কবি
মুহম্মদ
কবীরের বৈষ্ণব পদাবলী
*
মনোহর-মধুমালতীর পরিচয় ও প্রণয়
কবির “মধুমালতী” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
ভণিতা মুহম্মদ কবীর
কবি মুহম্মদ কবীর
এই পদটি পৌষ ১৩৬৯ বঙ্গাব্দে (ডিসেম্বর ১৯৬২) ঢাকার বাংলা একাডেমী থেকে
প্রকাশিত, আহমদ শরীফ সম্পাদিত মধ্যযুগের কাব্য-সংগ্রহ, ৫২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া
রযেছে।
মনোহর-মধুমালতীর পরিচয় ও প্রণয়
॥ জমক ছন্দ : কেদার রাগ॥
রূপে গুণে কুলেশীলে চন্দ্রিমা সমান।
এ কন্যা মানবী হএ অপ্সরা জন॥
পূর্ণ-শশী নিন্দে মুখে নিন্দে অরবিন্দ।
চক্ষে ধরএ জুতি সে রূপের চন্দ॥
কুন্তল চিত্রল ছাঁদে বিশেষ লক্ষিত।
অলকে মণির খোঁপা ত্রিলোক মোহিত॥
চটক চিকণ কেশ শীষেত সিন্দুর।
কাজলে উঝল অক্ষি অধরে নিন্দে সুর॥
কাণড় কুণ্ডল দোলে শ্রাবণে রাতুল।
পবন-বাহন ভুরু জিনিছে ধনুকুল॥
নাগ অরি জিনি চক্ষু নাসিকা বিশিখ।
সোনার ‘বেসর’ দোলে নাসিকা উপাধিক॥
দশন বিদ্যুৎ জিনি মুকুতা গুণিছে,
সপ্তছড়ি মুক্তা ছড়া হৃদয়ে পড়িছে॥
বিচিত্র কাঞ্চুলি শোভে গাএর উপর।
কেবল রাচুল অতি শীতল রয়োধর॥
কাঞ্চন কটোরা কুচ অধিক সুচারু।
কাঞ্চন পটের ’পরে হিঙ্গুলানি মেরু॥
কোমলতা বাহু জুড়ি আছে তার পরে।
আঙ্গুলে অঙ্গুরী করে কঙ্কণ শোভা করে॥
ক্ষীণ মাঝা মুষ্টে পুরে হেলে দোলে বাএ।
বিচিত্র হেমরি শাড়ী কাচি আছে তাএ॥
নূপুরের রুনুঝুনু পদযুগে চারু।
কামাসন হৈমস্তম্ভ যেন দুই উরু॥
যৌবন মাতলি কন্যা হেলি হেলি পড়ে।
সুরঙ্গ অঙ্গে জড়ি পাড় ঝরি গড়ে॥
রূপেত পার্বতী জিনি বিশাল সাজন।
কহিলে অনেক হএ না কৈলুঁ গ্রথন॥
বিচিত্র পালঙ্ক ’পরে বসিছেন রাএ।
ঝরি ঝরি পড়ে রূপ পালঙ্ক ভাসি যাএ॥
জগজিনে সুধা হাসি বঙ্কেত হেররি।
ধরনে না যাএ চিত্ত প্রাণি নিল হরি॥
ঝগমগ বালা রূপ আক্ষি নাহি ভরে।
মুশ্চাগত হৈয়া কুমার পালহ্কেত গড়ে॥
তা দেখিয়া কাজকন্যা কুমার ধরিল।
তুরিতে কুমার শির কোলে তুলি লৈল॥
ধীরে ধীরে রাজকন্যা মু’খানি মোছন।
মোহ ছাড়ি যুবরাজ পাইল চেতন॥
চৈতন্য পাইয়া কুমার উঠিয়া বসিলষ
রতি কামদেবে যেন একত্রে মিলিল॥
দোহোঁ রূপে দোহোঁ চিত্ত দোহাঁতে ভুলিল।
দোহোঁ প্রাণে একশরে মনেত গুন্থিল॥
মধুর সুস্বরে তবে অবোলা ফুকরি।
কুমারেত পুছে বাণী করি করজুড়ি॥
শুন শুন যুবরাজ কহ মহাশএ।
তুহ্মি কোন্ হও মোত দেঅ পরিচএ॥
আকাশের চন্দ্র কিবা দিবসের মণি।
ইন্দ্র পুরন্দর কিবা জগত মোহিনী॥
মদন জীবন্ত কিবা তুহ্মি নরেশ্বর।
কিরূপে কিসেরে আইলা মন্দিরেত মোর॥
একেত অবোলা আহ্মি রাজার নন্দিনী।
শুনি লোকে দিব লজ্জা হৈলুঁ কলঙ্কিনী॥
কিমুখে বসিমু মুঞি নারীর সভাত।
প্রমাদ ঠেকাইলা কুমার আসিয়া এথাত॥
শুনিলে জনকে মোর লইব পরাণি।
সত্য করি কহ তুহ্মি কোন্ রূপমণি॥
কথাত বসতি তোহ্মার কহ জাতিকুল।
আচম্বিত পরশিলা ফুটিতে কলিফুল॥
কুসুম্ব-বয়ানী বাণী শুনিয়া কুমার।
কহন্ত যে কুমার আপনা সমাচার॥
শুন আএ শশিমুখী কমল নয়ান।
তোমার অঙ্গের ছন্দে বান্ধিলা পরাণ॥
সুরঙ্গ অঙ্গের রূপে মদন মোহিত।
কার শক্তি আছে প্রাণ ধরে পৃথিবীত॥
নহি আহ্মি চন্দ্র সূর্য নহি বিদ্যাধর।
অবশ্য শুনিছ তুহ্মি কঙ্গিরা শহর॥
কঙ্গিরা রাজ্যেত জান সূর্যভান রাজা।
কমলা সুন্দরী নামে তাহান যে ভার্যা॥
তাহান তনয় আহ্মি নামে মনোহর।
বিদিত সংসারে আছে এ সব উত্তর॥
শুন শুন পদ্মমুখী পুণ্যবতী কলা।
চক্ষেত ধরএ জুতি তুয়া অঙ্গলীলা॥
এমত সুন্দরী তুহ্মি কাহার নন্দিনী।
এহি কোন্ রাজ্য হএ বোল সুবদনী॥
আরত কি নাম তোহ্মার কহত সুন্দরী।
উড়িল পিঞ্জর শুয়া রাখ বন্দী করি॥
এথ শুনি চন্দ্রমুখী কহে মন্দ মন্দ।
পূর্ণশশী মুখে যেন ঝরে মকরন্দ॥
তবে সে কামিনী কহে শুন মহাশএ।
অবশ্য শুনিছ তুহ্মি কাহার মুখএ॥
মহারস নামে রাজ্য গর্ব অবতারি।
ধার্মিক বিক্রম রাজা তথে অধিকারী॥
তাহান মহিষী নাম কূপসমঞ্জরী।
রাজার নন্দিনী আহ্মি সর্বজনে জানে।
পরাণে বাধিলা মোরে তুয়া অঙ্গবাণে॥
ধরাইতে না পারি চিত্ত তোহ্মা রূপ হেরি।
ধড়ফড় করে প্রাণ না দেখিলে মরি॥
দরশনে প্রাণ মোর ধাএ কিবা রএ।
না জানম পরশিলে আর কিবা হএ॥
কুমারে বোলন্ত শুন কমল নয়ানী।
অধিক সুন্দর তোহ্মা চান্দমুখ বাণী॥
তোহ্মা আহ্মা ললাটে লেখিছে পূর্বকালে।
তে কারণে তুহ্মি আহ্মি হৈছি এক মেলে॥
না জানম কোন্ হেতু আইলুঁ তুয়া পাশ।
একতিল তুহ্মা বিনে জীবন নৈরাশ॥
তিলেক বিমন নহি তোহ্মারে পাসরি।
তোহ্মা রূপ লৈল আঁখি পলক বিস্মরি॥
তুহ্মি মোর প্রাণেশ্বরী অতি শ্রধাশএ।
অক্ষি ’পরে থুই তোহ্মা ঘুরিমু সদাএ॥
মোর মনে এইভাবে যাবত জীবন।
তিলেক অন্তর নাহি দৃষ্টিত সঘন॥
তোহ্মা রূপ হেরি মন গেল তনু ছাড়ি।
সুধা তনু যতা, তথা রহিবেক পড়ি॥
তোহ্মা না দেখিলে মোর জীবন সংশএ।
তোহ্মা প্রেমশরে মোর বিন্ধিছে হৃদএ॥
এক তিল দরশনে মর্ম খান খান।
জ্বলি জ্বলি উঠে মন যেন কাম বাণ॥
সদাএ তোহ্মার সঙ্গে আনন্দ উপাম।
এক তিল দূর হৈলে অনঙ্গ মাথা খাম॥
আন রূপ মনে মোর কিছু নাহি ভাএ।
তোহ্মা রূপে মন মোর মজিবারে চাএ॥
লাবণ্য তোহ্মার শেল হানিছে আহ্মারে।
তোহ্মার প্রেমের বরশী ফুটিছে অন্তরে॥
এথাত অধিক আহ্মি না চাই কুশল।
এক দীপে দুই ঘর করিছে উঝল॥
এই বর মাগম মুঞি পদে করতার।
অহর্নিশ প্রেমবাতি না নিবউক আর॥
বিকল বিভোর কুমার দেখিয়া সুন্দরী।
কুমারক বোলে বালি রহ ধৈর্য ধরি॥
তুহ্মি যথ কৈলা বাণী মোর মনে লএ।
তোহ্মা প্রেম আনলে দহে হৃদএ॥
তোহ্মা আহ্মা প্রেমগুণ না যাউক ছিণ্ডন।
সদাএ ছাড়উক না হউক খণ্ডন॥
তুহ্মিহ আপনা মন কভু না টলাইবা।
আহ্মি তোহ্মা দাসী, প্রেম মনেত রাখিবা॥
তুহ্মি আহ্মি দুই তনু প্রাণি এক জান।
সদাএ হউক প্রেম হউক কল্যাণ॥
এ রূপ-যৌবন তোহ্মা পদেক নিছন।
তুহ্মি তরু আহ্মি লতা সর্বাঙ্গে জড়ন॥
অন্যে অন্যে দুই প্রাণী এক হই গেল।
তনু তনু মিলিবারে শ্রধা অতি ভেল॥
চান্দে চান্দে মিশামিশি নয়ানে নয়ান।
গলে গলে হৃদে হৃদে প্রেমের সন্ধান॥
করে করে লুলালুলি অঙ্গে মোড়ামুড়ি।
মুখে মুখে মিখাইয়া দলে চুম্বে অলি॥
পদে পদে জড়াজড়ি মদমত্ত আশ।
সদাএ এমত মাগি না হইতে বিনাশ॥
দোহোঁ জন প্রেমমগ্ন দোহান মাতাল।
দোহোঁ প্রেমে ভোর-তেজি জগজন জ্বাল॥
তবে কুমারী বোলে শুন প্রাণেশ্বর।
তোহ্মার অঙ্গের দীপ্তি হৃদয় পসর॥
তবে লই কুমারীর হাতের অঙ্গুরী।
কুমারের হাতে দিলা প্রেমে অনুসারী॥
কুমারেহ দিলা তানে অহ্গুরী আপনার।
দোহান নিশান লইলা দোহোঁ পরিবার॥
দোহোঁ জনে মনে ভীত ভাবএ সদাএ।
না জানি একলা মনে বিচ্ছেদ যে হএ॥
দোহোঁ জনে প্রেমানন্দে নিশি উজাগর।
নিদ্রাএ মোহিত পড়ে পালঙ্ক উপর॥
কুমার পালঙ্কে যাই কুমারী সুতিল।
চন্দ্রবালি খাট পাই কুমার রহিল॥
মোহাম্মদ কবীরে কহে রসের কাহিনী।
সুজনের প্রেম যেন জলদ দামিনী॥
. *************************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি
মুহম্মদ
কবীরের পরিচিতির পাতায় . . .
*
মনোহরের পত্র
কবির “মধুমালতী” কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া।
ভণিতা মুহম্মদ কবীর
কবি মুহম্মদ কবীর
এই পদটি পৌষ ১৩৬৯ বঙ্গাব্দে (ডিসেম্বর ১৯৬২) ঢাকার বাংলা একাডেমী থেকে
প্রকাশিত, আহমদ শরীফ সম্পাদিত মধ্যযুগের কাব্য-সংগ্রহ, ৫৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া
রযেছে।
মনোহরের পত্র
॥ রাগ : ধানশ্রী॥
হেন সমে মনোহরে পত্র দুইখান।
লেখিয়া পাঠাইল পত্র দুইজন স্থান॥
এক পত্র পাঠাইল রূপসমঞ্জরী।
বহুল মিনতি করি লেখিল নমস্কারি॥
কর বা না কর দয়া তোহ্মা পদে আশ।
সহজে ধর্মের মূল না কর বিনাশ॥
তে কাজে লিখিছি পত্র তোহ্মা পদতল।
কন্যাস্থানে আর পত্র লেখিছি সকল॥
প্রাণনাথের পত্র পড়ে কন্যা রাখি শির।
পড়িতে সজল আঁখি বুক যাএ চির॥
ভাতি ভাতি মিনতি লেখিছে বহুতর।
তুহ্মা বিনে আন্ধার দুর্গতি মতি ভোর॥
আহ্মি হেন শত দাস বলি দিব তুহ্মি।
তুহ্মি হেন এক চান্দ না পাইব আহ্মি॥
আহ্মি হেন কোটি দাস রূপের নিছনি।
কুশলে থাউকহ তুহ্মি চান্দ বদনী॥
পরাণ পিরীতি মোর কভু না ছাড়িবা।
মুঞি হেন প্রেমদাস মনেত রাখিবা॥
মোর দুঃখ তবে যথ আপনে জানসি।
তো কাজে লেখিছি পত্র শুনরে প্রিয়সি॥
পত্র শুনি আনন্দিত সব সভাজন।
কুমার আছএ শুনি হরষিত মন॥
মহারাজ দেবী সঙ্গে সৈন্য সমুদিত।
তারাচান্দ সৈন্য সমে শুনি আনন্দিত॥
সভানের মনে লএ যাইবারে তথা।
চল চল ঝাটে যাই কুমার আছে যথা॥
চল চল করিয়া চলিল সৈন্য রাএ।
দুই দিন পন্থ রাএ একদিনে যাএ॥
রাত্রি দিন চলি ভেল আনন্দ করিয়া।
ছত্রসেন রাজ্যের যে নিকটত হিয়া॥
শত ভএ সতত ভাবে আকলিএ মন।
ছত্রসেনে দূত পাঠাইলা একজন॥
তবে দূতে কহে ছত্রসেনে নমস্কারী।
বিক্রম আইসএ তথা শুন অধিকারী॥
দূত মুখে শুনি রাজা তুরিত উঠিলা।
সৈন্য সমুদিত সব তখনে চলিলা॥
চারিদিন পন্থ রাজা আগুবাড়ি গেল।
দেখাদেখি হাতাহাতি সম্ভাষিত ভেল॥
দুই রাজা রাজ্যের সব হুতাশে আশ।
দুই সৈন্য রবিল তথাত করিয়া উল্লাস॥
দিব (বিভা) এথাত সেই দুই কুমারী।
মধুমালতী আর পায়মা সুন্দরী॥
দোহোঁ বালি গলাগলি সানন্দিত মন।
মুখে মুখে আঁখি আঁখি লাগিল লগন॥
তবে সে দোহোঁর মন হইলেক শান্ত।
ছত্রসেন বোলে শুন বিক্রম রাএ মণি।
চন্দ্র পূজিবারে দেঅ মালতী রোহিণী॥
চিত্রারে সেবি আপনে রহুক কুশলে।
বিধু পূজিব রঙ্গে শীতল রহু জলে॥
পুষ্প তরে ভ্রোমর উড়ি আইসএ তুরি।
মধুকরে দেঅ পুষ্প যাএ মধু ঝরি॥
এ সকল বৃত্তান্ত কহে মধুরী মধুরী।
তা শুনিয়া ভএ জিনি গেল লাজে গাড়ি॥
মনোহর মালতীর অকূল পিরীত।
গাহি (য়া) কল লোক মন হরষিত॥
এহি সে সুন্দর কিচ্ছা হিন্দিতে আছিল।
দেশী ভাষাএ মুঞি পঞ্চালী ভণিল॥
অন্ত অন্তে অন্ত রএ সিন্ধু তার পাছ।
পঞ্চালী ভণিতে গেল হিজিরার পাঁচ॥
পণ্ডিত জনার ঘৃণা মূর্খের গোহারি।
শিরে ধরি কাব্য কথা দিলুম সঞ্চারি॥
মোহাম্মদ কবীরে কহে ভাবিয়া আকুল।
কি জানি ডুবিব শেষে এই কূল ওই কূল॥
. *************************
.
সূচীতে . . .
মিলনসাগর
কবি
মুহম্মদ
কবীরের পরিচিতির পাতায় . . .