কবি এর্শাদুল্লাহ - চট্টগ্রাম জেলার “বাঁশখালী” থানার অন্তর্গত “ওশখাইন' গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। এঁর পিতা অন্যতম প্রসিদ্ধ কবি “আলিরাজা” বা “কানুফকির”। এঁর ভ্রাতা কবি সর্ফতোল্লাও পদকর্তা ছিলেন। তিনি তাঁর পিতার কাছে দীক্ষিত ছিলেন।
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে তিনি এই কবির সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“এর্শাদুল্লাহ - ইনি কবি আলীরাজার পুত্র, নিবাস “ওশখাইন', অষ্টাদ শতকের শেষ পাদের কবি। ইনি পিতার দীক্ষিত, ইহার রচিত ৬টি পদ মুসলিম কবির পদ-সাহিত্যে গৃহীত হইয়াছে ; তন্মধ্যে মাত্র একটি পদ কৃষ্ণলীলা- বিষয়ক। আলীরজা পায়ে তাহান নন্দন ভণএ (পদ সং ৩৭৫) আলিরজা গুরু পন্থের তরু (পদ সং ৩৭৪)।"
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . . “. . . রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয় মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন, মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন। মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা গাহিয়াছেন।”
আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদের অনুপ্রবন্ধ - পাতার উপরে . . . জলধর সেন সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার পৌষ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় (জানুয়ারী ১৯১৯ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদের মুসলমান কবির বৈষ্ণব-পদাবলী প্রবন্ধের ৭৮-পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন . . .
“প্রাচীন কালে মুসলমান কবিগণ বৈষ্ণব-পদাবলী বা রাধাকৃষ্ণের লীলাবিষয়ক কবিতারাজি রচনা করিয়াছিলেন, ইহা এখন আর নূতন কথা নহে। অনেকেই জানেন, নদীয়া--- মেহেরপুরের জমিদার পরলোকগত বাবু রমণীমোহন মল্লিক মহাশয়ই সর্ব্বপ্রথমে মুসলমান কবিগণের কয়েকটি বৈষ্ণবপদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করিয়া সাহিত্য-সমাজের গোচর করেন। তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে এদিকে আমিও বহু পদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করিয়া কাব্যামোদিগণের আনন্দ বর্দ্ধন করিতে থাকি। আমার সংগৃহীত পদগুলি একত্র করিয়া রাজসাহীর সুপ্রসিদ্ধ সাহিত্যিক বন্ধুবর শ্রীযুক্ত ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল মহশয় কয়েক বৎসর পুর্ব্বে তাহা পুস্তকাকারে প্রকাশিত করিয়া দেন। ইতোমধ্যে আমি আরও বহু পদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করিয়াছি। পাঠক পাঠিকাগণ শুনিয়া আনন্দিত হইবেন, একমাত্র আমার চেষ্টায় এরূপ মুসলমান কবির সংখ্যা এখন পঞ্চাশেরও উপরে উঠিয়াছে।
সম্প্রতি আরও অনেক নূতন ও পুরাতন কবির অনেক নূতন পদ আমার হস্তগত হইয়াছে। তন্মধ্যে অনেকগুলি পদ গত বৎসর "গৃহস্থে” “ভারতবর্ষে” ও “ঢাক রিভিউ ও সম্মিলন” পত্রে প্রকাশিত হইয়াছে। আজ আবার আরও কয়েকটি নূতন পদ এস্থলে প্রকাশ করিতেছি।
এই প্রবন্ধে সৈয়দ মর্ত্তুজার ৪টি, আমানের ১টি, মীর ফয়জুল্লার ১টি, সেখ কবিরের ১টি, মনোয়ারের ২টি, এবাদুল্লার ১টি, আলিমুদ্দিনের ১টি, মোহম্মদ হামিরের ১টি এবং আবঝলের ১টি --- মোট ১৩টি পদ প্রকাশিত হইল। এই সকল কবি নূতন নহেন। কিন্তু তাঁহাদের পদগুলি সম্পূর্ণ নূতন বটে।
১০৮৯ মঘী সনে বা ১৬৪০ শকাব্দে (১৭১৮ খৃষ্টাব্দ) লিখিত “রাগমালা” নামক একখানি সঙ্গীত-গ্রন্থের ভিতর এই সকল পদ পাওয়া গিয়াছে। যাঁহারা কখনও প্রাচীন পুঁথির আলোচনা করিয়াছেন, তাঁহারা বেশ অবগত আছেন যে, একমাত্র প্রতিলিপির সাহায্যে সেকালের কিছু সম্পূর্ণ নির্ভুলরূপে প্রচার করা বড়ই কঠিন। এই কারণে পদগুলির স্থানে স্থানে অসংলগ্রতাদি প্রমাদ পরিলক্ষিত হওয়ার খুব সম্ভাবনা রহিয়াছে। প্রাচীন সাহিত্যের সংশোধনের ক্ষমতা কাহারও নাই। এজন্য আমরা পদগুলি প্রায়ই “যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং” করিয়া প্রকাশ করিলাম।
যে দেশে বড়-বড় কবিগণেরই পরিচয় পাওয়া যায়া না, সে দেশে এ সব ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র পদ-রচয়িতা কবিগণের পরিচয় কোথায় পাওয়া যাইবে?
ব্রজসুন্দর বাবুর “মুসলমান বৈষ্ণব কবি” নামক সংগ্রহ-গ্রন্থগুলির ভূমিকায় ইহাঁদের জীবনী-সম্বন্ধ জ্ঞাতব্য সকল কথা একবার প্রকাশ করিয়াছিলাম। এখানে তাহার পুনরুক্তি না করিয়া কেবল এই কথা বলিয়া রাখি, ইহাঁরা খুব সম্ভব চট্টগ্রামেরই কাব্য-কাননের কোকিল ছিলেন। তাঁহাদের নস্বর দেহ কোন্ সুদূর অতীতে মাটীতে মিশিয়া গিয়াছে ; কিন্তু তাঁহাদের পরিত্যক্ত বীণা এত দিন পরে আবার ঝঙ্কৃত হইয়া উঠিয়া, দেশবাসীর প্রাণে কি অভূতপুর্ব্ব আনন্দের সঞ্চার করিতেছে!”