কবি ফকির পাঞ্জ শা - জন্মগ্রহণ করেন
যশোহর জেলার শৈলকুপা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত
মুসলমান পরিবারে। পিতা খাদেমালী খোন্দকার
সাহেব ছিলেন একজন গোঁড়া মুসলমান।
কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রে উত্যক্ত হয়ে, যশোহর জেলার হরিণাকুণ্ড থানার অন্তর্গত হরিশপুর গ্রামের বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত,
অবস্থাপন্ন ফকির মহম্মদ বিশ্বাস দিগরের সাহায্যে সেই গ্রামেই সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। কবিপুত্র
জনাব রফিউদ্দীন খোন্দকার, তাঁর পিতার একটি জীবনীসহ, পুরাতন খাতা-পত্র থেকে তাঁর প্রায় দু’শো গান,
“বাংলার বাউল ও বাউল গান”-এর সংকলক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর কাছে পাঠিয়েছিলেন। উপেন্দ্রনাথ
ভট্টাচার্য মহাশয় সেই কবিজীবনীটি তাঁর গ্রন্থে হুবহু তুলে দিয়েছিলেন, ৫৫টি গান সহ।
কবির পিতা শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠান এতটাই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন যে তিনি পুত্র পাঞ্জ-এর বাংলা ভাষা-
শিক্ষারই বিরোধী হন এবং বাংলার বদলে পুত্রকে আরবী, ফার্সি ও উর্দু-শিক্ষাদান করেন। ১৫-১৬ বছর
বয়সে পাঞ্জ, পিতার ভয়ে বিশ্বাস-পরিবারের মহরালী বিশ্বাসের কাছে নিজে নিজেই গোপনে বাংলা ভাষা
শেখেন।
সমৃদ্ধ হরিশপুর গ্রামে সেকালে সকল শ্রেণীর হিন্দু-মুসলমান পরস্পরে মিলিতভাবে বসবাস করতেন। সুফী
ফকির, সাধা ও হিন্দু পণ্ডিতদের মধ্যে বৈষ্ণব ধর্ম ও বেদান্ত-তত্ত্ব, ইসলামের তত্ত্ব ও তাছাওফের গভীর
বিষয় এবং চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের বিষয় ইত্যাদি আলোচনা চলতো। এই বিদগ্ধজনের সমাবেশ কবির খুব
ভালো লাগতো। কিন্তু পিতার অপছন্দ বলে তিনি খোলাখুলি এই সাধু-সঙ্গে যোগদান করতে পারতেন না।
ধরা পড়লে পিতার কাছে প্রচণ্ডভাবে তিরস্কৃত হতে হতো। ২৪-২৫ বছর বয়সে কবির বিয়ে হয়। ২৭ বছর
বয়সে কবির পিতার মৃত্যুর কিছুদিন পরে তিনি খেলাফত (বৈরাগ্যবস্ত্র) ধারণ করেন। তাঁর ফকিরের জীবন
শুরু হয়। হরিশপুর গ্রামের হেরাজতুল্ল্যা খোন্দকার নামে একজন সুফীতত্ত্ববিদ সাধুর কাছে কবি দীক্ষাগ্রহণ
করেন। তাঁর অনেক গানে ভণিতার সঙ্গে গুরুর নামটি হীরুচাঁদ, গোঁসাই হিরুচাঁদ, সাঁই হীরুচাঁদ রয়েছে।
কবির ৩৩-৩৪ বছর বয়স থেকেই ২-৪ জন করে তাঁর কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর
গান ও কথা ছড়িয়ে পরে এবং সারা বাংলায় এবং সুদূর আসামেও মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে থাকেন।
কবির প্রকাশিত রচনার মধ্যে রয়েছে গানের সংকলন “ইস্কি ছাদেকী গহর”।
যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
১৯৪৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে
তিনি এই কবির সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“পাঞ্জশাহ - ইনি যশোহর জেলার শৈলকুপা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পিতা খাদেম আলী খোন্দকার, ইনি স্ত্রী ও
পুত্র পাঞ্জশাহসহ নিজ গ্রাম ত্যাগ করিয়া ষশোহর জেলায় হরিণাকুণ্ড থানার অধীন হরিশপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে
বাস করেন। পাঞ্জাশাহ উক্ত গ্রামের হেরাজতুল্ল্যা। খোন্দকার নামক জনৈক সুফী পন্থী সাধুর নিকট দীক্ষিত
হন। পাঞ্জশাহের রচিত ও প্রকাশিত গ্রন্থ “ইস্কি ছাদেকী গহর”। ইঁহার রচিত ৫৫টি গান “বাংলার বাউল ও
বাউল গান’-শীর্ষক গ্রন্থে সঙ্কলিত হইয়াছে। তন্মধ্যে ১৬টি গান বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন। ইনি ১৩২১ সালে ৬৩ বৎসর
বয়সে পরলোক গমন করেন।"
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
১৯৪৫ সালে, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য তাঁর সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি” গ্রন্থে, কেন
কিছু মুসলমান কবি বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন হলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . .
“. . . রাম ও কৃষ্ণের উপর দেবত্ব আরোপিত হওয়ায় সেই-সকল কাহিনী (রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি) ইঁহারা
তাঁহাদের নবলব্ধ ধর্ম্মের আদর্শের সহিত সামঞ্জস্য করিয়া মানিতে পারিলেন না। তাই কালক্রমে এদেশীয়
মুসলমানদের নিকট বহুদেবতার পূজক হিন্দুদের ধর্ম্মকাহিনী পাঠের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হইয়া উঠিল। চর্চ্চার
অভাবে এইজাতীয় অধিকাংশ কাহিনীই মুসলমানরা কালক্রমে ভুলিয়া গেলেন। কিন্তু চৈতন্যযুগে যখন প্রেমের
প্রবল বন্যায় বঙ্গদেশ প্লাবিত, তখন তাহা মুসলমানদের আঙ্গিনার মধ্যেও প্রবেশ করিল। প্রায় সেই সময়ই
প্রেমপূর্ণ বৈষ্ণব-হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পদাবলীরূপে পরিস্ফুট হইয়া নৃত্যে ও সঙ্গীতে বাঙ্গালার গগন-পবন মুখরিত
করিয়া তুলিল। এই প্রেমসঙ্গীত-মন্দাকিনী শুধু হিন্দুর গৃহপাশেই প্রবাহিত হয় নাই, মুসলমানদের আঙ্গিনার
পাশ দিয়াও প্রবাহিত হইয়াছে। তাহার ফলে হিন্দুরা এই মন্দাকিনীর পূতবারি পানে যেরূপ কৃতার্থ হইয়াছেন,
মুসলমানরা সেইরূপ না হইলেও প্রেমতৃষ্ণা নিবারণের জন্য এই ধারা হইতে যে সময় সময় বারি গ্রহণ
করিয়াছেন, তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। হিন্দু কবিরা এই ভাবগঙ্গায় স্নাত হইয়া জাহ্নবীর অশেষ
বীচিবিভঙ্গতুল্য অসংখ্য কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকার শাশ্বতমূর্ত্তি রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনা করিয়াছেন।
মুসলমানদের মধ্যে কেহ কেহ এই ভাবের প্রভাবে প্রভাবিত হইয়া রাধাকৃষ্ণ নাম উল্লেখ করিয়া প্রেমের কথা
গাহিয়াছেন।”
মুসলমান বৈষ্ণব কবি সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক, শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, জলধর সেন
সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার কার্তিক, ১৩২৩ সংখ্যায় (অক্টোবর ১৯১৬), তাঁর “বৈষ্ণব-কবিগণের
পদাবলী” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“মুসলমান কবিগণ এক-সময়ে কবিতাকারে রাধাকৃষ্ণের প্রেম-বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন,---এখন এই
ভেদবুদ্ধির দিনে এ কথা নিতান্ত বিচিত্র বলিয়াই বোধ হইবে। কিন্তু বিচিত্র বোধ হইলেও, তাহা একান্ত সত্য
কথা,---তাহাতে বিস্মিত হইবার কিছুই নাই। মুসলমান কবিগণ সত্যসত্যই রাধাকৃষ্ণের প্রেমসুধা-পানে
বিভোর হইয়াছিলেন। সেই সুধাপানে কেহ-কেহ অমরতাও লাভ করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের লীলারস
প্রকটনে অনেকে এমনই তন্ময়চিত্ত হইয়াছিলেন যে, ভণিতাটুকু উঠাইয়া দিলে---কবিতাটি হিন্দুর, কি
মুসলমানের রচনা, তাহা চিনিয়া লওয়া অসম্ভব বিবেচিত হইবে। জাতিধর্ম্মের ব্যবধানে থাকিয়া একজন
কবির এরূপ প্রসংশা-লাভ করা সামান্য গৌরবের কথা নহে। সৈয়দ মর্ত্তুজা, নাছির মহাম্মদ, মীর্জ্জা ফয়জুল্লা
প্রভৃতি কবিগণের পদাবলী কবিত্বে ও মাধুর্য্যে যে-কোন হিন্দু বৈষ্ণব-কবির পদাবলীর সহিত তুলনীয়।”
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক, শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র
সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের
একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“. . . বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ
আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই।”
এই কবিদের পরিচয় নিয়ে ব্রজসুন্দর সান্যালের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
ব্রজসুন্দর সান্যাল তাঁর “মুসলমান বৈষ্ণব কবি, ৩য় খণ্ড”-এর “জীবনী আলোচনা”-তে লিখেছেন . . .
“ . . . ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবির’ বর্ত্তমান খণ্ডে সৈয়দ আলাওল, মীর্জা ফয়জুল্লা, মীর্জা কাঙ্গালী, সৈয়দ
আইনদ্দিন, নাছির মহম্মদ, সৈয়দ নাছিরদ্দিন, সেরচান্দ বা সেরবাজ, এবাদোল্লা, আবাল ফকির, মোছন আলী,
মহম্মদ হানিফ এবং আলিমদ্দিন,---এই দ্বাদশ জন কবির পদাবলী প্রকাশিত হইল। ইহাঁদের মধ্যে মহাকবি
আলাওলের বৃত্তান্ত পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ হইল। অবশিষ্ট কবিগণের সম্বন্ধে আমাদের গবেষণার হুল কিছুমাত্র
প্রবেশ করিতে পারে নাই। প্রাচীন কবিগণ সাহিত্য-সংসারে একান্ত কুহেলিকাচ্ছন্ন। তাঁহাদের জীবনী
জানিবার অভিলাষ করা আর অন্ধকারে ঢিল ছোড়া প্রায় সমানই বটে!”
আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদের অনুপ্রবন্ধ - পাতার উপরে . . .
জলধর সেন সম্পাদিত “ভারতবর্ষ” পত্রিকার পৌষ ১৩২৫ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় (জানুয়ারী ১৯১৯ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত,
আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদের মুসলমান কবির বৈষ্ণব-পদাবলী প্রবন্ধের ৭৮-পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন . . .
“প্রাচীন কালে মুসলমান কবিগণ বৈষ্ণব-পদাবলী বা রাধাকৃষ্ণের লীলাবিষয়ক কবিতারাজি রচনা
করিয়াছিলেন, ইহা এখন আর নূতন কথা নহে। অনেকেই জানেন, নদীয়া--- মেহেরপুরের জমিদার
পরলোকগত বাবু রমণীমোহন মল্লিক মহাশয়ই সর্ব্বপ্রথমে মুসলমান কবিগণের কয়েকটি বৈষ্ণবপদ সংগ্রহ ও
প্রকাশ করিয়া সাহিত্য-সমাজের গোচর করেন। তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে এদিকে আমিও বহু পদ সংগ্রহ ও প্রকাশ
করিয়া কাব্যামোদিগণের আনন্দ বর্দ্ধন করিতে থাকি। আমার সংগৃহীত পদগুলি একত্র করিয়া রাজসাহীর
সুপ্রসিদ্ধ সাহিত্যিক বন্ধুবর শ্রীযুক্ত ব্রজসুন্দর সান্ন্যাল মহশয় কয়েক বৎসর পুর্ব্বে তাহা পুস্তকাকারে
প্রকাশিত করিয়া দেন। ইতোমধ্যে আমি আরও বহু পদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করিয়াছি। পাঠক পাঠিকাগণ
শুনিয়া আনন্দিত হইবেন, একমাত্র আমার চেষ্টায় এরূপ মুসলমান কবির সংখ্যা এখন পঞ্চাশেরও উপরে
উঠিয়াছে।
সম্প্রতি আরও অনেক নূতন ও পুরাতন কবির অনেক নূতন পদ আমার হস্তগত হইয়াছে। তন্মধ্যে
অনেকগুলি পদ গত বৎসর "গৃহস্থে” “ভারতবর্ষে” ও “ঢাক রিভিউ ও সম্মিলন” পত্রে প্রকাশিত হইয়াছে। আজ
আবার আরও কয়েকটি নূতন পদ এস্থলে প্রকাশ করিতেছি।
এই প্রবন্ধে সৈয়দ মর্ত্তুজার ৪টি, আমানের ১টি, মীর ফয়জুল্লার ১টি, সেখ কবিরের ১টি, মনোয়ারের ২টি,
এবাদুল্লার ১টি, আলিমুদ্দিনের ১টি, মোহম্মদ হামিরের ১টি এবং আবঝলের ১টি --- মোট ১৩টি পদ প্রকাশিত
হইল। এই সকল কবি নূতন নহেন। কিন্তু তাঁহাদের পদগুলি সম্পূর্ণ নূতন বটে।
১০৮৯ মঘী সনে বা ১৬৪০ শকাব্দে (১৭১৮ খৃষ্টাব্দ) লিখিত “রাগমালা” নামক একখানি সঙ্গীত-গ্রন্থের ভিতর
এই সকল পদ পাওয়া গিয়াছে। যাঁহারা কখনও প্রাচীন পুঁথির আলোচনা করিয়াছেন, তাঁহারা বেশ অবগত
আছেন যে, একমাত্র প্রতিলিপির সাহায্যে সেকালের কিছু সম্পূর্ণ নির্ভুলরূপে প্রচার করা বড়ই কঠিন। এই
কারণে পদগুলির স্থানে স্থানে অসংলগ্রতাদি প্রমাদ পরিলক্ষিত হওয়ার খুব সম্ভাবনা রহিয়াছে। প্রাচীন
সাহিত্যের সংশোধনের ক্ষমতা কাহারও নাই। এজন্য আমরা পদগুলি প্রায়ই “যথা দৃষ্টং তথা লিখিতং”
করিয়া প্রকাশ করিলাম।
যে দেশে বড়-বড় কবিগণেরই পরিচয় পাওয়া যায়া না, সে দেশে এ সব ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র পদ-রচয়িতা কবিগণের
পরিচয় কোথায় পাওয়া যাইবে?
ব্রজসুন্দর বাবুর “মুসলমান বৈষ্ণব কবি” নামক সংগ্রহ-গ্রন্থগুলির ভূমিকায় ইহাঁদের জীবনী-সম্বন্ধ জ্ঞাতব্য
সকল কথা একবার প্রকাশ করিয়াছিলাম। এখানে তাহার পুনরুক্তি না করিয়া কেবল এই কথা বলিয়া রাখি,
ইহাঁরা খুব সম্ভব চট্টগ্রামেরই কাব্য-কাননের কোকিল ছিলেন। তাঁহাদের নস্বর দেহ কোন্ সুদূর অতীতে
মাটীতে মিশিয়া গিয়াছে ; কিন্তু তাঁহাদের পরিত্যক্ত বীণা এত দিন পরে আবার ঝঙ্কৃত হইয়া উঠিয়া,
দেশবাসীর প্রাণে কি অভূতপুর্ব্ব আনন্দের সঞ্চার করিতেছে!”
পাঞ্জ শাহ সম্বন্ধে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
ফকির পাঞ্জ শা সম্বন্ধে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর “বাংলার বাউল ও বাউল গান” সংকলনের ৭২৭-পৃষ্ঠায়
লিখেছেন . . .
“বাংলার বাউল-ফকির বা নেড়ার ফকিরদের মধ্যে লালনের স্থান যে সর্বোচ্চ, তাহাতে সন্দেহ নাই ; কিন্তু
লালনের মৃত্যুর পরে যিনি সারা বাংলার ফকির-মহলে লালনেরই মতো উচ্চ স্থান লাভ করিয়াছিলেন, তিনি
ফকির পাঞ্জ শাহ। লালনের মৃত্যুর অব্যবহিত পর হইতে প্রায় পঁচিশ বসর যাবৎ পাঞ্চ শাহ অনেকটা
লালনের শূন্যস্থান পূরণ করিয়া রাখিয়াছিলেন । লালনের মতো তাঁহার রচিত গান বাংলার সর্বত্রই পাওয়া
যায় এবং ফকির-মহলে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে গীত হয়।
পাঞ্জ শাহর পুত্র রফিউদ্দীন খোন্দকারের দেওয়া পিতৃজীবনী - পাতার উপরে . . .
উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর “বাংলার বাউল ও বাউল গান” সংকলনের ৭২৭-পৃষ্ঠায় কবিপুত্র রফিউদ্দীন
খোন্দকারের লেখা পিতার জীবনীটির অংশবিশেষ এইখানে তুলে দেওয়া হলো . . .
“১২৫৮ সালের শ্রাবণ মাসে (জুলাই ১৮৫১) ফকির পাঞ্জ শাহ্ যশোহর জিলার শৈলকুপা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত
মুসলমান বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইঁহার পিতা খাদেমালী খোন্দকার সাহেবের ইনি প্রথম পুত্র।
ইঁহার পিতা একজন সঙ্গতিসম্পন্ন লোক ছিলেন। কুচক্রীর ষড়যন্ত্রে উত্যক্ত হইয়া বিষয়-বিভব তুচ্ছ-বোধে
ইনি স্বীয় স্ত্রী ও বালক পুত্রসহ যশোহর জিলার হরিণাকুণ্ড থানার অধীন হরিশপুর গ্রামের বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত,
অবস্থাপন্ন বিশ্বাস পরিবারের মাননীয় ফকির মহম্মদ বিশ্বাস দিগরের সাহায্য ও আস্তরিক সহানুভূতি পাইয়া
উক্ত হরিশপুর গ্রামেই দরিদ্রভাবে বসবাস আরম্ভ করেন। তাঁহার আত্মসম্মান-জ্ঞান ও ভদ্রতায় তিনি গ্রামস্থ
লোকের শ্রদ্ধাভাজন হন। . . .
. . . ফকির পাঞ্জ শাহের পিতা একজন গোঁড়া মুসলমান ছিলেন। শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে ( Formalities )
নিষ্ঠাবান হইয়া ইনি বাংলা ভাষা-শিক্ষারই বিরোধী হন এবং স্বীয় পুত্রকে আরবী, ফার্সি ও উর্দু-শিক্ষাদানে
প্রবৃত্ত হন। ১৫।১৬ বৎসর বয়সে ফকির পাঞ্জ শাহ গোঁড়া পিতার ভয়ে বিশ্বাস-পরিবারের মহরালী বিশ্বাসের
নিকট স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া গোপনে বাংলা ভাষা-শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। . . .
. . . তৎকালে হরিশপুর গ্রাম বিশেষ সমৃদ্ধ ছিল। সকল শ্রেণীর হিন্দু-মুসলমান পরস্পর মিলিতভাবে বসবাস
করিতেন। সুফী ফকিরদের মধ্যে জহরদ্দীন শাহ, পিজিরদ্দীন শাহ, ফকির লালন শাহের শিষ্য দুদমল্লিক শাহ্,
ইত্যাদি সুফীতত্ত্ববিদ্ সাধু ও হিন্দুদের মধ্যে মদন দাস গোস্বামী, যদুনাথ সরকার, হারানচন্দ্র কর্মকার প্রভৃতি
সমবেতভাবে বৈষ্ণব ধর্ম ও বেদান্তের সূক্ষ্ম তত্ত্ব, ইসলামের সুউচ্চ তত্ত্ব ও তাছাওফের গভীর বিষয় এবং
চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের বিষয়সমূহ 'আলোচনা করিতেন। প্রায়ই সুফী ফকির ও বৈষ্ণবগণ একত্র হইয়া সুফী
মতবাদ-সম্বন্ধীয় ও বৈষ্ণব তত্ত্ব-সম্বন্ধীয় গান ও সিদ্ধান্ত-আলোচনায় শান্তি অনুভব করিতেন।
এই সমন্ত বিষয় ফকির পাঞ্জ শাহের পিতা পছন্দ করিতেন না। . . .
. . . ২৪।২৫ বৎসর বয়সে ইঁহার বিবাহ হয়।...১২৮৫ সালের ২০ ভাদ্র ইঁহার পিতা পরলোক গমন করেন।...
পিতার মৃত্যুর কিছুদিন পর ইনি খেলাফত (বৈরাগ্যবস্ত্র) ধারণ করেন।...
এই সময় হইতেই তাহার ধর্মজীবন আরম্ভ হয়।...
হরিশপুর গ্রামের দক্ষিণপ্রান্তে হেরাজতুল্ল্যা খোন্দকার নামে একজন সুফীতত্ত্ববিদ্ পরম সাধুর নিকট ইনি
দীক্ষিত হন। . . .
. . . প্রায় ৩৩।৩৪ বৎসর বয়স হইতেই ইঁহার ধর্মানুরাগ ও জ্ঞানগরিমায় মুগ্ধ হইয়া ২।৪ জন করিয়া ইঁহার
শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে থাকে। এই সময় ইনি 'ইস্কি ছাদেকী গহর' নামে ১খানা কেতাব রচনা ও প্রকাশ করেন
এবং সুফী মতবাদ-সম্বন্ধীয় গান রচনা করিতে আরম্ভ করেন। ক্রমেই দেশ-দেশান্তরে শিষ্যসংখ্যা বর্ধিত
হইতে থাকে। নিজ জেলা ছাড়া ফরিদপুর, নদীয়া, রাজসাহী, দিনাজপুর, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল,
খুলনা ও সুদূর আসাম বিভাগেও অনেকে ইঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আজিও বাংলার বহু জায়গায় ইঁহার
রচিত পদাবলী আগ্রহ সহকারে গীত হুইয়া থাকে। জীবনে অক্ষয় কীর্তি রাখিয়া ১৩২১ সালে ২৮শে শ্রাবণ,
৬৩ বৎসর বয়সে ইনি পরলোক গমন করেন। . . .”