| কবি নিত্যকৃষ্ণ বসুর কবিতা |
| প্রসূতির পূর্ব্বরাগ কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ ১৩০৩ (ডিসেম্বর ১৮৯৬) সংখ্যা থেকে নেওয়া। ১ কেজানে কাহার লাগি ব্যাকুল বাসনা রাশি! কার আশে রয়েছি বাঁচিয়া! নীরব মায়ের কোলে সুখের শৈশব-হাসি কেবা সেই হাসিবে আসিয়া? ২ কেমন শিরীষ-সম কোমল মু'খানি তার! কেমন সে নয়ন-কমল! আগাগুলি বাঁকা-বাঁকা চিকণ কেশের ভার ; ওষ্ঠ দুটি রক্তিম তরল! ৩ কেমন লাবণ্য-ঘেরা ননীর শরীরখানি,--- লতাটি আবৃত জোছনায় ; কেমন সে অর্থভরা অফুট অমিয়-বাণী,--- বাণী-বীণা বচনের প্রায়! ৪ গোধুলির স্নিগ্ধকোলে সে কি গো উঠিবে তারা, সন্ধ্যা তাই রয়েছে চাহিয়া? না---না ! সে যে প্রভাতের অরুণ-কিরণ-ধারা, নিশি তাই উঠেছে জাগিয়া। ৫ বুঝি সে বিহগ-সম গাহিবে বসিবে ডালে ; তরু তাই সেজেছে মধুর! তাই বুঝি মধু ঋতু কচি কিশলয় জালে উপবন রচেছে প্রচুর! ৬ বুঝি সে ফুলের মত ফুটিবে বিজন বাসে সৌরভেতে ভরিয়া কানন ; চুমো খেয়ে, গান গেয়ে, দোলন দিবার আশে আসে তাই মলয়-পবন। ৭ না---না! সে নন্দন-বায়ু, বসন্ত-রাগিণী তুলি মেঘ-পখে আসিবে ভাসিয়া ; সরল স্নেহের ছলে মন্দার-মুকুল গুলি মার বুকে দিবে বিকশিয়া! ৮ ঊষার আলোকে তার নিশার তমস নাশি এ জীবন যেতেছে বহিয়া ;--- কে জানে কাহার লাগি ব্যাকুল বাসনারাশি ! কার আসে রয়েছি বাঁচিয়া! . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| যবনিকা কবি নিত্যকৃষ্ণ বসু। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত, “সাহিত্য” পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩০২ (নভেম্বর ১৮৯৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া। রচনা ২৮ কার্তিক, ১৩০২। ১ আজি এই নিশীথের নিভৃত শয়নে, নিদ্রাহীন নয়ন আমার ; শূন্যমনে, শূন্য প্রাণে, চাহি বাতায়ন পানে চিন্তার তরঙ্গরঙ্গে দিতেছি সাঁতার! হেরিতেছি হেমন্তের শিশির আকাশে, দূরব্যাপী দিগন্তের গায়,--- আমারি আঁখির মত দেবতার আঁখি শত জেগে আছে পরিপূর্ণ কৃপা মমতায়। ২ সমুখে পধিত্র-জলা জননী জাহ্ণবী ; মুখে তাঁর স্নেহের বচন ; কি অপূর্ব্ব প্রীতিভরে ধরার মৃত্তিকা পরে বহিছেন বিশ্বপতি-বাঞ্ছিত জীবন। কুহেলিকা-ঢাকা চারু মূর্ত্তি প্রকৃতির ; কভু দূরে নাচিছে কেবল,--- গঙ্গার অপর পারে, কোথা কোন দীপাধারে, কা'র কুটীরের আলো মুমূর্ষু, চঞ্চল। ৩ কি গভীর শান্তিমগ্ন সমস্ত সংসার ! ফি স্বপন-সঙ্গীতে বিহ্বল!--- সাঙ্গ দিবসের রণ ; শ্রান্তদেহ, ক্লান্তমন, অকাতরে নিদ্রা যায় সৈনিক সকল। কিন্তু শান্তি কোথা এই হিয়ার মাঝার? সুখসুপ্তি কোথা এ নয়নে? হেরি শুধু চারি ধার গুপ্ত অশ্র-পারাবার উচ্ছ্বসিয়া উঠিয়াছে নিশ্বাস-পবনে। ৪ প্রকৃতি ! ---পাষাণময়ী প্রসূতি আমার !--- আশৈশব ধরিয়া ও বুকে, পুতনা-রাক্ষসী প্রায়, কালকূটে ভরা, হায়, একি স্তন্য দিয়েছিস্ সন্তানের মুখে? নিদারুণ আত্মঘাতী অতি এ বাসনা! এ যে তৃষা জলন্ত অনল ! জহ্ণু-গণ্ডুষের প্রায়, নিমেষে গ্রাসিতে চায় বিশ্বের ভাণ্ডার-ভরা রহস্য-সম্বল। ৫ ভুলাইতে হেন মুগ্ধ প্রমত্ত হৃদয় করেছিস্ কত-না প্রয়াস! প্রত্যেক কলিজা ঘেরে পাকে পাকে শত ফেরে পরাইয়ে দিলি শুধু সৌন্দর্য্যের ফাঁস! কত নব নব দেশে লইয়া ফিরিলি, প্রমোদের তরী ভাসাইয়া ;--- হায়! সে সাধন-ধন সৌন্দর্য্যের বৃন্দাবন কোথায় মিলিবে মর্ত্ত্য-মরুভূ খুঁজিয়া? ৬ দেখাইলি মার মুখ---সংসার-কাননে একমাত্র স্বরগের ফুল ;--- স্নেহের তিয়াসা ঘোর তা'তেও মিটে না মোর নূতন আকাঙ্ক্ষা আসি করিল আকুল ;--- বিশ্বের যশোদা সেই কোথা মা আমার? কোন্ গৃহদ্বারে দাঁড়াইয়া, ভব-গোষ্ঠ গোচারণে পাঠায়ে জীবন-ধনে, আগ্রহ-ক্ষরিত-স্তনে আছেন চাহিয়া? ৭ তা'র পরে দিলি তুই যৌবনের বনে হেমে-গড়া প্রেমের হরিণী ; কুঞ্জে কুঞ্জে ছুটি ছুটি, বুকেতে, কোলেতে উঠি কত খেলা খেলিত সে দিবস-যামিনী !--- নাহি তৃপ্তি।---ভাবিতাম, কোথা সে নন্দনে বিছাইয়া বাসর-শয়ন, আমার সে বিশ্বপ্রিয়া, মালাগাছি গুছাইয়া, চকিতনয়নে করে যামিনীযাপন। ৮ এইরূপে উপেক্ষায়, অভিমান ভরে, শূন্য করি অন্তর-আগার, যাহা কিছু দিয়েছিলি, সকলি গিয়েছে চলি ,--- জগতের, জীবনের, যৌবনের সার। বরষার গুরু-গুরু নাহি সে গর্জ্জন ; বসন্তের নাহি সে বিলাস ; আর সে শরৎ-বুকে শেফালি ফুটে না সুখে নিদাঘে বহে না সেই দক্ষিণ বাতাস। ৯ তাই, আজি, রে পাষাণী, নয়ন-সলিলে তোরে আমি সাধি এইবার, --- এ জনমে যার লাগি করেছিস্ সর্ব্বত্যাগী খোল তবে সেই চির-রহস্যের দ্বার। মরমের অতি স্তব্ধ গোপন ভবনে মিলনের স্বপন সমান, কোথাকার কথা, হায়, নিশিদিন হৃদে ভায় তাই দেখিবারে চায় ব্যাকুল নয়ান। ১০ আছে প্রেম, নাহি যথা ইন্দ্রিয়-বিকার ; আছে সত্য, নাহিক সংশয় ; সুষমা-মণ্ডিত সব ; কর্ণে শুধু গীতরস ; সর্ব্ব বাসনার সেই বিশ্রাম-নিলয়। দারুণ দুরাশা তোর, হায় রে মানব! বৃথা তোর বিলাপ-বেদন ; জীবন-বন্ধন-পাশ আগে না করিলে নাশ, জীবনের যবনিকা কে করে মোচন? ১১ এই সে সংসার মাঝে সাধিয়া সংযম ধর তুমি তপস্বীর বেশ ; করি ধর্ম্ম আরাধনা পুণ্যের শিশির-কণা যথা পাও, পান কর করিয়া নিঃ:শেষ ; কর্ম-সুরধুনী-নীরে আত্মার কলুষ, প্রাণপণে কর প্রক্ষালন ; শুভ্র ফুলদল দিয়া সর্ব্বশুভ্রে আরাধিয়া হও শুভ্র দেহমনে ফুলের মতন। ১২ একদা আসিবে মুক্তি, মুক্তামালা গলে, হাতে মালা-চন্দনের খাল, --- ধূলিময়, ধূলি পরে’ অলক্ষ্যে পড়িবে ঝ’রে জীর্ণ বস্ত্র সম যত জড়তার জাল। সহসা বিমুক্ত তব মর্ম্মের মাঝার দিব্য নেত্র উঠিবে জ্বলিয়া ; স্ফুরিবে আলোক-শিখা, দুরে যা'বে যবনিকা সমুখে সে স্বপ্নরাজ্য হাসিবে ভাসিয়া। . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |