় পার্ষদ মুকুন্দ
দত্তের “
মুকুন্দ” ভণিতার দুটি পদ আমরা পূর্বেই মিলনসাগরে কবি "মুকুন্দ"-এর বৈষ্ণব পদাবলীর পাতায়
তুলেছি। সেই পাতায় যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .    

জগদীশ্বর গুপ্ত দ্বারা সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহ সম্পাদিত
কৃষ্ণদাস কবিরাজের “শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থের
“গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী”-তে তিনি
কৃষ্ণদাস কবিরাজের “মুকুন্দ দত্ত” নামের একজন শিষ্যের উল্লেখ  
করেছেন যাঁর চেষ্টার ফলে চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থটি জীব গোস্বামীর প্রচ্ছন্ন বিপরীত চেষ্টা সত্তেও লোকসমক্ষে
আসতে পেরেছিলো। আমরা নিশ্চিত যে, মুকুন্দদাস গোস্বামীরই পূর্বের নাম ছিল মুকুন্দ দত্ত। বৈষ্ণব  
রীতিতে তাঁর নামের সঙ্গে দাস পদবী যুক্ত হয় স্বাভাবিক নিয়মেই। জগদীশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত  
“শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থের “গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী” থেকে আমরা সেই বিবরণের অংশটি এখানে  
তুলে দিয়েছি। সেই অংশটি পড়তে
এখানে ক্লিক করুন . . .    

কৃষ্ণদাস কবিরাজের শিষ্য মুকুন্দদাস গোস্বামী বিরচিত “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থের এক কবির ভণিতা  
“তরুণীরমণ” দেওয়া রয়েছে।
বৈষ্ণবদাসের শ্রীশ্রীপদকল্পতরুতে “তরণীরমণ” ভণিতায় একটি মাত্র
পদ “ঐছন সঙ্কেত ভাবিয়া রাই” পাওয়া যায়। যেহেতু “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থটিই সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ যাতে এই
কবির পদ  পাওয়া গিয়েছে, আমরা কবির নাম “তরুণীরমণ” ধরেই এগোচ্ছি। তরুণীরমণের বহু সহজিয়া
মতাবলম্বী  পদও পাওয়া গিয়েছে। আমরা তাঁর বৈষ্ণব পদাবলীর পাশাপাশি, সহজিয়া মতের পদাবলীও
এখানে তুলেছি।

যে হেতু আমরা মনে করছি যে তরুণীরমণ অথবা তরণীরমণ ভণিতার পদকর্তা মুকুন্দদাস গোস্বামী ছাড়া  
আর কেউ নন, তাঁর সম্বন্ধে তাঁর “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থটি থেকে আমরা জানতে পারি যে মুকুন্দদাস গোস্বামী
কৃষ্ণদাস কবিরাজের মন্ত্রশিষ্য ছিলেন।

সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয় গ্রন্থের প্রথমপ্রকরণং এর প্রথম শ্লোকটিই শ্রীরাধার প্রিয়সংঙ্গিনী, বৃন্দাবনের গোপিণী কস্তূরি
দেবীর বন্দনা . . .

বন্দে কস্তূরিকাং দেবীং কৃষ্ণস্য প্রিয়বল্লভাং।
রত্যাদিগুণসংযোগাদ্রাধিকা-প্রিয়সঙ্গিনীং


অর্থাৎ
রত্যাদি গুণ সংযুক্ত থাকায় যিনি শ্রীরাধার প্রিয়সঙ্গিনী হইয়াছেন, সেই শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়বল্লভা কস্তূরী দেবীকে
আমি বন্দনা করি॥---রাসবিহারী সাঙ্খ্যতীর্থ, সম্পাদক “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়”॥

১৯২৪ সালে প্রকাশিত হরিলাল চট্টোপাধ্যায়ের বৈষ্ণব-ইতিহাস গ্রন্থের ৫ম অধ্যায়, পঞ্চতত্ত্ব ও ব্যক্তিগত  
সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ১৩৬-পৃষ্ঠায় নবমঞ্জরী-পরিচয় দেওয়া রয়েছে। সেখান থেকে জানা যাচ্ছে যে ব্রজলীলার  
শ্রীকস্তুরী মঞ্জরীর গৌরাঙ্গলীলায় নাম হয় শ্রীকৃষ্ণদাস গোস্বামী। অর্থাৎ গ্রন্থটি শুরু হয়েছে
কৃষ্ণদাস কবিরাজের
বন্দনা দিয়ে।

এরপরে রয়েছে বৃন্দাবনের ষট্ গোস্বামীগণের এবং
কৃষ্ণদাস কবিরাজের বন্দনা . . .

স্বরূপ রূপ রঘুনাথ শ্রীসনাতন।
ভট্টযুগ শ্রীজীব শ্রীগুরু গোসাঞিগণ॥
তা সভার পাদপদ্ম ধরি শির’পরি।
তা সভার গুণ গাই মনোবাঞ্ছা ভরি॥
জন্মে জন্মে প্রভু মোর কবিরাজ গোসাঞি।
তাঁহার তুলনা দিতে ত্রিভুবনে নাই


গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায় বা প্রকরণ শেষের ভণিতাতেও
কৃষ্ণদাস কবিরাজের বন্দনা রয়েছে যা প্রমাণ করে যে
মুকুন্দদাস গোস্বামী, কৃষ্ণদাস কবিরাজের মন্ত্রশিষ্য ছিলেন . . .

কবিরাজ গোসাঞির পাদপদ্ম করি ধ্যান।
যাহা হইতে স্ফূরে মোর এ সব আখ্যান


মুকুন্দদাস গোস্বামী ওরফে তরুণীরমণের জন্মকাল, রাসবিহারী সাঙ্খ্যতীর্থর অনুমানে ১৪৫৩ শকাব্দ (১৫৩১
খৃষ্টাব্দ)। তাঁর অন্যান্য রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে “অমৃত রত্নাবলী”, “রসতত্ত্বসার”, “রাগরত্বাবলী”, “আদ্যসার-
তত্ত্বকারিকা”, “আনন্দরত্নাবলী”, “সাধ্যপ্রেম চন্দ্রিকা” এবং “উপাসনাবিন্দু”। এ নিয়ে মুকুন্দদাস গোস্বামী  
বিরচিত “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থের সম্পাদক রাসবিহারী সাঙ্খ্যতীর্থর উদ্ধৃতি পড়তে
এখানে ক্লিক করুন . . .
তরুণীরমণই সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়ের রচয়িতা মুকুন্দদাস গোস্বামী   
মুকুন্দদাসের (তরুণীরমণ) পরিচয় নিয়ে রাসবিহারী সাঙ্খ্যতীর্থর উদ্ধৃতি  
এই মুকুন্দদাস গোস্বামী ও চৈতন্য পার্ষদ কীর্তনীয়া মুকুন্দ ভিন্ন ব্যক্তি  
শিষ্য মুকুন্দই গুরু কৃষ্ণদাসের গ্রন্থ কে লোকসমক্ষে আনার মূলে   
পদকল্পতরুতে তরণীরমণ ভণিতা নিয়ে ধন্ধ    
তরণী-রমণ চণ্ডীদাসের সমস্যা!? মণীন্দ্রমোহন বসুর উদ্ধৃতি   
তরুণীরমণের কাব্য ও সহজিয়া মত নিয়ে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ   
তরুণীরমণ না তরণীরমণ, এই নিয়ে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি   
তরণীরমণ নিয়ে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর উদ্ধৃতি    
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
আমরা মিলনসাগরে  কবি তরুণীরমণ বা তরণীরমণের পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলে এই  প্রচেষ্টাকে সফল মনে করবো।



কবি তরুণীরমণের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন

আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৪.৪.২০২০ নববর্ষে।
এই পাতার কবিতার ভণিতা -
তরুণীরমণ, তরণীরমণ.
তরণিরমণ, তরণী রমণ
.
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি -                                   পাতার উপরে . . .  
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক,
শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র
সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের
একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .

“. . .
বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ
আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই
।”
.
তরুণীরমণই সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়ের রচয়িতা মুকুন্দদাস গোস্বামী -                    পাতার উপরে . . .  
রসকদম্বের সম্পাদক তারকেশ্বর ভট্টাচার্য্য ১৯১৯ সালে (১৩২৬বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, “সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা”-
র ৪র্থ সংখ্যায় প্রকাশিত “তরুণীরমণের পদাবলী” প্রবন্ধের ২১০-পৃষ্ঠায় তরুণীরমণ সম্বন্ধে একটি চাঞ্চল্যকর
কথা লিখেছিলেন . . .

তরুণীরমণের পদাবলী হইতে প্রকাশ পায় যে তিনি ভগবৎপ্রেমিক পরম বৈষ্ণব ছিলেন। চৈতন্য সমসাময়িক
হইলে ইনি তাঁহার পারিষদভুক্ত না হইয়া পারিতেন না ; চৈতন্যের সময়ে বা তাহার পরে জন্মিলেও ইহাঁর  
পদাবলীতে চৈতন্য এবং তাঁহার পারিষদগণের কিছু-না-কিছু উল্লেখ থাকিতই। কিন্তু সেরূপ কিছু পাওয়া  
যাইতেছে না ;  সুতরাং  অনুমান  করিতে হয়,  তরুণীরমণ চৈতন্যের সমসাময়িক বা তাঁহার বহু পরবর্ত্তী
নহেন। এতদ্ব্যাতীত কবির সম্বন্ধে আর অধিক কিছু জানা যায় নাই।
শেষে আলোচনার পর আমার
সন্দেহ  হইয়াছে যে, সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয় গ্রন্থখানির রচয়িতা স্বয়ং তরুণীরমণ
।”

আমরা তরুণীরমণ সম্বন্ধে তারকেশ্বর ভট্টাচার্য্যর “চাঞ্চল্যকর কথা” বলতে উপরোক্ত অনুচ্ছেদের  শেষে
মোটা হরফে দেওয়া পংক্তিটির কথাই বলেছি। কারণ পদের ভণিতা ছাড়া, তরুণীরমণ নামের উল্লেখ  
আমরা আর কোনও বৈষ্ণব গ্রন্থে পাইনা। এমন কি কোনও শাখা-নির্ণয়, পাট-নির্ণয়, বংশপরিচয় ইত্যাদি  
কোনওখানেই এই  নামটির  উল্লেখ আমরা এখনও পাই নি। অথচ রাসবিহারী সাঙ্খ্যতীর্থ দ্বারা সম্পাদিত  
সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয় গ্রন্থে  তরুণীরমণের পদসংখ্যাই সর্বাধিক! গ্রন্থে গোবিন্দদাসের মাত্র ৮টি, বিদ্যাপতির ৬টি,
অন্যান্য কবির আরও অল্পসংখ্যক পদের পাশাপাশি তরুণীরমণের ৪৫টি পদ এই গ্রন্থে সংগৃহীত দেখা যায়।

শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর সংকলক
বৈষ্ণবদাসের আবির্ভাবের পূর্বে যত পদাবলী সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে
সংকলকের স্বরচিত পদের সংখ্যাই সর্বাধিক পাওয়া গিয়েছে। কেবল
বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর শ্রীশ্রীক্ষণদা-
গীতচিন্তামণিতে
গোবিন্দদাসের পদসংখ্যা সর্বাধিক রয়েছে। আমরা বৈষ্ণবদাসের শ্রীশ্রীপদকল্পতরু পর্যন্ত  
বিভিন্ন পদাবলীতে সন্নিবেশিত সংকলকের এবং
গোবিন্দদাসের পদসংখ্যা নিয়ে একটি চার্ট তৈরী করে  
দিলাম।
এখানে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে যে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বাদে, বৈষ্ণবদাস পূর্ববর্তী অন্যান্য সংকলকগণ তাঁদের   
সংকলনে নিজেদের পদসংখ্যাই সর্বাধিক সন্নিবেশ করছেন। সেই সাথে “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থে “তরুণীরমণ”-
এর পদের সংখ্যা সর্বাধিক হওয়াটা এটাই নির্দেশ করছে যে সম্ভবত  তরণীরমণই এই  গ্রন্থের  সংকলক
ছিলেন।
বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর “হরিবল্লভ” ভণিতার মত, “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থের রচনাকার মুকুন্দদাস  
গোস্বামীর  ভণিতাও “তরুণীরমণ”-ই ছিল বলে আমাদের অনুমান যা আমরা সঠিক বলে মনে করছি।

এর সাথে রয়েছে তরুণীরমণের সহজিয়া সাধন ভজন। সম্ভবত সেই যুগে বৈষ্ণব গোস্বামীরা তাঁদের সহজিয়া
মতের সঙ্গে একাত্ম হওয়াটাকে প্রচ্ছন্ন রাখাই সমীচীন মনে করতেন। সেই জন্য “তরণীরমণ” ভণিতায়,   
মুকুন্দদাস গোস্বামীই পদ রচনা করে গিয়েছেন যার বহু পদই সহজিয়া ভজন-সাধনের সঙ্গে যুক্ত। মিলনসাগরে
আমরা তাঁর বৈষ্ণব পদাবলীর পাশাপাশি, সহজিয়া মতের পদাবলীও তুলে দিয়েছি।

এই পাতার বিষয় বস্তুর একটু বাইরে গিয়ে এখানে উল্লেখ করতে চাই যে
বৈষ্ণবদাসের পদকল্পতরু থেকে  
শুরু করে, বিভিন্ন পদাবলী সংকলনে সহজিয়া মতাবলম্বী
চণ্ডীদাসের পদসংখ্যার আধিক্য দেখা যায়, নবাব
মুর্শিদকুলী খাঁর রাজসভায় অনুষ্ঠিত স্বকীয়াবাদ বনাম পরকীয়াবাদের বিতর্কসভায়
রাধামোহন ঠাকুর দ্বারা  
পরকীয়াবাদের জয়, শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠার পরেই, অষ্টাদশ শতকে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো  
দীনবন্ধুদাসের "সংকীর্ত্তনামৃত", যেখানে চণ্ডীদাসের একটিও পদ নেই।

তাই তারকেশ্বর ভট্টাচার্য্যের উপরোক্ত “শেষে আলোচনার পর আমার সন্দেহ হইয়াছে যে, সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়
গ্রন্থখানির রচয়িতা স্বয়ং তরুণীরমণ” এই উক্তির সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণ সহমত পোষণ করে জানাচ্ছি যে,   
সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয় গ্রন্থখানির রচয়িতা মুকুন্দদাস গোস্বামীই, “তরুণীরমণ” ভণিতার পদকর্তা ছিলেন।
.
মুকুন্দদাসের (তরুণীরমণ) পরিচয় নিয়ে রাসবিহারী সাঙ্খ্যতীর্থর উদ্ধৃতি -      পাতার উপরে . . .  
এর পূর্বের অনুচ্ছেদে আমরা বলেছি যে আমরা মনে করি - তরুণীরমণই সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়ের রচয়িতা  
মুকুন্দদাস গোস্বামী।

১৯০৫ সালে প্রকাশিত, রাসবিহারী সাঙ্খ্যতীর্থ দ্বারা সম্পাদিত মুকুন্দদাস গোস্বামী বিরচিত সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়  
গ্রন্থের “গ্রন্থের পূর্ব্বাভাস” এ গ্রন্থকর্ত্তার কিঞ্চিৎ পরিচয়-এ তিনি যা লিখেছেন একটু দীর্ঘ হলেও তা আমরা  
তুলে দিচ্ছি . . .

ভক্তদিগ্দর্শিনীতেও অবগত হওয়া যায় যে, ১৪১৮ শকাব্দে কৃষ্ণদাস জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৬ বৎসর বয়সে
অর্থাৎ, ১৫০৪ শকাব্দের আশ্বিন মাসের শুক্লা দ্বাদশ্রীতে শ্রীশ্রীরাধাকুণ্ডতীরে অন্তর্ধান করেন। ইহাতেও অধিক
ইতর বিশেষ দেখা যায় না, মাস ধরিয়া গণিলে প্রায় ঠিক হয়।

মুকুন্দদাস যখন কৃষ্ণদাসের আশ্রয় গ্রহণ করেন, তখন গুরুদেবের সেবা শুশ্রূষাই তাঁহার কর্তব্য কর্ম্ম ছিল
এবং অধ্যয়নাদিও শেষ করিয়াছিলেন, সেই সময় মুকুন্দদাসকে নূনাধিক ৩৫, বর্ৎসরের লোক ধরিলে এবং
কৃষ্ণদাসের জন্ম সময়ের হিসাবে, কম বেশী ১৪৫৩ শাকে মুকুন্দের জন্ম হয়।

মুকুন্দদাস পঞ্চালদেশীয় শ্রীসম্প্রদায়ী বৈষ্ণব, জাতি ব্রাহ্মণ। ইনি বিশেষ সদাচার ও বৈষ্ণবশাস্ত্রে সুপণ্ডিত
ছিলেন। কালক্রমে শ্রীবৃন্দাবনে শ্রীশ্রীরাধাকুণ্ডে আসিয়া শ্রীকষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর নিকট ভক্তিশান্ত্র
অধ্যয়ন করিতে আরস্ত করিয়া, অতিবৃদ্ধ কষ্ণদাসের সেবা শুশ্রূষায় বিশেষ মনোযোগী হন এবং কৃষ্ণদাসের
দেহাস্তর ঘটিলে, অতীব দুঃখের সহিত কালাতিপাত করিতে থাকেন। .বহু দিন পর শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তী
বৃন্দাবনে উপস্থিত হইলে, তাঁহাকে পাইয়া মুকুন্দের গুকবিরহজনিত দুঃখের আনেক পরিমাণে হ্রাস হয়।

মুকুন্দদাস নিজে অনেক গুলি লীলাগ্রস্থ আরম্ভ করিয়া নিজের শেষাবস্থায় বিশ্বনাথ দ্বারা তাহার পূর্ণতা
সম্পাদন করেন। এই ব্যাপারের কিয়দ্দিন পরেই মুকুন্দের নশ্বর মানবদেহ অপ্রকট হয়।

শ্রীমন্মহাপ্রভু নীলাচলক্ষেত্রে রঘুনাথদাস গোস্বামীকে যে গোবর্দ্ধন শিলা প্রদান করিয়াছিলেন, দাস গোস্বামীর
অপ্রকটের পর ক্বষ্ণদাস ঐ শিলার অর্চ্চনা করিতেন, তৎপরে মুকুন্দদাস তাঁহার অর্চ্চনভার গ্রহণ করেন।
শ্রীনরোত্তমদাস ঠাকুর মহাশয়ের শিষ্য গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্ত্তীর কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া বন্দাবনে যাইয়া শ্রীশ্রীরাধাকুণ্ডে
বাস করিতেন, তিনি মুকুন্দের, বার্দ্ধক্যদশায় শুশ্রূষাদি করায় তাঁহার প্রতি পরিতুষ্ট হইয়া গুরুপরম্পরালব্ধ
গোবর্দ্ধনশিলা ঐ বিষুপ্রিয়াকে সমর্পণ করেন।

বিষ্ণুপ্রিয়া আবার সময়ে সময়ে তাহা বিশ্বনাথকে অর্পণ করিতেন। উল্লিখিত প্রসিদ্ধ শিলা সম্প্রতি শ্রীবৃন্দাবনে
শ্রীগোকুলানন্দ বিগ্রহের নিকট অবস্থিতি করিতেছেন। বিষ্ণুপ্রিয়া মহাপ্রেমময়ী ছিলেন, শিলামধ্যে সাক্ষাৎ
ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করিতেন, বস্তুত; উক্ত শিলার স্বভাবই এইরূপ। শ্রীযুত দাস গোস্বামীকেও
ঐরূপে দর্শন প্রদান করিতেন। বাস্তবিক উৎকট চিন্তাপ্রবাহে বা মহাপ্রেমে কি না হইতে পারে।

কেছ কেহ অনুমান করেন যে, “মুকুন্দের ধর্ম্মমত গোস্বামিপাদদিগের মতের বিপরীত ছিল, কৃষ্ণদাসের মতও
সুতরাং তদ্রূপ, কারণ তিনি গুরু, মুকুন্দ শিষ্য, এতৎ-সঙ্গী বলিয়া বিশ্বনাথের মতও কিছু অন্যরূপ”। এই
অন্থুমান সম্পূর্ণ ভ্রমাত্বক। কৃষ্ণদাস যদি গোস্বামিপথের বিপরীতই হইবেন, তবে তাঁহার গ্রন্থ জীবগোস্বামিপাদ
প্রভৃতি আদরের সহিত কেন গ্রহণ করিবেন, আর আবহমান কাল বিশুদ্ধ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে রাজ্য করিবে
কেন? আরও বলি, যিনি সর্বশাস্ত্রের পারদর্শী, তাঁহার মত যে কুৎসিত, ইহা সর্ব্বথা অসম্ভব। তবে এই
বলিতে পারি যে, ক্বষ্ণদাস যে, ভগবানের গূঢ়লীলা বিস্তার করিয়াছেন, তাহার পাঠের অধিকারী অতি বিরল।
অনধিকারীর হস্তে প্রস্থ পড়িয়াছে, তাহারা উহার বিপরীত একটা মনগড়া অর্থ করিয়া গ্রন্থকর্ত্তাকেও সেই
দোষে দুষিত করিতেছে।

মুকুন্দের পূর্ব্ববাস যদিও পঞ্চাল দেশে ছিল, তথাপি তিনি সিউড়ী জেলার অন্তর্গত দুবরাজপুরে কিছু কাল
অবস্থিতি করিয়াছিলেন, কারণ ঐ স্থান মূকুন্দদাসের পাঠ বলিয়া অনেকে বিশ্বাস করেন।

... কতিপয় বাঙ্গলা পদ্য গ্রন্থ মুকুন্দপ্রণীত বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে। সেই সকল গ্রস্থাবলী কিছু নিগৃঢ়ার্থে পরিপূর্ণ।
তাহার আপাততঃ প্রতীয়মান অর্থ লইয়া অনেক মতদ্বৈধ ঘটিয়া থাকে। মুকুন্দের গ্রন্থাবলী এই :---

১--সিদ্ধান্তচন্দ্রোয়। ২--অমৃত রত্নাবলী। ৩--রসতত্ত্বসার। ৪--রাগরত্বাবলী। ৫--আদ্যসার-তত্ত্বকারিকা। ৬--
আনন্দরত্নাবলী। ৭--সাধ্যপ্রেম চন্দ্রিকা এবং ৮--উপাসনাবিন্দু
।”
.
শিষ্য মুকুন্দই গুরু কৃষ্ণদাসের চৈতন্যচরিতামৃতকে লোকসমক্ষে আনার মূলে -  পাতার উপরে . . .  
জগদীশ্বর গুপ্ত দ্বারা সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহ ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত ও প্রকাশিত,
কৃষ্ণদাস কবিরাজের
১৫৮১ খৃষ্টাব্দে বিরোচিত, “শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থের “গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী”-তে তিনি
কৃষ্ণদাস
কবিরাজের “মুকুন্দ দত্ত” নামের একজন শিষ্যের উল্লেখ করেছেন যাঁর চেষ্টার ফলে চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থটি
জীব গোস্বামীর প্রচ্ছন্ন বিপরীত চেষ্টা অথবা কপট ক্রোধ প্রদর্শন সত্ত্বেও লোকসমক্ষে আসতে পেরেছিলো।
আমরা নিশ্চিত যে, মুকুন্দদাস গোস্বামীরই পূর্বের নাম ছিল মুকুন্দ দত্ত। বৈষ্ণব রীতিতে তাঁর নামের সঙ্গে
দাস পদবী যুক্ত হয় স্বাভাবিক নিয়মেই। জগদীশ্বর গুপ্ত সম্পাদিত “শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থের গ্রন্থকারের
সংক্ষিপ্ত জীবনী থেকে আমরা সেই বিবরণের অংশটি এখানে তুলে দিয়েছি। জগদীশ্বর গুপ্ত লিখেছেন . . .

চৈতন্য চরিতাস্থত রচনা আরম্ভ হইবার পূর্বেই রূপ ও রঘুনাথ দাস গোস্বামী ন্বর্গারোহণ করিয়াছিলেন ;  
মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ শিষ্যের মধ্যে কেবল জীব গোস্বামী ও শিবানন্দ সেনের পুত্র কবিকর্ণপূর গ্রন্থ সম্পূর্ণ হওয়া
পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন। এই অপুর্ব্ব গ্রন্থের উত্পত্তি এই প্রকারে হইয়াছিল :--- বন্দাবনবাসী বৈষ্ণবমণ্ডলী প্রতি
দিন অপরাহ্নে প্রীযুত বৃন্দাবন দাস বিরচিত চৈতন্য মঙ্গল নামক গ্রন্থ শ্রবণ করিতেন ; কিন্ত ঐ গ্রন্থে চৈতন্য
দেবের শেষলীলা বিস্তৃত রূপে বর্ণিত না থাকায়, তাঁহাদের আশা পরিতৃপ্ত হইত না। সে জন্য গোবিন্দ  
মন্দিরের সেবাধ্যক্ষ শ্রীযুক্ত হরিদাস পণ্ডিতপ্রমুখ বৈষণবগণ কৃষ্ণদাসকে তদ্বিষয়ে একখানি গ্রন্থ রচনা করিতে
আদেশ করিলেন। কৃষ্ণদাস যদিও তখন বৃদ্ধ ও জরাগ্রস্ত, কিন্তু বৈষ্ণবাজ্ঞাবলে নবোৎসাহে উৎসাহিত হইয়া
এই গুরুতর কার্য্যভার গ্রহণ করিলেন ; এবং সেই দিনেই মদন মোহন মন্দিরে যাইয়া শ্রীবিগ্রহের নিকট আজ্ঞা
প্রার্থনা করিলেন। কথিত আছে যে ঐ সময়ে দেবতার কণ্ঠদেশ হইতে পুষ্পমালা খসিয়া পড়িয়াছিল ; তাহাতে
মদন মোহনের আজ্ঞানুমতি হইয়াছে বুঝিয়া সকলে আনন্দে হরি ধ্বনি করিয়া উঠিলেন এবং গ্রন্থকার সেই
খানেই গ্রন্থের মঙ্গলাচরণ শ্লোক রচনা করিলেন। এই গ্রন্থের রচনা সমাপ্ত হইতে কত দিন লাগিয়াছিল তাহা
জানা যায় না ; তবে গ্রন্থখানির আয়তন ও বিবিধ শাস্ত্রোদ্ধৃত শ্লোকাবলী দৃষ্টে অনুমান হয়, যে দীর্ঘ সময়
ব্যতীত ইহা সম্পূর্ণ হইবার সম্ভাবনা ছিল না।

রাধাকুণ্ডতীরে গ্রন্থ প্রণয়ণ পরিসমাপ্ত হইলে, ইহা  প্রকাশ  করিবার জন্য কৃষ্ণদাস অতিশয় ব্যগ্র হইয়া  
পড়িলেন। তৎকালের নিয়মানুসারে গ্রন্থ প্রকাশের পূর্বে স্থানীয় প্রধান প্রধান মান্য ব্যক্তির অনুমতি লইতে  
হইত। তাঁহারা গ্রন্থ পাঠ করিয়া যদি প্রকাশ যোগ্য বিবেচনা করিতেন, তবে গ্রন্থশেষে নিজ নিজ নাম স্বাক্ষর
করিয়া দিতেন ; তখন নে গ্রন্থ সাধারণে লিখিয়া লইতে পারিত। তৎকালে জীব গোস্বামীই বন্দাবনস্থ বৈষ্ণব
সমাজের অভিনেতা ছিলেন ; বৃদ্ধ কবিরাজ গ্রন্থখানি সঙ্গে লইয়া জীবের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে ইহা
পাঠ  করিতে ও প্রকাশের অনুমতি দিতে অনুরোধ করিলেন। জীব গোস্বামী আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া  
দেখিলেন যে বৈষ্ণব ধর্ম্মের গূঢ় রহস্য ও চৈতন্যোপদেশ সকল বঙ্গভাষায় বিবৃত হইয়াছে ; তাহা  
অবলীলাক্রমে সাধারণের আয়ত্তাধীন হইবে, অথচ রূপ, সনাহন ও তাঁহার স্বরচিত সংস্কৃত গ্রন্থ সকল  
অপ্রচারিত থাকিবে ; কেহ আর সে সকলের আদর করিবে না। এই আশঙ্কা করিয়া @@@ জীব গোস্বামী
কোপাবিষ্ট হইয়া যমুনার জলস্রোতে ঐ গ্রন্থ নিক্ষেপ করিলেন। বর্নিত আছে যে গ্রন্থ ভাসিতে ভাসিতে মদন
মোহনের ঘাটে আসিয়া লাগিয়াছিল ; তখন জীব গোঁসাই তাহা তুলিয়া আনিয়া গোস্বামীদিগের অপরাপর
গ্রন্থের সামিল একটি কুঠরীর মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিলেন। কেহ কেহ বলেন যে সাধারণে গ্রন্থের আশ্চর্য্য
মহিমা প্রতিপন্ন করিবার জন্য জীবগোস্বামী এই কৃত্রিমকোপ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। যাহা হউক বৃদ্ধ বয়সের
বহুযত্নের ধন গ্রন্থের এই দশা হইল দেখিয়া, কৃষ্ণদাস মর্ম্মাহত হইয়া শোকাকুল চিত্তে মথুরায় গমন করিলেন
এবং আহার নিদ্রা পরিত্যাগ, পুর্ব্বক সর্বদা এই খেদ করিতে লাগিলেন যে সাধারণে পড়িবে বলিয়া তিনি বহু
যত্নে যে গ্রন্থ রচনা করিলেন তাহা প্রকাশিত হইল না ও শ্রীচৈতন্যের শেষ লীলাও অপ্রচারিত রহিয়া গেল।

এই সময়ে মুকুন্দ দত্ত নামে কবিরাজের জনৈক শিষ্য তাঁহাকে জানাইলেন যে যখন চৈতন্যচরিতামৃত রচিত
হইতেছিল ; তাহার এক এক .পরিচ্ছেদ পরিসমাপ্ত হইলে, তিনি (মুকুন্দ) উহা চাহিয়া লইয়া এক এক
প্রস্ত নকল করিয়া রাখিয়াছেন। এই রূপে সমন্ত গ্রন্থের প্রতি লিপি তাঁহার নিকটে রহিয়াছে। ইহা শ্রবণে বৃদ্ধ
কবিরাজের আনন্দের সীমা থাকিল না। তিনি ঐ প্রতিলিপি খানি আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া সংশোধনান্তে তাহা
গোপনে রাখিয়া দিলেন। ইত্যবসরে শিবানন্দ সেনের পুত্র কবিকর্ণপুর বঙ্গদেশ হইতে শ্রীবৃন্দাবনে আসিয়া
উপনীত হইলেন এবং কৃষ্ণদাসের বাচনিক গ্রন্থ বিবরণ আদ্যোপান্ত অবগত হইয়া জীবকে তাহা জানাইলেন ;
এবং ঐ গ্রন্থের টীকা করিয়া তাহা প্রচার করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। জীব গোস্বামী অগত্যা
কবিকর্ণ পুরের অনুরোধ রক্ষা করিতে সম্মত হইয়া কুঠরী হইতে গ্রন্থ বাহির করত তাহাতে অনুমোদন
স্বাক্ষর করিলেন এবং প্রতি পরিচ্ছেদের শেষে ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ পর্য্যন্ত লিখিত ছিল; তিনি “কহে কৃষ্ণদাস'
ভনিতা বসাইয়া দিলেন।

তখন বৃন্দাবনবাসীগণ সকলে ঐ গ্রন্থ লিখিয়া লইলেন ; এবং ব্রজ ধামে উহা প্রচারিত হইয়া গেল। কিন্তু জীব
গোস্বামী প্রভৃতি বৈষবগণ এগ্রন্থ বঙ্গদেশে পাঠাইতে কিছুতেই সম্মত না হওয়ায় কৃষদাস মুকুন্দ দ্বারা  
পূর্ব্বোল্লিখিত নকলটি নবদ্বীপে পাঠাইয়া দিলেন। তদবধি উহা ক্রমে ক্রমে এ দেশের সর্ব্বত্র প্রচারিত হইয়া
পড়িল। কৃষ্ণদাসের স্বহস্ত লিখিত মূলগ্রন্থ অদ্যাবধি বৃন্দাধনে রাধাদামোদরের মন্দিরে দেবতার ন্যায় পূজিত
হইয়া আসিতেছে ; তাহা এদেশে কখন আইসে নাই
।”
.
পদকল্পতরুতে তরণীরমণ ভণিতা নিয়ে ধন্ধ -                                          পাতার উপরে . . .  
বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর বেশীরভাগ প্রাপ্ত পুথিতে “ঐছন সঙ্কেত ভাবিয়া রাই” পদটির ভণিতা
“তরণী রমণ” পাওয়া গিয়েছে। মিলনসাগরে এই পদটির পাদটীকায় এই সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ তুলে
দেওয়া হয়েছে। সেই পুথিগুলিতে ভণিতার কলি এইভাবে দেওয়া রয়েছে . . .

সখীগণ মেলি সঙ্কেত-গেহে।
আওল তরণী রমণ কহে
॥’

অর্থাৎ “তরণী” এবং “রমণ” শব্দদ্বয়ের এর মধ্যবর্তী ব্যবধান থাকার দরুণ কবির ভণিতা “রমণ” এ দাঁড়ায়
। সম্ভবত সেই কারণেই ১৯১৯ সালে (১৩২৬বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত, “সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায়  
প্রকাশিত “তরুণীরমণের পদাবলী” প্রবন্ধের লেখক তারকেশ্বর ভট্টাচার্য্য মনে করতেন যে পদকল্পতরুতে  
"তরুণীরমণ”-এর কোনও পদ ছিল না। তিনি তাঁর প্রবন্ধে “সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়” গ্রন্থে উদ্ধৃত পদকর্তাগণের নাম
উল্লেখ করার সময়ে লিখেছেন . . .

সিদ্ধান্তচন্দ্রোদয়ে নিম্নলিখিত মহাত্মগণের পদ উদ্ধৃত হইয়াছে,---বিল্বমঙ্গল (?), চণ্ডীদাস, যদুনাথ, গোবিন্দদাস,
জ্ঞানদাস, বঙ্ক, তরুণীরমণ।

ইহাঁদের মধ্যে প্রথম তিনজন চৈতন্যের বহু পূর্ব্বে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস ও যদুনাথ,
চৈতন্যের শেষ বয়সে ও তাঁহার তিরোধানের অব্যবহিত পরে বর্ত্তমান ছিলেন। বঙ্ক ও তরুণীরমণের নাম
আমরা এই প্রথম পাইলাম। পদকল্পতরুতে ইহাঁদের উভয়ের কাহারও নাম নাই। চৈতন্যের পারিষদবর্গের
মধ্যেও ইহাঁদের কাহাকেও পাই নাই
।”
.
তরণী-রমণ চণ্ডীদাসের সমস্যা!? মণীন্দ্রমোহন বসুর উদ্ধৃতি -                     পাতার উপরে . . .  
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রকুমার বসু সম্পাদিত “মাসিক বসুমতী” পত্রিকার বৈশাখ ১৩৩৪ (মে  
১৯২৭) সংখ্যায়  প্রকাশিত মণীন্দ্রমোহন বসু তাঁর “তরণী-রমণ চণ্ডীদাস” প্রবন্ধটিতে, বৈষ্ণব-সাহিত্যের  
চলমান “একাধিক চণ্ডীদাস-সমস্যা”-টি কে আরও জটীলতর করে দেওয়ার কাজ প্রায় করে ফেলেছিলেন!

তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১১১ সংখ্যক “রত্নসার” (রচয়িতা কৃষ্ণদাস) নামক পুথির ১৮৭ পৃষ্ঠায় প্রাপ্ত
এই দুটি কলি ও তার ঠিক পরে “তরণী রমন” এর একটি পদ উদ্ধৃত করেন . . .

ইহা জানি চণ্ডীদাস তরণী-রমণ।
গীত-ছন্দে গাহিলেন পিরীতি সে ধন॥

তথাহি পদং---

পিরীতি বলিয়া                        তিনটি আখর
.                বিদিত ভূবন-মাঝে।
জাহারে পসিল                        সেই সে মজিল
.                কি তার কলঙ্ক লাজে।
দুহার অধর                           সুধারস-পানে
.                তাহে উপজিল পি।
নআনে নআনে                        বাণ বরিখানে
.                তাহে উপজিল রি।
হিআয় হিআয়                         পরস করিতে
.                তাহে উপজিল তি।
এ তিন আখর                        অতি মনোহর
.                ইহার তুলনা কি॥
তাহে দুখ সুক                         হয় পরতেক
.                সদাই সুখের পারা।
তরণী রমন                           করে নিবেদন
.                মরিলে না যায় ছাড়া॥
এই ত পিরীত ধর্ম্ম জ[ন]ম জাহাতে।
রাধাকৃষ্ণ নিত্যস্থানে রমণ করিতে॥
.                                                   ইতাদি
।”

এই পদটি চণ্ডীদাসের ভণিতাতেও (খণ্ডিত অবস্থায়) পাওয়া গিয়েছে সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত  
“চণ্ডীদাসের পদাবলী” গ্রন্থে। কিন্তু সম্পূর্ণ পদটি তরণীরমণের ভণিতাতেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮৬৫  
সংখ্যক পুথির ২য় পদ হিসেবে পাওয়া যায়। তাই মণীন্দ্রমোহন বসু মনে করেছিলেন যে এই পটটি আসলে
তরণীরমণেরই। আমরাও তাঁর এই মতে সঙ্গে একমত পোষণ করছি। এরপরে তিনি উক্ত প্রবন্ধে লিখেছেন
যে তাঁর মনে হয়েছে যে এখানে “চণ্ডীদাস” শব্দটি তরণীরমণের বিশেষণ হিসাবেই দেওয়া রয়েছে। তিনি  
লিখেছেন . . .

ইহা হইতে আমরা দেখিতেছি যে, চণ্ডীদাস তরনী-রমণ গীতচ্ছন্দে পিরীতি সম্বন্ধে যে গান  গাহিয়াছিলেন,  
তাহা “তথাহি পদং" এই মুখবন্ধের পর ঐ পুথিতে উল্লিখিত হইয়াছে। সেই পদটি তরণী-রমণের ভণিতায়  
পাওয়া যাইতেছে। যদি এই স্থানে চণ্ডীদাসের ভণিতার আর একটি পদ উদ্ধৃত থাকিত, তবে আমরা বুঝিতে
পারিতাম যে, চণ্ডীদাস ও তরণী-রমণ এই উভয় কবিকে লক্ষ্য করিয়াই প্রথম ছত্র দুইটি লিখিত হইয়াছিল।
কিন্তু গানটির পরেই যে অন্য প্রসঙ্গ আরম্ভ হইয়াছে, তাহা শেষের দুই চরণ হইতে জানা যায়। অতএব এই
স্থানে “চণ্ডীদাস” শব্দটি তরণীরমণের বিশেষণ রূপেই আমরা গ্রহণ করিতে বাধ্য হইলাম
৷”

মণীন্দ্রমোহন বসু মহাশয় তাঁর প্রবন্ধ শেষ করার আগে "তরণীরমণ চণ্ডীদাস" নিয়ে চণ্ডীদাস-সমস্যা জর্জরিত
সাহিত্যসেবিদের একটি রসাত্মক হুল ফোটাতেও ছাড়েন নি! . . .

চণ্ডীদাস নানুরের না ছাতনার, ইহা লইয়া আজকাল বেশ আলোড়ন চলিতেছে। যাঁহারা এইরূপ অনুসন্ধানে
ব্যাপৃত আছেন, তাঁহারা এক চণ্ডীদাসকে লইয়াই টানাটানি করিতেছেন। তাঁহাদের নিকট আমাদের অনুরোধ
এই যে, কোন্‌ চণ্ডীদাস নানুরের, আর কোন্‌ চণ্ডীদাস ছাতনার, তাহাই স্থির করিতে তাঁহারা যত্নবান্‌ হউন।
একাধিক চণ্ডীদাস যে বর্তমান ছিলেন, তাহা সাহিত্যসেবিমাত্রেই সন্দেহ করিয়াছেন। তরণীরমণও চণ্ডীদাস  
পর্য্যায়ে পড়িয়া যাইতেছেন। ইহা ব্যতীত ‘দীন চণ্ডীদাস’ ও কৃষকীর্ত্তন-প্রণেতা বাসুলী-সেবক “বড়ু চণ্ডীদাসের”
অস্তিত্বও আমরা জানিতে পারিতেছি। ইঁহাদের কে কোথায় ছিলেন, তাহা জানিতে পারিলেই  
সাহিত্যসেবিমাত্রেই উপকৃত হইবেন, তাহাতে সন্দেহ নাই
।”
.
তরুণীরমণের কাব্য ও সহজিয়া মত নিয়ে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ -            পাতার উপরে . . .  
প্রাপ্ত ও সংগৃহীত বিভিন্ন পুথি থেকে জানা যায় যে তরণীরমণ সহজ মতের উপাসকও ছিলেন। তাঁর "সহজ
উপাসনা-তত্ত্ব" নামক একটি পুথিও পাওয়া গিয়েছে যেখানে এই সহজ সাধনভজনের গূঢ় বা গুপ্ত কিছু রহস্য
কে নিয়ে পদ রয়েছে। এই পুথিটি ১৯২৮ সালে (১৩৩৫বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত করেন বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ,
তাঁর “সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা”-র ৪র্থ সংখ্যায় প্রকাশিত “তরুণীরমণের পদাবলী ও সহজ উপাসনা তত্ত্ব”
প্রবন্ধে। আমরা এই প্রবন্ধে উদ্ধৃত তরুণীরমণের সকল পদাবলী মিলনসাগরে তুলে দিয়েছি। প্রবন্ধের ১৭১-
পৃষ্ঠায় তিনি তরুণীরমণের পদাবলী নিয়ে লিখেছেন . . .

আমরা শুনিয়াছি, বীরভূম বিবরণের সুযোগ্য লেখক শ্রীযুক্ত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন মহাশয়  
তরুণীরমণের বহু পদ সংগ্রহ করিয়াছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথিশালাতেও তরণীরমণের অনেক পদ  
সংগৃহীত হইয়াছে। আমরাও তরুণীরমণের বিস্তর পদের সন্ধান পাইয়াছি। এখন দেখা যাইতেছে, তরুণীরমণ
যথেষ্টসংখ্যক পদ রচনা করিয়াছিলেন। এবং পদগুলি উচ্চভাবপূর্ণ। অতঃপর আমরা অঙ্গহানি না করিয়া
কবির সহজ উপাসনা-তত্ত্ব আপনাদের সমক্ষে উপস্থিত করিতেছি। ইহা সহজসম্প্রদায়ের একখানি উপাদেয়
গ্রন্থ। এই ক্ষুদ্র নিবন্ধটিতে সংক্ষেপে সহজ-সাধনের গূঢ় রহস্য  বিবৃত হইয়াছে। অবশ্য ইহার মাঝে  মাঝে  
এমন সব কথা আছে, যাহা আজ কলিকার দিনে কেমন কেমন ঠেকিবে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য অন্যরূপ
।”
.
তরুণীরমণ না তরণীরমণ, এই নিয়ে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -                   পাতার উপরে . . .  
বৈষ্ণবদাস সংকলিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের সম্পাদক সতীশচন্দ্র রায় তাঁর সম্পাদিত পদকল্পতরুর  ৫ম  
খণ্ডের ভূমিকার ১২১-পৃষ্ঠায় পদকর্তা তরুণীরমণের সঠিক নাম “তরুণীরমণ” না “তরণীরমণ”, এই বিবেচনা  
করতে গিয়ে লিখেছেন . . .

বসস্তবাবু আমাদের ধৃত “তরণীরমণ” শন্দটর পরে একট প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়া “তরণীরমণ” কিংবা  
“তরুণীরমণ”, সে সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন। পদকল্পতরুর পুথিগুলিতে “তরণীরমণ” ও “তরণীরমণ”
পাঠ থাকিলেও, এ সম্বন্ধে গবেষণার অন্য উপকরণের অভাবে আমরা পদ-রস-সার পুথিব নানা স্থলে প্রাপ্ত
‘তরণীরমণ’, পাঠই প্রামাণিক বলিয়া গ্রহণ করিয়াছি। আমাদের নিকট এখন মণীন্দ্রবাবুর উল্লিখিত প্রবন্ধটা
নাই ; যত দুর স্মরণ হয়, তিনি সর্বত্র ‘তরণীরমণ’ লিখিয়াছেন। বসন্তবাবু তাঁহার প্রকাশিত ‘সহজ-উপাসনা-
তত্ত্ব’ পুথিতে বোধ হয়, সর্ব্বত্র ‘তরুণীরমণ’ পাঠই দেখিতে পাইয়াছেন। এ অবস্থায় প্রকৃত নাম যে কি, উহা
আরও অনুসন্ধান ও আলোচনার বিষয় বটে। বর্ত্তমানে এ সম্বন্ধে আরও বিশেষ আলোচনা করার উপযোগী
উপকরণ আমাদের নিকট নাই। সুতরাং আশা করি যে, বসন্তবাবু ও মণীন্দ্রবাবুই এ বিষয়ে আরও  
অনুসন্ধান করিয়া তাঁহাদিগের আলোচনার ফল প্রকাশিত করিয়া সন্দেহ নিবারণ করিবেন। এ সম্বন্ধে আমরা
এখন কোনও নিশ্চিত মত প্রকাশ করিতে অক্ষম হইলেও প্রসঙ্গতঃ ইহা না বলিয়া পারিতেছি না যে,  
তরণীরমণের স্বহস্ত-লিখিত পুথি বা কোন দলিল-পত্র আবিষ্কৃত না হইলে, শুধু পুথি-লেখকদিগের  
স্বেচ্ছাচারমূলক বানানের উপর নির্ভর করিয়া কোনও চুড়াস্ত সিদ্ধাস্ত করা নিরাপদ্‌ হইবে না। এখানে ইহাও
বক্তব্য যে, আধুনিক সময়ের 'রমণীমোহন’, 'কামিনীমোহন’ প্রভৃতি নামের ব্যাবহার পূর্ব্বে এতদ্দেশে  দেখা
যায় না। সুতরাং উহাদের প্রায় সমার্থক ‘তরুণীরমণ’ নাম অন্যুন তিন শত বত্সর পূর্ব্বে প্রচলিত  ছিল  
বলিয়া সহজে বিশ্বাস হইতে চাহে না। পক্ষান্তরে তখন বৈষ্ণব-সমাজে কীর্ত্তন-গীতের প্রাচুর্য্য হেতু শ্রীকৃষ্ণের
‘নৌকাবিলাস’ পালার স্মৃতি-পুত “তরণীরমণ নামটা উত্ত সমাজে বিশেষ প্রীতিকর হওয়া খুব সম্ভবপর মনে
হয়। অবশ্যই ‘তরুণীরমণ’ নামের ‘তরুণী’ শব্দের লক্ষ্য ‘ব্রজ-যুবতী’ মনে করিলে, ‘তরুণীরমণ’ শব্দের অর্থও
‘শ্রীকৃষ্ণ' করা যাইতে পারে, কিন্তু ভক্ত প্রাচীন বৈষ্ণব-সমাজ যে,  সৌভাগ্যবতী কৃষ্ণপ্রিয়া ব্রজ-তরুণীদিগকে
শুধু ‘তরুণী’ শব্দে উল্লেখ করার ধৃষ্টতা স্বীকার করিবেন, ইহা তেমন সম্ভবপর মনে হয় না। সুতরাং  
‘গোপীমোহন’, ‘গোপীরমণ’ ‘বল্লবীকান্ত’ ইত্যাদি  ব্রজাঙ্গনার স্মৃতি-পূত শ্রীকৃষ্ণের নামগুলি প্রাচীন বৈষ্ণব-
সমাজে খুব স্বাভাবিক ও সাধারণ হইলেও ‘শ্রীকৃষ্ণ’ অর্থে ‘তরুণীরমণ’ নাম আমরা স্বাভাবিক মনে করি না।
‘তরণীরমণ’, নামটা তদপেক্ষা অনেক সুন্দর ও স্বাভাবিক মনে হয়।  প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে ’তরণীরমণ’
নামের অপেক্ষা অপ্রাচূর্য্য সম্বন্ধে বোধ হয়, ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, উহাতে ‘তরুণীরমণ বা তৎশ্রেণীর
‘রমণীমোহন’ ‘কামিনীমোহন’ প্রভৃতি নামেরও সেইরূপ বা তদপেক্ষা অধিক অপ্রাচূর্য্য বা অভাব দেখা যায়।
আমাদের শাস্ত্রে আছে যে, মৃত্যুকালে রাম, কৃষ্ণ, হরি, নারায়ণ প্রভৃতি ভগবানের নাম উচ্চারণ বা নাম-চিন্তা
করিয়া প্রাণত্যাগ করিলে জীবাত্মা পরলোকে পরম সদগতি লাভ করিয়া থাকে। এইরূপ বিশ্বাস হেতু প্রাচীন
সময়ে দেবসূচক অন্যান্য নাম অপেক্ষা স্পষ্টতঃ দেববাচক নামগুলিই সমধিক আদৃত হইত ; সুতরাং প্রাচীন
কালের ব্যবহৃত নামের তালিকা (Statistics) সগৃহীত হইলে, রাম. কৃষ্ণ, হরি, গোবিন্দ প্রভৃতি স্পষ্টতঃ দেববাচক
নাম যে শতকরা সর্ব্বাপেক্ষা বেশী, ‘গোপীরমণ’, ‘গোপীমোহন’ ইত্যাদি  অস্পষ্টতঃ দেবসূচক নাম তদপেক্ষা
কম এবং ‘তরণীরমণ’ জাতীন্ন কিঞ্চিৎ দুরূহার্থ দেবলীলাসূচক কাল্পনিক নাম যে খুব কম দৃষ্ট হইবে, তাহা  
অভিজ্ঞ পাঠকদিগের অবিদিত নহে
।”
.
তরণীরমণ নিয়ে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর উদ্ধৃতি -                            পাতার উপরে . . .  
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁর ও নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী সম্পাদিত ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত মহাজন পদাবলী
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ডের ভূমিকার ৩৯-পৃষ্ঠায় পদকর্তা তরণীরমন সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

তরণীরমণ সম্বন্ধে বিশেষ কোনও সংবাদ জানা যায় না। তরণীরমণ শ্রীমহাপ্রভুর সমসাময়িক বলিয়া মনে
হয়
।”
এই মুকুন্দদাস গোস্বামী ও চৈতন্য পার্ষদ কীর্তনীয়া মুকুন্দ ভিন্ন ব্যক্তি -           পাতার উপরে . . .  
এই “তরুণীরমণ” বা “তরণীরমণ” ভণিতার কবি মুকুন্দ দাস গোস্বামী বা মুকুন্দ দত্ত, শ্রীচৈতন্য সমসাময়িক
প্রখ্যাত কীর্ত্তনীয়া ও
শ্রীচৈতন্যের প্রিয় পার্ষদ মুকুন্দ দত্ত নন। কীর্ত্তনীয়া ও শ্রীচৈতন্যের প্রিয় পার্ষদ মুকুন্দ
দত্তের “
মুকুন্দ” ভণিতার দুটি পদ আমরা পূর্বেই মিলনসাগরে কবি মুকুন্দ-এর বৈষ্ণব পদাবলীর পাতায়
তুলেছি। সেই পাতায় যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .

কীর্ত্তনীয়া মুকুন্দ দত্ত সম্বন্ধে ১২৯৮ বঙ্গাব্দে (১৮৯১ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত, জগদীশ্বর
গুপ্ত সম্পাদিত, শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ১০ম পরিচ্ছেদ, ২৭৫-পৃষ্ঠার শাখা বর্ণনাতে রয়েছে . . .

শ্রীমুকুন্দ দত্ত শাখা প্রভুর সমাধ্যায়ী ;
যাঁহার কীর্ত্তনে নাচে চৈতন্য গোসাঞি


মুকুন্দ দত্তের কীর্তন সম্বন্ধে বৃন্দাবন দাস দ্বারা ষোড়শ শতকে বিরচিত, অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী দ্বারা ১৯১৫
খৃষ্টাব্দে সম্পাদিত, “শ্রীচৈতন্যভাগবত”, আদিখণ্ড, ৭ম অধ্যায়, ৭৭-পৃষ্ঠায় এই কথা রয়েছে . . .

সর্ব্ববৈষ্ণবের প্রিয় মুকুন্দ একান্ত। মুকুন্দের গানে দ্রবে সকল মহান্ত॥
বিকাল হইলে আসি ভাগবতগণ। অদ্বৈত-সভায় সভে হয়েন মিলন॥
যেইমাত্র মুকুন্দ গায়েন কৃষ্ণগীত। হেন নাহি জানি কে পড়য়ে কোন্ ভিত॥
কেহো কান্দে কেহো হাসে কেহো নৃত্য করে। গড়াগড়ি যায় কেহো বস্ত্র না সম্বরে॥
হুঙ্কার করয়ে কেহ মালসাট্ মারে। কেহো গিয়া মুকুন্দের দুই পা’য় ধরে


কৃষ্ণদাস কবিরাজবৃন্দাবন দাসের গ্রন্থে উল্লিখিত চৈতন্য-পার্ষদ “মুকুন্দ”, যাঁর গানে শ্রীচৈতন্য স্বয়ং নৃত্য
করতে, এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের শিষ্য মুকুন্দ নিশ্চয়ই এক ও অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন না।
.