কবি সিদ্ধার্থ সিংহের কবিতা
*
বর্ষাদিন
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০০৮ সালে প্রকাশিত, শ্যামলকান্তি দাশ ও বিমল গুহ সম্পাদিত “হাজার কবির হাজার
কবিতা” সংকলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

আমাকে দেখলে ওভাবে মুখ ফিরিয়ে নাও কেন?
আকাশে রামধনু উঠলে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে
রামধনু কাউকে বলে না---
তাকিয়ে আছ কেন গো?
পুকুরে থোকা-থোকা কচুরিপানা ফুটলে
তার ছটা সকলের নজর কাড়ে
কেউ কেউ পা ডুবিয়ে জল থেকে তুলে আনে একটা দুটো,
কাইকে অপছন্দ হলেও
একটু তফাতে সরে গিয়ে কক্ষনো কচুরিপানা বলে না---
আমাকে একদম ছোঁবে না।
ঝলসে যাওয়া পৃথিবীতে যখন ঝিরঝির করে বর্ষা নামে
সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে
বর্ষা কাউকে বিমুখ করে না।

তুমি স্কুল-বাসে যাও, আসো
মাধে মাঝেই দাঁড়াও ঝুল-বারান্দায়
আমাকে দেখলে ওভাবে মুখ ফিরিয়ে নাও কেন।

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
অসম্ভব
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০০৭ সালে প্রকাশিত, আশিস সান্যাল ও মৃণাল বসুচৌধুরী সম্পাদিত “বাংলা কবিতার ভুবন” সংকলন
থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

ভদ্রলোক হওয়ার অনেক বিপদ।

যেতে যেতে লোকে বুট দিয়ে যত জোরেই পা পিষে দিক, সরি বললে
হাসি হাসি মুখ করে আপনাকে বলতেই হবে - ঠিক আছে।
রাস্তা দিয়ে আপনার বউ গেলে কেউ যদি রোজ রোজ খারাপ ইঙ্গিত করে
কু-প্রস্তাব ছুঁড়ে দেয়
আপনাকে বলতে হবে - ছেড়ে দাও। বখাটে ছেলে।
ওদের দিকে কক্ষনো তাকিয়ো না।
কেউ যদি প্রত্যেক দিন আপনার বাগানে ঢুকে
সব কটা ফুল সাপটে তুলে নিয়ে যায়,
মুচড়ে দিয়ে যায় পেয়ারা বা জামরুলের ডাল, তবি
ভদ্র হলে আপনি বলবেন - ওরা গরিব মানুষ --- নিয়েছে --- কী করবো ---
অথবা খুব বেশি হলে, বাগানের পাঁচিলটাই উঁচু করাবেন আরও কয়েক হাত

ব্যাস, এইটুকুই, এর বেশি কিছু করা ভদ্রলোকের পক্ষে সম্ভব নয়।

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ঘুমে জাগরণে
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০১২ সালে প্রকাশিত, পৃথ্বীরাজ সেন সম্পাদিত “দশ দিগন্তের বাংলা কবিতা” সংকলন
থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

বিশ্বাস করব কাকে? ঠিক কতখানি?
যে এসেছে ফুল নিয়ে হাসি-হাসি মুখে
ঝোলায় লুকোনো তার তীক্ষ্ণ বাঘনখ
মারাত্মক খেলা আজ আলো-অন্ধকারে।

যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি ঘুমে-জাগরণে
কামিনী-কাঞ্চন আনি সারা বিশ্ব ঢুঁড়ে
বাড়িটা মাতবে যার পায়ের নূপুরে
মাঝরাতে চুপি চুপি সে নূপুর খোলে।

যার ভয়ে কাঁটা আমি খাটের তলায়
স্তব্ধ করে হৃদি-শব্দ কৃষ্ণ নাম জপি
হঠাৎ সে দেখে বলে, এখানে কেন রে?
চল না একটু গিয়ে চোর-চোর খেলি।

বিশ্বাস করব কাকে? ঠিক কতখানি?
যে মেয়ের কথা ছিল চিঠি নিয়ে যাবে
আচমকা খমকে সে ঝরঝর কাঁদে
ধুয়ে যায় রাস্তা ঘাট, সব ঝকঝকে।

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কখনও যাবেন না
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বপনকুমার মান্না সম্পাদিত “আবৃত্তির
বাছাই ৫০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

আর যেখানেই যান
ভুল করেও সরকারি হাসপাতালে যাবেন না।

যত বড় সুপারিশ নিয়েই যান
জানবেন, আপনি ডাক্তারের কৃপাপ্রার্থী
‘যখন-তখন’ অবস্থা দেখে ডাক্তার যদি
একটা এক্সরে করাতে বলে---‘আর্জেন্ট’
ওই বিভাগ আপনাকে ‘ডেট’ দেবে ছ’মাস পরে।
স্থানীয় দাদাদের ধরে যদি শেষ পর্যন্ত করাতেও পারেন
যত আধুনিক মেশিনেই তোলা হোক না কেন
ডাক্তার দেখে বলবে---
এটা কী এনেছেন? কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না,
বলেই খস খস করে নাম ঠিকানা লিখে দেবে
কোনও ঝকঝকে ল্যাবরেটরির
হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে---
এথান থেকে করে নিয়ে আসুন।

এমনিতে পাওয়া যায় না, তবু যদি আপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়
কাউন্টার থেকে কিছু ওষুধও পেয়ে যেতে পারেন।
যদি পান, একবার পিছনটা খুটিয়ে দেখে নেবেন
না হলে জানতেও পারবেন না
তার ডেট এক্সপায়ার হয়ে গেছে বহু আগেই।

তার পরেও যদি চিকিত্সা করাতে চান
এবং ওরা যদি বুঝতে পারে আপনার দৌড় এই পর্যন্তই,
তা হলে যে-অপারেশনের দরকার নেই
সেটাই ওরা করবে
সদ্য ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেবার জন্য।

আর যেখানেই যান
কখনও সরকারি হাসপাতালে যাবেন না,
ওখানে গেলে, আপনি শুধু গিনিপিগই হবেন।

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
মাত্র কয়েকটা আর্মস
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বপনকুমার মান্না সম্পাদিত “আবৃত্তির
বাছাই ৫০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

আমাকে একটা পুরস্কার দিন।
একটি বড় পুরস্কার
যাতে এক সঙ্গে বেশ কিছু টাকা হাতে আসে
আমাকে ক’টা আর্মস কিনতে হবে।

সে দিন মাঝরাতে অফিসের গাড়িতে ফিরছি
সামনের অ্যামবাসাডারটা হঠাৎ প্রচণ্ড ব্রেক কষে দরজা খুলে
আলুথালু একটা মেয়েকে মুহূর্তে ঠেলে ফেলেই ফুল পিক-আপ-এ
ড্বাইভারকে বললাম---“পিছু নাও।”
গাড়ির গতি আরও কমিয়ে দিয়ে সে বলল---“ওদের কাছে আর্মস থাকে. . .”

একদিন দুপুরবেলায় তারাতলায় ইলেক্ট্রিক বিল দিয়ে
গায়ে রোদ মাখতে মাখতে রেল লাইন ধরে কালীঘাট স্টেশনের দিকে যাচ্ছি
আচমকা মাটি ফুঁড়ে কটা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল---“অ্যাই, এটা দে।”
এত কর্কশ ওদের গলার স্বর!
আমি ঘড়ি খুলে দিলাম।
---“ওটা কী?” ওদের চোখের কোণে কোণে রক্ত জমাট বাঁধা।
আমি আংটি খুলে দিলাম।
একজন থাবা বসাল পকেটে---“বের কর।”
আমি মানি ব্যাগ তুলে দিলাম ওদের হাতে।
কী করব! ওদের কারও হাতে ক্ষুর, কারও হাতে চকচক করছে কুকরি।

এই তো কবে যেন খবরের কাগজে দেখলাম
সুপার সাইক্লোনে তালগোল পাকানো লোকগুলো
যা পেলে হুড়োহুড়ি করে উনোন ধরাবে
সেই চাল ডাল বোঝাই লরি একটার পর একটা
মাঝপথেই বেচে দিয়েছে কোন্ মন্ত্রী।
এর পরেো কি চুপ করে বলে থাকা যায়?

বিশ্বাস করুন, তেমন ভাগ্য করে জন্মাই নি যে,
ইনকাম ট্যাক্সের লোক তল্লাসি করতে উঠছে দেখে
জানলা দিয়ে ফেলে দেওয়া কারও বস্তা ভর্তি টাকা বা স্বর্ণালঙ্কার
আমি রাস্তায় কুড়িয়ে পাব
কিংবা আমার এলাকায় পুরুলিয়ার মতো ভুল করবে পিটার ব্লিচ অথবা দয়ানন্দ।
মাঝে মধ্যে দু-একটা কবিতা-টবিতা লিখি
শুনেছি, ঠিক লোককে ঠিকভাবে ধরতে পারলে পুরস্কার বাগানো যায়
পাইয়ে দিন না আমাকে একটা পুরস্কার
যাতে একসঙ্গে বেশ কিছু টাকা হাতে আসে
আমাকে একটা আর্মস কিনতে হবে
মাত্র কয়েকটা . . .

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নিজের হাতে আইন তুলে নেবেন না
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বপনকুমার মান্না সম্পাদিত “আবৃত্তির
বাছাই ৫০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

আজ কালীপুজো, কাল জলসা, পরশু অমুকের মেয়ের বিয়ে
কিংবা একটা ফ্রি মেডিকেল সেন্টার খুলছি আমরা---এই সব বলে
যদি মাঝে মাঝেই কেউ খুবলে নেয়
আপনার মাস মাইনের একটা বড় অংশ
এবং তারপরেও যদি দিন কে দিন জুলুম বাড়তে থাকে
তবুও, "মরার আগে অন্তত একজনকে নিয়ে মরব” ঠিক করে
হাতে আইন তুলে নেবেন না।

নতুন মেশিন বসিয়ে
কোম্পানি যদি বলে---আপনাদের আর দরকার নেই
জেদাজেদিতে যদি গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়
কারখানার সামনে ঝাণ্ডা-ডাণ্ডা পুঁতে তেরপল খাটিয়ে যদি বসে পড়েন
আর তা দেখে যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকারি ও বেসরকারি গুণ্ডা
ভুল করেও রাস্তা থেকে তুলে একটা ইঁটের টুকরোও ছুঁড়বেন না।

রাস্তার ছেলেরা যদি আপনার মেয়েকে টেনে-হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যায়
যদি পরদিন কাকভোরে লোকমুখে খবর পান
তার খোবলানো শরীর পড়ে আছে নদীর ধারে কিংবা খেলার মাঠে
বারবার নাম ধাম দিয়ে অভিযোগ লেখালেও
থানা যদি একটুও নড়েচড়ে না বসে
কুড়িয়ে-কাঁচিয়ে লক্ষ্মীর ঘট ঘট ভেঙে
আর একটা রণবীর সেনা গড়বেন না

ও সব দেখার জন্য আমরা আছি।
যে যা পারে বলুক বলুক---
আমাদের হাত নেই! চোখ নেই! বুক নেই।
আপনি তো বুঝতে পারছেন, আমরা কী করতে পারি।
কারও কথায় কান দেবেন না।
একটু অপেক্ষা করুন
এক এক করে আমরা সব খতিয়ে দেখছি
কথা দিচ্ছি সাচ্চা বিচার পাবেন
আপনি না পেলেও, আপনার ছেলে বা মেয়ে ঠিক পেয়ে যাবে
কোনও কারনে যদি তারা না পায়
আপনার নাতি বা নাতনি কেউ না কেউ তো থাকবেই
কথা দিলাম।

শুধু আপনি কথা দিন
নিজের হাতে আইন তুলে নেবেন না।

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
খেলব না
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০০৬ সালে প্রকাশিত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও সরল দে সম্পাদিত “ছোটদের ৫০০ কবিতা”
সংকলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

খেলব না কানামাছি
ডাংগুলি, লুডো,
খেলব না বর-বউ
খেলব না জুডো।

ছাড়ব না জলে ভেলা
খাঁচা খুলে পাখি,
ওই তো লাটাই-ঘুড়ি
তাও তুলে রাখি।

দেখবো না তুলো মেঘ
সাগরের ঢেউ,
ফুলে-ফুলে মাখা রং
ডাকুক যে-কেউ।

শুনব না নিশিডাক
কোকিলের গান,
গোটা পাড়া নিঃসাড়
ঝরনার তান।

বলব না তেতো কথা
ব্যাট-বল দাও,
পড়ালেও দিন-রাত
গিলে যাব তাও।

করি যদি এই পণ
নিশ্চয়ই খুশি,
তা’লে আগে কোলে নিই
ছোট ওই পুসি?

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
চাই না
কবি সিদ্ধার্থ সিংহ
২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও স্বপনকুমার মান্না সম্পাদিত “আবৃত্তির
বাছাই ৫০০ ছড়া ও কবিতা” সংকলন থেকে নেওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।

চাই না আমার বার্বি পুতুল
রিমোট-চলা গাড়ি
তার বদলে দাও না কিনে
খুন্তি-হাতা হাঁড়ি।

চাই না আমি টিফিন হলে
প্যাস্ট্টি বা এগরোল।
তার বদলে খেতেও পারি
ডিগবাজি বা দোল।

চাই না এবার জন্মদিনে
হাতঘড়ি বা দুল
তার চে’ বরং নিয়ে এসো
কয়েকটা বেলফুল।

টাই না এমন বারো তলার
ঝাঁ-চকচকে জীবন
রিমিদের বেশ ছোট্ট বাড়ি
সামনে নদী, বন।

.         ****************       
.                                                                                   
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর