কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের কবিতা
*
অসময়ে
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা।

মালতী-বিতানে                        ফুটেছিল ফুল,
গাঁথিনি তখন মালা,
প্রভাতে উঠিয়া                     রাখিনি সাজায়ে
তোমার পূজার থাল ;
কত বসস্ত                           গিয়াছে বহিয়া,
পূর্ণিমা নিশি কত,---
তব বন্দনা                           গাহিতে পারিনি
আমার মনের মত ;
তোমারে বসাতে                     পাতিনি আসন,
হয়নিক দীপ জ্বালা,
সময়ে সাজায়ে                       রাখিতে পারিনি
তোমার বরণ-ডাল ;
তোমারি আশায়                        উৎসুক মনে
সারিয়া সকল কাজ,
তব পথ চাহি                         বসিয়া থাকিনি
ওগো মোর রাজ-রাজ !
তবুও করুণা                        করেছ আমায়---
এসেছ আমার দ্বারে,
দুই হাত মোর                         দিয়াছ ভরিয়া
মাণিকের সম্ভারে,
উৎসব-বাঁশী                           বাজায়ে এসেছ
বর-বেশ করি স্বামি,---
মরণ বেলায়                         তোমারেই প্রভু
বরিয়া নিলাম আমি।
গোধুলি এসেছে                       জীবনে আমার,
আঁধার আসিছে নেমে,
পরাণে ‘ললিত’                    'আশাবরী' যত ---
সকলি গিয়েছে থেমে,
আলোক-পুলক                      নাহিক যে আর,
অমার আঁধার আসে ;
দুর্দ্দিনে যদি                                জীবন-বন্ধু
এসেছ আমার পাশে ---
না হয় মোদের                           হয়নি মিলন
দিবালোকে ওগো প্রিয়,
তোমার স্নেহের                           চির-নির্ভর
অন্ধকারেই দিও !
না হয় নাইগো                           বহু উপচার
তোমার পূজার তরে ---
নয়ন সলিলে                         অভিষেক করি
লব হৃদয়ের ’পরে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সে দোষ আমারি
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


ফল্গুরাগে আসে ধীরে ফাল্গুনের ফুলময় ঊষা,
শারদ নিশীথ আসে সুলগনে পরি চন্দ্র-ভূষা,
.        বার বার আসে যায়
.        তবু যদি হায়,
.                নিমেষের ভুলে
.        প্রিয়েরে আমার বক্ষে তুলে
.                না লইতে পারি,
.                সে দোষ আমারি।


মলয়ের পুলক-পরশে,
.        পরম হরষে,
.        নিকুঞ্জ-বিতানে
কল-কণ্ঠ বিহঙ্গের ব্যাকুল আহ্বানে,
.        হয় গাঁথা মালতীর স্বয়ম্বর-মালা ;
.                বরণের ডালা
.                শরৎ সাজায়ে তুলে,
হৃদয়-শোণিত-রাঙ্গা-বৃন্ত-শোভা শেফালির ফুলে :
.        তবু যদি আমি,
হে প্রিয় দয়িত মোর, হে জীবন-স্বামি,
.        বরণের শুভ আয়োজনে
.                আনন্দ লগনে
সে মালা তোমার গলে দোলাতে না পারি,---
.        প্রাণাধিক, সে দোষ আমারি।


ফুটাইয়া লক্ষ মল্লিরাশি,
.                মধু হাসি
,        রমার আনন-অনুকারী,
.                তারা-মনোহারী,
রাস-রজনীর পূর্ণচাঁদ
পাতি মর্ম্মচোরা ফাঁদ,
কতবার আসে যায়,---
.                তবু হায়,
.                তব সনে
আনন্দ-বাসর সম্মিলনে
.        তৃষ্ণার্ত্ত বুকের আশা,
.                হৃদয়ের সব ভালবাসা,
.                        তৃপ্ত যদি না করিতে পারি,---
ওগো প্রিয়তম, সে দোষ আমারি।


বিধাতার আশীষ সমান,
.                হদয়ের বান
.                নন্দন হইতে নামে,---
মূর্খ মোরা চেয়ে থাকি দক্ষিণে ও বামে ;
.        অভ্যাসের সুজীর্ণ নিগড় দিয়া
.                জীবনেরে রেখেছি বাঁধিয়া,
আনন্দের উন্মাদিনী ধারা
.        মন্দাকিনী পারা,
.                ঐরাবত মত
ভাসাইয়া নিতে চায় মিথ্যা দ্বিধা দ্বন্দ্ব শত
.        নিয়মের হেরি রক্ত আঁখি
দুর্ব্বল এ বক্ষ মাঝে থরথরি কাঁপে প্রাণ-পাখী ;
.        প্রাণ যাহা প্রাণপণে চায়,---
.        বাধা-বিঘ্ন চরণে দলিয়া হায়,
তারে যদি বক্ষে তুলে নিতে নাহি পারি,---
হে প্রিয়, পরম বন্ধু, সে দোষ আমারি।


ওগো মোর চিরানন্দ, ওগো প্রিয়তম,
.        তুমি যে গো একমাত্র মম,
তোমারে বিদায় দিনু বিস্মৃতির মাঝে !
.        প্রভাতে ও সাঁঝে,
যে অশ্রু ঝরিছে তোর,
.                সে বেদনা ঘোর---
বক্ষে মোর করিছে আঘাত
.                চির দিনরাত।
দাঁড়ালে দুয়ারে দুঃখী দুহাত বাড়ায়ে
.        দিনু তবু সুদূরে তাড়ায়ে ;
অন্নপূর্ণা ভেবে এসে অনশন পেলিরে ভিখারি,----
প্রাণ-বঁধু, ক্ষমা কর, সে দোষ আমারি।


অবিচ্ছেদ মিলন মাগিয়া,
.        বর্ষ বর্ষ জাগিয়া জাগিয়া,
.                করেছিলি কত আবেদন ---
দুহাত ভরিয়ে পেলি ‘নির্বাসন’ ‘বিরহ-বেদন’ !
.                কানে কানে ছিল কত কথা,
.        দিলাম, পেলাম শুধু ব্যথা।
প্রিয়তম, তুই যে রে একান্ত আমারি,
জানিনা কেমনে তোরে নিজ হাতে সাজানু ভিখারী


.        এ নহে অস্নেহ প্রাণধন,---
অন্যায়-পীড়ন-পদে দুর্ব্বলের প্রাণ-বিসর্জ্জন ;
.        নাহি মুখ কিছু বলিবার,
.                তবু বার বার,
.        এখনো যে মনে হয়---
.                আসিবে সময়,
.        প্রণয়ের পরিণাম নহে পরাজয়,
এ প্রেম সার্থক হবে---রে ভিখারি, নাহি তোর ভয়।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফিরে এস
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


শুনেছি, ধরায়
.        কিছুই নিষ্ফল নাহি যায়,
.        আমারি কি ব্যথাভরা বাণী
.                হে জীবন-রাণী,
.        চিরদিন হইবে নিষ্ফল,
দীর্ঘ পথে অশ্রুই কি রহিবে সম্বল?
.        সারা পথ চলিব একেলা,
তুমি আসিবে না মোর হাত ধরে নিতে সন্ধ্যাবেলা?


অন্তহীন বায়ুস্তর তরঙ্গের ’পরে,
.                রাত্রি-দিন ধরে
.        চলিছে যে দীর্ঘশ্বাস
.                বার মাস,
.        ওগো প্রিয়তম,
.                সে দুঃখ-বারতা মম
যায় না কি তব পদে জানাইতে বেদনা বিষম?


জানত গো, সুদীর্ঘ জীবন ভরি
.        কি তপস্যা করি
ফুটেছিল জীবনের আনন্দ-মঞ্জরী ;
.        তাপ-তপ্ত দিবসের শেষে
.                সঞ্জীবন বেশে
.                তোমার আশ্বাস
এনেছিল প্রাণে মোর মলয়ের মৃদুল নিঃশ্বাস
.        যবে যায় ষায় দিন,
সুবর্ণ সন্ধ্যার আলো হয়ে আসে ক্ষীণ,
.        অলি-কল-গুঞ্জন-মুখর
মধু-মধ্যাহ্নের রৌদ্রে কবোষ্ণ মন্থর
.        মোর দিবা, অস্তগিরি-শিরে
.                পরিম্লান হয় যবে ধীরে,
তুমি লক্ষ্মী-পূর্ণিমার চাঁদ,
.        তৃষার্ত্ত হৃদয়-সিন্ধু করিয়া উন্মাদ
.                হইলে উদয়,
.        শঙ্কিতেরে দিলে বরাভয় ;
.                ওগো মোর হৃদয়-রঞ্জন,
আঁখিতে পরায়ে দিলে অমৃত-অঞ্জন,
.                নব-চক্ষে হেরিনু সংসার,
.        হৃদয়-মন্থন-ধন প্রেয়সি আমার !


.        অকস্মাৎ তার পরে,
এ হৃদয় অমৃত-নির্ঝরে
.        চাপাইয়া পাষাণের ভার,
.                হে প্রিয় আমার,
.                দিয়াছ বিদায় !
নিঃস্ব নিরালম্ব হয়ে নিরাশ্রয়ে দিন কি গো যায়?
সারা জীবনের যত আশা,
.        দুঃখভরা এ বুকের যতেক দুরাশা,
.                তব হৃদয়ের অনুরাগে,
.                        তোমারি সোহাগে
.                        পেয়েছিল প্রাণ ;
রেখেছিলে, হে দেবতা, চিরভক্ত সেবকের মান।

.        কোন্‌ অপরাধে নাহি জানি,
.                হৃদয়ের রাণি,
.        তপঃসিদ্ধি আসিবার ক্ষণে,
হল ‘নির্ববাসন’ মোর সুদূরে নির্জ্জনে।
তব প্রাঙ্গণের পাংশু বুকে করি নিয়া,
.        সমীরণ যেত যবে দিয়া,
সে ধুলি সর্ব্বাঙ্গে মোর নিতাম যতনে,
.        বৈরাগীর সুবিমল বৃন্দাবন-রজঃ ভেবে মনে।


.        জন্ম-জন্মান্তের পুণ্যার্জ্জনে,
.                এ জীবনে,
.        পরাইলে মন্দারের স্বয়ন্বর-মালা,
বেঁধেছিলে হাতে মোর রাখীর সে চিরন্তন বালা ;
.        সব যে টুটিয়া প'ল হায়
ধরণীর ধুলি ’পরে ! বল মোরে দিন কিসে যায়?

.                যেদিন যে ভার,
.        বহিতে দিয়াছ মোরে, দেবতা আমার,
.                অতি সযতনে,
.                        প্রাণপণে
.                        করেছি বহন,
.        জান তাহা হৃদয়-রতন।
আজ শিরে দিলে তুলে বড় গুরুভার ---
বহিতে পারি না পারি শঙ্কা তাই হয় বার বার,
.                                হে প্রিয় আমার !


এ বুকে আশ্বাস আশা করেছিল ভিড়,
কুলায়-বিহীন তরে কল্পনা বাঁধিতেছিল নীড়,
.                নিমেষে সকলি চুকাইয়া
.        নয়নের অন্তরালে লুকাইলে প্রিয়া !
.                মোর চক্ষে নিবাইলে চন্দ্র তারা রবি,
সম্বল দিলে গো শুধু নেত্রনীর---আর ক্ষুদ্র ছবি !


ওগো এস, এস তুমি, এস একবার,
হে প্রিয়, জীবন বন্ধু, দেখে যাও কি দুঃখ আমার !

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চিরাগত
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

যেদিন ছিল                  মলয়ানিল,
পিকের কল-তান,
বিহগ-রবে                প্রভাতে যবে
খুলিত দুনয়ান,
সুনীল নভে                চাহিয়া যবে
দিগন্তের পারে ---
বসিয়া ধ্যানে                উদাস মনে
খুঁজেছি যেন কারে ;
বন-বিতানে                  মধুপ-গানে
জুড়াত যবে কান,
বিহান সাঁঝে                হৃদয় মাঝে
বাজিত যবে গান,---
তখন তুমি                কোথায় ছিলে
ওরে কাঙ্গাল মোর---
রাজার ধনে                দিতাম ভরে
রিক্ত ঝুলি তোর !

মলয় আর                বহেনা হেখা,
ফাগুন দিন নাই---
বসন্তের                    পুস্পশোভা
এখন কোথা পাই?
মালতী-যুথি                 বকুল যত
ঝরিয়া গেছে সব,
নীরব আজি                   কুঞ্জবনে
বিহগ-কলরব ;
সুচিরাগত                অতিথি, কেন
এমন দিনে এলে?
ফিরিতে হবে            বুঝি বা আজ
আঁখির জল ফেলে !

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সিদ্ধার্থের প্রতি
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


হে কুমার,
.        জয় করি ‘মার’
.                বিশ্বহিত করিবে সাধন?
.                        এ যে মহাভ্রম !
.        বিশ্বদেব সৃজিয়াছে যারে,
.                        বধ করি তারে
.                        সাধিবে বিশ্বের হিত ?
.                                এ যে বিপরীত!
জন্ম তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রয়োজন সাধিবারে,
.                        কার সাধা, কে নাশে তাহারে ?


অঙ্গহীন অনঙ্গ সে ভ্রমে চরাচরে,
ত্রস্ত ব্যস্ত বিশ্ব তার কার্ম্মুক-টঙ্কারে ;
.        প্রভাবে তাহার
নন্দনে আন্দ ঢালে মন্দারের ভার
.        ঊর্ব্বশীর চটুল নয়ন
মুগ্ধ করে উর্দ্ধরেতা তপস্বীর মন,
আনন্দে অঞ্জলি দেয় সে তাহার তপোবন লব্ধ ধন।


.                মলয়ের সুদক্ষিণ বায়,
গগনের অফুরন্ত স্নিগ্ধ নীলিমায়,
.        বিহঙ্গের আনন্দ-কাকলি মাঝে,
বাসন্তী ঊষায় আর শরতের সাঁঝে
মধু-বক্ষ মাধবীর মঞ্জরী-বিতানে,
মধ্যাহ্নে বিরহক্লিষ্ট কপোতীর গানে ---
.                যে দিকে যেখানে
.        ফিরাইবে আঁখি নরপাল,
হেরিবে হে অনঙ্গের প্রতাপ বিশাল।
.        নবোদ্ভিন্ন পল্লবের মর্ম্মরিত গানে,
উচ্ছ্বসিত সিন্ধুবক্ষে পূর্ণিমার বানে,
পুষ্পাসব-লুব্ধ মত্ত-মধুপ-গুঞ্জনে,
হৃদি-পদ্ম-নিষণ্ণার নূপুর-শিঞ্জনে ---
.                যখন যেখানে
.        ফিরাইবে আঁখি নরপাল,
হেরিবে হে অনঙ্গের প্রতাপ বিশাল।


হে রাজতনয়,
.        এ ব্রহ্মাণ্ডে ব্যর্থ কিছু নয়,
.                এ বিশ্ব-সৃজন
.        মিথ্যা নহে নহে কদাচন।
.                এই ষে অপার
,        হৃদিস্থিত প্রণয় দুর্ব্বার,
.        এই মায়া বুকভরা স্নেহ,
.                এ সুন্দর দেহ,
.        বিরহের নিবিড় বেদন
অবিচ্ছেদ মিলনের লাগি প্রাণপণ,---
.        করোনা করোনা এরে হেলা,
নিখিল ব্রহ্মাণ্ডপতি এরে নিয়া করে নাই খেলা।


.                কত লক্ষ জন
.                        আজীবন,
.                করি প্রাণপণ,
রেখেছে সঞ্চিত প্রেম, প্রিয়-পদে করিতে অর্পণ ;
.                সে মুগ্ধ প্রণয়
.        নয় নয় কভু ব্যর্থ নয় :
.                পরিণাম তার
.        নহে শুধু নয়ন-আসার
মিলনের মাঝে তারে দিতে হবে আনন্দ আপার।
.                যে প্রেম সঞ্চিত করি
.                        বুকে ধরি,
.        ধ্যানরত আছে সারাবেলা,
.                ভেবনা ভেবনা তারে খেলা।
.                        দে আনন্দ লাগি
.        নির্ণিমেষ বসুন্ধরা রহিয়াছে জাগি ---
.                সে অমূল্য ধন,
.        সুখভরা আনন্দের মৃত-সঞ্জীবন,
.        তোমারে যে দিতে নিতে হবে ;
আত্মনির্ব্বাসিত হয়ে অরণ্যে বসিয়া কেন রবে?


.                জীবনের আন সার্থকতা,
.        অসাড় ও-হৃদয়ের চির-দুর্ব্বলতা
.                        কর পরিহার
.                        হে রাজকুমার ;
তোমারে চাহিয়া যে গো আছে চিরদিন,
অখণ্ড মিলনে তার বিরহেরে করহু বিলীন।
.        আন আগে আপনার মনে,
যে আনন্দ দিতে চাও বিশ্বের সকল দুঃখিজনে ৷
.        বরষার বারিভরা নদী
.        দুই কুল শস্যপুর্ণ করে নিরবধি।
আত্মনির্যাতনে আর বিরহ-বেদনে,
অবিরাম নিরাশায়, সজল নয়নে,
.        আনন্দ-বিপণিক্ষেত্রে নাহি অধিকার
.                হে রাজকুমার !


.        প্রকৃতি আপন করে ধরি
তুলিয়া দিতেছে দেখ পানপাত্র সুধারসে ভরি,
.        করোনা করোনা তারে হেলা,
হৃদয়-সঞ্জাত স্নেহ নহে কভু বিধাতার খেলা ;
.                        প্রথম প্রভাতে,
.                সন্দেহ শিশির-পাতে
.        বিকসিত কুসুমের বুকের গোপন-গন্ধ দিয়া,
অমার আঁধার নাশি, পূর্ণিমার আলোক আনিয়া,
একত্রে বন্ধন করি সম্মোহিত দুজনার হিয়া,
.                মানবের আনন্দ-কারণ
নিরলস প্রকৃতির চলিতেছে শত আয়োজন ;
.                সে আনন্দ সুদূরে সরায়ে
আপনি পরিয়া আর প্রিয়জনে গৈরিক পরায়ে
.                কি ফল লভিবে হে কুমার?
‘মায়া’ ‘মোহ’ যাই বল, মিথ্যা কভু নহে এ সংসার


.        আছে হেথা মরুর তিয়াষ,
আশার লতায় হেথা মঞ্জরীর অপূর্ণ বিকাশ,
সর্ব্বনাশা স্বার্থ আসি রুদ্ধ করে দুর্ব্বলের শ্বাস ;
.                তবুও কুমার
.                মিথ্যা নয় বিচিত্র সংসার,
.        মিথ্যা নয় হৃদয়ের কানে কানে কথা,
.        মিথ্যা নয় বিরহের সুখময় ব্যথা,
.        খণ্ডিত সে ক্ষণিকের বড় প্রাণপণ,
.        অপূর্ব্ব পুলকভরা, চকিত দর্শন,---
.                মিথ্যা নহে, হে রাজকুমার ;
দুই প্রাণে গ্রন্থি বাঁধা মিথ্যা নহে বিশ্ব-বিধাতার !


.                নিয়েছ যে স্নেহ-ঋণ,
শোধিতে হইবে তাহা আয়ুর প্রত্যেক নিশি দিন ;
.                একাস্ত আশ্রিতজনে,
.                        অনন্যশরণে
.        যে তোমারি মুখ চেয়ে আছে,
চরণের স্নেহাশ্রয় বিনা সেকি বাঁচে?
.                        নিশিদিন
.        'অশ্রুভারে দৃষ্টি যার ক্ষীণ,
.                অনাদৃত সে স্নেহ-সম্ভার
.                        বক্ষে তুলে লও হে কুমার !
.        একাস্ত শরণ যে গো মাগি,
বর্ষ বর্ষ যোড়করে রহিয়াছে জাগি,
.        করোনা করোনা তারে হেলা ;
এ যে তার জীনন-মরণ, নহে খেলা।
.        ‘স্বার্থে’র হেরিয়া রক্ত আঁখি,
ক্ষুধিত রেখনা তব স্নেহ-পিঞ্জরের পোষা পাখী ;
.                বাহুর বেষ্টনে তারে নিও
.                যে তোমার প্রাণাধিক প্রিয়,
স্বার্থক প্রেমের বলে আনন্দ আসিবে প্রাণে নেমে
মিথ্যা দ্বিধা দ্বন্দ্ব যত, নিরানন্দ, সব যাবে থেমে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দেবতার আক্ষেপ
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

দেউলে দেউলে মন্দিরে কত
.                বাজে উত্সব বাঁশী,
লক্ষ পূজারি বন্দনা গায়
.                নিত্য নিয়ত আসি।
হে মোর ভক্ত, সেবক আমার,
.                তোর দেখা নাই আর,
কোথা অর্চ্চন-আয়েজন যত
.                উপচার-সম্ভার !
স্তুতিগান আর করেনা কেহই,
.                কুসুমে ভরিয়া সাজি,
মোর মন্দিরে আসে না ত কেউ
.                পূজিতে আমারে আজি ;
নীরব সন্ধ্যা-আকাশে আমার
.                ওঠেনা আরতি রব,
মধ্য দিনের ষোড়শোপচার
.                আজিকে নিরুৎসব ;
মালতী-বল্লী-বিতানে কুসুম
.                আপনি শুকায়ে যায়,
কত পূর্ণিমা পর্ব্ব-রজনী
.                বৃথা হয় মোর হায় !
তুই চলে গেলে, হে মোর পূজারি,
.                ভাবিনি ত এক দিন
এমন করিয়া মোর মন্দির
.                হবে বন্দনা-হীন।
জানিতাম যদি, একবার গেলে
.                আসেনাকো আর ফিরে,
রাখিতাম তোরে, ভিখারী আমার,
.                সব সম্পদে ঘিরে।
সব অভিলাষ মিটাইয়া, তোরে
.                মোর পাদপীঠতলে
চির-নিশিদিন বেঁধে রাখিতাম
.                চির-করুণার বলে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শেষ নিমেষ
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


ফিরে ফিরে আসিতেছে মনে,
আমার সে নব বৃন্দাবনে
.                বসন্তের নবীন হিল্লোল
তুলেছিল একদিন আনন্দের শত কলরোল,
.                জীবন-নিকুঞ্জ মাঝে ফুটেছিল ফুল,
গুঞ্জন-মুখর-মুগ্ধ মধুব্রতে করিয়া আকুল ;
.                ফাল্গুনের ফল্গুরাগ সম
নব-প্রেম-ব্যথাতুর বাসনা-বিহবল হৃদি মম,
.                চির-তৃষ্ণা-কাতর নয়ন,
প্রাণপণে নাচিয়াছে মোর প্রাণ-প্রিয়ের মিলন
.                তিলেকের পরশ মাগিয়া
.                কত নিশি গিয়াছে জাগিয়া,
বসন্তে শরতে আর বর্ষণের মেঘ-ম্লান দিনে,
হৃদয়-মন্থন-ধন সে চির-বাঞ্ছিত-জন বিনে
.                ঝরিয়াছে কত অশ্রুজল,
.                সমগ্র জীবন জন্ম হয়েছে বিফল !


.                আজি সূর্য্য বসিয়াছে পাটে,
রুদ্ধ বিপণীর দ্বার জীবনের হাটে ;
.                সন্ধ্যা আসে সুধীরে নামিয়া
শ্রান্ত নয়নের ’পরে ধূসর অঞ্চল টানি দিয়া।
.                মধুমত্ত মধুপের রব,
বিহঙ্গ-কাকলি-গীতি, স্তব্ধ আজি সব ;
.                আসে ওই আসন্ন আঁধার,
উচ্ছ্বসিত অশ্রু-সিন্ধু, নাই নাই সীমা-রেখা তার।
হে প্রিয়, জীবনবন্ধু, এ দুস্তরে করিলে না পার !
.                মনে পড়ে আজি,
.                প্রভাতে ভরিয়া সাজি,
.                ও রাঙ্গা চরণ পূজিবারে,
জীবন-দেবতা মোর, এসেছিনু তোমারি দুয়ারে
.                মুখে মোর ফোটে নাই কথা,
.                মরমের ব্যথা
.                ঢাকিয়া বিদীর্ণ মর্ম্মতলে,
বার বার গেছি ফিরে বেদনার তপ্ত অশ্রুজলে।


.                দিন যে ফুরায়ে যায় মম,
.                হে অন্তরতম,
আর যে গো, প্রতীক্ষার নাহি অবসর !
.                জীবন-দোসর,
মরণ-সাগর-বেলা-শুষ্ক-বালুকায়,
তোমারে হেরিয়া যেন মোর শেষ নিমেষ ফুরায়

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিবাদ
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

উপহার বলে, “আমি বড় তোমা চেয়ে,”
স্নেহ বলে, “তুমি বড় আমারেই পেয়ে।”
“মূল্য মোর কত”, উপহার বলে ডাকি,
স্নেহ কহে, “অমূল্য যে আমি সঙ্গে থাকি,
উপহার ফিরাইতে পারে বার বার,
আমারে ফিরায়ে বল হেন সাধ্য কার?”

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পদপ্রক্ষালন
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


বেদনা যত পেয়েছি ওগো,
.        রয়েছে বুকে গাঁথা,---
নীরবে তার সকলগুলি
.        নিয়েছি পেতে মাথা ;
বুকের যত শোণিতধারা,
.        নয়নপথে ঝরে ---
কলস ভরে’ রেখেছি সব
.        সাজায়ে তব তরে !
পাখালি পদ, হিয়ার 'পরে
.        বস হে বঁধু মোর,
তোমার পদ-পরশ যাচি
.        করিয়া করযোড় ;
ভাবিগো বঁধু, দুখের ঘায়ে
.        কঠিন মোর হিয়া,
বাজে বা ব্যথা তাহার পরে
.        কোমল পদ দিয়া !

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সিন্ধুর প্রতি
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


কার তরে তুই পাগলপারা
.        ছুটে আসিস্‌ বালুর তটে,
অন্তবিহীন গভীর ছন্দে
.        কণ্ঠে তোমার কি নাম রটে?

লক্ষ শত উর্ম্মি-বাহু,
.        ওরে কাঙ্গাল, উর্দ্ধে তুলে
কোন্‌ সুদূরের অজানাকে
.        ডাকিস্‌ রে তুই আপনা ভুলে?

কেন শ্যামল-শস্প ভরা
.        ধরণীর এই কোমল দেহ,
আকুল প্রেমের আলিঙ্গনে
.        ব্যক্ত কর বিপুল স্নেহ?

অন্তরে তোর সুধা, শশী,
.        লক্ষ্মী বসি অতল-তলে,
আরও কত রত্বরাজি
.        লুকিয়ে ছিল লোকে বলে।

সে সব কারে বিলিয়ে দিয়ে,
.        শূন্য নিয়ে হৃদয় মাঝে,
নিদ্রাবিহীন রাত্রি দিনে
.        কি ব্যথা তোর বুকে বাজে?

ধরার শিশু ক্ষুদ্র মানব
.        দুঃখ শোকে দিশেহারা---
পাই না চেয়ে, পেয়ে হারাই
.        নয়ন শুধু বাষ্পভরা।

ওরে বিপুল অকূল সাগর
.        তোরও কি ঐ বুকের মাঝে,
ব্যথায় ভরা বীণার তারে
.        সেই পুরাতন সুরটি বাজে?

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর