কবি বিমল মণ্ডলের কবিতা
*
রোদের কোন অক্ষর নেই
কবি বিমল মণ্ডল
রচনার কাল  ১.১.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

কয়েক'শ বার আমি এই ঘরের থেকে যাই আসি
কেবল পরিচর্যার অপেক্ষায়
সকালের শুকনো রোদ চেটে খায় সমগ্র সময়
চোখ তুলে মাটি অনবদ্য ভঙ্গিতে আকাশটায়
দূর থেকে করুন আর্তনাদঃ ক্ষয়ে যাওয়া মনের
দামী এই  বহুজাতিক ইন্টারনেট :স্তব্ধ জনজীবন

একটা সভ্যতার চোখের পাতায় কৃত্রিম কোলাহল
সর্ব শূন্য স্বপ্ন  মহান যুদ্ধভূমি  
যেখানে মানুষের কোন জাত হয়না
সেখানে রোদের কোন অক্ষর নেই

শুধু মাটিতে পড়ে থাকা
স্বাধীন উজ্জ্বল শব্দগুলির গন্ধ কুড়াই।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মায়ের মাতৃভাষা
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল ৫.১.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

আমার মা আর আমি  পাশাপাশি মেঝেতে বসে
আমার মা আমার লেখা চিরকুটটার  দিকে একবার
আবার আমার চোখের দিকে আর একবার তাকায়    
আমি ভাবলাম মায়ের এই চাওয়া অপছন্দের
মাকে বললাম, 'আমি তো মায়ের ভাষাতেই লিখি!'
মা গজগজ করতে করতে আমার দিকে চেয়ে ভাবলে,
নিশ্চয়ই আমার ছেলের মনে দুঃখ আছে
আমি তো এখনও বেঁচে তাহলে ছেলের দুঃখ
কি করে আসবে?
মা ভাবতে থাকে, ভাবতে ভাবতে
আবার আমার লেখাটার দিকে চোখ বোলায়।

আমি বিস্মিত হই,
মুহূর্তে মা চিৎকার করে কয়েকটি মানুষের কথা বলে যায়
যাঁরা এই ভাষাতেই শহীদ হয়েছিল
'না না তুই এমন করে লিখিস না'-
আমি লেখা কবিতাটি মায়ের হাতে দিই
মা আবারও চোখ বুলিয়ে বলে
'এই একটুকরো কাগজে লেখা কবিতাটি
তোর মায়ের মাতৃভাষার পরিচয় দেবে। '

মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ি
আর বলি "সাব্বাশ মা! আমার জন্মদাত্রী মা"
এই ভাষাতে  লিখে যাই  আমি চিরকাল...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রোদ সাহিত্য
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল ৬.১.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।  

একগাছি সাহিত্য হাতে রোদ হেঁটে চলে
কেউ কোথাও পথে নেই দেখে
সাহিত্যগুলে খুলে ধরে দুপুর রোদে
ভাঙা ভাঙা আলোতে অক্ষর ঘ্রাণ
সহসা নিজের তীব্র চোখে  পড়ে
যেখানে আগুন চেটে খাচ্ছে সাহিত্য অক্ষর
দু'একটা পাতা পড়ে
হয়তো কপালের লিখন
সূর্যের এই অপার দৃশ্য দেখি, বিস্মিত হই
মুহূর্তে বাঁচাতে মরিয়া রোদ

উজ্জ্বল চোখে সাহিত্যের প্রতি পৃষ্ঠায়
অক্ষর চিনি আবারও মুছে যায়
পরম্পরায় এই বোধ কাজ করে
সমগ্র রোদ সাহিত্যে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নতুন ঠিকানা
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল ৬.১.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

অদ্ভুত  কয়েকটি বসত বাড়ির পাশে
দু'চার কলি পাখিদের মতো করে
কেউ যেন গেয়ে যায় রাস্তা দিয়ে
আমি আপন ভাবে চেয়ে  নয়ন ভরে।

সোঁদা গন্ধমাখা আকাশের গায়ে
ভীড় করে মাটি ঘ্রাণ নতুন ঠিকানায়
কালোমেঘ জমে ওঠে অন্ধকার করে
ভেসে আসে সেই সুর অনন্য আয়নায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঋতুরঙ্গ
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল ২৩.৯.২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

ঋতুর সাথে ঘর বেঁধেছি, স্বপ্ন দিনে-রাতে
কয়েকটি মাস ওলটপালট, তবুও এক সাথে

ভরা গ্রীষ্ম রাস্তা ভাঙ্গে দুপুর রোদের শাসনে
মনুষ্যহীন সরল হাওয়া রাজত্বকাল আসনে

ভিজে যাওয়া অনট বর্ষা আলো অন্ধকার
জোছনা ভরা আলোটুকু বহুরূপীতে আবার

হাওয়ায় ভাসে শিউলি সুবাস আহ্বানে শরৎ
সকাল চোখের পাতায় ছুটছে আকাশ রথ

শিশির ভেজা নরম শরীর আলতো পায়ে ছুঁয়ে
বসন্তেরই কোকিল সুর ঋতুর খেলায় পড়ে নুয়ে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মৃত্যুর কাছে
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল ২৩.৯.২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

হিসেব মৃত্যুর সংরক্ষণ
চাওয়ার মাঝে বেদনার প্রেম
তাও ভালোবাসতে চেয়ে
কয়েকগুণ অনুপাতে সরে যাওয়া

এমনই মৃত্যুর স্রোতে ভিজে যায় চোখ
প্রবল বর্ষার ভরা জলে
শোকের ভেতরে নামে

ভাবনার আবহে দীর্ঘ ভ্রমণ
তবুও সেই শ্মশান শিবির

লিখে যাই আস্তে -যেতে
কয়েকটি পাখির মতো
আমিও মৃত্যুর কাছে
জীর্ণ রাত্রির ঘরে
হাঁটু গেড়ে প্রতি অপেক্ষায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রেমিকের অন্তর্জাল
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল  ২৪.১২.২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

১.
সেই তো ঘর,  সে-ই তো স্বামী-ননদিনী
আমায় অবিশ্বাস ঝড়ে ফেলে গেলে
আমি ভালোবেসে ডাকি। তবুও এলে না
অন্ধকার কথা বলে শুধু প্রেমিকের অন্তর্জাল।

২.
রোজ দিগন্তরেখায় অসীমের জিজ্ঞাসা
আমি সেই ভাবি আমার মহাচেতনা খুলে
যতবার তোমার ডাকশুনি, মুহূর্তে তুফান বুকে
কি করে জানাবো এই বেদনাবিধুর ব্যাকুলতা।

৩.
আমার শরীরী অংশে কত রাত অপেক্ষায়
ঝড়, বৃষ্টিতে গম্ভীরা সুখ! সে অনবদ্য
তবুও রাঙা আকাশ ছকে অসুখ সারাই
তোমার সেই সংগোপন শরীরে।

৪.
অগাধ প্রেমিকের অন্তর্জাল, পাশে গানের ঢেউ
চেনার আশ্রয়হীন নীরব পথে
আমিও শুয়ে সারারাত... ;সেই অপেক্ষায়
চিনে নিতেই সময়ের প্রার্থনাটুকু।

৫.
এই দ্বন্দ্ব প্রাক্কালে  বৃষ্টির রহস্য:শব্দ সহবাস
তোমার শরীরে নারীবাস
দেখেছি নিবিড়তা রাত জুড়ে
আমার এই বিরহে;জাগে কবিতার মায়া।

৬.
আমার ডান হাতে ওঠানামা করে;চেঁচামেচি শব্দ
তোমার সেই স্মৃতি কয়েকটি ভ্রমণযোগে
মনে পড়  আদর্শ প্রেমিকের রদবদল
সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম শব্দের গায়ে নিখুঁত অন্তর্জাল।

৭.
আমি আমার পাশে তোমার রাত
সেই সোহাগি গানের  কান্নায়
রাত ভোর ভিজে যায় শরীরী অঙ্গ...
প্রশ্নভাসে আকাশের দুয়ারেঃঅন্তর্জাল কাব্য

৮.
জয়দেবের মধুরকান্ত পদাবলীতে একাকী কোলাজ গাঁথি
অভিসারে বৈষ্ণব রসে ক্ষণিক  জারিত হই
প্রেমজলে কামনার পথ;সে তো এই সংসার
আমি কাব্যিক বেড়ার ঘরে:শব্দের সন্ধি পুজো

৯.
তোমার কঠোর বিধিনিষেধ
সহসা ভেসে যায় খড়কুটো জলে
আমি নিয়তির অপেক্ষায়
প্রেমিকের অন্তর্জাল অবয়বে...

১০.
তোমাকে নিয়ে শেষের কবিতা
নীরব নারীর ছায়ায় কত গল্প
যে গল্পের চোখে রূপক তামাসা
সেখানেও প্রেমিকের অন্তর্জাল সহবাস।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এবং চেতনায় একা
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল ২৫.১২.২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

ঝরে পড়ছে খরা। তৃপ্ত চোখে।
অমোঘ বিধান। অন্ধকার নামে।      
একটা তুফান। পরিচয় সেই ঝড়ে।
মনে নাশকতা। বিভ্রান্তি হৃদয়ে।
চোখে প্রেম। সকলই একাকী।

২.
আমার প্রেমের গল্প। তোমাকে চিনি না। বলি?
হোক সময়। রাধিকার মতো। অভিসারে। চলি।  
বিরহবেদনা।মুহূর্তের প্রকাশ।ঝড় ঘিরে।চেতনায়।
জীবনের সাথে।গল্পের মতো।তুমি এলে।আয়নায়।
একাকী মেঘ। চেয়ে চেয়ে। শীত। বিছানায় ।

৩.
এবার চলো। অভিসারী পথে।ছোঁয়ার আশ্রয়।
এই মোহটুকু।আদব কায়দায়। জীবন থেকে।
আমার নির্ঘুম। চোখের জলে।সময় ঢাকে।
পরিচিত মুখ।অচেনা বোঝা।নেই প্রশ্রয়।
ভরসা হৃদয়ে। তোমার কাছে। প্রার্থনার।আশ্রয়।

৪.
কুয়াশা মাখা। বাঁকা পথ। চেতনায়। কোলাজ।
অনেক শুভেচ্ছা। অবিশ্বাস। ধুলো মুছি। আজ।
আসন দখল। সদর দরজা। ডিঙিয়ে। অভিনয়।
তবুও যেন। তোমার ঘরে। এতো বিশ্বাস। নয়।

৫.                       
 অক্ষর অক্ষর খেলা। নতুন সাধনা। একাকী।
আলো ভরা। চোখ উঠান। মায়াময়। চেতনায়।
বহু জন্মধরে। উপাসনা যাপন। আমার পার্থনায়।
সেই পথে পথে। কতবার আহত। করুনায় দেখি।

৬.
গুঞ্জন। শরীরে কলঙ্ক। কঠোর শব্দ যাপন।
আমি এক। শব্দ বাউল। একাকী করি সাধন।
আমার সমস্ত জ্ঞান। ভ্রম গুণি। চোখে মরিচীকা।
চেটেপুটে খায়। সমস্ত রোদ। দু'দণ্ড ছায়ায় একা।

৭.
শব্দ প্রেমে। পাগল মন। বেচারা নিশিযাপন।
এতো দুঃখ। ধীরে ধীরে। হৃদয় শূন্যস্থান।
আমায় ঘিরে। রোজ রোজ। শব্দে কোলাহল।
এসব আমি। আঁকি একা। চেতনায় কৌতুহল।

৮.
শহর ডাকে। শব্দ ভেঙে। বানান দুঃখ সার।
ভয়ে ভয়ে। গ্রাম কাঁপে। শাখাপ্রশাখা ভার।
হোক শব্দ। সুখের খেলা। এ-তো লীলা নয়।
চিরন্তন। রোজ অভিধান। বানান সংশয়।

৯.
কতবার। একা হয়েছি। শব্দ বিচ্ছিন্ন।
আঘাত যন্ত্রণা। ব্যথা বেদনা। অবষণ্ণ।
মনে মনে। মর্মে মরেছি। শুধু শব্দ এঁকে।
চিরবাউল মন।হেঁটে যাই।সমার্থক বেঁকে।

১০.
আজ মুক্ত। জিতেছি। সময় শেষে।
ক্ষতবিক্ষত। কত কাল। অবশেষে।
মেঘ সরাতে। স্বচ্ছ জোছনা। আলোর দেখা।
মনে আনন্দ। বিস্মিত। এবং চেতনায় একা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নির্লিপ্ত অন্ধকারে
কবি বিমল মণ্ডল
রচনাকাল ৩.২.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

আমার মা পশ্চিম ভেঙে পূর্বে
উত্তর ভেঙে দক্ষিণে খালি পায়ে পায়ে
ঝুড়ি ঝুড়ি কাদা নিয়ে
ক্লান্তিতে ফিরতেন বাড়িতে
উঠানের কোণের পুকুরে রোদ রঙ লেগে
মায়ের চোখে  বিষণ্ণ  চিন্তার ভাঁজ
তখনও আমি লম্ফর আলোতে পড়তে বসি
মায়ের দেওয়া সেই বর্ণ পরিচয় আর নামতার বই
আমার চোখে তখন অনিয়ম অনাহারে জেগে থাকা
কয়েকটি বর্ণের কাছে
মায়ের হাতে হাত দিই

আর তখনই স্বজনেরা
তাই অধিকার করে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অভাবী স্নেহ ও মায়া
কবি বিমল মণ্ডল  
রচনাকাল ৩.১.২০২১। মিলনসাগরে প্রকাশ ১১.২.২০২১।

মায়ের সংসারী ঠিকানায়
ছয় ছ'জন ছেলেমেয়ে
ফাঁকা উঠানে বসে
মায়ের কায়েমশ্রমের দায়ভার বহন করতে গিয়ে
আমি গলাছেড়ে বর্ণপরিচয় ও কয়েকটি নামতা
মুখস্ত করি
সহসা আমার পিঠের পরে কয়েক ফোটা জল
ফিরে দেখি মা দু'চোখে উজ্জ্বল জোছনায়  
আমার সারা শরীর থেকে  তুলে নিচ্ছে
অভাবী   স্নেহ ও মায়ায়...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর