কবি পিনাকী ঠাকুরের কবিতা
*
রূপ লাগি আঁখি ঝুরে
কবি পিনাকী ঠাকুর
আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি, নির্বাচিত ৫০০ কবিতার সংকলন থেকে নেওয়া।
ভূমিকা প্রদীপ ঘোষ, সংকলন ও সম্পাদনা মেঘ বসু।


এ কি বিষ ? না অমৃত ? মধু না হুল ? আদর না চাবুক ?
.               ক্ষত না ডেটল ভেজানো তুলো ?
এ কি শব্দ? না রাতের পর রাতের পর রাত চুল্লির
.                                                 দাউদাউ আগুন ?
টাওয়ার থেকে টাওয়ার এ কি ঝড়ের পর ঝড় সামলে নিয়ে
.                 বৃষ্টিভেজা মাইক্রোওয়েভ ?
এ কি গল্প ?  না থিয়েটার ? থিয়েটার না সিনেমা ?
.                  ভিডিও, অডিও, টেপ, ডিস্ক কিচ্ছু নয় ?
মারের পর মারের পর মার আরও আরও আরও
‘আর পারছি না’ এ কি চুল ছিঁড়ে নেওয়া টিপবোতাম ?
.                                                কান কামড়ে, এ কি, রক্ত ?
বরফে আগুন জ্বালিয়ে দেবার পর ফায়ারব্রিগেডে টেলিফোন ?
কে ? কে বলছে ‘শান্ত হও, এবার ঘুম, এবার জলোচ্ছাস” ?
.                ‘ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন’ সুর বাজাচ্ছে কেন ?
এ কি আইসবার্গ ? হঠাৎ ঘুমভাঙা আগ্নেয়পাহাড় ?
এ কি স্বপ্ন ? না ফিসফিস ঘুমপাড়ানি গান ?
সারারাত ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে ঘেমে উঠছে ওই
.                লাল রঙের মোমবাতি
গল্পের গুহামানব মধু খুঁজতে এসেছে আদিম অরণ্যে
বালিশের পাশ থেকে ছিটকে পরল নিষিদ্ধ বই
.                                                  আর ড্রয়িং
প্রোগ্রামে ঢুকতে চাইছে নতুন একটা কমপিউটার ভাইরাস---
ওঃ আরও বিষ, অমৃত, আরও শব্দ, নীরবতা, আরও আগুন,
আরও রক্ত, ডেটল, আরও জ্বালা, আরও আদর আরও আদর
.                 আর বুক ফাটিয়ে দেওয়া কান্না

এখনও ঝড়ের শব্দ, বালির ঘড়ি থেকে সময় গলে পড়ছে---

কাঠপিঁপড়ে কামড়ে দিচ্ছে কারও মিষ্টি একটা আঙুল—

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
টিউটর
কবি পিনাকী ঠাকুর
আবৃত্তির কবিতা কবিতার আবৃত্তি, নির্বাচিত ৫০০ কবিতার সংকলন থেকে নেওয়া।
ভূমিকা প্রদীপ ঘোষ, সংকলন ও সম্পাদনা মেঘ বসু।


তোমার ইংরেজি ফেল কান্নাটাকে বৃষ্টির উপমা
দেবার আগেই দেখি আকাশ ইস্পাতরঙ, নীল তরুশ্রেণী
হাত নাড়ছে দূরে দূরে --- শালিখ বালিকা
চোখ ফুটে মাকে চায়, দয়িতের আহ্বান বোঝে না !

দেওয়ালে বাঁধানো কার আলতাপরা শুভ লক্ষ্মী পা ?
তোমার দিদিমা ? তাঁর ফোটো নেই ? সুন্দরী ছিলেন ?
সংবাদে ফিমেল হাওয়া--- ললিতা, সোনিয়া মমতার—

যাক, বাজে কথা নয়, ত্রিকোণমিতির খাতা কই ?
তোমার গানের দিদি এই চিঠি দিলেন ? আমাকে ?
.                             আচ্ছা পরের বর্ষায়

যদি চাকরি পেয়ে যাই, ধরো, কোনো দূরের স্টেশনে

তুমি নিজে চিঠি লিখো, হোক না বানান ভুল, আরে
আমি কি বাংলার স্যার, ব্যাকরণ শুদ্ধ ক’রে দেব ?

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দি এন্ড অফ হিস্ট্রি
কবি পিনাকী ঠাকুর
শামসুর রাহমান ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘দুই বাংলার প্রেমের কবিতা’ থেকে
নেওয়া।


আবার ভোরের বাস ফিরে এল সন্ধ্যার শহরে।
বাতাসে ধোঁয়াশা ভারী। চা-দোকান। মুশাফিরখানা।
ইতিহাসে অন্ধকার--- গোলাম আর বিশ্বাসঘাতক।
মিটিংয়ে ঈশ্বরচন্দ্র। ক্যালেন্ডারে রবীন্দ্র ঠাকুর---
ভিড়ের হৃদয় চিরে ডবল ডেকার। ট্যাক্সি। মিনি।

ইতিহাস শেষ হল। কোনোদিন কেউ জানবে না
কে, কাকে, কী দিয়েছিল মোমজ্বলা ভিজিটার্স রুমে।
বাঘে যার ভয় নেই তারই কেউ অতীতের ভয় ?
রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, লমণাক্ত সমুদ্রবাতাসে
সন্ধ্যার শহরে ফিরল ভোরবেলার বাস---- এইবার

চুম্বন লুকিয়ে চলো, শীতবস্ত্রে লুকোও দংশন--

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
সেন্ট্রাল জেলের তরুলতা
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।


যাও গতি

এই মহাসাগরের সাপচরা বালুকাবেলায়
আমি তোমার বিস্তার থেকে অন্য এক ঘোড়ামুখ
এঁকে রাখি শ্যাওলার পিছলে !

এইটি শ্বাসের মতো দীর্ঘ ছিল, এটি ঠান্ডা ঠোঁটের ব্যর্থতা
এইটি হাসির মতো কান্না ছিল, এটি আমি ত্যক্ত বিপরীত ---
.                                              দাঁতে এত এত বালি, আঠাচুল

কলের গান ও ভরাচাঁদ
লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ ভেদ করে উঠে এলে
তোমাকে পৃথক করি, গতি

অষ্টম সমুদ্র থেকে অভিবাসী নোনা হাওয়া আসে
ছাপা কাগজের গন্ধে জিভে নিরুপায় মোহজল,
আবার রথের দিন বেড়াতে যাবার অবকাশে
তোমাকে আস্কারা দেব, যাও
জন্মজীবন ছেঁড়া আলোকসখার জলটানে

যাও গতি

আজও জানি না তো, কেন
কারা পুঁতে গিয়েছিল
.                সেন্ট্রাল জেলের তরুলতা ?

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বসন্তের দু’ টুকরো
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।


জারুল পাতার ফাঁকে ডেকে উঠল কোকিল এবারও।
কোকিলের খিদে তুমি গান ভেবে বাবু-কবিতার ধ্রুবপদ
হরফে হরফে ধরে চলে গেল রাত্রিসীমানায়---

লোডশেডিং ঘাম চাপ বাজেট খেলার ফল তিথি না জেনেও
মা-কোকিল খুঁজে ফিরবে এবারের গ্রীষ্মে কার বাসা ?


‘আদালতে গৃহলক্ষ্মী’ পর পর তিন নাইট। তুমি
রাতজাগা চোখ মুছে নকল চুমকি-আঁটা নীল ওড়নায়
বাড়ি ফিরছিলে ; আমি ঘুগনির দোকানে ছ’টা ডিশ
যেই ভেঙে ফেললাম, কোন্ দিকে উড়ে গেল হাসি ?

হেমন্ত মণ্ডল যত খিস্তি দিক, মাইনে কেটে দিক
পুকুরে চাঁদের থালা ভেঙে তোকে আবার হাসাব ----

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
জলসাঘর
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।

শ্রেষ্ঠ কবিতার মতো চুল বেঁধে বেরিয়েছ
.                       প্রথম প্রকাশ জানুয়ারী—
বেপাড়ার হাওয়া ঠিক সুযোগ সন্ধান করছে
.      মূল্য ষাট টাকার খোঁপায়
ফাজিল ছাপার ভূত গুঁজে দেবে ; বলবে ‘ঝড়াপাতা’
কলেজ স্ট্রিটের হাওয়া ‘ছাপা ও বাঁধাই ভাল’
.                       বনেদি রাস্কেল !
ওর প্ররোচনা শুনে বসন্ত কেবিন কিংবা রোল-কর্ণারের
ছদ্ম-নারীবাদী কোনো প্রোটিন খেও না কিন্তু
.                       লোভে পাপ, আর ওই পাপে
হতে চাও কল্ হনের ত্রিশ ফর্মা রাজতরঙ্গিণী ?
কিতাব মহল থেকে চুল বেঁধে বেরিয়েছ, শোনো
আজকেও চড়াই ভেঙে প্রতিশোধ উঠে আসছে
স্তবকে রক্তের পাইকা—শীত ছিঁড়ে, বসন্ত মাড়িয়ে
যাকে প্রেম ভেবেছিলে, ভেবেছিলে ভারতনাট্যম !
.                           তুমি
পা বাড়াও তার দিকে, তারই দিকে দিকে ---

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রকৃতি পড়ুয়া
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।


বর্ষায় ময়ূর এসে ঠুকরে দিয়ে বলেছিল, কেকা !
কাদের মেয়েটা এক বাবুইপাখির বাসা
.                       উপহার দিল, হাসল
.                তারপর লালবাঁধে, বাঁধের রাস্তায়
বায়ুশিকারির সাজে রোজ খিদে করতে আসি----
.                বসন্তে পা-দিয়ে আজ দুধের বালক
.                                   ফটো তুলে দিতে চায়
.                বাঁ হাতে কীসের দাগ জেনে নিয়ে উহু-আহা করে !

নিসর্গের মধ্যে এক রেলসেতু, দিনে তিনটে প্যাসেঞ্জার,
.                                            দূরে গ্রাম, দানাপানি---
.                                       তোকে বলে যাচ্ছি কুহুভাই ;
না ডাকলেও ফিরে আসব তোদের সবাইকে পড়তে
.                পরের বর্ষায়
.                 ছাপার কালিতে ডুবে আমি আর
.                                                 মরব না,
.                                                  দেখিস !

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পুত্রার্থে
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।


ভোর ৬টা : শ্রী শ্রী দুর্গামাতা সহায়। [ লাল কালি দিয়ে ১০৮
বার। ]  পাঁজিটা ? এই তো। ২৫ ভাদ্র, ১১ সেপ্টেম্বর, রবিবার,
অষ্টমী রাত্রি ১১। ১৫। ৫৭। পর্যন্ত। হুঁ। রোহিণী নক্ষত্র। বেশ।
কালরাত্রি ১। ০০ থেকে ২। ২৮। কালরাত্রি বাদ। অমৃতযোগ
দিবা ৬। ১৩ থেকে----। দিবা থাক। এই যে আবার অমৃতযোগ
রয়েছে রাত্রি ৭। ১৪ থেকে ৮। ১২। ওঃ জ্বালালে, এই সময়টা
প্রশস্ত নয়, ঘরভর্তি বাজে লোকজন। পুনঃ --- জয়গুরু, পুনঃ
রাত্রি ১১। ১৬ থেকে ১২। ৫০। মায়া, আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে
পড়তে হবে। কেন ? আরে বাপু, গুরু আদেশ,
জ্যোতিষশাস্ত্রের নির্দেশ। কেন ? কিছুই বোঝ না তুমি মুখ্যু
মেয়েমানুষ। যাগ্গে যাক, চায়ে একটু আদা দাও দিকিনি। রাত
১১টা : মায়ারানি গো, এসো। আহা লাগুক, গায়ে পা লাগুক,
পরে প্রণাম ক’রে নিও। ভাদ্র মাস। রবি তাঁর সক্ষেত্র
সিংহরাশিতে। দেশবরেণ্য হবার যোগ। আর ৪ মিনিট, ৩
মিনিট---। অষ্টমী তিথি। অমৃতযোগ। এহে, এরই মধ্যে ঘুমুলে
নাকি, মায়া ?

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শহীদের বাচ্চা
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।


হৈ হৈ করে বসন্ত এল জানলার টবে
দাঁত বের করা মনটারে তোর শীত কাটল না

ব়্যাপার জড়িয়ে বসে থাকে জ্বর, সান্নিপাতিক
বাঘা কুকুরকে ডাকতে এসেছে ওবাড়ির টমি

‘খুন রাহাজানি বোমা ধর্ষণ কিস্যা বানানো
নিউজ পেপার পড়ি না আ মরি বাংলা ভাষায়’

‘কোথায় আছিস ?’ জিজ্ঞেস করে দেখনহাসিরা
‘বাড়িতেই থাকি’ ---পছন্দ নয় এই উত্তর ?

অমর শহীদ আমরা তোমার জ্যান্ত বাচ্চা
মন্ত্রীকাকুর বরাবরে যাব প্ল্যান আঁটলাম

‘শহীদ স্মরণে আপন মরণে রক্তের ঋণ’
শোধ করবার আগেই ব্লাডের চিনি বেড়ে যায়

চাকুরি অথবা অটোপারমিট ---হিল্লে হবে কি ?
মিনিস্টারের ফটকে সাঁটানো :  বিওয়্যার, ডগ’

বোন দৌড়ল : ‘পালা, কামড়ায়’ !

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রাতের ট্রেনে
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবতা সংকলন থেকে নেওয়া।


নাম শোনছেন গোয়ালন্দ ? স্টিমার ঘাটে ভাতের হোটেল।
ইস রে সে কী ইলসা মাছের সোয়াদ --- কী ভাই, শোনছেন
.                                                      নাম ?

হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ

দুষ্ট অসৎ হোটেল মালিক পরদেশীয়া ধুর পাইলেই
বেকুব বানায় প্যাসেঞ্জারে।  কেমন জানেন ?

না তো

খাইতে বইছে।  অরা নিজেই ছোকরা দিয়া ঘন্টা বাজায়।
নূতন মানুষ ভাববে বুঝি জাহাজ ছাড়ার বেল দিতাছে--- হুড়মুড়দূর –
বয়রা তখন পাতের থিকা আমাখা ভাত, মাছের টুকরো
তুইলা রাখে। আবার যখন—

এ মা। ছি ছি –-
সব হোটেলে নষ্টামি নাই। একটা দুটো। আচ্ছা ধরেন
নারান সাহার ডিলুক্স হোটেল। খাওনটি ফ্রেস। সদ্ ব্যাবহার।
ফর্টিসিক্সে ক্যালকাটাতে সেটেল করি। আর যাই নাই।
আপনে অমন হাসেন কেন ? ও আমার কথায় ? স্টুডেন্ট বুঝি ?

[ সবাই নীরব ]
ভিটা মায়া, পদ্মা-মেঘনা, ছোকরা বয়স ছাড়ছি সবই।
এই ডায়লেক্ট জিলার স্মৃতি, মায়ের হাসি, প্রিয়ার চুমা---
‘এলুম খেলুম’  বাংলা যদি, আমার ভাষাও বঙ্গভাষা।

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর