কবি পিনাকী ঠাকুরের কবিতা
*
শিশুনাটিকা
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।

       
যখন মা-ববারা যে যার কাজে যান :

ভোর ভোর খেলি আয়। বাজার বাজার খেলি। ‘ট্যাংরামাছ, দই---’
তোর অফিস। চান কর। আমার সেলাই। রান্না। চ্যানেল ঘোরানো।
তুই বেশ ‘টা টা’ বল। আমি বলি, ‘তাড়াতাড়ি ফিরো আজ ওগো।’
এই ফাঁকে দুপুর যাচ্ছে ! পর্দা টেনে বিকেল করে দি।’

ডিং ডং।  ডিং ডং। দরোজা খুললাম। এই ভালুকপুতুল
আমাদের দুষ্টু সোনা। হামি খাই। ওর নাম ? এক্স ওয়াই রায়।
--‘চিঠি আছে ?’  ---- ‘নেই।’  ----‘কেউ এসেছিল ?’ --- ‘না মশাই।’
----‘তাহলে অ্যাশট্রেতে কার মরা সিগারেট ?’
---- ‘সিগারেট ? কই ? ও হো। কার ? তাই ত সিগারেট...’
আয় এবার ঝগড়া ঝগড়া খেলাটা জমাব।
উঁহু। মারামারি নয়। ছাড়। ‘চ্ছাড়ো ছোটলোক’ ...

বেশ বাবা। ঝগড়া থাক। সূর্য অফ ক’রে
রাতের খাবার খাওয়া।  ঘুম ঘুম খেলা করলে হয়।
কী রে দ্যাখা। দ্যাখাবি না ?  লজ্জা পাস ? আরে বোকুরাম
আমরা বড় বড় খেলছি। বড়রা মোটেই
লজ্জা করে না তো। আমি নিজে কাল দেখলাম
রাত দুপুরে—

.                        হি হি। না, না। সে কথা বলতে নেই।
.                                             বড়দের মতো তুই
.                                                   আয়...

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কম দামের যৌবন
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।


বাংলার অনার্সের ব্যাচে অমিত লাবণ্য আজও থাকে,
‘আবৃত্তি শেখানো হয়’ স্কুলে তৈরি কচ ও দেবযানী
‘সাহিত্য নতুন ক’রে গড়েছিল বাঙালি সত্তাকে
প্রেমের আইডিয়া আসছে নাটক নভেল থেকে’--- জানি
জানি না কেন যে রোজ স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তারবাবুকে
অন্ধ গায়িকার জন্যে উপহার দিতে চায় চোখ
আটাকলে কাজ করা রঘুবীর, শুনি তারও বুকে
রাজরোগ বাস করেন ! মেলায় সম্যক

রাধাকৃষ্ণ সেজে যারা কম দামের যৌবন ফুরাল,
বাঁশরিতে দম নেই, রাধাদির ছেঁড়া পরিধান—
নারকোল কুড়িয়ে পেয়ে কেষ্টদার মুখে ঐ যে আলো
সে কোন্ রোমান্স প’ড়ে ?
.                         ‘একবিংশে প্রেমের প্রস্থান’

পেপার লিখলেন যিনি, তাঁকে কেউ বাসিবে কি ভাল ?

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চৈতন্য লাইব্রেরির বই
কবি পিনাকী ঠাকুর
দেশ – এর কবিতা, ১৯৮৩—২০০৭, দেশ পত্রিকার ৭৫ বছর উপলক্ষে ২০১০ সালে
প্রকাশিত কবিতা সংকলন থেকে নেওয়া।

       
প্রেমে যার পড়া হয়নি, বই প’ড়ে কেটেছে জীবন
কেউ যদি বলে তাকে, আপনার হাতটা একটু ধরি ?
তখনই বিকেল হচ্ছে, ঐ খুলল কাফে আমন্ত্রণ,
ছাপা অক্ষরের সঙ্গে জাগরণে যায় বিভাবরী

কেটেছে, কেটেও যাবে, দিন আসবে, চোখ রাঙানো দিন—
এই ক্লাবে ডোনেশন, মোটা চাঁদা ওদের ফাংশনে !
অ্যান্টিক কাগজ থেকে রবিবার দুপুরে রঙিন
আগ্নেয় দ্বীপের ডাকে যাযাবর নায়ক জনের

নায়িকালুন্ঠন দৃশ্য—

.                                ১২০ পৃষ্ঠার ওপারে
মেয়েলি পেনসিলে লেখা : ‘বিদায় দিয়েছ তুমি যারে’ ...

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
রোমান্সের জন্য লাভ বার্ডস
কবি পিনাকী ঠাকুর
পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত ২০১২ সালে প্রকাশিত  “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা
সমগ্র” কবিতা সংকলন  থেকে নেওয়া।


আপনার সৌভাগ্যলাভের একশোটি উপায়ের মধ্যে লাভ বার্ডস
অন্যতম। ফেংশুই বলছে, লাভ বার্ডস প্রেম ও রোমান্সের নিদর্শন।
দুটি পাখিকে বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অথবা শয়নকক্ষের দক্ষিণ-
পশ্চিম কোণে রাখা যেতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ দম্পতির
সুদৃঢ় বন্ধন ও প্রেমময় জীবনের দ্যোতক।
আপনি যদি অবিবাহিত হন তাহলে শয়নকক্ষে এক জোড়া
হাঁস অথবা তাদের ছবি রাখতে পারেন। কিন্তু মনে রাখুন, একটি বা
তিনটি পাখি নয়। একটি পাখি রাখলে আপনি অবিবাহিতই থেকে
যাবেন। তিনটি পাখি আপনাদের সুখি জীবনে অবাঞ্ছিত তৃতীয়
ব্যাক্তির আবির্ভাব ঘটাতে পারে।
আপনি যদি অপজিট সেক্সের কাউকে আকর্ষণ করতে চান তাহলে
পাখির জোড়ায় যেন একটি ফিমেল পাখি এবং একটি মেল পাখি
থাকে। কিন্তু সেম সেক্সের দুটি পাখি নয়। হোমো সেক্সুয়ালিটি বা
লেসবিয়ানিজম প্রাচীন চৈনিক সভ্যতায় মারাত্মক পাপ।
লাফিং বুদ্ধ, তিন পা-যুক্ত ব্যাঙ, লাল রিবেন বাঁধা চৈনিক মুদ্রা,
গোল্ড ফিস, ক্রিস্টাল বল আর লাভ বার্ডসের ঠিকঠিক ব্যবহার
আপনাকে অর্থ, যশ, রোমান্স আর সমৃদ্ধি এনে দেবে। প্রতিবেশীদের
মুখ ম্লান করে দিতে পারবেন।
মনের মানুষের সন্ধ্যানে সব প্রক্রিয়ার পরেও যদি ব্যর্থ হন দৈবাৎ,
চিঠি লিখুন : বক্স নং৩১৭৪। জিপিও। কলিকাতা ৭০০০০১।
বিফলে মূল্য ফেরৎ।

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
একলা দাঁড়াও
কবি পিনাকী ঠাকুর
পার্থ ঘোষ ও অনীশ ঘোষ সম্পাদিত ২০১২ সালে প্রকাশিত  “বড়োদের আবৃত্তির কবিতা
সমগ্র” কবিতা সংকলন  থেকে নেওয়া।


আবার আমি প্রথম থেকে তোমায় ভালোবাসতে পারি
একলা দাঁড়াও রোদ বাঁচিয়ে---
.        যখন থেকে খুঁজছো বাড়ি
খুঁজছো কিস্তিবন্দী জিনিস, জীবনবীমার বেস্ট পলিসি
আমি তোমায় ভালোবাসছি সারা শহর,
.        যেমন নিশি—
পাওয়া মানুষ শয্যা ছেড়ে রাতবিরেতে পাগলপারা
বনবাদাড়ে জলা, ডাঙায় ঘুরছে--- শুধু ঘুরেই সারা
তেমন ক’রে বাসছি আবার, বাসব ভালো প্রথম থেকে
আবছা হাসির প্রশয় দাও, নাম কী বলো, পাড়ার কে কে
বই টুকে প্রেমপত্র পাঠায় ?
.        ওদের সঙ্গে ডুয়েল ল’ড়ে
.        বাসবো, তুমি একলা দাঁড়াও—
.        ভালোই বাসবো নতুন ক’রে

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বাঙালি প্রেমের কবিতা
কবি পিনাকী ঠাকুর
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী ও কালিদাস ভদ্র সম্পাদিত ২০০৪ সালে প্রকাশিত  “ আবৃত্তির শ্রেষ্ঠ
কবিতা ” কবিতা সংকলন  থেকে নেওয়া।


বাংলা অনার্সের ব্যাচে, অমিত লাবণ্য আজও থাকে,
আবৃত্তি শেখানো হয় স্কুলে তৈরি ও দেবযানী
সাহিত্য নতুন করে গড়েছিল বাঙালি সত্তাকে,
প্রেমের আইডিয়া আসছে নাটকে নভেল থেকে—জানি
জানি না কেন যে রোজ স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তারবাবুকে
অন্ধ গায়িকার জন্য উপহার দিতে চায় চোখ
আটাকলে কাজ করা রঘুবীর, শুনি তারও বুকে
রাজরোগ বাস করেন ! মেলায় সম্যক
রাধাকৃষ্ণ সেজো যারা কম দামের যৌবন ফুরাল,
বাঁশরীতে দম নেই, রাধাদির ছেড়া পরিধান—
নারকোল কুড়িয়ে পেয়ে কেষ্টদার মুখে ওই যে আলো
সে কোন্ রোমান্স পড়ে ?
.       ‘একবিংশে প্রেমের প্রস্থান’।

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মহানির্বাণতন্ত্রম্
কবি পিনাকী ঠাকুর
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী ও কালিদাস ভদ্র সম্পাদিত ২০০৮ সালে প্রকাশিত “আবৃত্তির শ্রেষ্ঠ
কবিতা” কবিতা সংকলন  থেকে নেওয়া।


আলো করা হল না এবার
সারানো হল না অয়ারিং,
লোডসেডিং, ভূতের শহরে
কপালিক ডাকে হিং ক্রিং

অন্ধকার নৃমুণ্ডমালিনী।
তুলোট কাগজে লেখা পুঁথি।
সে ভাষার কাছে আমরা ঋণী ;
কবিতাই মন্ত্র, স্তব, স্তূতি

মৃতদেহ, কারণ, কবিতা।
জ্বালাতে পারিনি কোনো আলো
কাপালিক শুধু টের পায়

দু-চোখের পাতা খুলে ‘মৃত ভাষা’ হঠাৎ  চমকাল !

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভোজের টেবিল, নতুন বাজি
কবি পিনাকী ঠাকুর
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী ও সরল দে সম্পাদিত ২০০৬ সালে প্রকাশিত “ছোটদের ৫০০ কবিতা”
কবিতা সংকলন  থেকে নেওয়া।

.                        এক        

রোস্তোরাঁতে বাজি জেতার ভোজের টেবিল ভরাক সে
লে আও দেখি মোগলাই ডিশ, শাম্মি কাবাব তড়াক্ সে—
‘সে’ মানে ওই লোকেন মিটার
চন্দ্রলোকে বাজান সিতার
আবার কোনও নতুন বাজি এই টেবিলেই লড়াচ্ছে !


.                        দুই

লোকেন বলে, সামনে আমার মাধ্যমিকের একজামিন
গ্রন্থ-কেতাব, আনন্দস্যার, উকিল কিংবা হেড আমিন
উনিশ না, এই চতুর্থবার
পাশ করতে পারবে না আর !
‘বেট হয়ে যাক !’ লোকেন, আবার বাজি হেরেই আর একদিন ---

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
বুকের মধ্যে আগুন
কবি পিনাকী ঠাকুর
শ্যামল কান্তি দাশ ও বিমল গুহ  সম্পাদিত ২০০৪ সালে প্রকাশিত  “হাজার কবির হাজার
কবিতা” কবিতা সংকলন  থেকে নেওয়া।


মাথার উপরে ঝুলছে দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ
শরীরে বোমার টুকরে, কাঁচ
না শুধু ‘আইডিয়া’ নয়—মাতা মৃত্তিকায় গড়া দেশ
পরে আছে দুঃখিনীর সাজ

প্রান্তরের গ্রাম থেকে গরীব বিষণ্ণ জিলা, মহকুমাগামী ভিড় বাস,
তরাইরের চা-বাগান, রোদ ঝলোমল মালভূমি,
স্টেশনে খোঁচর আর বাস স্ট্যান্ডে চিরুনি তল্লাস...
বন্ধ চিলেকোঠাঘরে তুমি

দু’টো রাত থাকতে দিলে, খাবার ওষুধ জল টাকা,
মস্ত বড় ঝুঁকি
আহত ফেরার লোককে লুকিয়ে নিজের বাড়ি রাখা !
ভোরেই পালাচ্ছি এই শান্ত আর সুখী

তোমার আশ্রয় ছেড়ে।  এ জ্বর সামান্য, কম যাবে।
দু’দিন নিশ্চিন্ত ঘুম, আঃ ! বন্ধু,. নিজেকে বাঁচাও—
আবার গভীর রাতে হয়ত আমার ডাক পাবে,
শুধু আমি ? আমি নয়, আমাদের পৃথিবীটা চাও

হ্যাঁ গো, সব পেয়ে গেছি তোমার সুগন্ধে মাথা রেখে...
--‘ছেড়ে যাবে না তো, বলো ?’—
তোমার ভিতরে আমি, আমরা রইলাম আজ থেকে !

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রান্তিক
কবি পিনাকী ঠাকুর
অজিত বাইরী সম্পাদিত ২০০৪ সালে প্রকাশিত  “দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকদের ১৫০
বছরের প্রেমের কবিতা” কবিতা সংকলন  থেকে নেওয়া।


সে নয়, ভুলগুলি বড়, লম্বা চৌকো নীল সাদা ভুল
ছাড়ালে পোস্টেজ দিয়ে---যত ডাক ততই মাশুল
বৃদ্ধি হতে থাকে আর সবুজ বেডসিটে
ময়ূর, আলপনা, ঘট, লোকশিল্প, সান্ধ্যঘাম, তার পোড়ো ভিটে
বর্ষায় উচ্ছন্নে যায়, শীতে ফুল ফোটাও মরশুমি,
ক্যাসেট আটকাচ্ছে ঠিক--- ‘যে আমারে চুমি
চলি গেল’ – জায়গাটায়।  সে বালক, কিন্তু ভুল বড়ো।
প্যাসেঞ্জার ভিড় ট্রেনে, হু হু জড়োসড়ো
ঝিমুতে ঝিমুতে আসে। তাকে জাগাবার
দায়িত্ব কেনই বা নেবে ? স্টেশন প্রান্তিক, ও হো তার
ট্রাঙ্ক বা সুটকেস নেই। ভাঙা জানলা কেটে বসছে হিম।
স্মৃতি : ভয় : অপমান।  শিখা সামলে, মাটির পিদিম।

.         ****************       
.                                                                               
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর