কবি মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের কবিতা
*
পাষাণ দেবতা
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

পাষাণ মন্দিরে তব নিত্য আসি যাই,
শত আহ্বানেও তব সাড়া নাহি পাই।
প্রথম প্রত্যুষে উঠি শুদ্ধ শান্ত মনে,
কর-যোড়ে আসি নাথ তোমার অঙ্গনে।
বেদনা-ব্যাকুল প্রাণে তোমা-পানে চাই,
করুণার কোন চিহ্ন নাহি কোন ঠাঁই !
তোমারে সাজাতে নিত্য আনি ফুল ডালা,
পাষাণ দুয়ারে গেঁথে রেখে যাই মালা।
সাধ করে মালাগাছি কণ্ঠে তুলে দিতে,
বাকাহীন মৌন দেখে ভয় পাই চিতে।
নিত্য এসে ফিরে বাহ সুখহীন ঘরে,
বিফল বাসনা রাশি কেঁদে কেঁদে মরে।
ব্যথিত পীড়িত হিয়া, বেদনা বিহবল,
পাষাণ দেবতা, শুধু তুমি তুমি অচঞ্চল।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আবেদন
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা

বকুল তলে                      কুটীর মোর,
কোমল পাতে ছওয়া ;
সন্ধ্যা হলে                        দখিন হতে
আছে পাগল হাওয়া :
সমুখে তার                      বিপুল দীঘি,
নিবিড় কাল জল ;
সকাল বেলা                     হাসিয়া উঠে
বিমল শতদল ;
ফাগুন দিনে                     গাছের ডালে
কালো কোকিল ডাকে,
প্রখর রবি                      আষাঢ় মাসে
নবীন মেঘে ঢাকে ;
শ্রাবণ দিনে                      মেঘের সনে
চাঁদের লুকোচুরি ;
পলকহীন                         নয়নে দেখে
পরাণ উঠে ভরি।

সকলি আছে ---                  কেবল মোর
আঁধার ঘরে আলো
করুণা মানি,                        হৃদয়-রাণি,
তুমিই এসে জ্বালো।
সাঁঝের বেলা                        শ্রান্ত পদে
যখন গৃহে ফিরি,
কোমল দুটি                       বাহুর পাশে
রাখিও মোরে ঘিরি ;
পুলকে আঁখি                     মুদিয়া আমি
রাখিব শির বুকে,
কাটিবে মোর                    শেষের দিন
গরবময় সুখে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাঁশী
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা


ব্যাকুল করা                        বাঁশরী তব
বাজায়োনা গো আজ,
সকাল বেলা                       সারিতে হবে
সকল গৃহকাজ।
জান না তব                        মোহন বেণু
কি রাগে ধরে তান,
কেমন করে’                        বিকল করে
আমার এই প্রাণ !
বাঁশীর সুরে                        আবেগ তব
পরাণে মোর মিশি
বেদনাময়                        করিয়া তুলে
আমার দশ দিশি।

নদীর জলে                       গায় সে ব্যথা
করুণ কল-সুরে,
শুনিতে পাই                        বিষাদ-গাথা
তরুর মর্ম্মরে ;
পবন আদি                        কাঁদিয়া কহে
তব বিলাপ-গীতি ;
চাঁদের করে                        বিষাদ তব
ঝরিয়া পড়ে নিতি।
গেওনা আর,                        করুণা তব
সাধি নয়ন জলে ---
জানত ভাই,                       ডানা ত নাই,
উড়িব কার বলে?

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শ্রাবণ
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা

এস হে শ্রাবণ,                      সরস প্লাবন
ভরিয়া তোমার বুকে,
তোমারি আশায়               বসে’ যোগাসনে
ধরণী উর্দ্ধমুখে।
রিক্তভূষণা                     শ্যামতনু শ্যামা,
হৃদয়ে বিরহ-ভার,
দিন গণি গণি                       দীর্ঘ বরষ---
গিয়াছে কাটিয়া তার।
এস হে নাগর                        নব নটবর
মেঘের শিরোপা শিরে,
চল-চপলার                        চেল-অঞ্চলে
প্রার্থিত তনু ঘিরে।
দূর অম্বরে                       মধুর তোমার
মোহন বাঁশরী-রবে,
শিহরি উঠিবে                      বিরহী ধরণী
অভিসার উৎসবে !
কোমল শ্যামল                      শষ্পের দলে
নব কদন্বে আর,
প্রিয়-মিলনের                          পুলকাঙ্কুর
জাগিয়ে উঠিবে তার।
অর্জ্জুন-ফুল-                         মঞ্জরী কানে,
কণ্ঠে কুটজমালা,
কামিনী-কেতকী                     কনক-চাঁপায়
সাজায়ে বরণডালা,
মুগ্ধ মেদিনী                      দাঁড়াবে তোমায়
বরিতে সন্ধ্যাকালে,
অভ্র-আবৃত                           চন্দ্রকলার
চন্দনলেখা ভালে।
দিগ্বধু মিলি                      কেতকী-বাসিত
বীজন করিবে সুখে,
বিদ্যুন্মণি-                          জড়িত বলয়
ঝঙ্কারি কৌতুকে।
মালতী-বিতানে                         মুগ্ধ মধুপ
ধরি গুঞ্জন-তান,
বন-বনান্ত                           করিবে মুখর
গাহিয়া স্বাগত গান।

এস গো ধরার                       চিরবাঞ্ছিত,
এস গো জীবন-ধন ;
মধুমাধবের                           অনলযজ্ঞ
হয়নি কি সমাপন?
পঞ্চ-তপার                           শ্রেষ্ঠ সাধন
সাধিয়া ধরণী রাণী,
সিদ্ধির লাগি                        উর্দ্ধে চাহিয়া
জুড়িয়াছে দুই পাণি ;
সিন্ধুসলিলে,                          নদী-পল্বলে,
বক্ষের মাঝে তার ---
যেখানে যা কিছু                  লুকান ছিল গো
স্নেহ-রস-সম্ভার ---
সবটুকু তার                      দিয়াছে নিঙাড়ি
তব করঙ্গ ভরি ;
দৈন্যের দশা                       দেওগো ঘুচায়ে
আজিকে করুণা করি।
গগন ভরিয়া                        এসগো শাওণ
শ্যাম-সমারোহে সাজি---
ঘুচুক দীর্ঘ                            বিরহ-বেদন
প্রেম-উত্সবে আজি।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কাঙ্গাল
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

চাইনি তব মুখের পানে
.        ঘখন গেলে চলে।
শুনিনি আমি বিদায় বাণী
.        কিযে গেলে বলে।
গিয়াছ তুমি যামিনী ভোরে
ছিলাম যবে ঘুমের ঘোরে,
আলসে আঁখি মুদিত ছিল
.        যখন গেলে চলে।
শুনিনি আমি বিদায় বাণী
.        কি যে গেলে বলে।

অজানা দেশে অচেনা পথে,
.        কিসের মোহ ঘোরে
একাকী তুমি কেন যে গেলে,
.        বলিলে না তো মোরে !
যা কিছু মোর ছিল বা আছে,
দিয়াছি তোর পায়ের কাছে,
তবুও তোর বিশাল তৃষা
.        মিটিল নাকি ওরে?
একাকী তুই কোথায় গেলি
.        কিসের মোহ ঘোরে !

রাজার ধনে দুহাত তোর
.        দিয়েছি আমি ভরে ;
আঁচল ঘিরে যতন করে
.        রেখেছি আমি তোরে ;
তবুও তুই বাড়াস্‌ হাত,
কিসের আশে দিবস রাত?
কাঙ্গাল তুই রহিয়া গেলি
.        কাঙ্গাল করে মোরে !
দিয়ে যে ছিনু রাজার ধনে
.        দুহাত তোর ভরে !

হেথায় ছিল বিহগ-গীত
.        নদীর কল গান ;
পূর্ণিমাতে সাগর হতে
.        আসিত হেথা বান ;
হেথায় বনে ফুটিত ফুল,
পবন হেথা হতো আকুল,
হেথায় ছিল তোমারি তরে
.        বেদনা ভরা প্রাণ।
রাখিয়া গেলে কেবলি শুধু
.        সজল দুনয়ান !

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হিসাব
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা

সঙ্গীবিহীন প্রবাসে, প্রদোষে
.                নির্জ্জন বাতায়নে,
কতবা দিয়াছি, কিবা পাইলাম,---
.                ভাবিতেছিলাম মনে।
রবি ডুবে যায়, পূরবীর সুরে
.                বাজে রাখালের বেণু
উন্মনা গাভী গোঠে ফিরে আসে
.                উড়ায়ে গোখুর রেণু,
খেয়া শেষ করি তরণী বাহিয়া
.                পারাণী চলেছে ঘর,
রক্তিম-রাগ-রঞ্জিত ছবি
.                অস্ত-গিরির পর,
আরতির গীতি মন্দির হতে
.                কানে আসে বার বার,
ঝিল্লি-মুখর পল্লীর বীথি,
.                নির্জ্জন চারিধার,
দ্বিতীয়ার চাঁদ---চন্দন-লেখা
.                সন্ধ্যা-কুমারী ভালে ---
একবার দেখা দিয়ে লুকাইল
.                নিবিড় তিমির জালে।
আমি এক মনে বসি বাতায়নে
.                খুলি জীবনের খাতা
ধূসর আলোকে পড়িতেছিলাম
.                @@@@@@@@
লাভের আশায় দিয়াছি দাদন,
.                কড়িটি পাইনি ফিরে,
বিশাল শূন্য রহিয়া গিয়াছে
.                নিরাশ জীবন ঘিরে।

@@@@@@@@ - অপাঠ্য পংক্তি

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ফিরে যাও
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

কে এসেছে আজ আকাশ ভরিয়া ছড়ায়ে আলোক,
কে এসেছে আজ রঙিন করিয়া পাখীর পালক,
কে এসেছে আজ বন-বনান্তে বিতরি গন্ধ,---
কে এসেছে আজ হৃদয় ভরিয়া দিতে আনন্দ?

কে এলে গো আজ মুখর করিয়া কাননতল,
কে তুমি ফুটালে সরসীর বুকে কমলদল,
কুলায়-বিহীনে কে তুমি বাঁধালে নূতন নীড়,
কুসুমের বনে কে তুমি বসালে ভ্রমর-ভিড়?

চাঁদের কিরণে কে তুমি বহালে মদির-ধারা,
ধূলার ধরণী করিলে কে তুমি ত্রিদিবপারা,
কোন্‌ দেবতার পূজার মন্ত্র পাঠের তরে
কে তুমি এসেছ আমার দার্ণ জীর্ণ ঘরে?

এখানে নাইগো প্রতিমা নাইগো দেবতা নাই ---
ব্যর্থ আশার অশ্রু-আসার নয়নে তাই !
ফিরে যাও ওগো, তোমার হেথায় নাহিক কাজ ---
স্মর নয়,---যিনি স্মরহর, তাঁরে স্মরিব আজ।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সে যে আমার কত আপন, আগে জানিনি
.                     (গান)
সে যে আমার কত আপন, আগে জানিনি

কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

সে যে আমার কত আপন, আগে জানিনি
এল কাছে, আরও কাছে কেন আনিনি?
.        তুলে নয়ন মুখের পানে,
.        চাইল কেন সেই তা জানে ---
ছিল যে তার গভীর মানে---তখন মানিনি।

ওগো আমার দিনশেষের গভীর আঁধারে
পড়ছে মনে এই কথাটি আজ বারে বারে ;
.        গেল যে দিন দূরে সরে ---
.        একলা পথের সাথী করে,
বল্‌ গো তোরা কেন তারে ধরে রাখিনি ---
ঘরের আগল খুলে তারে কেন ডাকিনি !

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শেষ মিনতি
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

এই যদি হয় বিচার তোমার,---
.        তাই হবে গো তাই হবে ;
নখের মাথা ক্ষয় করে আর
.        গুণবোনা ‘সে দিন কবে’
.     রইল পায়ে এই মিনতি
.     ওগো আমার চরম গতি,
পাই যেন গো শেষের দেখা
.        শেষ বিদায়ের দিন যবে ;
এই যদি হয় বিচার তোমার,
.        তাই হবে গো তাই হবে।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শেষ লগ্ন
কবি মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়
১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ খৃষ্টাব্দ) প্রকাশিত, কবির “সন্ধ্যাতারা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

দীর্ণ হিয়ার দুঃখ-মাণিক, অশ্রুকণার মুক্তা-মালা ---
তাই সাজায়ে রইল তোলা আমার বধূর বরণ-ডালা ;
আসবে যখন শুভ-লগন, মৌন-মগন গভীর রাতে,
দুঃখ-শরণ শ্রান্তিহরণ সুপ্তি আমার আঁখির পাতে,
তপ্ত-সচল জীবন-ধারা যেদিন দেহে আসবে থেমে,---
সকল বাধা ঘুচিয়ে দিয়ে সেদিন বধূ এস নেমে।
শুভ শরৎ চাঁদের রেণু এস সেদিন অঙ্গে মেখে,
তরুণ-অরুণ-কিরণ-বরণ-বসনে ঐ তনু ঢেকে,
পদ্মরাগের রক্ত-রসে রাতুল চরণ রাঙ্গা করে’,
পুলক-পরশ দিও আমার তুষার-শীতল বুকের 'পরে।
ব্যাকুল বাহুর আলিঙ্গনে সেদিন তুমি দিও ধরা,
বাসর রাতির সোহাগ-বাতি জ্বেলো আঁধার উজল-করা।
জন্ম-দুখীর শেষ-নিবেদন পরাণ-প্রিয় মনে রেখো,
রাত্রি শেষের লগ্ন সেদিন ভ্রষ্ট যেন না হয় দেখো।

.              ****************             
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর