কবি পায়েলী ধরের কবিতা
*
আবীর
কবি পায়েলী ধর

কোনও গোলাপবন্দরে অপেক্ষারা গুছিয়ে রাখছে আবীর
এ-পাশে দাঁড়িয়ে আমি কাঁটাতার ভাঙছি
কুহকের সভাঘরে আছে নিমন্ত্রণ
সেখানে স্বপ্নের মতো অবাস্তব কিছু
অমর্ত্যের আবাহনী গাইবে
আমার বোবা চোখের রঙিন কাচ
মিথ্যে সমঝোতা খোঁজে
বাতিল উত্তরীয় গলায় তুলে দিচ্ছে প্রান্তিক সম্মান
ঝোলা কাঁধে অগণন ভুলের শব বইতে বইতে
আমি ও ঈশ্বর বন্ধু হয়ে উঠছি দিন-দিন

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঘ্রাণ
কবি পায়েলী ধর

সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়ার পর
ধুলোর মতো গন্ধ ছড়ালো আগন্তুক।
ওকেই একদিন সমাজরহিত অরণ্য দিয়েছি।
মৃত্যুর মতো সে-সব রূপকথা এখন
পাহাড়ি খাদে ঝোলানো।
অথচ, ভূগোলজীবী খুঁজে ফেরে অবাক নোনাজল।
হৃদয় নিঙড়ে ভাবি নদী হই, নিঃস্ব হই।
ভয় নয়, প্রত্যয় আমায় সর্বস্বান্ত করে

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যাজ্ঞিক
কবি পায়েলী ধর

অকারণে কেন ডুবে যাওয়া!
এখনও তো বাকি আছে কিছুটা সংঘাত
উদ্ভিন্ন দিন কোনও বিনিময় চাইলে
তার সমস্ত আয়ুরেখায় লেপে দাও নশ্বর ছাইয়ের গন্ধ
এ-সময় স্বেদ আর রক্ত হাত ধরে ইতিহাস লিখছে
ইথারে জেনেছি, আমাদের অস্থি-অন্তর-অনন্ত-ঘুম— সব
জাহান্নমে বিক্রি আছে
পূতমন্ত্র এসো আগুন জ্বালি
আর ফলকে সাজিয়ে রাখি শ্রদ্ধা
মোমমিছিল কোনও সান্ধ্যগান তুলে আনুক মৌনতায়
আমরা আদিম এবং আত্মা নয়
ভেক ধরি ঈশ্বরের

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বৃক্ষ
কবি পায়েলী ধর

সাঁতরে পেরবো ভাবি বারো ঘর-বারো বাগান
কিছু অন্ধকার মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে আমাকে ছুঁতে
ছোবলের সুখ দিয়ে অসংখ্য ঈশ্বর
পুঁতে দিয়েছেন ফলসা গাছ
ফুল-ফল-জমি-জরা-জাহ্নবী-আগুন
প্রত্যেক ভাগে শেকড় বিছিয়ে ঘুমের ঘাটে যাই
ছাইয়ের গাদায় খুলে রাখি কমলারঙা নাভি
ও-পার থেকে বাঁশি ডাকছে প্রেমিকের মতো
ওর নীল ঠোঁটে এঁকে দিই চুম্বনের অধিক চুম্বন
তিস্তার জলে ক্ষয়ে যেতে-যেতে
স্বর্গীয় চাঁদ জুড়ে যাচ্ছে আমার নামের আগে

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মাধুকরী
কবি পায়েলী ধর

আমাকে ভ্রমণ জানো
ভ্রম জানো হৃদয়ে তোমার
চাবির ঝনাৎকারে
খুলে যায় অনাহারী গুহা
উপোসকাপাস তার
জলের কিনারে থামে একা
ব্যধের ছিলায় যেন
গেঁথে আছে দ্বাদশীয় চাঁদ
খইশাদা উজানের ঢেউ
স্নান ভাঙে নিচু-উঁচু ক্ষয়
আমাকে পেয়ালা ভেবে
চুমুকের জিভে রাখো খিদে
কিঞ্চিৎ গনগনে
সামান্য মৃত্যুকে ছোঁও…

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যাতায়াত
কবি পায়েলী ধর

গাছেদের স্নেহভার শ্লথ হলে পর
খয়েরি পাতারা ঢাকে জল ও বিষাদ
এতখানি যোগাযোগ— তবু তো হৃদয়
অনুরোধ ভুলে ছিল কোন অছিলায়
জানি সব রাস্তাই সামান্য হেঁটে
অবশেষে এক হাত মাটিতেই স্থির
মাঝখানে কোলাহল চেনাজানা ধুলো
কিছু চিঠি লিখে রাখে নিয়মমাফিক
সে-সব হরফ দিয়ে ব্যথা মাপে কেউ
কারও-কারও অভিমানে ধুয়ে যায় চোখ
পৃথিবীর সব শোক আঁচলের খুঁটে
বেঁধে রেখে, তবু কাড়া ফূল বলে ডাকে
কারা যেন ঘড়ি-ভাঙা সময়ের হাতে
মেহগনি ভুল ঠুকে এঁকে দেয় নদী

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাট
কবি পায়েলী ধর

এভাবেই ফেরি করা আয়ু ও আকাশ
আমাদের করতলে গুঁজে দেয় চাঁদ
চাঁদের ও’পিঠে ধান এ’পিঠে চাবুক
পথ খুঁজি, ঈশ্বর ভরসা জোগান
মালা ঢাকা মাথা-বুক-নিমীলিত চোখ
মার্ক্‌স বোঝ কাস্তে? লালরং-দেহ?
ছানাকাটা মাটি খুঁড়ে কারা আঁকে চাকা
খিদে দিয়ে ধুয়ে রাখে সাম্য ও স্বেদ
সমস্ত পানশালা সাঁঝবাতি জ্বেলে
পসরায় সাজিয়েছে তারার বিছানা
দাঁতনখ খুলে রেখে আয়নার জিভে
অবেলায় ভিজে খাক রুপোর কাঁচুলি
এইসব মোহভার: বিষ্ঠা ও বিষ
দেয়াললিখনে ছাপে মৃদু প্রতিবাদ
অথচ হাঁড়ির হাল একা ফুটে যায়
নুন নিয়ে গান বাঁধে কবি ও মাতাল

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
‘ও আলোর পথযাত্রী’
কবি পায়েলী ধর

রুটির গল্প বলতে-বলতে
তোমরা কারা হেঁটে যাচ্ছ
জন্ম থেকে জনান্তিকে
তোমরা কারা প্রসব ঠেলে
ধুলো-ধোঁয়ায় মাখামাখি
মানচিত্রে লেপ্টে আছো
দেশের পেটে কৃমির মতো
অবাঞ্ছিত তোমরা কারা
স্বপ্ন দেখছো ঘর-বসতির
বোকার মরণ: চাকায় পিষে
ধর্মসমেত পুড়ে যাচ্ছ
এখন এবং আবহমান
রাষ্ট্র তোমার শত্রু তো নয়
বন্ধুও নয় প্রসঙ্গত
রাষ্ট্র তোমার আধ-বিধাতা
কপাল লিখছে ঠাণ্ডা ঘরে
হরেক কিসিম হরেক রঙে
রাজার নীতি ছুতোনাতায়
তোমরা খবর রোজ কড়চা
নিম্নবর্গ ছাইকপালী
আলোয় ফেরার পথ ভুলে যাও

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সন্তরণ
কবি পায়েলী ধর

মাস্তুল ভেঙে পোড়া গন্ধরা উড়ান চাইছে
কারা যেন নাভি ছেড়ে গেছে ওই নদীর শরীরে
কিছু ছাই, কিছু বৈভব-গুঁড়ো
দু’টো হাতভরে লিখে দিলো এক নৈঃশব্দ্য
একটা জলজ উপকথা-নাম
তাতেই সাঁতার শিখে নিতে-নিতে
মানুষ কখনও আগুন কখনও ঈশ্বর হয়

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দোসর
কবি পায়েলী ধর

সমাধির কাছে এসে বলো
কতখানি ব্যথা ছিলো গাঢ়
আমি তো ফুলের থেকে বেশি
মিথ্যুক দেখিনি কোথাও
শোকের অধিক কোনও গূঢ়
অভিনয় জানিনি কিছুই
মানুষের পিঠের ও’পাশে
ছায়া বাড়ে, মায়া ছোট হয়
সংসার দেহ খুলে বসে
যেন এক খিলখিলে হাট
বিপনে-বিয়োগে তার
কেটে গেছে ব্যস্ত প্রহর
এখন প্রৌঢ় হলে আলো
বিরতির হয় প্রয়োজন
মৃত্যুর মতো এত বড়
বন্ধুতা থাকে না কোথাও

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর