দেখা কবি সিদ্ধার্থ সিংহ কবির স্বনির্বাচিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।
তা হলে কি চৈতন্যদেব এদেরই দেখেছিলেন!
সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। পেছনে কপিলমুণির আশ্রম সামনে ধুধু নিকষ কালো অন্ধকার। তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ নজরে পড়ল--- পুতুলের মতো সার সার মেয়ে দুধ-সাদা ঘাঘরা কামিজ পরে হাত ধরাধরি করে নাচতে নাচতে পাড়ে উঠে আসছে। এরা কারা! গাল টিপে খুব আদর করতে ইচ্ছে করল তাদের। একটু হলেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম আর কী আর ঠিক তখনই মনে পড়ল শ্রীচৈতন্যদেবের কথা। তিনি নাকি এক ঘোরের মধ্যে সোজা নেমে গিয়েছিলেন সমুদ্রে অতল গহ্বর থেকে আর মাথা তোলেননি।
জানালা কবি সিদ্ধার্থ সিংহ কবির স্বনির্বাচিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।
ঘর বানাচ্ছ, বানাও মনে করে দুটো জানালা বানাতে ভুলো না।
একটা জানালা দিয়ে ছেলে যাতে উড়ে যেতে পারে রামধনুর রং মাখতে পারে সারা গায়ে মেঘের ভেলায় চেপে ভেসে যেতে পারে যেখানে খুশি, আর অন্য জানালা দিয়ে পা টিপে টিপে এসে যাতে শুয়ে পড়তে পারে বিছানায়।
ঘর বানাচ্ছ, বানাও মনে করে দুটো জানালা বানিও।
একটা জানালা দিয়ে এসে ছেলেকে যাতে বকাঝকা করতে পারো কষাতে পারো দু'-একটা চড়চাপড়, আর অন্য জানালা দিয়ে এসে ঘুমন্ত ছেলের কপালে যাতে চুমু খেতে পারো।
ঘর বানাচ্ছ, বানাও মনে করে দুটো জানালা বানাতে ভুলো না আর হ্যাঁ, সেই জানালায় যেন গরাদের কোনও . ছায়া না থাকে...
আর এক হরিশ্চন্দ্র কবি সিদ্ধার্থ সিংহ কবির স্বনির্বাচিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।
আগেই ঘোষণা করেছিলেন ফের জিতলেই স্থাবর-অস্থাবর যা আছে তিনি সব বিলিয়ে দেবেন। দিন-ক্ষণ সব ঠিক সমস্ত মিডিয়া হাজির আলোকচিত্রীরা তাক করে আছেন ক্যামেরা প্রাসাদের বাইরে হাজার-হাজার লোক।
যে লোকটা একদম শূন্য থেকে আজ এতগুলো শূন্যের আগে একটা ৯ বসিয়েছেন তিনি তা কী ভাবে বিলিয়ে দেন, তা দেখার জন্য।
আগেই ঘোষণা করেছিলেন এ বার জিতলেই তিনি সব বিলিয়ে দেবেন। সব নয়, যদি তার সামান্য কয়েক শতাংশও বিলোন তা হলেও, এ দেশের সব ক'টা গণ্ডগ্রামে . গভীর নলকূপ বসানো যাবে অন্তত পঞ্চাশ হাজার স্কুলবাড়ি পাকা হবে সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না . অনেক ব্যাপারেই।
ওঁর বাড়ির সামনে হাজার-হাজার উৎসুক লোক ক্যামেরায় ক্যামেরায় ঠোকাঠুকি এই তিনি দরজা খুললেন বলে...
সে দিন ভিড়ের চাপে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন পরে জেনেছিলেন, সে দিন তিনি সব উজাড় করে দিয়েছেন বাড়িঘরদোর থেকে ঘরের আসবাব এমনকী নীলাখচিত আংটি, মানিব্যাগের খুচরো পয়সাও সব, সব হরির লুঠের মতো তিনি বিলিয়েছেন বিলিয়েছেন অন্দরমহলে আর সেগুলো টপাটপ কুড়িয়ে নিয়েছেন তাঁর বউ ছেলে-মেয়ে-নাতি-নাতনি।
সে দিন সমস্ত মিডিয়ার সামনে তিনি আবার কথা দিয়েছেন এর থেকেও অনেক অনেক বেশি আবার তিনি বিলোবেন তবে আজ নয়, ঠিক পাঁচ বছর পরে।
একই কবি সিদ্ধার্থ সিংহ কবির স্বনির্বাচিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।
বাবার কাছে কোনও দিন সাদা শাড়ি কোনও দিন জংলা ছাপা আবার কোনও দিন হাওয়ায় ওড়া আঁচল আসত। ওরা আসার আগেই আমাকে আর দিদিকে বাবা বসিয়ে দিয়ে আসতেন গলির মুখে, একটা রকে। বলতেন, যে-গাড়িগুলো যাবে সেগুলোর নম্বর লিখে রাখ তো দেখি। আমরা লিখতাম। পরে নিজেরাই মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতাম কার ক'টা বাদ গেছে বাদ গেলেই কানমলা আর যে লিখত, সে পেত কখনও কাগজের উড়োজাহাজ কখনও ঘটি চানাচুর। আমি রোজ রোজ কানমলা খেতাম। সতর্ক হতে হতে যখন বুঝলাম দিদি আসলে ওগুলো পাওয়ার জন্য মিথ্যে মিথ্যে নম্বর টুকে রাখে বাবাকে বললাম। বাবা চালু করলেন নতুন খেলা। বললেন, বসে বসে লোক দ্যাখ, দেখবি, এত মানুষ, তার ওইটুকু একটা মুখ তবু কী অদ্ভুত! কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। যদি কখনও একই রকম দুটো মুখ দেখতে পাস দ্বিতীয় জনের নাম-ঠিকানা লিখে রাখিস বকুলের দানা দিয়ে শিস-বাঁশি বানিয়ে দেব।
বাবার কাছে কোনও দিন সাদা শাড়ি কোনও দিন জংলা ছাপা আবার কোনও দিন হাওয়ায় ওড়া আঁচল আসত, মা তাই চলে গিয়েছিলেন মামার বাড়ি।
আমরা একই রকমের আর একটা মুখ খুঁজতাম। তখন মেলাতে পারিনি এখন বুঝতে পারি, সাদা শাড়ি, জংলা ছাপা আর হাওয়ায় ওড়া আঁচলের মুখগুলো আসলে একই হুবহু এক।
সতর্কীকরণ কবি সিদ্ধার্থ সিংহ কবির স্বনির্বাচিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।
বয়স্কদের থেকে একটু সাবধানে থাকবেন।
দেখবেন, ছেলেদের দিকে তেমন ভিড় না থাকলেও লেডিজ সিটের সামনে মেয়েদের ঠিক পিছনে . কিংবা গাঁ ঘেষে দাঁড়ানোর জন্য বাবা-জ্যাঠা-মামাদের সে কী প্রাণপণ লড়াই কয়েক দিন খেয়াল করলেই টের পাবেন গভীর রাতে উঠে শাশুড়ি কান পাতছেন . ছেলের ঘরের দরজায় না না, ছিঃ, ও সব শোনার জন্য নয়, কান পাতছেন, বউ তাঁর ছেলের কানে কোন মন্ত্র দিচ্ছেন, . তা শোনার জন্য বয়স হলে মানুষেরা ফুটপাতের এত ধার ঘেঁষে হাঁটেন যে, নোংরা তাঁরা পাড়াবেনই।
বয়স্কদের থেকে একটু সাবধানে থাকবেন।
এমনকী, যখন আমার বয়স হবে, তখন আমার থেকেও অবশ্য আমার বয়স কি আর বাড়বে!
ধুত কবি সিদ্ধার্থ সিংহ কবির স্বনির্বাচিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।
ছেলে মাধ্যমিক দিচ্ছে তাকে বললাম, তুই যদি নাইন্টি পার্সেন্টের বেশি পাস তোকে একটা ল্যাপটপ কিনে দেব, ছেলে পেয়েছিল।
বাঁক ঘুরতেই আলো-আঁধারিতে ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। কানাঘুষোয় শুনেছিলাম, বাড়িওয়ালা লোক ফিট করেছে আমি বললাম, তোমাকে উনি যা দিয়েছেন, তার থেকে বেশি দেব তুমি শুধু ওঁকে একবার কড়কে দাও আমার পিছনে যেন কোনও দিন না লাগে। পর দিন রাস্তায় দেখা হতেই বাড়িওয়ালা গদগদ হয়ে আমার দিকে সিগারেট এগিয়ে দিলেন, কেমন আছেন?
দিঘায় বেড়াতে গিয়েছিলাম আচমকা একটা স্রোত আমাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল দূরে নাকানি-চোবানি খেতে খেতে মা মনসাকে ডাকলাম রক্ষা করো মা, রয়ানি দিয়ে তোমার পুজো দেব। লোক নেই, জন নেই হঠাৎ কোত্থেকে একটা নুলিয়া এসে আমার চুলের মুঠি ধরল।
শুধু মানব নয় দানব নয় ঈশ্বরও ঠিক ঠিক প্রণামী পেলে যা চান, তাই দিয়ে দেবে। শুধু জানতে হবে কার প্রণামী কী।
আর, আপনাকে সুন্দরবনে ট্রান্সফার করে দিচ্ছে শুনেই আপনি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন, ধুত।
বিয়েবাড়ি কবি সিদ্ধার্থ সিংহ কবির স্বনির্বাচিত কবিতা। মিলনসাগরে প্রকাশ ২৮.৭.২০১৯।
বিয়েবাড়িটা মাতিয়ে রেখেছিল সে। ভীষণ ছটফটে, মিশুকে কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনে নিলাম তার বাড়ি, স্কুল গানের স্কুল, এমনকী কোথায় টিউশনি নেয়, তাও।
ক্লাস নাইনে পড়ে দল বেঁধে বেঁধে সব মেয়েরা চলে যাচ্ছে, সে কোথায়! উলটো ফুটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম বন্ধ হয়ে গেল স্কুলের ফটক। আধ ঘণ্টা আগেই বাণীচক্রের সামনে আমি হাজির রবিবার ওর গানের ক্লাস কিন্তু তিনটে তো বেজে গেছে তবে কি ওর কোনও অসুখ-বিসুখ হল! যেখানে ও টিউশনি নেয় সেই গলির মুখে ঘোরাঘুরি করলাম ক'টা দিন এত অন্ধকার কিচ্ছু দেখা গেল না। ওর হাতে তো একটা মোবাইল ছিল! ওহোঃ, কেন যে নম্বরটা নিলাম না না-হয় একটু হ্যাংলাই ভাবত!
ক'দিন পরে আবার একটা বিয়ে এবং সেখানেও যথারীতি সে। প্রথমেই বললাম, আগে আপনার নম্বরটা দিন তো... উত্তাল ঢেউ শান্ত হয়ে গেল। মৃদুস্বরে বলল--- বিয়েবাড়ি ছাড়া আপনি বুঝি আমাকে চিনতে পারেন না, না?