কবি মাহমুদ হায়াত-এর কবিতা
*
অন্য আকাশ
কবি মাহমুদ হায়াত

এখানে অন্য আকাশ ঝুলন্ত ব্যালকনি,
বুকের উপত্যকায় নরম নরম রোদ ঢেউ খেলে
দূর বিজন পথ, এলেস্ট্রোমেরিয়া ফুলের পাপড়ি।
সমুদ্রমন্থনে জেগে ওঠা স্মৃতির বিপুল বৈভব।
রোদরঙা শাড়ি, পান্থ-পরিযায়ী ডানা মেলে বসন্তের আঙিনায়,
বেভুলো সুরে তুবড়ি ফোটায় হরবোলা পাখি।
সেসব তৈলচিত্রে আঁকা সিসিলি দ্বীপের মতো টেরাকোটা।

শরীরই বোঝে কেবল ভালোবাসার মিশ্রকলা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মৃতসাগর
কবি মাহমুদ হায়াত

তখন ঢেউ ঢেউ আকাশ ছাঁদের উপর,
উটের ক্যারাভেনে ঘুম ঘুম চোখে ফেরে মুসাফির।
ভাটফুল ঠোঁটে বুকের কার্নিশে জমা নির্জন রাত,
নিজের মধ্যে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত সমুদয় নদী।
দুটো ঘুমশালিক এক পায়ে দাঁড়ানো,
গল্পের শেষে তারার আলিম্পন টিপ্পনী কাটে
খড়কুটো ঠোঁটে পাখিবেলা শেষ হয়।
ঝোপ ঝোপ দুধারে ফোটা রডোডেনড্রোন।
বিরান মাঠ, একলা বাউল উদাস উদাস পিছুটান যেখানে...

বুকের উঠোনে 'মৃতসাগর' চাইলেই ভাসতে ও ভাসাতে পারো...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নক্ষত্র দুটো
কবি মাহমুদ হায়াত

শরীর-শরীর রাত নেমে এলে নিভে যায় ঝাড়বাতি,
তৃষ্ণায় জ্বলে ওঠে দুইজোড়া জোনাকচোখ।
একুরিয়ামের জলে সাঁতারাতে থাকে রঙিন মাছ ,
আর অস্তমিত সূর্য মুখ গোজে বুকের উপত্যকায়।
জাদুকরী হাত দুটোও তখন বুঝে নেয় যুগল ভূখণ্ডের স্থাবর মালিকানা,
তারপর তুমুল কোলাহলে প্রতিমার শরীর বেয়ে খসে পড়ে কাঁদামাটি ,

নক্ষত্র দুটো আবার পাশাপাশি ঘুমিয়ে যায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মানুষ বেঁকে যায়
কবি মাহমুদ হায়াত

মানুষ খুব সহজে বেঁকে যায় বলে' সাত জনমেও মানুষ, মানুষ হয়ে ওঠে না।
পর্বত কিংবা বৃক্ষরা কখনও বাঁকে না
নদীরা যাত্রা পথে বাঁধা পেলে পথ বদলায় অভিমানে অন্য পথে।
গাছেরা জানে না ভালো থাকার ফন্দি ফিকির,
গাছেরা ভেঙে যায় কষ্ট বুকে চেপে।
কেবল মানুষ ভাঙে না স্বার্থের অমোঘ সুতোর টানে সে একশোবার বেঁকে যায়,
একশোবার খোলস বদলায়।
মানুষ বেঁকে গেলে তার কি বা থাকে বাঁকি ?
পাহাড় নদী গাছেদের কোন বিদ্যাবাড়ি নেই, মানুষ তবে সেখানে কী শেখে ?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঝুপড়িমেয়ে
কবি মাহমুদ হায়াত

বুক উচিয়ে হাঁটা যাবে না, মাথা উঁচু করলেও দোষ,
ঘাড় ডানে থেকে বায়ে ফেরালেও...
জিন্স পরা, চুল দেখানো যাবে না, এমন হলে অমন...
তুমি বরং হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটো মেয়ে...
মুরগী ভেবে শিয়ালেরা তোমার পিছু নিক।
খোলা খাবারে পেট নষ্ট হয় এই প্রকার ভেবে যারা কপালে নাক তোলে...
তুমি জানো না তারাও দেবালয়ে বসে ঈশ্বরের পাশাপাশি আদ্যোপান্ত তোমাকে যপে...

ইঁদুর-ইঁদুর খেলা দেখে শিকারী বিড়ালকে তুমি কেন সাধু ভাবো ও ঝুপড়িমেয়ে ?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ধার করা জীবন
কবি মাহমুদ হায়াত

ধার করা জীবন নিয়ে বেঁচে আছি শ্বাস টানা রুগী কিংবা মধ্যবিত্ত সংসার।
বুক চাপড়াতে চাপড়াতে দিন গুজার করি, নিত্যকার ঊর্ধ্বগতি চাল চুলো টেনশান,
দুবেলা দুমুঠো ডালভাতের জন্য যুদ্ধ করি, ভীড় ঠেলে পাবলিক বাসে অফিসে যাই,
ধার করা আগুনে বিড়ি টানি রোগ বালাই সন্তানের বাড়তি আবদার...
যদিও এসব যুদ্ধে বিজয়ীদের খেতাব অথবা বিশেষ ভাতা থাকে না।
চোখের সামনে উন্নয়নের মুলো, পা দুটো আটকে থাকে চৌকাঠে,
নাগালের মধ্যে থেকেও অনেক কিছু ছুঁতে পারি না।

সুদাসল কানায় কানায় পূর্ণ, এর বাইরে আর জীবন থাকে না...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আঘাটার জল
কবি মাহমুদ হায়াত

ভণ্ডদের মুখ থাকে না হরেক রঙের মুখোশ থাকে।
বিক্রি হতে পারলাম না বলে ভাবিসনে আমি ভজার আড়তের ফেরত মাল।
ও রকম দু'চারটে মুলো আমার সামনেও মাঝে মধ্যে ঝুলিয়ে দেয় লাট বাহাদুরের চামচারা,
যেমন তীর্থে যাওয়া, বিদেশ ভ্রমন, ফ্লাট বাড়ি একটা পদক।
শালা আমি কি তোর মতো রে... আঘাটার জল, ঘোমটা দিয়ে লেংটা নাচি?
পঁচে গেলেও ভাবিসনে তোর মতো সাত-সাতবার বেচা হবো...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
উত্তরের আকাশ দেখি
কবি মাহমুদ হায়াত

এখন আর কিছুই হয় না আমার, ভীড় ঠেলে হাঁটতে পারি না,
বৃষ্টিতে ভেজাদিন কিংবা এক নিশ্বাসে ডুব সাঁতার।
চশমার আড়ালে হারিয়ে ফেলি খেই, উঠতে বসতে গাটে গাটে কমজুরি
বৃষ্টি নামলে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ফিরি,
তোয়ালে টেনে মাথা মুছি, হাতড়াই কাঁশির সিরাপ, বাতের বড়ি।
কিংবা কোন বিকেল মনে পড়লে ভাঙা সাঁকোর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকি,
উত্তরের আকাশ দেখি।
কখনও কিছুদূর রেলপথ ধরে হাঁটি হুইসেল বাঁজিয়ে ট্রেন চলে যায়,
বগিগুলো এখন আর গোনা হয়না আমার।
ভুলে যাই চাকার নিচে একটা পয়সা দেওয়া।
অথচ একটা চ্যাপটা পয়সা আমাকে বেমালুম চঞ্চলসুখ এনে দিত একদিন।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ছেলেবেলা টানে
কবি মাহমুদ হায়াত

মাঝ বয়সে দিলিপ মাথা কেটে দেলোয়ার হলো
সাতপাকের বাঁধন ছেড়ে, এখন সে ঘোমটা সরিয়ে বায়স্কোপ দেখে...
রিপন ভালো আছে মাঝে মাঝে দেখা হয়,
ডারবি ছেড়ে ঘর পেতেছে বান্ধবীর সাথে, এখন বেনসন ফোঁকে।
আর আমি কবিতা করে জীবন চলে ?
তাইতো অনিতা'র বাবা বুঝলো না চৌহদ্দি লিখে দিলো রনেনের হাতে।
শুনেছি ওদের দুধে ফসলে বারোমাস, ওরা ভালো আছে।
দিলিপ সময় করে দেখে যা শিপ্রা বৈদি এখনও কপালে সিঁদুর মাখে।
তোরা কি এখনও যাস কৈবল্যধামে ?
পাচনের ধোঁয়ার গন্ধ আমার ছেলেবেলা টানে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দিকশূণ্য ভাবনা
কবি মাহমুদ হায়াত

শাদা ব্লাউজ কিংবা স্লিভলেস...
দুদিকে ছড়ানো কাঁধ, ভিতরে লাল নীল কাঁচুলি
দৃশ্যত দুটো ফিতে ইউটার্ন হয়ে পাহাড়ি পথের মতো নিচে নেমে যাওয়া।
সংলগ্ন দুটো পর্বত, রোদ্দুর চোখ,
পশ্চাতে পাহাড়ি ভূমি, এক গোছা চুল চোখের উপর, প্রসাধনীর গন্ধ।
বাগানবিলাস শাড়ির আঁচল যখন হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে,
দিকশূন্য ভাবনা তখন সমাচ্ছন্ন করে সমাজের কামুক চোখ,
কারও কারও ঘুড়িমন প্যাচ লেগে বেহাত হয় আর ভূমিতে জলের প্রস্রবণ ।
হয়তো তারা সূর্যস্নান দেখেনি বলে...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর