কবি আকবর আলী - জন্মগ্রহণ করেন শ্রীহট্ট জেলার ‘গুধরাইল’ পরগণার ‘মামদপুর’ গ্রামে। পিতা আবদুল আজিম। কবির পৈত্রিক নাম ছিল সরপউদ্দিন কিন্তু ইনি আকবর আলী বা ছাবাল সাহ আকবর আলী নামে খ্যাত হন।
এই কবি ও "কবি আলি আকবর" যাঁর "আলি আকবর" ভণিতা, এই দুই ব্যক্তি এক ও অভিন্ন কি না তাও আমরা জানি না। তাই তাঁদের জন্য আলাদা পাতা করা হলো।
কবির রচনাসম্ভারে রয়েছে ‘এস্কে দেওয়ানা’, ‘ফানায়ে জান’ ও ‘যৌবন-বাহার’ গ্রন্থ। এই তিনটি গ্রন্থে তাঁর ২১টি রাধাকৃষ্ণ-লীলা-বিষয়ক গান আছে। দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা তাঁর একটিও গ্রন্থ যোগাড় করে উঠতে পারিনি।
১৯৪৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থ থেকে একটি বৈষ্ণব পদ এবং ১৯৬৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, গুরুসদয় দত্ত ও ডঃ নির্মলেন্দু ভৌমিক সম্পাদিত, “শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত” সংকলন থেকে একটি বৈষ্ণব পদ ও দুটি বাউলাঙ্গের গান পেয়ে এখানে তুলে দিয়েছি।
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থের ১০৭-পৃষ্ঠায় এই কবির পরিচয় এইভাবে দেওয়া রয়েছে . . .
"ইনি শ্রীহট্ট জেলার ‘গুধরাইল’ পরগণার ‘মামদপুর’ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ইঁহাদের পুর্ব নিবাস হবিগঞ্জের ‘তরফ’ ছিল। পিতার নাম আবদুল আজিম। ইঁহার নাম ছিল ‘সরপউদ্দিন’ কিন্তু পরে ইনি ‘আকবর আলী’ নামে প্রসিদ্ধ হন। কবি প্রত্যেক গানের ভপিতায় নিজকে ‘ছাবাল আকবর আলী’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। কবি শ্রীহট্টের অন্ততম প্রসিদ্ধ সাধক কবি ‘ছৈয়দ শাহনূরের’ পুত্র ‘শাহজহুরআলীর’ শিষ্য ছিলেন। ইঁহার রচিত ‘এস্কে দেওয়ানা’, ‘ফানায়ে জান’ ও ‘যৌবন-বাহার’ নামক তিনখানি গ্রন্থ মুদ্রিত হইয়াছে। উক্ত গ্রন্থত্রয়ে রাধাকৃষ্ণ-লীলা-বিষয়ক মোট ২১টি গান আছে। কবির বংশলতা-জাফর আলী-মেন্দিকামাল-আবদুল আজিম-সরপউদ্দিন বা ছাবাল সা আকবর আলী। তুল--- “সাহা সরপউদ্দিন নাম রাখিলা আমার। আকবর আলী ছাবাল সাহ নাম করিলা প্রচার॥ ছৈয়দ সাহনূরের বেটা সাহা জহুর আলী নাম। তান খেদমতে আমি অধম গুলাম॥” (এস্কে দেওয়ানা পৃঃ ২২)।”
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . . “. . . রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয় মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন, মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন। মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা গাহিয়াছেন।”