আমরা মিলনসাগরে  কবি জগদানন্দের পদাবলী  তুলে  আগামী  প্রজন্মের  কাছে  পৌঁছে দিতে  পারলে  এই
প্রচেষ্টাকে সফল মনে করবো।

কবি জগদানন্দের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    



আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১.৯.২০২০।
...                                                                                            
*
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
কবি জগদানন্দ - বৈষ্ণব পদকর্তা হতে
পারেন  এমন  চারজন  জগদানন্দের  নাম
আমরা পাই।

১।
জগদানন্দ পণ্ডিত - ইনি কাঁচড়াপাড়ায়,
কবি কর্ণপূরের পিতা শিবানন্দ সেনের গৃহে
থাকতেন  এবং  তাঁর  সঙ্গে  নবদ্বীপে যান
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে দেখা করতে, এবং
সেখানেই  থেকে  যান।  ইনি   শ্রীচৈতন্যের
সন্ন্যাস গ্রহণের পরে তাঁর  সঙ্গেই  নীলাচলে
চলে  যান।  ইনি  
শ্রীচৈতন্যকে  সত্যভামার
মতো  দেখভাল  করতেন।  গৌড়ীয় বৈষ্ণব
মতে পূর্ব-লীলায় ইনি সত্যভামা ছিলেন।

নদীয়া জেলার কুমারহট্ট বা হালিসহরের "চাপাল গোপাল" ওরফে
দৈবকীনন্দনের বৈষ্ণব বন্দনায় জগদানন্দ
পণ্ডিতের বন্দনা রয়েছে . . .

জগদানন্দ পণ্ডিত বন্দোঁ সাক্ষাৎ সরস্বতী।
মহাপ্রভু কৈলা যাঁরে পরম পিরীতি


কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতের আদিলীলার  ১০ম  পরিচ্ছেদে এই  জগদানন্দ পণ্ডিতের উল্লেখ
রয়েছে . . .

পণ্ডিত জগদানন্দ প্রভুর প্রাণ রূপ। লোকে খ্যাতি যিঁহ সত্যভামার স্বরূপ॥
প্রীতে করিতে চাহে প্রভুর লালন পালন। বৈরাগ্য লোক ভয়ে প্রভু না মানে কথন॥
দুই জনে খট মটি লাগয়ে কোন্দল। তাঁর প্রীতি কথা আগে কহিব সকল


ইনি পণ্ডিত ছিলেন।  তাই  ধরে  নেওয়া  যায়  যে  পদাবলী  রচনা  করার  ক্ষমতা তাঁর ছিল।
জগদ্বন্ধু ভদ্র
সংকলিত “গৌরপদতরঙ্গিণী” সংকলনের ২য় সংস্করণের সম্পাদক  মৃণালকান্তি ঘোষ, তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন
যে সেই গ্রন্থে প্রকাশিত “জগদানন্দ” ও “জগত” ভণিতার ২৩টি পদের মধ্যে  কেবল  একটি  মাত্র  “দেখ দেখ
গোরাচাঁদ নদীয়া নগরে” পদ বাংলায় লেখা। বাকি সব ব্রজবুলীতে রচিত।  তাঁর  মতে  এই  বাংলা পদটির
রচয়িতা  চৈতন্য  সমকালীন  পণ্ডিত  জগদানন্দ  হতেও  পারেন।  
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র  তাঁর সহ  
সম্পাদনায়   প্রকাশিত   “শ্রীপদামৃতমাধুরী”  ১ম  খণ্ডে   জগদানন্দকে   
শ্রীচৈতন্যের  সমসাময়িক  বললেও,
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ডে  তিনি  তা সংশোধন করে জগদানন্দকে
শ্রীচৈতন্যের পরিকর খণ্ডবাসী মুকুন্দের
বংশধর বলেছেন।

২।
রাধামোহন ঠাকুরের পিতা জগদানন্দ -  শ্রীনিবাস আচার্য্যের  প্রপৌত্র  তথা  “পদামৃতসমুদ্র”  নামক
পদাবলী সংকলনের রচয়িতা
রাধামোহন ঠাকুরের পিতার নাম ছিল জগদানন্দ। ইনি তাঁর জীবদ্দশায় গৌড়ীয়
বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের শীর্ষে ছিলেন। ফলে ধরে নেওয়া যায় যে তিনিও  পদাবলী  রচনা  করতে  সক্ষম ছিলেন।
কিন্তু তিনি পদকর্তা ছিলেন, এমনটা শোনা যায় না।

৩।
জোফলাই-এর ঠাকুর জগদানন্দ - বর্ধমান জেলার কাটোয়া  সাবডিভিশনের অন্তর্গত  শ্রীখণ্ড গ্রামের   
নরহরি সরকার ঠাকুরের ভাই মুকুন্দের পুত্র রঘুনন্দনের বৃদ্ধ-প্রপৌত্র জগদানন্দ ঠাকুর।  জগদানন্দের পিতার  
নাম নিত্যানন্দ এবং পিতামহের নাম পরমানন্দ ছিল। জগদানন্দ চার ভাইয়ের মধ্যে  জ্যেষ্ঠ  ছিলেন।  অন্য  
ভাইরা ছিলেন সচ্চিদানন্দ, সর্ব্বানন্দ ও কৃষ্ণানন্দ। পিতা নিত্যানন্দ, কর্মসূত্রে শ্রীখণ্ড ছেড়ে  রাণীগঞ্জের  
অন্তর্গত  আগরডিহি-দক্ষিণখণ্ডে গিয়ে বসবাস শুরু করেন।

১৯২৫  সালে  প্রকাশিত  মুরারিলাল   অধিকারীর  “বৈষ্ণব  দিগ্  দর্শন”   পদকর্তা জগদানন্দের জন্মের সন
১৬২৪ শকাব্দ বা  ১৭০২  খৃষ্টাব্দ  দেওয়া  আছে।  জগদানন্দ  বীরভূম  জেলার  দুবরাজপুর থানার অন্তর্গত
জোফলাই  গ্রামে  গিয়ে  বাস  করেন।  তাঁর  অলৌকিক শক্তির পরিচয় পেয়ে,  তাঁকে  পঞ্চকোটের  রাজা
আমলালা নামের মৌজা দান করেন। ১৬৭৭ শকাব্দ বা ১৭৫০ খৃষ্টাব্দে তিনি জোফলাই গ্রামে শ্রীগৌরাঙ্গ বিগ্রহ
স্থাপন করেন।

সেখানে  “গৌরাঙ্গসাগর”  বা  “গৌরাঙ্গসায়র”  নামের  একটি  পুষ্করিণীও  খনন   করেন।   জগদানন্দের   
অলৌকিক শক্তির কথা এবং এই পুষ্করিনী খনন ও পঞ্চকোটের রাজা দ্বারা,  আমলালা  নামের মৌজা দান
সম্বন্ধে  ১৩২৩  বঙ্গাব্দে  (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) মহারাজকুমার  মহিমারঞ্জন  চক্রবর্তী  দ্বারা  সম্পাদিত,  
হরেকৃষ্ণ
মুখোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত, বীরভূম-বিবরণ, ১ম খণ্ডের, জোফলাই  কাহিনীতে  হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের
উদ্ধৃতি পড়তে
এখানে ক্লিক করুন . . .

জগদানন্দ ঠাকুরের তিরোধান ১৭০৪ শকাব্দের ৫ই আশ্বিন,  বামন  দ্বাদশী  তিথিতে (১৭৮২ খৃষ্টাব্দে)।  প্রতি
বছর সেখানে, এই তিথিতে তাঁর তিরোভাব মহোত্সব পালিত হয়ে আসছে।

৪।
মঙ্গলডিহির জগদানন্দ - “আরতি করে নন্দরাণী বালক মুখ হেরি শিরোনামের  পদের  রচয়িতা,  
পদকর্তা গোকুলানন্দের পুত্র মঙ্গলডিহির  জগদানন্দের  একটি মাত্র  পদ  সর্বপ্রথম  প্রকাশিত  হয়  ১৩২৩  
বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) মহারাজকুমার মহিমারঞ্জন চক্রবর্তী দ্বারা সম্পাদিত,
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় দ্বারা
প্রকাশিত, বীরভূম-বিবরণ, ১ম খণ্ডের, মঙ্গলডিহি-কাহিনীতে। পরে প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে,
হরেকৃষ্ণ
মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত “বৈষ্ণব পদাবলী”  সংকলনে। এই জগদানন্দ সম্বন্ধে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি
পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বিদ্যাপতি
চণ্ডীদাস ও অন্যান্য বৈষ্ণব মহাজন গীতিকা”  সংকলনে  কোনও  পদ  না  থাকলেও এই কবির উল্লেখ
রয়েছে “কবি-পরিচয়” অনুচ্ছেদে। এই জগদানন্দ সম্বন্ধে
চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ে পুরো উদ্ধৃতিটি পড়তে
এখানে ক্লিক করুন . . .
জগদানন্দের অলৌকিকত্ব নিয়ে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় উদ্ধৃতি -                   পাতার উপরে . . .   
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) মহারাজকুমার মহিমারঞ্জন চক্রবর্তী দ্বারা সম্পাদিত,  
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়  
দ্বারা প্রকাশিত, বীরভূম-বিবরণ, ১ম খণ্ডে, জোফলাই কাহিনীতে কবি জগদানন্দের অলৌকিকত্ব, গৌরাঙ্গসায়র
ও মৌজা প্রাপ্তি নিয়ে ১৮৬-পৃষ্ঠায়
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন . . .

প্রেম-অনুরাগ ও ভক্তিগুণে জগদানন্দ  সিদ্ধিলাভ  করিয়াছিলেন।  তাঁহার অলৌকিক শক্তি সম্বন্ধে যে সকল
প্রবাদ এতদ্দেশে প্রচলিত আছে, তাহা নিম্নে প্রদত্ত হইল।

অতিথি-সেবা তাঁহার জীবনের এক প্রধান ব্রত ছিল, নিত্য কত সাধু-বৈষ্ণব-ভিখারী তাঁহার দ্বারা আপ্যায়িত
হইতেন। এক সময়ে পশ্চিমদেশীয় কতকগুলি সাধু তথায় উপস্থিত হয়েন এবং পথশ্রমে কাতর হইয়া ব্রাহ্মণ-
প্রতিষ্যিত কূপের জল পান করিবার :ইচ্ছা প্রকাশ করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে জোফলাই গ্রামে কূপ ছিল না, সেইজন্য
জগদানন্দ  বড়ই  বিব্রত  হইয়া  যোড়করে  মহাপ্রভুকে  স্মরণপুর্ব্বক  একটি লৌহদণ্ডের দ্বারা মৃত্তিকা খনন
করিতে লাগিলেন, দেখিতে দেখিতে পাতাল ভেদ করিয়া স্বচ্ছ সলিলরাশি অনর্গল ধারায় উত্থিত হইতে আরম্ভ
করিল, জগদানন্দ  তাহা  দ্বারা  সাধুগণের  তৃষ্ণা-নিবারণ  করিলেন। এই জলরাশি এখনও সরোবর আকারে  
বিদ্যমান রহিয়াছে।  উহাকে  সাধারণে  “গৌরাঙ্গ-সায়ের” বলে। জগদানন্দ মভাগ্রভু প্রেমধর্ম্ম-প্রচারের জন্য
সর্ব্বদা  দেশ-বিদেশে  গমন করিতেন।  ভ্রমণ  করিতে  করিতে তিনি পঞ্চকোট রাজ্যান্তর্গত আমলালাসুনুরী
নামক গ্রামে আসিয়া  উপস্থিত হয়েন, এখানে আসিয়া একদিন তিনি একটি নির্ম্মল সরোবরের মধ্যস্থলে জল-
বেষ্টিত একটি রম্য-দর্শন দ্বীপ দেখিতে  পাইলেন।  কবিবর  এই  নির্জন  ও  মনোহর  স্থানটি  ঈশ্বরারাধনার
উপযুক্ত আশ্রম বিবেচনা করিয়া কাষ্ঠপাদুকা পরিধান  করিয়াই  সাধনবলে স্বচ্ছন্দে জলের উপর দিয়া সেই
দ্বীপে উপস্থিত হইলেন।  তিনি প্রত্যহ  অদ্ভুত  উপায়ে উক্ত  দ্বীপে গমন করতঃ নির্জ্জনে ঈশ্বরারাধনায় রত
থাকিতেন।

অচিরকালমধ্যে এই ঘটনা গ্রামে রাষ্ট্র হইয়া গেল এবং ক্রমশঃ এই সংবাদ পঞ্চকোট-রাজের কর্ণগোচর হইল।
তিনি তথায়  আগমনপূর্ব্বক  স্বচক্ষে  এই  অদ্ভুত  ব্যাপার  দর্শন  করিয়া  আশ্চর্য্যান্বিত  হইলেন।  তদবধি
হরিভজন করিবার জন্য পঞ্চকোট-অধিপতি জগদানন্দকে আমলালাসুনুরী গ্রাম দান করিয়াছিলেন। জগদানন্দ
ঐ সম্পত্তি তৎপ্রতিষ্ঠিত  গোপীনাথ  জীউর  নামে  অর্পণ  করেন।  গোপীনাথ  জীউর  সম্পত্তির  আয় হইতে
জগনানন্দ-প্রতিষ্ঠিত সকল বিগ্রহের সেবা-পূজা হইয়া থাকে।

সেই  অবধি  উক্ত  বৃহৎ  সরোবরটি  ‘ঠাকুরবান্ধ’ নামে আখ্যাত হইয়া থাকে।  কবিবরকে সাধারণে ঠাকুর
বলিয়াই ডাকিত, সেই জন্য এই জলাশয়ের নামও ‘ঠাকুরবান্ধ’ হইয়াছে
।"
এই পাতার কবিদের ভণিতা
জগদানন্দ, জগত, জগত আনন্দ,
আনন্দ
জগদানন্দের অলৌকিকত্ব নিয়ে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দের কবিত্ব নিয়ে ঘোর বিতর্ক    
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে কালিদাস নাথের উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে জগদ্বন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি    
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেনের তির্যক মন্তব্য   
জোফলাই-এর কবি জগদানন্দ নিয়ে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি   
মঙ্গলডিহির কবি জগদানন্দের নিয়ে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দ সম্বন্ধে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে বিমান বিহারী মজুমদারের উদ্ধৃতি    
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে নীলরতন সেনের সুষম উদ্ধৃতি   
কবি জগদানন্দের সম্বন্ধে দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি    
জগদানন্দ পণ্ডিত সম্বন্ধে কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যর চিত্তাকর্ষক উদ্ধৃতি   
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব নিয়ে ঘোর বিতর্ক -                                        পাতার উপরে . . .  
নগেন্দ্রনাথ  বসু  দ্বারা  সম্পাদিত  সাহিত্যপরিষদ  পত্রিকার ১৩০৫ বঙ্গাব্দের  ৪র্থ  সংখ্যায়  (মার্চ ১৮৯৯)
প্রকাশিত,  কালিদাস নাথের  “বৈষ্ণব-কবি জগদানন্দ”  প্রবন্ধে  তিনি  স্পষ্ট  লিখেছেন  যে  অন্যরা  
চৈতন্য-
সমকালীন   জগদানন্দ  পণ্ডিত  বা  
রাধামোহন  ঠাকুরের  পিতা  জগদানন্দের  নাম  নিলেও,  জগদানন্দের  
প্রথমাবস্থার  স্বহস্তলিখিত  পাণ্ডুলিপিতে  “
খণ্ডবাসিয়া  খণ্ডকপালিয়া  জগদানন্দ ভাষই”  পদ  থেকে  তিনি  
নিশ্চিত  যে  এই জগদানন্দই পদকর্তা ছিলেন।

তিনি  লিখেছেন যে জগদানন্দের  পদাবলী  “বাহ্যচিত্র”,  “অন্তশ্চিত্র”, “অনুকৃত” ও “সাধারণ” এই চার ভাগে
ভাগ করা যায়। তাঁর  পাণ্ডুলিপির  মধ্যে,  স্বহস্তে  লিখিত  একটি  “খসড়া”-ও পাওয়া গেছে। যেখানে তিনি  
অসংখ্য  অন্তমিল  শব্দের  একটি  অভিধানের মত তৈরী  করেছিলেন। এই খসড়াটি নিয়েও  
রায়বাহাদুর
দীনেশচন্দ্র সেনের তির্যক মন্তব্য রয়েছে। মন্তব্যটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .

মিলনসাগরে আমরা মনে করি যে, এই খসড়াটি কবির পক্ষে  অন্যায়ের  কিছু  নয়।  এমন  খসড়া  হয়তো  
আরও বহু কবি নিজের জন্য তৈরী করে রাখেন। দুর্ভাগ্যবশত  এই খসড়াটি কবি জগদানন্দের মৃত্যুর পরে
উনিশ  শতকের  বৈষ্ণব  সাহিত্যের  গবেষকদের  হাতে  প'ড়ে  সর্বসমক্ষে  চলে আসে এবং
রায়বাহাদুর
দীনেশচন্দ্র সেনের হাতে প’ড়ে তাঁর তির্যক মন্তব্যের অধিকারী হয়!

কালিদাস নাথের মতে পদকর্তা জগদানন্দ অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদকর্তা ছিলেন। এমন কি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে
গোবিন্দদাস কবিরাজের উপরে তিনি স্থান দিয়েছেন। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন . . .

কোন কোন সংস্কৃত কবি ও কোন কোন বঙ্গীয় কবি অন্তশ্চিত্র পদাবলী গ্রন্থন করিয়াছেন বটে, কিন্তু
তদ্বিষয়ে জগদানন্দের ন্যায় প্রচুরশক্তি প্রদর্শনে কেহই সমর্থ হন নাই। বাহ্যচিত্রাবলী প্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা
গোবিন্দদাসের অনেকগুলি আছে বটে, কিন্তু জগদানন্দের চিত্রপদের নিকট তাহাও অকিঞ্চিত্কর
।”

বৈষ্ণব পদাবলীর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে, কালিদাস নাথের উপরোক্ত অভিমতের যেমন সমর্থক ছিলেন তেমনই
ভীষণভাবে  বিরোধীও  ছিলেন।  “গৌরপদ-তরঙ্গিণী”-র সংকলক
জগবন্ধু ভদ্র কালিদাস নাথের সঙ্গে সহমত
পোষণ  করে,  তাঁর  “গৌরপদ-তরঙ্গিণী” সংকলনের ভূমিকায় জগদানন্দের ভূয়সী প্রসংশা করে লিখেছেন -
কালিদাস নাথ মহাশয় জগদানন্দের কবিত্ব ও কাব্য সম্বন্ধে মন্তব্যে ব্যাপদেশে যে সকল কথা কহিয়াছেন,
তাহাই এ বিষয়ের অতি সুন্দর সমালোচনা
”।
কালিদাস নাথের সম্পূর্ণ  উদ্ধৃতি  পড়তে  
এখানে ক্লিক করুন . . .।  
জগদ্বন্ধু ভদ্রর সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থে, ঠিক বিপরীত মত অবলম্বন করে জগদানন্দের
পদাবলী সম্বন্ধে লিখেছেন - “যাঁহারা শুধু ললিত শব্দকেই কবিতার প্রাণ মনে করিয়া অনেক স্থলে অর্থশূন্য
কাকলির সৃষ্টি করিয়াছেন, জগদানন্দ সেই স্রেণীর কবিসম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চ স্থান অধিকার করিবেন, সন্দেহ
নাই।”
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .
১৩২৩ বঙ্গাব্দে  প্রকাশিত  বীরভূম-বিবরণ,  ১ম খণ্ডের,  জোফলাই  কাহিনীতে  
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, কবি
জগদানন্দের জীবন, কর্ম  ও পদাবলী নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন।  তিনি  কবি  জগদানন্দের  কবিত্বের ভূয়সী
প্রসংশা করেছেন।
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি  পড়তে  এখানে ক্লিক করুন . . .।  জগদানন্দের
কবিত্ব নিয়ে  
অধ্যাপক  নীলরতন সেনের  ১৯৬৭  সালে  প্রকাশিত  বৈষ্ণব পদাবলী  পরিচয়  গ্রন্থের, অপর
কয়েকজন পদকার, ২৭৫-পৃষ্ঠায়,  খুব  সুন্দর  করে  আলোচনা  করা  হয়েছে  যা পাঠক, গবেষক এবং ছাত্র
সবারই সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি।
নীলরতন সেনের সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে কালিদাস নাথের উদ্ধৃতি -                        পাতার উপরে . . .  
জগদানন্দের  পদাবলী  সংকলনের  সম্পাদক  কালিদাস নাথ, নগেন্দ্রনাথ বসু দ্বারা সম্পাদিত সাহিত্যপরিষদ
পত্রিকার  ১৩০৫  বঙ্গাব্দের  ৪র্থ সংখ্যায়  (মার্চ ১৮৯৯)  প্রকাশিত,  তাঁর  “বৈষ্ণব-কবি জগদানন্দ”  প্রবন্ধে  
লিখেছেন . . .

ঠাকুর জগদানন্দের কবিত্ব বড় সাধারণ নহে। সুপ্রসিদ্ধ সংস্কত হিতোপদেশসঙ্কলয়িতা বিষ্ণুশর্ম্মা মহোদয়ের
মতে  যে  কাব্যশাস্ত্র-বিনোদনে  ধীমানগণের  কাল  সুখে  কাটিয়া  যায়,  জগদানন্দের  কাব্য  তজ্জাতীয়
কাব্যনিচয়ের  মুকুটমণি বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। শাস্ত্রকারেরা নির্দেশ করিয়াছেন---

নরত্বং দুর্ল্লভং লোকে বিদ্যা তত্র সুদুর্ল্লভা।
কবিত্বং দুর্ল্লভং তত্র শক্তি স্তত্র সুদুর্ল্লভা॥

অশীতি কোটি জীবের মধ্যে নরজন্ম দুর্ল্লভ। বিদ্যার অবিদ্যমানে সেই নরজন্মও অকিঞ্চিত্কর। সহস্র সহস্র
বিদ্বন্মনুষ্যের মধ্যে একটি কবি মিলে কি না সন্দেহ।  আবার  সহস্র সহস্র কবির মধ্যে একটি শক্তিমান্‌ কবি
অধিকতর সুদুর্ল্লভ। এখন যে কবিত্ব চারিদিকে ছড়াছড়ি যাইতেছে। সঞ্চরমান ভূবায়ুর শিরোভাগে যে শক্তি
অনুক্ষণ তরঙ্গায়িত হইতেছে, ঠাকুর জগদানন্দের কবিত্ব ও শক্তি  সে  শ্রেণীর  নহে।  জগদানন্দের  বাহ্যচিত্র,
অন্তশ্চিত্র, অনুকৃত ও সাধারণ এই চারি শ্রেণীস্থ পদাবলীরই নিদর্শন উপরিভাগে প্রদর্শিত হইয়াছে, সেই সকল
পদাবলীতে  যে  কবিকুল-দুর্ল্লভ  অত্যদ্ভুত  কবিত্ব  ও  কবিলোকবিজয়িনী  অসামান্যশক্তির  পরিচয় আছে,
কাব্যসমালোচক পণ্ডিতমাত্রই তাহা প্রাণ ভরিয়া আস্বাদন করিবেন। কোন কোন সংস্কৃত কবি ও কোন কোন
বঙ্গীয় কবি অন্তশ্চিত্র পদাবলী গ্রন্থন করিয়াছেন বটে,  কিন্তু  তদ্বিষয়ে  জগদানন্দের ন্যায় প্রচুরশক্তি প্রদর্শনে
কেহই সমর্থ হন নাই। বাহ্যচিত্রাবলী প্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা গোবিন্দদাসের অনেকগুলি আছে বটে, কিন্তু জগদানন্দের
চিত্রপদের নিকট  তাহাও  অকিঞ্চিত্কর। অন্যান্য  অন্তশ্চিত্র  কবিতার  চিত্রবর্ণাবলী  দ্বারা  দুই একটী শব্দ
অধিকতঃ কবির  নামেই  পরিস্কুট  হইয়া  থাকে।  সুললিত  ছন্দো  বন্ধের  কবিতা  এবং দ্বাত্রিংশদ্বর্ণাত্মক
তারকব্রহ্ম নাম জগদানন্দের চিত্র গাথা ভিন্ন অন্যের চিত্র কবিতায় কেহ কখনও দেখিয়াছেন কি? কি কবিত্ব,
কি ছন্দোলালিত্য,  কি  রচনা  চাতুর্য্য,  কি  শব্দবিন্যাস,  কি চিত্র, বোধ হয় ঠাকুর জগদানন্দ সকল বিষয়েই
তাঁহার পুর্ব্বতন ও পরবর্ত্তী কবিকুলের বন্দনীয় ও অগ্রগণ্য।  যে কবিত্বে মুগ্ধ হইয়া ও যে রসে ডুবিয়া মানুষ
কিয়ৎকালের জন্য শোক তাপ ভুলিয়া যায়, জগদানন্দের কবিতা সেই শ্রেণীর। যেমন প্রস্ফুটিত ও সৌরভময়
গোলাপকে নাড়াচড়া করিতে ভয় করে, পাছে তাহার সৌন্দর্য্যের ও মাধুর্য্যোর হানি হয়, জগদানন্দের কবিতা
সম্বন্ধে অধিক কথা বলিতে মাদৃশ ক্ষুদ্র ব্যক্তির তাদৃশ ভয় হইতেছে, এজন্য এই স্থলেই নীরব হইলাম।

উপসংহারে আর একটা কথা বলা আবশ্যক। কোন কোন লেখক ও সমালোচক জগদানন্দের দুই একটী পদ
প্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহাদের বিশ্বাস জগদানন্দের পদের সংখ্যা দুই চারিটীর অধিক নহে এবং কেহ ইঁহাকে
মহাপ্রভুর পার্ষদ জগদানন্দ পণ্ডিত বলিয়াছেন, কেহ বা শ্রীনিবান আচার্য্য প্রভুর বংশীয় রাধামোহন ঠাকুরের
পিতা জগদানন্দ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু আমরা তাঁহার প্রথমাবস্থার হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি পাইয়াছি
এবং সেই পাণ্ডুলিপির “খণ্ডবাসিয়া খণ্ডকপালিয়া  জগদানন্দ  ভাষই” এই পদানুসারেই তাঁহার প্রকৃত পরিচয়
প্রদান করিয়াছি। তিনি যে কে এবং কোন বংশ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন, এখন তাহা জানিতে শুনিতে কাহারই
কষ্ট হইবে না
।”
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে জগদ্বন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি -                            পাতার উপরে . . .  
১৯০২ সালে প্রকাশিত, “গৌরপদ-তরঙ্গিণী”-র ১ম সংকলনের সংকলক
জগবন্ধু ভদ্র, কবি জগদানন্দের কবিত্ব
সম্বন্ধে  কালিদাস  নাথের  সঙ্গে  সহমত  পোষণ  করে,  তাঁর  “গৌরপদ-তরঙ্গিণী”  সংকলনের  ভূমিকায়  
জগদানন্দের ভূয়সী প্রসংশা করে লিখেছেন  . . .

কালিদাস নাথ মহাশয় জগদানন্দের কবিত্ব ও কাব্য সম্বন্ধে মন্তব্যে ব্যাপদেশে যে সকল কথা কহিয়াছেন,
তাহাই এ বিষয়ের অতি সুন্দর সমালোচনা”

*
জোফলাই-এর কবি জগদানন্দের সম্বন্ধে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি -      পাতার উপরে . . .  
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ)  মহারাজকুমার মহিমারঞ্জন চক্রবর্তী  দ্বারা  সম্পাদিত,
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
দ্বারা প্রকাশিত, বীরভূম-বিবরণ, ১ম খণ্ডের, জোফলাই কাহিনীতে কবি  জগদানন্দের জীবন, কর্ম ও পদাবলী
নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তারই ১৮৯-পৃষ্ঠায় কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

জগদানন্দের কবিতাবলী পাঠ করিলে বুঝা যায় তাঁহার কবিত্ব সাধারণ নহে, তাঁহার গীতমঞ্জরীতে অসামান্য
কবিত্ব ও কবিকুলবিজয়িনী অসামান্য শক্তির পরিচয় আছে, কাব্যসমালোচক মাত্রেই তাহা একবাক্যে স্বীকার
করিবেন। তাঁহার কবিতার সুন্দর ছন্দোলালিত্যে,  মনোহর  রচনাচাতুর্য্যে এবং অপূর্ব্ব সজীব চিত্র অঙ্কনের
অদ্ভুত ক্ষমতা দর্শনে আমরা মুগ্ধ হই ; তাঁহার পদাবলী যত বারই পড়ি না কেন, তত বারই এক নূতন নূতন
ভাব দেখিতে পাই ; তাঁহার এই নিত্য নব নিত্য মধুর অপূর্ব্ব পদাবলী পাঠ করিতে করিতে আমরা যেন এক
নূতন প্রেমরাজ্যে আসিয়া পড়ি, কৃষ্ণপ্রেমে হৃদয় পূর্ণ হইয়া যায়।  জগদানন্দের কবিতার এরূপ মোহিনী শক্তি
যে, তাহার ছত্রে ছত্রে পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় এরূপ হরি প্রেম তরঙ্গান্দোলিত কারুণ্য-স্রোত প্রবাহিত যে, তাহা একবার
পাঠ করিলে পাষাণ-হৃদয়ও গলিয়া যায়, জন্মদুঃখীও ক্ষণেকের তরে শোক-তাপ বিস্মৃত হয়
।”
*
জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের তির্যক মন্তব্য -      পাতার উপরে . . .  
স্বাধীন  ত্রিপুরার  
মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য দেব-বর্ম্মণ বাহাদুরের  অর্থানুকুল্যে  ১৮৯৬  সালে  প্রকাশিত,   
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের  “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য”  ১ম  সংস্করণে  জগদানন্দের  উল্লেখ  না  থাকলেও  
১৯০১  সালে  প্রকাশিত গ্রন্থের  ২য় সংস্করণের  ৭ম  অধ্যায়ের, পদাবলী শাখার ২৮১-পৃষ্ঠায়, জগদানন্দের
পদাবলী, কাব্য ও তাঁর “খসড়া” সম্বন্ধে তির্যক মন্তব্য করে লিখেছেন . . .

যাঁহারা শুধু ললিত শব্দকেই কবিতার  প্রাণ  মনে  করিয়া  অনেক স্থলে অর্থশূন্য কাকলির সৃষ্টি করিয়াছেন,
জগদানন্দ সেই শ্রেণীর কবিসম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চ স্থান অধিকার করিবেন, সন্দেহ নাই। হৃদয়ের  অন্তঃপুরে
যে কবিতার নিভৃত স্থান এ কবিতা সে শ্রেণীর নহে ;--- শুধু ললিত শব্দ-প্রহেলিকায় শ্রুতিকে অব্যক্ত সুখদান
করাই, এ ভাবের কবিতার চরম লক্ষ্য, কিন্তু যমক  অলঙ্কার  ও “ম-কার, “ল”-কারের নিবিড় সমাবেশেই যে
সর্ব্বদা শ্রুতিসুখকর পদ হইতে পারে, জগনানন্দের পদ পড়িয়া আমরা তাহা বুঝি নাই। বহুতন্ত্রীতে অনভ্যস্ত
স্পর্শজনিত উচ্ছৃঙ্খল ধ্বনির ন্যায় জগদানন্দের পদরাশি শ্রুতিকে সুখদান না করিয়া অনেকস্থলে পীড়ন করে।
কিন্তু একথা অবশ্য স্বীকার্য্য যে, এই কবি স্থানে স্থানে জয়দেবের মত সুন্দর শব্দ গ্রন্থনে সক্ষম হইয়াছেন।

আমরা জগদানন্দের সম্বন্ধে আর  একটি  বিষয়  উল্লেখ  করা  বিশেষ  প্রয়োজন মনে করি, এই কবি ভাবী
কবিগণের সাহায্যার্থ  একটি  যমক-অলঙ্কারের  ধারা  রচনা আরম্ত করিয়াছিলেন ; তদ্দ্বারা অনুমান হয় যে,
জগদানন্দ  আকাশের তারা কি বনের ফুল দেখিয়া অতি অনায়াসে কবিত্ব মন্ত্রে দীক্ষিত হন নাই। তিনি শ্রমে
গলদ্ঘর্ম্ম হইয়া  কবিতা  রচনা  শিক্ষা  করিয়াছিলেন,  এবং  তদ্বিষয়ক একটি প্রণালী লিপিবদ্ধ করিয়া ভাবী
কবিগণের জন্য পন্থা  নিরূপণের  প্রয়াসী  হইয়াছিলেন। “জগদানন্দের খসড়া”  ললিত  শব্দের বিপণি বলিয়া
উল্লেখ করা যায়, পাঠক খসড়াখানি পাঠ করিলে জগদানন্দের কবিতার গুহ্যতত্ত্ব অবগত হইবেন। ইহা প্রাচীন
রীতি অনুসারে বঙ্গীয় ভাষায় অলঙ্কার শাস্ত্র সঙ্কলনের প্রথম ও শেষ চেষ্টা
।”

এখানে আমরা পুনরায় জানাই যে,  মিলনসাগরে  আমরা মনে করি এই খসড়াটি কবির পক্ষে অন্যায়ের কিছু
নয়। এমন  খসড়া  হয়তো  আরও  বহু  কবি  নিজের  জন্য  তৈরী করে রাখেন। দুর্ভাগ্যবশত এই খসড়াটি
জগদানন্দের মৃত্যুর পরে অন্যের হাতে চলে আসার ফলে সর্বসমক্ষে চলে আসে এবং
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র
সেনের হাতে প’ড়ে তাঁর এই তির্যক মন্তব্যের অধিকারী হয়!
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -                         পাতার উপরে . . .  
জগদানন্দের পদাবলীর মান নিয়ে
জগদ্বন্ধু ভদ্র ও কালিদাস নাথের সঙ্গে সতীশচন্দ্র রায় একমত হতে পারেন
নি। তবে  তিনি  
রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের মত জগদানন্দের পদাবলীর কবিত্যকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করেন
নি।  কবি  জগদানন্দ  সম্বন্ধে,  ১৯২৬ সালে  প্রকাশিত,  
সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী” এবং সেই এক কথাই ১৯২৭ সালে প্রকাশিত, তাঁর সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর
৫ম খণ্ডের ভূমিকার ১১৭-পৃষ্ঠায় “জগদানন্দ” অনুচ্ছেদে, তিনি লিখেছেন . . .  

জগদানন্দ প্রসিদ্ধ পদ-কর্ত্তা ; কিন্ত কালিদাস বাবু (কালিদাস নাথ, জগদানন্দের পদাবলী) ও তাঁহার অনুকরণে
জগদ্বন্ধু বাবু জগদানন্দের পদাবলীর যে  অতিমাত্রায়  প্রশংসা  করিয়া  গিয়াছেন, আমরা কোন মতেই উহার
সমর্থন কারিতে পারি না। জগদানন্দের ‘নরহরি নাম অন্তরে অছু ভাবহ’ ইত্যাদি যে পদটির মধ্যে সুকৌশলে
‘দ্বাত্রিশৎ বর্ণাত্মক তারক ব্রহ্ম নাম' অন্তর্নিহিত কণা হইয়াছে বলিয়া, কালিদাস বাবু উহাকে ‘অন্তশ্চিত্র’ পূর্ণ
অতুলনীয় পদ বলিয়া প্রশংসা করিয়াছেন, আমাদিগের আলঙ্কারিকদিগের বিচারে উহা চিত্র-কাব্যের অন্তর্গত
অতি-নিকৃষ্ঠ শ্রেণীর কবিতা বটে।  বস্তুতঃ  উহাতে  চিত্র-কাব্যের  উপযোগী শব্দ-বিন্যাসের কৌশল ব্যতীত
উত্তম বা মধ্যম-কাব্যের উপযোগী ব্যঞ্জনা বা কাব্যালঙ্কার কিছুই নাই। জগদানন্দের কোনও কোনও পদে পদ-
লালিত্যের সহিত  বর্ণনা  ও ভাবের বেশ বৈচিত্র্য দেখা যায়। দৃষ্টান্ত স্থলে ‘অকরুণ পুন বাল অরুণ’ ইত্যাদি
রসালসের পদটির উল্লেখ  করা  যাইতে পারে।  অনুপ্রাস  ও পদ-লালিত্যই জগদানন্দের বিশেষত্ব। তাঁহার
পদাবলী কালিদাস বাবু কর্ত্তৃক প্রকাশিত হইগ্লছে। আমাদের সংগৃহীত পদগুলি ইতিপূর্ব্বে প্রকাশিত হইয়াছে
বলিয়া জানা যায় নাই
!”

এ ছাড়া কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে, ১৯২৭ সালে প্রকাশিত,
সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর
৫ম  খণ্ডের  ভূমিকার  ১১৭-পৃষ্ঠায় “জগদানন্দ” অনুচ্ছেদে, তিনি কালিদাস নাথ,
জগদ্বন্ধু ভদ্র এবং দীনেশচন্দ্র
সেনের ঘোরতর পরস্পর বিরোধী মতামতের খানিকটা মধ্যস্থতা করে লিখেছেন . . .

কালিদাস বাবু পদাবলী-সাহিত্যে অভিজ্ঞ ও রসজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার সম্পাদিত “গোবিন্দদাস-পদাবলী”র
প্রথম ভাগ হইতে পদাবলী সম্বন্ধে তাহার পাণ্ডিত্য  ও  রসজ্ঞতার  যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। বিদ্যাপতির
পদাবলী ও গৌরপদ-তরঙ্গিণীর প্রসিদ্ধ সম্পাদক, গভর্মেন্টের উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের, প্রবীণ প্রধান শিক্ষক
জগদ্বন্ধু বাবুর পাণ্ডিত্ য ও  রসজ্ঞতা  সম্বদ্ধে  কিছু বলাই বাহুল্য। ইহাঁদিগের মত দুই জন প্রবীণ ব্যক্তি যে
সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হইয়া  জগদানন্দের  ন্যায়  একজন  দ্বিতীয়  শ্রেণীর  পদ-কর্ত্তার  সম্বন্ধে  এরূপ  অসঙ্গত
অতিশয়োক্তি-পূর্ণ প্রশংসা লিপি-বদ্ধ করিতে পারেন, ইহা আমাদের নিকট একান্ত বিস্ময়জনক মনে হওয়ায়,
আলোচবার সুবিধার  জন্যে  আমরা  তাঁহাদিগের  মন্তব্য  উদ্ধৃত করিলাম। ডক্টার দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়
আবার আর এক সীমায় যাইয়া জগদানন্দের সম্বন্ধে  তাঁহার  বঙ্গ-ভাষা  ও  সাহিত্যের  ৫ম সংস্করণে চূড়ান্ত
মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন,--- “যাঁহারা শুধু ললিত  শব্দকেই  কবিতার প্রাণ মনে করিয়া অনেক স্থলে অর্থশূন্য
কাকলির সৃষ্টি করিয়াছেন, জগদানন্দ সেই শ্রেণীর কবিসম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চ স্থান অধিকার করিবেন, সন্দেহ
নাই।

শুধু ললিত শব্দকে কবিতার প্রাণ মনে করিয়া অনেক স্থলে অর্থশূন্য কাকলির সৃষ্টি করিয়াছেন, প্রাচীন বৈষ্ণব
পদ-কর্তাদিগের মধ্যে এমন কোন কবি-যশঃ-প্রার্থীর কথা আমরা অদ্যপি জানিতে পারি নাই। বলা বাহুল্য যে,
সেরূপ অর্থ-হীন ললিত-শব্দের  যোজনাকারিগণ  আমাদর  অলঙ্কার-শাস্ত্রশাসিত  দেশে  কোনও কাজে ‘কবি’
বলিয়া গণ্য হইতে পারেন নাই। সুতরাং ডক্টার সেন মহাশয়  জগদানন্দকে  তাদৃশ  কবিতারচকদিগের মধ্যে
উচ্চ স্থান অর্পণ করিয়া, তাঁহাকে বর্ব্বরের স্বর্গ-লোকেই
(Fool's Paradise) উন্নীত করিয়াছেন। সেন মহাশয়ের
মত একজন সুপ্রসিদ্ধ কৃতী সাহিত্য-সমালোচকও যে, জগদানন্দকে মত একজন সুকবির সম্বন্ধে এরূপ অসঙ্গত
মন্তব্য প্রকাশ করিতে পারেন,  ইহা  দেখিয়াও  আমরা  অল্প  আশ্চর্য্যান্বিত  হই নাই। সুধী পাঠক নিশ্চিতই
ঝুঝিতে পারিয়াছেন যে, যে জন্যই হউক, ইহাঁরা প্রশংসা ও  নিন্দার  ন্যায্য মাত্রা ছাড়াইয়া যাওয়ায়ই আমরা
জগদানন্দের সম্বন্ধে এরূপ পরস্পর বিরুদ্ধ ও একান্ত বিভিন্ন মন্তব্য  শুনিতে  পাইতেছি। সুতরাং প্রকৃত সত্য
সম্ভবতঃ এই দুই উৎকট মতের মধ্যবর্ত্তী স্থানেই পাওয়া যাইবে
।”
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি -                           পাতার উপরে . . .  
১৯৪০ সালে প্রকাশিত, সুকুমার সেনের “বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস”, ১ম খণ্ডের ত্রিংশ পরিচ্ছেদে -
“পদাবলী”-র অন্তর্গত ৫৬৯-পৃষ্ঠায় জগদানন্দের পদাবলী সম্বন্ধে লিখেছেন . . .  

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগের  পদকর্ত্তাদিগের  মধ্যে  অবিসংবাদিতরূপে  শ্রেষ্ঠ  হইতেছেন জগদানন্দ। ইনি
শ্রীখণ্ডের রঘুনন্দনের বংশধর।  ইঁহার  পিতা  শ্রীখণ্ড ছাড়িয়া রাণীগঞ্জের নিকটে আগরডিহিতে বাস করেন।
জগদানন্দ স্বয়ং নিকটবর্তী জোফলাই গ্রামে উঠিয়া গিয়া বাস করেন।

ভাবের গভীরতায় নহে,  কিন্তু ধ্বনিঝঙ্কারে ও শব্দচিত্ররচনায়  জগদানন্দ  গোবিন্দদাস কবিরাজের  কতকটা
প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে জগদানন্দের কাব্যপ্রতিভা শব্দঝঙ্কারের উপরে উঠিতে পারে নাই ; গোবিন্দদাসের  কবিতায়
শব্দঝঙ্কার এবং অর্থগৌরব উভয়ের বিচিত্র সম্মেলন ঘটিয়াছে।  শব্দের  উপর  জগদানন্দের  অধিকার ছিল
অসামান্য।  কবিগণের  মিল  খুঁজিবার  সুবিধা  করিবার  জন্য  ইনি  ভাষা-শব্দার্ণব নামে একটি সমধ্বন্যান্ত
শব্দকোষ  রচনায়  প্রবৃত্ত  হইয়াছিলেন।  এই  অসমাপ্ত  গ্রন্থের  কিয়দংশ  এবং  জগদানন্দের ছত্রিশটি পদ
কালিদাস নাথ মহাশয় শ্রীজগদানন্দ-পদাবলী নামে ১৩০৬ সালে প্রকাশ করেন
।”
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর উদ্ধৃতি -        পাতার উপরে . . .  
১৯৫৫  সালে  প্রকাশিত,  নবদ্বীপচন্দ্র  ব্রজবাসী  ও  
রায়বাহাদুর  খগেন্দ্রনাথ  মিত্রর  মহাজন  পদাবলী
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ডের ভূমিকার ৩৮-পৃষ্ঠায় দেওয়া জগদানন্দের পরিচয়ে, তাঁর সম্বন্ধে  লিখেছেন . . .

জগদানন্দ - শ্রীযুক্ত  দীনেশচন্দ্র  সেনের  “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য" হইতে জানা যায়  যে  জগদাননদ  মহাপ্রভুর
অন্তরঙ্গ ভক্ত খণ্ডবাসী মুকুন্দের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। ইঁহার পিতামহ পরমানন্দ এবং পিতা নিত্যানন্দ। ইনি
অষ্টাদশ শতাব্দীতে  বর্তমান  ছিলেন  ইঁহার  কবিতায়  শব্দালঙ্কারের  চরম  উৎকর্ষ  দেখিতে পাওয়া যায়।
“অকরুণ পুন বাল অরুণ' (৩য় খণ্ড ৫৯২ পৃষ্ঠা)  এবং “মঞ্জুবিকচ-কুসুমপুঞ্জ' সুন্দর হইলেও অনুপ্রাসের ভারে
পীড়িত।
*

*
প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় ভ্রমক্রমে মহাপ্রভুর পারিষদ পণ্ডিত জগদানন্দকে পদকর্ত্তা বলা হইয়াছে।”

এই  শেষের  পাদটীকায়
* দেওয়া  পংক্তিটি  রায়বাহাদুর  খগেন্দ্রনাথ  মিত্র  দিয়েছিলেন  এই  জন্য  যে,
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ১ম খণ্ডের  ভূমিকার  ১৮-পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছিলেন . . .

গৌরচন্দ্রিকার বহু পদ চৈতন্যদেবের সমসাময়িক বাসুদেব ঘোষ, জগদানন্দ প্রভৃতি দ্বারা রচিত হইয়াছিল।
ইহা হইতে অনুমান হয় যে, সে সময়ে লীলা-কীর্ত্তন বা রস-কীর্ত্তনের প্রচলন ছিল
।”
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৪র্থ খণ্ডের ভূমিকার ৩৮-পৃষ্ঠায় তিনি তা সংশোধন করে দিয়েছিলেন উপরোক্ত পংক্তিটি
দিয়ে।
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে বিমান বিহারী মজুমদারের উদ্ধৃতি -             পাতার উপরে . . .  
১৯৬১ সালে  প্রকাশিত  
বিমান বিহারী মজুমদার  সম্পাদিত  “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী”, অষ্টাদশ শতাব্দী,
পদস্খলনের যুগ-এর ২১৭-পৃষ্ঠায় জগদানন্দের সঙ্গে
শশিশেখরচন্দ্রশেখর সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

অষ্টাদশ শতাবীর কবিদের মধ্যে শশিশেখর, চন্দ্রশেখর ও জগদানন্দ শ্রেষ্ঠ। ইঁহাদের কোনও পদই অষ্টাদশ
শতাবীর কোনও পদসংকলনে স্থান পায় নাই। তবে উনবিংশ শতকের প্রথম দশকে সংকলিত পদরসসারে
ও পদরত্নাকরে  ইঁহাদের পদ  আছে।  শশিশেখর  ও  জগদাননদের  পদের  শব্দঝংকার  ও  ছন্দোবৈচিত্র্য
অতুলনীয়। কিন্তু ষোড়শ শতাবর পদাবলীর স্বাভাবিকতা তাঁহাদের রচনায় বিরল
।”
*
কবি জগদানন্দের কবিত্ব সম্বন্ধে নীলরতন সেনের সুষম উদ্ধৃতি -                 পাতার উপরে . . .  
জগদানন্দের কবিত্ব নিয়ে
অধ্যাপক নীলরতন সেনের ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত “বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয়”
গ্রন্থের, “অপর  কয়েকজন  পদকার”  অধ্যায়ের,  ২৭৫-পৃষ্ঠায়,  খুব  সুন্দর  করে আলোচনা করা হয়েছে যা
পাঠক, গবেষক এবং  ছাত্র  সবারই  সহায়ক  হবে  বলে  আমরা  মনে  করছি।  তাই আমরা এই উদ্ধৃতিটি
একটু বিস্তারিত ভাবে এখানে তুলে ধরছি . . .

সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকে বৈষ্ণব সাহিত্যের নব প্রাণশক্তির প্রবাহ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে বলা যেতে
পারে। এই সময়ে আর নতুন কোনও দার্শনিক বোধ বা কবিত্বের ভাব-প্রবাহ বৈষ্ণব মহাজনদের মধ্যে দেখা
দেয়নি। পুর্ববর্তী ধারায় বহুধা বিভক্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে তার অন্তঃশক্তি ক্ষরিত হয়ে এসেছে। অষ্টাদশ শতকে
বৈষ্ণব গোষ্ঠী প্রধানতঃ  সংগ্রহের  প্রতি  বেশী  মনোযোগী  হয়েছিলেন।  বিশ্বনাথ  কবিবাজের  ক্ষণদাগীত
চিন্তামণি, রাধামোহন ঠাকুরের পদামৃত সমুদ্র,  গৌরসুন্দর  দাসের কীর্ত্তনানন্দ এবং বৈফবদাসের পদকল্পতরু
এ-যুগের সংকলন  গ্রন্থ হিসাবে বিশেষ  উল্লেখযোগ্য।  অষ্টাদশ  শতকের  কবিসংখ্যা  বিপুল,  তবে  যথার্থ
প্রতিভাবান কবি কাউকেই বলা চলে না। জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস বা বলরাম দাসের পর্যায়ে এ-যুগের কোনও
কবিই পৌঁছাতে পারেননি। তাঁদেব মধ্যেও জগদানন্দ ও শশিশেখরের নাম করা যেতে পারে


জগদানন্দ রচনারীতির দিক থেকে  লোচনের  ঠিক বিপরীত আদর্শের কবি ছিলেন। ছন্দ ও অলঙ্কারের প্রতি
তাঁর অত্যধিক আসক্তি গোবিন্দদাসকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু গোবিন্দাদাসের স্বভাবদত্ত কবিত্ব-প্রতিভা
সেখানে অনুপন্থিত।  শব্দ  প্রয়োগে  তিনি কিছুটা কৃত্রিম  সংস্কৃত-ঘেঁষা  আদর্শ  নিয়েছিলেন।  সব  মিলিয়ে
পদগুলি ধ্বনি-ঐশ্বর্য্য-সমৃদ্ধ,  তবে  কবিত্বের  ও  প্রকাশভঙ্গির  দিক  থেকে  কিছুটা কৃত্রিম ও আড়ষ্ট। তিনি
গৌরাঙ্গ-আবির্ভাব, বাল্য লীলা, রূপ বর্ণনা ও প্রেমানুরাগের যেমন পদ লিখেছেন, তেমনি বৃন্দাবন-লীলায় কৃষ্ণ
ও  রাধার  রূপ-বর্ণনা,  পূর্বরাগ,  অভিসার,  বিপ্রলম্ভ,  আক্ষেপানুরাগ,  মাথুব  প্রভৃতি পর্যায়ের পদও রচনা
করেছেন।  হরেকৃষ্ণ  মুখোপাধ্যায়  তাঁর  গ্রন্থে  কবির  ৬২টি পদ  সংকলিত করেছেন। এখানে তার থেকে
বৈশিষ্ট্যদ্যোতক দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

গোরা রূপ-বর্ণনায় কবির বর্ণানুপ্রাস প্রবণতায় দুটি দৃষ্টান্ত প্রথম উদ্ধৃত করি।---

ন-বর্ণানুপ্রাস :         নিতুই নৌতুন নিগূঢ় নিজরস নীরনিধি নিরমাই।
.                        নিয়ত নিমগন ন জানে নিশিদিন নদিয়ানন্দ সদাই॥

চ- বর্ণানুপ্রাস :         চারু চাচর চিকুর চূড়াহি চপল চম্পকদাম।
.                        চঞ্চলাচিত চোর মূরতি চাহি চমকিত কাম॥

উভয় পদে  যথাক্রমে  ন  ও  চ বর্ণের ব্যবহার-আধিক্যে আলঙ্কারিক  নৈপুণ্য  প্রকাশ পেলেও কবিত্ব আদৌ
প্রকাশ পায় নি


জগদানন্দের  একটি  প্রিয়  ছন্দোবন্ধ  হল প্রাচীন ( বিদ্যাপতি ভঙ্গিম ) লঘু-গুরু উচ্চারণ সমন্বিত ছয় মাত্রার
মাত্রাবৃত্ত পর্বভাগে  ১২॥১২॥১২॥১০ I  মাত্রিক  পদভাগের  চৌপদী।  এই ছন্দোবন্ধে কবি কৃষ্ণের রূপ বর্ণনা,
রাধার অভিসার  এবং  মিলন  ও  রসালস  বিষয়ক কয়েকটি পদ লিখেছেন। সুপরিচিত অভিসার বিষয়ক
পদটি এখানে উদ্ধৃত করা গেল।---

মঞ্জু বিকচ কুসুম পুঞ্জ
মধুপ শব্দ গঞ্জিগুঞ্জ
. . . [ গ্রন্থে পুরো পদটি এখানে দেওয়া রয়েছে। স্থানাভাবের জন্য পদটির কেবল প্রথম
.                           কলিটিই আমরা এখানে দিলাম। মিলনসাগরে সম্পূর্ণ পদটি পড়তে এখানে ক্লিক
.                             করুন . . .  ]

কিঙ্কিনী কর  কঙ্কণ  মৃদু  ঝঙ্কৃত” শ্রীরাধার অভিসার রূপ-সৌন্দর্যের চিত্রাঙ্কণে কবি এখানে অসাধারণ দক্ষতা
দেখিয়েছেন।  ধ্বনিতরঙ্গে  কৃষ্ণ-সমাগমোৎফুল্লা  রাধার  রূপের  তরঙ্গ,  উল্লাসের তরঙ্গ যেন উদ্বেলিত হয়ে
উঠেছে। পদটি ছন্দ ও অলঙ্কারে যেন সরব চিত্রের আশ্চর্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ধ্বনি দিয়ে যে কত সার্থক
চিত্রাঙ্কণ সম্ভব গোবিন্ধদাসের কিছু পদে তার পরিচয় রয়েছে। জগদানন্দের এ পদটিও সেই পর্যায়ভুক্ত হতে
পারে। তবে সর্বত্র যে এরূপ দক্ষতা দেখাতে পেরেছেন এমন বলা চলে না


আক্ষেপানুগরাগের একটি সুপরিচিত পদ কয়েকটি পরস্পরিত সুন্দর রূপক-চিত্রণের মাধ্যমে গ্রথিত হয়েছে।-

সজনি কেন গেলাম যমুনাব জলে
। . . . [ গ্রন্থে পুরো পদটি এখানে দেওয়া রয়েছে। স্থানাভাবের জন্য পদটির
.                                            কেবল প্রথম কলিটিই আমরা এখানে দিলাম। মিলনসাগরে সম্পূর্ণ
.                                              পদটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .  ]

ই বর্ণনা-ভঙ্গিতেই রূপকে গেঁথে কবি সমগ্র পদটি সাজিয়েছেন, তাতে বৈদগ্ধ্য, নৈপুণ্য এবং চিত্রাঙ্কণের শিল্প-
কুশলতা চমৎকার প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু কবিত্ব বহুলাংশে ক্ষুণ্ণ হয়েছে


কৃত্রিম শব্দ-গ্রন্থণের প্রতি কবির  কিছুটা  মাত্রাতিরিক্ত  প্রবণতা ছিল।  একাধিক পদে তিনি এমন ভাবে পর্ব
বিন্যাস করেছেন যে প্রতি পর্বের প্রথম বর্ণ পরপর সাজালে তার থেকে আবার নতুন কথা সৃষ্টি হয়। কোথাও
সেটি ‘হরেকৃষ্ণ’ নামকীর্তনের রূপ পায়, কোথাও বা তাঁর গুরু নরহরির বন্দনা বাক্য গড়ে ওঠে। এ পদগুলি
ভাষার কারুকর্মের পর্যায়ে পড়ে, কবিত্বের মাপকাঠিতে এর বিচার চলেনা
।”
*
কবি জগদানন্দের সম্বন্ধে দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি -                       পাতার উপরে . . .  
১৯৭৭ সালে প্রকাশিত, দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদসঙ্কলন”-এর
পরিশিষ্টের 234-পৃষ্ঠায় দেওয়া জগদানন্দের পরিচয়ে, তাঁর সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

শ্রীখণ্ডের রঘুনন্দন ঠাকুরের বংশধর জগদানন্দ ছিলেন অষ্টাদশ শতকের কবি। পিতার নাম নিত্যানন্দ বা
মদন ঠাকুর।  দুবরাজপুরের  জোফলাই  গ্রামে  কবি  জগদানন্দ প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথ বিগ্রহ ও গৌরাঙ্গ মূর্তি
বর্তমান। ১৭৮২/৮৩ খৃঃ জগদানন্দের তিরোধান। পদাবলী ছাড়া জগদানন্দের 'ভাষা শব্দার্ণব' নামে একখানি
সম-ধ্বন্যাত্মক শব্দকোষের খসড়া পাওয়া যায়। কবি ছিলেন ছন্দোনিপুণ
।”
*
জগদানন্দ পণ্ডিত সম্বন্ধে কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যর চিত্তাকর্ষক উদ্ধৃতি -              পাতার উপরে . . .  
১৯৭৮ সালে প্রকাশিত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের  শিলং শাখার সম্পাদক  কুমুদরঞ্জন  ভট্টাচার্যের  “সংক্ষিপ্ত
বৈষ্ণব অভিধান” এর ৭১-পৃষ্ঠায় চৈতন্য পার্ষদ জগদানন্দ পণ্ডিত সম্বধে এই চিত্তাকর্ষক উদ্ধৃতি দিয়েছেন . . .

জগদানন্দ পণ্ডিত - কাঞ্চন পল্লী নিবাসী মহাপ্রভুর  অন্তরঙ্গ  ব্রাহ্মণ  ভক্ত। পূর্ব লীলায় সত্যভামা। সন্ন্যাসের
পরে মহাপ্রভু যখন শান্তিপুর হইতে নীলাচলে আসেন, তখন ইনি  মহাপ্রভুর  সঙ্গে  নীলাচলে  আসিয়াছিলেন।
সাধারণতঃ নীলাচলে থাকিতেন। মধ্যে মধ্যে মহাপ্রভুর আদেশে  নবদ্বীপে  যাইতেন।  ইনি  মহাপ্রভূকে সুখে
রাখিবার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকিতেন। মহাপ্রভুর বায়ুরোগ নিবারণের জন্য ইনি  এক ভাণ্ড সুগন্ধি পাক তৈল
গৌড় হইতে আনিয়াছিলেন। কিন্তু মহাপ্রভু ইহা  অঙ্গীকার  না  করায়  ইনি  অভিমান ভরে উপবাস করিতে
থাকেন। মহাপ্রভু ইঁহার হস্তে ভিক্ষা গ্রহণ করিয়া ইঁহার মানভঞ্জন করিয়াছিলেন। মথুরায় তীর্থযাত্রা কালে ইনি
সনাতন গোস্বামীর সঙ্গে বাস করিতেন।  একদা  গোস্বামী  পাদ  মহাপ্রভু  ভিন্ন  অন্য  এক  সন্ন্যাসীর রক্তবর্ণ
বহির্বাস মস্তকে ধারণ করায় ইনি সনাতন গোস্বামীকে প্রহার করিতে উদ্যত হন। জগদানন্দের মহাপ্রভুর প্রতি
নিষ্ঠা পরীক্ষার জন্যই গোস্বামী পাদ এ রূপ করিয়াছিলেন। তিনি সেই বস্ত্র খুলিয়া ফেলিয়া দেন
।”
*
কবি জগদানন্দ সম্বন্ধে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি -                          পাতার উপরে . . .  
১৯৪০ সালে প্রকাশিত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “বিদ্যাপতি চণ্ডীদাস ও অন্যান্য বৈষ্ণব মহাজন
গীতিকা” সংকলনে জগদানন্দের কোনও পদ নেই। তা সত্তেও এই কবির উল্লেখ রয়েছে “কবি-পরিচয়”
অনুচ্ছেদে। গ্রন্থের ৭-পৃষ্ঠায় তিনি জগদানন্দ সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

জগদানন্দ (? - ১৭৮২) -
ইনি জাতিতে বৈদ্য। মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের অন্তরঙ্গ-ভক্ত শ্রীখণ্ডবাসী মুকুন্দের বংশে ইঁহার জন্ম। ইঁহার
পিতামহের নাম পরমানন্দ এবং পিতার নাম নিত্যানন্দ। জগদানন্দের পিতা শ্রীখণ্ড ত্যাগ করিয়া আগরডিহি
দক্ষিণখণ্ডে বাস করেন এবং জগদানন্দও বীরভূমের অন্তর্গত দুবরাজপুর থানার অধীন জোলফাই @ গ্রামে
বাস করিয়াছিলেন। জগদানন্দের পদাবলীতে ভাব-গভীরতা নাই, যমক অলঙ্কার ও অনুপ্রাসের ঘটাই তাহার
কাব্যের বিশিষ্টতা। জগদানন্দ ভাবী কালের কবিগণের জন্য বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম প্রাচীন অলঙ্কার শাস্ত্রের
রীতি সঙ্কলন করিয়া গিয়াছেন। বীরভৃম জেলার মঙ্গলডিহি গ্রামে ইঁহার সম-সাময়িক জগদানন্দ ঠাকুর নামে
একজন পদকর্তা ছিলেন


@ - জোলফাই - জোফলাই হবে। সম্ভবত মুদ্রণ প্রমাদ।
*
মঙ্গলডিহির কবি জগদানন্দের সম্বন্ধে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি -        পাতার উপরে . . .  
১৩২৩ বঙ্গাব্দে মহারাজকুমার মহিমারঞ্জন চক্রবর্তী দ্বারা সম্পাদিত,
হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত,
বীরভূম-বিবরণ, ১ম খণ্ডের, মঙ্গলডিহি-কাহিনীতে
পদকর্তা কবি গোকুলানন্দের পুত্র সংস্কৃত ভাষায় কৃতবিদ্য
জগদানন্দের জীবন, কর্ম ও পদাবলী নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ১৭৯-পৃষ্ঠায় . . .

গোকুলানন্দের  পুত্র  জগদানন্দ  সংস্কৃত  ভাষায়  কৃতবিদ্য  হইয়াছিলেন  এবং  পিতার ন্যায় সুকবি হইয়া  
পিতৃগৌরব অক্ষুণ্ণ রাখিতে সক্ষম হইযাছিলেন। পিতৃব্য-প্রতিষ্ঠিত চতুষ্পাঠী জগদানন্দের হস্তে আসিলে তাঁহার
যশঃ-সৌরভ  চতুর্দ্দিকে  বিস্তৃত  হইয়াছিল  এবং  সেই যশোগানে আকৃষ্ট হইয়া নানা স্থান হইতে বিদ্যার্থিগণ  
আগমন করিয়া তাঁহার নিকট বিদ্যালাভ করিতেন।  জগদানন্দ  ‘শ্যামচন্দ্রোদয়’ নামক  নাটক  কবিতাচ্ছন্দে  
প্রণয়ন করিয়াছিলেন। তদ্রচিত একটি গান উক্ত গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত হইল :---
আরতি করে নন্দরাণী বালকমুখ হেরি”
- [  গ্রন্থে পুরো পদটি এখানে দেওয়া রয়েছে। স্থানাভাবের জন্য
.                                               পদটির কেবল প্রথম কলিটিই আমরা এখানে দিলাম।
.                                                মিলনসাগরে সম্পূর্ণ পদটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন . . .  ]