কবি পূর্ণানন্দ ও পুণ্যানন্দ - এই কবির
জীবন সম্বন্ধে কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে “পূর্ণানন্দ” ও “পুণ্যানন্দ” এক ও অভিন্ন ব্যক্তি। লিপিকরপ্রমাদের জন্য নামের বানানে
পার্থক্য ঘটে গেছে। পূণ্যানন্দ ভণিতার মাত্র একটি পদ পাওয়া গিয়েছে, তাও দুটি পূর্ণানন্দ ভণিতাযুক্ত পদের
সঙ্গে, আগরতলার বীরচন্দ্র লাইব্রেরীতে প্রাপ্ত, একটি খাতা থেকে।
“পূর্ণানন্দ” ভণিতার “জয় কিশোরী গোরি” পদটির শেষ ৮টি কলির সঙ্গে “পুণ্যানন্দ” ভণিতার “ফিরাইতে কর
নারে গিরিধর” পদটির শেষ ৮টি কলির মিল উল্লেখনীয়। এ থেকে আরও জোর দিয়ে বলা চলে যে
“পূর্ণানন্দ” ও “পুণ্যানন্দ” ভণিতা আসলে “পূর্ণানন্দ” কবিরই ভণিতা এবং লিপিকরপ্রমাদের জন্য ভিন্ন
বানানের হয়ে গিয়েছে।
পূর্ণানন্দের সময়কাল নিরূপণ - পাতার উপরে . . .
আমাদের অনুমান এই যে পদকর্তা পূর্ণানন্দের আবির্ভাব ও জীবনকাল উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে ওই
শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। তাঁর রচনা ও কীর্তনাদি জনপ্রিয়তা লাভ করতে বা বিভিন্ন মেলা, আসর ও অনুষ্ঠানে
গীত হতে উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ১৮৭০ সালের কিছু পূর্ব, ধরা যেতে পারে।
অষ্টাদশ শতকে প্রকাশিত রাধামোহন দাসের “পদামৃতসমুদ্র”, বৈষ্ণবদাসের “পদকল্পতরু”, দীনবন্ধুদাসের
“সংকীর্ত্তনামৃত” প্রভৃতি পদ-সংকলনে পূর্ণানন্দের পদ নেই। উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে সংকলিত
নিমানন্দ দাসের “পদরসসার”, ১৮০৭ সালে প্রকাশিত কমলাকান্ত দাসের “পদরত্নাকর” সংকলনেও এঁর পদ
নেই। এমন কি ১৮৪৯ সালে প্রকাশিত গৌরমোহন দাসের “পদকল্পলতিকা” সংকলনেও পূর্ণানন্দ বা
পুণ্যানন্দের পদ নেই। এই সময়ে, হয় পূর্ণানন্দ জন্মগ্রহণ করেন নি অথবা তাঁর পদাবলী বা কীর্তন তখনও
প্রসার লাভ করেনি। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের, সংকলন
“পদরত্নাবলী”-তেও পূর্ণানন্দের পদ নেই। এক্ষেত্রে হয়তো উত্কৃষ্ট পদাবলীর মানদণ্ডে এঁর পদাবলী
বিবেচিত না হয়ে থাকতে পারে। কারণ এই সংকলনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্কৃষ্ট পদাবলী সংকলিত করা।
এই গ্রন্থের পদাবলী চয়ন এতটাই প্রশংসনীয় হয়েছিল যে, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রীশচন্দ্রের এক
পত্রের, ২৫ আশ্বিন ১২৯২ তারিখের (অক্টোবর ১৮৮৫) উত্তরে লিখেছিলেন . . .
“প্রিয়তমেষু,
. . . পদরত্নাবলী পাইয়াছি। কিন্তু সুখ্যাতি কাহার করিব? কবিদিগের না সংগ্রহকারদিগের? যদি কবিদিগের
প্রশংসা করিতে বল, বিস্তর প্রশংসা করিতে পারি। আর যদি সংগ্রহকারদিগের প্রশংসা করিতে বল, তবে
কি কি বলিব আমায় লিখিবে, আমি সেইরূপ লিখিব। তুমি এবং রবীন্দ্রনাথ যখন সংগ্রহকার, তখন সংগ্রহ
যে উত্কৃষ্ট হইয়াছে তাহা কেহই সন্দেহ করিবে না এবং আমার সার্টিফিকেট নিষ্প্রয়োজন। তথাপি তোমরা
যাহা লিখিতে বলিবে লিখিব।” ---“পদরত্নাবলী”-র আনন্দ সংস্করণ, ১৪২৩বঙ্গাব্দ (২০১৬খৃষ্টাব্দ), গ্রন্থ প্রসঙ্গ,
৩৩৯-পৃষ্ঠা॥
পূর্ণানন্দের পদাবলী আমরা সর্বপ্রথম পাই, চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সমস্ত জীবন ধরে, ১৮৭০ সাল পর্যন্ত
সংগৃহীত এবং তাঁর পুত্র রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ১৯২২ সালে প্রকাশিত “শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু”,
পদসংকলনে। অর্থাৎ এই কবির পদাবলী ১৮৭০ সালের পূর্বেই বিভিন্ন কীর্তনের আসরে গাওয়া হতো।
কারণ চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সারা জীবন ধরে বিভিন্ন কীর্তনের অনুষ্ঠান ও কীর্তনিয়াদের সঙ্গে আলাপ
পরিচয় জমিয়ে, তাঁদের বাড়ীতে এনে স্বাভাবিক আতিথেয়তার উপরে, টাকা-পয়সাও দিতেন, তাঁদের থেকে
পদাবলী সংগ্রহ করতে। এমনও হতে পারে যে, সংগ্রাহক চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বয়ং কবি বা কীর্তনিয়া,
পূর্ণানন্দের সঙ্গে দেখা করে তাঁর থেকে ৬টি পদ সংগ্রহ করেছিলেন! কবির নিজেই কীর্তনিয়া হওয়াটা, সে
যুগে খুবই স্বাভাবিক ছিল। সে ক্ষেত্রে ১৮৭০ সালের কিছু পূর্ব নাগাদ কবি পূর্ণানন্দ জীবিত ছিলেন! এই
গ্রন্থটির পদ-সংগ্রহ প্রসঙ্গে, চন্দ্রনাথের পুত্র প্রকাশক রাজেন্দ্রনাথ, গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন . . .
“পিতৃদেব কলিকাতায় একটী সদাগরী অফিসে চাকরী করিতেন। তিনি তৎকালে অফিস হইতে ছুটি লইয়া
স্বীয় জম্নভূমি শান্তিপুরে যাইতেন, এবং সেই সকল কীর্ত্তনীয়াসহ মিলিতেন। তাঁহাদিগকে বাটিতে আমন্ত্রণ
করিতেন এবং এই সকল পদাবলী সংগ্রহের জন্য তাঁহাদের মধ্যে কাহাকে কাহাকে অর্থও দিতেন। তাঁহারা
যে কয়দিন শান্তিপুরে অবস্থান করিতেন, তিনি সেই কয়েক দিন একরূপ আহারনিদ্রা ত্যাগ করিয়া এই কার্য্যে
ব্যাপৃত থাকিতেন। সেই কঠোর পরিশ্রমের বিষয় ভাবিলে এখনও বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া যাই। তাঁহার দীর্ঘ
জীবন এই তপস্যায় নিরবচ্ছিন্ন ছিল। প্রভাতে---নিশীথে যখনই সেই কর্মযোগী সংসার কর্ম্মে অবসর পাইতেন,
তখনই তিনি অভীষ্ট বিগ্রহের ন্যায় ইহারই সাধনা করিতেন। পাঠক! এই সংগৃহীত পদাবলীতে দেখিতে
পাইবেন, কত অজ্ঞাতনামা বৈষ্ণব কবির পদাবলী। মরি মরি! তাহা কত সুন্দর, ভাব-লালিত্যময়। এখনও
ইহার অনেক পদাবলী অমুদ্রিতাবস্থায় রহিয়াছে। ভিক্ষা-জীবি বাবাজী বৈষ্ণবগণের মুখে ইহার দুই চারটা
গানও এখনও শুনিতে পাই।”
এই পাতার কবিদের ভণিতা পূর্ণানন্দ, পূর্ণানন্দ দাস, পুণ্যানন্দ
|
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রর উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
১৯৫৫ সালে প্রকাশিত, নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রর মহাজন পদাবলী “শ্রীপদামৃতমাধুরী” ৩য়
খণ্ডের পদকর্তাদের পরিচয়ের ৪৫-পৃষ্ঠায়, পূর্ণানন্দ সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“এই গ্রন্থে তৃতীয় খণ্ডে পূর্ণানন্দের ৬|৭টি পদ দেওয়া হইয়াছে। (পৃষ্ঠা ২১৭ হইতে) ইঁহার অন্য কোনও পরিচয়
জানা যায় না। সখ্যরসের পদরচনায় ইঁহার কৃতিত্ব দেখা যায়। গোপীগোষ্ঠের হাস্যপরিহাসে ইঁহার কবিতা
উজ্জ্বল হইয়াছে।”
কালীপ্রসন্ন বিদ্যাভূষণের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . .
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত প্রবাসী পত্রিকার জৈষ্ঠ ১৩২৯ ( মে ১৯২২ ) সংখ্যায় প্রকাশিত পদ-সংগ্রাহক
কালীপ্রসন্ন বিদ্যাভূষণ তাঁর “এক অপরিজ্ঞাত বৈষ্ণব কবি” প্রবন্ধে, কবি পূর্ণানন্দ সম্বন্ধে লিখেছেন . . .
“অনেকদিনের কথা, আগরতলা বীরচন্দ্র লাইব্রেরীর কীটদষ্ট বিস্তর গন্থ ও কাগজ রক্ষার অযোগ্য বিবেচিত
হওয়ায় জ্বালাইবার নিমিত্ত স্তুপাকারে রাখা হইযাছিল। একদিন সেই আবর্জ্জনা-স্তুপ উপর উপর ঘাটিয়া
একখানা হস্তলিখিত খাতা পাইলাম, তাহাতে কতকগুলি বৈষ্ণব-পদাবলী লিখিত ছিল।
অল্পদিন হইল, আলোচনা করিতে প্রবৃত্ত হইয়া দেখা গেল, তাহাতে কতিপয় অপরিজ্ঞাত পদ এবং কয়েকটি
পদে অপরিচিত পদকর্তার ভণিতা সন্নিবিষ্ট রহিয়াছে। তদ্দর্শনে কৌতৃহলাবিষ্ট হৃদয়ে অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়া
পদকল্পতরু প্রভৃতি যে-সকল মুদ্রিত পদাবলীগ্রন্থ আলোচনা করিবার সুযোগ ঘটিয়াছে, তাহাতে ঐ-সকল পদ
অথবা পদকর্ত্তার নাম পাই নাই ; এবং 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থেও তদ্বিষয়ক কোন কথার উল্লেখ পাওয়া
যায় নাই। ‘বঙ্গীয় কৰি' গ্রন্থ প্রণয়ন উপলক্ষে আমরা যে-সকল বিবরণ ও কাগজপত্র সংগ্রহ করিতে সমর্থ
হইয়াছি, তাহা আলোচনা করিয়াও কিছু পাওয়া গেল না। পরিশেষে, আগরতলা রাজগ্রন্থাগারে রক্ষিত
হস্তলিখিত বহু প্রাচীন গীতকল্পতরু, গীতচন্দ্রোদয় ও পদামৃতসিন্ধু প্রভৃতি অপ্রকাশিত গ্রন্থনিচয় আলোচনায়
প্রবৃত্ত হইয়া পুর্ব্বোক্ত খাতায় সন্নিবিষ্ট কোন কোন পদ ও ভণিতা পাওয়া যাইতেছে। প্রাপ্ত খাতায় যে-সকল
অপরিজ্ঞাত কবির নাম পাওয়া গিয়াছে তন্মধ্যে পূর্ণানন্দ দাস একজন। ভণিতায় উল্লিখিত নাম ব্যতীত
আমরা পূর্ণানন্দের কোনবূপ পরিচয় বা বিবরণ পাই নাই। এই সকল বিষয় জানিবার আশায় কোন কোন
বৈষ্ণব-সাহিত্যানুরাগী ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির দারস্থ হইয়াছিলাম ; তাহারা জানাইয়াছেন, তাহারা অদ্যপি
পূর্ণানন্দের 'অথবা তাঁহার রচিত পদাবলীর সন্ধান পান নাই।
আমরা ‘পূর্ণানন্দ' ভণিতাযুক্ত দুইটি ও 'পুণ্যানন্দ' ভণিতার একটি পদ পাইয়াছি। পূর্ণানন্দ ও পুণ্যানন্দ অভিন্ন
ব্যক্তি, লিপিকরপ্রমাদে নামের এবম্বিধ পার্থক্য ঘটিয়াছে বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস ; কিন্ত এই বিশ্বাস অভ্রান্ত
কি না, বলিবার বা বুঝিবার উপায় নাই। যে তিনটি পদ পাইয়াছি তাহা উদ্ধৃত করিয়া, পাঠক ও
বিশেষজ্ঞগণের হস্তে স্থিরসিদ্ধান্তের ভার অর্পণ করা ব্যতীত গত্যন্তর দেখিতেছি না।”