কবি নয়নানন্দের (অনির্দিষ্ট ও অন্য ভণিতার) বৈষ্ণব পদাবলী
*
নিকুঞ্জ-মাঝারে শ্রীনন্দকিশোর
ভণিতা নয়নানন্দ
কবি নয়নানন্দ
এই পদটি ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত, নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত মহাজন পদাবলী
“শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৩য় খণ্ড, ঝুলন লীলা, ৪৫৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ
মিত্রের “শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৩য় খণ্ডে যে পদকর্তার পরিচয় দেওয়া রয়েছে সেখানে তিনি কেবল শ্রীচৈতন্য-
সমকালীন নয়নানন্দের উল্লেখ করেছেন। যা থেকে মনে হয় তিনি বিশ্বাস করতে যে এই পদটি নয়নানন্দ
(ভরতপুর)-এর রচনা। সতীশচন্দ্র রায় পদকল্পতরুর ভূমিকায় নয়নানন্দের পরিচয়ে লিখেছেন যে তাঁর রাধা-
কৃষ্ণ বিষয়ক পদ পাওয়া যায় নি, সম্ভবত বাসুদেব ঘোষের মতো চিরতরের জন্য বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
তাই আমাদের মনে হচ্ছে এই পদটি মঙ্গলডিহি অথবা শ্রীখণ্ডের নয়নানন্দের রচনা হতে পারে।

॥ বেহাগ - জপতাল॥

নিকুঞ্জ-মাঝারে                        শ্রীনন্দকিশোর
ঝুলত রাধিকা সঙ্গে।
চৌদিকে সুন্দরী                    বেঢ়ি সারি সারি
মঙ্গল গায়ত রঙ্গে॥
ঝুলন মন্দিরে                           বিচিত্র সুন্দর
মরকত স্তম্ভ @ দুই পাশে।
লাখেলাখে হীরা                        মুকুতার ছড়া
প্রবালে মাণিক রাজে॥
রতন হিন্দোলে                        ঝুলত কিশোর
দেখি অতি পুলকিতে।
রাই করি বাম                          ঝুলতহি শ্যাম
অবলা গায়ই গীতে॥
ইন্দ্র নীলমণি                           চমকে দামিনী
রাইয়ের অঙ্গ মোহনে।
পিন্ধি নীলাম্বর                        রাই অঙ্গ সুন্দর
গলে গজমতি শোভনে॥
সখিগণ মেলি                           ঝুলায়ই ধীরি
আনন্দ সাগরে ভাসে।
নয়নানন্দেতে                        চামরলেই হাতে
ঢুলায়ে মনের হরিষে॥

@ - গ্রন্থে “ম্ভম্ভ” দেওয়া রয়েছে যার কোনও মানে হয় না। সম্ভবত মুদ্রণপ্রমাদ। আমরা “স্তম্ভ” দিলাম। ---
মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
গোলোক ছাড়িয়া প্রভু কেন বা অবনী
ভণিতা নয়নানন্দ দাস
কবি নয়নানন্দ
/ গোবিন্দ দাস
এই পদটি ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত, মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন
“শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”, (প্রথম সংস্করণ ১৯০২), ৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এই পদটি পূর্বে গোবিন্দ
দাসের পদ বলে প্রকাশিত করেছিলেন (পাদটীকায় দ্রষ্টব্য)। পরে সংশোধন করেছেন।

॥ পঠমঞ্জরী॥

গোলোক ছাড়িয়া প্রভু কেন বা অবনী।
কাল রূপ কেন হৈল গোরাবরণখানি॥
হাস বিলাস ছাড়ি কেন পহুঁ কাঁদে।
না জানি ঠেকিল গোরা কার প্রমফাঁদে॥
ক্ষণে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি কাঁপে ঘন ঘন।
খনে সখী সখী বলি করয়ে রোদন॥
মথুরা মথুরা বলি করয় বিলাপ।
ক্ষণে বা অক্রূর বলি করে অনুতাপ॥
ক্ষণে ক্ষণে বলে ছিয়ে চাঁদ চন্দন।
ধূলায় লোটায়ে কাঁদে যত নিজগণ॥
ছার পরাণ কুলবতীর না যায়।
কহিতে আকুল পহুঁ ধূলায় লোটায়॥
গদাধর কাঁদে প্রাণনাথ লৈয়া কোলে।
রায় রামানন্দ কাঁদে প্রণয় বিকলে॥
স্বরূপ শ্রীরূপ কাঁদে সোঙরি বিলাস।
না বুঝিয়া কাঁদে নয়নানন্দ দাস॥

পাদটীকা -
প্রাচীন কাব্যসংগ্রহে মত্প্রচারিত গোবিন্দদাসের পদাবলী মধ্যে পদটী প্রচারিত হইয়াছিল, এবং ইহার
ভণিতা ছিল “না বুঝিয়া কাঁদি মরু গোবিন্দ দাস”। পদকল্পতরুর মতে নয়নানন্দ দাসের পদ বলিয়া গৃহীত
হইল।---জগদ্বন্ধু ভদ্র॥

সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত পদতল্পতরুতে এই পদটি গোবিন্দদাসের ভণিতায় রয়েছে। তিনি “ক”, “খ”, “গ”,
“ঘ” ও “চ” এই ৫টি পদকল্পতরুর পুথি থেকে এই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছিলেন। দেখা যাচ্ছে যে তার মধ্যে
একটি পুথিতেও এই পদটি নয়নানন্দের ভণিতায় ছিল না।  সবকটি পুথিতে পদটি গোবিন্দদাসের ভণিতায়
ছিল। কারণ তিনি তাঁর টীকা-পাঠান্তরে এ বিষয়ে কোনো উল্লেখ করেন নি। তাই বলা চলে যে গৌরপদ-
তরঙ্গিণীর সম্পাদক জগদ্বন্ধু ভদ্র মহাশয়ের সংগ্রহের পদকল্পতরু পুথিটিতে  পদটি নয়নানন্দের ভণিতায়
ছিল। আমরা নীচে সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর, গোবিন্দদাসের ভণিতার এই পদটি তুলে
দিলাম।---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥

ই পদটি আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩৩০ বঙ্গাব্দের (১৯২৩ সাল), ৩য় খণ্ড, ৪র্থ শাখা ২১শপল্লব,
শ্রীগৌরাঙ্গের সন্ন্যাস ইত্যাদি, ২২৪৭-পদসংখ্যায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এই গ্রন্থে পদটি গোবিন্দদাসের
ভণিতায় দেওয়া রয়েছে।

॥ পঠমঞ্জরী॥

গোলোক ছাড়িয়া প্রভু কেন বা অবনী।
কালা রূপ কেনে হৈল গোরা বরণ খানি॥
হাস বিলাস ছাড়ি কেন পহু কান্দে।
না জানি ঠেকিল গোরা কার প্রম-ফান্দে॥
খেণে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি কান্দে ঘনে ঘন।
খেণে সখী সখী বলি করয়ে রোদন॥
মথুরা মথুরা বলি করে কি বিলাপ।
খেণে বা অক্রূর বলি করে অনুতাপ॥
খেণে বলে ছিয়ে ছিয়ে চাঁদ চন্দন।
ধূলায় লোটাঞা কান্দে যত নিজগণ॥
ছার পরাণ কুলবতীর না যায়।
কহিতে আকুল পহুঁ ধূলায় লোটায়॥
গদাধর কাঁদে প্রাণ-নাথ করি কোলে।
রায় রামানন্দ কান্দে প্রবোধে বিকলে॥
স্বরূপ শ্রীরূপ কান্দে সোঙরি বিলাস।
না বুঝি না কান্দি মরু গোবিন্দদাস॥

এই কলিটি “গদাধর” ইত্যাদির পরে, এই পদে নেই . . .
ছার পরাণ কুলবতীর না যায়।
কহিতে আকুল পহুঁ ধূলায় লোটায়
॥”

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
পরশ-মণির সনে কি দিব তুলনা রে
কবি নয়নানন্দ দাস / পরমানন্দ
এই পদটি ১৮০৭ সালে প্রকাশিত কমলাকান্ত দাস সম্পাদিত পদরত্নাকর পুথিতে “নয়নানন্দ”-এর ভণিতায়
দেওয়া রয়েছে। (শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর পাঠান্তর থেকে পাওয়া তথ্য)  


পরশ-মণির সনে                          কি দিব তুলনা রে
পরশ ছোয়াইলে হয় সোণা।
আমার গৌরাঙ্গের গুণে                    নাচিয়া গাইয়া রে
রতন হইল কত জনা॥
শচীর নন্দন বনমালী।
এ তিন ভুবনে যার                        তুলনা দিবার নাই
গোরা মোর পরাণ-পুতলী॥ ধ্রু॥
গৌরাঙ্গ-চাঁদের ছাঁদে                       ও চাঁদ কলঙ্কী রে
এমন করিতে নারে আলো।
অকলঙ্ক পূর্ণ-চাঁদ                            উদয় নদিয়া-পুরে
মনের আন্ধার দূরে গেলো॥
এ গুণে সুরভি সুর-                          তরু সম নহে রে
মাগিলে সে পায় কোন জন।
না মাগিতে অখিল                       ভুবন ভরি জনে জনে
যাচিয়া দেওল প্রেম-ধন॥
গোরাঙ্গ-চান্দের তাই                        তুলনা দিবার নাই
হৃদয়ে ভাবিয়া সব দেখ।
নয়নানন্দের মনে                            অধিক আনন্দ রে
গোরা-গুণ বিচারিয়া লেখ॥

ই পদটি, আনুমানিক ১৭৫০ সালে, বৈষ্ণবদাস (গোকুলানন্দ সেন) সংকলিত এবং সতীশচন্দ্র রায়
সম্পাদিত শ্রীশ্রীপদকল্পতরু গ্রন্থের ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫ সাল) ২য় খণ্ড, ৩য় শাখা, ৬ষ্ঠ পল্লব, রসোদ্গার,
পদসংখ্যা ৬৭২-র শেষ চার পংক্তি এই রূপে দেওয়া রয়েছে “পরমানন্দের” ভণিতায়।

এতদ্গীতং সর্ব্ব-কালোচিতং।
অথ রসোদ্গারানুরাগঃ।

শ্রীগৌরচন্দ্রঃ।
॥ বিভাষ॥

পরশ-মণির সনে                          কি দিব তুলনা রে
পরশ ছোয়াইলে হয় সোণা।
আমার গৌরাঙ্গের গুণে                    নাচিয়া গাইয়া রে
রতন হইল কত জনা॥
শচীর নন্দন বনমালী।
এ তিন ভুবনে যার                        তুলনা দিবার নাই
গোরা মোর পরাণ-পুতলী॥ ধ্রু॥
গৌরাঙ্গ-চাঁদের ছাঁদে                        ও চাঁদ কলঙ্কী রে
এমন করিতে নারে আলো।
অকলঙ্ক পূর্ণ-চাঁদ                            উদয় নদিয়া-পুরে
মনের আন্ধার দূরে গেলো॥
এ গুণে সুরভি সুর-                          তরু সম নহে রে
মাগিলে সে পায় কোন জন।
না মাগিতে অখিল                       ভুবন ভরি জনে জনে
যাচিয়া দেওল প্রেম-ধন॥
গোরাচাঁদের তুলনা                     গোরাচাঁদ গোসাঞি রে
বিচার করিয়া দেখ সভে।
পরমানন্দের মনে                           এ বড় আকুতি রে
গৌরাঙ্গের দয়া হবে কবে॥


টীকা বা ব্যাখ্যা -
১-৪। “পরশ-মণির” ইত্যাদি। পদ-কর্ত্তা বলিতেছেন,--- স্পর্শ-মণির সহিত গৌরাঙ্গের কি তুলনা দিব ? স্পর্শ
মণি ( অন্য কোন ধাতু পদার্থে ) স্পর্শ করাইলে (উহা) স্বর্ণ হয় ; (কিন্তু) আমার শ্রীগৌরাঙ্গের (অদ্ভুত) শক্তির
প্রভাবে নাচিয়া গাহিয়া কত (শত) ব্যক্তি রত্ন হইল। ( প্রথমে ত পরশ-পাথর পাওয়াই দুর্ঘট ; তার
পরে উহা ঘাতু দ্রব্যে স্পর্শ করান আবশ্যক ; তাহা হইলে ঐ ধাতু-দ্রব্য স্বর্ণে পরিণত হয়, কিন্তু শ্রীগৌরাঙ্গের
নামের বাতাসেই মানুষ রত্ন হইয়া যায় ; সুতরাং এ স্থলে পরশ-পাথর অপেক্ষা শ্রীগৌরাঙ্গের উত্কর্ষ বর্ণিত
হওয়ায় “ব্যতিরেক” অলঙ্কার হইয়াছে।)
৮-১১। “গৌরাঙ্গচাঁদের” ইত্যাদি। শ্রীগৌরাঙ্গ-রূপ চন্দ্রের শোভায় (আকাশের) সেই চন্দ্র কলঙ্ক-যুক্ত (হইয়াছে)
; উহা এরূপ আলো করিতে পারে না ; (কেন না, শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাবে) নবদ্বীপ নগরে কলঙ্ক-বিহীন
পূর্ণচন্দ্র সমুদিত হইয়াছে ; (উহার প্রভাবে) দর্শকের মনের অন্ধকার বিদূরিত হইল। (আকাশের চন্দ্র কলঙ্ক-
যুক্ত এবং হ্রাস-বৃদ্ধির অধীন ; উহা মেঘ ইত্যাদির প্রতিবন্ধকতা না থাকিলে বাহ্য অন্ধকারমাত্র দূর করিতে
পারে ; কিন্তু অকলঙ্ক চন্দ্র-স্বরূপ শ্রীগৌরাঙ্গ তাঁহার আবির্ভাব দ্বারা দর্শকের মানসিক অন্ধকার পর্য্যন্ত
বিদূরিত করিয়াছেন ; সুতরাং এ স্থলেও “ব্যতিরেক” অলঙ্কার বুঝিতে হইবে।)

১২-১৫। “এ গুণে” ইত্যাদি। এই গুণের তুলনায় সুগন্ধি সুর-তরু পারিজাত (শ্রীগৌরাঙ্গের) তুল্য নহে ; কোন
(পুণ্যবান) ব্যক্তি (স্বর্গে যাইয়া সেই কল্পতরু পারিজাতের নিকট) শুধু প্রার্থনা করিলেই (ধন ইত্যাদি) প্রাপ্ত হন
; (কিন্তু) শ্রীগৌরাঙ্গ কেহ প্রার্থনা না করিলেও (অপূর্ব্ব দয়া-গুণ হেতু) সমস্ত জগৎ ভরিয়া (উত্তম-অধম না
বাছিয়া) সকল ব্যক্তিকে (নিজে) যাচ্ঞা করিয়া প্রেমরূপ অমূল্য রত্ন বিতরণ করিয়াছেন। (এ স্থলেও
“ব্যতিরেক” অলঙ্কার হইয়াছে।)

১৬-১৭। “গোরাচাঁদের” ইত্যাদি। শ্রীগৌরাঙ্গের তুলনা কেবল শ্রীগৌরাঙ্গ---এই বাক্য দ্বারা
শ্রীগৌরাঙ্গের দ্বিতীয় তুলনা-স্থল নাই, ইহা প্রতিপাদিত হওয়ায় “অনন্বয়” অলঙ্কার হইয়াছে।
“উপমানোপমেয়ত্বমেকস্যৈব ত্বনন্বয়ঃ॥”
---সাহিত্যদর্পণ, ১০ম পরিচ্ছেদ॥

.            *************************              
.                                                                                 
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর