কবি বাবলু গিরির কবিতা
*
মহাজন্ম - ১
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।

ভূমিষ্ঠ করেছিলে
গর্ভ ছিঁড়ে রাতভর কি বিষ্ময়ে দেখেছিলে, সৃষ্টিকে ।
গর্ভফুল খসামাত্র, মায়াপথ-
ষড়মন্ডলের হাড় মাস রক্ত মুত্র ।
উলু বাজলো,ঘিরে ফেলল বোবা শব্দ ধ্বনি ।
ফিরে আসি খড়ম ও জড়ুলে ।
এই তবে গোবরজল, তুলসীতলা,
হলুদমাখা স্নান ।
কেউই জানেনা আমি ছাড়া, পদ্মনাভী-
কিভাবে কাদায় ফুটে থাকি ।
কেন যে এসেছি আর কেনইবা মিশে যাবো
মাটি ও বাতাসে, সপ্তধাতুতে, এই মায়াভূমে ।
এ আমার মহাজন্ম, বরণ কর ষোড়শপাচারে ।
খিল খিল হা হা, এই কবিজন্ম,
ফুৎকারতা ।
সেই বোধিবৃক্ষতলে -
পরমান্ন দিও আমি ক্ষুধার্ত ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মহাজন্ম - ২
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।

অবাক হয়ে দেখি, পৃথিবীর কোলাহল
বোবা কান্না, পৃথিবীর হাঁ গহ্বরে শুয়ে।
হা ঈশ্বর- হা পৃথিবী তখনো বুঝিনি-
জ্ঞান বৃক্ষের ফলের মতো,
আমাকে অন্ন নিতে হবে, এবং শব্দের জামপাত্র
আমাকেও ফিরে যেতে হবে
ক্রমশ শব্দরা পেঁচিয়ে ফেলে
নদীরা উলুধ্বনি দেয়।
মগধের পথে পথে, হায় শালবৃক্ষ তলে মাতৃহারা
জ্বরা মৃত‍্যু ও সন্ন‍্যাসী, কিসের অন্নেষনে
এই মহাজন্ম,কিংবা কুশিনগরে
দুটি শালবৃক্ষের বিছানায়  শুয়ে থাকি।
দেখি বার্চর বাকলে ত্রিপিটক।
মৈত্রেয়ী হব বিরাশী হাজার বচরের আয়ু নিয়ে
কেতুমতি নগরে জন্ম নেব।
পায়াসান্ন হে সুজাতা দিও।
বোধিমগ্ন হবো।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মহাজন্ম - ৩  
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।

এ কি জন্ম আমি জন্মেছি,
মহাশূন‍্যে ।
এখানে সব ভাঙ্গে, সব ফিরে যায়
এ পৃথিবীও ছিলো না, এ নদী বৃক্ষ তুমি আমি ।
হা হা অট্টহাসি শুনি,মায়াজন্ম মোর
জ্বরা ও মৃত্যু আবর্তে আবর্তে, হা ঈশ্বর ।
তুমিও রক্তাক্ত,অনাথের মতো বেড়ে ওঠো,

লোভে ও পাপে, কিভাবে আরম্ভ কিভাবে শেষ
সব শূন্য,তবু ভিতরে জ্বলছে রচনা ও কূট চুর্ণনে ।
আমিও গড়ে উঠি, ক্রোধে ও বিনয়ে,
কামনায়, রোদনে ।
আহা ভোরের মতো জন্ম
অমাবস্যার মতো সমাধি ।
ঐভাবে ঘষে যায় জীবন,যুগ আসে যুগ ভাঙে ,
বৃক্ষও জ্বরাগ্রস্ত হয়,হা ঈশ্বর তুমিও বিষপান কর,
তপ্ত শরীরে ফিরে যাও।
বিষ তীরের দংশনে মহারথী ফিরে যায় ।
পেরেকবিদ্ধ বিছানা বয়ে যাব মৃত্যু পথে
বিষ্ময়ে দেখি মেঘেদের ঘাম ঝরা,
গোধূলীতে ধেনু সব ফিরে আসে ।
দেখি শ্মশানে তৃষ্ণার্ত আত্মারা জ্বলে,
ক্ষুদ্র বীজ,মাথা নত করে পুঁতে রই
মৃত্তিকার গভীরে, মহা বৃক্ষ হব বলে ।
কবি হব বোধিবৃক্ষতলে, জন্মেছি ক্ষুধার্ত,
হে সুজাতা পরমান্ন দিও, ভালোবেসে ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঈশ্বর ও ফেরিওয়ালা
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।

ঈশ্বর এক ফেরিওয়ালা ।
এসেছেন অবতারে,
সেই হোরেব পর্বতে দশাদেশ ।
হেরা পর্বতে জিব্রাইল,অশ্বস্থ বৃক্ষতলে ত্রিপিটক  
ঈশ্বর এইভাবে ফেরি করেন ।
যেভাবে কৃষক, অন্ন অবনীর বুকে বুনেন ।
গভীরে গোপনে, ঈশ্বরের নির্দেশে-
দেবতাগন, কখনো ফেবিয়াস, নেপথাইস,
কখনো পেরূনের বজ্র ঝলকানিতে -
মঘবার মতো বিধান দিয়েছ ।
পৃথিবীর কোষ্ঠী লিখেছ -
কুঁজিকাঠি নিয়ে নির্মাণ ও চূর্ণনের ইতিহাস  ।

ফেরিওয়ালা, নির্মাণ ও যুদ্ধের ফেরিওয়ালা ।
মায়াজালে কি রচনা কর - শূন্য ও কোলাহল !
মানুষ গোলকধাঁধার মতো তোমার অবট খেলা দেখে ।
নতজানু হয়ে ষোড়শপাচারে শিলাখন্ডে -
অর্চনা করে ।

বাঁশিওয়ালা,যমুনার কূলে প্রেমফেরি করেছিলে
অলিতে গলিতে শীলকাটাও, কিংবা-
গবেষনাগারে-কোয়ান্টাম তত্ত্ব চাই••ঈশ্বর কণা
চাই••  ।
গীতার জন‍্য কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ, বাইবেলের জন‍্য
কাঁটার কিরীটে কীলক বিদ্ধ ঈশ্বর ।
পুরুত ছুটে যায় মহলে মহলে -শালগ্রাম শিলা নিয়ে ।
তোমার নৈবেদ‍্য সাজাতে ।

কবি আমি ফেরি করি, পাপ পূণ‍্য, যজ্ঞভূমি ।
হে ঈশ্বর হাত পাতো -
শান্তির নৈবেদ‍্য দেব তোমার শূণ‍্য হাতে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আয়ু
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।
                       
জীবনের বয়সটাতো একটা সংখ‍্যা মাত্র ।
আগামীকাল একটা সংখ‍্যা বেড়ে যাবে
গতকাল একটা সংখ‍্যা কম ছিলো ।
একদিন এই বয়স আর বাড়বে না,কমবে না
শুণ্যতে ফিরে যাবে ।
একটা বৃত্তের মতো প্রথম বিন্দুতেই ফিরে আসা

পৃথিবীর সব সৃষ্টিই প‍্যারাবোলা,
বৃত্ত বা জন্মদন্ডের মতো নির্মাণ কলা,
সভ‍্যতার যোনি

সবকিছুই শূণ্য,খালি আমরা এক থেকে নয়
সংখ‍্যা হয়ে, জোকারের মতো দাঁড়িয়ে থাকি ।
খুঁজতে থাকি এক একটা শূণ‍্য
পরিপূর্ণতার খোঁজে ।

বছর পেরিয়ে,
ঋতু পেরিয়ে,প্রেম যন্ত্রণা পেরিয়ে সংখ্যায় আয়ু বাড়ে,
নাকি ক্রমশ কমে যায় !
বয়সতো একটা সংখ্যা -
আগামীকাল একদিন বেড়ে যাবে-
গতকাল একদিন কম ছিলো।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
লিবিডো
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।
                           
গাড়ি চলছিলো, উদম বস্ত্রহীন এলোমেলো রাস্তা দিয়ে,
অলুক্ষুনে বেড়াল রাস্তা পেরোলো ।
সময়কে থামিয়ে দাও, সামনে অমঙ্গল ।
এইসব বৃক্ষরাও মানুষের আততায়ী হয়ে ওঠে,
মাংস পুঁজ রক্ত পচনে খাদ‍্য হবে বৃক্ষের।

উলঙ্গ অক্ষর সাজিয়ে শব্দের রমনী সাজাই -
জন্মদন্ড ও হৃদয় নিয়ে বসে থাকি অরক্ষণীয়া।
ওই বৃক্ষ তার পত্র বাকলের শরীর নিয়ে
মানুষের মতো রক্ত মাংস নিয়ে বেঁচে থাকে -
স্বপ্ন আর বংশবৃদ্ধির সহবাসে।
আত্মাও বংশবৃদ্ধি করে,মানুষ যেমন থ‍্যানাটোস
হয়ে আত্মঘাতী, পরঘাতী ও বিধিঘাতী হয়ে ওঠে
আমি সেই নার্সিসাসের মতো
প্রেমকে হত‍্যা করি,আমার সৌন্দর্যের মগ্নে।
কাম প্রেরণায় ক্রমশ মৃত‍্যুর দেবতা হয়ে উঠি।

এই আগুনমাখা পৃথিবীতে
তোমার নৈবেদ‍্য সাজাই -বীর্য সিঞ্চন করি
মৃত‍্যুর উঠোন ডিঙিয়ে, জন্মের কুঁড়ে ঘরে
ক্রমশ আলোকিত হয়ে উঠি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চক্রপাদ
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।
                         
আহা শব্দ ও মধু মিলে মিশে যুগলবন্দী ।
মূঢ়গন বলেছিলেন মধুই শাশ্বত, অন্ন।
উত্তাপহীন বৃক্ষও জন্মায় না যেমন,
আহা ঐ ব্রহ্মঘরে এইসব শরীর,
ধান দূর্বা ও অশ্ব আর সেইসব মধূপর্ক ও ফল রচনা করি ।

মুঢ়গন বলেছিলেন বাঁচার সংগ্রামই নির্মাণ ও রচনা,
আর সেখানেই কেউ বুঝেছিল
শ্রম ও জড়বন্টন।
চৈতন্যময় শব্দের জীবন, কর্মময় চৈতন‍্যে বাঁচে।
আহা শব্দ খুলে যায়,মধু নৈবেদ‍্য হয় জঠরযজ্ঞে
মোহিনী ও ভষ্মাসুর,কামনৃত্য,
গরল ও অমৃতের যুদ্ধ,
এইভাবে শরীর- অশরীরী হয়,সময় ভেঙেচুরে একাকার।

মূঢ়রা নতজানু হয়,প্রাণ ও অন্নের কাছে,
আর জীবন বায়োস্কোপের মতো ছুটে চলে,
সভ‍্যতা থেকে সভ‍্যতার চক্রপাদে।
ক্রমশ আমি শব্দ হই,অন্ন ও প্রাণ -
আমার ভিতরের ঈশ্বর খুঁজে পাই,
অনন্তের গভীরে অনন্ত হয়ে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মুখ ভর্তি মুখ
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।
                       
আজকাল বড় ঘুম পায়।
ঐ অন্ধকার দিয়ে লোকটা হেঁটে যায়,
বিষণ্ন বিরক্তের মুখ,
এমন ছবির মতো মুখ রোজই দেখি।
ঐ নির্জন জ‍্যোৎস্নামাখা পথে প্রতিটি মুখ কেমন বিষাদভরা বেদনাক্ত।
আজকাল খালি ঘুম পায়,
মনেহয় থমথমে সব রাস্তাঘাট।
প্রতিটি মুখ বড় অচেনা লাগে,কেউ কাউকে চেনেনা,
প্রতিটি মুখে মুখোশ আঁটা।
আগামী প্রজন্মের মুখগুলি বড় অপরিচিত লাগে ।
এই মানুষের মুখোশে, কেউ জোর করে আমায়
জন্ম দিয়েছে,ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

হাজার হাজার মুখের ভিড়ে, আমার ঘুম পায়।
ক্রমশই বুঝতে পারছি, পরিচিত মুখ সব ফিরে গেছে।
আমি এখন ঘুমিয়ে পড়ছি,
আগামী দিন থেকে অনন্তকাল জেগে থাকতে হবে।
আমার মুখে অনন্ত মুখ, মুখ ভর্তি মুখ -
জেগে থাকে প্রতিটি মুখের অন্তরে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মৃত্যুর সুর
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।

মুগ্ধ হয়ে শুনি দরবারি অমা'র অন্ধকারে ।
নদীতে বেজে যায় পিয়ানোর ভৈরবী সুরে ।
বাতাসে শিরশিরে শীতের মালকোষ বাজে ।
পৃথিবী ও বসে থাকে রূপ রস গন্ধ মেখে ।
এইভাবে দিন যায় রাত যায় খসে খসে মধুকোষে ।
আহা জীবনের আয়ু সব ভেসে যায় ভালোবেসে ।
একদিন ঘুমায়ে রব ভিজে যাব পাতা ঝরা জলে ।
তুলসী চন্দনের গন্ধে মিশে যাবো শ্মশানের দেহে ।
দ্বাদশ যাত্রা সেরে স্বর হবো কড়ি ও কোমল সুরে  ।
পাখোয়াজ সারেঙ্গি যোগিয়া পাতার মর্মরে ।
নৈবেদ্য হবো পঞ্চভূতে মাটিতে শব্দে সুরে ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শব্দের নেশাড়ু
কবি বাবলু গিরি
মিলনসাগরে প্রকাশ ১২.২.২০২১।

আমি এক ঘোর মাতাল  
শব্দের চাঁট দিয়ে কবিতার ঢোক গিলি ।
একদিন চর্তমুখ দিয়ে ব্রহ্মশব্দ আউড়েছিলাম।
সোমরস খেয়ে বেদ থেকে উপনিষদ পেরিয়ে
তান্ত্রিক হলাম, তপোবনের শকুন্তলা হলাম ।
আস্ত পাঁড় মাতাল,শব্দ চিবোতে চিবোতে,
শব্দের অরিষ্টে তৃষ্ণা মেটাই ।
অগ্নি শর্মা আমি,মরা মরা বলে বাল্মীকি হয়েছি ।
কালিদাস হয়েছি শকুন্তলা হব বলে  ।
অন্ধ হয়েও, ইলিয়াড্ ও ওডেসি উগরে দিয়েছি ।
শব্দের নেশাখোর,ছিলিমে শব্দ ভরে -
কবিতার সুখটান  ।
ব্রহ্মান্ডকে উপুড় করে শব্দ ঢালি।
তরল গরল প্রেম, সব গিলে ফেলি -

আমি এক শব্দের নেশাড়ু  ।
ব্রহ্মান্ডের হৃদয়ের যন্ত্রণার তৃপ্তির ঢেকুর তুলি ।
শব্দ ধরে ধরে বেদনায়, কবিতার প্রলেপ মাখি ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর