কবি শীতলাং ফকিরের বৈষ্ণব পদাবলী
*
পিরীতের ছেল বুকে যার কলঙ্ক তার অলঙ্কার
কবি শীতলাং ফকির
এই পদটি ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান
কবি” গ্রন্থের ৯১-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

॥ পিরীতি-পরিচয়॥

পিরীতের ছেল বুকে যার                 কলঙ্ক তার অলঙ্কার
কুলমানের ভয় নাইরে তার॥ ধু॥
পিরীতের নয় নিশানি               সদায় থাকে উদাসিনী গো
এগো চেরা মলিন থাকে তার
দিবানিশি বেকরার॥
ক্ষুধা নিদ্রা নাই তার মনে              জলধারা দুই নয়নে গো
এগো ছির ঘুরে প্রেমধুন্ধে
দিবানিশি ইন্তিজার॥
হাসি খুসি নাই তার মনে         সদায় থাকে ঘোর নয়নে গো
এগো লাজ ভয় নাই তার
কলঙ্ক তার অলঙ্কার॥
যার গলে পিরীতের ফাঁসি            সে হয় সকলের দাসী গো
এগো লোকের নিন্দন পুষ্প-চন্দন
অলঙ্কার পরাইছে গায়॥
প্রথমকু পিরীতে মজা                দ্বিতীয় পিরীতে সাজা গো
এগো তৃতীয়ে পিরীতে রাজা
রঙ্গ খুসী বেসুমার॥
শীতালাং ফকিরে বলে              প্রেমের মালা যার গলে গো
এগো তারা কেওরের কথা নাহি শুনে
কেবল বন্ধু বন্ধু বন্ধু সার॥

এই পদটি ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দে প্রকাশিত, আবদুল কাদির, রেজাউল করীম সম্পাদিত, বাঙ্গালী
মুসলমান কবিদের রচিত কবিতাবলীর সংকলন “কাব্য-মালঞ্চ” গ্রন্থের ৪৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

পিরীতের শেল বুকে যার             কলঙ্ক তা’র অলঙ্কার
কুল-মানের ভয় নাইরে তা’র।
পিরীতের এই নিশানি                সদায় থাকে উদাসিনী,
দিবানিশি সে-জন বে-করার॥
ক্ষুধা নিদ্রা নাই গো মনে,               জল ঝরে দুই নয়নে
লাজ ভয় নাই গো তার।
কলঙ্ক তা’র অলঙ্কার॥
প্রথমে পিরীতে মজা,               দ্বিতীয়ে পিরীতে সাজা,
তৃতীয়ে পিরীতে রাজা---
রঙ্গ খুশী বে-শুমার॥
শীতালাং ফকিরে বলে,             প্রেমের মালা যার গলে
কার কথা সো নাহি শুনে---
কেবল ‘বন্ধু’ ‘বন্ধু’ সার॥

এই পদটি ১৯৬৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, গুরুসদয় দত্ত ও ডঃ নির্মলেন্দু ভৌমিক
সম্পাদিত, “শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত” সংকলন, বৈষ্ণব পদাবলী, ১১৩-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।

পিরীতের ছেল১ বুকে যার, কলঙ্ক তার অলঙ্কার---
কুল-মানের ভয় নাইরে তার॥

পিরীতের জয়-নিশানি২ সদায় থাকে উদাসিনী গো---
এগো, চে’রা৩ মলিন থাকে তার
দিবা-নিশি বেকরার৪॥

ক্ষুধা-নিদ্রা নাই তার মনে, জল-ধারা দুই নয়নে গো---
এগো, ছির৫ ঘুরে প্রেম-ধুন্ধে৬
দিবা-নিশি ইন্তিজার৭॥

হাসি-খুসি নাই তার মনে, সদায় থাকে ঘোর নয়নে গো---
এগো, লাজ-ভয় নাই তার
কলঙ্ক তার অলঙ্কার॥

যার গলে পিরীতের ফাঁসি, সে হয় সকলের দাসী গো---
এগো, লোকের নিন্দন পুষ্প-চন্দন
অলঙ্কার পরাইছে৮ গায়॥

প্রথমকু৯ পিরিতে মজা, দ্বিতীয়ে পিরিতে সাজা গো---
এগো, তৃতীয়ে পিরিতি রাজা
রঙ্গ-খুশি বেসুমার১০॥

শীতালাং ফকিরে বলে, প্রেমের মালা যার গলে গো---
এগো, তারা কেওরের১১ কথা নাহি শুনে
কেবল বন্ধু বন্ধু বন্ধু সার॥

১ - শেল, ২ - জয়পতাকা, ৩ - চেহারা, ৪ - অস্থির, ৫ - শির, ৬ - প্রেমের ধাঁধায়, ৭ - প্রকীক্ষীরত,
৮ - পরিয়াছে, ৯ - প্রথমকার, প্রথমটায়, ১০ - বেশুমার, অহণিত, অসংখ্য, অপরিমেয়, ১১ - কাহারও।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
দিয়া প্রাণ কুলমান
কবি শীতলাং ফকির
বাউলাঙ্গের গান
১৯৬৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, গুরুসদয় দত্ত ও ডঃ নির্মলেন্দু
ভৌমিক সম্পাদিত, “শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত” সংকলন, বাউল, ১৩৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া
রয়েছে। যদিও এই গ্রন্থে গানটি বাউল গানের পর্য্যায় দেওয়া রয়েছে, আমরা বৈষ্ণব
পদাবলীর অন্তর্ভুক্ত করলাম।

॥ বাউল গান॥

দিয়া প্রাণ, কুলমান, ---
মন পাইলাম না, সজনি।
আমি হইলাম গো সই,, কুলকলঙ্কিনী॥

আঙ্ঘি দিলাম রূপ-দর্শনে,
কর্ণ দিলাম নাম শুনি’।
এগো, রূপ দিলাম তার অঙ্গের বদল---
প্রাণ দিলাম তার নিশানি১॥

আর তন ছুড়২ , মন ছুড়,
ছুড় ঘর-বাসনি৩।
এগো, ফুটিব কমল-পুষ্প---
স্বগন্ধিত মোহিনী॥

আর শুনিয়াছি গুরুর মুখে
এ সব কাহিনী।
এগো, নারীলোকের না হয় দেখা---
মিছা আশা বঞ্চনি৪॥

আর জিজ্ঞাসিতে নগরেতে
বন্ধু আমার আসব নি৫---
এগো, একালে না হইলে দেখা
পরকালে হইব নি॥

ও ভাই, চাতকীর মতো
দিবানিশি-রজনী---
এগো, পরেতে পরার বেদন
বুঝব নি, প্রাণ-সজনি---

প্রেমতাপিত যে জন
তার হৃদয়ে আগুনি।
এগো, আলিঙ্গন দিয়া প্রভু---
শীতল করো পরানি॥

আর শীতালং ফকিরে কইন---
শুনো ওগো বিরহিণি :
এগো, তোমার পিরিতের কাজে---
জান করতাম কোরবানী১॥

১ - প্রাণ উৎসর্গ করিব, ২ - তনু ছাড়ো, ৩ - গৃহবাস, ৪ - বঞ্চনাময় মিথ্যা আশা, ৫ -
আসিবে কি।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর
*
ছাড়িয়া না যাও মোরে
কবি শীতলাং ফকির
বাউলাঙ্গের গান
১৯৬৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত, গুরুসদয় দত্ত ও ডঃ নির্মলেন্দু
ভৌমিক সম্পাদিত, “শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত” সংকলন, বাউল, ১৩৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া
রয়েছে। যদিও এই গ্রন্থে গানটি ভাটিয়াল গানের পর্য্যায় দেওয়া রয়েছে, আমরা বৈষ্ণব
পদাবলীর অন্তর্ভুক্ত করলাম।

॥ ভাটিয়াল॥

ছাড়িয়া না যাও মোরে
প্রেমানল দিয়া রে।
বন্ধু শ্যাম-কালিয়া,
আইস প্রভু, জগত-বন্ধু রে॥

নিঠুর জানিয়া মোরে
না যাইয়ো ছাড়িয়া।
প্রাণরক্ষা কর মোরে, ---দরশন দিয়া রে॥

প্রেমানলে অঙ্গ জ্বলে---
সহিতে না পারি।
শ্রবণেতে শুনি---বাজে মুকুন্দ-মুররী১ রে॥

প্রেমসুরে বাইয়ো২ বাঁশী
রসিক বন্ধুয়া---
অবুলার প্রাণি৩ নেও সুরেতে টানিয়া রে॥

পবনেতে বাইয়ো বাঁশী---
ডাকি’ নাম ধরি’।
যৌবতী৪ সবের তুমি প্রাণি নেও হরি' রে॥

মুররী বাজাইয়ো সাধু
কোকিলার সুরে---
প্রাণি হরি’ নেও মোর,---দগধে অন্তর রে॥

মথুরায় বাইয়ো বাঁশী---
কদম্ব হেলিয়া।
সোনাপুরে জপে নাম সুন্দর তুতিয়া৫ রে॥

সোনাপুরে আছে সাধু---
রূপের ভাণ্ডারী।
রূপেতে হরিয়া সাধু তুতিয়া পসারি রে॥

সোনাপুরে যাইয়ো সাধু
করিয়া ঘোষণ---
মিলিবা তুতিয়া সাধু চান্দের বরণ রে॥

আনন্দে প্রবেশ হইয়া
শ্রীকুলার হাটে---
দেখিতে রসিক বন্ধু, ত্রিপুণ্যির ঘাটে রে॥

শীতালং ফকিরে কহে---
না ভজিলাম প্রিয়া ;
মোরে নাহি চায় বন্ধু কলঙ্কী জানিয়া রে॥

১ - মুরলী, ২ - বাজাইয়ো, ৩ - অবলার প্রাণ, ৪ - যুবতী, ১ - তোতাপাখী।

.            *************************             
.                                                                           
সূচীতে . . .      



মিলনসাগর