ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় আগ্রহ দেখে পিতা তাঁর জন্য গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। ফয়জুন্নিসার প্রতিভার
স্ফূরণের পেছনে শিক্ষক তাজউদ্দিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গৃহশিক্ষকের সাহায্যে ফয়জুন্নেসা বাংলা, আরবি,
ফার্সি ও সংস্কৃত এ চারটি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।
বিবাহিত জীবন - পাতার উপরে . . .
১৮৬০ সালে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন জমিদার সৈয়দ মোহাম্মদ গাজীর সাথে। তাঁদের দাম্পত্য জীবন
সুখের ছিল না। শেষে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে তিনি সমাজ সংস্কার ও গঠনমূলক
কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কথিত আছে যে নওয়াব ফয়জুন্নেসা, বিয়ের সতের বছর পর জানতে পারেন যে
তাঁর স্বামীর আরেকটি স্ত্রী আছে। তাই সতীনের থেকে আলাদা থাকার জন্য তিনি তার বিবাহের “কাবিন”
-এর এক লক্ষ এক টাকা দিয়ে পশ্চিমগাঁও-এ সাড়ে তিন একর জমিতে একটি সুন্দর বাড়ি তৈরী করেন।
কবি নওয়াব ফয়জুন্নিসা চৌধুরাণী - ছিলেন
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নওয়াব বা নবাব।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের কুমিল্লার লাকসামে,
ডাকাতিয়া নদীর উত্তর তীরে। কবির পিতা খান বাহাদুর
সৈয়দ আহম্মদ আলী চৌধুরী এবং মাতা আরফান্নেছা
চৌধুরানী। কবিই জ্যেষ্ঠা সন্তান ছিলেন। তাঁর দুই ভাই
এয়াকুব আলী চৌধুরী ও ইউসুফ আলী চৌধুরী এবং দুই
বোন লতিফুন্নেসা চৌধুরাণী ও আমিরুন্নেসা চৌধুরাণী।
কর্মযজ্ঞ - পাতার উপরে . . .
১৮৭৩ সালে তার পিতার পরলোক গমনের পরে তিনি পশ্চিমগাঁও-এর জমিদারী লাভ করেন এবং ১৮৮৫
সালে মাতার মৃত্যুর পর তিনি মাতুল সম্পত্তিরও উত্তরাধিকারী হন। আধুনিক মনস্ক নওয়াব ফয়জুন্নেসা,
সেকালের সমাজ ব্যবস্থার সবরকম বাধা পেরিয়ে সম্পূর্ণ কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গঠনে মনোনিবেশ করেন।
একজন নারী হয়েও সেই যুগে জমিদারীর দায়িত্ব তিনি সফলভাবে পালন করতে পেরেছিলেন। তিনি জীবনের
শেষভাগে তাঁর উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেন এবং নিজের জমিদারীকে পরিণত করেন
“ওয়াকফ” সম্পত্তি হিসেবে।
তিনি সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি সচেষ্ট হন। ১৮৭৩ সালে, বেগম রোকেয়ার
জন্মের সাত বছর পূর্বেই, নারীশিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে তিনি মেয়েদের জন্য কুমিল্লায় একটি বালিকা বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা করেন। উপমহাদেশের বেসরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীনতম স্কুলগুলোর মধ্যে এটি
অন্যতম।
শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান গগনচুম্বী। নওয়াব ফয়জুন্নেসা, পশ্চিমগাঁও-এ একটি অবৈতনিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা
করেন। মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য একটি ছাত্রাবাসও ছিল। মাদ্রাসার ভালো ফলাফলে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তি
কালে তাঁর বংশধরগণ ১৯৪৩ সালে সেটিকে উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামিক কলেজে রূপান্তরিত করেন। ১৯৬৫
সালে কলেজটি একটি ডিগ্রী কলেজে রূপান্তরিত হয় “নওয়াব ফয়জুন্নেসা ডিগ্রী কলেজ” নামে। ১৯৮২ সালে
কলেজটির সরকারিকরণ করা হয় এবং নাম হয় “নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ”। মেয়েদেরকে
উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য তিনি সব সময় উৎসাহিত করতেন। তিনি মেয়েদের জন্য হোস্টেলের
ব্যবস্থা করেছিলেন। তার জমিদারীর আয় থেকে মেয়েদের জন্য নির্মিত এ হোস্টেলের সব খরচ বহন করা
হতো। মেয়েদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন । তিনি মক্কা শরিফে “মাদ্রাসা-ই-সওলাতিয়া”
ও “ফোরকানিয়া” সহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রচুর পরিমানে সহায়তা করেন।
শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন । ১৮৯৩ সালে
কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন “ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল”। তিনি ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বহু দাতব্য
প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অনাথাশ্রম এবং সড়ক নিমার্ণ করে তার মানবতাবাদী ও সমাজ সংস্কারের অনন্য
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
রচনা সম্ভার - পাতার উপরে . . .
তাঁর সময়কাল ছিল বাংলায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যুগ। তাঁর রচনা সম্ভারে রয়েছে “রূপ জালাল”
(১৮৭৬) কাব্যগ্রন্থ, “সংগীত লহরী” ও “সংগীত সার”।
ডঃ আহমদ শরীফ তাঁর সম্পাদিত, পৌষ ১৩৬৯ ( জানুয়ারী ১৯৬৯ সালে) ঢাকার বাংলা একাডেমী থেকে
প্রকাশিত, “মধ্যযুগের কাব্য-সংগ্রহ”, গ্রন্থে এই কবি সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী রূপজালাল নামে একটি বড় কাহিনী প্রকাশ করেন। কাহিনাটি গদ্যে-পদ্যে রচিত।
প্রকাশকাল ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ।”
আমরা তাঁর রূপজালাল থেকে একটি পদ্যের অংশ এখানে তুলে দিয়েছি।
প্রাপ্ত সম্মাননা - পাতার উপরে . . .
ইংল্যাণ্ডের মহারাণী ভিক্টরিয়া, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ফয়জুন্নেসাকে নওয়াব উপাধি দেন ১৮৮৯
সালে। তার নির্দেশে ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণীকে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান করে “নওয়াব” উপাধি প্রদান করা
হয়। ২০০৪ সালে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে বাংলাদেশ সরকার, মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন।
কবির ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী তে বাংলাদেশ সরকার একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেন।
ব্রিটিশদের দেওয়া "বেগম "উপাধি গ্রহণ করেননি - পাতার উপরে . . .
অজানা ও চেপে রাখা সোনালী ইতিহাস:-
ব্রিটিশদের দেওয়া "বেগম "উপাধি গ্রহণ করেননি, শেষ পর্যন্ত "নওয়াব" উপাধি দিতে হয়েছে এই নারীকে!
১৫ বছর বয়সী কিশোরীর শরীর জুড়ে ছিল রূপ-লাবণ্যের ঢেউ। টানা টানা চোখ, হরিণীর মতই সদা চঞ্চল।
বাবা ছিলেন কুমিল্লা অঞ্চলের (তৎকালীন ত্রিপুরা) পশ্চিমগাঁওয়ের (বর্তমান লাকসাম)বিরাট জমিদার।
অল্প বয়সেই কিশোরীর বিয়ের প্রস্তাব আসে ভাউকসারের জমিদার গাজী মোহাম্মদ চৌধুরীর কাছ থেকে।
পশ্চিমগাঁওতে জমিদারির কাজে এসে তিনি কিশোরীকে দেখে পছন্দ করেন। পরে বিয়ে হয়। ফুটফুটে দুটি
মেয়েও হয়। তখন তিনি পরিপূর্ণ যুবতী। বিয়ের ১৭ বছর পর জানতে পারেন, তার স্বামীর আরেকটি বউ
আছে। বিষয়টি তাঁর আত্মসম্মানে লাগে। তিনি প্রতারিত বোধ করেন। স্বামীকে স্পষ্টত জানিয়ে দেন,
সতীনের সঙ্গে ঘর করার জন্য জন্ম হয়নি তার। তিনি স্বামীর বাড়িতে আর ফিরে যাবেন না।
এরই মধ্যে বাবা মারা যাওয়ায় তিনি নিলেন পৈতৃক জমিদারির দায়িত্ব। এ নিয়ে তার কোনো অভিজ্ঞতা
ছিল না। কিন্তু এক সময় বাবার সান্নিধ্যে কাজ শেখা তার মজ্জাগতই ছিল। তিনি সেই অভিজ্ঞতা কাজে
লাগান সফলভাবে। সারাদেশে তিনি ছিলেন একমাত্র মহিলা জমিদার।
তখন ত্রিপুরার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন মি.ডগলাস। একদিন তিনি খেয়াল করলেন ত্রিপুরা অঞ্চল শিক্ষা ও
উন্নয়ন খাতে ভীষণ অবহেলিত। তিনি এই খাতে অর্থ বরাদ্দ চান ব্রিটিশ সরকারের কাছে।কিন্তু সেই অর্থ
নির্ধারিত সময়ে আসছে না। ডগলাস সাহেব চিন্তিত হলেন।সিদ্ধান্ত নিয়ে ডগলাস স্থানীয় ১০জন জমিদারের
কাছে ঋণ হিসাবে ১০ হাজার টাকা করে ১ লাখ টাকা চাইলেন। কিন্তু কেউই এতো অল্প সুদে অর্থ
দিতে রাজি হলেন না।একে একে সব আশা যখন শেষ হয়ে গেল তখন হঠাৎ একদিন এই নারী জমিদারের
নায়েব পুটুলি ভর্তি নগদ ১ লাখ টাকা নিয়ে এসে ডগলাসের হাতে দিলেন।
ডগলাস খুব আনন্দিত এবং নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি কালবিলম্ব না করে নায়েবের সাথেই রওনা হয়ে
জমিদারের বাড়িতে গেলেন ঋণের চুক্তি করতে। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটকে বিস্মিত করে জমিদার নারীটি বললেন
–
"আমি কাউকে ঋণ দিই না। আপনার পরিকল্পনা জনহিতকর। এটা নিশ্চিত হয়েই এই টাকা
ত্রিপুরার কল্যাণে আমি দান করলাম।"
ডগলাস কৃতজ্ঞচিত্তে ফিরে গেলেন এবং জানলেন যে এই নারী জমিদার জনকল্যাণমূলক অসংখ্য কাজ
করেছেন এবং প্রতিনিয়ত করে চলেছেন।
ডগলাস এইসব কথা জানিয়ে ইংল্যান্ডে মহারানী ভিক্টোরিয়াকে পত্র পাঠালেন। রাণী ভিক্টোরিয়া এই
জমিদারকে "বেগম" উপাধি দিলেন। কিন্তু জমিদার এই উপাধি প্রত্যাখ্যান করলেন। কারণ অন্য জমিদারদের
যেখানে 'নওয়াব' উপাধি দেয়া হয় সেখানে তাকে কেন 'বেগম' উপাধি দেয়া হবে? উপাধির কোন জেন্ডার
থাকা উচিৎ নয়।
ভিক্টোরিয়া এই প্রত্যাখানের খবর পেয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করে ত্রিপুরায়
পাঠালেন। তদন্ত কমিটি এসে নানা বিষয়ে তদন্ত করে একদিন সেই তেজী নারী জমিদারের বাড়িতে উপস্থিত
হয়ে দেখেন, জমিদার হাতিতে চড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।তিনি কোথাও কাজে যাবেন, সেখানে তাকে নির্দিষ্ট
সময়ে পৌঁছুতে হবে।তদন্ত কমিটি জমিদারের কাছে সময় চাইলে জমিদার বললেন –"আমি পূর্ব নির্ধারিত
কাজে যাচ্ছি, এখন আপনাদের সময় দেয়া সম্ভব নয়।" আর কথা না বাড়িয়ে সময়নিষ্ঠ জমিদার তাঁর কাজে
রওনা হয়ে গেলেন।
ব্রিটিশ তদন্ত কমিটি হতবাক হয়ে গেল নেটিভ এই জমিদারের সময়ানুবর্তীতা, তেজস্বী মনেভাব ও
অহংকার দেখে !! এবং তারা ফিরে গিয়ে ভিক্টোরিয়াকে জানালেন সব কথা। এইবার রানী ভিক্টোরিয়া
আর ভুল করলেন না। প্রবল ব্যক্তিত্বময়ী এই জমিদারকে "নওয়াব" উপাধি দিলেন।
১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকার পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ব্যয় করে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে কুমিল্লায় এই জমিদারকে
সম্বর্ধনা দিলেন। তিনি হলেন বাংলার প্রথম নারী "নওয়াব"। তাঁর নাম নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। তিনি
কেবল জনহিতকর কাজই করেননি, নারী শিক্ষা,নারী উন্নয়নমূলক অসংখ্য কাজ করেছেন। ছিলেন সুশিক্ষিত,
চারটি ভাষা জানতেন। ছিলেন একজন সুসাহিত্যিকও।
(সংগৃহীত - জানা -অজানা পৃথিবী)"
নাসির ভাইয়ের পাতা থেকে.....
অজ্ঞাত লেখকের এই লেখাটি আমরা পেয়েছি মিরাজ আজাদের ফেসবুক পাতা থেকে। তাঁর কাছে আমরা
কৃতজ্ঞ। . . .
Miraj Azad - https://www.facebook.com/miraj.azad.1