কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের কবিতা
*
তরী আমার কবে কিনার পাবে
(গান)
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার ভাদ্র ১৩২২ সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর
১৯১৫) প্রকাশিত। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা”
কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

.        তরী আমার কবে কিনার পাবে,
ওরে        পাবে সেদিন যেদিন আমার
.                        দিন ফুরায়ে যাবে।

.        ডেকেছিলে কাছে এসে,
.        চেয়েছিলে মধুর হেসে,
.        আবার আমায় ভালবেসে
.                        মুখের পানে চাবে,
.                        যেদিন দিন ফুরায়ে যাবে।

.        একদা মোর কুঞ্জবনে
.        গেয়েছ গান আপন মনে,
ওগো        শেষ বিদায়ের গানটি আবার
.                        নয়ন-জলে গাবে,
.                        যেদিন দিন ফুরায়ে যাবে।

.        নিভে নিভুক দিনের আলো,
.        ছেয়ে আসুক আঁধার কালো,
তোমার করুণ আঁখির উজল তারা
.                        শেষের পথ দেখাবে,
.                        যেদিন দিন ফুরায়ে যাবে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিষ্ফল
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৯৩১ সালে প্রকাশিত, নরেন্দ্র দেব ও রাধারাণী দেবী সম্পাদিত “কাব্যদীপালি” সংকলন
থেকে নেওয়া। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের
কবিতা।


চাহিনা তোমার অশোক চাহিনা,
.                চাহিনা বকুল-মালা,
চাহিনা মধুপ-মধু-ঝঙ্কৃত
.                কুসুম-কুঞ্জ-শালা ;

চাহিনা মালতী-বল্লী-বিতানে
.                পত্রের শেজ পাতা,
পিক-রবাকুল ফাগুন যামিনী
.                জ্যোত্স্না-মদির-মাতা।

চাহিনাক আর চক্ষে আশার,
.                ইন্দ্রধনুর আঁকা,---
শেষ হয়ে যাক্‌ বক্ষ-আড়ালে
.                বেদনা ঢালিয়া রাখা।

হে নব বরষ, রুদ্র-পরশ
.                এবার দাওগো ঢালি,
বেণু-বীণা সব করিয়া নীরব,
.                তোল কালাগ্নি জ্বালি।

মুগ্ধ মনের মোহ করিবার
.                বিফল মন্ত্র যত---
জীর্ণ দীর্ণ চূর্ণ হউক
.                ভস্মেতে পরিণত !

গগনের নীল নিছিয়া মুছিয়া
.                দাও গো অনল জ্বালি---
কাল-বৈশাখী করুক নৃত্য
.                বাজায়ে বজ্র-তালি।

চঞ্চল তার চরণ আঘাতে---
.                টুটিয়া হউক লয়,
সারা জীবনের বক্ষে লুকান
.                নিষ্ফল সঞ্চয়।

বরষে বরষে যত আশা, আর
.                দুরাশা নিরাশা যত---
বজ্র-আঘাতে হউক দীর্ণ
.                দগ্ধ ভস্ম হত।

সাধের কুলায় ভাঙ্গিল এবার,---
.                বিহঙ্গ পাক্‌ ছুটি,
কালের বক্ষে মিলাক তাহার
.                আর্ত্ত রোদন লুটি !

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এসো
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৯৯১ সালে প্রকাশিত, সুকুমার সেন সম্পাদিত “বাংলা কবিতা সমুচ্চয় ১০০০-১৯৪১”
সংকলন থেকে নেওয়া। মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার ভাদ্র
১৩২২ সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর ১৯১৫) প্রকাশিত।

ধরার উর্বশী ওগো মোর হৃদি-নন্দনের নারী,
বিচ্ছেদ বেদনা তোর চিরন্তন সহিতে কি পারি?
.        ওগো মোর হৃদি-কল্পলতা,
.        তোর চিরবিরহের সুকঠিন ব্যথা,
.                        সেই জানে,
মর্মবিদ্ধ কর যার দুর্নিবার আঁখির সন্ধানে।

.        বসন্তের অফুরন্ত কুসুম সম্ভার
.        প্রস্ফুটিত প্রতি অঙ্গে যার।
.        বরষার তটপ্লাবী নদী
.                অঙ্গের লাবণ্য যার বহে নিরবধি,
.                প্রভাতের মধুর অরুণ,
.                রক্তিম প্রণয়-ব্যথা যার সকরুণ,
.        বিশ্বে মোর তুই এক নারী,
বিচ্ছেদ বেদনা তোর চিরন্তন সহিতে কি পারি?
.                প্রশ্বাসে যাহার,
.        মলয় সুগন্ধ ভার
.                বহিয়া প্রচ্ছায় বনতলে,
.        দক্ষিণের মন্ত্রপড়া গন্ধবহ চলে,
.        যার নীল নিচোল অঞ্চলে
নীলিমা ছড়ায়ে দেয় শরতের গগন মণ্ডলে।
.        যার পাদ প্রক্ষেপের শোণিমা কুড়ায়ে
বসন্ত দিতেছে নিত্য অশোকে ও কিংশুকে ছড়াঁয়ে,
.                সেই মোর বিশ্বভরা তুই এক নারী,
বিচ্ছেদ বেদনা তোর চিরন্তন সহিতে কি পারি?
.        এস ওগো এস মোর প্রাণভরা ধন,
.        অরণ্যে বসাব মোরা সুরভি নন্দন ;
.                মোর কুটীরের অন্ধকার
.                        দূর করিবার
দিয়াছে দেবতা ওগো তোরি ’পরে ভার।
.        মিলন-বাসর-শয্যা পাতি,
.                রত্ববাতি
.        জালাইয়া, রয়েছি বসিয়া।
এস গো উর্বশী লক্ষ্মী, এস রতি, এস মোর প্রিয়া।
.        এস মোর প্রাণাধিক প্রিয়,
জীবনের সব শৃন্য নিজহাতে তুমি ভরে দিও।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জানি, বুকের-পাঁজর-ভাঙ্গা-দুখের এমন দিনও যাবে
(গান)
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার পৌষ ১৩২২ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৫) প্রকাশিত।
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের গান।

জানি, বুকের-পাঁজর-ভাঙ্গা-দুখের এমন দিনও যাবে,
আমার, মাঝ দরিয়ায় ভাঙ্গাতরী আবারও কুল পাবে।
আমার, নিথিল আঁধার যে জন বিনে,
আমি, ডাকছি তারে রাত্রি দিনে,
জানি, একদিন তার করুণ আঁখি আমার পানে চাবে।
এলে সে দিন, শাখীর শিরে,
ফুটবে কুসুম আবার ফিরে,
ফাগুন দিনের বাহার-রাগে বিহগে গান গাবে ;
ও তার, আপন হাতে বরণমালা কণ্ঠে মোর দুলাবে।

রাঁচি, “নিভৃত কুটীর”
১০ই ডিসেম্বর ১৯১৫

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বন্ধুর জন্ম দিনে
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার পৌষ ১৩২২ সংখ্যায় (ডিসেম্বর
১৯১৫) প্রকাশিত।

এই শুভদিন যেন চিরদিন বর্ষ বর্ষ ধরি’
সুখ শাস্তি সান্ত্বনারে নিত্য সঙ্গী করি’
.                        দেখা দে তব দ্বারে,
.        তব মনোনন্দন মাঝারে
.                        শত ভারে,
নিত্য বিকশিত হোক আনন্দ মঞ্জরী,
জীবন যোগাক্‌ সুধা নিত্য তব পাণপাত্র ভরি’ ;
.        বসন্তের বৈতালিক
.                কলকণ্ঠ পিক
.        নিত্য গাক্‌ তব স্তুতিগান,
ঊষার অরুণোদয়ে নিত্য যবে খুলিবে নয়ান ;
.        সুনীলিম গগনের গায়
হেসে যাক পূর্ণ চাঁদ, হাসে যথা প্রতি পূর্ণিমায়,
.        সুকোমল সদ্য পাতি
.        চামেলী চষ্পক যুঁই জাতি
.                        মেগে' নি’ক সার্থক মরণ,
কঠিন ধরণী 'পরে যেথা তব রাখিবে চরণ ;
.        মনোরথ যদি কিছু অপূর্ণ রহিয়া
.        অতৃপ্ত কাতর ক্লিষ্ট রেখে থাকে হিয়া,
.                        হোক্‌ পরিপূর্ণ সব,
.        আনন্দের নিত্য কলরব
চির বন্ধ থাক তব অঙ্গনের মাঝে,
তোমারে ঘেরিয়া যেন নিত্য সুখ রাজে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অনাদর
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার মাঘ ১৩২২ সংখ্যায় (জানুয়ারী
১৯১৬) প্রকাশিত।

সময় তোমার হ’লোনা নিতে,
যা ছিল মোর সব দিয়েছি তেমন কি
.                        কেউ পারবে দিতে?
.                গগন ঘেরা ভরা বাদর
.                বিন্দু পাতের হয় কি আদর?
নিদাঘ দিনে আবার তৃষা জাগবে চাতকিনীর চিতে।
.                ফাল্গুন দিনে ফুলের বাহার,
.                রঙ্ বেরঙে ছায় চারিধার,
শূন্য দেখি শরৎ শেষের শিশিরভরা দারুণ শীতে।

বারাকপুর, বিজনালয় ৯।১।১৬

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অপলক আঁখি
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার মাঘ ১৩২২ সংখ্যায় (জানুয়ারী
১৯১৬) প্রকাশিত। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা”
কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

গৃহহারা পথিক বলে সাঁঝের আঁধারে,
মলিন বয়ান সজল নয়ান সে এল দ্বারে।
হাত বাড়ায়ে দাঁড়ায়ে গো কাঙ্গাল ভিখারী,
কেমন করে বল তারে ফিরাতে পারি?
ভিক্ষা দিতে গেলাম যখন দুহাত ভরিয়া,
দখিন হাওয়ায় মাথার কাপড় গেল সরিয়া,
বন্ধ হাতে কবরী মোর ঢাকা হলোনা,
চেয়ে দেখি তারো আঁখির পলক প'লোনা ;
ভাবছি বসে ভিখারীর এ কেমন ব্যবহার !
আবার এসে মুখের পানে চাইবে না সে আর

রাঁচি, নিভৃত-কুটীর
২৫শে ডিসেম্বর

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভুল
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার মাঘ ১৩২২ সংখ্যায় (জানুয়ারী
১৯১৬) প্রকাশিত। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা”
কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

সত্য যদি কাঙ্গাল হ'তো বুঝিতাম তবু,
রাজার দুলাল ভিখারী হয় শুনিনি কভু !
যে দান তারে দিতে গেলাম ওঠেনা তার মন্‌,
তুষ্ট তারে করতে পারি, কি আছে এমন?
ছিল ছিল কণ্ঠমালা, গেলাম ভুলিয়া,
পড়লে মনে সেইটি তারে দিতাম খুলিয়া।
সে দিন থেকে সে মালা আর পরিনি গলে,
ভুলের তরে নয়ন ভরে নয়নের জলে !

রাঁচি, নিভৃত-কুটীর
২৫ ডিসেম্বর

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শাহজাদী
( গাথা )
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়ও প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “মানসী ও মর্ম্মবাণী”
পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৩ সংখ্যায় (সেপ্টেমম্বর ১৯১৬) প্রকাশিত।


একদা প্রদোষে দিল্লী-অবরোধ পিঞ্জরের পাখী,
সুবর্ণের আস্তরণে গজদন্ত-শিবিকায়-ঢাকি,
হয়-হস্তি-পদাতীর পদভরে কাঁপায়ে কোঙ্কণে
সহ্যাদ্রি লঙ্ঘিয়া চলে শাহজাদী পিতার বন্দনে।
হেনকালে অকস্মাৎ সচকিয়া মেদিনী অন্বর
সহস্র মিলিত কণ্ঠে ওঠে রব “হর হর হর” ;
পর্ব্বতের শৃঙ্গে শৃঙ্গে হ্রেষারবে ওঠে ঘোর ধ্বনি
সৈনিকের কটিদেশে কৃপাণের বাজিল ঝঞ্ঝনি।
চেয়ে দেখে চতুর্দ্দিকে চমকিত দিল্লী-সেনাপতি,
নামিছে মারাঠা সৈন্য অশ্বপৃষ্ঠে বিদ্যুতের গতি।
পর্ব্বতের সানুদেশে মারাঠা যে সমরে দুর্ব্বার,
শতযুদ্ধে শতবার হইয়াছে পরীক্ষা তাহার।
সম্রাট ও শাজাদীর কি উপায়ে বিপুল সম্মান
রক্ষা হবে, বহু চিন্তি সেনাপতি না পেয়ে সন্ধান,
ত্রস্ত সৈনিকের দলে বজ্ররবে কহে ডাক দিয়া---
“মরণ সঙ্কল্প ছাড়া নাহি গতি, দেখিনু ভাবিয়া ;
যাঁর অন্নে এতদিন পালিয়াছ শরীর সবার,
তাঁরি লাগি প্রাণপণ, এর বাড়া গৌরব কি আর !
মারাঠা দস্যুর সনে যুঝিয়া হইব জয়ী রণে,
নতুবা বীরের মত চিরনিদ্রা অনন্ত শয়নে ;
মৃত্যুভয়ে ভীত যদি কেহ থাকে মোর সৈনামাঝে,
মোগল উন্নিত-শীর্ষ হবে হেঁট আজি সেই লাজে।
স্মরিয়া তৈমুরে আর বাবর বীরত্ব রাখি মনে,
প্রভুর সম্মান তরে অগ্রসর হও সবে রণে।
বীরের সন্তান মোরা, ---মাতৃদুগ্ধ করিয়াছি পান,
প্রাণ দিব আজি মোরা, সম্রাটের রাখিতে সন্মান।”
নীরবিল সেনাপতি---করে ধরি উলঙ্গ কৃপাণ
দাঁড়াল অসংখ্য সৈন্য সমর্পিতে সংগ্রামে পরাণ।


মারাঠার দলপতি অগ্রসরি, মৃদুমন্দ হাসি,
জলদ-গম্ভীর-স্বরে কহে কথা মোগলে সম্ভাষি---
“আজ্ঞা কর সেনাপতি, দূরে ওই বনস্পতি ছায়ে
বাহকেরা নিয়ে যাক শাজাদীর শিবিকা সরায়ে ;
রণোন্মত্ত সৈনিকের বীভৎস ও বিকট চীৎকার,
আহত আর্ত্তের রব কর্ণে যেন নাহি পশে তাঁর,
সম্রাটের অবরোধে আনন্দে লালিত যেই জন,
তাঁর তরে নহে এই রণক্ষেত্র---কঠিন ভীষণ ;
শাজাদী থাকুন দূরে জয়াজয় হইলে নিশ্চিত,
করিও, করিব মোরা, সে সময়ে যা হয় বিহিত।”
শতসংখ্য 'মাউলী'রে ডাকিয়া কহিল সেনাপতি,---
“শিবিকা রক্ষণে সবে যাও ত্বরা, যাও দ্রুতগতি।
জয়-পরাজয় আজি স্থিরীকৃত নহে যতক্ষণ,
সাবধানে শাজাদীরে সসম্মানে করিও রক্ষণ।
যুদ্ধশেষে বাঁচি যদি, দেখা পুনঃ হইবে আবার ;
মরি যদি, যেতে দিও শাজাদীরে যথা ইচ্ছা তাঁর।”
ফিরিল অশ্বের মুখ, পুনরপি কাঁপায়ে অন্বর
আকাশে উঠিল ধ্বনি---“হে ভবানী হর হর হর।”


চকিতে শিবিকাদ্বার খুলে গেল নিমেষের তরে ;
দুইট খঞ্জন আঁখি মারাঠার মুখের উপরে
নিবদ্ধ হইল আসি, বীরের সে সুতীক্ষ্ণ নয়ান
ত্বরিতে দেখিয়া নিল রূপসীর সুচারু বয়ান।
কি আগ্রহভরা এই চারি চক্ষু শুভ সম্মিলন,
কে জানে বিশাল বিশ্বে বিনা সেই অন্তর্যামী জন?
শাজাদী ভাবিল মনে--- “শুনিয়াছি মারাঠা তস্কর,
শুনিয়াছি দস্যু তারা, শুনিয়াছি ক্রূর স্বার্থপর ;
এ যে দেখি বিপরীত! কে গো এই কান্তিমান বীর,
নিমেষে মধুরকণ্ঠে জিনে লয় মন রমণীর?
মারাঠা দস্যুই বটে, নতুবা এ মুহূর্ত্তের মাঝে
দিবালোকে হেন চুরি নাছি জানি আর কারে সাজে !”

মোগলের 'দীন্‌ দীন্”, মারাঠার “হর হর হর”
ছাইল কোঙ্কণ-গিরি, কাঁপাইল মেদিনী অম্বর।

অন্তশিখরীর পারে দিনকর ডুবে ধীরে ধীরে,
সুপ্তিভরা সন্ধ্যা আসে ধূসর অঞ্চলখানি ঘিরে
শান্তি দিতে শ্রান্তজীবে। সে প্রাদোষে মারাঠা মোগল
ক্ষিপ্ত-শার্দ্দূলের সম, এ উহার শোণিত-পাগল
আক্রমিছে পরস্পরে ; পূর্ণিমার পূর্ণ শশধর
আকাশের প্রান্ত হতে প্রসারিয়া সুধাসিক্ত কর,
শৈলঘেরা তড়াগের দ্রবীভূত স্ফটিকে শয়ান
খুলিতেছে কুমুদীর নিমীলিত সুচারু নয়ান।
এ হেন সন্ধ্যায় কত জন্মান্তের বাসনা বহিয়া
সমীরণ কত কথা কাণে কাণে যায় যে কহিয়া,
কেবা জানে? শুধু তার আকুলিত উচ্ছ্বাসের সনে
হৃদয়-বাঞ্চিত ধন চির-প্রিয়ে এনে দেয় মনে  ;
বিদায় দিয়াছি ওগো কারে যেন জনমের শোধ
তারি কথা আসে মনে, অশ্রুভারে দৃষ্টি হয় রোধ !


সুপ্তি-ঘেরা শ্রান্তিহরা সমাসন্ন সন্ধ্যার ছায়ায়,
আবরোধ-বিহঙ্গিনী নারী যেথা বসি শিবিকায়,
দক্ষিণের মন্ত্রপড়া বায়ু আসি তার কাণে কাণে
অজ্ঞাত কাহার বার্ত্তা দিয়া গেল, সেই তাহা জানে।
জন্মাবধি প্রাসাদের সুবিপুল-বৈভব-লালিতা
আনন্দের আয়োজনে পরিজন-স্নেহে যে পালিতা,
নিমেষের মাঝে তার ইন্দীবর-নিন্দী দু'নয়ন
নিতান্ত বেদনা-ভারে সৃজিবারে চাহে গো প্লাবন !
শত-যন্ত্র কণ্ঠ-গীতে ঝঙ্কারিত দিবস রজনী
সৌধশিরে বাস যার, মারাঠার বজ্রঘোষ ধ্বনি
আজি তার শ্রতিমূলে মনচোরা বাঁশরীর মত
অপূর্ব্ব পুলকভরে বাজিয়া উঠিছে অবিরত।
অন্বেষি হৃদয় তার বারবার মানিছে বিস্ময়,
যবন-নন্দিনী আজ মাগে কেন মারাঠার জয়!
সম্পদবেষ্টিত দিল্লী-প্রাসাদ-দুর্গের অবরোধ
শুষ্ক তুচ্ছ ধূলি সম আজি তার কেন হয় বোধ?
যদি সে শুনিতে পায় মোহন কণ্ঠের মধুস্বর,
চিরদৃষ্টি রহে যদি মারাঠার মুখের উপর---
রাজপ্রাসাদেরে তবে যোড়করে করি নমস্কার,
কোঙ্কণ কুটীর তলে বিছাইত সুখের সংসার।


গত অর্দ্ধ-নিশীথিনী, স্তব্ধ এবে রণ-কোলাহল,
“দীন দীন্ত” “হর হর” আকাশেরে করেনা পাগল,
অশ্বপদভরে এবে গিরিশৃঙ্গ নহে বিকম্পিত,
আর্ত্তের করুণ-রবে বসুন্ধরা নহে সচকিত।
গিরি আরণ্যেরে ঘিরে সুগন্ধী কুসুমগন্ধ ভাসে,
সুনীল গগন মাঝে পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ হাসে।
যেখানে সম্রাট-সুতা উদ্ঘাটিয়া শিবিকার দ্বার
হেরিতেছে সহ্যাদ্রির অতুলন শোভার সম্ভার,
মরাঠার সেনাপতি রণক্লান্ত ক্লিষ্ট দেহ নিয়া
শিবিকার কিছুদুরে সসম্মানে দাঁড়াইল গিয়া ;
কহিল বিনম্রসুরে, “রাজসুতা, কর অবধান,
যুদ্ধে জয়-পরাজয় চিরদিন আছে এ বিধান।
যবন বিজিত আজি, মহারাষ্ট্রে মোর অধিকার ;
হিন্দুর আতিথ্য এবে রাজকন্যা করহ স্বীকার।
অদূরে  “পানালা” দুর্গ, যোগ্য নহে তোমার ভবন,
তথাপিও কোন মতে নিশা আজি করহ যাপন।”


“বাদশা-নন্দিনী আমি, সে বারতা জান বীরবর?
বন্দিনী করিয়া যদি অতাচার কর মোর পর,
রাজরোষ অগ্নিসম প্রবেশিবে রাজ্যের মাঝারে---
ক্ষুদ্র মহারাষ্ট্র এই অবিলম্বে যাবে ছারে খারে।
কেন এ দুর্ম্মতি বীর?”


.                        “বৃথা এই গঞ্জনা আমারে,
নারী কভু শম্ভাজীর বন্দিনী হইতে নাহি পারে।
বাদশারে নাহি ডরি, স্বাধীন এ মহারাষ্ট্র দেশ,
সন্দেহ-বিহীন মনে দুর্গে মোর করহ প্রবেশ।
কালি প্রাতে যেও তুমি, যথা ইচ্ছা যাইতে তোমার,
সঙ্গে করি নিয়া যাবে চতুরঙ্গ-বাহিনী আমার।
এ কথা জানিও স্থির, যুদ্ধ করি যে ধর্ম্ম কারণ---
নারী প্রতি অত্যাচার সেই ধর্ম্ম করেছে বারণ,
যেখানে নারীর পূজা নাহি, সেথা ধর্ম্ম নতশির,
সেই হতভাগা দেশে সম্পদ রহে না কভু স্থির।
হিন্দু মোরা, বীর মোরা, জানি নারী জীবন সম্বল,
সুখের সঙ্গিনী নারী, দুঃখে নারী নির্ভর নিশ্চল,
মিলনে আনন্দ নারী, বিরহীর বক্ষতলে ধ্যান,
জীবন-যাত্রার পথে নিরাময় পরম কল্যাণ ;
আয়ুসূর্য্য বসে পাটে, সন্ধ্যা যবে আসে ঘনাইয়া
স্নেহময়ী রমণীর প্রেমমুগ্ধ একখানি হিয়া
শেষ শয়নের লাগি শ্রান্ত শির রাখিবার তরে
জীবন ভরিয়া যাচে, যাচে নর আকুল অন্তরে ;
দুঃখক্লিষ্ট শ্রান্ত নরে বাহুবদ্ধে রাখিবার তরে
বিধাতার আশীর্ব্বাদ নামিয়াছে ধরণীর পরে  ;
কল্পবন-পারিজাত সে রমণী নহেক বন্দিনী,
স্বর্গের সম্পদ তারে জানি মোরা, হে রাজনন্দিনী।”


“শম্ভাজী তোমার নাম? ছত্রপতি শিবাজী-নন্দন,
মহারাষ্ট্র অধিপতি? লহ বীর নারীর বন্দন ;
বীর্য্যমুগ্ধ রমণীর অকৃত্রিম হৃদয়ের নতি
গ্রহণ করিয়া কর কৃতার্থ হে মহারাষ্ট্রপতি।"


নীরব হইল নারী, চাহিল সে দিগন্তের পানে।
বারবার ফিরে ফিরে বাজিতে লাগিল তার কাণে
নরকঠে নারী-স্তুতি, অমৃতনিস্যন্দী নবতান---
হৃদয়ের নব তন্বী ঝঙ্কারিয়া আরম্ভিল গান।
একি এ আনন্দবার্ত্তা, ক্ষোভ ক্ষতি দুঃখের সংসারে
বিধাতার আশীর্ব্বাদ সম মোরা ধরণী মাঝারে !
কভু আর শুনি নাই এ অমৃত মধুক্ষরা বাণী
ঝঙ্কারি তোলেনি হেন কেহ মোর হৃদি-তন্ত্রীখানি !
কেগো তুমি বীরবর, মোহন অঙ্গুলি তব দিয়া
ঝঙ্কারিয়া জাগাইলে আজি এই সুপ্ত নারী হিয়া !


ধূলিমুষ্টি সম আজি মনে হয় দিল্লী-রাজশালা
অন্তরের নারী মোর দিতে চাহে তার বরমালা
তব কণ্ঠে বীরমণি, ব্যথাতুর ব্যর্থ এ জীবন
অঞ্জলি ভরিয়া তব পাদপদ্মে করি সমর্পণ
সার্থক করিব এই জন্মতরা ব্যাকুল বেদনা
এ তৃষার্ত্ত হৃদয়ের এই যে গো একান্ত কামনা ;
হে বাঞ্চিত বীরমণি, শৌর্য্য আর শিষ্ট আচরণে
জাগায়ে তুলেছ ওগো কি দুরাশা অবলার মনে
জানেন অন্তরযামী, রণে বনে বাসনে উৎসবে
এ চির-আনন্দহীনা অভাগিনী চিরসাথী হবে
এ বিপুল আশা তার, বুভুক্ষিত জীবন-সন্ধ্যায়
একান্ত আশ্রিত যেন বাঞ্জিতের পদছায়া পায়।


সুনীল নলিননিন্দী লাজনম্র মদির নয়ন
শম্ভাজীর মুখ ’পরে কোন মতে করিয়া স্থাপন,
সরম বিহ্বলকণ্ঠে কহিল সে, “হে বিজয়ী বীর,
যে জয় কৃপাণে করে সে কভু না রহে চিরস্থির,
বিজীত রমণী প্রতি হে রাজন্‌। এই শিষ্টাচার
স্থাপিল যে জয়স্তম্ভ, চিরতরে বক্ষে অবলার
রহিবে অটল তাহা লক্ষ সৈনিকের লোহ দিয়া
মোগল বা মারাঠায় যে বিজয় নিয়াছে কিনিয়া
বহু যুদ্ধে বহুবার, কালবশে সে সব বারতা
ভুলিবে সকল লোকে, ভোলে যথা স্বপনের কথা।
আজি শৈল সানুদেশে, গিরি-নির্ঝরের কলস্বনে
রজত-সুশুভ্র এই সুধাময় চন্দ্রিকা প্লাবনে,
কচিৎ বিহঙ্গরবে, মধুগন্ধী পাদপের তলে.
কৃতজ্ঞ এ রমণীর হৃদয়-পুষ্পের দলে দলে
লেখা হ'লো যে প্রশস্তি, সে বিজয়-বারতা রাজন,
ভোলে যদি বিশ্বলোক, এ অধমা রাখিবে স্মরণ।
পরাভব অগৌরবে কোন ক্ষোভ নাহি মনে আজ,
অজ্ঞাত এ পথে মোরে করে ধরে লহ রাজ-রাজ।”


রুদ্ধ রোষে বাদশাহ চাহি দুহিতার মুখ পানে
কহিতে লাগিল, “তৃপ্ত শম্ভাজীর উষ্ণ রক্তস্নানে
আমি আজ, হে রসনা মোর তনয়ারে প্রেমবাণী
কহিতে সাহস করে, তারে আমি দৃঢ়বলে টানি
শতখণ্ড করিয়াছি, কলুষিত যে বাহু তাহার
চেয়েছিল আলিঙ্গন দিল্লী সম্রাটের তনয়ার,
সেই বজ্রাহত দগ্ধ বাহু তার ছিন্ন ছিন্ন করি
দিয়াছি মিটাতে ক্ষুধা শৃগাল গৃধ্রের কাছে ধরি।
জিজ্ঞাসি তোমারে নারী, অয়ি অভাগিনী সুতা মোর
পবিত্র যবনকুলে জন্মি একি কুপ্রবৃত্তি তোর?
অধম কাফের সে যে, মনে হ'লে অঙ্গ জলে যায়
তারে সমর্পিলি প্রাণ, প্রেম-অর্ঘ্য দিলি তারি পায় !”


ধীরে অবনত শিরে সম্রাটের ভাগাহীনা সুতা
বেদনা-জড়িত-কণ্ঠে বিরহের ব্যাকুলাশ্রুপ্লুতা
কহিতে লাগিল বাণী, “হে সম্রাট, পিতা তুমি মোর,
নৃশংস হত্যার পাপে কি শাস্তি ভোগিতে হবে মোর
বিধাতার ন্যায় দণ্ডে, জানে তাহা অন্তর্যামী জন ;
মৃঢ় নারী আমি, মোর ভাবিলে শিহরি’ ওঠে মন !
পতি-পুত্র-হীনা আমি নাহি জানি কেমন সংসার,
রিক্ত লতিকার মত কাটিয়াছে দিবস আমার।
অকস্মাৎ দৈববশে দেখা হ'লো মনোচোর সনে
ফুটিল মন্দার-দাম হৃদয়ের নন্দন-কাননে ;
স্বয়ম্বরা রমণীর বরমালা তারি গলায়
স্বেচ্ছায় সানন্দ মনে পরাইয়া দিয়াছিনু হায় !


হে নৃশংস পিতা মোর, নিজহস্তে স্বীয় দুহিতার
ছিঁড়িলে অসির ঘায়ে সে পেলব প্রেম-পুষ্পহার !
বিধবা কন্যার অশ্রু দেয় পাছে মহা অভিশাপ,
লুকাইয়া রাখি তাই কোনমতে সে মহা সন্তাপ,
বেদনা রুধিয়া রাখি দীর্ণ এই বক্ষতলে মম,
ব্যর্থ প্রেম কেঁদে মরে বাণবিদ্ধ শকুন্তের সম।
তুমি কি বুঝিবে তার, স্বার্থ-অন্ধ দিল্লী অধিপতি,
জানেন অন্তরযামী, যিনি বিশ্বে অগতির গতি।
দ্বিচারিণী নহি আমি, পতিহীনা হৃদয় অর্পণ
করিয়াছে স্বামীপদে হে সম্রাট, ক্ষত্রিয় যবন
সে ভেদ কাহার গড়া? হৃদয়ের পূত প্রেম-হায়
যার কণ্ঠে পরায়েছি, সেই যে গো দেবতা আমার।

"আমি ক্ষমিয়াছি দোষ, পিতা তুমি ; বিধাতার ক্ষমা
তোমা তরে মেগে নবে@ ব্যথাতুর তনয়া অধমা।”

হেমন্ত-পদ্মের মত বিশীর্ণা সে বিধবা রমণী
ধীরে চলে গেল দূরে, সুর্য্য পাটে বসিল অমনি।


@ নবে - সম্ভবত “নেবে” বা “নিবে” হবে। মুদ্রণ-প্রমাদ।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তপঃসিদ্ধি
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্পাদিত “মানসী” পত্রিকার আষাঢ় ১৩২২ সংখ্যায় (জুলাই
১৯১৫) প্রকাশিত। ১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা”  
কাব্যগ্রন্থের কবিতা। সেখানে কবিতাটির শিরোনামের বানান - তপসিদ্ধি।


ছিন্ন শুষ্ক ধুলিম্লান বসন্তের বল্লরী-বিতান,
হিল্লোলিত মলয়ের কোথা কোনো নাহিক সন্ধান
.        কলকণ্ঠ কোকিলের বাণী
.        নাহি শুনি, ওগো ধরা-রাণী,
.                মালঞ্চ-অঞ্চল-তলে,
.        'সান্ধ্য ঊষা শিশিরের জলে
মল্লিকা মালতী আর ফুটিয়া না ওঠে,
.                মধুলোভে অলি নাহি জোটে ;
.        বনশ্রীর,
.     নিকুঞ্জ-লক্ষ্মীর,
হৃদিস্থিত বেদনার মত
ফুটিয়া ওঠেনা আর অশোক কিংশুক আদি যত ;
.        নারী-মুখ-মদিরার বাস
.                করি উপহাস,
.        বৃন্ত হতে আপনি টুটিয়া
ছায়াচ্ছন্ন তরুমূলে বকুল তো পড়ে না লুটিয়া।


.        হে ধরণী-রাণি,
স্তব্ধ তব বিহঙ্গ-কূজন-বাণী ;
.        পীত-শোভা বসন্তের সাজ
.                দূর করি আজ,
.        অনিন্দ্য-সুন্দর অভিনব
.        যৌবনের পূর্ণ তনু তব
ঢাকিয়াছ খর-সূর্য্য-গৈরিক-কিরণে,
.                একমনে
.                        কি সিদ্ধির লাগি,
.                সুদুরে তেয়াগি
.        বসন্ত-বাসরে আজ
.        কুসুমের সাজ?
.                হোমানল
.                        জ্বালিয়া প্রবল,
.        কোন্‌ অভিলাষে
জপিতেছ ইষ্টমন্ত্র নির্ণিমেষ রহি রুদ্ধশ্বাসে?


কোন্‌ এক গতযুগে হিম-শৈল-নন্দিনী পার্ব্বতী,
.        মহেশে মাগিয়া পতি,
.                তাপসের অসাধ্য সাধন,
.            না শুনি বারণ
.        সেধেছিল, একাগ্র অন্তরে
ব্যগ্র আশা বহি বক্ষ'পরে ;
.                স্ফুট-চন্দ্র-গ্রহ-তারা,
.            সন্ধ্যাকাশে সূর্য্যোদয় পারা,
যৌবনের নব আগমনে
দূর করি ভূষণে রতনে,
.                বাকল বঈন পরি,
চেলাঞ্চল দূরে পরিহরি ;
.        ভ্রমরের পদভার
.    সহেনাকো যার,---
পেলব শিরীষ ফুলে
.        পতত্রী পড়িলে
যে দারুণ বেদনা তাহার,---
বাকল বসনে তাই ঘটেছিল নন্দিনী উমার।


বসন্তে সহায় করি,
সাজাইয়া কুসুমে বল্লরী
.                হিমাপ্রির যোগাশ্রমে,
.        বিলাসে বিভ্রমে,
বালসূর্য্যকর উপহাসে
.        চীনাংশুক বাসে
আবরিয়া তনুলতাটিরে,
.        ধীরে ধীরে,
সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতার মতন,
.                        করিয়া যতন,
হর-যোগভঙ্গ আশে,
মনোজের পাশে
.                চলেছিল পর্ব্বতকুমারী,
যৌবন-আনন্দ-বিভা চৌদিকে সঞ্চারি ;
.        মদনের ধনুর্গুণসম,
.        গতিলোল কাঞ্চি অনুপম,
.                                এক করে
.                যথাস্থানে বিনিবেশ তরে
.        করিয়া যতন
.                অনুক্ষণ,
.                        অন্য করে
.                লীলা-পদ্ম ধরে’
মুখপদ্মভ্রমে ভ্রান্ত দূর করি ভ্রমর-পঙ্ক্তিরে
.        চলেছিল ধীরে এতি ধীরে
.        কোথা স্মর কোথা সম্মোহন !
.        হুরনেত্র অনলের প্রসয়-দহন
.                মন্মথের সনে
ভস্মশেষ করেছিল পার্ব্বতীর সুখসাধ মনে


ফাল্গুনের ফুলশয্যা পরিহরি, তুমি যার তরে,
.        একাগ্র আগ্রহ ভরে,
.                যোড় করে
.        ব্যাকুল অন্তরে,
.        উর্দ্ধে চাহি জপিতেছ নাম
.                অবিরাম,
.        রূপচক্রধ্বনি যার
.                শুনিবার
.        একান্ত আশায়,
বসে আছ জড় প্রাণহীন পাষাণ-প্রতিমা প্রায়
.        তোমার সে নব-ঘন-শ্যাম
.                অভিরাম,
.        স্নিগ্ধ কান্ত সুন্দর শোভন,
.                স্নেহাতুর নয়ন-লোভন,
.        আসিতেছে মিথুনের মাসে
.                তব বাসে।
.        শেষ করি বিশ্বজিৎ মাগে,
.                অনুরাগে,
.        সব তর কর সমর্গণ,
.                        হৃদয় তর্পণ,
যাচিয়া স্নেহের ধার,
.        সার কর করুণা তাহার।


হে মেদিনি, ওগো মহামূক,
কভু তুমি হবে না বিমুখ ;
বসন্তের মালতী-মঞ্জরী
.        পড়িয়াছে ঝরি,
.        নাহি খেদ তার তরে,
.                আষাঢ়ে আগ্রহভরে
.        ফুটিবে আবার
কুটজ-কুন্দের ভার,
.        কদম্বের পুলক-আকুলে,
.                যাবে ভুলে
.        বিগত বেদনা তব,
.        হবে অভিনব
.                যৌবন সঞ্চার,
.        অঞ্চল তোমার
.        ভরিবে আবার
অশ্রুধৌত শিশিরের সুধাগন্ধ শেফালি সম্ভার।
.        নিদাঘের সব নিষ্ফলতা,
.                মিটিবে তা,
সুন্দর সে শ্যাম-শোভা-জলদের স্নেহধার দানে
.        প্রাবৃটের রাত্রি-দিনমানে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর