কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডলের কবিতা
*
মায়াসঞ্চয়
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

জানালার কাছে পুড়তে থাকা অসুস্থতা নিয়েই
পাখি দেখছি , তার ঠোঁটে স্মৃতিডাক -

এভাবেই বসে আছি কয়েক জন্ম ; মাঝরাতে হারমোনিকার সুর
হাওয়ায় অন্ধকার জাগানো অদৃশ্য মহিমায় সতত শুশ্রুষা রাস্তা
পেরিয়ে যাচ্ছে মাধুকরী মেঘ
আলপথ চিনে নিতে গাছের ছায়ায় বাজে দীর্ঘশ্বাস  -

ক্রমে ক্রমে ঈশ্বরের ভিজে যাওয়া শরীর থেকে
কুড়িয়ে নিই উপোসী কাঙাল , কাঁচের রঙে অসুখ -
ডালপালা উঁচিয়ে  দেখা যায় জমানো হিরণ্য পাতা
.                                        আমার মায়াসঞ্চয় -

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মাথা নত করে দাও
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

মাথা নত করে দাও হে বলতে বলতে প্রদীপেরর সলতেটা
উস্কে দিতে থাকি , আগুন স্বয়ং পুড়ে খাক্ ; বৃষ্টি পড়ছে
কিনা বুঝতে চেষ্টা করিনি কোনদিন, লবনাক্ত হয়ে ওঠা
ব্যকুলতায় অবাধ্য দুপুরের গন্ধ ভাসে  

বাতাসেরর ধানক্ষেত আর
একক নৌকার জলোচ্ছ্বাস

মানুষের শূন্যতা কোথায় যেতে পারে ভাবতে ভাবতে
নীল আকাশের তারার মতো উড়ে যায় দুধ সাদা বক
দুটো চারটে ছটা সারি সারি নিমগ্ন ছায়ায় তীক্ষ্ণ ঠোঁটের
কাব্য কৌশল,  সাপের ছোবলগুলি পচা জলের মাঠে
ডুব সাঁতার কাটে, থৈ নেই এমন নয়-তবুও ভেসে
থাকতে থাকতে হয়তো পতন
.                 হয়তো বাঁশির জন্য জীবন মরণ-

রাস্তার কোনদিকে আছে ব্রহ্মাণ্ড

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শূন্যকাল
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

একটি নিঃস্বকাতর পলাশের পাশে দাঁড়ায় স্পর্শরেখা
কলঙ্কের পাহাড় নিয়ে কতটা হৃদয় গোপন করে রাখে

কিছু ফুল ঝরে গেলে এক শূন্য থেকে শুরু হয় উল্কাপাত
অথচ যাবার সময়ে নতুন ছায়ার মোহিনী অন্তর্বাস

শিশির ধোয়া ধানক্ষেত মন্ত্রে যাবতীয় জীবন যাপন
ওপারে নামছে মেঘ , রোদ ফুটেছে  ব্রহ্মকমলে

এপারে অমিত প্রেমলিপি জ্যোৎস্নার কপালে অষ্টপ্রহর
সাজঘর , ভেসে আসছে আলপথের বিবাগী পথিক

নিঃশেষ হতে কত বাকি যদি ভেসে আসে পুবের সৌগন্ধ
ডানায় ছড়িয়ে দেই মর্মরিত অনন্তকাল : আমার--

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুর
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

এই নাও আমার রাস্তাঘাট, যখন যেখানে খুসি চলে যাওয়া যায় এখান থেকে-
একে তুমি  মনখারাপ বলতে পারো, অবিশ্বাস করতে পারো শেষ শীত, অথবা
দূরে কোন থানকুনি প্রেমিকার পাস দিয়ে
বয়ে যাচ্ছে স্যাঁতসেঁতে চাষির রোগা দেহ
রোদ মাখতে মাখতে সমস্ত ক্ষয় পেরিয়ে গঙ্গা ফড়িঙের দেশ, আকাশ আলিঙ্গন চায়-
চোখের ভেতর জমে উঠেছে ডুব সাঁতারের ভ্যাপসা আঁধার, আর রাতের অস্থিরতায়
জোনাকির শুদ্ধ কাঁপন

আশ্চর্য এই,
বুকের মাঝে যে বৃষ্টি এখনও জমে আছে     ঝরাপাতার দুঃখ নিয়ে সে বাঁধ বাঁধতে চায়
সংসারের কাপড় মেলা দড়িতে তখনও গ্রামীণ পতাকা,  বুঝে নিতে কষ্ট  হয় না
তার নিচেই আছে ধানখেত আর সূর্যমুখী
জলসেচের শব্দ ভরে যায় বাতাসের স্নায়ু ও শিরায়--

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কৃষক
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

ঘন দুপুরের নিরিবিলি ধানের ডগায়
সবুজ নাচে সমুদ্র হাসিতে, যেন নিভৃত পাখিদের
আঁকা জাগ্রত দিন - টান টান ;
দেবদাসী নৃত্য পটিয়সী , যে নিজেকে
বিলিয়ে দেয় ঈশ্বর সেবায় -

ঝরঝর শব্দে রোদের যন্ত্রণায় কম্পিত
তরুণ আমের মুকুল, মাতাল ; বেলপাতা নয়
শ্রম ঢালে দেবদাসী পায়ে-
নৌকা ভাসায় গরিবি চোখে
মাঠ ফুলের গা ঘেঁসে মানুষের ঋতু নিয়ে
ভালবাসা বিলিয়ে দেয় উত্তরপুরুষ  ; পরম্পরায় -

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিঃশব্দ
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

সবুজ নিঃশব্দ শরীরে মুগ্ধতা ; কথা  
আর কথাদের মতো ভীড় জুড়ে আছে আলোর ঝিল ,  মিশে যায়
মানুষ ও কায়ায়  ; বাষ্পমেঘের গুমোটে রোদ পেলেই
তার অভাব বোধ , চোখ গেল পাখির নিরুপায় তৃষ্ণা
.                    উঠোন ফেটে চৌচির

একদিন হাঁটতে হাঁটতে ভিজে গেলাম খুব
চোখের পাতা বেয়ে নদীর বিপর্যয় , দরজা জানলা
সব মুছে যায় -  ছায়া শরীরেরর স্যাঁতসেঁতে
সুর ও কাহিনীর অতীত

স্রোত পথ করে নেয়
সব ছন্দ আর আলো ছড়িয়ে যায়
.             উঁচু নিচু মাটির অলস নদীপাড় -

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অশোক
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

অভ্যাসের কাছে চাঁদ থাকলে দীর্ঘশ্বাস বাড়ে
মেঘের গায়ে লেপটে থাকা ধূলোময়লার দখলে
অসহ্য গুমোট, আকাশের গায়ের ইতিহাস থেকে
পোড় খাওয়া বট গাছটি ডানার ঝটপটানি  সহ্য করে,
ভেতরে ভেতরে পথ ক্ষয়ে যায় -
সেই খাদের ধারে দাঁড়িয়ে মেরুদণ্ড সোজা করার
কথা বলে অতীত গভীরের নক্ষত্র গুলি, ঝোপঝাড়
শেকড় বাকড়ের সুগন্ধি সঙ্গমে তেতো নোনতা পাতায়
রাতের স্নায়ু,  ঋতুবন্ধ্যা নারীটি কপাল আড়াল করে
হাতের চেটোয়; তার চার পাশে দুচোখের ক্লান্তি-

কৃষ্ণপক্ষের মাঝে নিঃস্ব হয়ে যায় অশোক দুরত্ব

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পরাগ
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

খালের ধারে দাঁড়ালে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত
ঢেউগুলি ভাটিয়াল হয়ে যায় -
কিনারা  কিনারায় কচুরিপানার জীবনগুলি ক্ষতবিক্ষত ও শান্ত
তার সাথে অনন্ত অবগাহন,  - লেপটে থাকা নিরন্তর পরিক্রমায়
দূরত্বের খরতাপ, আকাশ বিস্তারের মরণ বাঁচনের বাঁশি
বাতাসের শব্দে দাঁড়কাকের লাস্যময় উঠানামা--
রুক্ষ খোঁপায় তখন সবুজ ফড়িংয়ের হাঁফছাড়া নিশ্বাস

কেঁপে উঠি রোজ।
ধানখেতের জনপদে সহস্র চোখ, উন্মুক্ত পিঠে সেই উত্তরপথ
পলে পলে বদলে যায় আকাশের রঙ
সরু জলে স্বপ্নের নূপুর লজ্জাময় -- কিছু ছায়া আর ইতিহাসবৃক্ষ
বুকে নিয়ে আঁকড়ে রাখে মাটি, বহন করে কত পরাগ
দূরে আমার নিঃশ্বাস ; পূর্ণতার মাঠ পেরিয়ে যাই
.                                         এক উঠোন রোদ্দুর --

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হিজল গন্ধ
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

বলরামের জন্য  হাহাকারটা বেশি দিন থাকেনি  ;  ঘাড় সোজা করে
যে যার পথ আনতে স্কুল বাড়ির ধারের জমিটায় পুঁতে দিয়েছে কদম
গাছ, একই সঙ্গে কেলেঘাইয়ের বুক থেকে গঙ্গামেলার মাটি এনে
জীবন লিপিময় করে এগিয়ে গেছে আগুনের কাছাকাছি - যার ফলে
অস্বচ্ছ কারণগুলো নিজেদের শিরদাঁড়া থেকে নেমে গেছে মাটির ফাটলে-
মাটিই পারে কার্য কারণ লুকিয়ে ফেলতে, তাই একটা কবিতার জন্য
প্রকৃতির দুঃসাহস বুকে নিতে হয়, শিরদাঁড়াকে দুরন্ত অর্জুন গাছের তলায়
দাঁড়িয়ে মাপতে হয় ঝড়বৃষ্টি - বুকের গোপন ঢেউয়ে অক্ষত হাওয়া ঘর -
জমা থাক হিজল গন্ধ-

এখানে বৃষ্টির পূর্বাভাষ,  গাছ ও শশ্মান সমেত জীবনের তিন ভাগ--

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সৌম্য
কবি লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

নীল অপরাজিতা হয়ে ফুটে আছেন আমার ঠাকুমা
গাছের আড়াল কিংবা পাখি ডাকের সর্বত্র নির্জনে
নীল রং হয়ে দুলতে থাকেন মায়ায় মায়ায় -
আরও অনেক স্বপ্নঘোরে সেই কবে আমরা তিন জন,  
বাবা ভাই আর আমি দিয়ে এসেছিলাম সেখানে -  
ভিজতে ভিজতে
কাঁদতে কাঁদতে
কর্পূরের গন্ধের সাথে
অগম্য সম্পর্কের মতো রেখে এসেছি কদম গাছের নিচে

ওদিকে মধ্যাহ্ন গড়িয়ে গোধূলি হচ্ছে
এত পথ,  সীমাহীন
মেঘ মেঘ কূজনে নিজের বুকে পুষি সৌম্য আগুন -

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর