কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজির কবিতা
*
বর্ষবরণ : ১লা বৈশাখ, ১৪২৭
(বর্তমান মিডিয়া প্রোপাগান্ডার উপর)
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

এবারের বৈশাখ
তুমি বরণ করবে কি দিয়ে?
রক্ত দিয়ে নয়
চোখের পানি দিয়ে নয়
মাথার ঘাম দিয়ে নয়...
খবরের শিরোনাম দিয়ে
ফলা ফলা করে কেটে আমার হৃদয়
ছুড়ে দিয়ো দর্শকের দিকে
তারাও লুফে নেবে
বর্ষশেষ উৎসবের মতন!

এবারের বৈশাখ
তুমি বরণ করবে কি দিয়ে?
মিষ্টি দিয়ে নয়
শুভেচ্ছায় নয়
নেমন্তন্নয় নয়...
তুমি বাটি ভরে দিয়ো যত ঘৃণা ছিল মনের গহনে
আমি চুপচাপ গিলে নেব
কোনো কথা বলবো না
বাধ্য সন্তানের মতো।

এবারের বৈশাখ
তুমি বরণ করবে কি দিয়ে?
দুর্বিষহ গরম দিয়ে নয়
বুক জুড়ানো দক্ষিণের হওয়া দিয়ে নয়
চৈত্রের কঠোর মাটি দিয়ে নয়...
উগরে দিয়ো তোমার যত রাগ ছিল শতাব্দী প্রাচীন
পিঠ পেতে--- রক্ত দিয়ে নিয়ে নেব
আদর্শ নাগরিকের ন্যায়...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুই সুতো
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

ছেড়া কাপড়        
সেলাই ও করা যায়
সে তো ভুলেই গেছি!
এখন নুতন জামা বলে কোনো জিনিস নেই
শুধু নুতন রঙের খেলা
যাওয়া-আসা শেষ হয় না,
লেগেই আছে
আপডেট বলে কথা!
মা,
সেই কবে একটি সুই আর এক গুলি সুতো পাঠিয়ে ছিল...
আজও পড়ে আছে
সেইভাবে
বছর সাল গড়িয়ে গেল
ব্র্যান্ডেড কাপড় ছিড়লেও যে
ওয়ারেন্টি আছে,
সেলাইয়ের কি দরকার আছে?
.              মনে পড়ে,
মা কাঁথা সেলাই করতো
শীতকালে, দুপুরে রোদে বসে
লাইনের পরে লাইন দিয়ে
সেলাই সোজা হয়ে শেষ হয়
এক এক করে...
কখনো বাঁকা তো হতো না,
কি আশ্চর্য!
বু,
লেপের অড় সেলাই করতো
দুপুরে ভাত খাওয়ার পরে...
আমাকে বলতো,

"কোনাটা টানটান করে ধরিস" আর
শাড়ির পাড় থেকে সুতো খুলে নিয়ে
ধীরে ধীরে বুনে বুনে সুই বাড়িয়ে দিতে আমার দিকে...
সুতো সরু সরু
মোলায়েম
একটা দুটো তিনটে...
যতগুলি সুইয়ের গেরোয় ধরে
যে সুতোর গুলি কিনতে হতো না
তিন টাকা যার দাম ছিল।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ধর্মধারের বীল
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

আজ হাটবার
এ পথ দিয়ে মেলা লোক ফেরেনা
রাস্তা কাঁচা, নিঝুম...
ধর্মধারের বিল
আজও খালি রয়ে গেছে
সস্তার জমি
কাটায় কাটায় ভাগ হয়ে,
চারিপাশে পাকা বাড়ি।
'ও বিল অভিশপ্ত
ওখানে বাড়ি করলে বাড়ির কেউ না কেউ মরে যাবে'
বু বলে,
তাই হয়তো বিলটা
আজও খালি আছে
যেমন একশো বছর বছর আগে ছিল।
'এখানে মেলা বসতো
কোন শতাব্দী আগে
ওই বুড়ো বট গাছের তলায়

বিরুর ঝি-মা দেখেছে ছোটবেলায়'।
আমি আধাবেলা পেরে
দেখতে যেতাম বিলে
কত শালুক ফুল ফোটে
ভদ্র মাসে
ঝিঁঝি খেলা করে অবিরত
বিরাম নেই।
হয়তো এমনি বিরাম ছিলোনা
একশো বছর আগে
বিরুর ঝিমা যখন দেখেছে
শালুক ফুলের 'পরে
কেমন ঝিঁঝিঁ উড়ে পড়ে।
আজ বিরুর ঝি-মা নেই
কাল আমিও থাকবে না
ধর্মধার, তুমি অভিশপ্ত হয়ে থেকো
তোমার বুক চিরে
যেন কোনো পাকা বাড়ি না ওঠে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এ অকৃত্রিম শহরে
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

এ অকৃত্রিম শহরে
প্রত্যেক ধূলির কণা
প্রত্যেক দমকা হওয়া
বারবার কানে কানে বলে যায়,
"ফিরে যেতে হবে!"
হতবাক,
হয়ে আমি জিজ্ঞেস করি,
"কোথায়-কবে-কার কাছে?"
কোনো উত্তর নেই।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রবাসের জ্যেষ্ঠী
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

পহেলা জ্যেষ্ঠী।
দক্ষিণে হওয়া  বিকুপ্তপ্রায়
গাছের একটা পাতাও নাড়ে না।
কাপড়ের আঁচল ধরে
পাখার মতো চারিদিকে ঘোরাতে ঘোরাতে
বু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো
"আল্লাহ, একটু হওয়া দাও।"

হওয়া, এলো কিনা মনে নেই
তবে, বু'র আঁচলের হওয়ার ছাপ
এখনো স্পষ্ট
আমার বুকে, মুখে...
বৎসর পেরিয়ে গেছে
এ শহরে, এ সি কুলারের দাপটে
সে কথাই মনে পড়ে!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গ্রীষ্ম ২০১৯, ৪৯ ডিগ্রী টেম্পেরেচার
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

দুর্বিষহ গরম।
মায়ার বশে বন্ধু তাচ্ছিল্যের স্বরে বলেছিল,
"মরে যাবি তো!"

আমি উত্তর দিয়েছিলাম....
মণ্ডিতে আমার বু'র বয়েসের মতো মহিলারা
বোঝা মাথায় নিয়ে চলে
এই গরমে...
গাংমেনএ রা এক নাগাড়ে রেল লাইনে
পাথর বসিয়েই চলে

যাতে রাজধানী-শতাব্দী সময়মতো চলতে পারে
নইলে ভাত জুটবে না যে...
যদি না বিহার থেকে আসা নব-বিবাহত বধূ
একটা ভাঙা ছাতা লাগিয়ে
চকে
সেকা ভুট্টা বিক্রি করে
এই তীক্ষ্ণ রোদের মধ্যে...

যদি ওরা মরে, আমিও মরবো,
যদি ওরা বাঁচে, আমিও বেঁচে থাকবো।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হওয়া
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

হওয়া
এ শহরে  চলে এলোমেলো
গলি গলি ধুলোয় মেখে
বিছিন্ন
দক্ষিণের না...
তুমি কিসের কবিতা শুনবে?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কালপুরুষ
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

আকাশে অবিরত ধোঁয়ার আচ্ছাদন
এ শহরে
তারা, সে তো চোখেই পড়ে না।
মনে পড়ে,
আমরা সাতটা নাতী-নাতনি
বু'র কোলে উঠানের চাতালে শুয়ে
কেমন করে কালপুরুষের

দিকে চেয়ে চেয়ে
তারা গুনে গুনে বেড়ে উঠেছি
পূর্ব থেকে পশ্চিমে
বিশাল আকাশে
কোন কালে!
আজ,
আমারা যেন কেমন ছন্নছাড়া,
ঠিক এ শহরের আকাশের মতো
শতাব্দী পেরিয়ে গেছে
তবুও কালপুরুষের দেখা নেই!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদেশী খোকার তারা দেখা
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

এক রাশ তারা
মাথা ঝুঁকে
মিটিমিটি দেখে
কথা কয় না।
খোকা বিদেশি এখন
কালপুরুষ সপ্তর্ষি বৈশাখী
আর কারো চেনে না।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
লুঙ্গির কবিতা
কবি আজাহার উদ্দিন সাহাজি

ওরা লুঙ্গি নিয়ে হাসাহাসি করে
মনে পড়ে, আমার নানা,
ভরা শ্রবণের রাতে
লুঙ্গি পরে, কোদাল নিয়ে
যেত ক্ষেতে পড় কাটতে,
বর্ষার পানি যেন ধরে থাকে
নইলে, বাংলা সোনার কেমন করে হবে?
মনে পড়ে, অঘ্রয়নের ভোরে
আব্বা ডেকে নিয়ে যেত মাঠে,
ধান কাটতে হবে বলে,
সেই লুঙ্গি পরে
চেয়ে, আমিও তখন দেখেছি বাংলার মুখ!
মনে পড়ে, জামাইবাবু
চৈত্রের ছাতিফাটা রোদে
পাট খেতে
একা একা ঘাস নিড়িয়ে  চলে
একমনে, ক্লান্তিহীন---
আর লুঙ্গি দিয়ে কপালের ঘাম পোঁছে---
আমরা পৌঁছে দেখতাম গামছায় পান্তা বেঁধে নিয়ে।
লুঙ্গি পরতে ওদের কারও বাঁধেনি
না কোনো লজ্জা
যত লজ্জা, সব তো আমাদেরই!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর