কবি নিত্যকৃষ্ণ বসুর কবিতা
*
নির্ভর
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার জ্যেষ্ঠ ১৩০৭ (মে ১৯০০)
সংখ্যা থেকে নেওয়া।

শৈশব সুখের কাল সব লোকে বলে,
আমি সে কাটানু শুধু কুহকের ছলে।
যৌবনে যাতনা যত কহিব কি আর,
জ্বলিয়া পুড়িয়া তনু হ'ল ছারখার।
প্রয়াণের পথে শেষে পশিনু যখন,
দেখিনু সমুখে সিন্ধু গরজে ভীষণ।
পারের সন্বল নাই, না জনি সাঁতার,
ঘনায়ে আসিছে সন্ধ্যা মৃত্যু অন্ধকার,
আকাশ পাতাল ভেঙে আইল ভাবনা,
বুশ্চিক-দংশন সম শতেক বেদনা।
সাত পাঁচ ভেবে শেষে পড়িনু ঝাঁপিয়া,
কহিনু সান্ত্বনাভরে মনেরে স্মরিয়া ;---
“আর বৃথা পরিতাপে কি হইবে ভাই,
অকূল পাথারে এবে যা’ করে গোঁসাই।”

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নবীন
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার বৈশাখ ১৩০৬ (এপ্রিল ১৮৯৯) সংখ্যা
থেকে নেওয়া।

নবীন বরষে আজি বৈশাখের দিন
নিরখি অবনীতলে সকলি নবীন।
আকাশে নবীন মেঘ শ্যামলবরণ,
কাননে শ্যামলতর নবীন ভূষণ।
নবীন মুকুলে ফুলে লতা গেছে ছেয়ে,
আনন্দে নবীন তানে পাখী উঠে গেয়ে।
নবীন সমীরে লভি' নব কলেবর
লহরী রূপসী নাচে সরসী উপর।
সাধ যায় হেন দিনে নবীন মধুর
হৃদয়-বীণার তারে বাঁধিবারে সুর।
সাধ যায় বসুধার বসন্ত মতন
জীবনে জাগায়ে তুলি নবীন যৌবন।
পুরাণো এ অশ্রুরাশি করি পরিহার
রচি শুধু নব নব প্রমোদের হার।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভুল
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩০৬, (নভেম্বর ১৮৯৯) সংখ্যা
থেকে নেওয়া।

আমারি এ ভুল, বন্ধু, আমারি এ ভুল ;---
সে ষে ছিল বরষার                        কুটজকুসুমহার,
শরতে সোনার ক্ষেতে শেফালির দুল ;
হেমন্তে কুন্দের হাস,                   বসন্তে বেলার বাস,
নিদাঘে অপরাজিতা এলায়িত-চুল ;---
আমারি এ ভুল, বন্ধু, আমারি এ ভুল !


আমারি এ ভুল, বন্ধু, বলি শতবার ;---
সর্ব্বস্ব ফেলিয়া পাছে             সে যবে আসিত কাছে,
গললগ্নীকৃতবাসে করি নমস্কার,
দুই করে কৃতাঞ্জলি              “প্রেমভিক্ষা দেহ" বলি"
দাঁড়াইত মূর্ত্তি যেন দীন দীনতার,
ভাবিতাম মনে মনে,                আমি ধনী যেই ধনে
সে যে পূর্ণ সফলতা কম-কামনার,
শত সুষমার খনি                সে যে কোহিনুর মণি
সোহাগে ধরিবে শিরে রাণী অলকার ;
এ কি বিড়ম্বনা হায়!             ভিখারিণী তারে চায়!
এমনি নিলাজ বটে আশা দুরাশার!


আমারি এ ভুল, বন্ধু, বুঝেছি এখন ;---
কে জানিত সেই দিন              দীন হ'তে আমি দীন,
বুকে পোরা সর্ব্বনাশী হোম-হুতাশন ;
চির নিশি.দিনমান                শিখা যার লেলিহান
রস রক্ত মাংস মেদ করে বিদাহন ;
কে জানিত অবশেষে             ক্ষুধার্ত্ত কাঙাল বেশে
সর্ব্বশূন্য অকিঞ্চন অনাথ মতন,
দীর্ণ শত বজ্রাঘাতে                এ হৃদয় ল’য়ে হাতে
ধরার ছুয়ারে হ'বে করিতে ক্রন্দন ;---
আমারি এ ভুল, বন্ধু, বুঝেছি এখন।


আমারি এ ভুল, বন্ধু, লইনু মানিয়া ;---
---কেমনে জানিব, হায়,                পরিহরি অলকায়
মায়া করি’ মানবীর মূরতি ধরিয়া,
দীনা ভিখারিণী বেশে                ধরার কুটীরে এসে
অলকার লক্ষ্মী মোরে যাবে যে ছলিয়া ;
কেমনে জানিব তবে                সেই যাচনার রবে
চিরসুখ-বরদান, ছিল লুকাইয়া ;
স্বর্গের সম্পদে তাই                উপেক্ষা করেছি ভাই,
ভেঙেছি মঙ্গল-ঘট চরণে ঠেলিয়া ;---
আমারি এ ভুল, বন্ধু, লইনু মানিয়া।


আমারি এ ভুল, বন্ধু, বলি আরবার ;---
সব গর্ব্ব-অভিমান                চূর্ণ আজি শতখান,
শূন্য ঘরে রিক্ত আত্মা করে হাহাকার ;
বিশাল বিশ্বের পাট                ধূ ধূ ধূ মরুভু-মাঠ
হু হু হু অবাধ বায়ু বহে অনিবার ;
বাসগৃহে করি থানা            পিশাচে দিতেছে হানা,
অদৃষ্টের অট্টহাসে কাঁপে চারিধার ;
ঢাকিয়া শবদ সব               সদা ‘দেহি-দেহি’ রব,
উচ্চকণ্ঠে আর্ত্তনাদ চির বুভুক্ষার ;---
আমারি এ ভুল, বন্ধু, বলি আরবার।


আমারি এ ভুল, বন্ধু, বুঝিনু এখন ;---
ছিঁড়িয়া কনকপট                   ভঙিয়া মঙ্গলঘট
করিতেছি কাষ্ঠলোষ্ট্রে দেবতা-পূজন ;
দ্বারুণ অবজ্ঞাভরে                দূর করি কমলারে
কামরূপা কূহকীর চরণ-বন্দন ;
সে ছিল শঙ্কিতগতি                হরিণী বেপথুমতী,
এ ষে প্রলয়ের বামী বড়বা ভীষণ ;
সে ছিল জগতধাত্রী                স্বর্ণসীতা সুখদাত্রী,
এ যে শুষ্ক শূর্পণখা সর্ব্ব অলক্ষণ ;
আমারি এ ভুল, বন্ধু, বুঝিনু এখন।


আমারি এ ভুল, বন্ধু, আমারি এ ভুল ;---
কেন না শুনিন্থ কানে             সে বচন বীণাগানে?
সেই প্রেমমন্দাকিনী কল-কুলুকুল?
কেন না দেখিনু, হায়,             সে আনন-সুষমায়?
ধরাতলে কোথা আছে তার সমতুল?
জীবন-মন্থন-সার                মোহিনী সে অমরার,
সকল সুখের উৎস, প্রণয়ের মূল।
তাই ভাবি প্রাণ দিলে             প্রাণের সর্ব্বস্ব দিলে
আর কি মেলে না সেই ত্রিদিবের ফুল?---
আমারি এ ভুল, বন্ধু, আমারি এ ভুল।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিঃসম্বল
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
১৯৯১ সালে প্রকাশিত, সুকুমার সেন সম্পাদিত, “বাংলা কবিতা সমুচ্চয় ১ম খণ্ড” সংকলন
থেকে নেওয়া।

সুখে দুঃখে এ জীবন, হে জীবন স্বামী,
তিলমাত্র দুঃখ তাহে নাহি গণি আমি।
হ’ক সুখ হ’ক দুখ, তোমারি সে শন ,---
কভু বা বিকাশে ঊষা কভু অবসান।
বসন্ত হাসিয়া ফিরে, নাহি তার লাজ,
বরষা সে কেঁদে সারা সেই তার কাজ।
যে হাসে যে কাঁদে আর যেবা যায় চলে,
সবাই দাঁড়ায় শেষে সিংহাসন-তলে ;
সুখ দুঃখ হাসি-অশ্রু যাহা আছে তার
তোমার চরণ প্রান্তে দেয় উপহার।
রিক্ত এ পরাণ মোর শূন্য সব ঠাঁই,
আমি যাব কি লইয়া ভাবিতেছি তাই ;
সুখ যাহা দিয়েছিলে দেখি নাই ভুলে,
দুঃখেরেও বরি নাই বক্ষে লয়ে তুলে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুন্দর
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার বৈশাখ ১২৯৭ (এপ্রিল ১৮৯০) সংখ্যা
থেকে নেওয়া।

এ জীবনও তবে মোর যাবে কি বৃথায়?
হে সুন্দর! মনে হয়, সৌর-জগতের
গ্রহে গ্রহে এসেছি খুঁজিয়া ; দিবসের
অবসানে, লোকান্তের সমুদ্র-সীমায়,
কত জন্ম কাঁদিয়াছি বসি ; ছিন্ন-প্রায়
আজি এ হৃদয়-বীণা হায় ! ---সংসারের
রঙ্গ-ভূমে, সেই ভিক্ষা-গীতি মরমের
পুনর্ব্বার ধরেছি তুলিয়া ; আকাঙ্ক্ষার
পথ চাহি কাটে দিন, কাটিছে রজনী
অনিদ্রায়, উষ্ণ-শ্বাস মিশিছে বাতাসে !
কে জানে এ অবসানে, জন্মাস্তর গণি,
যাবে পুন কত কাল বিফল হুতাশে !---
অয়ি! কোথা জগতের অসীম সুষমা?
কোথা তুমি চিত্রলেখা? কোথা তিলোত্তমা?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদেশের পাখী
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩০০ (নভেম্বর ১৮৯৩)
সংখ্যা থেকে নেওয়া।

বিদেশের ক্ষুদ্র পাখী মর্ত্ত্য-তরু-শাখে
.        এক রাত্রি ক’রেছিল বাস ;
কেউ তা'রে চিনিল না, আপনি গাহিয়া
.        আপনি সে ফেলিল নিশাস।
প্রভাতে সে উড়ে গেছে, হ'য়েছে স্বাধীন ;
.        কথাটিও যায়নি বলিয়া
কোথা হ'তে এক রশ্মি আলো .এনেছিল,
.        তা’ই শুধু গিয়াছে রাখিয়া।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পুনর্ম্মিলন
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার শ্রাবণ ১৩০৩ (জুলাই ১৮৯৬) সংখ্যা
থেকে নেওয়া। রচনা ৫ই শ্রাবণ ১৩০২।

এত দিন পরে পুন কবিরে তোমার
মনে কি পড়িল প্রিয়ে? জাগিল পরাণে
সেই শান্ত স্লেহরণ নিশীথ শিখানে?
সেই পরাজয়ে জয় নিত্য দু'জনার?
এই মর্ত্ত্য-লোকে তাই এলে কি আবার,
বহিয়া সে সুকোমল কমল-বয়ানে
যে নম্র নয়ন-যুগ?---প্রেম-অভিমানে
সেই সে করুণ আভা আঁখির মাঝার?
এলে যদি, প্রিয়তমে, আর 'এ জীবনে
জীবন থাকিতে আমি দিব না ছাড়িয়া।
বন্দী তুমি এই বার ; অরুণ চরণে
অক্ষয় হৃদয়-ডুরী দিলাম বাঁধিয়া।
ছিলে সংসারের পথে সংসার-সঙ্গিনী,
আজি হতে হ'লে মোর “মর্ম্মের গৃহিণী।”

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রক্ষালিপি
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার আশ্বিন ১৩০৩ (সেপ্টেম্বর ১৮৯৬)
সংখ্যা থেকে নেওয়া।

সমর্পিনু আজি মা গো! রাজীব-চরণে
এ প্রাণ-শিশুরে মোর। স্নেহ-আশীর্ব্বাদে
বিনাশিয়া সর্ব্ববিধ বিঘ্ন-পরমাদে
রক্ষা তুমি কর এরে অক্ষয় যতনে।
ভাগ্যহীন আমি মাগো! সংসার-ভবনে
একটি যে রত্ন বক্ষে ধ'রেছিনু সাধে,
তা'রেও হরিল কাল ;--- পূর্ণিমার চাঁদে
গ্রাসিল জলদ যেন শারদ গগনে।
তাই আজি সভয়ে মা! অভয় ভাবিয়া
লইনু আশ্রয় পদে। যে অপূর্ব্ব বলে
শূন্য পথে সপ্তলোক রেখেছ ধরিয়া,
পালিছ বিশ্বেরে নিত্য স্তন্য-অন্ন-জলে,
সেই মৃত্যু-বিজয়িনী শক্তি সঞ্চারিয়া
দাও রক্ষালিপিখানি বাঁধিয়া এ গলে।

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাঁশী
কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার আশাঢ় ১৩০৪ (জুন ১৮৯৭) সংখ্যা
থেকে নেওয়া।

কবে তুমি বেজেছিলে বিশ্ববৃন্দাবনে
হে বিশ্ববেদনাভরা বাঁশী? কালিন্দীর
কালো বুকে, সে দিন কি তরঙ্গ অধীর
গ্রথম পড়িল লুটি' তটের চরণে?
রোমাঞ্চ কি দিল দেখা প্রেমের স্বপনে
কদন্বকুসুম-রূপে স্তব্ধ বনানীর?
সুনীল অঞ্চলে ধরা ঢাকি' অশ্রুনীর
ফেলিল কি গুপ্তশ্বাস সুপ্ত সমীরণে?
কিশোরী সে ধরিত্রীর কোমলহৃদয়ে
প্রথম সে পূর্ব্বরাগ, কি অন্ধ আগ্রহে
কি গূঢ় সৌরভভরে উঠেছিল জাগি?
কি উচ্ছ্বাসে মরমের গোপন নিলয়ে
কেঁদেছিল আদিমাতা সর্ব্বস্ব তেয়াগি
অপূর্ব্ব সুন্দর লাগি’ অপূর্ব্ব বিরহে?

.              ****************                
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর